ভ্লাদিমির নবোকভ > ললিতা [পর্ব-৩] >> ভাষান্তর রনক জামান

0
234

পর্ব ২ (অধ্যায় ৬ ও ৭)

[সম্পাদকীয় নোট : ‘ললিতা’ গত শতকের বিখ্যাত ও নিষিদ্ধ উপন্যাসগুলোর মধ্যে অন্যতম। একটি নাম। এটি বিখ্যাত রুশ লেখক ভ্লাদিমির নবোকভের (১৮৯৯-১৯৭৭) এক অনবদ্য সৃষ্টি। উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশ পায় ১৯৫৫ সালে প্যারিতে ইংরেজি ভাষায়। ১৯৬৭ সালে ভ্লাদিমির নবোকভ নিজেই রুশ ভাষায় অনুবাদ করেন। ললিতা উপন্যাসটি কেবল নিষিদ্ধ প্রেম, প্রণয় বিষয়ক নয়। বরং আদর্শ মনস্তাত্ত্বিক গবেষণাগ্রন্থ হিসেবেও স্বয়ংসম্পূর্ণ। পরবর্তী কোনো সময়ে তীরন্দাজে এ নিয়ে প্রবন্ধ প্রকাশিত হবে। এবার প্রকাশিত হলো উপন্যাসটির নির্বাচিত ষষ্ঠ আর সপ্তম অংশ। এই অংশের শেষে পূর্বে প্রকাশিত প্রথম পর্ব ও দ্বিতীয় পর্বের লিংক দেয়া হলো। যারা আগে সেই পর্ব দুটি পড়েননি, তারা পড়ে নিয়ে বর্তমান পর্বটি পড়তে পারেন।]
৬.
আমি প্রায়ই ভেবে অবাক হতাম, এই নিমফেটদের এরপর কী হয়? মানে নিমফেট বয়স শেষ হবার পর এদের জন্য কী অপেক্ষা করছে? সাংঘাতিক কিছু? এমন কিছু যে ব্যাপারগুলো ওরা ভাবতেই পারেনি? আমি যে ওদের ভেতরের স্পন্দন, নিমফেট স্বাদটুকু চুরি করে নিচ্ছি, ওদের পরের বয়সটাতে এর কোনো প্রভাব পড়বে না? ওদের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে না? উত্তরটা যে ‘হ্যাঁ, তাতে অবাক হবার কিছু নেই। প্রতিটি নিমফেট মেয়ের সংস্পর্শে আসার পর আমি আর তাদের কথা ভাবতে পারিনি। তাদের স্বার্থ তুচ্ছ করে দেখেছি। নিজের ক্ষুধার্ত দানবটিকে সন্তুষ্ট করতে গিয়ে এই নিমফেট মেয়েদেরকে একেবারে নিংড়ে শেষ করে ফেলেছি। ওদের সৌন্দর্য, জ্যোতি, নিষ্পাপ কমনীয়তা সবই নষ্ট করে ফেলেছি। নিমফেট বয়স শেষে ওদের জন্য অসহায় একটা দেহ ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকার কথা নয়। এর চেয়ে নিষ্ঠুর বাস্তবতা আর কী হতে পারে? আমি ওদের পাগলকরা আকর্ষণ এড়াতে পারতাম না। যেভাই হোক, ওদের সংস্পর্শে আসার চেষ্টা করতাম। ওদের পাতলা পোশাকের ভেতর নগ্ন দেহকে মনে হতো একমাত্র আরাধ্য বিষয়। আমি যেসব নিমফেটের সাথে মিশেছি, তাদেরকে বড় হতে দেখেছি, দেখেছি নিমফেট বয়স শেষ হবার পর ওদের ভয়াবহ করুণ অবস্থাটা।
ছোট্ট একটা উদাহরণ দিই। যতদূর মনে পড়ে সময়টা বসন্তের কোনো বিকেল ছিল। ম্যাডেলিনের কাছে একটা রাস্তা দিয়ে আপনমনে হাঁটছিলাম। তখন উল্টো দিক থেকে শুকনো শরীরের একটা মেয়েও দ্রুত হেঁটে আসছিল। পায়ে উঁচু হিল, হাঁটার সময় রাস্তার সাথে ঘষা খাবার শব্দ। আমাকে পার হয়ে যাবার পর ঘুরে এক নজর তাকালাম। দেখলাম মেয়েটিও হাঁটা থামিয়ে আমার দিকে তাকিয়েছে। ভদ্রতাবশত মুচকি হাসলাম। সে আমার কাছে এসে দাঁড়াল, একেবারে বুকের কাছে। আমি ওর শরীরের সস্তা পারফিউমের গন্ধ টের পাচ্ছিলাম। অধিকাংশ ফ্রেঞ্চ মেয়েদেরই হাসার সময় গালে টোল পড়ে। এই মেয়েটিরও তাই। মেয়েদের চোখের লম্বা পাপড়ি আমার পছন্দ। ওর চোখের পাপড়ি লম্বা ছিল। শরীরের সাথে আঁটসাঁট জামা, উদ্ধত বুক, আমার ভেতর একধরণের আকর্ষণবোধ জাগিয়ে তুলল। ওর চোখে আনন্দের উচ্ছাস, দুষ্টু চাহনি, রহস্য ধরে রাখা ঠোঁট, সমস্ত শরীরে নিমফেটিক প্রতিধ্বনি, সব মিলিয়ে একজন পেশাদার বেশ্যা হিসেবে পারফেক্ট। আর এর মাঝে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ব্যপার ছিল ওর পেশাদারী চেহারার মাঝে শিশুসুলভ আচরণটি। নিমফেট! একদমই নিমফেট!
জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কত?’
মেয়েটির কথার স্বর সুন্দর। অচেনা পাখির মতো সুরেলা গলায় সে জবাব দিল, ‘এক সেন্ট!’
আমি দরাদরি করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু বোঝা গেল সে পাকা ব্যবসায়ী। আমার দিকে বিরক্তি মেশানো চাহনি নিয়ে বলল, ‘এত সস্তা? হাহ! অন্যদিকে দেখো!’
এইকথা বলে উল্টো পথে হাঁটে। ওকে ভালো লেগেছিল, ব্যাপারটা সেও টের পেয়ে থাকবে হয়ত। বারবার আফসোস হচ্ছিল আমার, ইশ! একে যদি তিন বছর আগে কোনো স্কুলের পোশাকে দেখতে পেতাম! মাত্র তিন বছর আগে!
সাতপাঁচ ভেবে শেষে রাজি হয়ে গেলাম। কারণ মেয়েটার শরীরে তখনো নিমফেটিক বৈশিষ্ট্য আছে। জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কী নাম?’
আগের মতোই সুরেলা কণ্ঠে সে জবাব দিল, ‘মনিকা।’
‘বয়স কত তোমার?’
‘আঠারো। কেন?’
‘এমনি।’
আঠারো বছর বয়সী মনিকার শরীরে তখনো নিমফেট সুগন্ধ। ওর চোখের বড় বড় পাপড়ির প্রতিটি পলক আমাকে সম্মোহিত করছিল। মনিকার শরীরের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আমার শরীরে আলাদা আলাদাভাবে আনন্দের উৎস হয়ে উঠল। আমি ওর শিশুসুলভ হাত পরখ করতাম, আঙুল নিয়ে খেলতাম। অদ্ভুত সে খেলা, আর অদ্ভুত সে আকর্ষণ। এরপর নিয়মিত যোগাযোগ হয়ে ওঠে ওর সাথে। মাঝে মাঝে বেখেয়ালে হাতের নখ কাটতে ভুলে যেত সে। অপরিষ্কার নখগুলো দেখিয়ে বলতাম, ‘শেষ কবে কেটেছিলে?’
ও খেয়াল করে জিভে কামড় দিত, বলত, ‘এহ, কী বিশ্রী দেখাচ্ছে।’ বলে দৌড়ে বাথরুমে চলে যেত, অনেকক্ষণ সময় নিয়ে হাতের নখগুলো পরিষ্কার করে আসত।
আমি বলতাম, ‘সমস্যা নেই তো!’ আমার কথা কে শোনে! ওর হাতের অপরিুছন্ন নখও যে আমার ভালো লাগত তখন, সে কথা কিছুতেই ওকে বোঝাতে পারতাম না। মনিকার চুলগুলো সুন্দর ছিল, ববকাট, চোখে অদ্ভুত নেশা, ধূসর মায়াবী চাহনি, মলিন সোনালি শরীর, সবমিলিয়ে বেশ আদুরে একটা মেয়ে। অন্য যৌনকর্মীদের খেয়াল করলে দেখা যায়, তাদের কোমরগুলো বিদঘুটে রকম প্রশস্ত। মনিকার কোমর মোটেই অন্যদের মতো বৃহদাকার ছিল না। প্রশংসাগুলো ওকে সরাসরি বলতাম। ও লাজুক চোখে প্রেম প্রেম ভাব নিয়ে তাকাতো, খুশি হতো। চোখে মুখে সেই খুশি ছড়িয়ে যেত। এরকম আলাদা বৈশিষ্ট্যের কারণে সে আমার স্মৃতিতে গেঁথে আছে। আমার থাকার ছোট ঘরটিতে যতদিন ছিলাম, মনিকার স্মৃতিও ততদিন রয়ে যায়। এখনো সেই স্মৃতিগুলো ভাবতে ভালো লাগে। মনিকাই একমাত্র মেয়ে ছিল তখন, যে কিনা আমাকে সম্পূর্ণভাবে সন্তুষ্ট করতে পেরেছিল। সহস্র যৌনকর্মীদের চেয়ে নিখুঁত ছিল ওর পেশাদারিত্ব। আমার দেহের ব্যাকরণ বুঝত সে, আমার শিল্পের চাহিদা ধরতে পারত। আমি ওর কাছ থেকে যে আনন্দ পেয়েছি, সে সময় এভাবে আর কেউ পারত না। কথাগুলো মনিকার কাছে অকপটে স্বীকার করতাম। মনিকা দ্রুত পোশাক পরে নিতে নিতে অমায়িক সুর তুলে বলত, ‘তুমি তো দারুণ স্মার্ট দেখছি, অনেককিছু খেয়াল করেছো!’
আমি লোভ সামলাতে পারতাম না। প্রথম দিনই বলে ফেললাম, ‘আজ সন্ধ্যার দিকে সময় হবে তোমার? আরো সুন্দর করে দেখতে চাই তোমাকে। আরো গভীরভাবে!’
মনিকা জবাব দিল, ‘ক্যাফেতে নয়টার দিকে দেখা করতে পারব।’
সেরাতেই মনিকাকে আমার ঘরে নিয়ে আসি আবার। রাতের আলোতে ওকে চমৎকার লাগছিল। আমি মুগ্ধ হয়ে বলে ফেললাম, ‘সাংঘাতিক সুন্দর লাগছে তোমাকে।’
সে শান্ত গলায় বলে, ‘তোমার প্রশংসার ধরণটা ভালো লাগছে!’
আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। মনিকার সৌন্দর্যে আয়না ভেঙে চুরমার হয়ে যেতে চায়। ওর প্রতি আমার আকর্ষণের কারণ আগেও বলেছি। ওর শরীরে তখনো দারুণ নিমফেট ঘ্রাণ ছিল। সচরাচর নিমফেট মেয়েদের বয়স চৌদ্দ’র নিচে হয়ে থাকে। চৌদ্দ’র পরে আর এই ঘ্রাণ পাওয়া যায় না। আপনারা জানেন, চৌদ্দ বছরের নিচের মেয়েদের সাথে মেশা আমার পক্ষে আদৌ সম্ভব ছিল না। আঠারো বছর বয়সী মনিকার মাঝে নিমফেট ঘ্রাণ পাওয়াটাই ওর প্রতি আমাকে আরো আকৃষ্ট করে তুলত।
‘আমি কি লিপস্টিক তুলে ফেলব?’ জিজ্ঞাসা করে সে। কোনো উত্তর না দিয়ে নিঃশব্দে ওর দিকে এগিয়ে যাই। আলতো করে চুমু খাই ঠোঁটে।
কম বয়সী কোনো মেয়েদের সান্নিধ্য একেবারেই পেতাম না বললে ভুল হবে। মনিকার সাথে পরিচয়ের আগেও আমি অনেক কমবয়সী মেয়েদের সাথে মিশেছি। কিন্তু তারা কেউ মনিকার মতো ছিল না। তাদের কেউ কখনোই সে রাতের মনিকার মতো হতে পারেনি। মনিকার প্রতিটি স্পর্শে প্রেম, প্রতিটি নিঃশ্বাসে শিহরণ, প্রতিটি শীৎকারে অপার্থিব আনন্দ ছিল। মনিকার চোখের লম্বা পাপড়ি মেলা পলক এত সহজে ভোলার নয়। আমি সেইরাতে মনিকার প্রতি খুব বেশি সন্তুষ্ট ছিলাম। এতটাই সন্তুষ্ট যে, খুশি হয়ে ওকে আরো কিছু টাকা বখশিস দিয়ে দিই। যৌনতার আনন্দের চেয়ে শিল্পের আনন্দ আমাকে এতটাই সন্তুষ্ট করে ফেলে যে, সেইরাতে ওকে বললাম পরদিন দুপুরবেলা বাসায় আসতে। দুপুর দুইটা পনেরোতে আসার কথা ছিল। নির্দিষ্ট সময়ের আগেই সে চলে আসে। কিন্তু একি? মনিকার দিকে তাকিয়ে আমি অবাক হয়ে যাই। মনে হচ্ছিল এই একরাতের ব্যবধানে ওর বয়স দশ বছর বেড়ে গেছে। মনিকার ভেতরে কিশোরীসুলভ যে ভাব ছিল, তা হারিয়ে গেছে। সে যেন আরো বেশি যুবতী হয়ে উঠেছে। কোথায় সেই শিশুসুলভ চাহনি? ওর ভেতরে যে নিমফেটিক বৈশিষ্ট্য ছিল সব কর্পূরের মতো উবে গেছে। সে আর বিগত রাতের মনিকা নেই। আমার ভালো লাগল না, মনিকার ভেতর আকর্ষণ খুঁজে পেতে ব্যর্থ হলাম। শেষে হতাশ গলায় ওকে চলে যেতে বলি। এই বলার মাঝে শুধু হতাশা ছিল, কোনো দুঃখবোধ ছিল না, ফিরিয়ে দেবার মাঝে কোনো প্রকার অপরাধবোধই কাজ করেনি আমার। সোজা বলে দিয়েছিলাম, ‘চলে যাও!’
আমি যা উপভোগ করেছি সব ছিল নিজের জন্য। মনিকার কথা ভাবিনি। এক মুহূর্তের জন্য শুধু মনে হয়েছিল, মনিকা আমার ব্যবহারে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলছে। ওর ভেতরে এক অপরাধী নিমফেট কাঁচুমাচু হয়ে হারিয়ে যাচ্ছে, কবর হয়ে যাচ্ছে। নিমফেট পরবর্তী দুঃসময়ে পা রাখতে যাচ্ছে সে। এটুকুই! আমার আর কিছুই মনে হয়নি।
আমি এরপর বড়দের ম্যাগাজিন ঘাটতে থাকি। একদিন এরকম এক ম্যাগাজিনে কৌতূহল জাগানো বিজ্ঞাপন খুঁজে পেলাম। এমএলএলই এডিথ অফিসের বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপনে লেখা ছিল, ওরা গ্রাহকের মনমতো যৌনসঙ্গী যোগাড় করে দেবে। সাহস করে একদিন সেই অফিসে গেলাম। ডেস্কের ওপাশে মহিলা বসে ছিল, তিনি নিজেকে যৌনবিশেষজ্ঞ বলে পরিচয় দিলেন। প্রথমে আমার কথা মনোযোগ খুব দিয়ে শুনলেন। তারপর যা করলেন তাতে মনে হলো অযথাই এতক্ষণ বকবক করেছি। পুরনো একটা ছবির অ্যালবাম আমার দিকে এগিয়ে দেয়। ওতে অনেক মেয়ের ছবি ছিল। ছবিগুলো দেখে একজনকে বাছতে বলে। কিন্তু আমার একটা ছবিও পছন্দ হয়নি, এদের কেউই নিমফেট ছিল না। এই ছবিগুলো কেন দেখাচ্ছে তাও বুঝতে পারলাম না। রেগে প্রায় ছুঁড়ে ফেলার মতোই অ্যালবামটা ফেরত দিলাম। খুব হতাশ লাগছিল নিজেকে, মনে হচ্ছিল আমার পছন্দমতো কোনো নিমফেট পাওয়া আর আদৌ সম্ভব নয়। অ্যালবাম ফেরত দিয়ে বিব্রত হলাম। ওভাবে ফেরত দেয়ায় উনি অপমানিত হয়েছেন, আমাকে এখুনি চলে যেতে বলা হবে। কিন্তু আমাকে অবাক করে মহিলা কর্পোরেট একটা হাসি দিলেন, জানতে চাইলেন, আমার বাজেট কত!
আমি আবার সবকিছু বিস্তারিত বললাম। আমি আসলে কী চাচ্ছি, নিমফেট মেয়ে পেতে আমি কেমন মরিয়া, ইত্যাদি। দশজন পতিতার সমান খরচ করে হলেও আমার নিমফেট মেয়ে চাই! ডেস্কের ওপাশে বসে মহিলাটি আগের মতো খুব মনোযোগী ভঙ্গিতে আবার শুনলেন। এবার মনে হলো কিছুটা বুঝতে পেরেছেন। আমাকে বললেন, তার পরিচিত লোক আছে যে কিনা আমার পছন্দমতো এমন মেয়ে খুঁজে দিতে পারবে। তবে খরচ বেশি পড়বে। সেটা নিয়ে আমার ভাবনা ছিল না, আমি খুশিমনে রাজি হলাম। সেদিন অগ্রিম কিছু টাকা দিয়ে এলাম মহিলাটিকে।
পরদিন আমাকে এক মধ্যবয়সী হাঁপানি রোগীর সাথে দেখা করিয়ে দেয়া হলো। মহিলার বিশাল শরীর, মুখে পুরু মেকাপের প্রলেপ, ঠোঁটগুলো যত্নের সাথে গোলাপি রঙে রাঙানো। আর সেই ঠোঁটের উপর একটা গোঁফ- ঝুলছে। ওই মহিলার দিকে যতবার চোখ পড়ে ততবারই ওই গোঁফটার উপর আমার চোখ আটকে যায়। একটা দোতলা বাড়ি, সিঁড়ি ধরে তার পিছন পিছন উপরে উঠলাম। আমাকে দোতলায় একটা ঘরে নিয়ে যাওয়া হলো। ঘরটার দিকে একবার নজর বুলিয়ে বুঝলাম, এই একটা ঘরেই পুরো পরিবার থাকে। বিভিন্ন জনের ব্যবহারের জিনিসপত্র এখানে সেখানে, কাপড়-চোপড়গুলো গুছিয়ে রাখা। খদ্দরের সুবিধার্থে বা ব্যবসার খাতিরে তখন ঘরটাতে সেই পরিবারের কোনো মানুষ ছিল না। শুধু আমি, গোঁফওয়ালী হাঁপানি রোগী মহিলা, আর আমার সামনে ছিল পনেরো বছর বয়সী একটা মেয়ে।
অতিথির জন্য সুন্দর করে সাজগোজ করার চেষ্টা চোখের পড়ছিল, চুলে যত্নে করে বাঁধা লালরঙা ফিতে, মুখে পাউডার মাখা মেকআপ, ঠোঁটে গোলাপি লিপস্টিক। মেয়েটার দিকে একবার তাকিয়েই অপছন্দ হলো। মেয়েটি পনেরো বছর বয়সী সাধারণ এক পতিতা ছাড়া আর কিছুই না। কোনো আলাদা আকর্ষণ নেই, বাড়তি বৈশিষ্ট্য নেই। আমি যেরকম খুঁজছি সেরকম নিমফেটিক বৈশিষ্ট্যের ছিটেফোঁটাও মেয়েটার ভেতর নেই। আবার হতাশ হতে হলো। আমার অপছন্দের কথা গোঁফওয়ালী মহিলাকে জানালাম। জানিয়ে যেন বিপদই হলো, মহিলাকে বোঝানো তখন কার সাধ্য?
পুরো ব্যবসায়ী মেজাজে আমাকে এটা সেটা বলে বোঝাতে লাগল, খদ্দের কিছুতেই হাতছাড়া করতে চায় না। বোঝানোর এক পর্যায়ে ওই ছোট্ট মেয়েটার জামাকাপড় পর্যন্ত খুলে দেখাতে থাকে। আমি বারবার বোঝানোর চেষ্টা করছিলাম, এবং উনি বারবার কৃতিত্বের সাথে ভুল বুঝে যাচ্ছিলেন। নিজের মতো করে এটা সেটা বোঝাতেই লাগলেন। আমাকে এসব বোঝানোর কোনো দরকার ছিল না। কিন্তু আমার কথা কানে তোলার অবসর কোথায় তার?
শেষমেশ আমাকে রাজি করাতে না পেরে হাঁপানি রোগী মহিলাটি রেগে গেল। জোর গলায় কাকে যেন ডাকল। আমি ঘুরে বেরিয়ে আসছিলাম তখন দুইজন ষণ্ডামার্কা লোক এসে পথ রোধ করল আমার। কী যন্ত্রণা! তখন রাত ছিল, তাদের একজন রাতের বেলাতেও সানগ্লাস পরা, তাদের পিছনে ছোট্ট একটা ছেলে। লোক দুটো বিভিন্নরকম খোঁড়া যুক্তি দিয়ে, চিৎকার চেঁচামেচি করে, আবোল-তাবোল বকে, আমাকে বাধ্য করতে মরিয়া হয়ে উঠল। সানগ্লাস পরা লোকটা আমাকে হুমকিও দিল সে নাকি পুলিশের লোক, আমি অবাধ্য হলে ঝামেলা হয়ে যাবে। কিন্তু আমি তো কোনভাবেই ওই মেয়ের সাথে বিছানায় যেতে রাজি নই! শেষে মেয়েটাকে তার টাকা পরিশোধ করে দিয়ে বললাম, টাকা রাখো, কিন্তু এই মেয়ের সাথে আমি বিছানায় যাব না।
টাকা পেয়ে ওরা খুশি। আমাকে ছেড়ে দিল। আগে বললেই হতো, টাকা দিয়ে কেটে পড়তাম। শুধু শুধু এরকম হয়রানির কোনো মানে ছিল না।
৭.
এরপর সিদ্ধান্ত নিই এবার সত্যি বিয়ে করে ফেলব। বিয়ের চিন্তা মাথায় আসতেই ভালো-মন্দ দিকগুলো ভাবতে শুরু করলাম। যদিও এ ব্যাপারে কারো সাথে আমার আলোচনা করার সুযোগ ছিল না। সিদ্ধান্ত যা নেবার আমাকেই নিতে হয়েছে। ভেবেচিন্তে মনে হলো, বিয়ে করা উচিত। বিয়ের ফলে ঘরের কাজ হয়ে যাবে, রান্নাবান্নায় সাহায্য পাওয়া যাবে, আর যাই হোক অন্তত একজন কথা বলার সঙ্গী পাওয়া যাবে। এমনও হতে পারে বিয়ের পরে স্ত্রীর সাথে অভ্যস্ত হয়ে যাব। তখন মানসিকভাবে আরো চাঙ্গা থাকতে পারব। আমার ভেতরের অসুস্থ দানবটাকে দমিয়ে রাখা যাবে। ছোট ছোট মেয়েদের প্রতি আমার যে ভয়ংকর আকর্ষণ ছিল, সেটা অন্তত এই সুযোগে এড়িয়ে যাওয়া যাবে। বিয়ে করলে নিজেকে আরো গুছিয়ে নিতে পারব, একটা রুটিনের ভেতর চলতে চলতে একসময় সব ঠিক হয়ে যাবে। একজন স্ত্রী থাকা মানে নিজেরও বাড়তি নিরাপত্তা, সুখে দুঃখে সবসময় একজনকে পাশে পাওয়া কম কি? শেষমেশ বিয়ের সিদ্ধান্তেই অটল রইলাম।
বাবার মৃত্যুর পরে হোটেল মিরানা বিক্রি করে দিয়েছিলাম। তাতে কিছু টাকা জমানো ছিল। টাকাটা বিয়ের সময় কাজে দেবে। পাত্রী খোঁজা কষ্টের কাজ ছিল না। আমি দেখতে একজন অত্যন্ত সুদর্শন পুরুষ ছিলাম। যে কোনো নারীর মন জয় করা আমার জন্য কয়েক মুহূর্তের ব্যাপার। বিয়ের সিদ্ধান্ত নেবার পর মনে মনে পাত্রী খুঁজতে থাকি। একজনকে পছন্দও হয়ে যায়। মেয়েটার নাম ভ্যালেরিয়া। বহুদিন ধরে আমার হৃদযন্ত্রের সমস্যা ছিল। সাথে ইনসোমনিয়া ও সাইকোলজিক্যাল সমস্যার কথা আগেও বলেছি। নিয়মিত ডাক্তারের কাছে যেতে হতো। এইভাবে প্যারিসে এক পোলিশ ডাক্তারের সাথে আমার আলাপ হয়। তাঁর সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। ভ্যালেরিয়া তাঁরই মেয়ে। প্রায়ই ডাক্তারের বাসায় আমি আসা যাওয়া করতাম। আড্ডা হতো, দাবা খেলতাম দুজন। আর ভ্যালেরিয়া দূর থেকে আমাকে লক্ষ করত। লুকিয়ে লুকিয়ে দেখত।
একটু আগেই বলেছি, আমি দেখতে অত্যন্ত সুদর্শন ছিলাম। অসম্ভব সুদর্শন পুরুষ যাকে বলে— একবার কেউ তাকালে আমার দিকে দ্বিতীয়বার সেই মেয়ে ফিরে তাকাবেই। ‘ছিলাম’বললে ভুল হবে, কারণ হলফ করে বলতে পারি আমি এখনো যথেষ্ট সুদর্শন। আমার চেহারা, কথার ধরণ, সুস্থির চিন্তাশীলতা, ব্যক্তিত্ব- সবকিছুই আকর্ষণীয় ছিল। যে কোনো মহিলাকে আমার জালে আটকে ফেলাটা সময়ের ব্যাপার। এটা আমার কাছে একটা খেলা ছিল, মহিলাদের এক মুহূর্তে পটিয়ে আবার পরমুহূর্তে তাদেরকে পাত্তা না দেয়াটা উপভোগ করতাম। তারা তখন দ্বিধান্বিত হয়ে যেত। মেয়ে মানুষকে দ্বিধায় ফেলে দেয়া মানে সে প্রায় আপনার জালে ফেঁসে যাবে। আমার এরকম রহস্যময় আচরণের কারণে অনেক ইগোসর্বস্ব সুন্দরী মহিলাও ‘হামবার্ট হামবার্ট’ নামে পাগল হয়ে যেত। যে কোনো মহিলা, সে যত আহামরিই হোক, তাদের সাথে আমি তাচ্ছিল্য নিয়েই মিশতাম। চাইলেই প্রেমিকা হিসেবে, স্ত্রী হিসেবে হাজার হাজার সুন্দরীর ভিড়ে আকর্ষণীয়, চোখের লম্বা পাপাড়ির মহিলাদের কাউকে আমি বেছে নিতে পারতাম, সে সুযোগ আমার ছিল। চাইলে ভ্যালেরিয়ার চেয়ে বহুগুণে সুন্দরী, বুদ্ধিমতী, জাঁকজমকপূর্ণ কাউকে বিয়ে করতে পারতাম। কিন্তু তাতে আমার কী লাভ?
আমি কী চাইতাম সে তো শুধু আমি জানি! আমার কাছে নিমফেট বালিকা ছাড়া অন্য কেউই আকর্ষণীয় ছিল না। ভ্যালেরিয়াই হোক বা কোনো বিশ্বসুন্দরী বা বিশ্রী চেহারার কেউ, শরীরের প্রশ্নে আমার কাছে এদের কোনো পার্থক্য নেই। সুতরাং ভ্যালেরিয়াই ঠিকঠাক। ‘ভ্যালেরিয়াই ঠিকঠাক’- ভাবতে ভাবতে নিজেকে শুধু অসহায় মনে হতো। আমি এত সুদর্শন সুপুরুষ যুবক, অথচ শরীর প্রসঙ্গে কতটা অতৃপ্ত, কতটা অসহায়! হায় বেচারা হামবার্ট!

[চলবে]

নিচে পূর্ববর্তী দুই (পর্ব-১ ও পর্ব-২) পর্বের লিংক দেয়া হলো। এই দুটি পর্ব পড়ে পর্ব তিনটি পড়তে পারেন।

পর্ব-২

http://www.teerandaz.com/%E0%A6%AD%E0%A7%8D%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A6%BF%E0%A6%AE%E0%A6%BF%E0%A6%B0-%E0%A6%A8%E0%A6%AC%E0%A7%8B%E0%A6%95%E0%A6%AD-%E0%A6%B2%E0%A6%B2%E0%A6%BF%E0%A6%A4%E0%A6%BE-%E0%A6%AA%E0%A6%B0/?fbclid=IwAR2FREjwXCYjPAG68xqBtKuVXCVq3-kPvTfw1gNwUhGtYcGlJTJu2df2Bb4

পর্ব-১

http://www.teerandaz.com/%E0%A6%AD%E0%A7%8D%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A6%BF%E0%A6%AE%E0%A6%BF%E0%A6%B0-%E0%A6%A8%E0%A6%AC%E0%A7%8B%E0%A6%95%E0%A6%AD-%E0%A6%B2%E0%A6%B2%E0%A6%BF%E0%A6%A4%E0%A6%BE-%E0%A6%AD%E0%A6%BE/?fbclid=IwAR1up6swyAovmKJ_c8gsi_8ngZVNpf_1lN0GuwLTI1Jrs5Cq9KixtngKtao