মনোয়ার মোকাররম > লক্ষ্ণৌ : অর্ধেক ইতিহাস অর্ধেক বর্তমান >> ভ্রমণ

0
383

মনোয়ার মোকাররম > লক্ষ্ণৌ : অর্ধেক ইতিহাস অর্ধেক বর্তমান >> ভ্রমণ

ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শ্রী চরন সিংহয়ের নামে নামকরণ। যাই হোক, বিমান থেকে নেমে লাগেজ কালেক্ট করার সময় থেকে শুরু করে বের হবার আগ পর্যন্ত পুরো সময়টাতেই বিমানবন্দরের এদিক-ওদিক তাকিয়ে খোঁজ করলাম কোথাও চোখে পড়ে কিনা লক্ষ্ণৌর সেই বিখ্যাত ট্যাগলাইন, ‘মুসকুরাইয়ে জনাব, আপ লক্ষ্ণৌ-মে হ্যায়’, অর্থাৎ ‘জনাব এবার হাসুন, আপনি লক্ষ্ণৌ পৌছে গেছেন।’
সাদাত আলীর কবর
প্লেনটা চৌধুরী চরন সিং বিমান বন্দরের রানওয়ে স্পর্শ করা মাত্রই মনের মধ্যে একটা ছোট্ট আনন্দের ঢেউ খেলে গেলো। যেন একটা অপেক্ষার অবসান। ঠিক অপেক্ষাও নয়, একটা ক্ষুদ্র অনিশ্চয়তার যেন পরিসমাপ্তি। যতক্ষণ আকাশে থাকি ততক্ষণ কেমন যেন মাটির প্রতি একটা টান অনুভব করি। মাটিতে পা পড়তেই যেন প্রশান্তি। তো চরন সিং বিমান বন্দরের চরন স্পর্শ করতে আক্ষরিক অর্থেই নবাবদের ভূমিতে পা পড়লো। মোটামুটি ছিমছাম বিমানবন্দর, খুব বেশি জৌলুশ নেই, তবে একটা কেতাদুরস্ত ভাব আছে। ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শ্রী চরন সিংহয়ের নামে নামকরণ। যাই হোক, বিমান থেকে নেমে লাগেজ কালেক্ট করার সময় থেকে শুরু করে বের হবার আগ পর্যন্ত পুরো সময়টাতেই বিমানবন্দরের এদিক-ওদিক তাকিয়ে খোঁজ করলাম কোথাও চোখে পড়ে কিনা লখনউ’র সেই বিখ্যাত ট্যাগলাইন, ‘মুসকুরাইয়ে জনাব, আপ লক্ষ্ণৌ-মে হ্যায়’, অর্থাৎ ‘জনাব এবার হাসুন, আপনি লক্ষ্ণৌ পৌছে গেছেন।’ কোথাও নজরে পড়ল না। ট্রেনে ভ্রমণ করলে শুনেছি স্টেশনে নামলেই চোখে পড়ে বড় করে লেখা সেই ট্যাগলাইন। বিমানবন্দরে সেই টাগলাইন চোখে না পড়লেও, চোখে পড়লো পাণ্ডে সাহেবের ঠোটের কোণায়। আমাকে অভ্যর্থনা জানাতে তিনি বেশ হাসি-হাসি মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। দেখে মনে হচ্ছে, উনিই লক্ষ্ণৌ’র সেই ট্যাগলাইনের জীবন্ত প্রদর্শনী হয়ে দাঁড়িয়ে। আসার আগে অল্প-বিস্তর কথা হয়েছে। নামটাই শুধু জানি, আর হোয়াটসআপের প্রোফাইলের কল্যাণে তার ছবিখানাও দেখেছি। তিনিও হয়তো তাই। সুতরাং দুজনের দুজনকে চিনে নিতে তেমন কোনই অসুবিধা হয়নি।
প্রাদেশিক সরকারের আমন্ত্রণে এসেছি, গেস্ট হাউসই ঠিকানা। গেস্ট হাউসের দিকে গাড়ি চলতে শুরু করেছে। কথায় কথায় জানা হলো আমার লিয়াঁজো অফিসার পাণ্ডেজী স্থানীয় একটি কলেজে অর্থনীতি পড়ান। আমিও অর্থনীতির ছাত্র, একটু স্বজনপ্রিয়তা পেয়ে বসলো যেন! দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে তার সংসার, সাথে অবশ্যই স্ত্রী-সহ! তবে তারা কেউই এখানে থাকে না। তিনি জানালেন কাল সারাদিনই ব্যস্ত থাকতে হবে অফিসিয়াল কাজে, সুতরাং যদি ঘুরে ফিরে কিছু দেখার ইচ্ছে থাকে তাহলে আজ বিকেলে দেখে ফেলাটাই উত্তম। ইন্টারনেট আর লোনলি প্লানেটে কিছুটা পড়ে এসেছি, তবু তাকে জিজ্ঞেস করলাম, কি কি আছে লক্ষ্ণৌতে দেখার? তিনি সেই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বললেন, লক্ষ্ণৌর লোকজন খুবই আন্তরিক। বললাম, হ্যাঁ, সেতো আপনাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে। উনিও আগের চেয়েও বিনয়ে গলে গেলেন, যেমন করে মুখে দিলেই গলে যায় লক্ষ্ণৌ’র গালাউটি কাবাব!
আম্বেদকার পার্কের প্রশস্ত, পরিচ্ছন্ন রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে গোমতী নদী পড়লো। বাইরে রোদের তেজ কিছুটা পড়তে শুরু করেছে। বিকেলের নরম রোদে শহরের গায়ে কেমন একটা নবাবি আমেজ, মনস্তাত্বিক প্রভাবে নবাবি আমেজ আমার মনকেও কিছুটা গ্রাস করে নিল। একসময় এই শহরে রাজত্ব করেছে কত নামজাদা নবাব ও তাদের বংশধরেরা। আজ সেই রামও নেই, সেই অযোধ্যাও নেই, কিন্তু তাদের ইতিহাস, আভিজাত্য, রাজকীয় জীবনধারা এখনো লক্ষ্ণৌর প্রতিটি ইমারত আর কাঠামোতে মিশে আছে, যেন চাইলেই ছুঁয়ে দেখা যায়। পুরো শহর কেমন পরিপাটি ও পরিচ্ছন্ন। রাস্তা-ঘাট ফাঁকা। পান্ডে সাহেব জানালেন, যানজট এমনিতে এই শহরে তেমন একটা নেই। গেস্ট হাউসে পৌঁছতে ২০ মিনিটের মতো লাগলো।
গেস্ট হাউসে ঢুকতেই সবাই হাসি মুখে এগিয়ে এলো। ডিউটি ম্যানেজার আসলেন। কুশল বিনিময় হলো। ভিভিআইপি গেস্ট হাউসের ১১০ নাম্বার রুম হলো আমার ঠিকানা, আগামী দুই দিনের জন্য। রুমে ঢুকে ফ্রেশ হতেই আরেকখানা হাস্যজ্জ্বোল মুখ। হাসি যেন সারাক্ষণ মুখে লেগেই আছে। পান্ডে সাহেব যদি হন স্মিতহাস্যের বিজ্ঞাপন, ইনি ভুবন ভোলানো প্রশস্ত হাসির বিজ্ঞাপন। নাম জিজ্ঞেস করতে বললো, দীনদয়াল, গেস্ট হাউসের সার্ভিস পারসন। সেই সাথে পালটা প্রশ্ন, লাঞ্চে কি খাব? আমি জানালাম, আমার তেমন ক্ষিধে নেই। লাঞ্চের সময় অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে। বিমানে যা খাবার দিয়েছে তাতে ক্ষিদে আসলেও নেই। কিন্তু তিনি নাছোড়বান্দা। তাই বললাম, আপনার যা ইচ্ছে হয় নিয়ে আসুন কিছু একটা। কথাবার্তা হিন্দিতেই হচ্ছে তার সাথে। তিনি হাসতে হাসতে চলে গেলেন এবং কিছুক্ষণ বাদে হাসতে হাসতে নানা পদের খাবার নিয়ে এলেন। সব ভেজ খাবার। দুটো খাবার চিনতে পারলাম- একটি পনির মাখানি। এখানকার, মানে পুরো ভারতেরই কমন এবং জনপ্রিয় খাবার। কিউব আকৃতির পনিরকে মশলা-তেল দিয়ে রান্না। খেতে মন্দ নয়। আরেকটি আলু- গোবী’র (ফুলকপি) মিক্সড সবজির তরকারি। চাকুরীসূত্রে দিল্লিতে বসবাসের কারণে এই দুটি খাবারে ততদিনে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। সাথে আরো অনেক রকমের ভেজ আইটেম, বিভিন্ন রকমের ডাল। মাসকলাইয়ের ডালের মতো আঠালো একধরনের ডালের তরকারি, পাণ্ডে সাহেব এবং দীন দয়াল দুজনই জোরাজুরি করলেন, এই মাসকলাইয়ের ডাল খাওয়ার জন্যে। দীনদয়ালের হাসি মুখকে সম্মান জানাতে ডাল খেলাম, সব কিছুই খেলাম। তবে পনির মাখানি আর আলু গোবীর তরকারি বেশ ভালো লাগল। শেষ ভালো যার সব ভালো তার। খাবার শেষে আসলো ছানার তৈরি সেই বিখ্যাত রাবরি, আমার খুবই পছন্দের। দীন দয়াল যাবার আগে হাসতে হাসতে জানতে চাইলো, রাতে কি খেতে চাই। বললাম, রাতে একটু শহরটা ঘুরে দেখব, ফিরতে দেরি হবে, বাইরে খেয়ে নিব। এই প্রথম দীন দয়ালের মুখের হাসি কিছুটা ম্লান দেখালো। বলেই ফেললো, খানা আচ্ছা নেহি লাগা ক্যায়া? তাকে আশ্বস্থ করতে তাড়াতাড়ি বললাম, না না, খানা বহুত আচ্ছা লাগা। তাকে নিবৃত্ত করতে বললাম, আচ্ছা, এখন বেরোই, অবস্থা বুঝে আমি আপনাকে ফোনে জানিয়ে দেব, রাতে খাব কি না। পাণ্ডেজী দীন দয়ালকে বললেন, আচ্ছা, রাত মে কুছ ননভেজ বানাদো না। দীন দয়াল তাতেও রাজি, ‘হা, হা কিউ নেহি। সব কুচ মিল জায়েগা।’ তাদের ধারণ হয়েছে, আমি যেহেতু ননভেজ, হয়তো ভেজ খেয়ে ভালো লাগেনি। আমি তাদেরকে আশ্বস্ত করলাম, উদ্বিগ্ন হবার কিছু নেই, আমি ফোনে জানাবো। কিন্তু তাতে কিছু লাভ হলো বলে মনে হলো না। দীন দয়ালের উদ্বিগ্ন ভাব একটু কিছুও কমলো না। আমি আর পাণ্ডে সাহেব বেরোলাম।
লক্ষ্ণৌর তিন শব্দের একটা পরিচিতি আছে। নবাব, কাবাব আর আদবের শহর। এই আদব শব্দটার ব্যাপ্তি আরেকটু বড়। উর্দু ভাষায় যাকে বলে তেহজিব, এটিই লক্ষ্ণৌতে বহুল পরিচিত। ইংরেজিতে বলে এটিকেট। ‘নবাবের শহর’ যদি হয় লক্ষ্ণৌর প্রথম পরিচিতি, তবে তার দ্বিতীয় পরিচিতি হলো ‘তেহজিবের শহর’। নবাবরা নেই, কিন্তু ‘তেহজিব’ এখনো বর্তমান, সেটা আপনি এখানকার যে কারো সাথে দু’মিনিট কথা বললেই বুঝে যাবেন। এই তেহজিব নিয়ে অনেক গল্প চালু আছে, যার প্রত্যেকটার সাথেই আমরা পরিচিত। সবচেয়ে জনপ্রিয় যে গল্প, সেটি হলো দুই নবাবের। ট্রেনে করে ভ্রমণ করবেন দুই নবাব, তো ট্রেনে চড়তে গিয়ে সৌজন্যতাবশত একজন আরেকজনকে আগে ট্রেনে চড়তে বলছেন। কিন্তু কেউই অন্যজনের আগে উঠবেন না। এভাবে একজন আরেকজনকে বলছেন, আর এর মধ্যে ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে। আমরা সবাই জানি এই গল্পটা, কিন্তু অনেকেই হয়তো জানিনা যে এই গল্প লক্ষ্ণৌবাসীর তেহজিব বুঝাতেই চালু হয়েছিল, আমি জানতাম না। তেহজিবের আরো কিছু নমুনা বলা যাক। যদি আপনি লক্ষ্ণৌ এসে কাউকে কোন ঠিকানা জিজ্ঞেস করেন, তবে সে আপনাকে ঠিকানা বলবে না। একদম সরাসরি ঐ ঠিকানায় আপনাকে পৌছে দিয়ে আসবে! খুব ধনী সম্প্রদায়েরও কেউ যখন কাউকে তার বাড়িতে আমন্ত্রণ জানায়, বিনীতভাবে বলে ‘মেরা গরীবখানেমে যারাসা তসরিফ রাখিয়েগা’। বলা হয়ে থাকে লক্ষ্ণৌ-তে কেউ কাউকে গালি দেবার আগেও জনাব বলে থাকে। যেমন, জনাব আপনি তো একটা মহা হারামি!
যাই হোক, ইতিহাস, ঐতিহ্য, রসনা আর তেহজিবের সমাহারে লক্ষ্ণৌ ভ্রমণপিয়াসীদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে আছে সবসময়ই। নবাবি শহর, রাজনীতির নগরী, শিল্পসাহিত্য ও সংস্কৃতির নগরী, সঙ্গীতের নগরী এবং অপরপ স্থাপত্যশিল্পের নগরী লক্ষ্ণৌ। আর এইসব কিছু মিলিয়েই লক্ষ্ণৌকে বলা হয় প্রাচ্যের প্যারিস (Paris of the East) এবং ভারতের ব্যাবিলন (Babylon of India)। কাউকেই লক্ষ্ণৌ নিরাশ করে না। হোক সে ইতিহাসবিদ, হোক সে ভোজনবিলাসী কিংবা নিছক ভ্রমণকারী। সবার জন্যই লক্ষ্ণৌ তার পসরা সাজিয়ে বসে আছে।
ভারতের ২৯টি প্রদেশের একটি উত্তরপ্রদেশের রাজধানী ও সবচেয়ে বড় শহর হল জৌলুসময় নগরী লক্ষ্ণৌ, উর্দুতে উচ্চারণ ‘লখনঊ’ বা ‘লাখনাউ’। এর ইংরেজি বানানটি বেশ মজার – Lucknow। অনেকে তাই মজা করে বলেন, লক্ষ্ণৌতে যারা আছেন, they want their luck now! এটা নিছকই একটি হাস্যরস। কিন্তু লক্ষ্ণৌর নামকরণ নিয়েও আছে বিভিন্ন মত। হিন্দু কিংবদন্তি অনুসারে, রামচন্দ্রের অনুজ লক্ষণের নাম অনুসারে এই শহরের নাম হয় লক্ষ্মণাবতী যা ক্রমে ক্রমে অপভ্রংশ হয়ে লক্ষ্ণৌতে রূপান্তরিত হয়। কেউ কেউ ধারণা করেন, স্থপতি লখনার নামই পরিবর্তিত রূপ নিয়ে লক্ষ্ণৌ হয়ে বেঁচে আছে। ইতিহাসে এও রয়েছে যে, বল্লাল সেনের পুত্র লক্ষণ সেন দ্বাদশ শতাব্দীতে নিজের নামানুসারে লাক্ষ্ণুর বা লক্ষ্ণৌর নামে একটি নগরী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে নামের ইতিহাস নিয়ে একটা মতানৈক্য রয়েই গেছে। হিন্দু পুরাণ অনুসারে, এই অঞ্চল একসময় পরিচিত ছিল অযোধ্যা হিসেবে এবং রামচন্দ্র ছিলেন অযোধ্যার রাজা। নবাবি আমলেও এই অঞ্চলকে অযোধ্যা বা আওয়াধ বলা হতো, আর তখন এর রাজধানী ছিল ফৈযাবাদ। আওধের শাসকদের তখন নবাব বলা হতো। হিন্দু ধর্মানুসারীরা ধারণা করেন যে, উত্তর প্রদেশের ফৈজাবাদে এখন যে অযোধ্যা নগরী আছে, তাই বস্তুত সেই অযোধ্যা।
আগেই বলেছি, লক্ষ্ণৌর প্রথম পরিচয় ‘নবাবের শহর’। অনেক নবাব তাদের নবাবি চালিয়েছেন এখানে। ইন্টারনেট ঘেটে মোটামুটি ১১ জন নবাবের ব্যাপারে তথ্য জানা যায়, যার শেষ নবাব ছিলেন নবাব ওয়াজেদ আলী শাহ। ওয়াজেদ আলী শাহের পর তার স্ত্রী বেগম হজরত মহল ১৮৫৭-১৮৫৮ পর্যন্ত বিদ্রোহ চালিয়ে যেতে থাকেন, সে সময়ই ঐতিহাসিক সিপাহী বিদ্রোহের সূচনা হয়। নবাবদের মধ্যে সবচে সুপরিচিত ছিলেন নবাব আসফউদদৌলা আর নওয়াব ওয়াজেদ আলি শাহ। সুনামে তাদের সমকক্ষ না হলেও সাদাত আলী খানেরও নাম-ডাক ছিলো। তবে এই তিনজনকে ছাপিয়ে এই শহর পরিচিতি পেয়েছে নবাব ওয়াজেদ আলী শাহের শহর হিসেবে। এর একটা কারণ হতে পারে যে হয়তো ট্র্যাজিক হিরোর প্রতি আমাদের হৃদয়ে একটা আলাদা জায়গা সবসময়ই থাকে। সিংহাসন হারানো ওয়াজেদ আলী শাহের সেই বোতাম খোলা বুকের ছবি তো শহরের প্রতিটি দোকানে দোকানে দেখা যায়। গাড়িতে যেতে যেতে কাচের জানালা গলে সেই ছবি চোখেও পড়লো বিভিন্ন দোকানের সাইনবোর্ডে বা বিজ্ঞাপনের বিলবোর্ডে। তবে যে লক্ষ্ণৌ নগরীর সাথে আমরা এখন পরিচিত, তার প্রকৃত রূপকার অযোধ্যার স্বাধীন নবাব আসফউদদৌলা। লক্ষ্মৌর সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে নবাব আসফউদদৌলার নাম। তার সময়েই অযোদ্ধা বা আউধের রাজধানী সরে আসে লক্ষ্ণৌতে, তার আগে যেটি ছিল ফৈজাবাদে। এই আসফউদ্দৌলার শাসনকালকেই বলা হয় আওধের স্বর্ণযুগ। ১৭৭৫ সালে লক্ষ্ণৌতে প্রথম পদার্পণ করেছিলেন নবাব আসফউদদৌলা। তারপর থেকেই লক্ষ্ণৌর বিকাশ হতে থাকে এক বহুরুপী ও বহু গুণের নগরী হিসেবে। শিল্পসংস্কৃতিতেও দিল্লির সাথে পাল্লা দিতে থাকে লক্ষ্ণৌ। উর্দু কবিতা ও শায়েরীর জন্য লক্ষ্ণৌ সুপরিচিত হয়ে ওঠে। দিল্লির সুষমা তখন কিছুটা মলিন হতে শুরু করেছে, অন্যদিকে লক্ষ্ণৌর নবাবেরা গুণীজনদের আশ্রয়দাতা হিসেবে সুপরিচিত হয়ে উঠেছিলেন, তাই তখন অনেক গুনীজনই দিল্লির কবি-সভা থেকে লক্ষ্ণৌ শহরে এসেছিলেন। লক্ষ্ণৌর সংস্কৃতির আরেকটি ধারা ছিল বাঈজী নাচ, যেটি অবশ্য নবাব ওয়াজেদ আলী শাহের লক্ষ্ণৌ থেকে কলকাতা নির্বাসনের পর পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে ধীরে ধীরে বিলীন হতে শুরু করে।
গাড়ি থামতে ভাবনায় ছেদ পড়লো। আমরা আছি এখন এক চমৎকার ইমারতের সামনে। ইমারাতকে ঘিরে মোটামুটি বড় একটা কমপ্লেক্সের মতো। ভিতরে দুই দিকে দুইটা সুদৃশ্য ইমারত। কোনটি যে কি ইমারত তা দেখে বোঝা মুশকিল। এমনকি পথে যেতে অনেক সাধারণ স্থাপনার মাঝেও নবাবি আমলের স্থাপত্যশৈলী দেখে চোখ জুড়াতে বাধ্য, কিন্তু এটি হয়তো তেমন বিখ্যাত কিছু নয়। যাই হোক, সামনের নামফলক দেখে বুঝলাম এই ইমারত বিখ্যাত। সাদাত আলী খানের কবর। সাদাত আলী খান ছিলেন আসফউদ্দৌলার ভাই। আসফউদ্দৌলার ছেলে ওয়াজির আলীর স্বাধীনচেতা মনোভাবের কারণে তাকে সরিয়ে দিয়ে ইংরেজরা ক্ষমতায় বসিয়েছিল সাদাত আলী খানকে। পরবর্তী কালে তিনি অবশ্য আর্থিক সংস্কারসহ, বিভিন্ন স্থাপত্য নির্মাণের মাধ্যমে বেশকিছু অবদান রেখেছিলেন লক্ষ্ণৌ নগরীর বিকাশে।
মাথার উপরে প্রায় ৫০ ডিগ্রি তাপমাত্রার আকাশ নিয়ে কোথাও খুব বেশিক্ষণ দাঁড়ানোর অবস্থা ছিল না। তবে একটাই রক্ষা, যে আদ্রতা কমের কারণে ঘাম না হওয়াতে এই গরমে যে একটা বিপর্যস্ত অবস্থা হবার কথা তা মনে হচ্ছিল না। এর মধ্যেই একটু দেখা, কিছু ছবি তোলার পর তাড়াতাড়ি গাড়িতে গিয়ে উঠলাম। গন্তব্য নগরীর চৌক নামক স্থানে বড়া (বড়) ইমামবাড়া। যার সাথে জড়িয়ে আছে আসফউদ্দৌলার নাম। এটি নবাব আসফউদ্দৌলার মূল প্রাসাদ। লক্ষ্ণৌতে পদার্পণের নয় বছর পর ১৭৮৪ সালে বড় ইমামবাড়া নির্মাণ করেছিলেন তিনি। চারতলা এই প্রাসাদ যেন আক্ষরিক অর্থেই এক রহস্যময় প্রাসাদ। এই প্রাসাদেরই নিচতলায় দরবার ঘরে সমাধিস্থ রয়েছেন নবাব আসফউদদৌলা ও তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী।
বড় ইমামবাড়া সন্দেহাতীতভাবেই লক্ষ্ণৌর স্থাপত্যশৈলীর সবচেয়ে বড় নিদর্শন। তবে এর নির্মাণের পিছনে যে ইতিহাস তা জানলে অবাকই হতে হয়। স্থাপত্যশৈলীর পাশাপাশি অর্থনীতিবিদদের জন্যেও এক অনুপ্রেরণা। বিশেষ করে নিজে অর্থনীতির ছাত্র হওয়ায় অর্থনীতিবিদ কেইনসের ফিসক্যাল পলিসির (আর্থিক নীতি) সাথে পরিচিত ছিলাম, যেখানে তিনি প্রবৃদ্ধির জন্যে কাজের সুযোগ সৃষ্টি এবং ব্যয় বৃদ্ধির উপর জোর দিয়েছিলেন। সেটাও এসেছিল ১৯৩০ সালের মহামন্দার প্রেক্ষিতে। কিন্তু তারও বহু আগে যে আসফউদ্দৌলা সেই তত্ত্ব দিয়ে গেছেন, লক্ষ্ণৌ না এলে এর কিছুই জানা হতো না। জানা যায়, তার সময়ে একবার খরাগ্রস্ত হয়েছিল এই লক্ষ্ণৌ নগরী। নেমে এসেছিল দুর্ভিক্ষ। নবাব চেয়েছিলেন, কোনও একটি কাজের মাধ্যমে প্রজারা যাতে নিজেদের রুটি-রুজি অর্জন করতে পারেন সেই ব্যবস্থা করতে। কাজের বিনিময়ে অর্থ ও আহার বলতে পারেন, এখন আমরা আমাদের দেশে যাকে বলি কাজের বিনিময়ে খাদ্য প্রকল্প। এই নিয়ে একটা জনপ্রিয় কাহিনিও চালু আছে শহরে। নবাবের নির্দেশেই সারাদিনের কাজ রাতের বেলা ভেঙে তছনছ করা হতো। একদল শ্রমিক দিনের বেলায় নির্মাণ কাজ করতেন, রাতের বেলায় আরেক দল শ্রমিক সেই স্থাপনা ভেঙে দিতেন। ফলে পরদিন সকালবেলা কাজ শুরু হতো সেই গোড়া থেকে। লোকজনকে লাগাতার কাজে নিযুক্ত রাখার এই উদ্যোগ মানুষের কাছে ভীষণ জনপ্রিয় করেছিল এই নবাবকে। তার প্রশংসায় একটা কথাও চালু হয়ে গিয়েছিল সে সময়, ‘জিসকো না দে মওলা, উসকো দে আসফুদ্দৌলা’। অর্থাৎ ঈশ্বর যদি কাউকে নিরাশ করেন, তাদের জন্য কিছু জোগান আসফউদ্দৌলা। এভাবেই তৈরি হয় বড় ইমামবড়া। পাশাপাশি নগরীকে বহিরাগত সেনাদের হাত থেকে রক্ষা করাও ছিল অন্যতম উদ্দেশ্য। আর এ দুই উদ্দেশ্য পূরণ করেই গড়ে উঠেছিল বড়া ইমামবাড়া, হযরত ইমাম হোসাইনের (স) নাম অনুসারে এবং কারবালার ময়দানে তার সুমহান আত্মত্যাগের মহিমাকে স্মরণ করতে, যা পরবর্তী কালে নবাবি স্থাপত্যের এক অনুপম নিদর্শন হিসেবে অপার বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে।
কভারের ছবি : উপরের ছবিটা আসফউদ্দৌলার, নিচের ছবিটি সাদাত আলীর ইমামবাড়ার
[চলবে]