মাসরুর আরেফিন >> যা একবার চলে তা চলতেই থাকে >> দীর্ঘকবিতা

0
218

যা একবার চলে তা চলতেই থাকে

এক লোক কারওয়ান বাজারের মোড়ে বুক চিরে
দেখাতে চাইছে যে সে খায়নি বহুদিন ভালো করে
এবং আবার সে কবে পছন্দের খাবার খেতে পাবে,
এই নিয়ে তার মনে বিস্ময় ও জিজ্ঞাসা ঘোরে।

প্রশ্ন হল এরকম সাধারণ এক বিষয় নিয়ে,
যেমন কালিচরণ আছে লাইটারের খোঁজে,
যেমন কেউ দুই নৌকায় আছে পা দুই দিকে দিয়ে,
অতএব শরীর মাঝখান থেকে স্বভাবতই ছিঁড়ে যাবে —
তো এরকম সাধারণ সত্যকে কেন্দ্র করে
চিরে কেন দেখাতে হবে বুক আলাদা করে করে?

সেই ব্যাখ্যাটা যদি চাও, যাও রাজার দরবারে —
সেখানে অনন্তলতা ঘেরা মালার মতো বহু সিঁড়ি
বহু ধাপ পার হয়ে শেষে
দেখবে যে ওরা তোমাকে ক্ষুধার্ত পিপাসার্ত দেখে
অবাক হচ্ছে না মোটে।
উল্টো ওরা নিজেরাই বিস্মিত এই লোক বুক চিরেছে দেখে,
কারণ এধরনের লোকের বেদনা ও কান্নাকে
ওরা ন্যাচারাল জাস্ট ন্যাচারাল বলে ভেবে
বরং বলে হেসে হেসে—
‘তোমার জবাফুল এইভাবে বের করলে কেন খোকা
তাও সামান্য প্রিয় খাবারের লোভে?‘

চেরা-বুককে যেইমাত্র ডাকা হল জবাফুল নামে,
যদিও তারা জবা নামে চেনে না ফুলটাকে,
‘হিবিস্কাস রোজা’ বলল ওরা, যেহেতু পুরোটা বিজ্ঞান বটে!
তখনই কাব্যমুহূর্ত সৃষ্টি হয়ে গেল —
তখনই আকাশের তারা ওই লোকের পক্ষ নিয়ে
বলে দিল শান্ত সমাহিত ব্রহ্মাণ্ড এভাবেই চলে থাকে।

হ্যাঁ, পৃথিবীতে যা একবার চলে তা চলতেই থাকে,
যে একবার জন্ম নেয় ক্ষুধা ও পিপাসাতে
চিরকালই সে যেন থেকে যায় তাতে,
চিরকালই সিরিয়াল ছাড়া রোগী চেম্বারের বাইরের দিকে,
যেমন লাল পলাশ থাকে যেই রোডে
সেই রোডে অন্য ফুল থাকলেও লাল পলাশই শুধু থাকে।

এমনই লেখা আছে এরকমই কথা
তোমরা সিস্টেম বলো যাকে,
ধরো যাকে মাধুরীলতা নামে বলো,
আমরা বলি ইরাবেরা, এরাবেরা—ওই একটা হলো,
একে অন্যায়-ক্ষমতা নামেও ডাকা হয়ে থাকে।
এখন ধরো ক্ষমতা তুলে নেওয়া হল
ছেঁড়া হল আইনের বইগুলো,
তাহলেই মনে করো সব
ঠিক হয়ে যাবে—ভুলগুলো?
মুছে যাবে বুকের লাল-কালো দাগ যত আছে?
আর তাতেই জবাগুলো রূপ নেবে সাদা শেফালিতে?

‘শেফালি’ বলতেই ফের এক দফা
কাব্যমুহূর্ত তৈরি হয়ে আসে,
কারণ আকাশের অত তারার মাঝ থেকে ছোট এক তারা, অন্ধক নাম,
সে কিনা এইভাবে
উন্মোচিত করে মানুষের আশা ও অস্থিরতা,
চোখ খুলে বলে দেয় সোজাসুজি —
আমরা থেকে যাব তোমাদের থেকে বহুকাল বেশি
আছিও বেশি কাল ধরে,
তাই অভিজ্ঞতা থেকে বলি —
কেউ না কেউ রাজা থেকেই তো যাবে,
হয়তো অন্য নামে তাকে ডাকা হবে শুধু,
অতএব কী খাওনি তা নিয়ে
সাধারণ কথা না বললেও তো পারো।

তখনই ব্রুক ব্রাদার্সের জামা
তখনই সিল্কের শাড়ি
তখনই ঘড়িয়া খাল ও ঘন্টেশ্বর নদী
সবই সার্ক ফোয়ারার পাশে
সকলে নাচছিল
যেহেতু ওটা কাব্যমুহূর্ত ছিল।

তাই মাইকে এটাও বলা হল—খাওয়ার কাজ আদতে
পশুদের মতো কিম্বা অর্থহীন লীলাখেলা
আহা এড়িয়ে যাওয়া যেত যদি
জীবনের হায়ার পারপাজে বিশ্বাস করে!
আর সেটাই তো কথা —
খাওয়া ও দাঁত ব্রাশ করে করে জীবন কীভাবে মানুষের মতো হবে?
হলে তা গরিলাদের মতো হতে পারে।

কারণ সবই আপেক্ষিক কথা, এই যেমন জবা শেফালি হয়ে গেল
এই যেমন চেঙরাইল বেড়ে শিবসায় পড়ে হল ঘন্টেশ্বর নদী
চাইলে গোল্লার খালও হতে পারত গোল্লার খালও —
এই যেমন যে লোক গুলশানে থাকে তাকে যদি জিজ্ঞাসা
করো ঢাকার বেড়িবাঁধের কথা
সে ভাববে তুমি কথা বলছ কঙ্গোকে নিয়ে, হাহা —
সবই আপেক্ষিকভাবে এইভাবে
তৈরি হয়ে বসে থাকে কুকুরের মতো ভাল্লুকের মতো করে
যেমন ওই যে নক্ষত্র, সে জানে
যারা পৃথিবী থেকে চলে গেছে এবং চলে গিয়ে
এখন পৃথিবীর ওপর দিয়ে উড়ে বেড়ায় রাতে
এখানে কাজ ফেলে যাবার দুঃখ ও অভিমান থেকে,
তাদের তো কোনো অভিযোগ নেই পৃথিবীকে নিয়ে।
তারা তো সবই ভালো বলে একে নিয়ে সবই তো ভাল বলে —

তাই তো বলি, পৃথিবী অত খারাপই যদি হত
যদি বুক চিরেই দেখাতে হত নালিশ যত আছে,
তাহলে বল কীভাবে সেই কালিচরণ আজও থাকে
তার লাইটারের খোঁজে —
কেন এবং কোন মায়া থেকে?