মঈনুস সুলতান > মাউন্টেন রেনেয়ার ও রত্নময় রঙধনু ট্রাউট [৩] >> ভ্রমণ/হাইকিং

0
184

রেড সিডার উড বৃক্ষের গোড়ায় অনুমতি প্রার্থনা

অনেকক্ষণ খাড়াই ভেঙে হাইকিং করে আমরা এসে ঢুকি হাল্কা বনজ গাছপালায় ছাওয়া প্রাকৃতিক টানেলের মতো দেখতে একটি ট্রেইলে। এখানে রোদের আলোছায়ায় সাদা বালুকা মাড়িয়ে হাঁটি আমরা। এই বুনোপথ তুলনামূলকভাবে সমতল হওয়ায় খাড়াই ভাঙার ক্লান্তিকর মশগত থেকে একটু রিলিফ পাওয়া যায়। এদিককার হাল্কা বনানী ভরে আছে ছোট্ট কালো দেহে হলুদাভ লেজের লোহিত মাথাওয়ালা সব পাখিতে। তোড়েজোড়ে হাইকিং করনেওয়ালাদের দ্রুত পদক্ষেপে তারা উড়ে যায় এক ডাল থেকে আরেক ডালে। জঙ্গলের সবুজ ছত্রীতে তাদের উড্ডয়নের ঝিলিক চিত্রশিল্পীর ব্রাশের বর্ণাঢ্য রেখার মতো ভাসে। আমার পাশে শর্টস্ পরা স্কারলেট শিস দিয়ে সুর ভেজে হাঁটছে। একটু খেয়াল করে কান পেতে শুনলে মনে হয়, সে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বারবার গাইছে জন ডেনভারের অনেকদিন আগে গাওয়া একটি লিরিক, ‘লিভিং অন অ্যা জেটপ্লেইন।’ ইদানিং খেয়াল করছি, স্কারলেট যখন আমার সাথে কথা বলতে চায় না, তখন সুরে-ছন্দে গুনগুনানির আশ্রয় নিয়ে দৈহিকভাবে কাছে থেকেও সে চলে যায় মানসিকভাবে অনেক দূরে। শুকতারা এ মুহূর্তে তার ব্যাকপ্যাকে বিস্তর মালসামান নিয়ে, কাঁধে কোমরে এক্সট্রা থলে ঝুলিয়ে, হাতে হরিণের শিং বসানো মুখোশটি ক্যারি করে আগে আগে হাঁটছেন।
আজকের হাইকিংয়ের সূত্রপাত হয়েছে খুব ভোরবেলায় সুরুয ওঠার সাথে সাথেই। প্রস্তুতি হিসাবে স্কারলেট আমাকে একটু ফ্রিহ্যান্ড এক্সারসাইজ করতে বলে। তাতে কেন জানি আমি বিরক্ত হয়ে বেঁকে বসি। এখনো আমরা মাউন্ট রেনেয়ারের তুষারধবল সামিটের দিকে মূল হাইক শুরু করিনি, তাই আমার বেজায় অধৈর্য্য লাগে। অহিষ্ণুতায় উশখুশ করে ‘হোয়েন আর উই গোয়িং টু স্টার্ট হাইকিং টু মাউন্ট রেনেয়ার?’ বলে প্রশ্নটি ছুঁড়লে, স্কারলেট গ্রীবা বাঁকিয়ে নির্লিপ্ত জবানে জবাব দেয়, ‘বড়সড় একটা হাইকের প্রিপারেশন হিসাবে আমরা আজ একটু ওয়ার্মআপ হাইক করবো। মাউন্ট রেনেয়ার তো কোন মিনার না যে সিঁড়ি বেয়ে চড় চড় করে তার চূড়ায় উঠে যাওয়া যায়। প্রথমে ফুটহিলসে ছোট ছোট হাইক করে আমাদের বডি ক্লাইমেটিকভাবে এডজাস্ট করে নিতে হবে তো?’ শুকতারার ছোট্ট জঙ্গলে টিপি ভাড়া করে আমরা দিন কাটাচ্ছি। আমার একটু আগ্রহ হয়েছিলো, নিসকোয়ালি রির্জাভেশনে গিয়ে নেটিভ আমেরিকানদের জীবনযাপন স্বচক্ষে দেখা। কিন্তু ওখানে ঢোকার পার্মিশন সহজে পাওয়া যাবে না জানতে পেরে আমার ফ্রাসট্রেশন বেড়েছে। তবে আজকের ওয়ার্মআপ হাইকে শুকতারা তার গোত্রের একটি পবিত্র স্থান দেখাবেন বলে কথা দিয়েছেন। তার উদ্দেশ্য হচ্ছে- পাহাড়ে ওঠার আগে আমাদের নেটিভ আমেরিকান সমাজে প্রচলিত একটি অবশ্য করণীয় আচার সশরীরে পালন করে দেখানো। এ আচারের জন্য তার পরামর্শ মোতাবেক আমরা না খেয়ে আছি। আচারের নৃত্য শেষ হলে পর আমরা মুখে পানি কিংবা খাবার তুলতে পারবো। উপাস-কাপাস হালতে হাইক করতে গিয়ে আমার মেজাজ কেবলই খিঁচড়ে যাচ্ছে।
আমরা টানেলের মতো পাতায় ছাওয়া ট্রেইল অতিক্রম করে ছোট্ট একটি প্রান্তর পাড়ি দেই। তারপর বড় বড় পাথর মাড়িয়ে মার্চ করে উঠতে শুরু করি পাহাড়ের উপর। আমাদের পায়ের মাংশপেশীতে জোর চাপ পড়ছে, জোরে জোরে দম ফেলতে ফেলতে আমরা কপালের ঘাম মুছি। গাছপালা-লতাপাতাহীন পাহাড়ের উপর আসা মাত্রই শুকতারা হাইকের সাময়িক বিরতি টানেন। এখানকার চারদিকে ঝোপেঝাড়ে ফুটেছে কমলালেবু বর্ণের অজস্র বেরী আর পার্পোল বর্ণের থোকা থোকা বুনোফুল। স্কারলেট ঘাসহীন পাথরের উষর জমিনে বসে পড়ে তার স্লিপইন সোয়েটারটি খুলে নেয়। আমি তার সাথে আই কণ্টাক্ট করতে গেলে সে ‘সানসাইন অন মাই শোল্ডার’বলে জন ডেনভারের আরেকটি গানের কলি ভাজতে ভাজতে চোখ বন্ধ করে। সে নীরবে অফশোল্ডার হয়ে রোদ পোহায়। তামাকের উপর জলন্ত টিকি’র ধিকিধিকি আগুনের মতো অস্বস্তি নিয়ে আমি আবার তার দিকে তাকাই। তার নিরাবরণ উরুতে রাখা মেরুন রঙের হাল্কা সোয়েটার, উন্নত বুক জড়িয়ে পরা নিমার মতো স্লিভলেস সিল্কের খাটো ঝুলের ফিরোজা টপ।
আমার ফের কেইপকডের কথা মনে পড়ে। সারা দিনমান সৈকতে কাটিয়ে আমরা সন্ধ্যার পর বারে এসে দু’মগ ড্রাফ্ট বিয়ার নিয়েছিলাম। কাঠের ফ্লোরের কোণে লাইভ জ্যাজ্ বাজছে, তাই স্কারলেট ফিরোজা বর্ণের এ টপটি পরে ঊর্ধ্বাঙ্গের জেসচারে আমাকে ড্যান্সের ইশারা দেয়। কিন্তু আমি পজিটিভভাবে সাড়া না দিয়ে ফেনা উপচানো মগ নিয়ে এসে বসি মোমের আলোয় বারের আধো অন্ধকার এক কোণে। না, নির্জন পানশালায় সাথী না জোটাতে পারায় তার ড্যান্স জমেনি। তো সে আমার টেবিলে এসে খুব মুডি ভঙ্গিতে আমার গোঁফ থেকে ফেনা মুছিয়ে দিয়ে জানতে চায়, ‘লুক, আই ডোন্ট কেয়ার আবাউট ড্যান্স। বাট টেল মি ওয়ান থিং, ওয়ান এক্টিভিটি, ইউ রিয়েলি এনজয় ডুয়িং।’ আমি জবাব দেই, ‘আই অ্যাম নট গুড অ্যাট ড্যানসিং… তবে একটা ব্যাপার আমি রিয়েলি এনজয় করি, আমার ভালো লাগে খোলা প্রান্তর ধরে হাঁটতে হাঁটতে পাহাড়ের গভীরে চলে যেতে।’ সে এবার আমার দীর্ঘচুলের ভেতর আঙুল চালিয়ে বলে, ‘ডু ইউ লাইক টু হাইক ইন মাউন্ট রেনেয়ার? পর্বতটি আমার চেনা, হাইক করেছি আমি ওখানে বেশ কয়েকবার। যাবে মাউন্ট রেনেয়ারে আমার সঙ্গে?’ আমি সম্মতিতে উদগ্রীব হয়ে তার হাত ধরে বলি, ‘ইয়েস, আই উড লাইক টু হাইক ইন মাউন্ট রেনেয়ার, বাট, জাস্ট টেল মি… এর বিনিময়ে হোয়াট ডু ইউ ওয়ান্ট রিয়েলি?’ সে নিবিড়ভাবে আমার দিকে তাকিয়ে যেন আমার ফেস স্টাডি করে, তারপর মৃদুস্বরে বলে ‘আই লাইক ইউ টু বি অ্যা প্লেজেন্ট কমপেনিওন। খুব খুশ মেজাজে তোমাকে কিন্তু হাইক করতে হবে আমার সঙ্গে। আই ডোন্ট ওয়ান্ট অ্যানি ফ্রাউনিং বিজনেস।’
আজ সাতসকালে কেন জানি ফ্রিহ্যান্ড এক্সারসাইজের প্রসঙ্গে আমার মেজাজ বিলা হয়ে ওঠে। তাতে প্লেজেন্ট কমপেনিওন হওয়ার চুক্তিটি ভেঙে যায়। চেষ্টা করেও কনফ্লিক্ট ঠিক এড়াতে পারিনি। এখন আবার তার কাছাকাছি যেতে ইচ্ছা হচ্ছে তীব্রভাবে। জন ডেনভারের গান বিচ্ছিন্ন করেছে তাকে আমার কাছ থেকে। গানের তোড়ে তার শরীর দুলছে একটু একটু; তাতে মনে হচ্ছে, কেইপকডের সমুদ্রজলে ঢেউ লেগে দুলছে সেইলবোটটি। ওদিকে শুকতারা ঝোঁপঝাড় মাড়িয়ে ঝুড়িতে তুলছেন অরেঞ্জ বর্ণের বেরী ও বেগুনি বুনোফুল। স্কারলেটের সাড়া না পেয়ে আমি ওদিকে হাঁটি। দেখি, পাথরের উপর পড়ে আছে আস্ত এক মৃত প্রজাপতি। তুলে এনে দেখি, সে চোখ মুদে শরীরে রোদের উত্তাপ মাখছে। আমি দ্বিধা ঝরিয়ে তার টপের লো নেকলাইনে প্রজাপতিটি পরিয়ে দেই। মৃদু স্পর্শে চোখ খুলে সে হেসে বলে, ‘দিস ইজ ইনডিড ভেরি কালারফুল। ম্যান, ইউ মেইড মাই ডে। নাউ হোল্ড মাই হ্যান্ড এন্ড লিফ্ট মি আপ।’ আমি মাটি থেকে তাকে টেনে তুলি। সে ব্যাকপ্যাক থেকে পলিথিনের ছোট্ট পাউচ বের করে তাতে প্রজাপতিটি সাবধানে রাখে। বুনোফুল আর বেরী চয়ন করে শুকতারাও ফিরে এসেছেন। শুরু হয় আমাদের দ্বিতীয় দফা হাইকিং।
মিনিট বিশেকের মধ্যে আমরা চলে আসি পাথুরে পাহাড়ের একদম রীজে। এর নিচ দিয়ে খয়েরি পাথরের বিপুল জগদ্দল কেটে বয়ে যাচ্ছে নিসকোয়ালি নদী। আমরা হাজার বছরের পুরানো পায়ে চলা ট্রেইল ধরে পাথরের খাঁজ কেটে ধাপে ধাপে নিচের দিকে নামি। নামতে নামতে আমাদের কানে নদীর গর্জন স্পষ্ট হয়। আমরা এসে পৌঁছি, রকওয়ালের পাঁজর কেটে ভেতরের দিকে সেঁধিয়ে যাওয়া ফ্রাইপ্যানের আকৃতির একচিলতে সমতলে। নিসকোয়ালি গোত্রের পবিত্র এ থানে এক সময় ছিলো দুশ তেরো ফুট উঁচু- নয়শ চৌদ্দ বছরের পুরানো একটি রেড সিডার উডের গাছ। মাউন্ট রেনেয়ার উপত্যকার আদিবাসি নিসকোয়ালিরা হাজার বছর ধরে উপাসনা করছিলো বয়োবৃদ্ধ এ মহিরূহের। কনিফার প্রজাতির এ বৃক্ষটির পাতা, বক্কল, প্রশাখা ও ফল যোগাতো তাদের রোগশোকে ভেষজ নিরাময়। নিচের নদীজলে আজো তারা শিকার করে স্যামন মাছ।
১৮৫৪ সালে শ্বেতাঙ্গরা এ এলাকা দখল করতে আসলে যুদ্ধ বাঁধে। নিসকোয়ালি সম্প্রদায়ের পরাজয়ের পর রেনেয়ার পর্বতের পাদদেশে শ্বেতাঙ্গ যোদ্ধাদের সেটলার হিসাবে দেয়া হয় জনপ্রতি ১৫৪ একর করে ভূমি। যুদ্ধ-পরবর্তী শান্তিচুক্তির শর্তানুযায়ী নিসকোয়ালিরা পায় মাত্র চার একর জংলাভূমিতে চাষাবাদের অধিকার। তাদের চীফ লেসলি প্রতিবাদ করেন। শ্বেতাঙ্গ শাসকরা তাঁকে ফাঁসি দেয়, এবং একই দিনে তাদের এ উপাসনার স্থানে এসে নিধন করে মহাকালের সাক্ষী রেড সিডার উডের বিপুল বৃক্ষটিকে। এরপর থেকে নিসকোয়ালিরা গাছটির কাটাগুড়িকে নিশানা করে- বিশেষ করে মাউন্ট রেনেয়ারে হরিণ বা ভালুক শিকারের আগে নৃত্যে মেতে ওঠে প্রকৃতির কাছে প্রার্থনা করে পাহাড়ের সম্পদ আহরণের অনুমতি।
কাটাগুড়ির উপর মালসায় ধূপ জ্বেলে শুকতারা ও স্কারলেট চলে যায় মানুষ সমান উঁচু এক লোহিত পাথরের বিশাল বোল্ডারের আড়ালে। মিনিট দশেক পর তারা ফিরে আসে আচারের বিধানানুযায়ী নৃত্যের পোশাক পরে। শুকতারা এ মুহূর্তে মাথায় হরিণের শিংওয়ালা মুখোশ পরে এসেছেন। তার গায়ে হরিণের চামড়ার পোশাক ও পায়ে মোকাসিন জাতীয় জুতা। স্কারলেট পরেছে পাখির পালকে বোনা টপ। তার চুলে গাঁথা অনেকগুলো পাখির রঙিন পালক। দুই নারী নীরবে চাতালে কমলালেবু রঙের বেরী ও বেগুনিফুল দিয়ে দ্রুত আলপনা আঁকে। দেখতে দেখতে লালচে খয়েরি পাথরের পাষাণ চত্বর ভরে ওঠে গাছ, পাথর, পর্বত, হরিণ, ভালুক ও মাছের প্রতীকী নকশায়। শুকতারার মুকাসিনের সাথে বাঁধা গাছের শুকনা গোটার ঝুমুর। তা ঝমঝমিয়ে তিনি স্কারলেটকে নৃত্যের বেসিক স্টেপ দেখিয়ে দেন। তারপর দুই নারী ঐতিহাসিক রেড সিডার উডের কাটা গুঁড়িকে কেন্দ্রে রেখে, বাঁকা হয়ে দূরের মাউন্ট রেনেয়ারের দিকে নিশানা করে নেচে ওঠে। ঢিমে তালের এ নৃত্যের রিদমে সঙ্গতি রেখে তারা গাছ, হরিণ ও মাছের প্রতীক না ছুঁয়ে সাবধানে মৃদু লাফিয়ে লাফিয়ে ঘুরছে। নদীজলের গর্জনের সাথে মিশে যায় তাদের ঝুমুরের ধ্বনি। অল্পক্ষণের মধ্যেই শুকতারা তার মাথায় ধূপের জলন্ত মালসা হরিণের শিংয়ের ভেতর স্থাপন করেন। তারপর কুর্নিশি কায়দায় মাউন্ট রেনেয়ারের দিকে মাথা ঝুঁকিয়ে প্রার্থনা করেন অনুমতি। এরপর তাদের পেছন পেছন আমি নামতে থাকি, পাথরের প্রাকৃতিক খাঁজে তৈরি সিঁড়ি ধরে নদীজলের দিকে।
অনেক ঘুরানো পথে নদীর উপরের রকওয়াল পেঁচিয়ে বিস্তর মেহনতে আমরা যখন জলের কাছাকাছি নেমে আসি, ভারি অবাক লাগে এখানকার খোলামেলা ভূভাগ দেখে! লালচে পাথরের রকওয়াল ছেড়ে এসেছি বেশ খানিকটা দূরে। এদিকে ধূসর সব পাথররাজি ছুঁয়ে বয়ে যাচ্ছে রূপালি জলের সংকীর্ণ শাখা-নদী। বহতা স্রোতের উপর আস্ত গাছ ফেলে তৈরি করা হয়েছে সাঁকো। আমার সঙ্গী দুই নারী তার উপর দাঁড়িয়ে তাদের প্রতিফলনের দিকে ঝুঁকে প্রণত হয়। জলপ্রণামের ভেতর দিয়ে সমাপ্ত হয় আচারের। অতঃপর সাঁকোটি ধরে নদী অতিক্রম করতেই শুকতারা আমাদের খাবারের বিরতি দেন। সে কাকভোর থেকে উপাস করে আছি। পাড়ে বসে আমরা যবের রুটির সাথে হলুদ স্কোয়াশের নরোম মন্ড খাই। তারপর পোড়া মিষ্টি আলু খেয়ে স্রোতে নেমে দুই নারী আঁজলা ভরে নদীর জল পান করলে আমার আরেক দফা অবাক লাগে! আমি পানিতে নামতে ইতস্তত করছি, তাই স্কারলেট প্লাস্টিকের কাপে করে খানিকটা পানি আমার জন্য নিয়ে এসে বলে, ‘দু’দিন পর যখন সত্যি সত্যি মাউন্ট রেনেয়ারের হাই এলিভেশনে হাইক করবো, ওজনের জন্য ওখানে কিন্তু পানি ক্যারি করে নিয়ে যাওয়া যাবে না। আমাদের তখন পানীয় জলের জন্য ডিপেন্ড করতে হবে ঝর্ণার ওপর। সো, ট্রাই দিস নাউ। হাইকিংয়ের ট্রায়েলরানে অনেকক্ষণ না খেয়ে থাকা ও রিভার ওয়াটার ড্রিংক করা দুটাই প্র্যাকটিস হয়ে যাক।’
আমরা পাড় ধরে আরেকটু সামনে এগিয়ে যাই। দেখি, এদিককার দহের মতো কিঞ্চিত গভীর জলে ডুবো পাথরে বাড়ি খেয়ে বহতা স্রোত তুলছে দারুণ ঊর্মি। স্কারলেট ইশারায় দেখায়- পানিতে আধডোবা হয়ে বুজকুড়ি কাটছে বেশকিছু লালচে-রূপালি স্যামন মাছ। শুকতারা তার নাচের ধড়াচূড়া খুলে ফেলে এবার পানিতে নামার উদযোগ করেন। নামতে নামতে তিনি হাঁক পেড়ে বলেন, ‘উই আর গোয়িং টু ক্যাচ সাম ফিস হিয়ার।’ স্নানের পোশাক নিয়ে আসেনি, তাই স্কারলেট কাপড়চোপড় খুলে রেখে প্যান্টি ও ব্রা পরাবস্থায় পানিতে নামে। আমি জলস্পর্শ করে দেখি তা বেজায় ঠান্ডা। সে একটি ডুবো পাথরের উপর পা দিয়ে বতিচেল্লির ভেনিসের কায়দায় দাঁড়িয়ে ডাকে, ‘কাম অন ম্যান, লেটস সুইম আরাউন্ড অ্যা বিট অ্যান্ড ক্যাচ সাম ফিস ফর দ্যা ডিনার।’ আমি সাড়া দিতে ইতস্তত করলে সে বিরক্ত হয়ে সাঁতার কেটে স্রোতে ভাসে।
দহের উজানে পানি খুবই কম। ঝিরিঝিরি জলে ভাসছে অনেকগুলো ধূসর পাথর। পাড়ের কিনারে স্রোত নেই বললেই চলে। ওখানে দেখি, জলতলে পাথরের উপর ভাসছে লালচে রঙের বড়সড় একটা স্যামন মাছ। শুকতারা ও স্কারলেট দু’হাতে স্যামন মাছ তাড়িয়ে ওদিকে নিয়ে যাচ্ছে। মাছ লাফিয়ে লাফিয়ে পাথর অতিক্রম করছে। শুকতারা পাথরে উঠে একটি স্যামন ধরে তা নেটের ব্যাগে পুরে ফেলেন। আমি এবার উজানে গিয়ে জুতা খুলে প্যান্ট গুটিয়ে আধডোবা পাথরের উপর দিয়ে হাঁটি। শ্যাওলা মাখা পিছল পাথরে পা রেখে দহের দিকে তাকিয়ে দেখি, শুশুকের মতো সাঁতার কাটছে স্কারলেট। তাকে সম্প্রতি নিরাভরণ দেখেছি আমি টিপিতে। মোমের আলো গোলাপকুঞ্জে উড়ে যাওয়া পাখির পাখনার মতো তার মসৃণ ত্বকের ওপর তিরতির করে কাঁপছিলো। এ মুহূর্তে আমি আবার তার আধেক নগ্নতা অবলোকন করছি। রূপালি জলে তার রূপ কিংবদন্তির মৎস্যকন্যা হয়ে ফোটে। শুকতারা আরেকটি স্যামন মাছ ধরেন। আমি লাফিয়ে ওঠা একটি মাছ ধরতে গিয়ে শ্যওলায় পা পিছলে পানিতে পড়ি।
গোটা পাঁচেক স্যামন মাছ নিয়ে আমরা যখন ফিরে আসি- বেলা তখন গড়িয়ে বিকাল হচ্ছে। আজ সারাদিন খুব ধকল গেছে, তাই টিপিতে একটু বিশ্রাম নিয়ে সন্ধ্যার দিকে আমি ও স্কারলেট শুকতারার ট্রেইলারের কাছে আসি ডিনারের জন্য। তিনি কাঠকয়লায় আগুন দিয়ে একটি স্যামন মাছ গ্রীলের উপর চড়িয়েছেন। পাশে আঁচে রোস্ট হচ্ছে কয়েকটি ভুট্টা। অবাক হয়ে দেখি, ট্রেইলারের পেছনে ঘাসবনে দাঁড়িয়ে লাজুক মুখে আমাদের দেখছে ছোট্ট একটি হরিণ। একটু পর সে শুকনা পাতা সরসরিয়ে এসে দাঁড়ায় শুকতারার কাছে। সে তার পায়ে ও হাঁটুতে নাক ঘষলে শুকতারা, ‘সো নাইস টু সি ইউ সুইটহার্ট, টুডে ইউ রিমেমভার মামি’ বলে নিচু হয়ে তাকে আদর করেন। অতঃপর মৃগশিশুটির নাম ‘বেবছি’ বলে আমাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। এ দিককার জঙ্গলে শিকারের সিজনে লাইসেন্স করা শিকারীরা আসে। শুকতারা ক্যাম্প-ফায়ারের জন্য একদিন কাঠ কাটতে বনানীতে গেছেন। বাচ্চা বেবছি ঝরা পাতায় লেগে থাকা তার সদ্য গুলিবিদ্ধ মায়ের রক্ত শুঁকছিলো। তিনি তাকে ট্রেইলারে এনে বোতলের দুধ খাইয়ে দত্তক কন্যার স্নেহে লালনপালন করেন। বেবছি এখন সোমত্ত হয়েছে। সে আর ট্রেইলারে থাকতে চায় না। বনানীতে তার হয়তো মদ্দা বয়ফ্রেন্ড জুটেছে। তারপরও বেবছি মাঝে মাঝে আসে তার মাম’কে দেখতে।
বেবছি সিঁড়ি বেয়ে উঠে ট্রেইলারের দরোজায় ঢুস মারতে শুরু করে। তো শুকতারা উঠে তাকে ভেতরে নিয়ে গিয়ে ব্যাটারি লাগানো ছোট্ট টেলিভিশনটি ছেড়ে দেন। বেবছি ম্যাটের উপর বসে এবার দিব্যি টিভি সিরিয়ালের ছবি দেখছে। তিনি গ্রিলের কাছে ফিরে এসে আমাদের বলেন, ‘বাচ্চা বেবছি প্রথম দিকে খুব কাঁদতো, তখন টিভি খুলে দিলে সে শান্ত হয়ে প্রোগ্রাম দেখতো। এখন তো সে বনানীতে থাকে। তারপরও মাঝেসাঝে মামকে দেখতে আসলে তার ইচ্ছা হয় একটু টিভি দেখার।’ স্কারলেট আমার দিকে ফিরে জানতে চায়, ‘ক্যান আই আস্ক ইউ অ্যা ফেভার?’ বিষয় কী শুনতে আমি আগ্রহ দেখালে সে ঘন হয়ে আরো কাছে এসে ফিসফিসিয়ে বলে, ‘জাস্ট ডোন্ট গো ব্যাক। লেটস লিভ হিয়ার। দিস ইজ ফান। বনের টিবিতে বাস করলে আমরা হয়তো হরিণ বা কাঠবিড়ালীর ছানাকে একদিন দত্তক নিতে পারবো।’ জবাবে আমি মৌন থাকি।
[ক্রমশ]