মাসুদুজ্জামান > কে পাবেন ২০১৯ সালের নোবেল সাহিত্য পুরস্কার ? >> সাহিত্য সংবাদ

0
208
প্রথমেই এবারের নোবেল সাহিত্য পুরস্কারের কয়েকটি বিশেষ দিকের কথা সংক্ষেপে বলে নিই :
[১] এই প্রথম সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাচ্ছেন দু’জন। পুরস্কার যদিও ভাগাভাগি হবে না।
[২] গত বছর পুরস্কার দেয়া হয়নি বলে এবার দু’জনকে পুরস্কার দেয়া হচ্ছে।
[৩] যে দু’জন পুরস্কার পাচ্ছেন তাঁদের একজন হবেন নারী।
[৪] যে দু’জন পুরস্কার পাবেন তাঁরা হবেন ভিন্ন ভিন্ন দুই মহাদেশের দুই লেখক।
[৫] পুরস্কারের অর্থমূল্যের পরিমান ৭ লাখ ৪০ হাজার পাউন্ড (দু’জনেই এককভাবে পাবেন এই অর্থ)।
[৬] ইংরেজিতে লেখেন এমন লেখকের পুরস্কার পাওয়ার সম্ভাবনা খুব কম।
[৭] আগামীকাল পুরস্কার ঘোষণা করা হবে, ঘোষণা করবেন সুইডিশ অ্যাকাডেমির সাহিত্যে পুরস্কার কমিটির প্রধান অ্যান্ডার্স অলসন।
[৮] আগের নিয়ম বাতিল করে নতুন নিয়মে পুরস্কার দেয়া হবে। পুরস্কার কমিটির সদস্যরা এর আগে আজীবন সদস্য থেকে যেতেন। অর্থাৎ পুরস্কার কমিটির সদস্যদের পরিবর্তন করা যেত না। কিন্তু এখন থেকে একটা নির্দিষ্ট সময় অব্দি তারা সদস্য থাকবেন।
গত বছর যৌন কেলেঙ্কারির কারণে নোবেল সাহিত্য পুরস্কার দেয়া হয়নি। এবার তাই দু’জনকে সাহিত্য পুরস্কার দেয়া হবে। এর মধ্যে অবধারিতভাবে একজন হবেন নারী। এই পুরস্কারপ্রাপ্ত নারী হতে পারেন মেরিস কোনডে অথবা মার্গারেট অ্যাটউড। আগামীকাল ১০ অক্টোবর ঘোষণা করা হবে এই সাহিত্য পুরস্কার। পুরস্কার কমিটির প্রধান বলেছেন, সাহিত্য পুরস্কারে পুরুষ লেখকদের যে প্রাধান্য দেখা গেছে, সেই প্রাধান্যের কথা বিবেচনা করে এবারের দুটি পুরস্কারের একটি পাবেন একজন নারী। শুধু তাই নয়, ইউরোপীয় অথবা ইংরেজিতে লেখেন এরকম লেখকদের প্রাধান্য ঘুচিয়ে এবার একটি পুরস্কার পেতে পারেন একজন অ-ইউরোপীয় ইংরেজি ভাষায় লেখেন না এরকম একজন লেখক।
গত বছর যৌন কেলেঙ্কারি আর আর্থিক অব্যবস্থার কারণে সাহিত্য পুরস্কারটি স্থগিত করা হয়। পুরস্কার কমিটির অনেকে পদত্যাগ করায় যে নৈরাজ্যের সৃষ্টি হয়, সেই নৈরাজ্যের পটভূমিতে পুরস্কার দেয়া যায়নি। ওই কেলেঙ্কারিজনিত ঘটনার নাটের গুরু ছিলেন জ্যঁ -ক্লদে আরনল্ট। তার স্ত্রী ক্যা টারিনা ফরস্টেনশন ছিলেন সুইডিশ অ্যাকাডেমির আজীবন (এটাই ছিল নিয়ম) সদস্য। এ বছরের জানুয়ারিতে পুরস্কারের গোপনীয়তা ফাঁস করার অপরাধে তিনি পদত্যাাগ করলে তাঁর স্বামীর যৌন কেলেঙ্কারির বিচার শুরু হয়। বিচারে আরনল্টের দুই বছরের জেল হয়।
এখন সারা বিশ্বের সাহিত্যপ্রেমীরা অপেক্ষা করছেন এবার পুরস্কার দুটি কে কে পান তা দেখার জন্য। এবার পুরস্কারপ্রাপ্ত দু’জন লেখকের প্রত্যেকে পাবেন ৯০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা বা ৭ লাখ ৪০ হাজার পাউন্ড। “অসাধারণ সাহিত্য রচনার জন্য পুরস্কারটি দেয়া হবে” বলে আলফ্রেড নোবেল সেই যে ঘোষণা দিয়েছিলেন, সেই ঘোষণা অনুসারে সাহিত্য অনুরাগীদের কৌতূহল এখন তুঙ্গে। রুশ ঔপন্যাসিক লুডমিলা উলিস্ক্যানয়া অথবা ফরাসি শাসনাধীন গুয়াডেলোপ দ্বীপের ঔপন্যাসিক মেরিসে কোনডে অথবা ‘হ্যান্ডমেইড’-এর রচয়িতা কানাডার মার্গারেট অ্যাটউড পুরস্কারটি পেতে পারেন। এর মধ্যে কোনডের কথা একটু বলি। তিনি কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরাসি ভাষা ও সাহিত্যের এমিরেটাস অধ্যাপক এবং সাম্প্রতিক ফরাসি সাহিত্যের শীর্ষ লেখক।
সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার কমিটির প্রধান অ্যান্ডার্স অলসন জানিয়েছেন, পুরস্কার প্রদানের নিয়মে এবার তারা পরিবর্তন এনেছেন। এ পর্যন্ত ১১৪ জন সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন। এর মধ্যে মাত্র ১৪ জন ছিলেন নারী। বিগত দুটি পুরস্কার পেয়েছেন কাজুও ইশিগুরো ও বব ডিলান। এবার পুরস্কারের পরিধি আরও বিস্তৃত থাকবে বলে জানিয়েছেন অলসন। তিনি বলেছেন, ইতিপূর্বে পুরস্কারটি ছিল অনেকটা ইউরোকেন্দ্রিক কিন্তু আমরা এবার পৃথিবীর অন্য অঞ্চলগুলোর দিকে দৃষ্টি দেব। বেশিরভাগ পুরস্কারও এর আগে পেয়েছেন পুরুষেরা, সেই প্রাধান্য থেকেও আমরা সরে আসবো। কেননা ইদানিং আমরা অনেক মহান নারী লেখককে পাচ্ছি যা আগে সেইভাবে পাওয়া যেত না। পুরস্কার দেয়া হবে অনেক বড় প্রেক্ষাপটে। অনেক কিছু বিবেচনা করে। ফলে, এখন অনেকেরই পুরস্কার পাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে।
অন্য আর যাঁরা এবার পুরস্কার পেতে পারেন বলে মনে করা হচ্ছে তাঁদের মধ্যে আছেন হাঙ্গেরীয় ঔপন্যাসিক লাসলো ক্রাসনাহোরকাই এবং পোলিশ লেখক ওলগা তোকারজুক। হারুকি মুরাকামি অথবা এনগুগি ওয়া থিয়োঙ্গো পেলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। প্রভাবশালী ‘ইকোনমিস্ট’ পত্রিকার সাংস্কৃতিক প্রতিবেদক ফিয়ামেত্তা রোকো বলেছেন, “যে-দুজন পুরস্কার পাবেন তাঁদের একজন অবশ্যই হবেন নারী।” আর বুকার পুরস্কারের সঙ্গে যুক্ত একজন কর্মকর্তা বলেছেন, যে দু’জন পুরস্কার পাবেন তাঁরা হবেন ভিন্ন ভিন্ন মহাদেশের দুই লেখক।
এই মুহূর্তে, ফিয়ামেত্তা মনে করেন, বিশ্বব্যাপী ব্যাপকভাবে পঠিত ও আলোচিত লেখক হচ্ছেন মেরিসে কোনডে। তিনি হচ্ছেন, তাঁর মতে, “ক্যারিবীয় সাহিত্যের রাজরানি। এমনকি পূর্ব ইউরোপের ক্রাসনাহোরকাই এবং তোকারজুকও বিবেচিত হতে পারেন নোবেল পুরস্কারের জন্য।” রোকোর মতে আর্হেন্তিনার লেখক সেজার আইরার সঙ্গে নির্বাসিত চীনা লেখক মা হিয়ানও পুরস্কারটি পেতে পারেন। দক্ষিণ আফ্রিকার আন্তিজিয়ে ক্রগ, যিনি একাধারে সাংবাদিক, সম্প্রচার আধিকারিক, নাট্যকার এবং কবি, তিনিও পুরস্কারের জন্য বিবেচিত হলে বিস্ময়ের কিছু থাকবে না। ক্রগ বর্ণবৈষম্যের কাল থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষ্ণাঙ্গদের ধারাবাহিক শাসন-শোষণের ইতিহাস নিয়ে যেভাবে কাজ করে চলেছেন, তাতে তাঁর প্রতিও বিচারকদের দৃষ্টি পড়তে পারে।
তবে এবার ইংরেজিতে লেখেন এমন কারুর পুরস্কার পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। তবু নীল গেইম্যানকে বিচারকরা পুরস্কারের তালিকায় রাখতে পারেন আর মার্গারেট অ্যাটউডতো পুরস্কারের তালিকায় থাকার যথেষ্ট যোগ্য লেখক।
সুইডিশ-গ্রিক লেখক আলেক্সান্দ্রা পাসক্যালিডোউ অথবা অ্যান্টিগুয়ান-আমেরিকান নারী লেখক জামাইকা কিনকার্ডের ভাগ্যেও পুরস্কারটি জুটে যেতে পারে। ১৯০১ সালের পর নোবেল পুরস্কারের ইতিহাসে মাত্র ১৪ জন নারী পুরস্কার পেয়েছেন, কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে যোগ্যতা অনুসারে নারী লেখকদের দাবি ক্রমশ বাড়ছে। ফিয়ামেত্তার এটাই ধারণা। ব্রিটিশ পেনের চেয়ারপার্সন মাউরিন ফ্রিলি, যিনি এবার ইন্টারন্যাশনাল বুকার পুরস্কারের একজন বিচারক ছিলেন, তিনি মনে করেন, ফরাসি নারী লেখক অ্যানি এরমস, যিনি উপন্যাসের প্রচলিত প্রকরণকে ভেঙে নিজের মতো করে একধরনের প্রকরণ দাঁড় করিয়েছেন, উপন্যাস আর স্মৃতিকে মিশিয়ে নতুন ধরনের কাহিনি লিখছেন, যৌথজীবনের কথা যাঁর লেখায় উঠে আসছে, তিনি পুরস্কারটি পেলে অবাক হবার কিছু থাকবে না, বরং তিনি হতে পারেন এই পুরস্কারের একজন গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থী।
নোবেল পুরস্কারদাতারা আবার ভুলে যেতে পারবেন না কলম্বিয়ার লেখক হুয়ান গ্যাব্রিয়েল ভাসকেজের কথা, যিনি স্বদেশী শাসকদের তৈরি ইতিহাসকে অস্বীকার করে নতুন ধরনের গদ্যবয়ান রচনা করেছেন- যে রচনায় তিনি দেখিয়েছেন ইতিহাসে শুধু অর্ধসত্যের কথা বলা হয়।
সভেতলানা আলেক্সিভিচ পুরস্কার পেতে পারেন, যাঁর এই ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হয়েছিল, তিনি হচ্ছেন ব্রিটিশ সাংবাদিক জ্যাক তেস্তার্দ। তিনি এবার বলছেন, লাতিন আমেরিকার দুই লেখক- কান জু অথবা স্কলাস্তিকে মুকাসোঙ্গা কৌতূহল জাগানিয়া লেখক হিসেবে এদের যে কোনো একজন পুরস্কার পেয়ে যেতে পারেন। লাতিন আমেরিকার আরেক নারী লেখক এলিনা পোনিয়াতোস্কাকেও তালিকার বাইরে রাখা যাবে বলে মনে হয় না।। বাজিকরদের কাছে ওলগা তোকারজুক এবং হন ফসেও দুটি আকর্ষণীয় নাম হয়ে উঠতে পারে নিঃসন্দেহে। তবে এদের মধ্যে অ্যানি এরমসের পাওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি।
গত বছরের যৌন কেলেঙ্কারির কারণে সুইডিশ অ্যাকাডেমিকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা পাঠকদের আস্থা অর্জন করতে কিছুটা সময় লাগবে। এবার তারা তাই এমন কাউকে পুরস্কার দেবেন না যাতে তারা বিতর্কের মুখে পড়েন। আগামীকাল এই পুরস্কারটি ঘোষণা করা হবে আর এই ঘোষণাটি দেবেন অলসন। তিনি বলেছেন, “সাহিত্যের এই পুরস্কারটি এবার দু’জন পেতে পারেন। তবে এর অর্থমূল্য যে ভাগাভাগি হবে তা নয়। গতবার যেহেতু পুরস্কারটি দেয়া হয়নি তাই বিষয়টি হবে নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী একটা ব্যাপার।”
প্যাসক্যালিডোউ বলেছেন, এখনই সুইডিশ অ্যাকাডেমিকে পুনর্গঠিত করার উপযুক্ত সময়, “আমি মনে করি যৌন নির্যাতন, যে নির্যাতনের জন্য অপরাধী পুরুষটির শাস্তি হয়েছে বলে নয়, অ্যাকাডেমির অন্য সদস্যদের মধ্যেও পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন এমন অনেকেই ঘাপটি মেরে আছেন। প্রতিষ্ঠানটির আস্থা অর্জন আর মর্যাদা ফিরে পেতে তাই সময় লাগবে। কীভাবে সেটা ঘটবে সেই প্রক্রিয়াটা এখনও শুরু হয়নি। এখনও প্রতিষ্ঠানটিতে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থেকে যাওয়া পুরুষরা রয়ে গেছেন। আমি আশা করবো, যে-ঘটনা ঘটেছে তা থেকে তারা শিক্ষা নেবেন। বিষয়টা খুবই দুঃখজনক ছিল। মনুষ্য-সৃষ্ট সমস্যার কারণে সাহিত্য সাজা পেয়েছে, যা দুঃখজনক।”
সব মিলিয়ে বলা যায়, নোবেল সাহিত্য পুরস্কারের প্রতি এবার সবার বিশেষ দৃষ্টি থাকবে নিঃসন্দেহে। তবে প্রতিষ্ঠানটির পুরস্কার প্রদানের প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ আড়ালে থেকে যায় বলে অথবা সবকিছু গোপন রাখা হয় বলে কে আসলে পুরস্কার পাবেন, সেটা অনুমান করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিগত বছরগুলিতে দেখা গেছে, পাঠকপ্রিয় লেখকরাই যে পুরস্কার পেয়েছেন তা নয়। আমাদের মতো দেশগুলির পাঠকেরা নাম জানেন না এরকম অনেকেই পুরস্কার পেয়েছেন। আমরা অবশ্য নাম না জানলেও বা তাঁদের লেখা পাঠ না করলেও তাঁরা যে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য নন, সেটা বলা যাবে না। যেমন ইশিগুরোর কথাই ধরা যাক, ইশিগুরোর কথা আমরা জানতাম না, সেটা আমাদের সমস্যা। কিন্তু এই ইশিগুরো নোবেলের আগে একবার বুকার পেয়েছিলেন আরেকবার মনোনীত হয়েছিলেন। গত কয়েকবছর ধরে যেসব লেখক পাঠকপ্রিয়তার শীর্ষে আছেন, যেমন এনগুগি ওয়া থিয়োঙ্গো, আদোনিস, মার্গারেট অ্যাটউড এঁরা পুরস্কার পাবেন বলে তেমন একটা বলা হচ্ছে না। সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার নিয়ে যাঁরা ভবিষ্যদ্বাণী করেন, তাঁদের মুখে ওই লেখকদের নাম খুব একটা শোনা যাচ্ছে না। আসলে, সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারটাই এমন যে সুইডিশ অ্যাকাডেমির পুরস্কার কমিটি এর কোনো শর্টলিস্ট করেন না। কোনো তথ্যই তারা পুরস্কার পাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত জানান না। শুধু কিছু সমালোচক ও সাংবাদিক সম্ভাব্য পুরস্কারপ্রাপ্তদের সম্বন্ধে ভবিষ্যদ্বাণী করে থাকেন। এইটুকু। আপনিও এরকম ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারেন। ভেবে দেখুন তো আপনার মতে কে এবার পুরস্কার পেতে পারেন?
প্রিয় পাঠক, আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা, এরপরই ঘোষণা করা হবে কোন দুই লেখক এবার সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেলেন। এখন শুধু অপেক্ষা সেই মাহেন্দ্রক্ষণটির।