মনোয়ার মোকাররম > শবপুষ্প >> ছোটগল্প >>> উৎসব সংখ্যা ১৪২৬

0
536
এই প্রথম আমরা বারান্দায় বসেছি একসাথে।
ছয় ফুট বাই পঁচিশ ফুট বারান্দাটা বেশ প্রশস্ত। এখানে বসে সামনের পুরো ভিউটা পাওয়া যায়। তবে বারান্দার সামনের গাছগুলোর কারণে বাইরে থেকে কেউ বারান্দায় কী হচ্ছে দেখতে পারেনা। এটা একধরনের বাড়তি সুবিধা।
বারান্দাটা আমার খুব প্রিয় তা বলা যাবে না। আসলে বারান্দা নিয়ে আমার কখনোই কোন আগ্রহ ছিল না। এ বাসায় কোন বারান্দা না থাকলেও যে আমি খুব দুঃখিত হতাম তা নয়।
প্রিয় বা অপ্রিয় যাই হোক বারান্দাটা বেশ সুন্দর করে গোছানো। পুরো আয়তাকার বারান্দাটা সোখিন টবে বিভিন্ন রকমের গাছ দিয়ে ঘেরা। মাঝখানে দুটি চেয়ার আর একটি ছোট্ট টেবিল, যেখানে বসে চাইলে দুজন মিলে গল্প করতে করতে চা কফি খাওয়া যায়।
চারিদিকে মাথার উপর বেশকিছু টব ঝোলানো, যেগুলোর ভিতর থেকে লতানো গাছ ঝাঁকড়া চুলের আকৃতি নিয়ে এদিক সেদিক ঝুলে রয়েছে। কিছু ফুলের গাছও রয়েছে। সব গন্ধহীন, সিসনাল। তাদের আয়ু বড্ড স্বল্প। তবে সুগন্ধী গাছও রয়েছে। একটা বেশ বড়সড় গামলার মধ্যে হাসনাহেনা ফুলের গাছ। হাসনাহেনা আমার অত্যন্ত পছন্দের, আমার স্ত্রী লাগিয়েছে। আমার জন্যই লাগিয়েছে। রাতের বেলা বাতাসের সাথে সাথে পুরো ঘরে যখন হাসনাহেনার রেনু উড়ে বেড়ায়, তখন কেমন পাগল পাগল লাগে।
আমার স্ত্রী অনেকটা অবাকই হয়েছে।
আশ্চর্য হলেও সত্যি, এই বারান্দাটায় আমার কখনো বসা হয়নি। আমাদের বিয়ে হয়েছে সাত বছর হলো। বিয়ের পরপরই আমরা এই বাসাটায় উঠি। দুই রুমের ছোট্ট ছিমছাম ফ্লাট। ফ্লাটটি অবশ্য আমার কেনা না, কিংবা পৈত্রিক সূত্রে প্রাপ্তও না। এটা আমাদের বিয়েতে আমার শশুর সাহেব উপহার হিসেবে দিয়েছেন। আমি যে ব্যাংকে কাজ করি, এটা তার একদম কাছে। অবশ্য এটা এমন কোন সুবিধা নয়। অফিসের কাছে বাসা রাখতে যে আমি সব সময় এই ব্রাঞ্চেই বা এই ব্যাংকেই কাজ করবো তা নয়। ব্যাংকের চাকুরিতে শাইন করতে হলে এক জায়গায় থিতু হওয়া যাবে না। আজ এ ব্যাংক, তো বছর দুয়েক পর অন্য ব্যাংক, ফের আবার পুরনো ব্যাংক। এভাবেই দ্রুত আপার র্যাং কে না যেতে পারলে ব্যাংকিং ক্যারিয়ার এ কেউ সফল হতে পারবে না। এভাবেই আজকাল সবকিছু চলছে। কোথাও থিতু হবার সুযোগ নেই।
আসল কথায় ফিরে আসি। আমাদের ছোট্ট ছিমছাম ফ্লাটের বারান্দায় গত সাত বছরেও আমার আসা হয়নি, কিংবা চেয়ারটাতে বসে আমার স্ত্রীর সাথে এককাপ চা খাওয়া হয়নি। ঘটনা অস্বাভাবিক মনে হতে পারে, তবে ঘটনা সত্য।
তবে আজ বসেছি। এই মুহূর্তে আমাদের দুজনের সামনে দুই মগ চা-ও রয়েছে।
আমি অবশ্য এমনিতে চা-কফি পছন্দ করি না, খাইও না। আমার স্ত্রী খুব চা-কফি পছন্দ করে। তার দিনের বেশিরভাগ সময় কাটে চা-কফি খেয়েই, এই বারান্দাতেই। আমি সপ্তাহের পাঁচ দিনই বাসায় থাকি না। তখন সে এই বারান্দায় থাকে। যখন আমি ঘরে থাকি তখনো দৃশ্যপটের খুব একটা পরিবর্তন হয় না।
আজ ভিন্ন দৃশ্য। আমি বারান্দার দুটি চেয়ারের একটি চেয়ারে বসে আছি। আমার হাতে কফি মগে লেবু চা, আমি নিজে বানিয়েছি। লেবু চা বানানো খুব সহজ। প্রথমে ওয়াটার হিটারে পানি গরম করে নিয়েছি, দুই মিনিট লেগেছে। তারপর লেবু চিপে রস ঢেলে চিনি দিয়েছি। আমার স্ত্রী কড়া চিনি দিয়ে চা খায়, আমি হালকা চিনি দিয়ে খাই, তবে আজ আমার মগেও বেশি করে চিনি আর লেবু দিয়েছি।
কথা না বলতে বলতে হয়তো আমরা কথা বলা ভুলেই গিয়েছি। আমিই নীরবতা ভাঙলাম।
– হাসনাহেনা ফুলের গন্ধটা খুব চমৎকার, তাই না?
– হুম। পৃথিবীর সব ফুলের গন্ধই চমৎকার।
– কথাটা পুরোপুরি ঠিক না। পৃথিবীতে অনেক ফুল আছে যাতে কোন গন্ধই নেই।
– তা ঠিক। তবে যেসব ফুলে গন্ধ আছে মোটামুটি সব ফুলের গন্ধই ভালো।
– তাই কি ?
– হুম, আমারতো তাই মনে হয়।
– তোমার ধারণা পুরোপুরি সত্য নয়। পৃথিবীতে অনেক ফুল আছে যাদের গন্ধ খুব তীব্র এবং অসহ্য। অবশ্য এমন মানুষও হয়তো পাওয়া যাবে যাদের কাছে ওইসব ফুলের গন্ধও চমৎকার। পৃথিবীতে এবসল্যুট বলে কিছু নেই। যেমন আমার এক বন্ধু ছিলো যার কাছে কেরাসিনের গন্ধ খুব চমৎকার লাগতো। রিলেটিভ সেন্সে হয়তো পৃথিবীর সব ফুলের গন্ধই কারো না কারো কাছে ভালো লাগবে। কিন্তু যদি তুমি মেজরিটির পছন্দ-অপছন্দ কাউন্ট করো, তাহলে পৃথিবীতে বহু ফুল আছে যাদের গন্ধ খুব একটা ভালো নয়।
– বুঝলাম। হঠাৎ ফুলের গন্ধ নিয়ে লেগেছ কেন?
– কোন কারণ নেই। এমনি। আচ্ছা তুমি কি জানো, পৃথিবীতে একধরনের ফুল আছে যার গন্ধ অবিকল গলিত লাশের মতো?
– নাতো, শুনিনি। তবে আমার ধারণা তোমার এই ফুলের গন্ধ ভালোই লাগবে।
– কেনো তোমার এমন ধারণা হলো?
– এমনি মনে হলো, কোন কারণ নেই।
– এই ফুলের নাম কর্পস ফ্লাওয়ার। বাংলা নামটাও খুব সুন্দর- শবপুষ্প। লাশ ফুল আর কি! লাশ ফুলের চাইতে শবপুষ্প শুনতে ভালো লাগে।
– এই ফুল কি মানুষ বারান্দায় টবে চাষ করে। তাহলে আমাদের বারান্দায়ও চেষ্টা করতে পারি।
– নাহ, লোকালয়ে এই ফুলের চাষ হলে টিকে থাকা মুশকিল। এই ফুলের গাছ পাওয়া যায় গভীর বনের ভিতরে, লোকালয় থকে অনেক দূরে। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ফুল এটি। স্বাভাবিক ভাবেই, সব বনে পাওয়া যায়না, অত্যন্ত দুর্লভ, আবার ফুলও ফোটে প্রতি দশ বছর পর পর। ফুল ফোটার একদিনের মধ্যেই আবার তা শুকিয়ে মিলিয়ে যায়। মানুষের কাছে এই ফুলের গন্ধ অত্যন্ত বিকট হলেও কীটপতঙ্গের কাছে তা অন্ত্যন্ত লোভনীয়। সর্বশেষ এই ফুল ফুটেছে শিকাগোর এক উদ্ভিদ উদ্যানে। কলার থোরের মতো দেখতে বিকট আকৃতির ফুল। ইন্টারেস্টিং না?
– হুম
– আমার কি মনে হয় জানো?
– কি?
– একেক জন মানুষ একেকটি পুষ্প। কেউ রজনীগন্ধা, কেউ গোলাপ, কেউ হাসনাহেনা, কেউ বেলি, কেউ ধুতরা, কেউ বা আবার কর্পস ফ্লাওয়ার, মানে শবপুষ্প। তুমি কিন্তু কোন কথা বলছনা? কেন? তোমার কি এখানে বসতে খুব খারাপ লাগছে? আমার সাথে?
– নাহ, তা কেন? আমি তো এখানে প্রায়ই বসে থাকি।
– হুম, কিন্তু তখন তো আমার সাথে বসে থাক না। একা বসে থাকা আর আরেকজন মানুষের সাথে বসে থাকায় অনেক পার্থক্য।
– তুমি খুব অস্বাভাবিকভাবে কথা বলছ? তুমি কি বুঝতে পারছো?
– হুম। বুঝতে পারছি। মাঝে মাঝে একটু অস্বাভাবিক কথা বললে কিচ্ছু হয় না। আচ্ছা, তুমি তো আমার সাথে অনেক দিন আছো? তুমি কি আমার থেকে কোন গন্ধ পাও? গোলাপ, বেলি, ধুতুরা বা কর্পস ফ্লাওয়ার?
– তুমি পাও আমার থেকে?
– আমি তোমার থেকে উত্তর চাচ্ছি। পাল্টা প্রশ্ন নয়। আচ্ছা ঠিক আছে, বলতে হবেনা। আমার নিজের কাছেই নিজেকে আজকাল একটা শবপুষ্পের মতো মনে হয়। বেঁচে আছি, কিন্তু বেঁচে নেই। পঁচা-গলা-গন্ধ বের হয়। হাসছো কেন?
– হাসছি না।
– হাসছো। তোমার এই হাসিটা আমার খুবই অপছন্দ। বিদ্রুপের হাসি। অবশ্য তুমি যখন সত্যি সত্যি হাসো সেই হাসিটা আমার খুবই পছন্দের।
– তুমি আমার হাসি দেখো?
– দেখাদেখির ব্যাপারটা আপেক্ষিক। চা খাও।
– হুম। চা খুব ভালো হয়েছে।
– হুম, আমারও তাই মনে হচ্ছে। ভালোই হয়েছে।
– তুমি এতো ভালো চা বানাতে পারো আগে জানলে তোমাকে দিয়েই চা বানাতাম। আমি চা খাই বটে, কিন্তু আশ্চর্য হলো আমি খুব ভালো চা বানাই না।
– তাই? ইটস সো নাইস অফ ইউ। এখন থেকে আমি তোমাকে প্রতিদিন চা বানিয়ে খাওয়াতে পারি।
– সেটা সম্ভব নয়।
– কেন?
– কেন সেটা তুমিও জানো।
– তুমি খুব বুদ্ধিমতি।
– আমি জানি আমি খুব বুদ্ধিমতি। তুমিও অসম্ভব বুদ্ধিমান। আমাদের সমস্যা সেটাই। দুজন খুব বুদ্ধিমান ধরনের মানুষ একসাথে পড়ে গেছি। একজন একটু বোকাসেকা হলে খুব ভালো হতো।
– আমার খুব ঘুম ঘুম পাচ্ছে। তুমি কি শবপুষ্পের কোন গন্ধ পাচ্ছ?
– নাহ্।
– আমি পাচ্ছি। আচ্ছা, তুমি কি কাঁদছ?
– নাহ, আমি কাঁদছি না।
– আমার মনে হয় তুমি কাদঁছ। এই কান্না দুই রকমের হতে পারে। একটা হতে পারে আনন্দ অশ্রু। আরেকটা হতে পারে বেদনার অশ্রু। আমি ধরে নিলাম এটা বেদনার অশ্রু। তুমি কি আমার পাশে একটু বসবে?
– নাহ। কিছুক্ষণের মধ্যে বাসায় একটা হৈচৈ শুরু হবে। আত্মীয়-স্বজন আসবে। পুলিশও আসবে হয়তো। আমার এই পোশাকটা পালটে ফেলা উচিত, ভালো কিছু পড়া উচিত।
আমার স্ত্রী পোশাক পাল্টাতে বেডরুমে গেলো। আমার ঘুম একটু একটু করে গাঢ় হতে লাগলো। আধো আধো ঘুমে আমি বারান্দার গ্রিলে ঝোলানো লতানো গাছটার ফাঁক দিয়ে দেখলাম একখণ্ড মেঘ এসে চাঁদটাকে আড়াল করে দিলো। আমি প্রাণপনে চাইছি মেঘ সরে গিয়ে চাঁদটা আবার দেখা যাওয়া পর্যন্ত আমি জেগে থাকি। কিন্তু ততক্ষণে বারান্দার সবগুলো গাছ থেকে কর্পস ফ্লাওয়ারের গন্ধ বের হতে শুরু করেছে।