মাসুদুজ্জামান অনূদিত >> গাম্বিয়ার তিনটি কবিতা

0
714

[বাংলাদেশের মানুষের পক্ষ থেকে গাম্বিয়ার প্রতি এই অনুবাদগুচ্ছ উৎসর্গ করা হল]

তীরন্দাজের নিবেদন

আলফুসেইনি সঙ্কো >> মানবিক কবির কাছে চিঠি

প্রিয় মানবিক কবি,
পুরানকে নিয়ে উচ্ছ্বাস নয়
তার চেয়ে আমাদের কাছে
সুমহান কোনো কবিতার কথা বলুন
শোনান কোনো পরিধির গান
অথবা এখনকার কালো সময়ের আগের কথা
অন্ধকারকে দূর করার জন্যে কলমটাকে নামিয়ে আনুন
আপনার কলমের কালি মুছে দিক আমাদের অশ্রু ও বেদনা
প্রকৃত আলোর জায়গাটা দেখতে সহায়তা করুন
শুনুন সত্যের পরিচ্ছন্ন স্বর
জানুন বিশুদ্ধ ন্যায়পরায়ন হৃদয়ের কথা

দেখুন মানবিক কবি,
দেখুন দুঃসহ কষ্ট
আমাদের বলুন কীভাবে এসব সৃষ্টি হলো
বলুন কীভাবে আমাদের নিজেদের চোখ দিয়ে এসব দেখতে পারি
আমরা তাহলে আমাদের বেদনা থেকে মুক্ত হতে পারবো
দুঃখকে উপড়ে ফেলুন
আপনার তীর দিয়ে শয়তানদের ধ্বংস করুন

এই যে মানবিক কবি, একটা কিছু করুন!
আপনার তো ক্ষমতা আছে
তাদের পরাজিত করবার
অত্যাচারী মশার বিরুদ্ধে
কত কত মারাত্মক যুদ্ধ আপনি জিতেছেন
এটা তো কোনো সমস্যা নয়

কত কিছুই তো আপনি দেখেছেন
হে মানবিক কবি
কিন্তু আপনি এখন রহস্য নিয়ে মেতে আছেন
ঠাণ্ডা এই খেলাটা আপনি এড়িয়ে চলেছেন
এড়িয়ে যাচ্ছেন কঠিন পথ
আদুরে গলায় শুনিয়ে যাচ্ছেন ধর্মের বাণী
কবিতার ছন্দ আর চিত্রকল্পের কথা
কিন্তু এসব বলার সময় তো এটা নয়

দেখুন মানবিক কবি,
আগুনের দিকে তাকান
অনুভব করুন আমার চোখ আর পোশাক পুড়ে যাচ্ছে
আপনার আত্মা পুড়ে কালো ছাই হয়ে যাচ্ছে
বলেন আমাদের এইসব অনুভবের কথা
আমাদের আপনার আতঙ্কিত চিৎকার শুনতে দিন
শব্দ দিয়েই পৃথিবীতে উদাহরণ সৃষ্টি করুন
তরবারির মতো আপনার কলম তুলে ধরুন
অসংগতির গায়ে আঘাত করুন
দেখান আমাদের মহান সে প্রাসাদ
আমরাও ওই যুদ্ধে শয়তানের মুখোমুখি হবো

স্মরণ করুন আপনার অমর গল্পের কথা
হে মানবিক কবি
একদা আপনি বলেছিলেন,
যদি আপনার কলম শুকিয়ে যায়
আপনার কণ্ঠ তাহলে আর শোনা যাবে না
আপনার কথা পড়া যাবে না
যদি আপনার কলম শুকিয়ে যায়
সমস্ত পৃথিবী তাহলে কাঁদবে
রান্নাঘরে আর কোনো কিছু ভাজা হবে না
মাংস অথবা মাছের তরকারি
আপনার উপস্থিতিও থাকবে না
আপনার আত্মা উড়ে গিয়ে শূন্যে ঝুলে থাকবে

মনে রাখবেন মানবিক কবি,
আপনার নামের শেষটা হচ্ছে হায়দারা
ভাষার যত সিংহ আছে তাদের সে আটকায়
নির্মমভাবে তাদের ধ্বংস করে
আমরাও আপনাকে অক্লান্তভাবে অনুসরণ করবো
কিন্তু আপনাকে অবশ্যই বলতে হবে
মানবিক কবি
বলেন কোনটা আসলে সত্যি
সাদামাটা ভাষার পেছনে যে শক্তি আছে
বলতে হবে সেই গোপন কথা

আমরা বেশ মনোযোগ দিয়ে শুনবো
কাজও করবো সতর্ক হয়ে
আপনি কখন সাড়া দেবেন তার জন্য অপেক্ষা করছি
ইতি আপনার বিশ্বস্ত।

আবদুল্লাহ জেইতহ্ >> মানুষের কাছে চিঠি

আমরা, আপনার বন্ধু
সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলিসহ প্রতিটি দিন আমরা একসঙ্গে থাকি
রাতে আপনার ইতিহাসের কথক হয়ে উঠি, আপনার কানের কাছে
গিয়ে গুনগুন করি
আমাদের গোত্রের লোকেরা নাচতে ভালোবাসে, কিন্তু আমরা যখন মৃত্যুর মুখোমুখি হই
আপনাকে মনে হয় হাততালি দিতে চান, কী যে রুচিহীন কাজ, যা কিছু মানবিক

তার কিছুই দেখি না আপনার মধ্যে, অথচ আমরা আপনাকে অনেক ভালোবাসি
আপনার ত্বকে চুমু খাই
আপনার রক্ত চুষি যাতে পরমাত্মীয় হিসেবে সম্পর্কিত থাকতে পারি
কিন্তু আপনি জল ধুলা আর দুষিত বাতাস নির্গত করে
সবসময় আমাদের ঘৃণা করে চলেছেন যার ফলে আমাদের মাথা ঘুরতে থাকে
আপনি চান আমাদের গোত্রটি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাক, তারপরও আপনি
রেখে যাচ্ছেন বদ্ধ নোংরা পানি, খোলা নোংরার স্তূপ, ডাস্টবিন
এ এক পরম পরিহাস আর এভাবেই আপনি বড় বড় পাপ করে চলেছেন
এমন করেই আমার মাকে আপনি হত্যা করেছেন, পিতাকে শ্বাসরোধ করে মেরেছেন
আমার ভাই আর বোনের চুলের কাঁটা ভেঙে দিয়েছেন

কেন আপনি আমাদের দীর্ঘদিনের সম্পর্ককে ভুলে গিয়ে আমাদের প্রতি এতটা ঘৃণা দেখান
প্রতিশোধ নিলে আমরা কিন্তু আপনাকে ম্যালেরিয়ায় ভোগাবো আর দেখবো আপনি
একটা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছেন, যে যুদ্ধ আপনি সহজে জিততে পারবেন না

আমরা যে একজন আরেক জনের জন্য সৃষ্টি হয়েছি আপনি সেটা দেখতে পারছেন না
আপনি আমাদের বদ্ধ ঘরে আটকে রেখে সবকিছু অন্ধকার আর নোংরা করে তূলছেন
ডাক্তারদের যে রোগী হিসেবে এত এত টাকা দেয়া হয় আমরাই তার কারণ হয়ে উঠছি
তাহলে, আমরা যখন আপনার বা আপনার বিছানার কাছে আসি আমাদের সঙ্গে ভালো
আচরণ করুন, আর আপনি আমাদের মৃত্যুতে গাওয়া গান শুনে যে হাততালিটা দেন,
সেই শব্দটা করবেন না

যতক্ষণ অব্দি আপনি একমত হবেন না যে এই হচ্ছে আমাদের আচার-ব্যবহার, আপনি
নুয়ে পড়বেন না
আমরা এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চালিয়েই যাবো, একেবার অন্তিম সময় পর্য়ন্ত।

বাহো মোমোদোপ >> উন্মাদ নেতা

হায় রে, এ কোন জেনারেশন?
কত কত যে উন্মাদ নেতা,
জাতির সঙ্গে জাতির চলছে যুদ্ধ।
বিশ্বাসে না মিললে তাকে আলাদা করে দেখা হয়,
গণব্যবহারে চলছে কত প্রতারণা
পৃথিবীটাকে শেষ করে দিচ্ছে।
আমি কখনো যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে যাবো না,
আমি বলে যাবো আর লিখবো শব্দ।
যতক্ষণ অব্দি শান্তিবৃষ্টি না বর্ষায়,
প্রতিটি জাতির জীবনে।
মুছে দেবো বর্ষ-বর্ষ ধরে চলা বেদনা,
এটাই আমার লক্ষ্য।
তোমার ক্ষমতার দখল চলছে,
দেশে দেশে কত দেশে,
বিনষ্ট হচ্চে বর্ষ-বর্ষ ধরে চলা শ্রম,
এটাই তো তোমার কাজ।
চুরি করার সময়ও বলো সাহায্য করছো,
শুষে নিচ্ছ দেশগুলির প্রাকৃতিক সম্পদ,
শান্তি মরে যাচ্ছে,
তুমি বোমা মারছো আর ধ্বংস করছো সবকিছু।
শিশু আর বৃদ্ধরা কাঁদছে,
তোমার উচিত তোমার প্রতিবেশীদের রক্ষা করা,
এটাই ছিল তোমার দায়িত্ব।
যতটা পারো রঙিন করে তুলতে পারতে তাদের,
যতটা তুমি পারো।
জীবন এক বৃত্ত,
যখন তুমি অন্যদের হনন করবে,
ব্যাথাটা হবে হৃদয়বিদারক,
একদিন তোমাকেও দেখবে অন্যেরা আঘাত করছে।