মনিজা রহমান >> কুসুমিত স্মৃতি >> ছোটগল্প

0
365

কুসুমিত স্মৃতি 

‘জানেন, আমার জ্বর হইছে। কাশি আর গলা ব্যথাও আছে। ডাক্তারের লগে কথা কইবার পরে উনি জ্যাকসন হাইটস ফার্মেসিতে ওষুধ পাঠাইছেন। আপনি কি একটু ওষুধগুলা নিয়া আসতে পারবেন?’
হুমায়ুন মনে মনে উত্তর হাতড়ায়। তাৎক্ষণিকভাবে বুঝতে পারে না কি বলবে! একটু মরিয়া কণ্ঠে এরপর বলে ওঠে, ‘আমি আনতে পারবো। আপনার জন্মতারিখ আর বাসার অ্যাড্রেস আমারে মেসেজ করেন। দেহি সন্ধ্যার মধ্যেই নিয়া আসব।’
রেহানা যখন আচমকা ‍হুমায়ুনকে ফোন করল- তখন প্রায় দুপুর। নিউইয়র্ক শহরে করোনা মহামারী শুরু হয়েছে মার্চের মাঝামাঝি থেকে। এপ্রিল মাস শেষ হতে চললেও মানুষের মধ্যে করোনা নিয়ে আতঙ্ক যায় নাই। লকডাউনের কারণে এই বাড়ির কারো কোনো টাইমটেবিল নাই। রাতে ঘুমাতে ঘুমাতে বেশিরভাগ সময় তিন-চারটা বেজে যায়। উঠতে আবার সেই এগারোটা বারোটা। স্যারের ছেলেরা যতক্ষণ না বিছানায় ঘুমাতে যায়, ক্লান্ত লাগলেও জেগে থাকতে হয় হুমায়ুনকে।
হুমায়ুনের কাছে রেহানাকে একটু ছটফটে ধরনের মেয়ে মনে হয়। তবে একটু আগে তার কণ্ঠে কোনো অস্থিরতা ছিল না। শারীরিক দুর্বলতার সঙ্গে মিশে আছে যেন দ্বিধার বিহবলতা! রেহানা হয়ত সিদ্ধান্ত নিয়ে উঠতে পারছে না, মহামারীর সময়ে এমন একটা অনুরোধ হুমায়ুনকে করা যাবে কিনা! যে কারণে কাঁপা কাঁপা গলায় জানায়-
‘আমার তো আপন বইলা আর কেউ নাই যে বলব। তাই আপনারেই ডিস্টার্ব করতেছি।’ কথাটা বলেই উত্তরের অপেক্ষা না করে ফোন কেটে দেয় রেহানা।
রেহানার কণ্ঠের বিষাদময়তায় প্রভাবিত হয়েছে দেখে নিজের কাছে নিজেই অবাক হয়ে গেল হুমায়ুন। অথচ রেহানা তার কেউ না, আবার আইনত ভাবতে গেলে অনেককিছু। কিন্তু মনের দিক থেকে কোন অধিকার থাকলেই না দাবির প্রশ্ন আসে! নিজের মনের কাছে প্রশ্ন করে হুমায়ুন, রেহানার কোন জায়গা কি নেই তার জীবনে!
অস্বস্তি আর বেদনা ভরা মন নিয়ে ধীরে ধীরে ফ্রিজ খোলে হুমায়ুন। সেখান থেকে বিরিয়ানির বাক্সটা বের করে। বাক্সের মুখটা খোলার পরে মন খারাপ দ্বিগুণ হয়ে যায়। ডিপফ্রিজে রাখা বরফ হয়ে যাওয়া বাসী বিরিয়ানি ওপর থেকে পাঠানো হয়েছে ওর খাওয়ার জন্য। কিঞ্চিৎ বইপাঠের অভ্যাস থেকে হুমায়ুনের মনে হয় – অবস্থান পাল্টালেও মালিকরা মালিকই তাকে, তাদের সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতার পরিবর্তন হয় না।
এখন এই বরফ হয়ে যাওয়া বিরিয়ানি খেয়ে কীভাবে ক্ষুধা মেটাবে বুঝতে পারে না হুমায়ুন। মাইক্রোওভেনে গরম করার পর একধরনের স্যাঁত স্যাঁতে আঠালো ভাব থাকবে খাবারটায়। পুরো খাবারটা টক হয়ে যাবার সম্ভাবনাও আছে।
হুমায়ুন পুরো বিরিয়ানির প্যাকেট গার্বেজ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সিদ্ধান্ত নেবার সাথে সাথে মনে একটা হালকা স্বস্তি অনুভব করে। এর আগে দুই কাপ চাল ধুয়ে চুলায় বসিয়ে দেয়। ভাতের মধ্যে একটা ডিম আর আলু ভালো করে ধুয়ে দিয়ে দেয়। তারপর বাসি বিরিয়ানির প্যাকেটের দিকে মনোযোগ দেয়। একটা পলিথিন ব্যাগে হবে না। দুইটা ব্যাগ লাগবে। দুই ব্যাগের মধ্যে বাসি বিরিয়ানি প্রথমে ঢালে হুমায়ুন। তারপর ব্যাগের মুখ শক্ত করে গিট দেয়। যাতে পচা বিরিয়ানির গন্ধ না ছড়ায়!
আরেফিন স্যার কিংবা হিরা ম্যাডাম বলা যায় না বেসমেন্টে এসে পচা গন্ধ পেয়ে গার্বেজ ফেলার বিনটাও চেক করতে পারে। ওনাদের কাণ্ড-কারখানা সব অদ্ভুত, কখনও ভালো, কখনো মন্দ- মাথামুণ্ডু নেই। তাদের দেয়া ডিপফ্রিজে রাখা বিরিয়ানি না খেয়ে ফেলে দিয়েছে হুমায়ুন! সেটা দেখে খাদ্যদ্রব্য নষ্টের জন্য তাদের দরদ উথলেও উঠতে পারে।
তখন তারা হুমায়ুনের সঙ্গে অকারণে রুক্ষ আচরণ করবে। মনে আঘাত দিয়ে কথা বলবে। কিন্তু, হুমায়ুন মরে গেলেও বলতে পারবে না, বরফ হয়ে যাওয়া বাসি বিরিয়ানি খাওয়ার দায়িত্ব কি আমার! আমি কি আপনাদের বাসার পোষা কুকুর! আমেরিকায় কি খাবারের অভাব যে আমাকে এসব অখাদ্য-কুখাদ্য খাইতে হবে!
আদতে কঠিন গলায় কাউকে কিছু বলতে পারে না ও। এই যে রেহানার সঙ্গে লকডাউন শুরুর আগে যখন দেখা হত, কত রকম ঠাট্টামস্করা করতো, তার মধ্যে কোনো কোনোটা অপমান-অপদস্থের মধ্যেও পড়ত, মনে মনে রেগে গেলেও গুছিয়ে কোনো প্রত্যুত্তর দিতে পারেনি হুমায়ুন।। বরং সবাইকে একান-ওকান হাসি দিয়ে সব সময় তাল মিলিয়ে গেছে।
হুমায়ুন ক্লজেটে তার কাপড়চোপড়ের মধ্যে একটা পলিথিনের ব্যাগে ঘিয়ের বয়ম লুকিয়ে রেখেছে। অনেকদিন পরে আজ সেটা বের করে। গরম গরম ধোয়া ওঠা ভাত, তাতে ঘি ছড়িয়ে দেয়। ডিম ও আলু সেদ্ধ মাখায়। তেলে ভাজা শুকনা মরিচ থাকলে ভালো হত। কিন্তু সেটা করা যাবে না। গন্ধ আর ধোঁয়া ছড়াবে। স্যারের স্ত্রী এমনিতে সারা বছর অসুস্থ থাকেন, ধোয়ার গন্ধ তার শরীর আরো খারাপ করে দেবে।
হুমায়ুন কুচি কুচি করে পিয়াজ আর কাঁচা মরিচ কাটে। তারপর সেটা দিয়ে আলু আর ডিম কচলে মাখায়। এই রান্নাবান্নার ধরন হুমায়ুন শিখেছে লেখক হুমায়ুন আহমেদের বই পড়ে। মালিকের বাড়ির বেসমেন্টে বাস করা হুমায়ুন খুব আহামরি পাঠক নয়। তবে মাঝে মধ্যে হুমায়ুন আহমেদের বই পড়ে। ঢাকা থেকে আসার সময় স্যুটকেসে প্রিয় লেখকের কয়েকটা বই এনেছিল। কখনও নিঃসঙ্গ লাগলে সেই বইগুলো বের করে পড়ে। এক বই ঘুরে ফিরে পড়ে আর পুরনো দিনের কথা চিন্তা করে। তখন না পাওয়ার বেদনা আরো গভীর হয়। তাড়িয়ে তাড়িয়ে বেদনাকে উপভোগ করে হুমায়ুন।
হঠাৎ করে কোনো কারণ ছাড়া একফোঁটা জল হুমায়ুনের গাল বেয়ে নেমে আসে। ও সেটা মোছে না। ও চায় গালে যেন কান্নার দাগ শুকিয়ে লেগে থাকে। এত বড় পৃথিবীর অতি সাধারণ একজন মানুষ ও। কোনো বিশেষত্ব নেই। রেস্টুরেন্টে বেয়ারার কাজ করতো এক সময়। রান্না জানলে শেফ হিসেবে ভালো বেতন পেত। বেশ কিছুদিন কিচেনে কাটিয়েও কোনো খাবার রান্নাতেই তেমন জুত করতে পারেনি। অগত্যা টেবিলে টেবিলে খাবার দেয়াই সই। ভালো ইংরেজি জানে না বলে বাঙালি রেস্টুরেন্টের বাইরে কোথাও কাজ নেবার সাহস হয়নি। ছয় বার পরীক্ষা দিয়ে ড্রাইভিং পাশ করতে পারেনি। জীবনের ব্যর্থতার পাল্লা এত ভারী যে ন্যুজ্ব হয়ে থাকটাই নিয়তি। যে কারণে মালিকরা ডিপ ফ্রিজে বহুদিন রাখা বাসী বিরিয়ানি ওর খাওয়ার জন্য বরাদ্দ করে।
হুমায়ুন সিঁড়িতে আবরারের ধুমধাম করে নামার শব্দ পায়। এই বাড়িতে একমাত্র ওই এভাবে শব্দ করে নামে। বড় বড় লোকমা দিয়ে খাওয়া শেষ করার চেষ্টা করে হুমায়ুন। আবরারের আবার খুব তীক্ষ্ণ চোখ। হুমায়ুন কি খায়, কি করে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে এবং সবার সামনে গিয়ে দুম করে বলে বসে। একবার রেহানার সঙ্গে কথা বলছিল ফেসটাইমে, বোঝেনি যে আবরার খেয়াল করছে, হঠাৎ একদিন গাড়িতে স্যারের সামনে বলল, হুমায়ুন মামার অ্যাফেয়ার আছে। হুমায়ুনের ঘেমে-নেমে একাকার অবস্থা। ভাগ্যিস স্যারের তখন আরেকটা ফোন এসেছিল বলে আবরারের কথায় মনোযোগ দিতে পারেনি।
‘তুমি এখন প্লেট ক্লিন করছ! এখনও রেডি হও নাই?’ আবরার তার যান্ত্রিক কণ্ঠে কথা বলে যায়। হাই ফাংশনাল অটিস্টিক ছেলে আবরারের বয়স এখন ১৯ বছর। স্বাভাবিক মানুষের মতো অনেক কিছুই করতে পারে, তবে একই প্রশ্ন বার বার করে আর অচেনা-অপরিচিত কাউকে দেখলেই নাম জিজ্ঞাসা করাটাই ওর সমস্যা।
হুমায়ুন ওর দিকে হাসি মুখে তাকায়। ‘আমি তো রেডিই আছি, জুতা পড়ব শুধু।’ কথা বলতে বলতে হুমায়ুন দ্রুত বয়েম থেকে নিয়ে একটা এলাচ মুখে দেয়। যাতে মুখে কোন গন্ধ না হয়। হিরা ম্যাডাম খুব খুঁতখুঁতে মানুষ যাকে চলতি বাংলায় বলে শুচিবাইগ্রস্ত। সারাক্ষণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে পটের বিবি সেজে বসে থাকেন!
বেসমেন্ট থেকে উঠে হুমায়ুন দেখে লিভিং রুমে ম্যাগাজিন হাতে বসে আছেন হিরা ম্যাডাম। পরনে বাইরে যাবার পোষাক। কিন্তু তিনি সচরাচর কোথাও যান না। বেডরুম আর লিভিংরুমে আসা যাওয়া করে দিন কাটে তার। ওনার জন্য আলাদা করে লকডাউনের প্রয়োজন নেই। সারা বছরই উনি লকডাউনেই থাকেন।
‘হুমায়ুন আজ যে দেরি করলে ওপরে উঠতে, ব্যাপার কি!’ হাইহিল জুতা পরে পায়ের ওপর পা রেখে কথাটা বলেন তিনি। ‘আমি বহুদিন বলেছি রোদ তীব্র থাকতে থাকতে আবরারকে নিয়ে পার্কে যেতে। কিন্তু কখনও সেটা হয় না।’
‘আমার গ্রামের একজন এখানে থাকে, সে…’ কথা শুরু করেছিল হুমায়ুন, কিন্তু শেষ করতে পারে না! আবরারের ছোট ভাই সায়ান এসে যায় কথার মধ্যে। ‘মাম্মি, আই ওয়ান্ট টু গো টু পার্ক ‍ওলসো।’ হিরা ম্যাডাম মাথা দুলিয়ে সায় জানায়। সায়ান আবরারের মতো না, সে খুব বুদ্ধিমান ছেলে। ও গেলে খুশিই হয় মনে মনে হুমায়ুন। পনের বছরের ভাই হয়ে ও দেখে রাখতে পারে উনিশ বছরের আবরারকে।
সায়ান জুতা পরতে গেলে কথাটা বলার আবার সুযোগ পেয়ে যায় হুমায়ুন। ‘হিরা ম্যাডাম আমাকে আজকে বিকেলে এক ঘণ্টার জন্য ছুটি দিতে হবে। খুব আর্জেন্ট প্রয়োজন।’ কণ্ঠের সব আকুতি দিয়ে বলে হুমায়ুন। কিন্তু অপর পক্ষে কোন প্রতিক্রিয়া দেখতে পায় না। ম্যাডামের চোখ পত্রিকার দিকে নিবদ্ধ। তবে তিনি শুনেছেন, একটু পরে বলে ওঠেন, ‘তোমার আর্জেন্ট কাজটা কি শুনি।’
হুমায়ুন দ্রুত গড়গড় করে বলতে থাকে, ‘আমার এক গ্রাম-সম্পর্কের আত্নীয় খুব অসুস্থ। এলমহারস্টে থাকে সে, কিন্তু বাসা থেকে বের হবার মতো অবস্থা নাই। আমাকে একটু আগে ফোন করে জানাল নিজের দুরবস্থার কথা। খুব করে অনুরোধ করেছে জ্যাকসন হাইটসের ফার্মেসি থেকে কয়েকটা ওষুধ তার বাসায় পৌছে দেবার জন্য।’
‘কি অসুখ হয়েছে তোমার আত্নীয়ের, করোনা?’ হিরা ম্যাডামের পুরো মনোযোগ এখন হুমায়ুনের দিকে।
‘মনে হয় করোনাই হইছে। অসুখের কারণে গুছাইয়া কিছু বলতে পারে নাই।’ সরল ভাবে বলে ওঠে হুমায়ুন।
‘তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে হুমায়ুন! তুমি করোনা ভাইরাসের এক রোগীকে যাবে ওষুধ দিতে! তারপর তার কাছ থেকে ভাইরাস তুমি নিয়ে আসবে। সারাক্ষণ তুমি আমাদের সঙ্গে বাসায় থাকো, এখন করোনা দিয়ে আমাদের সবাইকে মারতে চাও নাকি!’
‘আমি ওনার সঙ্গে দেখা করব না, শুধু বাসার সামনে ওষুধগুলো দিয়ে চলে আসব।’ হুমায়ুন শেষ চেষ্টা চালায়।
‘তোমাকে যেতে হবে না আজ জ্যাকসন হাইটসে। ওনাকে টেক্সট করে দাও, কেউ না কেউ ওনার জন্য ওষুধ নিয়ে আসবে।’ হিরা ম্যাডাম সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেন ওনার অধীনস্ত কর্মচারীকে। মনে হয় যেন আধুনিক যুগের ক্রীতদাস সে। ‘এখন ওদের দুইজনকে নিয়ে পার্কে যাও। খেয়াল রেখো ওরা যেন ডিসট্যান্স মেনে চলে আর মুখে মাস্ক রাখে সব সময়।’
মনোক্ষুণ্ণ হয়ে বের হয়ে এল হুমায়ুন। কোনভাবেই বুঝে উঠতে পারছে না কি করবে!

২.

পার্কে গেলে হুমায়ুনের বেশি টেনশন থাকে, আবরার না পানির কাছে যায়! পার্কে আসার সময় স্যার ও ম্যাডাম বারবার এই নিয়ে সাবধান করে দেন। আবরার পার্ক থেকে বের হয়ে রাস্তাতেও চলে যেতে পারে! তাদের বিশ্বাস তেমন কিছু হলে ও নিশ্চয়ই কারো সাহায্য নিয়ে বাসায় ফিরতে পারবে কিংন্তু একবার পানিতে পড়ে গেলে আর ফিরবে না। আবরার আবার পানিতে নামতে খুব পছন্দ করে। ওর মতো যারা অটিস্টিক, তাদের কাছে পানির স্পর্শ অনেকটা নেশার মতো।
এসব কারণে পার্কের বেঞ্চে বসার মতো সুযোগ হয় না হুমায়ুনের। সারাক্ষণ দাঁড়িয়ে বা আবরারের পিছনে ঘুরে কাটাতে হয়। সায়ান যে কোনো জায়গাতে গেলেই দ্রুত বন্ধুবান্ধব বানিয়ে খেলা শুরু করে দেয়। আবরারও খেলে মাঝে মধ্যে, তবে খুব বেশি প্রশ্ন করে আশেপাশের মানুষকে। বিশেষ করে সুন্দরী মহিলাদের দেখলেই ও গিয়ে কথা বলবেই। সেই একই কথা – হোয়াট ইজ ইউর নেম? বলা নেই কওয়া নেই এভাবে হঠাৎ করে নাম জিজ্ঞাসা করলে অনেকে তো প্রথমে খুব অবাক হয়ে যায়। কেউ কেউ বিরক্ত হয়, কারণ ভালো করে না তাকালে বোঝা যায় না আবরার যে অটিস্টিক। তবে বেশিরভাগ মানুষই হাসিমুখে নিজের নাম বলে, আবার ওর নামও জিজ্ঞাসা করে।
মাসখানেক হল আবরারের নতুন স্বভাব হয়েছে – পরিচিত হয়ে তাদের ফেসবুকে ফ্রেন্ড বানানো। তারপর যখন-তখন তাদের ফেসবুক মেসেঞ্জারে কল দেয়া। লুপিতা নামের পেরুর মেয়েটির সঙ্গে এভাবেই আলাপ হুমায়ুনের। মেয়েটা যত না সুন্দর, তার চেয়ে বেশি বাঙালিদের মতো দেখতে বলে হুমায়ুনের ভালো লাগে লুপিতাকে।
একদিন অনেকটা ঝড়ের বেগে মেয়েটা এসে চিৎকার করতে থাকে হুমায়ুনের সঙ্গে, বাংলায় যার অনুবাদ করলে হয় – ‘তুমি কি আবরারের ফেসবুক অপারেট কর ? বল? উত্তর দাও…। আমি কিন্তু পুলিশ কল করব, আরেকবার আমাকে গভীর রাতে টেক্সট করলে!’
হুমায়ুন কিছু বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই আবরার বলে ওঠে, ‘না আন্টি, আমি তোমাকে টেক্সট করেছি। হুমায়ুন আঙ্কেল করেনি।’ লুপিতা হয়ত বয়সে আবরারের চেয়ে পাঁচ/ ছয় বছরের বড় হতে পারে। এভাবে আন্টি বলাতে ও আরো রেগে যায়। কিছু না বলে যেভাবে ঝড়ের বেগে এসেছিল, সেভাবে চলে যায়। এরপর কাহিনির নাটকীয়তায় ধীরগতি আসে। আবরার ও হুমায়ুনের সঙ্গে বেশ ভালো সম্পর্ক হয়ে যায় লুপিতার। লুপিতা ওর বন্ধুদের নিয়ে যে কোর্টে ভলিবল খেলে, সেই দলে ওরা আবরারকেও নেয়। হুমায়ুন পাশে দাঁড়িয়ে ওদের খেলা দেখে আর হাত তালি দিয়ে উৎসাহ দেয়। মাঝেমধ্যে ওরা আইসক্রিম খায়, খেলাশেষে ঝর্ণার পানিতে ভেজে। আবরার ভলিবল খেললে হুমায়ুন এদিক দিয়ে নিশ্চিত থাকে যে ও অন্তত লেকের কাছে যাবে না।
আজ হুমায়ুনের নিজেরই খুব লেকের ধারে যেতে ইচ্ছে করছে। লেকের স্বচ্ছ জলের মধ্যে ডুবে থেকে জীবনের খামতিগুলোকে ঘষে ঘষে মুছে ফেলতে মন চাইছে। পার্কে আসার পথে রেহানার টেক্সট পেয়েছে, ফার্মেসির নম্বর ও বাসার ঠিকানা দিয়েছে। এদেশের আইনে বৈধ স্ত্রী হয়েও রেহানার বাসার ঠিকানা জানা নেই হুমায়ুনের। জীবন আসলে মানুষকে কত রঙ দেখায়, এটাই আজ প্রতি সেকেন্ডে মনে হচ্ছে হুমায়ুনের। বেলা প্রায় পাঁচটা বাজতে চলল। করোনা মহামারীর কারণে এখন ছয়টার মধ্যে ফার্মেসি সব বন্ধ হয়ে যায়। এরপরে গেলে সে ওষুধ নিতে পারবে না।
হুমায়ুনকে কোর্টের একপাশে অন্যমনস্ক দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হেঁটে আসে লুপিতা। ‘তোমার কি হয়েছে আজ ? অনেকক্ষণ ধরে দেখছি চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছ।’
হুমায়ুনের হঠাৎ মনে পড়ে লুপিতা একদিন ওকে বলেছিল – ‘তোমার মতো ভালো মানুষ আমি খুব কম দেখেছি।’
আসলে কী ভালো মানুষ, নাকি বোকা, কঠিন হতে না-পারা ব্যর্থ মানুষ। কাগজপত্রের আশায় যে বসের ব্যবসায় দিন নেই রাত নেই পরিশ্রম করছে, তাদের কাছ থেকে মাস গেলে বেতনের কিছু ডলার ছাড়া কি পেয়েছে ! আজ-কাল করতে করতে এখন পর্যন্ত স্পন্সরশিপের ব্যবস্থা করেনি। স্যার কি ভেবেছিলেন, এই দেশে বৈধ হয়ে গেলে কাজ ছেড়ে দেবে হুমায়ুন? দিনের পর দিন স্যারের উদাসীনতার জন্য অবশেষে গ্রামসম্পর্কের এক ভাইয়ের মাধ্যমে রেহানার সঙ্গে পরিচয় ও গ্রীনকার্ডের জন্য সাজানো বিয়ে! কিন্তু এটা কি চেয়েছিল হুমায়ুন?
‘কি হয়েছে ? খারাপ কিছু? চুপ করে আছ কেন?’ লুপিতার একের পর এক প্রশ্নে ভাবনার জগত থেকে বাস্তবে ফেরে হুমায়ুন।
‘আমার খুব কাছের একজন মানুষ করোনা আক্রান্ত। জ্যাকসন হাইটসের এক ফার্মেসি থেকে ওষুধ নিয়ে বাসায় পৌছে দিতে হবে। সন্ধ্যা ছয়টায় ফার্মেসি বন্ধ হয়ে যাবে। তাই কি করব ভাবছিলাম!’ হুমায়ুন ভাঙা গলায় বলে লুপিতাকে।
লুপিতার প্যান্টের পকেট থেকে মোবাইল করে দেখে বলে – ‘তোমার হাতে তো সময় নেই। এখান থেকে ট্রেনে জ্যাকসন হাইটসে যেতে ছয়টা প্রায় বেজে যাবে। তোমার এখনই রওনা দেওয়া উচিত।’
‘তুমি তো জান আবরারকে, তাকে একা রেখে গেলে ম্যাডাম আর স্যার আমাকে গুলি করেই মেরে ফেলবেন।’ হুমায়ুন আর্দ্র কণ্ঠে বলে ওঠে।
‘তুমি এটা নিয়ে এত ভাবছ কেন? আমি আছি না? আমি দেখে রাখবো আবরারকে। আমার ওপরে তোমার এইটুকু ভরসা হয় না!’ কথা বলতে বলতে হুমায়ুনের হাতে আলতো করে চাপ দেয় লুপিতা আশ্বস্ত করার ভাষায়।
হুমায়ুন কিছু বলার আগে লুপিতা আবরারকে ডেকে সবকিছু বুঝিয়ে বলে। ওর সব বন্ধুদেরও ডেকে বলে হুমায়ুনের সমস্যার কথা। সবাই দেরি না করে হুমায়ুনকে চলে যেতে বলে। দ্বিধাগ্রস্ত হুমায়ুন বুঝতে পারে না কি করবে? লকডাউনের কারণে পার্ক এখন প্রায় ফাঁকা থাকে। হুমায়ুন ইশারায় দূরে খেলতে থাকা সায়ানকে ডাকে। সায়ানও সব শুনে জানায়, হুমায়ুন আসার আগ পর্যন্ত বড় ভাইয়ের সঙ্গে থাকবে ।
আবরার ওর মোবাইল বের করে উবার এক্স কল করে। মুখে বলে, ‘হুমায়ুন আংকেল তুমি তাড়াতাড়ি যাও। ওষুধ না পেলে তোমার বন্ধুর শরীর খারাপ হবে। আমার জন্য চিন্তা কোরনা তো।’

৩.

জ্যাকসন হাইটস ফার্মেসির সামনের রাস্তায় বাঁধানো এক জায়গায় টিউলিপ ফুটে আছে। হরেক রঙের টিউলিপ দেখলেই হুমায়ুনের সব সময়ই রেহানার কথা মনে পড়ে। স্বামী-স্ত্রী প্রমাণ করার জন্য দুজনের ঘনিষ্ঠ ছবি তুলতে হবে! রেহানা খুব শখ সে টিউলিপ গাছের সামনে ছবি তুলবে। একবার তো টিউলিপের সামনে ছবি তোলার জন্য সেই নিউজার্সির এক ফার্মে গিয়েছিল সবাই। সবাই মানে হুমায়ুনের গ্রামসম্পর্কের ভাই, যিনি এই ওদের সাজানো বিয়ের ঘটক সেই রঞ্জু ভাই ছিলেন। রঞ্জু ভাই রেহানার ফুফাতো ভাইয়ের চাচাতো ভাই হয়। আগের স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ির পরে রেহানার অনেকটা অভিভাবক ছিলেন তিনি।
ঘনিষ্ঠ হয়ে ছবি তুলতে গিয়ে কী যে লজ্জ্বা লাগতো হুমায়ুনের। আর রেহানা হেসে গড়িয়ে পড়তো। আর বলত, ‘ভাবতে পারেন না, আমরা সিনেমায় অভিনয় করতেছি। এত লজ্জা পান ক্যান?’ টিউলিপের দিকে তাকিয়ে সেই স্মৃতি মনে করে মৃদু হাসি পেল হুমায়ুনের।
ফার্মেসি থেকে ওষুধ নেবার পরে রেহানাকে ফোন করল হুমায়ুন। মোবাইল বন্ধ। কি ব্যাপার ? শরীর কি বেশি খারাপ ? মোবাইলে চার্জ দিতে পারে নাই বলে বন্ধ হয়ে গেছে! আবার ফোন করল হুমায়ুন। বন্ধ। কি করবে বুঝতে না পেরে ওষুধের প্যাকেট হাতে নিয়ে হাঁটা শুরু করে রেহানার বাসার উদ্দেশ্যে। এখান থেকে হাঁটা পথে গেলে দশ মিনিট লাগার কথা।
হঠাৎ রিঙ বেজে উঠল মোবাইলে। রেহানার কল ভেবে হাতে নিয়ে দেখে রঞ্জু ভাই ।
‘সালাম ভাই। আপনি কই?’ হুমায়ুন প্রশ্ন করে।
‘আমি বাসায়। রেহানা তো হাসপাতালে। ও তো দম নিতে পারতেছিল না। কোনক্রমে ৯১১-এ কল করে। এম্বুলেন্স আইসা ওরে নিয়া গেছে।’
রঞ্জু ভাইয়ের কথা শুনে ওষুধের প্যাকেট হুমায়ুনের হাত থেকে পড়ে যাবার উপক্রম হয়। কি বলবে বুঝতে পারে না!
অপরদিক থেকে রঞ্জু ভাই বলে যায়, ‘রেহানার জন্য তোমার চিন্তা করার দরকার নাই। আমি তো সব জানি। যদি ওর খারাপ কিছু হয়, তাই একটু আগে আমাগো উত্তরবঙ্গ এসোসিয়েশন অব নর্থ আমেরিকার নেতাগোর সঙ্গে কথা কইছি। ওরা সব ব্যবস্থা করব। রেহানার কেউ না থাকলেও ওর এলাকার লোক তো আছে।’
হুমায়ুনের গলা থেকে স্বর বের হয় না। রঞ্জু ভাই কতক্ষণ হ্যালো হ্যালো বলে লাইন কেটে দেয়। ফাঁকা রাস্তায় মানুষ বলতে গেলে নেই। গাড়ির সংখ্যাও খুব কম।
আশেপাশের নির্জনতাকে ভেঙে হুমায়ুনের চিৎকার বলে বলতে ইচ্ছা করে, ‘রেহানার কেউ নেই এটা সত্যি না। একটু সত্যি না।’