মঈনুস সুলতান > মাউন্টেন রেনেয়ার ও রত্নময় রঙধনু ট্রাউট [২] >> ভ্রমণ

0
351

পর্ব ২

গ্রেইট হোয়াইট মাউন্টেন

“কাঠের ফ্লোরে রমরমিয়ে বাজছে আফ্রো-ক্যারিবিয়ান মিউজিক। সে ছন্দায়িত স্টেপ ফেলে ড্যান্সিং ফ্লোরের দিকে যেতে যেতে ফের গ্রীবাটি বাঁকিয়ে বলে, ‘ইউ ক্যান হ্যাভ কোম্পানি ইফ ইউ ওয়ান্ট। চাইলে তুমি কেইপকড যাওয়ার সঙ্গী পেতে পারো… এন্ড ইউ নো ইট।’ আমি এ মন্তব্যের কোন রেসপন্স করার আগেই তার শরীর শঙ্খিনী হয়ে ফণা তুলে ঢুকে পড়ে কাঠের ডান্সিং ফ্লোরে।”

টিপির খোলা দুয়ার দিয়ে মৃদু হাওয়ায় ভেতরে উড়ে আসছে একটি দু’টি ঝরাপাতা। আধো ঘুমের ভেতর বুঝতে পারি- পাশে স্কারলেট নেই। চোখ খুলে উপরের দিকে তাকাই, ছাদ জুড়ে মস্ত জালের এক প্রান্তে ঝিমাচ্ছে ডোরাকাটা মাকড়শা, তার ঊর্ণনাভে আঁটকে পড়ে ফড়ফড়াচ্ছে রঙিন এক পতঙ্গ। ধড়মড় করে জেগে উঠে নিরিখ করে তাকাতেই দেখি, না, মাকড়শা নয়, টিপির চাঁদিতে জালের মতো দেখতে সুতায় বোনা মস্ত এক ড্রিম ক্যাচার। নেটিভ আমেরিকান জননীরা ড্রিম ক্যাচার বলে ঊর্ণনাভের মতো এ জাল বোনে, যাতে প্রকৃতি থেকে তাদের সন্তানরা সহজে ধরতে পারে সুন্দর সব স্বপ্ন। বুঝতে পারি, আমাদের সমবেত সময়কে স্বপ্নে ভরে দেয়ার জন্য শুকতারা ওখানে টাঙ্গিয়েছেন ড্রিম ক্যাচার। তাতে সত্যি সত্যিই আঁটকেছে রঙিন ডানার একটি পতঙ্গ। স্কারলেট আমাকে একা টিপিতে রেখে গেলো কোথায়? কেমন যেন নার্ভাস হয়ে আমার হৎপিণ্ড পতঙ্গের ডানার মতো ফড়ফড় করে কাঁপে।
চাকাঅলা শাদা রঙের ট্রেলার
টিপির বাইরে পাইনের ঘন বন। দুপুরের সরগরম রোদে একহারা দেহের বৃক্ষরাজি খাঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে স্রষ্টার দরবারে। ডালপালা মেলে পাতা নাড়িয়ে তারা যেন মগ্ন হয়ে আছে গাঢ় মোনাজাতে। মাঝে মাঝে অশ্রু-ফোঁটার মতো ঝরছে একটি দু’টি স্বর্ণাভ পাইন-নিডোল। এই বনানীর প্রান্তে নিজেকে নিশি পাওয়ার মতোই বিভ্রান্ত মনে হয়। প্রাগাঢ় নীরবতার সাথে নিঃসঙ্গতা মিশে গিয়ে আমার অস্তিত্ত্ব হয়ে উঠে অসহনীয়। খানিক ক্রোধ ও ফাসট্রেশনে দগ্ধ হতে হতে গাছপালার ছায়াপথ কেটে কেটে ভেতরে ঢুকি। পায়ের নিচে জমে থাকা মচমচে পাইন-নিডোলস্। দু’টি কাঠবিড়ালি বুনো-বাদাম খেতে খেতে কান খাড়া করে তুরতুরিয়ে উঠে যায় গাছের ডালে। ওখান থেকে ঝুলে একটি কাঠবিড়ালি সামনের পা দুটি তুলে মুখমাথা ও গোঁফ খিলাল করে। আর আমি কদম কদম করে আগ বাড়ি। দেখি, বাঁকানো একটি গাছের কাণ্ডে বসে আরেকটি কাঠবিড়ালি আমাকে অবলোকন করছে  নীরবে। বনানী অন্ধকার হয়ে আসলে আমার ফাসট্রেশন আরো বাড়ে। খয়েরি ডানার কয়েকটি পাখি চুরুৎ চুরুৎ করে একডাল থেকে উড়ে গিয়ে বসে অন্য ডালে। ঠিক বুঝতে পারি না, এ ঘোর অরণ্যে স্কারলেটকে খুঁজবো কোথায়? পায়ে চলার পথ ধরে মোড় ফিরি, তখনই সরসর করে ছুটে যায় একটি হরিণ। আমি তার সাদা লেজের দিকে বিরক্ত হয়ে তাকিয়ে থাকি।
আরো কিছুক্ষণ একাকী হেঁটে-চলে পায়ে চলার ট্রেইল হারিয়ে ফেলি। এদিকে দেখি- পড়ে আছে বেশ কতগুলো মস্ত বড় বড় বোল্ডার। পাথরগুলোর ধূসর অবয়বে সবুজ মস্ জাতীয় শ্যওলা জমে কেমন যেন স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে আছে। একটি পাথরে বসতেই জিন্সের পেছন দিকটা মসের ঘঁষায় সবুজ হয়ে ওঠে। একটু উদ্বেগ হয়। এবার যাই কোথায়? স্কারলেটের কিন্তু এরকম একাকী নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার স্বভাব আছে। দিন বারো আগে তার সাথে আবার দেখা হয়েছিল নিউ ইংল্যন্ডের একটি হর্স ফার্মে। খামার বাড়ির ছাদখোলা কাঠের ঝুলন্ত ডেকে জমেছিল পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে ইউনিভারসিটিতে আসা স্কলারদের নৃত্যগীতের মাইফেল। সমবেত ড্যান্স উতরোল মিউজিকের তোড়ে ঝমঝমিয়ে উঠেছে, আর স্কারলেটের দেহে যেন বয়ে যাচ্ছে মিথুনে উদগ্রীব শঙ্খিনী সাপের ফণা দোলানো ছন্দায়িত মোচড়। আমি তা অ্যাভয়েড করার জন্য কিচেন কাউন্টারের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম একাকী। সে ড্যান্সের রিদম মৃদুভাবে মেনটেইন করে আমার পাশে এসে দাঁড়ায়। কিছু না বলে অজানা কোন পারফিউমের স্বপ্নাচ্ছন্ন সুরভী ছড়িয়ে সে গ্লাসে ভোদকার সাথে মেশায় অরেঞ্জ জুস্। আমার তখন দেশে ফেরার ব্যাপারটা পাকাপাকি। সে পানীয় হাতে খুব মৃদু স্টেপের ড্যান্সে শরীর ঘুরিয়ে আমার দিকে চেয়ে জানতে চায়, ‘সো, ইউ আর রিয়েলি গোয়িং ব্যাক টু ইয়োর হোম, যাওয়ার আগে কি তুমি এদেশের কোথাও বেড়াতে যেতে চাও?’ আমি ভাবনাচিন্তা না করেই জবাব দেই, ‘ইয়েস স্কারলেট, আই উড লাইক টু ভিজিট কেইপকড। ওখানকার সমুদ্রসৈকতে একটু সময় কাটাতে পারলে বেশ হতো…বাট আই ডোন্ট থিংক ওখানে আমার যাওয়া হবে।’ সে গ্রীবা বাঁকিয়ে জানতে চায়, ‘হোয়াই নট?’ প্রতিক্রিয়ায় আমি অজুহাত দেই, ‘আই ডোন্ট ফিল লাইক টু গো দেয়ার অ্যালোন, একা যেতে আমার ভালো লাগছে না, ডু ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড দিস স্কারলেট?’ দাঁড়িয়ে থেকেও তার শরীরে রিদম দ্রুত হয়ে উঠছে। ওদিকে কাঠের ফ্লোরে রমরমিয়ে বাজছে আফ্রো-ক্যারিবিয়ান মিউজিক। সে ছন্দায়িত স্টেপ ফেলে ড্যান্সিং ফ্লোরের দিকে যেতে যেতে ফের গ্রীবাটি বাঁকিয়ে বলে, ‘ইউ ক্যান হ্যাভ কোম্পানি ইফ ইউ ওয়ান্ট। চাইলে তুমি কেইপকড যাওয়ার সঙ্গী পেতে পারো… এন্ড ইউ নো ইট।’ আমি এ মন্তব্যের কোন রেসপন্স করার আগেই তার শরীর শঙ্খিনী হয়ে ফণা তুলে ঢুকে পড়ে কাঠের ডান্সিং ফ্লোরে।
তার ঠিক পরদিন খুব ভোরে- আমি উপবনের জংলা জায়গায় যে ছোট্টমোট্ট লগ-কেবিনে থাকতাম, ওখানে এসে স্কারলেট দরোজায় জোরে নক করে আমাকে জাগায়। প্রস্তুতি নেয়ার কোন সুযোগ পাই না, যেন কোন তর সইছে না, এরকম তাড়া লাগিয়ে সে বলে, ‘গেট রেডি, ডোন্ট বি লেইজি ম্যান, কুইক, আই বট দু বাস টিকিটস, উই আর গোয়িং টু কেইপকড।’ আমি চটজলদি ব্যাকপ্যাকে টুথব্রাশ আর স্লিপিং স্যুট ইত্যাদি পুরে নিয়ে তার সঙ্গে চলে আসি কেইপকডে যাওয়ার বাস স্টেশনে। বাসে পিছন দিকে একটি জোড়া-সিটে আধোঘুম ও আধো অন্তরঙ্গতায় কেটে যায় ঘণ্ট তিনেক। কেইপকডে পৌঁছে আমরা কোন এজেন্ডা ছাড়াই স্রেফ ঘুরে বেড়াই কোস্টাল শহরটির ফুটপাতে। এক পর্যায়ে সুইমিং ট্র্যাক পরে শরীর ডুবাই সমুদ্রজলে। অতঃপর সৈকতের বালুকায় আধশোয়া হয়ে সে জানতে চায়, ‘তোমার কি আসলেই দেশে ফিরে যাওয়ার দরকার আছে? কেউ কি বসে আছে পথ চেয়ে?’ জবাবে সত্যি কথাটাই বলি, ‘আদপেই না, কারো মনেও পড়বে না যে আমি দেশে ফিরে আসিনি।’ জবাবে পুরোপুরি সন্তুষ্ট না হয়ে সে জানতে চায়, ‘টেল মি দ্যা ট্রুথ- দেশে কি তুমি কোন টান রেখে এসেছো? কেউ কি ভালোবাসে তোমাকে?’ এবারও অকপটে সত্যি বলতে কোন দ্বিধা হয় না, ‘অ্যাবসোলিউটলি নট, বিলিভ মি স্কারলেট… দেশেও আমার সময় কাটতো মূলত একা, আর যাদের সাথে ঘুরে বেড়াতাম, কখনো বা আড্ডায় বসতাম, তারাও যে আমাকে পছন্দ করে খুব, তা মনে হয়নি। ব্যাক হোম, আই ওয়াজ বেসিক্যালি আ লৌনার অল অ্যালং।’ কিছুক্ষণ আমার মুখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে সে এবার প্রশ্ন করে, ‘সো হোয়াই ইউ ওয়ান্ট টু গো ব্যাক? থাকো না কিছুদিন এদেশে।’ এ প্রশ্নের জবাব দেয়া আমার পক্ষে সহজ হয় না। তবে ম্রিয়মান ভঙ্গিতে আমি প্রশ্ন তুলি, ‘বাট, হোয়াট ডু আই ডু হিয়ার? এখানে থেকেই বা কি করবো স্কারলেট?’ আমার দিকে তাকিয়ে মৌন হয়ে কী যেন ভাবে সে, তারপর আমাদের চলমান সংলাপটি শেষ না করে উঠে দাঁড়িয়ে সে বিকিনি থেকে ঝেড়ে বালু ঝরায়। ভ্রুকুটি করে হাত বাড়িয়ে দিয়ে আমাকে সৈকত থেকে টেনে তোলে। তারপর আমরা হাঁটতে যাই ঊর্মিমুখর লোনা জলের প্রান্তে।
কেইপকডের এ সৈকতে ঊর্মিমালায় জোর কম। পাড় ভাঙে না একেবারে। খানিক দূরে দরিয়ায় ভাসা দু’তিনটি খুব ছোট আকারের প্রাইভেট দ্বীপ। তার পাশ দিয়ে পাল তুলে ভেসে যায় বেশ কয়েকখানা শৌখিন বোট। মাথার উপর গাংচিলের উড্ডয়ন রেখার দিকে তাকিয়ে আমরা হাঁটুজলে নেমে আস্তে আস্তে শিলাপাথরে তৈরি বাঁধের দিকে হাঁটি।
স্কারলেট ভাসমান কিছু ফেনা হাতের মুঠোয় নিয়ে জানতে চায়, ‘বাই অ্যানি চান্স ক্যান ইউ নট ওয়ার্ক হিয়ার?’ জবাবে আমি পাল্টা প্রশ্ন তুলি, ‘কিন্তু কি কাজ করবো স্কারলেট? আমি তো কাজবাজ বিশেষ জানিও না।’ মৃদু হেসে ভরসা দেয়ার ভঙ্গিতে সে রেসপন্স করে, ‘তুমি চাইলে হর্স ফার্মে কাজ করতে পারো, খামারের বেড়াগুড়া মেরামতের কাজ? বিক্রি করতে পারো মুভি থিয়েটারের টিকিট? তুলতে পারো ঝুড়ি ভরে অপেল, তারাও পারিশ্রমিক কিন্তু খারাপ দেয় না।’ প্রস্তাবিত কাজগুলোর ধরন শুনে আমি রীতিমতো নার্ভাসবোধ করে খুব নিরুৎসাহিত জবানে বলি, ‘আই ডোন্ট থিং আই ক্যান ডু অ্যানি অব দিজ জবস। আমি কোন কাজই ভালোভাবে করতে পারি না। আই অ্যাম সিম্পলি নট গুড অ্যাট এনিথিং। আমাকে দিয়ে কিছুই হবে না। দ্যাটস অল আই উড সে আবাউট দ্যা জবস ইউ মেনশন্ড।’
স্কারলেট এবার হতাশ হয়ে আমাকে টেনে নিয়ে বালুতে বসায়। তারপর সৈকতে লেপ্টে পড়ে থাকা তারা মাছের চারপাশে আঙুল দিয়ে নকশা আঁকতে আঁকতে বলে, ‘লুক, আই অ্যাম গেটিং অ্যা লিটল টায়ার্ড অব ইউ। তুমি আমাকে খুব অধৈর্য করে দিচ্ছো কিন্তু। জাস্ট টেল মি ওয়ান থিং ইউ ক্যান ডু।’ আমি মৃদু হেসে জবাব দেই, ‘রাইটিং, চাইলে আমি একটু-আধটু লিখতে পারি। দ্যাটস অল।’ শুনে অভিব্যক্তিতে রহস্য ফুটিয়ে সে জানতে চায়, ‘ক্যান ইউ রাইট আবাউট মি? আমাকে নিয়ে লিখতে পারবে না?’ বলেই সে কৌতূহলি দৃষ্টিতে আমাকে বিদ্ধ করলে, আমি তার স্তন-বিভাজনে শুকিয়ে লেগে থাকা নোনা জলের ফেনার দিকে তাকিয়ে জবাব দেই, ‘আমি তোমার শরীরকে এমনভাবে আঁকতে পারবো, যারা পড়বে তারা কিন্তু শুনতে পাবে নাচের ছন্দ, আর দমকা হাওয়ায় ভেসে আসা লোনা জলের ঘ্রাণের মতো তাদের কেউ কেউ পাবে তোমার দেহের ফ্লোরাল সৌরভ।’ আমার এই সো-কল্ড পোয়েটিক স্টেটমেন্টে স্কারলেট ইমপ্রেসড্ হয় না একবিন্দু, সে মৃদু হেসে জানতে চায়, ‘ইজ দ্যাট অল?’ জবাবে আমি আরেকটু যোগ করি, ‘নো, দেয়ার ইজ অ্যা লিটল মোর টু ইট, না এটাই যথেষ্ট নয়, আই অ্যাম টেলিং ইউ… আরেকটু আছে…।’ অধৈর্য হয়ে স্কারলেট জানতে চায়, ‘হোয়াট ইজ দ্যাট?’ আমি এবার তার চোখে চোখ রেখে প্রত্যক্ষভাবে বলি, ‘প্লিজ ওপেন ইয়োর হার্ট স্কারলেট, এই যে মাঝে মাঝে একা নিখোঁজ হয়ে যাও, তোমার চোখের পাপড়ির নিচে জমে ওঠে বিষন্নতা, তুমি ঠিক যেভাবে খুব নীরবে সাফার করো… আমার ডেসক্রিপশন যারা পড়বে তাদের মধ্যে আমি তোমার সাফারিংজনিত সহমর্মিতাকে সংক্রামিত করে দেবো। বিলিভ মি, আই নো আই ক্যান ডু ইট।’
গাছের বাঁকানো কাণ্ডে বসে থাকা কাঠবিড়ালি
কিছুক্ষণ নীরবে নিচু হয়ে বালির দিকে তাকিয়ে থেকে স্কারলেট আবার চোখ তুলে বলে, ‘ডিড আই নট ওপেন মাই হার্ট?’ জবাবে আমি কিছু বলি না, তবে গভীরভাবে তাকে অবলোকন করি, তার সৌরভ ছড়ানো মুখখানা যেন ফুলের মতো আমার চোখের সামনে ফুটে ওঠে। মিনিয়েচার পেইনটিংয়ে যেমন মোগল শাহজাদা শুঁকেন গোলাপ, এরকম ভঙ্গিতে আমি তাকে টেনে আনি কাছে। তারপর আমরা নীরবে হেঁটে যাই সৈকত ছেড়ে ইনল্যান্ডের দিকে। এদিকে দীর্ঘ ঘাসের সবুজ কেটে বয়ে যাচ্ছে স্রোতহীন জলধারার সংকীর্ণ এক নদী। কয়েক জাতীয় নৌকায় চড়ে বৈঠা ফেলে ভেসে যায় দুজন অপরিচিত মানুষ।
টিপি সংলগ্ন বনানীর বোল্ডারটি থেকে আমি নেমে পড়ি। বেফজুল দিবাস্বপ্নে সময় কেটে যাচ্ছে, কিন্তু স্কারলেটকে যে এ মুহূর্তে না পেলেই নয়। কি যে করবো ঠিক বুঝতে পারি না। ঠিক তখনই একটি গাছের পাতা দুলিয়ে আবডালে লুকায় ধূসর ডানার লেজঝুলা একটি পাখি। আর কোথা থেকে যেন ভেসে আসে শীস দিয়ে ভাজা গানের কলি। তার এ স্বভাবের সাথে আমি ইদানিং পরিচিত হয়েছি। তাই সুরের উৎসের তালাশ করি। বেশীদূর যেতে হয় না আমাকে। অল্প দূরেই সে বসে আছে আরেকটি বোল্ডারে। হাতে তার খোলা হেনরী মিলারের বই। পৃষ্টায় দু’টি ছত্র হাইলাইট করা; তাতে লেখা, ‘ দ্যা ওয়ান থিং উই নেভার ক্যান গেট এনাফ ইজ লাভ। এন্ড ওয়ান থিং উই নেভার ক্যান গিভ এনাফ ইজ লাভ।’ এ বোল্ডারের উপরিভাগে গাছপালার পত্রালিতে ফিল্টার হয়ে খেলছে আলোছায়া; তার আভায় দেখি স্কারলেটের চোখের পাতা ভরে আছে তরতাজা শিশিরে। হাত ধরে আমি তাকে বোল্ডার থেকে নামিয়ে আনি।
 এ জঙ্গলের ঘোছগাছ স্কারলেটের খুব ভালো করে জানা। শুকতারার ভাড়া দেয়া টিপিতে থেকে সে আগেও কয়েকবার মাউন্ট রেনেয়ারে হাইক করেছে। আমরা হাত ধরাধরি করে ঝরাপাতা মচমচিয়ে চলে আসি আরেকটি খোলামেলা ওপেনিংয়ে। এখানে রাখা শুকতারার সাদা রঙের ট্রেইলার। চাকাওয়ালা গাড়ির মতো দেখতে দু’কামরার ট্রেইলারে তার ঘরকন্না,তাবৎ সংসার। ট্রেইলারের সামনে পাতা কয়েকটি গাছের কাটা গুড়ি। তার একটিতে রাখা মেটে নীলাভ রঙের কয়েকটি ছোট্ট ছোট্ট পাথর। প্রতিটি পাথরে প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় খোদাই করা গর্ত। আমাদের গাছের গুড়িতে বসতে বলে শুকতারা বাটি কাত করে পাথরের গর্তগুলোতে ঢালেন পানি।
আমি বেজায় কৌতূহলি হয়ে পাথরে পানি ঢালা দেখছি, বোধ করি তাই তিনি বলে ওঠেন,‘অলরাইট, আই উইল টেল ইউ দ্যা স্টোরি বিহাউন্ড দিজ স্টোনস। নিসকোয়ালি গোত্রের মানুষজন কিন্তু আজ অব্দি আমেরিকার হোয়াইটম্যানদের ঠিক বিশ্বাস করতে পারে না। তার কারণও আছে। অই যে আমি কিশোরী বয়সে হোয়াইটম্যানদের স্কুলে পড়ালেখা করতে গেলাম, তারপর আই ডেট উইথ হোয়াইট বয়েজ, একজনের সাথে আমি লিভ টুগেদার করলাম, আমার পেরেন্টসরা কিন্তু তা পছন্দ করেন নি।’
এই পর্যন্ত বলে দীর্ঘশ্বাস ফেলে শুকতারা বাটি থেকে তলানির জল ফোঁটায় ফোঁটায় নিজিয়ে তার চুলে ঢেলে বসে পড়েন গাছের অন্য একটি গুড়িতে। পুরো কাহিনী শুনতে চাইলে তিনি বলেন,‘ও ওয়েল, এই যে আমি পর্যটক- যাদের অনেকেই হোয়াইটম্যান, তাদের নিয়ে মাউন্ট রেনেয়ারে হাইক করতে যাই; নিসকোয়ালি গোত্রের মুরব্বীরা চান না শ্বেতাঙ্গ মানুষরা তাদের গ্রাম তথা রিজারভেশনে ঢুকুক। নিসকোয়ালিদের কালচার খুবই ভিন্ন, তারা চায় না তাদের সংস্কৃতি পলিউটেড হোক শ্বেতাঙ্গদের আচার বিচারে। এসব কনফ্লিক্টের কারণে আমি আর আজকাল আমার পিতামাতার পরিবারের সাথে বসবাস না করে রিজারভেশনের পাশে ছোট্ট এক চিলতে বনানী লিজ নিয়ে এখানে বাস করছি। হাইকিংওয়ালাদের হেল্প করার জন্য আমি ছোট্ট একটি ব্যবসাও করছি।’
 শুকতারা এবার উঠে গিয়ে এক ঝুড়ি শাকপাতা ও কাঁচি নিয়ে ফিরে আসেন। তিনি শাকপাতা কুচিকুচি করে কাটতে কাটতে বলেন,‘এ পাথরগুলো আমি কালেক্ট করেছি মাউন্ট রেনেয়ারে হাইক করার সময়। এরা সকলে আমার পরিবার তথাÑমা-বাবা-ভাই-বোন-দাদী ও খেশকুটুমদের প্রতীক। তাদের হৃদয় পাষাণ হয়ে গেছে। তারা আজকাল আর আমার সাথে দেখাসাক্ষাৎ করতেও আসেন না। আমি প্রতিদিন এ পাথরের হৃদয়ে একটু একটু করে জল ঢালি,যাতে তাদের স্নেহ সম্পূর্ণ রূপে শুকিয়ে না যায়।’ শুকতারা এবার আমার দিকে তাকিয়ে ‘বয়, ইউ মেড মি ক্রাই,’ বলে চোখ মুছেন। স্কারলেট উঠে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে।
কেইপকডের নদীতে দুটি কায়াক
শুকতারা নিজেকে সামলিয়ে কাটা শাকপাতার ঝুড়ি হাতে উঠে দাঁড়িয়ে বলেন,‘ চল, তোমাদের এ জংগলের বাসিন্দা আরেকটি কাপোলের সাথে পরিচয় করিয়ে দেই।’ একটু হেঁটেই আমরা চলে আসি রোদ জ্বলা খোলামেলা চত্তরে। ওখানে বিশাল এক গাছের নিচে ছানাপোনা নিয়ে লম্বা গলা বাড়িয়ে যেন অপেক্ষা করছে কানাডিয়ান গিজ্ নামে এক জোড়া বুনোহাঁস। শুকতারাকে দেখে ছানাগুলো চিঁউ চিঁউ করে তার কোলে উঠতে চায়। তিনি মাটিতে উবু হয়ে বসে বুনোহাঁসের পরিবারকে শাকপাতা খাওয়াতে খাওয়াতে তাদের ‘রোমিও ও জুলিয়েট’ বলে পরিচয় করিয়ে দেন। তারপর বুনোহাঁস পরিবারটির সঙ্গে তার সম্পর্ক গড়ে ওঠার গল্প বলেন।
মাউন্ট রেনেয়ারের যে দিকে পাথর কেটে বয়ে যাচ্ছে হোয়াইট রিভার,তার চরে গুলিতে ডানা ভেঙে পড়েছিল জুলিয়েট নামে মাদি-হাঁসটি। আর তার উপর চক্রাকারে উড়ে, আবার কখনো চরে নেমে পালকে চঞ্চু ঘঁষে বিলাপ করছিলো মদ্দা-হাঁস। শুকতারা আহত মাদি-হাঁসটিকে তুলে ট্রেইলারে নিয়ে আসলে মদ্দা-হাঁস তাকে ফলো করে চলে আসে ট্রেইলারে।
তিনি পশুপাখির ডাক্তার ডেকে মাদি-হাঁসের চিকিৎসা করান। তখন মদ্দা-হাঁসটি ট্রেইলারের পাশেই এক গাছে বাস করতে শুরু করে। একে অপরের প্রতি টান দেখে তিনি তাদের নাম দেন রোমিও ও জুলিয়েট। সার্জারিতে জুলিয়েট সেরে উঠলেও সে আর তেমন একটা উড়তে পারে না।
শীত ঋতুতে তাদের পরিযায়ী হওয়ার কথা, কিন্তু জুলিয়েট উড়তে পারে না বলে ট্রেইলারেই তাকে বাসা তৈরী করে দেয়া হয়। রোমিও দিন দুয়েক উড়ে পরে ফিরে আসে ট্রেইলারে জুলিয়েটের বাসায়। তারপর গেল বসন্তে তাদের খোকাখুকু হয়েছে। এ বনানীতে মনে হয় তারা এখন থিতু হচ্ছে ।
অতঃপর শুকতারা বনানীর প্রান্তে যেখানে হরিণ জল খেতে আসে এরকম ছোট্ট এক জলাভূমি দেখাতে নিয়ে যান। তার পিছন পিছন হাঁটে বুনোহাঁসের পুরো পরিবার। জলা জায়গায় বারো চৌদ্ধ ফুট উঁচু হয়ে জন্মেছে এক ধরনের ঘাস। তাদের ছায়ায় ঝোপে ঝোপে ফলেছে থোকা থোকা বø্যাকবেরী। ছানাদের চিঁউ মিঁউয়ে বিরক্ত হয়ে শুকতারা সকলকে তার ঝুড়িতে তুলে নেন। স্কারলেট কাঁটা বাঁচিয়ে সাবধানে বø্যাকবেরী তুলতে তুলতে চলে যায় দীর্ঘ ঘাসের আবডালে। ওখান থেকে শীস কেটে ‘টু..কি’ বা ‘কাম এন্ড ফাইন্ড মি’ বলে আওয়াজ দিলে আমি তার খোঁজে ঘাস সরিয়ে জঙ্গলে ঢুকি। আমার পায়ের দু’দিকে গলায় সোনালি-সবুজ থলে ফুলিয়ে ডাকতে ডাকতে সরে যায় বেশ কয়েকটি হৃষ্টপুষ্ট ব্যাঙ। স্কারলেট মৃদু স্বরে ‘লুক এহেড’ বলে রহস্যময় ভঙ্গিতে তাকায়। আমি দু’পাশের বেজায় লম্বা ঘাস দু’হাতে চেপে নিচু করে দামসে সামনে তাকাই। দিগন্তে যেন মেঘের চালিতে চড়ে ভাসছে তুষারের তাবুদ- হেয়ার ইট ইজ..দ্যা মাউন্ট রেনেয়ার! তার হাশিয়ায় পাইনের সবুজ বন। শুকতারা ছানাপোনার চিঁউ মিঁউ সামলাতে সামলাতে পাহাড়ের দিকে মাথা ঝুঁকিয়ে নিসকোয়ালি ভাষায় বলেন,‘তালোল, তালোল বা গ্রেইট হোয়াইট মাউন্টেন।’ শুভ্র এ পর্বতের বুকের সবুজ বনানী চিরে সাদা ফেনায় প্রান্তর ভিজিয়ে আমাদের দিকে যেন ছুটে আসছে হোয়াইট রিভার।
[ক্রমশ]

পূর্ববর্তী পর্বের লিংক

http://www.teerandaz.com/%e0%a6%ae%e0%a6%88%e0%a6%a8%e0%a7%81%e0%a6%b8-%e0%a6%b8%e0%a7%81%e0%a6%b2%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%a8-%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%89%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%9f-%e0%a6%b0%e0%a7%87%e0%a6%a8%e0%a7%87-2/