মঈনুস সুলতান > মাউন্ট রেনেয়ার ও রত্নময় রঙধনুট্রাউট >> ভ্রমণ

0
205

মাউন্ট রেনেয়ারের ফুটহিলসে নেটিভ আমেরিকান নারীর সান্নিধ্য

“আজ ভোর পাঁচটা পয়তাল্লিশ মিনিটে নিউ ইংল্যান্ড থেকে ফ্লাই করে এসে স্কারলেট ও আমি সিয়াটল এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করেছি। লগেজ নিয়ে বাইরে বেরোতেই দেখি, বিমানবন্দরের উল্টা পাশে দিগন্তে শুভ্র স্বপ্নের মতো ভাসছে মাউন্ট রেনেয়ার নামে তুষার ছাওয়া আশ্চর্য এক পর্বত।”

পাখার ঝটপট আওয়াজে মনে হচ্ছিলো লংলার ষাড়েরগজ পাহাড়ের পাদদেশে রাঙিছড়া চা বাগান পাড়ি দিয়ে- টিলাটক্কর অতিক্রম করে চলে যাচ্ছি বনানীর গভীরে। তবে কি মাথার উপর দিয়ে উড়ে গেল সবুজে কমলালেবুর রঙ মেশানো একঝাঁক টিয়া? ঝাঁকুনিতে রাতজাগা ক্লান্তিজনিত চটকার ঘোর ভেঙে যায় সহসা। গাড়ির পেছনের সিটে এল্ক বলে এক ধরনের শিংগাল হরিণের পশমে বোনা কুশনে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। শেভ্রলে কোম্পানির ইম্পালা জাতীয় লাল রঙের গাড়িখানার বয়স তেত্রিশের কাছাকাছি। চলিষ্ণু হালতে এর ঢিলে হয়ে আসা পার্টসের জোড়ে জোড়ে কল্কঙ্ কল্কঙ্ আওয়াজ হয় বলে এর চালানেওয়ালি তাকে আদর করে ডাকেন কল্কঙকার । তার ছাদ থেকে ঝুলছে বর্ণাঢ্য সব পাখির লেজ ও ডানার গুচ্ছ গুচ্ছ পালক। তাদের পাখসাটে বোধকরি আধোঘুমে ফিরে এসেছিলো কৈশরে দেখা টিলার হাশিয়ায় টিয়াপাখির উড্ডয়নের স্মৃতি। ড্রাইভারের পাশের সিট থেকে গ্রীবা বাঁকিয়ে জোড়া ঠোঁটের বৃত্তে সম্ভাব্য চুমোর নকশা এঁকে স্কারলেট বলে ওঠে, ‘রাইজ এন্ড সাইন। লিসেন, একটু আগে আমরা ফোর্ট নিসকোয়ালি অতিক্রম করেছি… ইউ ওয়ার ডিপ ইন স্লিপ, তাই জাগাইনি। লুক অ্যাট দি উইন্ডো, কল্কঙকারটি এখন চলছে নিসকোয়ালি নেটিভ আমেরিকান ইন্ডিয়ান রিজারভেশনের ভেতর দিয়ে।’
মাস তিনেক হলো যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইংল্যান্ড অঞ্চলে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। সপ্তা কয়েক বাসও করেছি আমহার্স্ট বলে একটি ছোট্ট শহরের লাগোয়া এক নিবিড় উপবনে কাঠে তৈরি দেড় কামরার লগ কেবিনে। কাছাকাছি ঘরদুয়ার বলতে ছিলো দেড়শত বছরের পুরানো একটি চার্চের সাদা দালান। মাঝে মাঝে কেবিনের বারান্দায় বসে কফি পান করতে করতে শুনতে পেতাম, চার্চের ঘণ্টা-ধ্বনি মিশে যাচ্ছে অরণ্যের পাখপাখালির কলতানে। কাঠের এ ছোট্টমোট্ট লগ কেবিনটিতে কখনো একাকী, আবার কখনো স্কারলেটের সান্নিধ্যে বসবাস প্রিয় হয়ে উঠছিলো। কিন্তু এই নিরিবিলি কেবিনটি ছিলো দূর প্রবাসে আমার সস্তা সাময়িক নিবাস। কথা ছিলো আজ দেশে ফিরে যাবো। প্রস্তুত ছিলো কনফার্ম করা রিটার্ন টিকিট। কিন্তু এ মুহূর্তে আমি বসে আছি নিউ ইংল্যান্ড থেকে হাজার মাইল দূরে- সিয়াটল শহর ছাড়িয়ে মাউন্ট রেনেয়ার বলে এক পাহাড়ের পাদদেশে। নেটিভ আমেরিকান জনগোষ্ঠির নিসকোয়ালি সম্প্রদায়ের রিজারভেশনের ভেতর দিয়ে বৃক্ষপল্লবে ছায়াময় নুড়িপাথর ছড়ানো কাঁচা রাস্তায় ধুঁকে ধঁকে হেলেদুলে চলা বয়োবৃদ্ধ ফিফটি নাইন মডেলের এক লাল শেভ্রলে ইম্পালার ভেতর।
আজ ভোর পাঁচটা পয়তাল্লিশ মিনিটে নিউ ইংল্যান্ড থেকে ফ্লাই করে এসে স্কারলেট ও আমি সিয়াটল এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করেছি। লগেজ নিয়ে বাইরে বেরোতেই দেখি, বিমানবন্দরের উল্টা পাশে দিগন্তে শুভ্র স্বপ্নের মতো ভাসছে মাউন্ট রেনেয়ার নামে তুষার ছাওয়া আশ্চর্য এক পর্বত। তার দিকে গর্জন ছড়িয়ে উড়ে যায় একটি জেট-বিমান। কল্কঙকার নিয়ে আমাদের জন্য এয়ারপোর্টের পার্কিং-লটে যিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন, তার সঙ্গে কস্মিনকালে আমার দেখাসক্ষাৎ না হলেও টেরিসা নামের এ বিচিত্র মহিলা স্পষ্টত স্কারলেটের পূর্বপরিচিত।

আমার সাথে পরিচয় হতে না হতেই টেরিসা আমার দীর্ঘ চুল মুঠো করে ধরে বলেন, ‘আমার জন্ম বাংলাদেশে হলে আমি তো তোমার খেশকুটুমের কেউ একজন হতে পারতাম। সো, ডোন্ট বি শাই।

টেরিসার মৌচাকের মতো ঘন বুনটের চুলের প্রান্তে মিনিয়েচার টিকিতে গাঁথা ঈগল পাখির মাঝারি সাইজের একটি পালক। তার কব্জি ও ভারী স্তন জড়িয়ে ব্লাউজ থেকে আলগা হয়ে ঝুলছে ফিরোজা ও এমেথিস্ট পাথরের জড়োয়া গহনা। অচেনা মানুষকে আপন করে নিতে বোধ করি তার সময় লাগে না একটুও। আমার সাথে পরিচয় হতে না হতেই টেরিসা আমার দীর্ঘ চুল মুঠো করে ধরে বলেন, ‘আমার জন্ম বাংলাদেশে হলে আমি তো তোমার খেশকুটুমের কেউ একজন হতে পারতাম। সো, ডোন্ট বি শাই। অনেকক্ষণ ফ্লাই করে এসে নিশ্চয়ই তোমার খিদা লেগেছে’ বলে আমার হাতে কফির কাগজের কাপ ও ব্রাউন প্যাকেটে মোড়া মাফেনটি ধরিয়ে দেন। আমি কফিতে চুমুক দিতে যাই। তখন তিনি শেভ্রলে গাড়িটির বয়স, গোত্র ও তার ডাকনাম কল্কংকার প্রভৃতি তথ্য দিয়ে সিরিয়াসলি পরিচয় করিয়ে দেন ভিনটেজ যানবাহনটির সঙ্গে । আমি পেছনের সিটে জাঁকিয়ে বসতে বসতে জিঞ্জেস করি, ‘আপনি কি নেটিভ আমেরিকান গোত্রের, আমরা যাদেরকে রেড ইন্ডিয়ান বলি…?’ ‘ও হেল- ইয়েস… অফকোর্স, আই অ্যাম নেটিভ আমেরিকান, আমরা নিজেদের রেড ইন্ডিয়ান বলি না। আমার সম্প্রদায়ের নাম হচ্ছে নিসকোয়ালি। এ গোত্রের মোট জনসংখ্যা কাগজে-কলমে ৬৫১ জন। আমি তাদেরই একজন। ডু ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড হাউ লাকি ইউ আর? তুমি চাইলে এ মুহূর্তে একজন নিসকোয়ালি মহিলার অটোগ্রাফ কিংবা ইন্টারভিউ নিতে পারো।’আমি ব্যাকপ্যাক থেকে সত্যি সত্যি ইন্টারভিউ নেয়ার জন্য নোটপ্যাড ও কাগজ-কলম বের করি। তা দেখে তিনি জোরেশোরে হেসে উঠে বলেন, ‘নট নাউ, হ্যাং অন ম্যান। প্রথমে কল্কঙকারটি স্টার্ট করাই, দেন উই উইল টক।’

 

লবজটি উচ্চারণ করতে আমার গলায় রীতিমতো কাতুকুতু লাগে, তাই বলি, ‘এর বাংলা হচ্ছে শুকতারা। ইট ইজ অ্যা ভেরি পোয়েটিক নেইম টেরিসা, কনসেপ্টটা ধরতে আমার বিশেষ কোন অসুবিধা তো হচ্ছে না।’ তিনি জবাব দেন , ‘হু নোজ, তোমার বাংলা কালচারের সাথে আমাদের খানিক মিলমিশ থাকলেও থাকতে পারে।

খানিক যেন কেশে গ্রো গ্রো আওয়াজে হিক্কা তুলে কল্কঙকার থেমে গেলে টেরিসা বনেট তুলে ইঞ্জিনের নাটবল্টু মোরামুরি করেন। অবশেষে জিন্সের উপর দিয়ে পাছায় কালিঝুলি মুছে বেশ মশগতে শেভ্রলে স্টার্ট দিতেই আমি সাক্ষাৎকারের পয়লা সওয়ালটি ঠুকি, ‘হোয়াট ইজ ইয়োর ফুল নেইম টেরিসা? টাইটেলসহ কাইন্ডলি আমাকে বলুন।’টিকির পালক দুলিয়ে টেরিসা জবাব দেন, ‘ইনডিড অ্যা স্মার্ট কোয়েশ্চন। সারাদিন আমি আমার মা-কে গর্ভ-যন্ত্রণায় কষ্ট দিয়ে- যখন ঈভিনিং-স্টার কেবলমাত্র আকাশে আলো ছড়াতে শুরু করেছে, তখন বেরিয়ে এসেছিলাম পৃথিবীতে। নিসকোয়ালি গোত্রের শামান বা তুকতাকের ওঝা আমার নামকরণ করেন ঈভিনিং-স্টার । তবে একসময় আমি হোয়াইটম্যানদের ইস্কুলে একটু আধটু লেখাপড়া করেছি তো, শ্বেতাঙ্গ এক বয়ফ্রেন্ডও জুটেছিলো। স্যাড থিং ইজ দ্যাট, ওরা ঈভিনিং-স্টার নামের পেছনের গুঢ় প্রাকৃতিক কনসেপ্টটা ঠিক ধরতে পারতো না। ইস্কুলে পড়াশুনার জন্য চাই একটি মেইনস্ট্রিম নেইম। লাস্ট নেইম না হলে কাগজপত্র ফর্ম ফিলাপ করতে অসুবিধা হয়; তাই আমি আমার সে আমলের বয়ফ্রেন্ডের টাইটেল ব্লেয়ার জুড়ে দিয়ে হয়ে গেছি টেরিসা ব্লেয়ার।’এ পর্যন্ত বলে তিনি ঈভিনিং-স্টার শব্দটির নিসকোয়ালি প্রতিশব্দ উচ্চারণ করেন। আমি মনযোগ দিয়ে শুনি, কিন্তু নোটবুকে ঠুকতে অসুবিধা হয়। মনে হয়, তার ভাষায় স্বরবর্ণের ব্যবহার কম। লবজটি উচ্চারণ করতে আমার গলায় রীতিমতো কাতুকুতু লাগে, তাই বলি, ‘এর বাংলা হচ্ছে শুকতারা। ইট ইজ অ্যা ভেরি পোয়েটিক নেইম টেরিসা, কনসেপ্টটা ধরতে আমার বিশেষ কোন অসুবিধা তো হচ্ছে না।’ তিনি জবাব দেন , ‘হু নোজ, তোমার বাংলা কালচারের সাথে আমাদের খানিক মিলমিশ থাকলেও থাকতে পারে। উই উইল টক আবাউট দিস। নাউ উই আর হিয়ার। দিস ইজ প্রিসাইসলি দ্যা ফুটহিলস অব মাউন্ট রেনেয়ার। এন্ড লুক ম্যান, ইউ আর ভেরি মাচ ওয়েলকাম হিয়ার টু মাই প্লেস।’

নিউ ইংল্যান্ড থেকে এতো দূরে- সারারাত উড়ে, তিনবার তিনটি ভিন্ন ভিন্ন বিমানবন্দরে ফ্লাইট চেঞ্জ করে এখানে কোথায় আসলাম? কার সাথে আসলাম? স্কারলেট- সে কে? তার সাথে আমার সম্পর্কইবা কি? মাউন্ট রেনেয়ারে তার সঙ্গে হাইক করতে যাচ্ছি, তাকে কতোটা বিশ্বাস করা যায়?

একটু ঝাঁকি দিয়ে কল্কঙকারটি থেমে যেতেই আমরা গাড়ি থেকে নামি। স্কারলেটের কথাবার্তা থেকে বুঝতে পারি, আমরা সিয়াটল শহর থেকে প্রায় ৫৮ মাইল দূরে মাউন্ট রেনেয়ারের ফুটহিলসে চলে এসেছি। স্থানটির ধূসরে সবুজ মিশ্রিত আবহকে মনে হয়, ভিন্ন কোন গ্রহের শ্যামল বাতাবরণ। নিসকোয়ালি রিজারভেশনের প্রান্ত ঘেঁষে এখানকার বনানীতে শুকতারা বাস করেন। তিনি পেশা হিসাবে সামান্য পারিশ্রমিকের বিনিময়ে যারা মাউন্ট রেনেয়ারে হাইক করতে চায় তাদের গাইড হিসাবে সাহায্য করেন। তার কয়েক একরের নিজস্ব জঙ্গলে আছে গোটা চারেক টিপি বা নেটিভ আমেরিকান কেতার তাঁবু। হাইকিং করনেওয়ালারা এসব টিবি ভাড়া করতে পারেন, দু’চার দিন জিরিয়ে নিয়ে হাইকিংয়ের প্রস্তুতির জন্য।
আমাদের টিপিটির অবস্থান- জঙ্গল কেটে পয়পরিষ্কার করা একচিলতে ওপেনিংয়ে। বাদামি রঙের তাঁবুর নিচের দিকে পেষা বুনো ভেষজের গাঢ় রঙে ত্রিভুজের নকশা আঁকা। স্কারলেট গাড়ি থেকে টেনে নিয়ে আসে সিপ্লিংব্যাগ, বেডরোল, ব্যাকপ্যাক, ও ডাফোলব্যাগ ইত্যাদি। আমি টিপিতে ঢুকতে গেলে শুকতারা কাঁধে হাত দিয়ে বলেন, ‘গেস্ট ফ্রম ফার ফার ওয়ে ল্যান্ড, একটু অপেক্ষা করো ভাই, তোমাকে যে কুটুমখেশের মতো ওয়েলকাম করতে হয়।’স্কারলেট টিপির ভেতর ডাফোলব্যাগ খুলে জিনিসপত্র গোছাচ্ছে। শুকতারা চলে গেছেন গাছপালার ছায়ায় বনানীর গভীরে। আমি বিভ্রান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি টিপির সামনে। মাস তিনেক আগে আমি রওয়ানা হই বাংলাদেশের পৃথিমপাশা অঞ্চলের গনিপুর বলে একটি অজো পাড়াগাঁ থেকে। রাতের ট্রেনে ঢাকা আসতে প্রচণ্ড ভীড়ে স্লিপিংকারের করিডোরে বসেছিলাম স্যুটকেসের উপর। ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পেতে বেজায় ঝামেলা হয়েছিলো। আমি যে দেশ ছেড়ে ভিন্ন দেশে ঘুরতে যাচ্ছি, তা কাউকে বলে আসিনি। কুর্মিটোলা এয়ারপোর্টেও কেউ আসেনি আমাকে বিদায় দিতে। গেল মাস তিনেক আমার কেটেছে নিউ ইংল্যান্ডের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যে। দেশে পরিবারের সাথে একমাত্র যোগসূত্র যে টেলিফোন নাম্বার, তাও হারিয়েছি। চিঠি লিখতে ইচ্ছা হয়নি। আজ আমার দেশে ফিরে যাওয়ার কথা ছিলো। পিছনের ব্রীজ পুড়িয়ে দেয়ার মতো রিটার্ন টিকিটও নষ্ট হলো। নিউ ইংল্যান্ড থেকে এতো দূরে- সারারাত উড়ে, তিনবার তিনটি ভিন্ন ভিন্ন বিমানবন্দরে ফ্লাইট চেঞ্জ করে এখানে কোথায় আসলাম? কার সাথে আসলাম? স্কারলেট- সে কে? তার সাথে আমার সম্পর্কইবা কি? মাউন্ট রেনেয়ারে তার সঙ্গে হাইক করতে যাচ্ছি, তাকে কতোটা বিশ্বাস করা যায়? কাচের জানালায় প্রতিবিম্ব পড়া পাখির উড্ডয়ন রেখার মতো নানা ভাবনা করোটিতে ছায়া ফেলে। ঠিক ভরসা পাই না।
টিপি থেকে বেরিয়ে এসে চুপচাপ আমার কাঁধে হাত রাখে স্কারলেট। বোধকরি আমার ভেতরকার টেনশন ধরতে পেরে সে বলে ওঠে, ‘ম্যান, জাস্ট ট্রাই টু রিল্যাক্স, নাথিং টু বি ওয়ারিড আবাউট, উই আর গোয়িং টু হাইক টুগেদার, এন্ড ট্রাস্ট মি, লাইফ ইজ গোয়িং টু বি রিয়েলী ফান হিয়ার।’আমি চোখ তুলে তার দিকে তাকাই, সে জিন্স খুলে ফেলে কোমরে জড়িয়েছে ঘাস রঙের হাল্কা সিল্কের র‌্যাপার। কথা বলতে বলতে বারবার একগুচ্ছ কোঁকড়া চুল এসে পড়ছে তার চোখে। নিউ ইংল্যান্ডের এক রাইটার্স ওয়ার্কশপে তার সাথে দেখা হয় মাস খানেক আগে। ওয়ার্কশপের শেষ দিনে সে এসেছিলো বিকালের সেশনে। না লেখক নয় সে। নৃত্যশিল্পীর পরিচয় দিয়ে সে বসেছিলো আমার সেশনে। আমি বাংলা পাণ্ডুলিপি সামনে রেখে কায়ক্লেশে ইংরেজি তর্জমায় গল্প বলছিলাম। গল্প শুনতে শুনতে গলা থেকে পাথরের এক ইলাবরেট হার খুলে নিয়ে, তার চুল চূড়া করে বেঁধে মন্দিরের শীর্ষে রত্নচূড়ের মতো নেকলেসটি সে জড়িয়েছিলো। গল্প শেষ করতে করতে আমি ঊর্ধ্বমুখি জোড়া বাহুর দিকে তাকিয়ে খানিক অন্যমনষ্ক হয়ে ছিলাম। পড়া শেষ হলে পর সে রহস্যময় হেসে আমার পাণ্ডুলিপিটি দেখতে এগিয়ে এসেছিলো।
রাইটার্স ওয়ার্কশপে তাকে প্রফেশন্যাল ড্যান্সার হিসাবে ধরে নিয়ে আসা হয়েছিলো, সমাপনী অনুষ্ঠানে ডিনারের পর কবি সাহিত্যিকদের সমবেত নৃত্যের কোরিওগ্রাফ করে দেয়ার জন্য। রাত সাড়ে আটটার দিকে ককটেলের মাইফেল জমে উঠলে, সে অন্তর্বাসহীন গোলাপি গাউনে- চুলে নেকলেস ও ময়ূরের পালকের জোড়া ইয়ারিং গেঁথে সূচনা করেছিলো নৃত্যের। ‘কিক ইয়োর সুজ, মাই ডিয়ার মাদমোজেল অ্যান্ড মঁশিয়োজ’, বলে সে দু-খানা হাইহিল স্কার্ফে বেঁধে, তা ঘোড়ার মুখে জাবনার ঝুড়ির মতো লুবাতে লুবাতে সবাইকে নৃত্যে এনকারেজ করে। মিউজিকের রিদমে দোদুল্যমান তার শরীরের দিকে তাকিয়ে কাঁচাপাকা চুলের এক প্রৌঢ় কবি ড্যান্সিং ফ্লোর হিট করে আওয়াজ দেন, ‘হিয়ার সি গোজ, অল পিংক অ্যান্ড আই মাস্ট সে লাভলি লেগস্ ।’মিউজিক সুরতালে উতরোল হয়ে বাঁক নিতেই অন্যান্য লেখক-কবিও নাচে এক্সাইটেড হয়ে উঠেছিলো। না, ড্যান্সের দক্ষতা আমার ছিলো না , তাই হলরুম থেকে বেরিয়ে এসে দাঁড়িয়ে ছিলাম ঝুলবারান্দার উডেন ডেকে একাকী।

মূলত পাড়াগাঁয়ের বাঙ্গাল আমি, উইশ কালচারের সাথে তেমন একটা পরিচয় আমার নেই, তাই প্রার্থনার মতো নীরবে উচ্চারণ করি- যে কয়েকদিন এখানে থাকি, মাদুরে শুয়েবসে যেন রিল্যাক্স হালতে সময়টা কাটে।

মাঝরাতের দিকে ড্যান্সের তামাদি হয়। তখন ঘর্মাক্ত কলেবরে পূর্ণস্তনী স্কারলেট মার্টিনির গ্লাস হাতে এসে দাঁড়িয়েছিলো আমার পাশে। আমি ম্রিয়মান স্বরে ‘হাই দেয়ার‘বলে সিগ্রেট ধরালে সে ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলো, ‘সো, ইউ ডিডন্ট ড্যান্স, বাট ডু ইউ হ্যাভ এ বঙ উইথ ইউ?’ ‘বঙ’ নামক হিপি উপদ্রুত লবজের প্রতিশব্দ যে কল্কে বা ছিলিম- তা জানতাম, কিন্তু সাথে করে বঙ নিয়ে আমি ঘুরে বেড়াচ্ছি না। আমার নেতিবাচক জবাবে সে নিরুৎসাহিত না হয়ে বলে, ‘আই হ্যাভ সাম গ্রাস, উড ইউ লাইক টু শেয়ার অ্যা জয়েন্ট উইথ মি?’ তাতে উৎসাহিত হয়ে আমি ডেক ছেড়ে তার সঙ্গে নেমে আসি সবুজ ঘাসের চত্বরে। একটি ম্যাগনোলিয়া বৃক্ষের পুষ্পিত ছায়ায় ল্যাম্পপোস্ট থেকে বেশ দূরে দাঁড়িয়ে আমরা জয়েন্ট স্মোক করি। রোলিং পেপারে জড়ানো নেতিয়ে আসা আবগারি সিগ্রেটটির জলন্ত ছাই সামলিয়ে সে মন্তব্য করেছিলো, ‘তোমার পাণ্ডুলিপির হরফগুলো মনে হয় কোন মন্দিরগাত্রে অজানা ভাষায় লেখা সংকেতের মতো!’ আমি কীভাবে রেসপন্স করবো তা বুঝতে না পেরে নীরবে চোখ তুলে তাকিয়েছিলাম। তখন তার মেকাপহীন মুখে ছড়িয়েছিলো রহস্যময় স্মিত হাসি, আর সবুজাভ চোখেও নেমে এসেছিলো কোঁকড়া চুলের গুচ্ছ। আমি তা সরিয়ে দিলে সে-ই উদ্যোগ নিয়ে আরেকটু কাছে আসে। আমরা অন্তরঙ্গ হই, তখনই অসাবধানে বেরিয়ে আসা পানজেন্ট ধোঁয়ায় আবছা হয়ে উঠেছিলো তার চোখমুখ।
তারপর থেকে অফকোর্স তার সাথে গড়ে উঠেছিলো একধরনের অন্তরঙ্গ যোগাযোগ। দেখা-সাক্ষাৎ হচ্ছিল হরহামেশা, আমরা নিত্যদিন লিপ্ত হচ্ছিলাম নানাবিধ সামাজিক সহবতে। এ পারস্পরিক যোগসূত্রকে কি গভীর কোন সম্পর্ক বলা যায়?
স্কারলেট আমার শার্টের বোতাম খুলে দিতে দিতে উদ্বেগ লাঘবের উদ্যোগ নেয়। খুব গুছিয়ে থটফুল ভঙ্গিতে সে বলে, ‘আই আন্ডারস্ট্যান্ড ইউ রিপ্রেজেন্ট অ্যা টোটালি ডিফরেন্ট কালচার, আই অলসো নো ইউ কেইম ফার এওয়ে, অ্যাট দিস মোমেন্ট, ইউ আর অ্যা লিটল ডিসওরিয়েন্টেড। আমরা এখন বনানীতে এসেছি। এনজয় দ্যা সাইলেন্স অব দি ফরেস্ট এন্ড জাস্ট লুক অ্যাট দ্যা কালার অব দিস প্লান্ট।’তার কথায় আমরা টিপির সামনে যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, তার উল্টা দিকে তাকাই। দেখি, অসাধারণ একটি বৃক্ষ, গাছটির অজস্র পত্রালিতে জ্বলে উঠেছে তীব্র লোহিত বিভা। বর্ণাঢ্য এই পত্রসম্ভার অতিক্রম করে অজান্তে লাগোয়া বনানীর দিকে চলে যায় আমার দৃষ্টি। দেখি, দীঘল সব একবগে পাইন গাছের স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে আছে নীলাভ আসমানের মেঘভাসা এক শামিয়ানা।
আমাদের এই প্রকৃতি পর্যবেক্ষণের নীরবতার ভেতর ঝরাপাতা মাড়িয়ে হুড়মুড় করে সামনে এসে দাঁড়ান শুকতারা। তিনি বয়ে নিয়ে এসেছেন মস্ত এক ঝুড়ি, ঘাসে বোনা চাটাই ও মাটির ভাণ্ডে ধুপদা। মেলে দিতে দিতে শুকতারা জানান যে- চাটাইটি তিনি নিজে বুনেছেন। এই ওয়েলকাম ম্যাট বিছিয়ে দিয়ে তিনি আমাকে তার নিজস্ব বনানীতে স্বাগতম জানাতে চান। আমি স্কারলেটের ইশারায় চাটাইয়ে খালি পা রেখে মাঝখানে দাঁড়াই। সে গ্রীবা বাড়িয়ে ফিসফিসিয়ে আমাকে মনে মনে উইশ করতে বলে। মূলত পাড়াগাঁয়ের বাঙ্গাল আমি, উইশ কালচারের সাথে তেমন একটা পরিচয় আমার নেই, তাই প্রার্থনার মতো নীরবে উচ্চারণ করি- যে কয়েকদিন এখানে থাকি, মাদুরে শুয়েবসে যেন রিল্যাক্স হালতে সময়টা কাটে। শুকতারা ধুপদানির অঙ্গার জ্বালান। তিনি পাখির পালকের পাখা দিয়ে উত্থিত ধোঁয়া আমার দিকে বাতাস করতে করতে নিসকোয়ালি ভাষায় মন্ত্র পড়েন। অতঃপর আমার শরীরে বেজোলের সুরভিত পাতা, তামাক ও সিডার উডের গুঁড়া ছড়িয়ে দেন। তার মন্ত্রের কোন কিছু যে আমি বুঝতে পারছি না- সেদিকে খেয়াল হলে তিনি ফিসফিস করে ইংরেজিতে বলেন, ‘যিনি সৃষ্টি করেছেন বৃক্ষ, পাথর, ডানা ছড়ানো হাঁস ও রূপালি জল- জাস্ট থিংক অ্যাবাউট দিস হৌল প্রসেস অব ক্রিয়েশন, তিনিই তো জন্ম দিয়েছেন তোমাকে ও আমাকে দুই দূর দেশে, আমরা যেহেতু কাছে এসেছি, আমাদের ভেতর দূরত্ব রাখা কি ঠিক হবে? … ম্যান ফ্রম ফার ফার ল্যান্ড, কাম ক্লোজ টু মি, কাছে আসো হে দূরদেশ থেকে আসা মানুষ’, বলে তিনি তার দুটি হাত বাড়িয়ে দিলে আমি শুকতারাকে আলিঙ্গন করি। এতে তার মুখে ফুটে ওঠে অমলিন হাসি, ফিসফিসিয়ে ফের তিনি বলেন ‘দ্যাটস এ গুড বয়, রিমেমবার, ফ্রম নাউ উই আর লাইক রিলেটিভস্।’
ওয়েলকামের রিচ্যুয়েল শেষ হলে পর স্কারলেট আমার হাত ধরে উচ্ছল হয়ে বলে, ‘ইভনিং ইজ সো ওয়ার্ম অ্যান্ড ওয়েলকামিং, কামঅন ম্যান, লেটস্ গো টু দি ফরেস্ট।’ আমার ক্লান্ত লাগে তাই উৎসাহ পাই না। শুকতারা এগিয়ে এসে তাকে বলেন, ‘দ্যা বয় লুক টায়ার্ড।’অতঃপর তিনি টিপিতে ঢুকে ঝুড়ি থেকে বের করে মেঝেতে শুকনা ঘাসপাতা বিছিয়ে দিয়ে স্কারলেটকে স্লিপিংব্যাগ পাততে সাহায্য করে বলেন, ‘ইউ বোথ নিড অ্যা লিটল রেস্ট, ফরেস্ট ইজ রাইট হিয়ার, ইউ মে এক্সপ্লোর ইট লেটার।’শুকতারা টিপি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগে দুহাত তুলে ওয়েভ করতে করতে মন্ত্রের মতো উচ্চারণ করেন, ‘ডো ডাহডো গো না হা হি।’আমি অবাক হয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে আছি বুঝতে পেরে তিনি ইংরেজিতে বলেন, ‘দিস মিনস … সি ইউ এগেইন।’আমার অবাক হওয়া আমলে এনে স্কারলেট ফিক করে হেসে বলে, ‘ডোন্ট বি ডাম্ব, নেটিভ আমেরিকানরা এভাবে গুডবাই বলে, অলরাইট।’আমি মাথা ঝাঁকিয়ে বেডরোলে হেলান দিয়ে রিল্যাক্স হই। স্কারলেট আধশোয়া হয়ে কাছে আসে। আমরা পরস্পরের দিকে তাকাই। বনানীর নীরবতা ভরে উঠে পাখির কলকাকলীতে।

[চলবে]