মনোয়ার মোকাররম >> আয়না >> ছোটগল্প

0
577

আয়না

এক

ডান দিকে তাকাতেই হঠাৎ শফিকের নজরে পড়ল পাশের রিকশায় ক্ষীণকায় এক তরুণী বসে আছে – ক্ষীণকায় এবং যথেষ্ট রূপসী। এক পলক দেখল। তারপরেই তরুণীর রিকশা সাঁই করে হাওয়ার বেগে শফিকের রিকশাকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল।
তরুণী যতটাই ক্ষীণকায়, রিকশাচালক ততটাই বলশালী, অন্তত পেছন দিক থেকে দেখে শফিকের তাই ধারণা হয়েছে। ক্ষীণকায় তরুণী যাত্রী আর বলশালী চালক। ফলে দুইয়ে দুইয়ে চার হয়ে গেল। তরুণীর রিকশা হাওয়ার বেগে চলছে। আরো একটা কারণ থাকতে পারে – সুন্দরী প্যাসেঞ্জারকে নিজের কর্মক্ষমতা জাহির করবার বাসনা। তরুণীর রিকশা হাওয়ার বেগে চলছে সে ঠিক আছে, কিন্তু এতক্ষণ ফুরফুরে গতিতে চলা শফিকের রিকশাও যে হাওয়ার বেগে চলতে শুরু করেছে। রিকশাচালক দ্রুত প্যাডেল মারছে আর বারবার সামনে ধাবমান তরুণীর রিকশার দিকে সরু নজর রাখছে। কোনো চেষ্টাই বৃথা যায় না। এই রিকশাচালকের চেষ্টাও বৃথা গেল না। খানিক সময় পরেই সে অগ্রবর্তী রিকশাকে ধরে ফেলল। সব রিকশাওয়ালা ভাই ভাই, কিংবা তারো বেশি কিছু। চকিতে দুই ভাই-বন্ধুর মধ্যে কী জানি কী ইশারা বিনিময় হল। শফিকের রিকশাওয়ালাটা পান কিংবা জর্দা খাওয়া লাল দাত বের করে হাসল। তার ভাই কিংবা বন্ধু – সেও জবাবে হলুদ দাঁত প্রদর্শন করল। দুই রিকশারই গতি কমে গেলো। আবাসিক এলাকার ভিতর দিয়ে যাচ্ছে রিকশা দুটো, ভারী যানবাহনের চলাচল নেই। যার ফলে শফিকের রিকশা পাশাপাশি একই গতিতে ধীরলয়ে চালিয়ে নিতে খুব একটা সমস্যা হচ্ছিল না।
কিরে মেশিন ঠিকঠাক মতন চলেতো? শফিকের রিকশাওয়ালা চিৎকার করে ওঠে, আড় চোখে দৃষ্টি তরুণীর দিকে ।
নারে দোস্ত, চাইনিজ মেশিনতো, চালাইতে একটু বেগ পাইতাসি। অশ্লীলতার সুরে জবাব আসে।
দেখিস, বুইজা শুইনা চালাইস, বেশি গরম হইস না, তয় কইলাম চেইন পইড়া জাইবগা। বলেই খিক খিক করে একধরনের বিকৃত হাসি হেসে ওঠে, আর তার লাল দাতগুলো আরো লাল দেখায়।
হেই ডর নাই, সব পার্টসে তেল-গিরিজ লাগাইয়া লইসি। দোস্ত, তেল গিরিজ লাগান মেশিন চালাইতে জব্বর মজা। ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনের দিকে তাকাল হলুদ দাঁতওয়ালা। তার মুখ দিয়ে কিছুটা লালা ঝরে পড়ল।
তা যা কইসস দোস্ত। তয় মাঝে মাঝে বেরেক লইস। বলেই আবার সেই খিকখিক লাল দাঁতের হাসি। চলন্ত রিকশার কারুকাজময় গতিতে এই স্বল্প কথোপকথন শেষে রিকশার গতি আবার বেড়ে যায়।
মেয়েটি পাশ ফিরে অন্যদিকে তাকিয়ে ছিল। কিছু কি দেখছিল? কি দেখবে? তার চাইতে বলা ভাল কিছু না-দেখার, না-শোনার চেষ্টা করছিল। তার চারপাশে কিছু লাল দাঁত, হলুদ দাঁতওয়ালা ড্রাকুলা, ভ্যাম্পায়ারের দৃষ্টি থেকে নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা। তাকে ইঙ্গিত করে দুটি রিকশাওয়ালার এই কুৎসিত কথোপকথনে অসহায়, বিব্রত মেয়েটির জন্যে শফিকের খুব মায়া লাগল। শফিকের মনটা খারাপ হয়ে গেল।
শফিক তার রিকশাওয়ালাকে একটা ঝাড়ি দিল, এই মিয়া এতো জোরে তোমারে রিকশা চালাইতে বলছে কে? আস্তে চালাও।
রিকশাওয়ালা এবার লাল চোখ দেখায়, জোরে চালামু না তো কি করুম? এক ক্ষ্যাপ নিয়া দিন পার করুম নাকি? আরো জোরে প্যাডেল মারতে থাকে সে। এবার অন্য কোন উদ্দেশ্যে নয়, শফিককে বুঝিয়ে দেয়া যে তার হুকুম মানতে সে বাধ্য নয় ।
শফিকের মুখ দিয়ে অস্ফুষ্ট স্বরে একটা গালি চলে এলো, শালা বাস্টার্ড!

দুই

অনেকক্ষণ হল শফিকের রিকশা চলছে না। একটা গলির মধ্যে আটকে আছে। জ্যাম থেকে বাঁচার জন্যে অনেকসময় রিকশাওয়ালারা শর্টকাট পথে গলির ভিতর ঢুকে যায়। এতে কাজ হয়। বড় রাস্তার জ্যাম এড়ানো যায়। তবে সরু গলিতে একবার জ্যাম লাগলে সহজে ছোটে না। শফিকের মাঝে মাঝে মনে হয়, মানুষের জীবন আর রাস্তার মাঝে একটা দারুণ মিল আছে। অনেক বড় দূরত্ব আমরা অনায়াসে পার হয়ে যাই, কিন্তু অনেক সময় একটা ছোট গলি পার হতেই মানুষের একজীবন পার হয়ে যায়। এখন সেই অবস্থা। গলি সরু হলেও লেন দুটি। প্রত্যেকটি রিকশার মুখোমুখি আরেকটি রিকশা। শফিকের আগে থেকেই বিগড়ে থাকা মেজাজ চরমে উঠতে লাগল। ইচ্ছে করল, রিকশা থেকে নেমে হাঁটা দেবে। কিন্তু সেই উপায় নেই। কাল রাতে প্রচণ্ড বৃষ্টি হয়েছে। রাস্তার দিকে তাকাতেই কেমন যেন গা ঘিন ঘিন করে উঠল। ফিরনির মতো আঠালো, থকথকে কাদায় রাস্তা একাকার হয়ে আছে। শফিকের সমস্ত রাগ গিয়ে পড়ল দুইজনের উপর। যাদের উপর কারণে-অকারণে-অভিমানে সব অভিযোগ চাপানো যায় – আল্লাহ আর মা। কী দরকার ছিল কাল এত বৃষ্টি দেয়ার। ছোটবেলায় যখন বৃষ্টি নামত তখন কি মজাই না করত। কিন্তু এই রাজধানিতে বৃষ্টি মানে যে কর্দমাক্ত রাস্তা আর অতিশয় যানজট, তা কি সে জানে না। আবার পরক্ষণেই মনে হলো, সব দোষ আসলে তার মায়ের। কেন যে আজকে তাকে হল ছেড়ে বাসায় আসতে বলেছিল! কী দরকার ছিল মায়ের আজকে গ্রামের বাড়ি যাওয়ার। তাহলেই তো আর তাকে কষ্ট করে আজকে বাসায় আসতে হয় না।
কাল রাতে ফোন দিয়ে বলল, শফিক, তুই কালকে সকাল সকাল বাসায় চলে আসবি। আমি আর তোর বাবা কাল একটু গ্রামের বাড়ি যাব, আমাদের জমি-জমার ব্যাপারে, খুব জরুরি। শীলুকে বাসায় একা রাখা যাবে না। আমরা সকালে বের হয়ে যাব। তুই কিন্তু বেশি দেরি করিস না।
শফিক বলেছিল, মা দুই দিন পর আমার অনার্স ফাইনাল শুরু। হাতে এই দুইটা দিন। আর আমাদের বাসাতো সবসময় তালাবন্ধ থাকে। একদিনের জন্যে আর এমন কি হবে।
মা রেগে গেলেন, তুই জানিস এ বাসায় আমরা নতুন, এক মাসও হয়নি এসেছি। শীলুকে কিছতেই একা রাখা যাবে না।
তাহলে শীলুকেও নিয়ে যাও না, শফিকের পালটা যুক্তি।
আমরা কালই চলে আসব। তুই জানিস শীলু বাসজার্নি সহ্য করতে পারে না, বমি করে। একদিনের জন্যে ওকে নিয়ে যাবার কোন মানে হয় না। আর তুই বইপত্র নিয়ে আসবি সাথে করে, এখানে পড়বি, আমি তো কোন সমস্যা দেখি না। তোকে যা বললাম, তাই কর। আমি রাখলাম।
একদিকে ভাইয়ের দায়িত্ব, অন্যদিকে পরশু ফাইনাল এক্সাম। তারপর এইসব লাল দাঁত হলুদ দাঁতওয়ালা, ফিরনির মতো কাদা, সরু গলির যানজট – শফিকের মনে হল তার যদি দুটো ডানা থাকত, উড়ে চলে যেতো। কোথায় যেত? বাসায়? নাকি অন্য কোথাও? কী জানি, কোথায়। তবে এই জায়গায় অন্তত অনন্তকাল বসে থাকত না।
– আহ, মালডা তো জটিল! সুন্দর আছে!
শফিকের অনন্তকালের ভাবনায় ছেদ পড়ল হঠাৎ। সামনে তাকিয়ে দেখে একটা রিকশায় দুই লোক বসে। ঠিক রিকশায় নয়। রিকশার উপর অনেক তরিতরকারি বোঝাই, তার উপর বসে আছে লোক দুটি। ঠিক লোক নয় – একটা লোক আর একটা ছেলে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে তরকারি বিক্রি করে। দোকনের জন্যে হয়তো তরকারি কিনে নিয়ে যাচ্ছে। ছেলেটির বয়স ১৫-১৬ হবে। কথাটা ছেলেটি বলেছে। কাকে বলেছে? শফিক ছেলেটির হা-করা মুখের উপরে হা-করা দুটি চোখ অনুসরণ করল। সে চোখ যেখানে গিয়ে থেমেছে সেখানেও রিকশায় বসে আছে দুজন।একজন মহিলা আর একটি মেয়ে। মেয়েটির বয়স ১৮-১৯ হবে। কথাটি মেয়েটিকে উদ্দেশ্য করে বলা। মেয়েটি লজ্জায় মাথা নিচু করে আছে। যেন শুনেও না শোনার ভান করছে। কিংবা কাকে উদ্দেশ্য করে বলেছে এটি উৎসুক জনতাকে বুঝতে না দেয়া। তার মাকে দেখা গেলো ছেলেটির দিকে অগ্নিদৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছেন। কড়া ভাষায় কিছু একটা বললেন। তাতে তার কিছু যায় আসে বলে মনে হলো না। সে তেমনি হা-করা দৃষ্টি নিয়ে মেয়েটিকে গিলছে, সাথের ওই লোকটিও। মেয়েটির ভাগ্য ভাল, জ্যাম ছুটে গেছে। তাই তাকে আর বেশিক্ষন আর হা-করা দৃষ্টির সামনে থাকতে হলো না। শফিকের মাথায় কেমন যেন একটা যন্ত্রণা হচ্ছে। সে অস্ফুস্ট স্বরে উচ্চারণ করল, শালা বাস্টার্ড!

তিন

শফিকের রিকশা চলছে। এ বাসায় ওঠার পর এর আগে একদিনই সে হল থেকে এ বাসায় এসেছিল। সে ভার্সিটির হলে থাকে। যদিও ফ্যামিলি থাকে ঢাকাতেই, তবু যে সে হলে থাকে এর কারণ বাবা। শফিকের বাবার মতে, ভার্সিটিতে পড়ে হলে না থাকলে নাকি জীবন আট আনাই বৃথা। চোখ কান ঠিক মতো খোলে না। তার মা অবশ্য ভেটো দিয়েছিলেন। ছেলে হলে থাকুক এটি তিনি চাননি। কিন্তু চিরাচরিত নিয়ম মেনে কর্তার ইচ্ছের কাছে কর্ত্রীর ইচ্ছে পরাজিত হয়েছিল। বাসায় পৌছতে যে যে পয়েন্টগুলিতে জ্যাম পড়ার কথা তার সবগুলোই সে পেরিয়ে এসেছে। এখন আর তেমন জ্যাম নেই রাস্তায়। ফাঁকা রাস্তায় রিকশা আবার ফুরফুরে গতিতে চলতে শুরু করেছে। ফুরফুরে একটা বাতাসও গায়ে এসে লাগছে। কিন্তু তার মাথার যন্ত্রণা কিছুতেই কমছে না। কখনো তার চোখে ভাসছে রিকশায় একা থাকা সেই ক্ষীণকায় তরুণীর অসহায় ও বিব্রত মুখ, কখনো ১৯ বছরের সেই মেয়ের বিব্রত নত মাথা, তার মায়ের অসহায় অগ্নিদৃষ্টি, কিছু লাল দাঁত, কিছু হলুদ দাঁত, হা-করা মুখ, কয়েক জোড়া হা-করা চোখ। শফিক ভেবে পায় না আমাদের সমাজের মানুষগুলো এমন কেন? পরক্ষণেই আবার মনে হলো সবাই কি এমন? যারা এসব করে তাদের নিয়েই কি আমাদের সমাজ? কিছু রিকশাওয়ালা, কিছু ফেরিওয়ালা নিয়ে তো আর আমাদের সমাজ নয়। শফিকের মন কিছুটা শান্ত হয়। বাসায় গিয়ে একটা গোসল দিতে হবে।
নামবেন না? আইসা পরছি তো, বাসায় নামায়া দিতে হইব নাকি? রিকশাওয়ালার তীব্র চিৎকারে শফিকের মগ্নভাব কাটে।
ইচ্ছে করছিল এক থাপ্পরে শালার সবকটা লাল দাঁত ফেলে দেয়। কিন্তু আপাতত সেই ইচ্ছায় লাগাম দিতে হল। শফিকের শারীরিক গঠন সাহস জোগাল না। তাছাড়া মশা মেরে হাত কালো করার কোন মানে হয় না। ব্যাটা না হয় রিকশাওয়ালা, কিন্তু ভার্সিটি পড়ুয়া একজন ছাত্র হিসেবে তার তো একটা অবস্থান আছে। রিকশাওয়ালার সাথে কথা কাটাকাটি তার সাজে না। সে ভাড়া মিটিয়ে বাসার দিকে হাঁটা ধরল। সাধারণত এখান থেকে সে আরেকটি রিকশা নেয়। এখান থেকে তার বাসা পাঁচ টাকা ভাড়া, লাল দাঁতওয়ালা টাইপের কোন রিকশাওয়ালা হলে অবশ্য ১০ টাকা খসিয়ে নেয়। আজ আর কোন রিকশা নিতে ইচ্ছে করল না। পৃথিবীর সব রিকশাওয়ালার প্রতি ওর একটা ঘৃণা চলে এসেছে। পারলে সে আর কোন তরকারিওয়ালার কাছ থেকে কোনদিন তরকারিও কিনবে না। মাথায় অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে সে হাঁটা ধরল বাসার দিকে।
বাসার কাছে আসতেই শফিকের মাথার যন্ত্রণা আরো বেড়ে গেলো। কিছু বখাটে ছেলের আড্ডা চলছে। ক্যারাম খেলছে। এর আগে যখন এসেছিল তখনো দেখেছিল। বাবা যে কেন এ বাসাটাই বেছে নিলেন? উনি কি ব্যাপারটা খেয়াল করেননি? মনে মনে ভাবে শফিক।

চার

শফিক বারান্দায় বসে আছে। দখিনা বাতাস এসে গায়ে লাগছে। গোসল দেওয়ার পর অনেকটাই হাল্কা লাগছে। শীলু ওর ঘরে বসে বই পড়ছে। ওর আবার বইপড়ার খুব শখ। কার কাছ থেকে যেন হুমায়ুন আহমেদের একটা বই এনেছে, চলে যায় বসন্তের দিন। বসন্তের দিন কি আসলেই চলে যাচ্ছে? গান শুনলে কেমন হয়। রবীন্দ্রসঙ্গীতের একটা এমপি থ্রি কিনেছিল নীলক্ষেত থেকে। পরীক্ষার কারণে খুব একটা শোনা হয়নি। রবীন্দ্রসঙ্গীত নাকি মনের রাগ, দুঃখ, যন্ত্রণা, ব্যাথা, বেদনা কমিয়ে দিতে পারে – কোন একটা নাটকে দেখেছিল। দেখা যাক রবীন্দ্রসঙ্গীত থিওরি আজ কাজ করে কিনা। ঘরে ঢুকতেই রোদের আলোটা খুব চোখে লাগল। জানালার পর্দাটা টেনে দেওয়া দরকার। শফিক পর্দাটা টেনে দিতে গেল। জানালার পর্দাটা টানতে যাবে, এমন সময় শফিকের চোখ পড়ল নিচে, তাদের বাড়িটার দেয়াল ঘেষে দাঁড়ানো আম গাছটার দিকে। আজকাল ঢাকা শহরে আবাসিক এলাকায় আম গাছের দেখা পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। কিন্তু শফিকের ভাগ্য বোধ হয় আজ একটু বেশিই ভাল। অন্তত শফিকের কাছে তাই মনে হচ্ছে। আমগাছটার কয়েকটা ডাল আর পাতার ফাঁক দিয়ে তার দৃষ্টি আরো নিচে গিয়ে ঠেকল, যেখানে কোন এক মানবী তার শরীরের সব পাতা সরিয়ে তার ফলবতী বৃক্ষের সমস্ত ডাল পালা উন্মুক্ত করে দিয়েছে। রগড়ে রগড়ে তার বাকল থেকে সরিয়ে নিচ্ছে ধুলার আস্তরন। আমগাছের নিচেই পাশের বাড়ির গোসলখানা। এ বাড়ীর বাসিন্দারা সব, বোঝাই যায়, নিম্নবিত্তের মানুষ। নুন আনতে পান্তা ফুরায় তাদের জীবনে। গোসলখানায় মাথার উপরে এই আম গাছটিকে তারা ছাদ হিসেবে যথেষ্ট মনে করে। এর মাঝেই তারা তাদের মতো করে কোনমতে গোসল করার কাজটি হয়তো সেরে নেয়। কিন্তু এই মানবীর কোন রাখ ঢাক নেই। হয়তো ভেবেছে এই আম গাছের ডালপালা আর পাতাই রক্ষা করবে তার মানববৃক্ষের ডালপালাগুলিকে। কিংবা ভেবেছে এই দুপুরে কে তাকিয়ে থাকবে এই গাছের ডালপালা আর পাতার ব্যুহ ভেদ করে তার দিকে। কিন্তু শফিকের এক জোড়া চোখ আমগাছের ডালপালা আর পাতার প্রাচীর ভেদ করে ঠিকই পৌঁছে গেছে তার পাতাহীন রসাল বৃক্ষে। মানববৃক্ষ আর আম্রবৃক্ষের ডালপালা আর ফলমূল মিলে মিশে একাকার। কোন এক বিদেশি ছবিতে শফিক দেখেছিল, সুন্দরী উর্বশী তরুণী কোন এক নির্জন পাহাড়ি উপত্যকায় ঝর্নার নীচে প্রকৃতির সাথে মিলে মিশে একাকার হয়ে গিয়ে স্নান করছিল আর আড়াল থেকে এক সুদর্শন সুঠামদেহী যুবক উপভোগ করছিল প্রকৃতির অপরূপ রূপ। শফিকের নিজেকে এখন সেই যুবকের মতো লাগছে। শফিকের দৃষ্টি তরুণীর মানববৃক্ষের মগডাল থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে তার ভেজা শাখাপ্রশাখা, রসাল ফল, কাণ্ড, খাঁজ-ভাঁজ-লতা বেয়ে গোড়ালিতে গিয়ে ঠেকল। আবার আস্তে আস্তে গাছের মগডালে এসে ঠেকল। নিচে এই দ্বিপ্রহরে কোন এক আমগাছের নিচে এক উর্বশী তরুণী তার সমস্ত ভাঁজ খুলে দিয়েছে নিজেকে ধুয়েমুছে পবিত্র করার জন্যে, আর উপরে কোন এক জানালার ফাক গলে আমগাছের ডালপালা আর পাতার মাঝ দিয়ে তপ্ত সৌররশ্মির সাথে সাথে একজোড়া চোখের দৃষ্টি রঞ্জনরশ্মির মতো ভেদ করে চলেছে তার সকল শাখাপ্রশাখার ভাঁজ। বৃষ্টিস্নাত গাছের পাতা আর ডালপালা বেয়ে যেমন শিশিরবিন্দু ঝরে, তরুণীর ফলবতী বৃক্ষের ডালপালা বেয়েও যেন শিশিরের ফোঁটা ঝরছে। শফিক মুগ্ধ দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকল। একটা অদ্ভুত শিহরনে শফিকের সমস্ত শরীর আচ্ছন্ন হয়ে রইলো। তার শরীর কেঁপে কেঁপে উঠছিল। তরুণী তার ধোঁয়া-মোছার কাজ শেষে বের হল। কিন্তু যে আমগাছের উপর তার অগাধ বিশ্বাস, সেই আমগাছকে তার বিশ্বাসঘাতকতার জন্যে কোন জবাবদিহি করতে হলো না। শফিকের আবার সেই বিদেশি ছবিটির কথা মনে পড়ল। সেখানে তরুণী আর যুবক পরবর্তী কালে গভীর প্রণয়ে আবদ্ধ হয়েছিল। জীবন আর নাট্যমঞ্চের মধ্যে যে অনেক ফারাক, শফিক নতুন করে উপলব্ধি করল। তরুণী অবশ্য এর কিছুই জানলো না। নিম্নবিত্ত এক তরুণীর কাছে হয়তো-বা জীবন আর নাট্যমঞ্চের ফারাকটা অজানাই থেকে গেল।
একটা কী যেন কী শিহরণ নিয়ে শফিক আবার বারান্দায় গিয়ে বসল। কি ঘটে গেছে তা যেন সে নিজেই বিশ্বাস করতে পারছে না। দখিনা বাতাস গায়ে এসে লাগছে। শফিক চোখ বন্ধ করল। পুরো ব্যাপারটা যেন সিনেমার ফাস্ট ফরোয়ার্ডিং এর মতো স্ক্রিনে ভাসছে। হঠাৎ কিসের যেন শোরগোল, শফিকের নিমগ্ন ভাব কেটে গেলো। বারান্দার গ্রিলের ফাঁক গলে নিচে তাকাতেই দেখল, ক্যারাম খেলোয়াড়দের ঘিরে কী এক চেচামেচি হচ্ছে। এক মাঝবয়সী ভদ্রমহিলা তারস্বরে চেচাচ্ছেন, হয়তো এই ছেলেগুলিকেই কিছু বলছে আর খেলোয়াড়েরা হেসে চলেছে, আর ঘুটি মারছে কটাস কটাস। মায়ের বয়েসী একজনকে টিজ করতেও এদের রুচিতে বাধে না। একটা স্বশব্দ হাসির কোরাস। যে হাসি, হাসি শব্দটার অর্থই বদলে দেয়।
শফিকের মাথায় আবার যন্ত্রণা শুরু হচ্ছে। মনে হচ্ছে কেউ তার মাথার ভিতরে ক্যারাম খেলে চলেছে। গুটিগুলো গিয়ে বাড়ি খাচ্ছে তার মাথার এপাশ-ওপাশ। শব্দ হচ্ছে কটাশ কটাশ। মনে হচ্ছে মস্তিষ্কের শিরাগুলি এখুনি ছিঁড়ে যাবে। শফিক এবার একটু জোরেই বলল, শালা বাস্টার্ডের দল। কিন্তু কথাগুলি সে অবধি পৌঁছল না। দখিনা বাতাস বইছিল। সেই বাতাসের তোড়ে শব্দগুলি ফিরে এসে শফিকের গায়ে বিঁধল।