মাসুদুজ্জামানের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে জয় গোস্বামী > “অপমানের উত্তর মনের মধ্যে কবিতার মতো কল্লোলিত হতো…” >> পর্ব ১

0
270

পর্ব ১

[সম্পাদকীয় নোট : আজ কবি জয় গোস্বামীর জন্মদিন। ১৯৫৪ সালের ১০ নভেম্বর পশ্চিমবঙ্গের রানাঘাটে তাঁর জন্ম। গত শতকের সত্তর দশকে বাংলা কবিতায় তাঁর আবির্ভাব ঘটে। গত চার দশক ধরে কবিতা লেখার পাশাপাশি উপন্যাস ও গদ্যও লিখেছেন। বাংলা কবিতায় স্বতন্ত্র স্বর, শৈলী ও বিষয়বৈচিত্রের কারণে অনেক আগেই কবি-প্রতিষ্ঠা অর্জন করেছেন। লিখে চলেছেন এখনও। দু’বছর আগে জয়ের বন্ধু তীরন্দাজ সম্পাদক মাসুদুজ্জামান কলকাতার সল্টলেকে তার বাড়িতে বসে পরপর তিন দিন কয়েক ঘণ্টার দীর্ঘ সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। সেই সাক্ষাৎকারটির প্রথম পর্ব জয়ের জয়ের জন্মদিন উপলক্ষে এখানে প্রকাশিত হলো।]

মাসুদুজ্জামান : তোমার সঙ্গে আমি তোমার কলকাতার সল্টলেকের বাড়িতে বসে কথা বলছি এবং তোমার কবি হয়ে ওঠা, তোমার জীবনযাপন, তোমার লেখালেখি, বাংলা কবিতা কিংবা বাংলা সাহিত্য, সব মিলিয়ে তোমার কাছে আমার কিছু জিজ্ঞাসা আছে – সেগুলো তুমি আমাকে বললে পাঠকদের কাছে তোমাকে আরো ভালোভাবে উপস্থাপন করার বিষয়টা ঘটবে বলে আমি মনে করি। সে জন্যে যেটা আমি তোমাকে প্রথমেই জিজ্ঞেস করতে চাইছি সেটা হচ্ছে, এই যে তোমার জীবন- কবি হয়ে ওঠা বা লেখালেখির জীবনযাপন- তুমি নিজের মতো করে যদি বল কেন এই জীবনটা বেছে নিয়েছো? এর পেছনে তোমার কী ভাবনা কাজ করছিল? অনেকেই তো অনেক কিছু ভাবে, আমার জীবনটা যদি এরকম হয় বা অন্যরকম, তাহলে বেশ হতো। তোমার কাছে লেখালেখিটা মুখ্য হয়ে উঠেছিল কখন এবং কীভাবে? এটা খুব সাদামাটা প্রশ্ন, কিন্তু একটা মৌলিক জায়গা থেকে প্রশ্নটা করছি, লেখকের জীবন সব দিক থেকে আলাদা হয়ে ওঠা, লেখক হিসেবে আলাদা হয়ে ওঠা এবং যে জীবনটাকে সে গ্রহণ করে, সেই জীবনে কতদূর যেতে পারবেন, একটা বয়সে কিন্তু বোঝা যায় না। এরকম অবস্থায়, কারো হয়তো মনে হতে পারে, আমি কী পৌঁছুতে পারবো, আমি কী একজন লেখক হয়ে উঠতে পারব- এই শঙ্কাটা বা ভাবনাটা কিন্তু থাকে। সেই জন্যেই অনেকে মনে করেন এই প্রশ্নটা খুব সহজ, কিন্তু আমি মনে করি সহজ নয়। এই জীবন বেছে নেয়াটাই একটা কঠিন ব্যাপার। এটা তোমার কেন মনে হয়েছিল যে এরকম একটা জীবন তুমি বেছে নিতে পারো?

জয় গোস্বামী : এই জীবন আমি বেছে নিয়েছি, বলা ঠিক হবে না। বরং বলা উচিত যে অপরিকল্পিতভাবে চলতে চলতে জীবনের মধ্যে পৌঁছেছি। মনে কিছু কথা আসতো, কিছু কথা মনের মধ্যে তৈরি হতো, সেটা ঠিক কী, আমি নিজে জানিনা। কয়েকটা লাইন ছাড়া-ছাড়া ভাবে ঘোরাফেরা করছে, কিন্তু সেই লাইনগুলোকে গুছিয়ে লিখতে গেলে আরো অন্যরকম হয়ে উঠছে। এরকম একটা কন্ডিশনের মধ্যে পড়ে কবিতা লেখা মুখ থুবড়ে পড়ে। তারপরও এই নেশাটাকে আর ছাড়তে না পারা, এভাবেই শুরু।

মাসুদ : তাহলে কি পড়তে পড়তেই, অর্থাৎ পড়াশোনা করতে করতেই কি তোমার মধ্যে এই কথাগুলো তৈরি হতো? কবিতা তৈরি হতো?

জয় : পড়তে শুরু করেছি অনেক পরে, আমার আসলে মনে যা ঘুরতো, আর বাইরের জীবনটায় আমি যেমন থাকতাম, দুটো একরকম ছিল না। আজকে, এই বয়সেও, দুটো একরকম নয়। একটা আছে, যে জীবনটা তুমি আমার দেখতে পাচ্ছ বা অন্যরা দেখতে পাচ্ছে, এমনকী আমিও দেখতে পাচ্ছি, আরেক জীবন সমান্তরালভাবে বয়ে চলেছে- একটা গোপন অন্তরজীবন। হয়তো সেই অন্তরজীবনের চাপ, তখন বুঝতে পারতাম না, আমার মাথার মধ্যে কতকগুলো কথা নিয়ে আসতো, কতকগুলো বাক্যের সমষ্টি, সেগুলো না লিখে উপায় থাকত না। ফলে, লেখা হতো, লিখতাম।

মাসুদ : এখন, ধরো, কোনো ধরনের প্রস্তুতি বা পঠন-পাঠন কি তোমাকে লেখালেখিতে টেনে এনেছে?

জয় : লেখালেখিতে এসেছি বা কবিতা লেখা শুরু করেছি কয়েকটা কবিতার বই পড়ে, এমন নয়। বরং জীবন, বেঁচে থাকার মধ্যে, অনেক না-বলা-কথার জায়গা তৈরি করেছে, যে-কথাটা নিজে থেকে পরিস্কার করে অন‍্য লোককে বলতে পারব না, এমনকী অনেক কথা নিজেও বুঝতে পারছি না, কিন্তু কথাগুলি বলতে ইচ্ছে করছে, সেইখান থেকে লেখালেখিতে আসা। আরো অনেক কবিতা পড়তে পড়তে আমিও কয়েকটা কবিতা লিখলাম, ঠিক এইরকম নয় জিনিসটা। আমি লিখতে শুরু করার পরে আমার কবিতা পড়ার অভ্যাসটা তৈরি হয়।

মাসুদ : তাহলে তোমার যখন প্রথমে কিছু কথা তৈরি হয়েছিল নিজের মধ্যে, এইটে কীভাবে হয়েছিল এবং কী ধরনের একটা, আমি অনুপ্রেরণা বলবো না, ভাবনা কাজ করছিল, না এই কথাটা আমার বলতেই হবে, বলা দরকার, সেই কথাগুলো আসলে কী ছিল যা তুমি বলতে চাইছিলে?

জয় : কথাগুলো কী ছিল, কী কথা থাকবে, কবিতা লেখার আগে আমি সেটা বুঝতে পারিনি। কবিতা লিখতে লিখতে আমি যখন পঞ্চম লাইনে আছি, তখনও আমি জানি না সপ্তম-অষ্টম লাইন কিরকম হবে। ধরো, কোনো একটা কবিতার মধ্যে আমি কাজ করছি, লিখছি কবিতাটা, তখনো আমি জানিনা কবিতাটা সতেরো লাইনে শেষ হবে, নাকি চব্বিশ লাইনে, নাকি একত্রিশ লাইনে। অর্থাৎ সমস্তটাই একটা অনির্দিষ্ট অন্ধকার পথের মধ্য দিয়ে হাতড়াতে হাতড়াতে চলা, এই বাষট্টি বছর বয়সেও। কবিতা লেখার শুরুতেও এরকমটাই ছিল। আর আমি কবিতা লিখবো ভেবে কাগজ কলম নিয়ে লিখতে শুরু করলাম, যা খানিকটা ডায়েরির মতো বলা যায়, এভাবে লিখেছি তা নয়। বরং আমার বেলায় যা ঘটেছিল সেটা হলো, আমার তো শারীরিক অসুস্থতা ছোটবেলা থেকেই আছে, তার ফলে, বুঝি, পৃথিবী দু’রকম মানুষে ভাগ হয়ে গেছে। কেবল ধনী এবং দরিদ্রই নয়, সুস্থ এবং অসুস্থ, যে দীর্ঘদিন ধরে কোনো না কোনো ভাবে শারীরিক অসুস্থতার সম্মুখীন, তাকে সুস্থ মানুষেরা পুরোপুরি বুঝতে পারেন না। সুস্থ মানুষদেরও অসুস্থ মানুষেরা পুরোপুরি বুঝতে পারেন না। এবার আমার ক্ষেত্রে অসুস্থতাটা, প্রাথমিকভাবে ধাক্কা হয়ে উঠেছিল, অন্যদের কাছে অপমানিত হতে হতে এবং সেই অপমানের উত্তর মুখে না দিতে পেরে চলে আসতাম, ফিরে আসতাম, মনের মধ্যে তখন কথারা কবিতার মতো কল্লোলিত হতো। কাগজ কলম নিয়ে সেগুলো লিখতাম।

মাসুদ : তার মানে একধরনের আঘাত বা কেউ তোমাকে অন‍্য চোখে দেখছে, সাধারণ সুস্থ মানুষ হিসেবে দেখছে না, এরকম পরিস্থিতিতে তোমার মনের মধ্যে যে যন্ত্রণা ঘনিয়ে উঠতো…

জয় : শুধু শারীরিক অসুস্থতা থেকে নয়, আমি বলছি যে আমার সমসাময়িক বন্ধুবান্ধব, আত্মীয় স্বজনদের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারতাম না। ফলে, খানিকটা হেনস্থা আমাকে হতে হতো। তাদের দিক দিয়ে দেখতে গেলে তারা স্থির স্বাভাবিক সামাজিক বুদ্ধিতেই কাজ করত। আমার কাছে সেটা আঘাতের মতো হয়ে আসতো। দোষটা আমার।

মাসুদ : সেটা ঠিক কী ধরনের ছিল, একটু বলবে?

জয় : ওই যে আমি বললাম…।

মাসুদ : মানে, ধরো, তোমাকে কোন কথাগুলি আহত করত, বা মনে হতো যে এই কথাটা আমি কেন শুনবো? তোমার খারাপ লাগাটা ছিল কী ধরনের?

জয় : মানুষ যখন নিজের সম্পর্কে খারাপ কথা শোনে, তখন তার প্রথমেই মনে হয় আমি কেন শুনবো। এই ধরনের মনোভাব আমার চুয়ান্ন-পঞ্চান্ন বছর বয়স পর্যন্ত ছিল, তারপর এখন মনের সেই ভাবটা চলে গেছে। এখন আমি ভাবি, নিশ্চয়ই আমার মধ্যে অনেক অপারগতা আছে, দোষত্রুটি আছে, তার জন্য এত সব মানুষ কথাগুলো বলছে।

মাসুদ : তুমি তো, ধরো, প্রশ্নটা অবান্তর, তবু বলি, তুমি তো স্কুলে খুব যেতে না বা যাওয়া হয়ে উঠতো না। তার জন্য কী অনেকে অনেক কথা বলতো, এবং একা হয়ে যেতে, নিঃসঙ্গ হয়ে যেতে বা মনে হত কী যে আমি আর দশজনের সঙ্গে তো মিশতে পারছি না, বা মিশিও না, তো ওই সময়টা কি…

জয় : মিশতে পারছি না, না। চেষ্টা করেছি…

মাসুদ : হ্যাঁ চেষ্টা করছো, ব্যর্থ হয়েছো এবং একা হয়ে গেছ, নিঃসঙ্গ হয়ে গেছ; তখনই কি তোমার মনের ভেতরে অনেক কথা ঘনিয়ে উঠতো? আমার মনে হয় তুমি নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলতে। আসলে তুমি যদি তোমার লেখা, ডায়েরির মতো বলো, কবিতা লেখাটা আমার কাছে অনেকটা সেরকমই মনে হয়। একবার একটা লেখা পড়েছিলাম, নিজের সঙ্গে নিজের কথা বলাটাই হচ্ছে ডায়েরি। অথবা নিজের সঙ্গে কথা বলার জন্যই মানুষ ডায়েরিটা লেখে। কবিতাও তো তাই। তো, ডায়রি ধরনের কিছু লেখাই কি তোমার কবিতা লেখার বীজ ছিল?

জয় : হ্যাঁ, সেটা তখনও ছিল, আজও তা-ই।

মাসুদ : তুমি কী ডায়েরি লেখো?

জয় : ডায়েরি আমি লিখি না, কবিতা বা গদ্য যা লিখি, তার অনেকখানি অংশ ডায়েরির মতো।

মাসুদ : তাহলে তোমার লেখাকে কি আত্মজৈবনিক বলতে পারি?

জয় : আত্মজীবন মানে, এই যে জীবনটাতে তুমি আছো, তুমি যে বাসায় ছিলে, সে বাসা থেকে উঠলে, বেরুলে, রিক্সা বা ট্যাক্সি ধরলে, আমার বাড়িতে এলে, চারপাশ দিয়ে অনেক লোক বয়ে গেল, তোমার পাশ দিয়ে নদীর মতো অনেক চরিত্র, অনেক সামাজিক ঘটনা বয়ে যেতে লাগলো। তার ফলে তোমার নিজের জীবনটা তো ঠিক আর তোমার নিজের মতো রইল না। সেটা সরে গেল অর্থাৎ আত্মজীবনী বলতে এর সমস্তটাই বোঝাচ্ছি আমি।

মাসুদ : তোমার কবিতার মধ্যে সেটা দেখেছি। চারপাশের যে মানুষ, চারপাশের যে চলমান জীবন, অন্যেরা যেভাবে বলে তার চাইতে তুমি অন‍্যভাবে লেখো। এ নিয়ে পরে কথা বলবো যখন তোমার কবিতার ভেতরে ঢুকবো। এখন একটা কথা জিজ্ঞেস করি, তুমি বললে নিজের কথা বলবার ভাবনা তোমার মধ্যে প্রাথমিকভাবে এসেছে, ডায়েরির মতো কিছু লিখেছো, এরপর এসেছে কবিতা। তো পরে যখন তুমি কবিতায় এলে তখন তোমার নিশ্চয়ই একধরনের প্রস্তুতি ছিল, সেই কথাগুলো যদি বলো।

জয় : বাচ্চারা যখন হাঁটতে শেখে, হাঁটতে হাঁটতে পড়ে যায়, আবার উঠে দাঁড়ায়, আবার পড়ে যায় আবার হাঁটে, কখনো বাবা-মায়ের একটু সাহায্য নেয়। প্রস্তুতিটা লিখতে লিখতেই হয়েছে। লিখেছি, লেখার সঙ্গে সঙ্গে পাশাপাশি কিছু কিছু পড়েছি। আর প্রত্যেকটা লেখা, যদি তুমি সারা জীবনে একশোটা কবিতা লিখে থাকো, বা কবিতা লেখার উপক্রম করে থাকো, কাগজ কলম নিয়ে বসে একশোবার চেষ্টা করে থাকো, তাহলে প্রথমটা থেকে দ্বিতীয়টি, দ্বিতীয়টি থেকে চতুর্থটি, চতুর্থ থেকে সপ্তম অষ্টমটি, প্রত্যেকটাই তোমার আগের কবিতা লেখার যে অভিজ্ঞতা, সেই অভিজ্ঞতা থেকে খানিকটা সাহায্য তোমাকে পাঠাতে পারে, খানিকটা শিক্ষাও তোমাকে পাঠাতে পারে, কিছু বাদ দিতে হবে সেটা পাঠাতে পারে, কিছু যোগ করতে হবে সেটা পাঠাতে পারে, নতুন যে কবিতাটি তুমি লিখছো, নবম বা দশম কিংবা চল্লিশতম যে কবিতাটি তুমি লিখছো, সেই কবিতাটিও তোমাকে কিছু শেখায়।

মাসুদ : তার মানে কবিতা লিখতে লিখতে কবির একধরনের আত্মশিক্ষাও ঘটে। সে লিখতে লিখতে শেখে, এবং কী বাদ দিতে হবে, বা নতুন কী যুক্ত হতে পারে, কবিতা লেখার মুহূর্তে সেটা মাথার মধ্যে আসে। একটা ব্যাপারে তো সব কবিই সচেতন থাকেন, তুমিও ছিলে, বোঝা যায়, আমি কী একই ধরনের কবিতা লিখবো, না ছড়িয়ে যাওয়ার একটা চেষ্টা করবো। আবার নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার একটা কাজ কিন্তু কবির থাকে, যতটা পারা যায়।

জয় : কবির কাজটা কী, সেই জিনিসটা নিয়ে কখনো মাথা ঘামাইনি। অবকাশ পাইনি। কারণ, আমার জীবন আমার কাছে যেভাবে এসে পড়েছে, আমি সেভাবে রিঅ্যাক্ট করেছি এবং সেইখান থেকে কবিতা বা যে-কোনো লেখা তৈরি হয়েছে। ফলে, আমার নিজেকে ছাড়িয়ে যেতে হবে, কিংবা অনেক ভাবে লিখব, কী একভাবে লিখবো, এসব নিয়ে আমি ভাবি নি। আমার ব্যক্তিজীবনে এবং মনোজীবনে- মনোজীবনটা মানুষ দেখতে পায় না, বাইরের লোক- এমন-কী নিজের পরিবার-পরিজনও দেখতে পায় না। মনোজীবনের পরিবর্তন এবং ব্যক্তিজীবনের পরিবর্তন, সেই সঙ্গে চতুর্পাশে যে পৃথিবী রয়েছে তার পরিবর্তন, যেভাবে আমার ওপরে এসে আছড়ে পড়েছে, আমি সেইভাবে রিঅ্যাক্ট করেছি। এইটুকু।

মাসুদ : সেখানে ধরো, একটা অভিজ্ঞতা তোমাকে একভাবে একটা কবিতা লেখালো, পরে অন্য একটি অভিজ্ঞতা অন্যভাবে তোমাকে আরেকটা কবিতা তৈরি করে দিচ্ছে তোমার ভেতরে, এইভাবে তুমি দেখেছো, যেভাবে হয়ে উঠছে যে অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে, তাই নিয়েই তুমি কবিতা লিখেছো। এরকমই ভাবনা ছিল বা এরকমই চলেছো তুমি, তাইতো?

জয় : একেবারে তাই।

মাসুদ : এখানে একটা ব্যাপার জিজ্ঞেস করি, আমি যতদূর জানি, তুমি বাংলা কবিতাকে খুব ভালো মতো পড়েছো। ঠিক এখন নয়, যখন তুমি লেখালেখি শুরু করেছো বা কবিতা লিখবে বলে মনে করেছো, প্রকাশের জন্যেও দিচ্ছ যখন, ভাবছো, কবিতা বেরোচ্ছে যখন, তার আগে-পরে বাংলা কবিতাটা তুমি খুব ভালোমতো পড়েছো এবং সমসাময়িকদের কবিতা তুমি খুব ভালোমতো পড়েছো। শুধু কবিতা নয়, বাংলা সাহিত্যও তুমি খুব ভালোমতো পড়েছো। এর সঙ্গে সঙ্গে যে অন্য শিল্পকলা, যেমন গান হতে পারে, বিশেষ করে গানের কথা আমি জানি, তুমি খুবই ভালোবাসো শুনতে, বিশেষ করে ধ্রুপদী সংগীত তোমার খুব প্রিয়। নানা প্রসঙ্গে এর উল্লেখও তোমার লেখায় দেখেছি। এই যে অন্য শিল্পকলা বা গানের বিষয়টি, ওইসব অনুভূতিকে কী কবিতায় ধারণ করবার ভাবনা কখনো কাজ করেছে?

জয় : যারা লেখালেখি করেন, অনেক কিছুই তাঁদের লেখার মধ্যে এসে পড়ে। যে-মানুষ কবিতা লিখছেন, গদ্য লিখছেন, সেই মানুষই একইসঙ্গে চারপাশে কী ঘটছে, কী লেখা হচ্ছে বা এর আগে কী লেখা হয়েছে, সেসব লেখা সম্পর্কে স্বাভাবিকভাবেই অবহিত হয়ে থাকেন। কবির ক্ষেত্রে এটা ঠিক আলাদা কিছু হবে, তা নয়। কবিতার মধ্যে অন্য কোনো শিল্পের কোনো কিছু নিয়ে আসব, গ্রহণ করব, এটা সচেতনভাবে পরিকল্পিতভাবে কিছু করার নয়। কিন্তু যেমন নাটক আমার খুব প্রিয় জিনিস, অনেক নাটক দেখেছি, গানও শুনেছি। গান একরকম জীবন, নাটক একরকম জীবন, তেমনি আমার কাছে আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হল ক্রিকেট। ক্রিকেট আমি খেলতে পারিনি এবং গান গাইতে পারিনি। কিন্তু এগুলোর মধ্যে আমার একটা জীবন ছিল, থাকতে পারতো। এসব কিছুর মধ্য দিয়েই জীবন আসলে তার সংকেত পাঠায়। সবকিছুর মধ্যেই চরিত্র তৈরি হয়ে ওঠে। তারা এসে আমার ভেতরে প্রবেশ করেছে। নিজেদের মতো করে প্রবেশ করেছে। তা থেকে কিছু লেখা হয়ে থাকতে পারে।

মাসুদ : তাহলে একথা কী বলতে পারি, এসব তোমাকে আলো দিয়েছে- এইসব বিষয়আশয়। তোমার ভেতরের নানা ধরনের অনুভুতিকে উস্কে দিয়েছে। আরেকটি ব্যাপার, আমি লক্ষ করেছি, তোমার জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। সেটা হলো তোমার মা-বাবা ও ভাই। আমি যতদূর তোমার কথা জানি, তাতে এদের সঙ্গে তোমার সম্পৃক্ততা, সব মানুষেরই এই ধরনের সম্পৃক্ততা থাকে, কিন্তু তোমার সম্পৃক্ততার ব্যাপারটা আরেকটু অন্যরকম। তোমার জীবনটা এই তিনজন মানুষের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তোমার জীবন যেন ওদেরই জীবন অথবা ওদের জীবন যেন তোমার। এই যে সম্পৃক্ততা, তোমার জীবনযাপন, লেখালেখি, সবকিছুকে একটা অন্য মাত্রা দিয়েছে। বিশেষ করে তোমার লেখা পড়লে সেটা বুঝতে পারি। অনেক কবিতায় তোমার মায়ের উল্লেখ, বহু কবিতায় তোমার ভাইয়ের উল্লেখ, পরিপার্শ্বের উল্লেখ, এসব আমি পেয়েছি। এ-প্রসঙ্গে কিছু বলবে।

জয় : আমার মা-বাবা আমি ও ভাই, এই চারজন মিলে একটা সুখী পরিবার ছিলাম। এখন এই পরিবার থেকে বাকি তিনজন অপসৃত, একমাত্র আমি বেঁচে আছি। আর আমার বর্তমান পরিবার- কাবেরী, বুবুন- যাদের নিয়ে আমি বেঁচে আছি, তাদের নিয়েও আমি অনেক কবিতা লিখেছি, অনেক গদ‍্যে তাদের প্রসঙ্গ এসেছে। এটা আমার কোনো বৈশিষ্ট্য নয়, এটা একটা সাধারণ ব্যাপার। মানুষ যার সঙ্গে বাঁচে, যাদের নিয়ে বাঁচে, তাদের কথা তার লেখায় এসে পড়ে, আমার লেখার মধ্যেও এসে গেছে।

মাসুদ : তুমি তোমার বাবা-মা ও ভাই এবং পরে কাবেরী-বুবুন, আমার জিজ্ঞাসাটা এইখানে যে, এদেরকে নিয়ে কী ধরনের আবেগ ও ভাবনা তোমার মধ্যে ঘনিয়ে উঠতো?

জয় : এই আবেগ, যা তুমি বললে, সেসব আমার কবিতার মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে। কখনো শোক, কখনো আনন্দ, পুরনো দিনের ফেলে আসা জীবন, স্মৃতি ও স্মৃতির টান আমার কবিতায় চলে এসেছে।

মাসুদ : তোমার কবিতায় আমি তোমার বাবা কথা পাচ্ছি, মায়ের কথা পাচ্ছি। তাদের উপস্থিতি বেশ প্রবল। আমি এই ধরনের কবিতার সঙ্গে একাত্ম বোধ করেছি। মনে হয়েছে, এ যেন আমার বাবার কথা, আমার মায়ের কথা।

জয় : এটা যদি হয়ে থাকে তাহলে আমি পুরস্কৃত বোধ করব। কিন্তু এতটা কিনা আমি জানিনা, কিন্তু ওই যে বললাম, যেমন ভাবে জীবন আমার কাছে এসে পড়েছে, কবিতায় আমি তার বিক্রিয়া ঘটিয়েছি, বিক্রিয়ার ফলাফলই হয়তো আমার কবিতা।

মাসুদ : এ প্রসঙ্গে আমি বলবো, তুমি বললে না হয়তো, তোমার বাবা-মা-ভাই কেউ বেঁচে নেই, তুমি শুধু বেঁচে আছো; এটা যেমন সত্যি, তেমনি এও তো সত্যি যে এভাবেই আমরা প্রত্যেকেই নিঃসঙ্গ একা হয়ে যাই। আমরা মূলত একা ও নিঃসঙ্গ। তোমার কবিতা পড়েও আমার সেটা মনে হয়েছে। এটা হলো তোমার কবিতার একটা দিক যে, তুমি একা ও নিঃসঙ্গ, প্রত্যেক মানুষই হয়তো তাই। কিন্তু আরেকটা দিক আমার মনে হয়েছে, তাকে তুমি তোমার কবিতার বৈশিষ্ট্য বলবে কিনা জানি না, কিন্তু আমি বলব; তুমি খুব সম্পৃক্ত থাকতে চাও, অনেক কিছুর সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে চাও, জড়িয়ে থাকতে ভালোবাসো। সবকিছুর সঙ্গে একধরনের ভালবাসা, নিমগ্নতা, গভীর আসক্তি চারপাশের মানুষের সঙ্গে, পরিবেশের সঙ্গে, জীবনযাপনের সঙ্গে প্রবল সম্পৃক্ততা দেখতে পাই। অর্থাৎ আধুনিকতার সেই দিকটি তোমাকে স্পর্শ করে না যেখানে মানুষ একা, নিঃসঙ্গ, অসম্পৃক্ত, যে জীবনকে অনেকেই মহিমান্বিত করে তোলেন কবিতায়, শিল্পে। কিন্তু তোমার কাছে জড়িয়ে থাকা, সম্পৃক্ত থাকা, আনন্দ-দুঃখ-শোকে, এটাই মনে হয় প্রধান ব্যাপার। জীবনকে, আমার মনে হয়, তুমি এভাবেই উপলব্ধি করতে চাও। আর সেদিক থেকে ভাবলে সম্পৃক্ত থাকার ব্যাপারটিকেই তুমি মহিমা দিয়েছো তোমার কবিতায়। এই ব্যাপারটা তুমি যদি একটু ব্যাখ্যা করতে।

জয় : আমার কবিতার চরিত্র কী, সেটা আমি ঠিক জানি না।

মাসুদ : আমি যা দেখেছি তাই বললাম। এই দেখাটা ঠিক কিনা?

জয় : এক-একজন পাঠক এক-একভাবে দেখবে। কিন্তু আমার নিজের কবিতার চরিত্র কী, কোনো নির্দিষ্ট চরিত্র এর আছে কিনা, এ নিয়ে আমি ঠিক নিঃসংশয় নই।

মাসুদ : কিন্তু তুমিতো সম্পৃক্ত থাকতে চাও বা সম্পৃক্ততার অনুভব থেকে বেশিরভাগ কবিতা লিখেছো, এটা তো সত্যি। সেটা তো অনুভব করো। এটা আমার অভিমত।

জয় : তোমার এই মনে হওয়াটা, সেটা নিশ্চয়ই অন্তত তোমার সঙ্গে আমার কবিতার একটা সংযোগ তৈরি করে দিয়েছে, এটা প্রমাণ করে। কিন্তু তার মানে, আমার কবিতা সত্যি সত্যি কোনো সারবস্তু নিয়ে উপস্থিত হয়েছে, এমন বিশ্বাস আমি পাইনা। কিন্তু সংশয় থাকলেও কবিতা লেখা তো বন্ধ করতে পারিনা। তাই মাথায় লেখা এলেই লিখে ফেলি।

[অসমাপ্ত]