মঈনুস সুলতান > রায়শ্রী গ্রামের নতুন গন্তব্যে >> ছোটগল্প

0
366
Joydeep chottopadhaya

মঈনুস সুলতান > রায়শ্রী গ্রামের নতুন গন্তব্যে >> ছোটগল্প

 

হারমনিয়ামের আওয়াজ কিছুক্ষণ পর বন্ধ হয়ে গেলে বৃষ্টিপাতে ভিজে যাওয়া মাটির মতো সেলিমের মন আর্দ্র হয়ে আসে। শীত কমে গিয়ে মাত্র বসন্ত এসেছে। বাড়ির দেয়ালের কাছে ফুটেছে সালাম বরকতের রক্তের মতো ডগমগে লাল পলাশ। তার ডালে বসে পাপড়িতে ঠোঁট ছোঁয়াচ্ছে ঝলমলে সবুজ রঙের একটি টিয়ে পাখি। সেলিমের ভেতরটা মনু নদীর তীরের বাউরি বাতাসের মতো উদাস হয়ে যেতে থাকে। তার মনে হয়- পার্টিটার্টি ছেড়ে কলেজে ভর্তি হয়ে বিএ পরীক্ষাটা সে পাশ করে নেয়। তারপর যাওয়া যায় ইউনিভারসিটিতে, বিসিএস দিয়ে চাকুরিবাকরিও ধরা যায়। সাথে সাথে বিবাহের সম্ভাবনা তার মস্তিষ্কে উঁকি দেয়।
কলেজ থেকে রিক্সায় ফিরে মনু ব্রিজের কাছে নামে সেলিম আজাদ। তারপর ফরেস্টাফিস রোড ধরে হেঁটে হেঁটে ছৈয়ারপুরের পেশকারবাড়িতে পৌঁছে। মৌলভিবাজার শহরের প্রান্তিকে হলেও ছৈয়ারপুর মনুনদীর পাড়ে নিরিবিলি একটি গ্রাম বিশেষ। সেলিমের মা-বাবার দেয়া আসল নাম মুরাদ আহমেদ। মুক্তিযুদ্ধের আমল থেকে সে পার্টির ক্যাডার হিসাবে কাজ করছে। মাস সাতেক সে সিলেট সদরের মদনমোহন কলেজে পড়াশোনা করে। তখন পার্টি থেকে তাকে দ্বায়িত্ব দেয়া হয় গোপনে কলেজ ছাত্রদের মধ্যে রেডগার্ড স্কোয়াড গড়ে তুলতে। অরগেনাইজার হিসাবে জেলা শহরে তার সফলতা প্রচুর। কিন্তু পরপর কয়েক রাত ওয়ালিং করতে গিয়ে ঝামেলার সূত্রপাত হয়। একরাতে ওয়ালিংয়ের পর দীর্ঘ সময় ধরে সে লাল কালিতে চেয়ারম্যান মাও সে তুঙের প্রতিকৃতি আঁকছিলো। তখন মুজিববাদী ছেলেরা তাকে ধাওয়া করে ঘিরে ফেলে। এদের হাতে রড ও চেইন ল্যাম্পপোস্টের আলোয় ঝিকিয়ে উঠলে জীবনে প্রথম সে রিভলবার থেকে গুলি ছোঁড়ে। তাতে পরিচিত ছেলে পারভেজের লাশ পড়ে যেতেই জিন্দাবাজারের গলিঘুজি পেরিয়ে সেলিম দ্রুত মিশে যায় অন্ধকারে।
আন্ডারগ্রাউন্ড হালতে মাস কয়েক সে কাটায় চুনারুঘাটে। কৃষকদের মাঝে জনযুদ্ধের প্রস্তুতি গড়ে তুলতে তুলতে সে পার্টির দেয়া সেলিম আজাদ নামটি আত্মস্থ করে নেয়। তারপর তাকে শ্রেণীশত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াকু চেতনা গড়ে তোলার অ্যাসাইনমেন্ট দিয়ে পাঠানো হয় ফেঞ্চুগঞ্জ এলাকায়। ওখানে জোতদার খতমের পর পুলিশি রেইডের তুলতবিলে গ্রামে বসবাস করা কঠিন হয়ে পড়লে পার্টি তাকে মৌলভিবাজারে পাঠায়।
মৌলভিবাজার শহরে সেলিমের জানাশোনা বিশেষ কেউ নেই। পার্টির সিমপেথাইজার ছেলেদের চেইন ধরে কলেজের বিএ ক্লাশের ছাত্রদের সাথে মিশে যেতে তার কোন সমস্যা হয় না। মাঝে মাঝে পার্টিসূত্রের জানাশোনা ছেলেদের হিল্লা ধরে সে কোন কোন ক্লাশের পেছন দিকে জিলকরা খাতা ও টিপকলম নিয়ে বসে। বাকি সময় সে ক্যান্টিনে কাটায়। এখানেও সেলিম ছাত্রদের মাঝে গোপনে গড়ে তুলছে রেডগার্ড স্কোয়াড। পয়লা তৎপরতা হিসাবে হপ্তাখানেক আগে তার উদ্যোগে শহরে ওয়ালিং হয়েছে। কোর্ট-কাছারি, মুন্সেফের বাসভবন থেকে কলেজের চুনকাম করা দেয়াল অব্দি সর্বত্র- তার হাতের লেখায় লাল রঙে জ্বলজ্বল করছে- ‘নকশালবাড়ির লাল আগুন দিকে দিকে জ্বরবে দ্বিগুণ।’ ওয়ালিংয়ের পর আজ সেলিম কলেজ ক্যান্টিনে একপাক ঘুরে আসলো। প্রতিক্রিয়া প্রচুর হচ্ছে, কিন্তু কেউ তাকে সন্দেহ করছে না। সিমপেথাইজার এক প্রফেসারের সাথে দেখা করে পার্টির লিটারেচার ‘লাল ঝাণ্ডা’ পত্রিকাটি সংগোপনে তার হাতে পাচার করতেই তিনি মৃদু হেসে মাসিক চাঁদার পনেরো টাকা তার হাতে ধরিয়ে দেন।
বাষট্টি ও উনসত্তরে গণআন্দোলন করা বাম মতাদর্শের সমর্থক এই প্রফেসার পেশকারবাড়িতে নিরাপদ শেল্টার হিসাবে তার বসবাসের বন্দোবস্ত করে দিয়েছেন। উদাস প্রকৃতির এই প্রফেসারের আরেকটি আচরণে তাঁর প্রতি সেলিমের শ্রদ্ধা আরো ঘনীভূত হয়েছে। ফেঞ্চুগঞ্জ থেকে রিট্রিট করে মৌলভীবাজারে এসে সে পয়লা রাত কাটায় এই অধ্যাপকের বাসায়। তিনি তাকে দাড়ি কামানোর জন্য রেজার-ব্লেড এসব দেন। পরদিন চিঠি লিখে পাঠান শহরের আর এন্ড এইচের এক কন্ট্রাকটারের কাছে। কনট্রাকটার সাহেব দর্জি দিয়ে তাকে দুটি প্যান্ট ও শার্ট বানিয়ে দিয়েছেন। এসব পরে প্রফেসারের বাসায় ধন্যবাদ দিতে গেলে তিনি তাকে একটি বাটার স্যান্ডেল-সু পরতে দেন। অনেকদিন পর পরিচ্ছন্ন পোশাক পরিচ্ছদ পরতে পেরে সেলিমের মাঝে এসেছে খানিকটা স্মার্টনেস। জিল করা খাতা ও টিপকলম পকেটে গুঁজে সে নিজেকে বিএ ক্লাশের ছাত্র ভাবতে শুরু করেছে।
পেশকারবাড়ির অবস্থান গ্রামের দিকে হওয়ায় সে নিরাপদবোধ করছে। এ বাড়ির আগের প্রজন্মের কোন এক মুরব্বী আদালতে পেশকার হিসাবে কাজ করতেন বলে ঢেউটিনের দোতালা বাড়িটি এ নামে পরিচিতি পেয়েছে। বাড়ির গৃহকর্তা জনাব বশির আহমেদও ছিলেন ঊনসত্তরের জেলখাটা বামপন্থী ছাত্রনেতা। মুক্তিযুদ্ধের সময় ওপার থেকে তিনি বিলাতে পাড়ি জমান। হালফিল বশির সাহেব লন্ডন থেকে হামেশা টাকাপয়সা পাঠাচ্ছেন বিধায় পরিবারটি আর্থিকভাবে সচ্ছল। বশির সাহেবের ছোটভাই কনফার্মড ব্যাচেলর জনাব কাওসর আহমেদও সেলিমের পরিচিত। কুলাউড়ার যে হাইস্কুল থেকে সেলিম এসএসসি পাশ করে- সেখানে একসময় কাওসর সাহেব শিক্ষকতা করতেন। তার গানের গলা চমৎকার; হারমনিয়াম, তবলা ছাড়াও তিনি বাঁশী বাজাতে পারেন। স্কুলে তিনি ছাত্রদের উৎসাহ দিয়ে নাটক করাতেন, এবং যাদের গলা আছে তাদের গানেরও তালিম দিতেন। ইনিও একসময় বামধারার রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন। বালক বয়সে সেলিম তাকে হাট-বাজার-গঞ্জে লাল ঝাণ্ডা উড়িয়ে হারমনিয়াম বাজিয়ে গণসঙ্গীত গাইতে দেখেছে। তাঁর উদাত্ত কণ্ঠস্বরে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গান- ‘কাস্তেতে দাও শান হে…’ এখনো সেলিমের কানে অনুরণন ছড়ায়। বর্তমানে কাওসর সাহেব রাজনীতির সাথে এক্টিভভাবে জড়িত নন। তিনি স্থানীয় হাইস্কুলে বাংলা পড়ান। পেশকারবাড়িতে বসবাসের কারণে সেলিমের সাথে হামেশা দেখাসাক্ষাৎ হয়। তিনি তাকে স্নেহ করেন। এ বাড়িতে তার বসবাসকে আরামদায়ক করার জন্য তিনি তাকে কিনে দিয়েছেন স্পঞ্জের স্যান্ডেল, ট্রুথব্রাশ ও গামছা।
পেশকারবাড়িতে ফিরে পেছনের পুকুরে হাতমুখ ধুয়ে সেলিম খেতে বসে। ডাইনিংরুমে ঢাকা দেয়া খাবারের ডিশ থেকে শরপোস সরিয়ে খেতে বসলে তুলিকা সিঁড়ি বেয়ে নেমে এসে তাকে অবলোকন করে। সে যে নখে বর্ণিল পালিশ পরেছে- বিষয়টি সেলিমের নজর এড়ায় না। বশির সাহেবের বড় মেয়ে তুলিকা কথা বলতে পারে না। তবে সে কানে শুনতে পায়। তার বয়স ষোল কিংবা সতেরো। ছিমছাম গড়নের এ কিশোরীর চোখ দুটিতে যেন প্রকৃতিকভাবে কাজল পরানো। কোন কারণে ভ্রুকুটি করলে তার আঁখি দুটি আরো ডাগর হয়ে ওঠে। আজ সেলিমের খিদা তেমন নেই, তাই তাড়াতাড়ি খাবার সেরে বেসিনে হাত ধুতে গেলে তুলিকা চোখের ইশারায় তাকে থামতে বলে। সে ছুটে গিয়ে রান্নাঘর থেকে নিয়ে আসে বাটিতে করে খানিকটা ঘরে পাতা দই। তার উপর চিনির গুড়া ছড়িয়ে দিতে দিতে গাঢ়ভাবে সেলিমের দিকে তাকালে- সে চোখ নামিয়ে চামচ দিয়ে দই খায়। তার পাঁজরের ভেতর একটি অলিক ঘুঘু যেন করুণ স্বরে ডেকে ওঠে। সেলিম তুলিকার চোখে চোখ রাখতে চায় না। কোন কিশোরীর প্রতি দুর্বলতা তার মতো বিপ্লবীর জীবনযাপনের সাথে ঠিক খাপ খায় না। সে দইয়ের খালি বাটিটি ঠেলে উঠতে গেলে গোঙানোর মতো অস্ফুট আওয়াজ করে তুলিকা তার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সে তার হাতে তুলে দিতে চায় এক চিমটে গুয়ামুরি। কিন্তু সেলিম তার বাড়ানো হাতকে অবজ্ঞা করে পর্দা ঠেলে বেরিয়ে আসে ডাইনিংরুম থেকে। তখনই তুলিকার আম্মা দোতালা থেকে জোর গলায় তাকে উপরে যেতে ডাকেন।
তুলিকার আম্মা, বশির সাহেব স্ত্রীর বছর দুয়েক আগে মারাত্মক রকমের স্ট্রোক হয়। তাতে তাঁর শরীরের একাংশ সম্পূর্ণ অবশ হয়ে গেছে। তুলিকা বোবা বলে স্কুল-টিস্কুলে যায় না। বাড়িতে বসে বসে সে মায়ের দেখভাল করে। আর সারাক্ষণ ট্রানজিসটার রেডিওতে আকাশবাণীর গান শোনে। মেয়েটি হারমনিয়ামও বাজাতে পারে। হারমনিয়ামে সুর তোলা সে শিখেছে তার ছোটকাকা কাওসর সাহেবের কাছ থেকে। চিরকুমার কাওসর সাহেবও এ বাড়ির একটি কামরায় বাস করেন। তিনি বেশ রাত করে বাড়ি ফেরেন। ভোরে উঠে হারমনিয়াম বাজিয়ে সুর তোলা তাঁর স্বভাব। কখনো মুড ভালো থাকলে তিনি তুলিকাকে ইশারায় স্বরলিপির বিষয়আশয় বুঝিয়ে দিয়ে নজরুলগীতির রেওয়াজ করান।
ডাইনিংরুম থেকে বেরিয়ে এসে সেলিম পুকুরের বাঁধানো ঘাটে বসে সিগ্রেট ধরায়। কচুরিপানার আবডাল থেকে বুঁজকুড়ি কেটে বেরিয়ে আসে একটি তেলাপিয়া মাছ। তখনই চোখের সামনে সাইকেলের চকচকে চেইন হাতে তেড়ে আসা পারভেজের মুখ সে পরিষ্কার দেখতে পায়। তার গুলিতে সড়কে পড়ে যাওয়া লাশের ছবি সে দিন তিনেক পর স্থানীয় সাপ্তাহিক পত্রিকা যুগভেরীতে দেখেছিলো। ছেলেটির সাথে সেলিমের ব্যক্তিগত কোন বিরোধ ছিলো না। বার কয়েক মদনমোহন কলেজের কেন্টিনে বসে চা খেতে খেতে পারভেজের সাথে সে আড্ডাও দিয়েছে। রিভলবারের গুলি না ছুঁড়ে গতরে চেইনের দু একটা বাড়ি নিলে কী এমন ক্ষতি হতো? এ চিন্তা মাথায় আসতেই সেলিম সতর্ক হয়। এ ধরনের দুর্বলতা তার মাঝে বাসা বাঁধলে কোনদিন সে সাচ্চা বিপ্লবী হতে পারবে না। তখনই দোতালার জানালা খুলে যায়। তুলিকা উঁকি দিয়ে তাকে একনজর দেখে পর্দা ফেলে দেয়। তারপর উপর থেকে ভেসে আসে হারমনিয়ামে রেওয়াজ করার আওয়াজ। সুরতরঙ্গকে নিয়ন্ত্রণে এনে তুলিকা মিহি করে বাজাচ্ছে- ‘কোথা চাঁদও আমার / ভুবনো ভরিয়া ঘিরিল আঁধার / কোথা…।’ এর নিবিড় ঝংকারে অলীক ঘুঘুটি আবার যেন ফিরে এসে তার বুকে প্রবলভাবে ডানা ঝাপটায়।
হারমনিয়ামের আওয়াজ কিছুক্ষণ পর বন্ধ হয়ে গেলে বৃষ্টিপাতে ভিজে যাওয়া মাটির মতো সেলিমের মন আর্দ্র হয়ে আসে। শীত কমে গিয়ে মাত্র বসন্ত এসেছে। বাড়ির দেয়ালের কাছে ফুটেছে সালাম বরকতের রক্তের মতো ডগমগে লাল পলাশ। তার ডালে বসে পাপড়িতে ঠোঁট ছোঁয়াচ্ছে ঝলমলে সবুজ রঙের একটি টিয়ে পাখি। সেলিমের ভেতরটা মনু নদীর তীরের বাউরি বাতাসের মতো উদাস হয়ে যেতে থাকে। তার মনে হয়- পার্টিটার্টি ছেড়ে কলেজে ভর্তি হয়ে বিএ পরীক্ষাটা সে পাশ করে নেয়। তারপর যাওয়া যায় ইউনিভারসিটিতে, বিসিএস দিয়ে চাকুরিবাকরিও ধরা যায়। সাথে সাথে বিবাহের সম্ভাবনা তার মস্তিষ্কে উঁকি দেয়। মানসচক্ষে তুলিকার কনে সাজা টিকলি পরা মুখ ভেসে উঠলে সাবধান হয় সেলিম। এসব অবান্তর কল্পনা যে মধ্যবিত্তসুলভ দোদুল্যমানতার আলামত, এ ব্যাপারে সে নিশ্চিত, তাই নিজেকে প্রবোধ দেয়- বুর্জোয়া শিক্ষা ব্যবস্থা তো আদতে কেরানি গড়ার কারখানা বিশেষ। কমরেড চারু মজুমদার এ শিক্ষা ব্যবস্থাকে রিজেক্ট করে মেহনতি মানুষের জীবনযাপন থেকে শিক্ষা নিতে নির্দেশনা দিয়েছেন। আর চেয়ারম্যোন মাও সে তুঙের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পয়লা সবক হচ্ছে- নিজের অভ্যন্তরে আগাছার মতো গজিয়ে ওঠা মধ্যবিত্তসুলভ প্রবণতাকে বিপ্লবী চেতনার নিড়ানি দিয়ে সবসময় উপড়ে পরিচ্ছন্ন্ রাখা। সেলিম পলাশের শোণিত ছলকানো গুচ্ছের দিকে তাকিয়ে একুশে ফ্রেব্রুয়ারির রাতে চাপলিশে পার্টির লিফলেট ছড়ানোর পরিকল্পনা করে। তার মধ্যে গোপন কিছু তৎপরতার সংকল্প দৃঢ় হয়ে দানা বাঁধলে সে আরেকটি সিগ্রেট ধরায়। তখন জানালায় ফের তুলিকা এসে দাঁড়ায়। বেলাশেষের মৃদু আলোয় তার মুখখানি মায়াবি হয়ে ওঠে। সাথে সাথে সেলিমের হৃৎমহলে অবাস্তব ঘুঘুটি করুণ স্বরে আর্তি ছড়ায়। তুলিকা গলা বাড়িয়ে তাকে কিছু বলার ভঙ্গি করে। সেলিম চোখ তুলে তাকাতেই ইশারায় তুলিকা তাকে সিগ্রেট খেতে বারণ করে।
কী কারণে জানি তার দারুণ অস্থির লাগে। তাই সে বাড়ির বাগানে এলোমেলো পায়চারী করে। যুগভেরী পত্রিকায় দেখা পারভেসের লাশের ছবি ফিরে আসে মনে। দুটি খোলা চোখ যেন নীরব দৃষ্টিতে তাকে বলছে- আমাদের মত ও পথ ভিন্ন হলেও তোমার সাথে তো আমার কোন দুশমনি ছিলো না, সেলিম। পার্টিটার্টি ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়া- গড়পড়তা আরো চার পাঁচটি ছেলেদের মতো কলেজের পড়ুয়া ছাত্র হওয়ার বিষয়টি লণ্ঠনের চিমনির দিকে ছুটে আসা আলোভুক পোকার মতো তার করোটিতে ঘুরপাক করে। সাথে সাথে সে দুটি বাস্তব সমস্যা সম্পর্কে সচেতন হয়। পার্টি ত্যাগ করলে প্রথমেই সে হারাবে পেশকারবাড়ির মতো একটি নিরাপদ শেল্টার। আর মাথার উপর হুলিয়া নিয়ে কোন কলেজে ভর্তিটর্তি হলেও বেশি দিন টিকতে পারবে না। পার্টির অন্যান্য কমরেডরা তার আচরণকে বেঈমানি বিবেচনা করে অ্যাকশনের উদ্যোগ নিলে তার জানের খতরা হওয়ারও সম্ভাবনা আছে।
একটু পর পায়চারি থামিয়ে সেলিম ড্রইংরুমে এসে ঢুকলে তুলিকা একপেয়ালা চা নিয়ে এসে তার সামনে রাখে। তখন সে দারুণভাবে চেষ্টা করে যাতে তার সাথে মেয়েটির চোখাচোখি না হয়। তুলিকা একটু সময় নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে হাত বাড়িয়ে তার শার্টের বোতাম লাগিয়ে দেয়। জুতার সুখতলায় ঘঁষে সিগ্রেটের জ্বলন্ত শেষাংশ মাড়ানোর মতো তীব্র ইচ্ছাশক্তিতে সেলিম একটি উষ্ণ বাসনাকে পিষে মারে। তার চোয়াল দৃঢ় হয়ে উঠলে সে দেখতে পায়- টলোমলো চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে তুলিকা। সেলিমের সাথে চোখাচোখি হতেই ওড়নার খুঁটে চোখ মুছে সে ফিরে যায় ডাইনিংরুমের দিকে।
কিছু একটা করতে না পারার তীব্র অতৃপ্তি নিয়ে সেলিম ফিরে যায় তার কামরায়। মন প্রশমিত করার জন্য সে মাও সে তুঙের সামরিক রচনাবলীর পৃষ্ঠা ওল্টায়। তার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে চাপে চ্যাপ্টা হয়ে আসা শুকনা একটি গোলাপ। সে যখন পেশকারবাড়িতে বাস করতে শুরু করে- মাস দুয়েক আগের কথা, ড্রইংরুমে সে বসে ছিলো একা। তুলিকা এসে তার দিকে চেয়ে ফিক করে হেসে ক্যাসেট প্লেয়ারের নব টিপে বাজিয়ে ছিলো চিন্ময় মুখার্জির রবীন্দ্রসংগীত। তারপর ক্যাসেটের প্লাস্টিকের খোল তুলে বুকের কাছে নিয়ে গিয়ে ইশারায় বলেছিলো যে- গান সে খুব ভালোবাসে। আর কানে আঙুল দিয়ে জানিয়েছিল, কথা বলতে না পারলেও শুনতে তার কোন অসুবিধা হয় না। মেয়েটির অভিব্যক্তির দিকে তাকিয়ে সেলিম নির্লিপ্ত থাকার চেষ্টা করলে তুলিকা ভ্রুকুটিতে অভিমান ছড়িয়ে ফিরে গিয়েছিলো ভিন্ন কামরায়। নিজের ওপর বিরক্ত হয়ে সেলিম অতঃপর ড্রইংরুম থেকে বেরিয়ে গাড়ি-বারান্দার অন্ধকার কোণে দাঁড়িয়ে ধরিয়েছিল সিগ্রেট। তখন অন্য দরোজা দিয়ে বেরিয়ে বাগান হয়ে হেঁটে এসে তুলিকা তার সিগ্রেটটি কেড়ে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে। সেলিম বিরক্ত হলে- তার হাত ছুঁয়ে চোখে অনুনয় ফুটিয়ে তুলে বুকপকেটে গোলাপটি রেখে নীরবে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গিয়েছিল ড্রইংরুমে।
সামরিক রচনাবলীর ভেতর চিড়েচ্যাপ্টা হওয়া শুকনা গোলাপটি শুঁকতেই ওই দিন ক্যাসেটে শোনা চিন্ময়ের গানের দুটি কলি তার ভেতর মহলে গুনগুনিয়ে ওঠে- ‘শুধু দূর থেকে তারে আমি সাধিব / গোপনে বিরহডোরে বাঁধিব।’ মনকে শান্ত করার জন্য সেলিম এবার সন্ত্রাসবাদী যুগের অনুশীলন দলের এক বিখ্যাত বিপ্লবীর লেখা পোকায়কাটা আত্মজৈবনিক বই তুলে পাতা ভেঙে মোড়া একটি পৃষ্ঠা ওল্টায়। কয়েকটি ছত্র পড়তে পড়তে সে টিপকলম দিয়ে আন্ডারলাইন করে – যেখানে বিপ্লবী এক কিশোরীর প্রতি তাঁর অনুরাগের কথা অকপটে লিখে মন্তব্য করেছেন, তাঁর ভালোবাসা উৎসর্গীকৃত হয়েছে দেশমাতৃকার প্রতি। এখানে একটি বালিকার রূপবিভ্রমে মতিচ্ছন্ন্ হওয়ার কোন অবকাশ নেই।
সন্ধ্যা একটু গাঢ় হতেই ড্রইংরুমে সেলিম পেশকারবাড়ির ছেলে দুটিকে পড়াতে বসায়। জাহিদ ও মজিদ বয়সে তুলিকার অনেক ছোট। বশির সাহেবের এ যমজ ছেলে দুটি ক্লাশ সিক্সে পড়ে। তাদের সরল অংক শেখাতে শেখাতে সেলিম খেয়াল করে- পর্দার ফাঁক দিয়ে তুলিকা তাকে অবলোকন করছে। তাতে তার মনযোগ বিঘ্নিত হয়। এই অবলোকনের ঘটনা হালফিল প্রায়ই ঘটছে। মাঝে মাঝে ছেলে দুটির পড়ানো শেষ হলে তুলিকা সুজির হালুয়া বা নুলডস্ নিয়ে তার কাছে আসে। আর টেবিল থেকে বইপত্র তুলে বুকের কাছে ধরে ইশারায়- তারও যে পড়তে ইচ্ছা হয় এ বিষয়টি সেলিমকে জানায়। তখন সেলিমের তুলিকাকে কাছে পেতে ভীষণ ইচ্ছা হয়। কিন্তু পার্টির ক্যাডার হিসাবে সে সচেতন যে, এসব ইমোশন বস্তুবাদী হওয়ার পেছনে অন্তরায় বিশেষ। এ মুহূর্তে পর্দার ফাঁক দিয়ে তুলিকার দৃষ্টিপাত তার মনে ছড়াচ্ছে মেঘলা দিনের আবহ। সেলিম মনযোগ দিতে পারে না। পড়ানো শেষ হলে তুলিকা চানাচুর ও কলা নিয়ে আসে। সে নাস্তার পিরিচ স্পর্শ না করে কামরা থেকে বেরিয়ে আসলে- পেছন থেকে তুলিকা গলায় বিচিত্র আওয়াজ তুলে প্রতিবাদ জানায়। পুকুরের ঘাটে বসে সেলিম সিগ্রেট ধরিয়ে ভাবে- বোবারা তো আজকাল সাইন ল্যাঙ্গুয়েজের মাধ্যমে পড়াশুনা করছে। বশির সাহেব বিলাতে ভালো উপার্জন করছেন। তিনি তুলিকাকে বোবাদের স্পেশাল স্কুলে পাঠিয়ে লেখাপড়া শেখাচ্ছেন না কেন?
দিন দুয়েকের জন্য সেলিমকে পার্টির কাজে যেতে হয় গোলাপগঞ্জের দিকে। সে স্যুটকেসে কাটা রাইফেল ও গ্রেনেড ক্যারি করে তা পৌঁছে দেয় গোলাপগঞ্জের একটি গুপ্ত ডেনে। তারপর ডিস্ট্রিক্ট কমিটির বর্ধিত সভা সেরে ফেরার পথে ডিসিপ্লিন ভেঙে সিলেট শহরের বন্দর বাজারে ঢুকে। কোথাও কোন প্রতিক্রিয়া হয় না। কেউ তার দিকে তেমন খেয়াল করেও তাকায় না। গানের দোকান থেকে সে কিনে নেয় ফিরোজা বেগমের গাওয়া নজরুলগীতির একটি ক্যাসেট। তুলিকাকে ক্যাসেটটি উপহার দেয়ার কথা ভাবতে ভাবতে দুপুরের বাসে চড়ে এসে নামে মৌলভিবাজারে। তারপর হেঁটে হেঁটে সে ফিরে যায় পেশকারবাড়িতে। ঘোরের ভেতর বাড়ির ড্রেইংরুমে ঢুকতে ঢুকতে সে কল্পনা করে- তুলিকা বেশ রাত করে জানালার পাশে বসে বাজাচ্ছে তার দেয়া উপহার। আর সে পুকুরের ঘাটলায় বসে বসে শুনছে ফিরোজা বেগমের গলায় গীত, ‘দূর দ্বীপবাসিনি…।’
ড্রইংরুমে ঢুকতেই তার সাথে দেখা হয় শহরের পরিচিত গফুর ডাক্তারের। বাড়িতে আজ প্রচুর অচেনা আত্মীয়স্বজন। তাকে দেখতে পেয়ে কাওসর সাহেব ছুটে এসে উদভ্রান্তের মতো জড়িয়ে ধরে কেঁদে ওঠেন হু হু করে। কী হয়েছে- পুরো বিষয়টি বুঝতে তার মিনিট দশেক সময় লাগে। মানসিক আঘাত পেয়ে নাসির সাহেবের স্ত্রীর শরীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি হয়েছে। গফুর ডাক্তার একটু আগে তাকে মর্ফিয়া ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়েছেন। কাওসর সাহেব আবার কপালে করাঘাত করে হাহাকার করেন। গান-বাজনা নিয়ে মশগুল হাসিখুশি মানুষটিকে বিভ্রান্ত দেখায়।
পেশকারবাড়ির এক কাজের লোকের কাছে সেলিম পুরো ঘটনাটি শোনে। আড়াই দিন আগে সে বাড়ি থেকে ভারী স্যুটকেসটি নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার পর তুলিকা পুকুরের ঘাটে বসে তার আম্মার পেইন কিলার ও স্লিপিং পিলের শিশি দুটির সবগুলো ট্যাবলেট একসাথে পানি দিয়ে গিলে ফেলে। তারপর ঘোরের ভেতর সে নেমে যায় পুকুরের জলে। কয়েক ঘণ্টা পর তার ভাসমান লাশ জাহেদ ও মজিদের চোখে পড়ে।
মরা-বাড়িতে জড়ো হওয়া আত্মীস্বজনদের কেউ কেউ সেলিমের পরিচয় জানতে চাচ্ছেন। ড্রইংরুমের কোণায় জায়নামাজ পেতে একজন মৌলভি গোছের কুটুম মৃদুস্বরে পাঠ করছেন সুরা আর-রাহমান। কাজের মানুষটি পেয়ালা-পিরিচ গোছাতে গোছাতে ‘হায় আল্লা মাবুদ’ বলে হাহাকার করে উঠলে কাওসর সাহেব তাকে চুপ করতে বলেন। তিনি দোতালার দিকে ইশারা করে জানান যে, তুলিকার আম্মাকে কেবলমাত্র ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পাড়ানো হয়েছে। যমজ ছেলে দুটি- জাহিদ ও মজিদ সেলিমের কাছে এসে তার দিকে নীরব দৃষ্টিতে তাকালে- একধরনের অপ্রাপ্তি ও দ্বায়িত্ব পালন করতে না পারার ব্যর্থতা তার মস্তিষ্কে মিলেমিশে বিভ্রান্তি ছড়ায়।
পেশকারবাড়ি থেকে বেরোতেই পার্টির একটি চেনা ছেলে সাইকেল চড়ে ল্যাম্পপোস্টের কাছে এসে থামে। সে হুঁশিয়ারির সাথে চারদিকে তাকিয়ে কোথাও কোন মানুষজন আছে কী না- তা নিরিখ করে। তারপর আলগোছে সেলিমের হাতে পার্টির এক নেতৃস্থানীয় কমরেডের লেখা চিঠি ধরিয়ে দিয়ে কোন কথাবার্তা না বলে প্যাডেল মেরে চলে যায়। সেলিমের তখনই নির্দেশনা দেয়া চিঠিটি পড়তে ইচ্ছা হয় না। সে খিন্ন মনে ফরেস্টাফিস রোড ধরে একাকী হাঁটতে থাকে। খানিক দূরে প্রান্তর ছাড়িয়ে মনু গাঙ্গের পাড়ে লাশকাটা ঘর। এ ঘরটিতে গতকাল তুলিকার শরীর কাটাছেড়া করে ময়না তদন্ত করা হয়েছে।
মাত্র আড়াই দিন আগে খুব উদ্বেগের ভেতর কাটা রাইফেল ও গ্রেনেডে ভরা ভারী স্যুটকেসটি নিয়ে সে বেরিয়ে গিয়েছিলো। বেরুনোর সময় সে দেখতে পায়, তুলিকা বাসন্তী বর্ণের ওড়নায় বুক-কাঁধ ঢেকে ম্যাচকরা টিপ পরে তার দিকে তাকিয়ে ম্লান হয়ে হাসছে। তখন তার চুলেও বোধকরি গোঁজা ছিলো দুটি গাঁদা ফুল। স্যুটকেস হাতে তোড়ে বেরিয়ে যেতে যেতে একবার তার মনে হয়েছিলো-মারণাস্ত্রগুলো কোন বাঁদাড়ে ছুড়ে ফেলে সে ফিরে যায় পেশকারবাড়িতে। আর তুলিকার দিকে তাকিয়ে ইশারায় উচ্চারণ করে হৃদয়ের অন্তস্থল থেকে উদ্ভাসিত হওয়া একটি শব্দ। কিন্তু অনেক যুগ আগের এক শ্রদ্ধেয় সন্ত্রাসবাদীর রচনার কয়েকটি ছত্র যেন নাটকের স্বগোক্তির মতো ফিসফিসিয়ে তাকে বলে- বস্তুবাদী বিপ্লবী তুমি, ভাববাদের ভ্রান্তিবিলাসে বিভ্রান্ত হওয়া তোমাকে মানায় কী, সেলিম? হাঁটতে হাঁটতে ফরেস্টাফিস পেরিয়ে সে চলে আসে গাপাড়ে। নদীর বহতা স্রোতের দিকে তাকাতেই মনে পড়ে, তার পকেটে রাখা ফিরোজা বেগমের ক্যাসেটটির কথা। একটি আফসোস তুষের আগুনের মতো ধিকি ধিকি করে জ্বলে ওঠে। তুলিকা কোনদিন জানবেও না- তার জন্য রিক্সার ভাড়া বাঁচিয়ে সে কিনে এনেছিলো একটি ক্যাসেট।
তুষের দাহ ক্রোধ হয়ে ছড়িয়ে যেতে থাকে তার দেহমনে। সময় থাকতে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে না পারার ব্যর্থতায় নিজে ওপর খেপে ওঠে সে নদীতীরে ছড়ানো বোল্ডারের উপর ক্যাসেটটি রেখে অন্য একটি পাথর দিয়ে তা ভেঙেচুরে ক্র্যাশ করে। স্পুলের ফিতা দাঁতে কেটে কুটিকুটি করে ছিঁড়তে ছিঁড়তেও তার রাগ কমে না। এনভেলাপ ছিড়ে অতঃপর পার্টির নেতৃস্থানীয় কমরেডের লেখা চিঠিটি সে খোলে। তাতে তাকে পত্রপাঠমাত্র পেশকারবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র মুভ করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কারণ হিসাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে- সুইডসাইডজনিত কারণে পেশকারবাড়িতে পুলিশি তদন্ত হবে, জড়ো হওয়া খাশ কুটুমরাও জানতে চাইবে সে আদতে কে? কী কারণে পেশকারবাড়িতে বাস করছে? তখন তার আসল পরিচয় এক্সপোজড্ হয়ে গেলে সমূহ বিপদ।
মনু নদীর ঢালু পাড় ভেঙে জলের কিনারে নেমে আসতে আসতে সেলিম গেল দু’বছরে একজায়গা থেকে অন্য জায়গায় রিট্রিট করার বিষয়টি নিয়ে ভাবে। পৈতৃক ভিটা ছাড়ে সে এলাকায় রক্ষীবাহিনীর রেইডে ধরপাকড় শুরু হলে মদনমোহন কলেজেও তার ছাত্রত্ব বেশিদিন বহাল রাখা সম্ভব হলো না। তাকে পালিয়ে আসতে হলো চুনারুঘাট এবং ফেঞ্চুগঞ্জ ছেড়ে। এবার রিট্রিট করতে হচ্ছে পেশকারবাড়ি থেকে। নদীর চলমান জলের দিকে তাকিয়ে আবার সে তুলিকার কথা ভাবে। বাসন্তী বর্ণের ওড়না থেকে বিচ্ছুরিত সোনালি আভা মেখে মেয়েটি যেন পরপার থেকে তার দিকে নীরবে তাকিয়ে বলছে- ‘সেলিম, আমার একটু কাছাকাছি হলে তোমার বিপ্লবী চরিত্রে কী চিড় ধরে যেতো?’
স্রোতের দিকে তাকিয়ে অনেক্ষণ তব্দিল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে সেলিম। ভিন্ন গন্তব্যে যাওয়ার আগে সে আরেকবার তুলিকার কথা ভাবতে চায়। কিন্তু, তার স্মৃতি থেকে মেয়েটির মুখখানা সম্পূর্ণ উবে গেছে। তার পাঁজরেও আর ফিরে আসে না ঘুঘুর করুণ স্বরে ছড়ানো আর্তি। নিজেকে তার বেজায় সর্বস্বান্ত মনে হয়।
কিন্তু উপায়ই-বা কী? এদিকে আলো কমে আসছে। অন্যমনষ্কভাবে সেলিম পার্টির কমরেডের লেখা চিঠিটি আবার খুঁটিয়ে পড়ে। তাকে নদীর অন্য পাড় ধরে ঘণ্টাখানেক হেঁটে রায়শ্রী গ্রামের মোড়লবাড়িতে গিয়ে শেল্টার নিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ গ্রামে আছে চার পাঁচটি হাইস্কুলের ছাত্র। তার পরবর্তী আ্যাসাইনমেন্ট হচ্ছে- মাসখানেক রায়শ্রী গ্রামে বাস করে স্কুল ছাত্রদের মাঝে রেডগার্ড স্কোয়াড গড়ে তোলা। সেলিম শার্ট-প্যান্ট-স্যান্ডেলশু এসব কিছু না খুলেই নদীর জলে নামে। শীতের মনু গাঙে স্রোত তেমন জোরালো নয়। সে ভাটির দিকে আলগোছে সাঁতরে যেতে যেতে ঘাড় বাঁকিয়ে ছেড়ে আসা পাড়ের দিকে তাকায়। লাশকাটা ঘরের টিনের চালে ঝিকিয়ে ওঠে বেলাশেষের আলো।