মাসুদুজ্জামান > জাতির জনকের আরেক প্রতিকৃতি : সাহিত্য-সংস্কৃতিপ্রেমী বঙ্গবন্ধু >> স্মরণ

0
512
গতকাল (রবিবার) রেসকোর্সের গণসংবর্ধনা সভায় বক্তৃতা প্রসঙ্গে সাহিত্য সংস্কৃতির উপর বর্তমান সরকারের (এহিয়া সরকার) হামলার তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করিয়া তিনি বলেন যে আমরা মির্জা গালিব, সক্রেটিস, শেক্সপীয়র, এরিস্টটল, দান্তে, লেনিন, মাও সে তুং পড়ি জ্ঞান আহরণের জন্য আর দেউলিয়া সরকার আমাদের পাঠ নিষিদ্ধ করিয়া দিয়াছেন রবীন্দ্রনাথের লেখার, যিনি একজন বাঙালি কবি এবং বাংলায় কবিতা লিখিয়া যিনি বিশ্বকবি হইয়াছেন। শেখ মুজিব দৃঢ়কণ্ঠে ঘোষণা করেন যে, আমরা এই ব্যবস্থা মানি না- আমরা রবীন্দ্রনাথের বই পড়িবই, আমরা রবীন্দ্র সংগীত গাহিবই এবং রবীন্দ্র সংগীত এই দেশে গীত হইবেই।
একথা আজ আর কারো অজানা নেই যে, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই স্বাধীনতার পর বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে বাংলাদেশে নিয়ে এসেছিলেন। তাঁরই সিদ্ধান্ত অনুসারে ‘জাতীয় কবি’ অভিধায় অভিষিক্ত হয়েছেন নজরুল। নজরুল ইনস্টিটিউটও প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বাঙালির মুক্তিদাতা এই মহান নেতার আগ্রহে। এই ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার পরই আমরা দেখেছি, এদেশে নজরুলচর্চার ধারাটা গতি পায়। একইসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটিও আমাদের জাতীয় সংগীত হয়ে উঠতে পেরেছে বঙ্গবন্ধুরই সিদ্ধা্ন্তে। এই দুই কবির প্রতি যে বঙ্গবন্ধুর প্রবল ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ ছিল, এসব ঘটনাই তার প্রমাণ।
কিন্তু শুধু কী এই দুই কবি খ্যাতিমান ছিলেন বলে তাঁদের প্রতি বঙ্গবন্ধুর ভালোবাসা প্রকাশ পেয়েছিল? নিঃসন্দেহে বলা যায়, একজনের দ্রোহী সত্তা এবং আরেক জনের রচনায় ও গানে বাংলার প্রকৃতি ও জনমানুষকে তুলে ধরবার যে বিস্ময়কর প্রতিভার বিকাশ ঘটেছিল, বঙ্গবন্ধু তার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। তাঁর এই যে কবি ও কবিতা, আরেকটু বিস্তৃতভাবে বললে, সাহিত্যিক ও শিল্পীদের প্রতি অনুরাগ হঠাৎ করে দেখা দেয়নি। বাঙালি জাতিসত্তার উত্থানের কাল থেকেই তিনি শিল্পী-লেখক-কবিদের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। আরেকটু স্পষ্ট করে বললে, বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে যে জাতীয়তার সম্পর্ক গভীর, রাজনৈতিক জীবনের শুরুতেই তিনি সেটা বুঝেছিলেন। এই লেখায় তার এই অনুরাগের কথাই বলবো আমি। সূত্র হিসেবে আমি কয়েকটি প্রকাশিত পত্রিকার সংবাদকে ব্যবহার করবো।
১৯৬৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় এরকম একটি খবর প্রকাশিত হয় : “রবীন্দ্রসংগীত শুনিবই : বেতার টেলিভিশনের উদ্দেশে শেখ মুজিব”। জনৈক স্টাফ রিপোর্টারের পরিবেশিত সংবাদটি এখানে তুলে দিচ্ছি : “বন্দীদশা হইতে সদ্যমুক্ত আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান রেডিও ও টেলিভিশনে রবীন্দ্র সংগীতের উপর হইতে সর্বপ্রকার বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করিয়া পর্য়াপ্ত পরিমাণে রবীন্দ্র সংগীত প্রচারের দাবী জানাইয়াছেন। গতকাল (রবিবার) রেসকোর্সের গণসংবর্ধনা সভায় বক্তৃতা প্রসঙ্গে সাহিত্য সংস্কৃতির উপর বর্তমান সরকারের (এহিয়া সরকার) হামলার তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করিয়া তিনি বলেন যে আমরা মির্জা গালিব, সক্রেটিস, শেক্সপীয়র, এরিস্টটল, দান্তে, লেনিন, মাও সে তুং পড়ি জ্ঞান আহরণের জন্য আর দেউলিয়া সরকার আমাদের পাঠ নিষিদ্ধ করিয়া দিয়াছেন রবীন্দ্রনাথের লেখার, যিনি একজন বাঙালি কবি এবং বাংলায় কবিতা লিখিয়া যিনি বিশ্বকবি হইয়াছেন। শেখ মুজিব দৃঢ়কণ্ঠে ঘোষণা করেন যে, আমরা এই ব্যবস্থা মানি না- আমরা রবীন্দ্রনাথের বই পড়িবই, আমরা রবীন্দ্র সংগীত গাহিবই এবং রবীন্দ্র সংগীত এই দেশে গীত হইবেই।” বঙ্গবন্ধু এখানেই থেমে থাকেননি, তিনি রবীন্দ্র সংগীতের উপর পাকিস্তানি সরকার যে বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল সেই বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে রেডিও ও টেলিভিশনে পর্য়াপ্ত পরিমানে রবীন্দ্র সংগীত প্রচারের দাবি জানান।
এখানে উল্লেখ্য, বঙ্গবন্ধু এই কথাগুলি বলেছিলেন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্ত হওয়ার মাত্র একদিন পর ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রয়ারি। সেই জনসভাটাই ছিল আগরতলা ষড়যন্ত্র থেকে মুক্ত হওয়ার পর তাঁর প্রথম জনসভা। শুধু তাই নয়, রবীন্দ্রনাথের প্রতি তিনি যে কতটা অনুরক্ত ছিলেন, সেটা দেখতে পাচ্ছি আরেকটি সংবাদে। যথারীতি সেই সংবাদটিও প্রকাশ করেছিল ইত্তেফাক (১৭ ডিসেম্বর ১৯৬৯)। শিরোনাম ছিল, “রবীন্দ্র-রচনাবলী প্রকাশের জন্য বাংলা উন্নয়ন বোর্ডের প্রতি শেখ মুজিবের আহ্বান”। তৎকালীন পাকিস্তানে রবীন্দ্র সংগীতের প্রথম রেকর্ড প্রকাশ উপলক্ষে গ্রামোফোন কোম্পনি অফ ইস্ট পাকিস্তান একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল আর তাতে প্রধান অতিথি হিসেব বঙ্গবন্ধু এসব কথা বলেছিলেন। সংবাদ থেকেই উদ্ধৃতি দিচ্ছি : “শেখ মুজিব বলেন যে, যে জাতি তাহার কবি-সাহিত্যিককে সম্মান করে না, সে জাতি কখনও সমৃদ্ধ হইতে পারে না। শেখ মুজিবর রহমান বলেন যে, বিগত ২২ বৎসর যাবৎ সংস্কৃতি ও ভাষাকে দমাইয়া রাখার বহু ষড়যন্ত্র হইয়াছে; কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ সে-সবে ষড়যন্ত্র রুখিয়াছে।” ভাষা আন্দোলনের পটভূমি ব্যাখ্যা করে ওই বক্তৃতায় আরও বলেন যে, রাজনৈতিকভাবে দমিয়ে রাখার জন্যই ভাষা ও সংস্কৃতিকে সুপরিকল্পিতভাব ধ্বংসের চেষ্টা করেছে পাকিস্তানি শাসকেরা। বঙ্গবন্ধু এই বক্তৃতায় আরও যেসব কথা বলেছিলেন, তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে তাঁর জীবনযাপন ও ভাবনাকেও রবীন্দ্রনাথ প্রভাবিত করেছিলেন। “জেলখানার নির্জনে ‘সঞ্চয়িতা’ তাঁহাকে প্রেরণা যোগাইত বলিয়া শেখ মুজিব উল্লেখ করেন। তিনি বলেন যে, জেলে ‘সঞ্চয়িতা’ হইতে ‘বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা’ কবিতা পাঠ করিয়া তিনি প্রেরণা লাভ করিতেন। শাহজাদপুর এবং শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতবিজড়িত কুঠিবাড়ির যথাযথ সংরক্ষণ না হওয়ায় তিনি দুঃথপ্রকাশ করেন। তিনি বলেন যে, সাম্প্রতিক এক সফরকালে তিনি শাহজাদপুরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কর্তৃক ব্যবহৃত পালকি ও অন্যান্য জিনিসপত্র সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হইতে দেখিয়াছেন। তিনি এইসব স্মৃতি যথাযথভাবে সংরক্ষণের দাবি জানান।”
এই সংবাদেই দেখতে পাচ্ছি, গ্রামোফোন কোম্পানির কর্ণধার রোজি লতিফের উদ্যোগেই এ দেশের রবীন্দ্র সংগীত শিল্পীদের রেকর্ডটি বের হয়। কবি সুফিয়া কামাল রোজি লতিফের হাত থেকে এর একটি সেট নিয়ে বঙ্গবন্ধুকে উপহার দেন। আফসারী খানম, বিলকিস নাসিরুদ্দিন, রাখী চক্রবর্তী, কলিম শরাফী, জাহেদুর রহিম এবং ওয়াহিদুল হকের মতো সেই সময়ের বেশ কয়েকজন বিখ্যাত রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। বাংলা একাডেমির মিলনায়তন ছিল দর্শকদের দ্বারা পরিপূর্ণ। সাহিত্যিক, শিল্পী, সাংবাদিকরাও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
এই সংবাদটি যে সেই সময়ের রাজনীতির প্রেক্ষাপটে খুবই গুরুত্ব ছিল। বঙ্গবন্ধু সদ্য আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্ত হয়ে রাজনীতি শুরু করেছেন। ভবিষ্যতের বাংলাদেশ কেমন হবে তার রূপরেখা ৬ দফার মধ্য দিয়ে বাঙালিদের সামনে আগেই উপস্থাপন করেছেন। সাধারণ নির্বাচনও আসন্ন। এরকম সময়ে বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণটি ছিল নিঃসন্দেহে শিল্পসাহিত্যের জন্য দিকনির্দেশনামূলক। বঙ্গবন্ধু ক্ষমতা গ্রহণের পর ঠিক যা যা বলেছিলেন, তাই করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবিজড়িত প্রতিটি স্থান তিনি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেন। রবীন্দ্রসংগীত রেডিও টেলিভিশনে যে কোনো সময়ের তুলনায় বেশি প্রচারিত হয়েছে। শিল্পসাহিত্যের বিকাশের জন্যও তিনি উদ্যোগী হয়েছেন। বাংলা একাডেমির জন্য গ্রহণ করেছিলেন ব্যপক পরিকল্পনা। শিল্পকলা একাডেমিও প্রতিষ্ঠিত হয় তাঁরই উদ্যোগে। আমাদের সাহিত্য-শিল্পের বিকাশে বঙ্গবন্ধুর অবদান শুধু সেই সময়ে নয়, এখনও অনুভব করছি আমরা। স্বাধীনতার পর-পর বাংলা একাডেমিতে যে সাহিত্য সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছিল, তাও আয়োজিত হয়েছিল বঙ্গবন্ধুরই আগ্রহে। সার্বিকভাবে শিল্পসাহিত্যের উন্নয়নে তিনি ব্যাপকভাবে প্রাথমিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা থেকে শুরু করে বাস্তবায়নের কাজও করে গেছেন আর এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকারও শিল্পসাহিত্যের বিকাশে ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে জাতির জনকের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে শিল্পসাহিত্যের ক্ষেত্রে যে প্রাণসঞ্চারিত হবে, সেকথা বলাই বাহুল্য।
আজ বঙ্গবন্ধুর প্রয়াণ দিবস। এই দিনে রাজনীতির মতো শিল্পসাহিত্যের ক্ষেত্রেও তাঁর অবদানের কথা স্মরণ করে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি।