ভ্লাদিমির নবোকভ > ললিতা [পর্ব ২] >> ভাষান্তর : রনক জামান

0
377

পর্ব ২

[সম্পাদকীয় নোট : ‘ললিতা’ গত শতকের বিখ্যাত ও নিষিদ্ধ উপন্যাসগুলোর মধ্যে অন্যতম। একটি নাম। এটি বিখ্যাত রুশ লেখক ভ্লাদিমির নবোকভের (১৮৯৯-১৯৭৭) এক অনবদ্য সৃষ্টি। উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশ পায় ১৯৫৫ সালে প্যারিতে ইংরেজি ভাষায়। ১৯৬৭ সালে ভ্লাদিমির নবোকভ নিজেই রুশ ভাষায় অনুবাদ করেন। ললিতা উপন্যাসটি কেবল নিষিদ্ধ প্রেম, প্রণয় বিষয়ক নয়। বরং আদর্শ মনস্তাত্ত্বিক গবেষণাগ্রন্থ হিসেবেও স্বয়ংসম্পূর্ণ। পরবর্তী কোনো সময়ে তীরন্দাজে এ নিয়ে একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হবে। এবার প্রকাশিত হলো উপন্যাসটির নির্বাচিত চতুর্থ আর পঞ্চম অংশ। পরেও এই প্রকাশনার আরও কিছু অংশ প্রকাশিত হবে। এই অংশের শেষে পূর্বে প্রকাশিত প্রথম পর্বের লিংক দেয়া হলো। যারা আগে সেই পর্বটি পড়েননি, তারা সেই পর্বটি পড়ে নিয়ে এই পর্বটি পড়তে পারেন।]


সেই দুঃসহ স্মৃতির পাতা বারবার ওল্টাই, নিজেকেই প্রশ্ন করি, সেই গ্রীষ্মের ঝলমলে দিনগুলোই কি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় দুঃখ? আমিই কি একমাত্র অস্তিত্ব যে এতটা ভালবেসেও একাকীত্ব নিয়ে বেঁচে থাকছে? কেনইবা বেঁচে থাকছে? সমস্ত প্রশ্ন যেন মাথার ভেতর দেয়ালে দেয়ালে আছড়ে পড়তে থাকে, প্রতিধ্বনিত হয়, প্রতিধ্বনি ছড়িয়ে ছিটিয়ে যায় এদিক সেদিক। গ্রীষ্মের সেই দিনগুলো আমার কাছে যতটা আনন্দের ছিল, এনাবেলের মৃত্যুর কারণে তারচেয়ে অনেক বেশি কষ্টের স্মৃতি হয়ে ওঠে। অনেক এড়িয়ে যেতে চেয়েছি, বিকল্প পথ খুঁজেছি, যত ভুলে যেতে চাই, স্মৃতিগুলো ততবেশি করে আমাকে আঁকড়ে ধরে। সময়ের স্রোতে এরপর ললিতার সাথে দেখা হয়ে যায়। আমি ললিতার ভেতরে আমার শৈশবের এনাবেলকে খুঁজে পাই। ললিতা কি এনাবেলের পরের জন্ম ছিল? নইলে কেন বারবার সেই ভালবাসাকে ললিতার মাঝে খুঁজে পাই আমি?
আমি জানতাম এনাবেলের মৃত্যুর ধাক্কা আমার পক্ষে হজম করতে সময় লেগে যাবে। সারাক্ষণ প্রচণ্ড মন খারাপ একটা ভাব ভর করে থাকত। এনাবেলের মৃত্যুর ধাক্কাই আমার পরবর্তী জীবনে সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলে। যতবার প্রেম শব্দটা মাথায় আসে, আমি ওই বয়সটাতে চলে যাই, ওই বয়সেই আটকে থাকে আমার ভালবাসা, চাওয়া-পাওয়া, আবেগ, আরো অনেক কিছু। এনাবেলের মৃত্যুর পরে আমি অন্য কাউকে ভালবাসতে পারিনি। স্কুল শেষে কলেজে গিয়েছি, তরুণ বয়সে অনেক মেয়ের সাথেই মিশেছি, শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়েছি। কিন্তু এনাবেলকে আমি ভুলতে পারিনি। উল্টো এনাবেলের স্মৃতি আমাকে দ্বিধান্বিত করত, অন্য কারো সাথে সম্পর্কে জড়াতে বাঁধা দিত। এতগুলো বছর পার হয়ে গেছে, তবু এনাবেলের স্মৃতি আমার কল্পনায় স্পষ্ট ভাসতে থাকে। চিন্তাগুলোর সাথে লুকোচুরি খেলে, সবার চোখ এড়িয়ে আমার আঙুল ছুঁয়ে দেয়, আমার ঠোঁট ছুঁয়ে দেয়, ঘোরের ভেতর এনাবেলকে খুঁজে পাই, ললিতাকে খুঁজে পাই। একমুঠো বালি ওর আঙুলের ফাঁক গলে, আমার ভাবনার ফাঁক গলে ঝরে যেতে থাকে। আমাদের দুজনের ভাবনাগুলোর অদ্ভুত মিল ছিল, স্বপ্নগুলোও ছিল একই রকম।
মাঝে মাঝেই দুজন মেলাতে গিয়ে অবাক হতাম, ভাবনা, ইচ্ছা, স্বপ্ন এসব মিলে যেতেই পারে, কিন্তু তাই বলে এতটাই? একবার সেই বছরেরই (১৯১৯) জুলাইয়ের দিকে ওদের ঘরে কোত্থেকে একটা ক্যানারি পাখি ঢুকে পড়েছিল। কাকতালীয়ভাবে তখন আমাদের ঘরেও একটা ক্যানারি পাখি ঢুকে পড়েছিল। এবং সেটা একইসময়ে, জুলাইয়ের দিকে। পাখিটা যতক্ষণ বের হবার পথ খুঁজে পায়নি, ততক্ষণ সারাঘর তছনছ করে দিয়ে গেছে। এনাবেল চিঠিতে লিখেছিল ওদের ঘরেরও একই অবস্থা। অথচ আমরা দুজন তখন সম্পূর্ণ আলাদা দুই দেশে! হায় ললিতা, এইভাবে ভালবেসেছিলে তুমি?
এনাবেলের কথা শেষ করার আগে একটা ঘটনা তুলে ধরছি। এনাবেল প্রসঙ্গের শেষের দিকে বলব বলে বাঁচিয়ে রেখেছিলাম। আমাদের চুরি করে সাক্ষাতের অনেক ব্যর্থ ঘটনার একটি এটি। একদিন বিকেলবেলা দুজনে মিলে ঠিক করলাম রাতে দেখা করব। রাতে এনাবেলদের বাসা বন্ধ থাকে, গেটে দারোয়ান পাহারা দেয়। এনাবেল ওদের দারোয়ানকে কোনোরকম এড়িয়ে রাতে বাইরে বের হয়। দারোয়ান ঝিমুচ্ছিল, টের পায়নি। আমি রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। ও বেরিয়ে আসার পরে দুজনে মিলে ওদের বাড়ির পেছনের দিকে চলে গেলাম। জায়গাটা নিরাপদ, আমাদের কেউ দেখতে পাবে না। অসংখ্য লজ্জাবতী গাছ ঝোঁপঝাড় পুরো জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে ছিল। একটা অল্প উঁচু ঢিবি পেয়ে তার উপর বসে পড়লাম আমি। এনাবেল আরো উঁচুতে বসেছিল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে ওর ঠোঁটের একপাশে চুমু খেলাম। সেই বয়সে এর চাইতে বেশি কিছু জানতে পারিনি আমরা।
এইটুকুতেই মনে হচ্ছিল চূড়ান্ত ভালবাসায় মিশে গেছি। এক অচেনা শিহরণ আমাদের দুইজনের শরীর দিয়ে প্রচণ্ড গতিতে বিদ্যুতের মতো প্রবাহিত হচ্ছিল। আর গাছপালা, পাতার ফাঁক দিয়ে আমাদের মাথার উপর কয়েকটা তারা জ্বলছিল। মনে হচ্ছিল আকাশ কাঁপছে। কাঁপতে থাকা আকাশটাকে একবার এনাবেলের শরীর মনে হল। ওর জামার ভেতরের নগ্ন দেহের মতো আকাশটা কাঁপছিল। ওর মুখ তাতে যেন নিজস্ব মহিমা নিয়ে ভাসছে। স্নিগ্ধ কিরণগুলো ওর মুখ থেকে ঠিকরে বের হয়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে সমস্ত আকাশে, স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম। ওর নিঃশ্বাসের উষ্ণতায় আমি অতল গভীরে তলিয়ে যাচ্ছিলাম। আর এনাবেল শুধু পাগলের মতো ঠোঁটে ঠোঁট, মুখে মুখ ঘষেই যাচ্ছিল শুরুতে। যেন ভালবাসার যন্ত্রণা থেকে মুক্তির উপায় খুঁজে বেড়াচ্ছে।
সেদিন সাজুগুজু করতে গিয়ে ওদের স্প্যানিশ কাজের মেয়েটার পারফিউম চুরি করে মেখে এসেছিল সম্ভবত। সেই পারফিউমের ঘ্রাণ আর ওর নিজস্ব বিস্কুট-বিস্কুট ঘ্রাণ মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছিল। সেই ঘ্রাণে আমি ডুবে যেতে যেতে সমস্ত অনুভূতি পূর্ণ হয়ে ভরে উঠছিল অবিরাম।
হঠাৎ পাশের ঝোঁপে শব্দ হলো! মনে হলো কারো পায়ের শব্দ। ছিটকে দুজন দুদিকে সরে গেলাম। একজন আরেকজনকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিই। প্রথমে ভেবেছিলাম মানুষের পায়ের শব্দ, কিন্তু সাথে সাথেই বুঝতে পারি ওটা মানুষের পায়ের শব্দ ছিল না। ‘মিউ মিউ’ করতে করতে ঝোঁপের কাছ থেকে একটা বিড়াল দৌড়ে দূরে চলে গেল। আমি যেদিকে ছিটকে পড়েছিলাম সেখানে শক্তমত কিছু একটার সাথে হাঁটুতে চোট লাগে। ব্যথায় ককিয়ে উঠি। আঘাত কতটুকু লেগেছে সেটা অন্ধকারে বোঝার উপায় ছিল না। আস্তে আস্তে ব্যথা বাড়তে থাকে।
একটু পরেই এনাবেলের মায়ের গলার স্বর শুনতে পাই। এনাবেলকে ডাকছে। ডাক শুনে মনে হচ্ছিল রেগে আছে। আমরা দ্রুত বাড়ির পিছন থেকে দেয়াল টপকে বাগানের দিকে নিঃশব্দে এগোতে থাকি। ওদের বাগানের কাছে আস্তেই দেখি ড. কুপার পায়চারী করছেন, উনিও এনাবেলকে খুঁজতে বের হয়েছেন। এরপর উল্লেখযোগ্য আর কিছুই ঘটেনি। এনাবেল শেষ চুমু খেয়ে একদিকে চলে গেল। আমি চললাম আরেকদিকে। বাগান থেকে রাস্তায় কোনোরকম বের হয়ে সোজা দৌড়। ধরা পড়িনি কেউ, ঘটনা এখানেই শেষ। তবে অসমাপ্ত রয়ে গেছে অনেককিছু। আমাদের ভালবাসাকে এনাবেল অসমাপ্ত রেখে চলে গেছে, কিন্তু সেই লজ্জাবতীর বাগান, শিশিরের ফোঁটা, কুয়াশার ফাঁক গলে আসা নক্ষত্রের আলো, পাতাদের ফাঁকে ফাঁকে অদ্ভুত আলোর খেলা এবং হাঁটুর ব্যথা- এসব এখনো যত্নে রাখা আছে। সেই ছোট্ট এনাবেলের হাতের আঙুল, আগুনরঙা ঠোঁট, জিভ, দেহের ঘ্রাণ বয়ে চলেছি চব্বিশটি বছর ধরে। তারপর? একদিন অন্য কারো ভেতরে খুঁজে পাই এই ছোট্ট মেয়েটিকে। আহ! আমার ললিতা!


আমার যৌবনের দিনগুলোর কথা মনে করলে শীতল একটা অনুভূতি জাগে। নিস্তব্ধ, শান্ত সময়ের মতো সেই অনুভূতি। তখন মেয়েদের সাথে আমার সম্পর্ক ছিল অনেকটা বাস্তববাদী ধরনের, চাঁচাছোলা কথা, যতটুকু যার সাথে মানায় ঠিক ততটুকুই। যখন যতটুকু দূরত্ব রাখা প্রয়োজন ছিল, ঠিক ততটুকুই দূরত্ব রেখেছি। কলেজজীবন কেটেছে লন্ডনে আর প্যারিতে, স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, তখন অনেক যৌনকর্মীর সাথে আমার মেলামেশাটা হয়ে উঠত। তাদের অনেকেই আমাকে সন্তুষ্ট করতে পেরেছে। তবে সেটা ছিল স্রেফ শারীরিক সন্তুষ্টি। এর মাঝে কোনো ভালোবাসা ছিল না।
পড়াশোনায় বরাবরই মনোযোগী ছিলাম। কিন্তু ফলপ্রসূ না হওয়ায় মনোরোগবিদ্যার উপর ডিগ্রি নেব বলে সিদ্ধান্ত নিই। কিছুদিন যেতে না যেতে সেটাও বিরক্তি এসে গেল, আগ্রহ হারিয়ে ফেললাম। আগ্রহ হারিয়ে শেষমেশ ইংরেজি সাহিত্যের ওপর ঝোঁক চলে এলো। ইংরেজি সাহিত্য তখন ছিল বিপজ্জনক এক জায়গা। অনেক সম্ভাবনাময় কবিকেই হতাশ হয়ে অন্যপথ বেছে নিতে দেখেছি আমি। হাতে পাইপ, কেতাদুরস্ত পোশাক, কলেজের গম্ভীর শিক্ষক বনে যেতে হয়েছে অনেক কবিকেই। আমার প্যারি ভালো লাগত, ওখানেই মানিয়ে যাই। ওখানকার অনেক রুশ বিশেষজ্ঞের সাথে সিনেমা নিয়ে আলোচনা হয়।
প্যারিতে কিছু অখ্যাত ম্যাগাজিনে প্রবন্ধ প্রকাশ করি কতগুলো। প্রবন্ধগুলো দুর্বোধ্য ছিল বলে অভিযোগ আছে। মূলত প্রবন্ধের বিষয়গুলোই ছিল জটিল। এত জটিল বিষয় সহজভাবে বললেও অনেকের কাছে দুর্বোধ্য লেগে যাবে, সেটা আমার জানা ছিল। তাই অভিযোগগুলোকে পাত্তা দিইনি। সেই সময় আমার প্রচুর বই পড়ার অভ্যাস গড়ে ওঠে। ইউরোপের বিভিন্ন ভাষার বিখ্যাত সব কবি, সাহিত্যিকদের প্রায় সবার লেখাই পড়ে শেষ করে ফেলি। আগের কবিদের লেখনীর ধরন নিয়ে কিছুদিন গবেষণাও করি। পরীক্ষামূলকভাবে একবার এক পুরনো ধারার অনুকরণে কিছু লেখাও লিখেছিলাম। সেগুলো প্রকাশও হল স্থানীয় এক সাহিত্য ম্যাগাজিনে।
‘বেঞ্জামিন বেইলিকে লেখা জন কিটসের চিঠির লেখনীর ধারা’ শিরোনামে কাগজে তখন আমার একটা লেখা আসে। সেই লেখার প্রতিক্রিয়া হিসেবে সাহিত্যে তৎকালীন ছয়-সাতজন পণ্ডিত ব্যক্তির ব্যাঙ্গাত্মক মনোভাব আমি এখনো ভুলতে পারিনি। এরপর বেশ জনপ্রিয় এক প্রকাশনা থেকে প্রকাশ করলাম ‘ইংরেজি কবিতার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস‘ এবং সেই সঙ্গে ‘ইংরেজি ভাষাভাষী ছাত্রছাত্রীদের জন্য ফরাসি সাহিত্য পাঠ’। দ্বিতীয় বইটি প্রথম বই প্রকাশের অল্প কিছুদিনের ভেতর প্রকাশ পায়, এবং খুব সাড়া পায় সাহিত্যমনস্কদের কাছে। এই বইটি একাই চল্লিশ দশকের পুরো বাজার দখল করে রেখেছিল। বইটার চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে শেষখণ্ডের কাজ শুরু করে দিই। পাণ্ডুলিপি প্রায় গুছিয়ে এনেছিলাম। ছাপাখানায় দেব বলে ভাবছিলাম এমন সময় আমাকে গ্রেপ্তার করা হলো।
প্যারির অউটুলে একটা চাকরি পাই আমি। একদল বুড়োকে ইংরেজি শেখাতে হতো সপ্তাহে দুদিন। একটা বয়েজ স্কুলেও শিক্ষকতা করেছি বছর দুয়েক। প্যারি শহরটা ছিল আমার হাতের তালুর মতো মুখস্থ। ফলে, বিভিন্ন পতিতালয় এবং সাইকোথেরাপিস্টদের অফিস, বিভিন্ন এতিমখানায় যাওয়া হতো প্রায়ই। ঘুরে ঘুরে প্রচুর স্টাডি করেছি বিভিন্ন বিষয়ের ওপর। সেখানে টুকিটাকি কাজও করেছি। আমার মানসিক অবস্থার উপর আমার কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। কোথাও কোনো সদ্যযৌবনা মেয়েকে এড়াতে পারতাম না, তাকিয়ে থাকতাম। ওদের চাহনিকে মনে হতো কামনার আহ্বান, ছলনামাখা দৃষ্টি। মাথার ভেতরে ওই মুখগুলো গভীরভাবে গেঁথে যেত, আর অবসরে সেই মুখগুলো আমার সামনে ভেসে আসতো সুন্দর করে।
এবার ‘নিমফেট’ নিয়ে কথা বলে নিই। যে কথাগুলো বলতে যাচ্ছি এগুলোই হচ্ছে এই নোটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মেয়েরা যখন নয় থেকে চৌদ্দ বছর বয়সী থাকে, তাদের কাউকে কাউকে দেবীর মতো মনে হয়, যেন সাক্ষাৎ জলপরী। কোনো সাধারণ গোছের মেয়ে নয়, অন্য যে কোনো মেয়ের চাইতে আলাদা এরা, ভিন্নরকম। আমি এদের নাম দিয়েছি ‘তরুণী জলপরী’ বা ‘নিমফেট’। পাঠক, আপনাদের মনে এবার প্রশ্ন জাগতে পারে, নয় থেকে চৌদ্দ বছর বয়সের ভেতরের সমস্ত মেয়েই কি নিমফেট?
আমি বলব, না! সবাই না।
তবে কি যারা দেখতে সুন্দর শুধু তারা নিমফেট?
না! শুধু সৌন্দর্যকে মানদণ্ড হিসেবে নিতে আমার ঘোর আপত্তি আছে। ছলনাময়ী, চতুর, অধরা, রহস্যময়ী একধরনের মেয়ে থাকে যারা যে কোনো সময়, যে কোনো পুরুষের হৃদয়ে খুব সহজে দাগ বসাতে পারে। এরকম ‘নিমফেট’ মেয়ে হতে গেলে দেখতে সুন্দর হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। আকর্ষণীয় শরীর, চেহারায় স্বভাবসুলভ ললিতার ছায়া, সব বোঝে নাকি কিছুই বোঝে না- এমন দ্বিধায় ফেলে দিতে জানে এরা। যে নিমফেট নয় সে শত চেষ্টাতেও নিমফেট হতে পারবে না।
তার চাইতেও কঠিন কাজ, একঝাঁক মেয়ের মাঝে একজন নিমফেটকে খুঁজে বের করা। কোনো স্কুলের বা এতিমখানার একঝাঁক মেয়ের গ্রুপছবি কারো হাতে তুলে দিয়ে যদি জিজ্ঞাসা করা হয় এদের মধ্যে আলাদা কাউকে বেছে নিতে, আমি নিশ্চিত সে ‘আলাদা’ কাউকেই খুঁজে বের করতে পারবে না, নিমফেট খুঁজে বের করা আরো অনেক দূরের পথ। এজন্য থাকা চাই নিখুঁত শিল্পীমন, এজন্য আপনাকে পরিপূর্ণভাবে একজন শিল্পী হতে হবে, একজন দার্শনিক হতে হবে, একজন পাগল হতে হবে। দেখার দৃষ্টি থাকতে হবে সবার চাইতে আলাদা, যে নিমফেট চিনতে জানে, তার রক্তের ভেতর থাকে তপ্ত বিষের স্রোত, ব্যথার ঝরনাধারা। একজন নিমফেটকে চিনতে হলে অসংখ্য ব্যথাবাষ্প দিয়ে তৈরি বিশেষ সৃষ্টি হতে হবে আপনাকে, যার প্রতিটি অস্থি-মজ্জায় থাকবে অতীন্দ্রিয় অনুভবের ক্ষমতা। আর তখনই আপনি একজন নিমফেট দেখে চিনতে পারবেন। মেধা, পরিশ্রম আর অভিজ্ঞতা দিয়ে নিমফেট চেনার যোগ্যতা অর্জন করা যায়। একজন নিমফেট মানে শুধু একজন নিমফেট মেয়েই না, সে আরো গভীর কিছু, আরো বিশাল কোনো রহস্য। তাকে চেনার মাঝে, তাকে পাওয়ার মাঝে স্রষ্টাকে খুঁজে পাবার আনন্দ থাকে। অবর্ণনীয়, অদৃশ্য কোনো চিহ্নের মাধ্যমেই কেবল তাদের চিহ্নিত করা সম্ভব। অদৃশ্য এক ডানা থাকে তাদের, সেই ডানায় ভর দিয়ে তারা সাধারণের মাঝে মিশে থাকে। মনে হবে দশজন সাধারণ মেয়ের মতই তাদের চলাফেরা। অথচ তারা নিজেরাই জানে না একেকজন কত মূল্যবান, কত বিশাল ক্ষমতার অধিকারী! একজন শিল্পীর চোখ ছাড়া আর কার কাছে ধরা দেবে এরা? শিল্পী ছাড়া অন্য কারো কাছে তারা অপচয়, শুধু অপচয়।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, আমি যাকে এতটা ভালোবেসেছি, ভালোবাসা বলতে আমি যাকে বুঝি, সেই এনাবেল কখনো আমার কাছে নিমফেট ছিল না। একজন ত্রিশোর্ধ্ব ব্যক্তির পক্ষেই নিমফেটস চেনা সবচেয়ে সহজ। কারণ নিমফেটকে চিনতে হলে, নিমফেটিক বৈশিষ্ট্য বুঝতে হলে দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতার প্রয়োজন। এইজন্য বয়স্ক হতে হয়। আর দু’জনের বয়সের ব্যবধান কমপক্ষে দশ বছর থাকতে হবে। এনাবেল ও আমি সমবয়সী ছিলাম। সুতরাং ওই বয়সে নিমফেট চেনা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। কিন্তু আজ, সেপ্টেম্বর, ১৯৫২-তে এসে, প্রায় ঊনত্রিশ বছর পরে এসে মনে হয়, সেই ছোট্ট এনাবেলকে যদি সামনে পেতাম, সে নিমফেট ছিল কিনা যাচাই করা যেত। সেই ভালো, আমি নিমফেট বৈশিষ্ট্য খুঁজতে যাইনি ওর ভেতরে। এতে বিশুদ্ধতা থেকে গেছে। আমাদের সেই ভালোবাসা রয়ে গেছে সবকিছুর ঊর্ধ্বে। ফুলের কলির মত নিষ্পাপ, অপরিপক্ক, কাঁচা অথচ বিশ্বস্ত ভালবাসা। যে ভালবাসা খুব সহজেই কারো জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা রাখে। আমিও শেষ হয়ে যেতাম, নষ্ট হয়ে যেতাম। প্রচণ্ড মানসিক শক্তি দিয়ে আমাকে টিকে থাকতে হয়েছে। প্রতিটি মুহূর্ত নিজের সাথে নিজের যুদ্ধ করে টিকে থাকতে হয়েছে। সময়ের ব্যবধানে সব ক্ষতই সেরে ওঠে, কিন্তু আমার ক্ষতের ভেতরে আজতক বিষটুকু রয়ে গেছে। এই ক্ষতই আমাকে আরো শক্তিশালী করে তোলে।
আস্তে আস্তে আমি নিজের প্রতি বিশ্বাস ফিরে পেতে থাকি। নিজেকে সামাজিক রুটিনের ছকে ফেলে দিই, তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারি। স্বস্তির ব্যাপার বলতে এতটুকুই। সমাজের ভেতরে এসে দেখি আমাদের সমাজ ও সমাজ ব্যবস্থাপনা বিশ্রী অবস্থা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মুক্তি কোথায়? যে সমাজ বারো বছর বয়সী মেয়েদের সাথে মিশতে বাধা দেয়, বেআইনি বলে ঘোষণা করে, অথচ ষোল বছর বয়সী মেয়েদের সাথে একই বিছানায় শোবার সুযোগ করে দেয় নিজেই।
অবাক হবার কিছু নেই, ইউরোপে নিজের অস্তিত্বকে দ্বিগুণভাবে টের পাচ্ছিলাম আমি। সেই সময় অনেক মহিলার সাথেই আমার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কিন্তু আমার ভেতরে ছিল অন্য আগুন, অন্যরকম আকাঙ্ক্ষা। ভেতরে ভেতরে নরক যন্ত্রণা পোহাচ্ছিলাম আমি। কোনো নিমফেট মেয়েকে দেখলে আমার ভেতরের অদম্য, অসুস্থ এক কামনার দানব জেগে উঠত। অনেক কষ্টে নিজের সেই ক্ষুধার্ত দানবটিকে শান্ত করে রাখতাম। আর কোনো উপায়ই ছিল না। ওই কচি কচি মেয়েদের স্পর্শ করার সাহস করে উঠতে পারিনি কখনো। সামাজিক নিয়মের কাছে অহসায় আত্মসমর্পণ করতে হয়েছে। আমার দৈহিক চাহিদা মেটানোর জন্য অনেক মহিলাই ছিল, কিন্তু তাদেরকে স্রেফ ‘দৈহিক চাহিদা মেটানোর যন্ত্র’ বলেই মনে হয়েছে। এর বেশি কিছু নয়। অথচ আমার এই চাহিদা আলাদা কোনো চাহিদা ছিল না। সমাজের দশজন সাধারণ পুরুষের মতই প্রাকৃতিক ছিল। কিন্তু তারা সবাই যেভাবে নিজেদের বয়সী সঙ্গী খুঁজে নিয়ে রুটিনমাফিক দেহের ক্ষুধা মিটিয়ে সুখী থাকে আমি তাদের মতো হতে পারিনি। সমাজের অন্য পুরুষেরা যেখানে সমবয়সী মহিলাদের সাথে দৈহিক সম্পর্ক করে আনন্দ পায়, আমি সেভাবে পাইনি। অনেক চেষ্টা করেছি, কিন্তু লাভ হয়নি।
আমার চিন্তাধারা, কল্পনাশক্তি ছিল আমার বয়সী অন্য যে-কোনো ব্যক্তির চেয়ে প্রখর। এমনকি কোনো মেধাবী লেখকের কল্পনাশক্তির চাইতেও হাজারগুণে শক্তিশালী। বয়সের দিক থেকে আমার জীবন কয়েক ভাগে বিভক্ত। বিশ থেকে তিরিশ, একত্রিশ বছর বয়স পর্যন্ত শরীরের কাতরতা বুঝতে পারিনি। আমার শরীর আসলে কী চায়, কীভাবে চায়, সেটা অতটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারেনি। আমার মন আমার দেহের চাহিদাকে খুব স্বাভাবিকভাবে এড়িয়ে গেছে ততদিন। শরীরের কোনো অজুহাতই মেনে নিইনি। ভেবেছিলাম অল্পবয়সী বাচ্চা মেয়েদের প্রতি আমার আকর্ষণটা সাময়িক ব্যাপার-স্যাপার। কিন্তু একটা পর্যায়ে গিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলাম। পৃথিবীতে অসংখ্য পুরুষকে খেয়াল করি, তারা কী সুন্দর নিজের বয়সের সাথে মানানসই সঙ্গী নিয়ে শান্তিতে আছে। অথচ আমি নিমফেট বালিকা ছাড়া অন্য কোনো মেয়ে বা মহিলাদের প্রতি বিন্দুমাত্র আগ্রহ পাই না। নিজের কাছেই লজ্জায় পড়ে গেলাম। সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে গেলাম। উনিও বিভিন্ন সময়ে অনেক ওষুধই দিলেন। কিন্তু কোনো ওষুধেই কাজ হলো না। ভয় পেয়ে যাই আমি, নিজেকে ভয় পেতে শুরু করি। বুঝতে পারি, কামনা, ইচ্ছা সব ওই বয়সে আটকে গিয়েছে। এনাবেলের স্মৃতি আমাকে বন্দি করে ফেলেছে। শুধু এই কারণেই আমি নিমফেট মেয়েদের প্রতি আকৃষ্ট হই। কিন্তু এর কোনো সমাধান খুঁজে পাইনি।
এনাবেলের মা, ওদের বাড়ির কাজের মহিলা- কাউকেই আমার পছন্দ ছিল না। আমি চৌদ্দ বছরের বেশি বয়স্ক মেয়েদের পছন্দ করতে না পারার এটিও একটা কারণ হতে পারে। নারীবিদ্বেষী অনেকেই থাকে, তাই বলে এরকম অভিজ্ঞতার কথা কোথাও পাইনি। অবস্থা আরো খারাপের দিকে যেতে লাগল। আস্তে আস্তে মেনেই নিলাম আমার আচরণগত সমস্যা রয়েছে, বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণে অস্বাভাবিক রুচি রয়েছে। সেই সময় আমি নিজেই নিজের জ্ঞানার্জনের বিষয় হয়ে উঠি। এই ভয়ঙ্কর যৌনরুচির উপর প্রচুর বই ঘাঁটাঘাঁটি করি। যতদূর মনে পড়ে, ১৯৩৩ সালের দিকে ইংল্যান্ডে আট থেকে চৌদ্দ বছরের মেয়েদের ‘মেয়েশিশু’র পরিবর্তে ‘কিশোরী’ বলা শুরু হয়। (এবং চৌদ্দ থেকে সতেরো বছর বয়স্ক মেয়েদের ‘যুবতী’।) ইউনাইটেড স্টেটসের ম্যাচাচুসেট্‌স্‌ অঞ্চলে আট থেকে সতেরো বছর বয়সী সব মেয়েকেই নিরঙ্কুশভাবে শিশু বলা হতো। সবচেয়ে অবাক হয়েছিলাম ইতিহাস ঘেঁটে। ইতিহাস কমবয়সী মেয়েদের বিয়ের অসংখ্য নমুনা পাওয়া যায়। আমি ইতিহাস ঘেঁটে ঘেঁটে আফসোস বাড়াতে থাকি।
একটা সময় এলো, নিজেকে গুছিয়ে নেবার সিদ্ধান্ত নিলাম। এভাবে একা থাকলে আরো অসুস্থ হয়ে যেতে পারি। বরং বিয়ে করে ফেলা উচিত। তাহলে হয়তো সব ঠিকঠাক হয়ে যাবে। আপাদমস্তক একজন ভালো মানুষ হবার চেষ্টা করলাম। একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলে রাখি, আমি শিশুদের যথেষ্ট স্নেহ করি। যে কোনো শিশুর প্রতিই আমার অগাধ স্নেহ-মমতা। ওদের মিষ্টি স্বভাব, নিষ্পাপ চাহনি, ওদের আশ্চর্য কোমল মন আমার ভালো লাগে। শিশুদের মন হল পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র জায়গা। আমি সেই বিশুদ্ধ মনের প্রতিচ্ছবিতে ভালো মানুষ হয়ে ওঠার উৎসাহ পাই। কিন্তু যখনই দশ বছরের কোনো মেয়ের সাথে চোখাচোখি হয়ে যায়, আমি শেষ! সেই চোখ, চাহনি, চোখের তারা, জ্বলজ্বলে ঠোঁট সব মিলিয়ে আমাকে এমন বিব্রত করে ফেলে, হৃৎস্পন্দন বেড়ে যায়। হাজার চেষ্টা করেও নিজের রুচিতে পরিবর্তন আনতে পারি না।
আমি চাইলে যে কোনো ফুলকেই তুলে নিতে পারি, যে কোনো মহিলার সাথেই জড়াতে পারি, এই আত্মবিশ্বাস আমার ছিল। কিন্তু আমার অপেক্ষা ফুলের জন্য ছিল না। ছিল কুঁড়ির জন্য অদম্য অপেক্ষা, আকাঙ্ক্ষা। দশ বা সাড়ে-দশ বছর বয়সের পরে মেয়েদের শরীরের পরিবর্তনের সময় স্তনগুলো অহংকার নিয়ে জেগে উঠতে থাকে- তেমনি ফুটন্ত কোনো কলির জন্য আমার সব অপেক্ষা ছিল। এগারো বছর বয়সের পরে ওদের উরুসন্ধিতে কেশ জন্মাতে থাকে, অবাধ্য হয়ে বেড়ে উঠতে থাকে। তখন সেই অপ্সরীকে মৌচাকের মতো মনে হয়, আর আমি যেন মধুলোভী দুরন্ত ভ্রমর!
পার্কের বেঞ্চে প্রতিদিন বিকেলবেলা বসে থাকতাম। হাতে একটা বই নিয়ে এমন ভাব করতাম যেন খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ছি, কালকেই এর উপর থিসিস পেপার জমা দেবার শেষ তারিখ। বিকেলবেলা পার্কে অনেক মানুষ আসত। আমার ভিড়, কোলাহল পছন্দ না। কিন্তু বিকেলবেলার পার্কের ভিড়ও মধুর মনে হত। অনেকগুলো বাচ্চাকাচ্চা, নিমফেট মেয়ে নিজেদের মতো খেলাধুলা করত। আর ওদের বাবা-মা সব যে যার মতো আড্ডায় মেতে উঠত। আমি ওই বাবা-মা’দের এড়াতেই বইপড়ার অভিনয় করতাম। পুরোটা বিকেল আমি নিমফেট মেয়েদের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকে ওদের নিয়ে কল্পনায় হারিয়ে যেতাম। প্রতিদিনের মতো একবার বিকেলবেলা সুবিধামত জায়গায় ফাঁকা বেঞ্চ পেয়ে বসে পড়ি। কিছুক্ষণ পরেই এক নিমফেট এসে ধপ করে আমার গা ঘেঁষে বসল। পায়ে রোলার স্কেট বাঁধতে বসেছিল। আমার পায়ের সাথে ওর পায়ে ছোঁয়া লাগছিল। কী অসাধারণ সেই স্পর্শ, সেই স্পর্শের অনুভূতি! স্কেট পড়ার জন্য আমার পায়ের উপর একটা হাত রেখে ব্যালেন্স করছিল। মেয়েটা দেখতেও অসম্ভব সুন্দর। ও নিজেই জানত না কত চমৎকারভাবে কারো স্বর্গ হয়ে ওঠার ক্ষমতা রাখে সে। ওর শরীরের উষ্ণতা আমার শরীরে মিশে যাচ্ছিল। যেন সূর্যের আলো পেয়ে নরম মোমের মতো গলে পড়ে যাচ্ছিলাম আমি। আরেকদিন বাসের ভেতর একটা বাচ্চা মেয়ে, নয়-দশ বছর বয়স হবে, আমার পাশে এসে দাঁড়াল। বাসের ঝাঁকুনিতে মেয়েটার লাল চুল, শরীরের স্পর্শ সবটুকুই আমার ভেতরে শিহরণ ধরিয়ে দিচ্ছিল। ঘটনা দুটো আলাদা আলাদা সময়ে ঘটে, প্রতিবার দেখা যেত পরের সপ্তাহ দুয়েক সেই ঘ্রাণ, সেই দৃশ্য, সেই অনুভূতি, সেই স্পর্শগুলো ভাবনার পুরোটা জুড়ে থেকে যেত। অদ্ভুত সেই ভাল লাগা অনুভূতি!
এগুলোও তো একেকটা প্রেম, তাই না? আমার পক্ষ থেকে এরকম এক তরফা প্রেমের সংখ্যা আঙুল গুণে শেষ করতে পারব না, অসংখ্য। এরকমও হয়েছে জানালার পাশে বসে আছি। রাস্তার ওপাশের বাড়িগুলোর জানালা থেকে আসা কোনো নিমফেটের পোশাক বদলানোর দৃশ্য দেখে তার প্রেমে পড়ে গেছি। ওই পোশাক বদলানোর দৃশ্যগুলো আমার কাছে শৈল্পিক ভালোলাগা নিয়ে আসত। খাঁ খাঁ শূন্যতা মেখে থাকা দৃশ্য, তবু পুরোপুরি শূন্য না, গাছ থেকে বৃদ্ধ পাতারা যেভাবে খসে যায়, ঠিক সেভাবে নিমফেট বালিকার শরীর থেকে পোশাক খসে যেতে থাকে, ঝরে যেতে থাকে, নতুন কিছুর প্রতি আহ্বান করে, অসাধারণ সেই শিল্প। এই শিল্পে অনাবিল আনন্দ আমার, স্নিগ্ধ, অলৌকিক সেই আনন্দ। যেন আমার প্রার্থনার ফসল, আমার উপাসনার বর! একজন অসম্ভব মেধাবী শিল্পী তাঁর তুলতুলে তুলিতে নিখুঁত আঁচড় কেটে যাচ্ছে, দৃশ্যকে প্রাণ দিয়ে যাচ্ছে। এ দৃশ্য কোনো নগ্নতা নয়, কোনো যৌনতার প্রতি মোহ নয়, এটা নিতান্তই এক অপরূপ শিল্প। প্রিয় পাঠক, এই দৃশ্য যদি শৈল্পিক না হয়ে থাকে, তাহলে আপনিই বলুন শিল্প মানেটা কী?
বাইরে থেকে এসে বলা নেই কওয়া নেই হুট করে টান দিয়ে পোশাক খুলে চেঞ্জ করে নেয়াটাকে শিল্প বলবেন? এরকম বিশ্রী, জঘন্য দৃশ্য আমি কখনোই দেখতে চাই না। এরকম হুটহাট পোশাক খুলে নগ্ন হবার দৃশ্যে উল্টো বিরক্তি আসে। যেন কোনো টাকমাথার ভূড়িওয়ালা মাঝবয়সী লোক প্রচণ্ড গরমের রাতে তার ভুড়ি মেলে দিয়ে শুধু আন্ডারওয়ার পরে জানালার পাশে বিতিকিচ্ছিরিভাবে বসে একমনে খবরের কাগজ পড়ছে। শিল্পহীনভাবে পোশাক পাল্টানোর দৃশ্যের সাথে এর কোনো পার্থক্যই আমি দেখি না।
মাঝে মাঝে এমনও হত যে বিকেলবেলা পার্কের বেঞ্চে বসে আছি, বাচ্চারা সামনেই খেলছে, আমি একমনে তাকিয়ে আছি। এমন সময় এক মেয়ের মার্বেল বা বল গড়িয়ে আমার বসার বেঞ্চের নিচে চলে এসেছে। মেয়েগুলো এখনই আমার শরীর ছুঁয়ে যাবে বেখেয়ালে, তখনই বাধা আসত। তখন ঠিক কোনো কর্কশ বৃদ্ধ মহিলা আমার পাশে এসে গা ঘেঁষে বসতো। হায়, বসার আর কোনো জায়গা নেই যেন! মাঝে মাঝেই এরকম হতো। আমি ভেতরে ভেতরে খুনি হয়ে উঠতাম। শুধু তাই না, আমার সাথে আলাপ পর্যন্ত জুড়ে দিত, আমার মাঝে মধ্যে পেটব্যাথা হয় কিনা, গ্যাস হয় কিনা, হজমে গণ্ডগোল আছে নাকি, বাথরুম ক্লিয়ার হয় কিনা, দিনে কতবার, ইত্যাদি ইত্যাদি!
উফ্‌! নিঃশব্দে চেঁচিয়ে উঠি, দোহাই লাগে, আমাকে একা থাকতে দিন! এই পার্কে, প্রিয় এই নিমফেট বাগানে আমাকে একটু একা থাকতে দিন! আমি চিরকাল এখানে এভাবেই বসে বসে নিমফেট মেয়েগুলোর খেলা দেখতে চাই, কাটিয়ে দিতে চাই মাতাল করা এই দর্শক-জীবন।
[চলবে]

পূর্ববর্তী পর্ব ২-এর লিংক

http://www.teerandaz.com/%E0%A6%AD%E0%A7%8D%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A6%BF%E0%A6%AE%E0%A6%BF%E0%A6%B0-%E0%A6%A8%E0%A6%AC%E0%A7%8B%E0%A6%95%E0%A6%AD-%E0%A6%B2%E0%A6%B2%E0%A6%BF%E0%A6%A4%E0%A6%BE-%E0%A6%AD%E0%A6%BE/?fbclid=IwAR1qj8S5KiS1cGYlRqcAY8lbMj9Xe6khYPalMFD95FeK14u_XRcmsat6m4M