মাসুদুজ্জামান > সেলিনা হোসেন : একজন সর্বমানবিক লেখকের প্রতিকৃতি >> জন্মদিন

0
681

লেখকের লক্ষ্য, বোঝাই যায়, সেলিনা হোসেন মনে করেন, মানবিক মূল্যবোধের ডিসকোর্স রচনা করা। গণতান্ত্রিক অসাম্প্রদায়িক আধুনিক সমতাভিক্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্পর্কে তাই স্বাভাবিকভাবেই উচ্চকিত তাঁর কণ্ঠস্বর। বাংলাদেশকেই প্রতিনিধিত্ব করছেন তিনি।

সেলিনা হোসেন, পরিচয় যাঁর কথাসাহিত্যিক হিসেবে, একইসঙ্গে তিনি আমাদের প্রধান লেখক এবং লেখকদের কণ্ঠস্বর। লেখকের দায় মেনে নিয়েই নিজেকে তিনি যুক্ত করেছেন গণতান্ত্রিক অসাম্প্রদায়িক সমতাভিত্তিক আধুনিক রাষ্ট্রভাবনার সঙ্গে, যার কেন্দ্রে আছে নিঃসন্দেহে বাংলাদেশ।
লেখকের প্রাথমিক দায়, লেখার ভেতর দিয়ে আত্মপ্রতিষ্ঠিত হওয়া। কিন্তু সেই লেখা, সেলিনা হোসেন মনে করেন, হতে হবে ‘ভালো লেখা’। কেউ লেখক হবেন কিন্তু ভালো লিখবেন না, এই দায় থেকে কোনো লেখকেরই মুক্তি নেই। এটাই তাঁর মৌলিক দায়িত্ব। লেখক হয়ে উঠবার প্রাথমিক শর্ত। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, “লেখকের মৌল দায়িত্ব ভালো লেখা। নিজের প্রতি সৎ থেকে নিজের অনুভবকে শক্ত মেরুদণ্ড দেওয়া লেখকের কর্তব্য।” লেখকের গুরুত্ব তাঁর কাছে অপরিসীম, এ কারণেই সোলজেনিৎসিনের মতো তিনি বিশ্বাস করেন, লেখক হচ্ছে ‘স্বদেশের দ্বিতীয় সরকার’। কিন্তু কী লিখবেন তিনি? লেখকের রচনা হবে, তাঁর কথায়, মানবিক মূল্যবোধের লিখিত দলিল, যা মানুষের গভীর এবং সূক্ষ্ণতম অন্তরকোণকে স্পর্শ করবে।
লেখকের লক্ষ্য, বোঝাই যায়, সেলিনা হোসেন মনে করেন, মানবিক মূল্যবোধের ডিসকোর্স রচনা করা। গণতান্ত্রিক অসাম্প্রদায়িক আধুনিক সমতাভিক্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্পর্কে তাই স্বাভাবিকভাবেই উচ্চকিত তাঁর কণ্ঠস্বর। বাংলাদেশকেই প্রতিনিধিত্ব করছেন তিনি। তিনি নিজেও সুস্পষ্টভাবেই বলেছেন লেখকের রাজনৈতিক অঙ্গীকারের কথা, পাবলো নেরুদার সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে বলেছেন, “রাজনৈতিকভাবে বিচার না করলে বুদ্ধিজীবীদের খণ্ডিত করে রাখা হবে।” এরই প্রবর্তনায়, সেলিনা হোসেনও মনে করেন, লেখকদের উচিত সাধারণ মানুষের প্রবক্তা হওয়া। তাদের পক্ষে সোচ্চার হতে হবে যাঁরা লিখতে পারে না।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্পর্কে সেলিনা হোসেনের পক্ষপাত তাই খুবই স্বাভাবিক, “আধুনিক রাষ্ট্রসমূহের ন্যূনতম চাহিদা জনসাধারণের গণতান্ত্রিক চেতনাবোধ। নইলে রাষ্ট্রীয় ভিতে ফাটল ধরে, সে ফাটলে নোনাজল ঢুকে ভাসিয়ে দেয় জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা-স্বপ্ন, হরণ করে অধিকার।” লক্ষণীয়, শুধু লেখক নন, জনমানুষের গণতান্ত্রিক চেতনার উপরও গুরুত্ব দিয়েছেন সেলিনা হোসেন, এটাই আধুনিক রাষ্ট্রের ভিত্তি। সংস্কৃতি ও নৈতিকতাই হচ্ছে এই গণতান্ত্রিক চেতনার উৎস। অনৈতিকতার প্রভাবেই রাষ্ট্র অগণতান্ত্রিক ও সাম্প্রদায়িক হয়ে পড়ে। এ প্রসঙ্গে তাঁর উচ্চারণ, “জাতি-বিদ্বেষ, বর্ণ-বিদ্বেষ ও সাম্প্রদায়িকতা অনৈতিক, কেননা তা মানুষের মৌল নৈতিকতাকে ক্ষুণ্ন করে এবং মানুষকে মানুষ হিসেবে ছোট করে দেয়। এইসব প্রবণতা হিংসার জন্ম দেয় এবং মানুষকে সহিংসতার পথে অগ্রসর হতে উৎসাহিত করে। যে-সংস্কৃতি জাতি-বিদ্বেষ, বর্ণ-বিদ্বেষ ও সাম্প্রদায়িকতাকে লালন করে বা প্রশ্রয় দেয়, তাকে সুস্থ বিবেচনা করা যায় না।” এই নৈতিকতা, বলা বাহুল্য, সেলিনা হোসেন মনে করেন, মানবিক মূল্যবোধের দ্বারা পরিশোধিত হতে হয়। ধর্মের দ্বারা, জাতিসত্তার অহমের দ্বারা, ভাষার দ্বারা, ঐতিহ্য-বিচ্যুতির দ্বারা এই বোধটি খণ্ডিত হলে হবে না। ঔপন্যাসিকের কাজ বা লেখকের দায়বোধ এভাবেই নির্ধারিত হয়। নেরুদা যেমন বলেছিলেন, লেখকের কাজ হচ্ছে মানবিক যে পরিস্থিতি বা হিউম্যান কনডিশনকেই তার লেখায় প্রতিফলিত করা, যে-পরিস্থিতি মানবকল্যাণের সমার্থক। সেলিনা হোসেন পরিশেষে তাই এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, “সৃজনশীল মানুষের সামনে মানবকল্যাণ ছাড়া দ্বিতীয় কোনো প্রশ্ন নেই।”
নারীলেখকদের লৈঙ্গিক অবস্থানের দিকটিও গভীরভাবে বিবেচনা করেছেন তিনি। আত্ম-অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি দেখেছেন, ‘ফেমিনিন দুর্বলতা’র কারণে নারীদের লেখা আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে না। কিন্তু এই দুর্বলতা নারীলেখকদের যেভাবেই হোক কাটিয়ে উঠতে হবে। তবে শুধু নারী নয়, অনেক পুরুষ লেখক আছেন যাদের রচনা নানা ধরনের দুর্বলতার কারণে ম্লান হয়ে পড়ে। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে, দুর্বলতা কারো লেখাতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। লেখালেখি বা শিল্পচর্চা তাই সহজ বিষয় নয়। এ প্রসঙ্গে সেলিনা হোসেন বলেছেন : “শিল্পকে জীবনযাপনের প্রতিমুহূর্তের সঙ্গী হিসেবে বিবেচনা করলে, পর্যবেক্ষণে ডারউইন হতে পারলে এবং পড়াশোনার পরিধি বিস্তৃত করলে মহিলাদের পক্ষে ফেমিনিন দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা কোনো কঠিন কাজ নয়। দরকার নিরলস প্রচেষ্টা সকলের ক্ষেত্রেই যা সমান প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে মহিলারা কিছুটা পিছিয়ে আছেন বলে ফেমিনিন দুর্বলতা নামক অনেক ধরনের শব্দ তাঁদের ঘাড়ে চাপানো হয়। ফেমিনিন দুর্বলতাকে আমি সমস্যা মনে করি না। বরং সমস্যা ভাঙতে আমার আনন্দ।” সেলিনা হোসেনের যাঁরা অভিনিবিষ্ট পাঠক, তাঁর কথাসাহিত্য চর্চার ধারাটি যাঁরা গত চার-পাঁচ দশক ধরে অনুসরণ করে আসছেন, তাঁরা নিঃসন্দেহে লক্ষ করে থাকবেন যে ফেমিনিন দুর্বলতাকে অতিক্রম করেই বাংলাদেশের সাহিত্যে তিনি প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। অন্য দুর্বলতাগুলিও তাঁর লেখায় তেমন একটা খুঁজে পাওয়া যায় না। এই অর্থে সমকালীন বাংলাদেশের একজন প্রধান কথাসাহিত্যিক তিনি। এবার সেই প্রসঙ্গ।
শিল্পসাহিত্যের যেসব অধ্যাপক তাত্ত্বিক আর দার্শনিক আলোচনায় ব্যস্ত থাকেন, মিলান কুন্দেরা সেই সব তাত্ত্বিকের কাছ থেকে পাঠকদের দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। কেননা ব্যক্তিসত্তা আপনাআপনিই সম্পূর্ণতা পায় পাঠকের কল্পনায়। ব্যক্তিসত্তা, বলাবাহুল্য, এভাবেই কুন্দেরা আধুনিক উপন্যাসের প্রধান বৈশিষ্ট্য বলে চিহ্নিত করেছেন। বলেছেন, “ঔপন্যাসিক ঐতিহাসিক নন, ভবিষ্যৎদ্রষ্টাও নন। তিনি অস্তিত্বসন্ধানী।” উপন্যাসের এই যে গহনতা, ব্যক্তিসত্তাকে অনুধাবন করবার চেষ্টা, আধুনিক উপন্যাসের এটাই হচ্ছে মুল কথা। সেলিনা হোসেন, বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের ক্ষেত্রে যাঁর নাম অনিবার্যভাবে উচ্চারিত হয়, তিনি এভাবেই ব্যক্তির অস্তিত্বকে নিজের কথাসাহিত্যে নানাভাবে উপলব্ধি করবার চেষ্টা করেছেন। উপস্থাপন করেছেন নানা ধরনের কাহিনি আর চরিত্রায়নের মধ্য দিয়ে।
তাঁর জন্মের ক্ষণটিও ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য হয়ে আছে। সেলিনা হোসেন যখন জন্মগহণ করেন, তার দু’ মাসের মাথায় ভারত বিভক্ত হয়ে যায়। এই বিভক্তি, বলা বাহুল্য, এই অঞ্চলের মানুষকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল তীব্র সংকটের মুখে। রাজনৈতিকভাবে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির কবল থেকে মুক্ত হয়ে ‘স্বাধীনতা’র নামে দেশভাগ হয়ে যায়। অমানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হয় পূর্ব বাংলা আর পশ্চিম বাংলার হিন্দু আর মুসলমানদের। সেলিনা হোসেন যখন উপন্যাস লেখা শুরু করেন তখন এই ঘটনা তাকে এতটাই প্রভাবিত করেছিল যে, তিনি লিখেছিলেন ‘গায়ত্রী সন্ধ্যা’ নামের একটা ট্রিয়োলজি। ওই উপন্যাসেই তিনি দেখিয়েছেন, রাজনৈতিক ঘটনা কীভাবে ব্যক্তিজীবনকে প্রভাবিত করে। রাজনীতিই হয়ে ওঠে ব্যক্তিজীবনের অন্তিম পরিণাম। উপনিবেশের কাল পেরিয়ে ব্যক্তিজীবন উত্তর-উপনিবেশবাদী সময়ে প্রবেশ করলেও ব্যক্তিসংকট থেকে উপনিবেশ-কবলিত মানুষ মুক্তি পায় না। এই উপন্যাসগুলো, লক্ষণীয়, তিনি লিখেছেন অনেকটা পরিণত স্তরে পৌঁছে, গত শতকের নব্বইয়ের দশকে। কিন্তু সেলিনা হোসেনের লেখকজীবন শুরু হয়েছিল বাংলাদেশের জনজীবন, মধ্যবিত্তের সংকট আর ইতিহাস-ঐতিহ্যের সূত্র ধরে। জলোচ্ছ্বাস, হাঙর নদী গ্রেনেড, মগ্ন চৈতন্যে শিস, যাপিতজীবন, নীল ময়ুরের যৌবন, পদশব্দ, চাঁদবেনে, পোকামাকড়ের ঘরবসতি, নিরন্তর ঘণ্টাধ্বনি, ক্ষরণ এইসব উপন্যাসে উপজীব্য হয়েছে ওইসব প্রসঙ্গ। অবাক হতে হয় এই ভেবে যে, একটা বিষয় থেকে আরেকটা বিষয়ে কত স্বচ্ছন্দেই না বিচরণ করেছেন তিনি। একদিকে প্রকৃতির দ্বারা বিপন্ন উপকূলীয় মানুষের জীবন, অন্যদিকে মুক্তিসংগ্রাম, এরই সঙ্গে মধ্যবিত্তের আত্মসংকট, আবার চর্যাপদের পটভূমি আর চাঁদবেনের মতো ঐতিহ্যআশ্রয়ী ঘটনার প্রেক্ষাপটে উপজীব্য করেছেন সমকালীন মানুষের রাষ্ট্রিক-সামাজিক সংকটকে।
এখানেই শেষ নয়। এরপর তিনি ঘুরে গেলেন একটা আধুনিক জাতিরাষ্ট্র কীভাবে সাধারণ মানুষের জীবনকে বিপন্ন করে তুলতে পারে, সেইদিকে। তবে এই বিপন্নতার কথা তার উপন্যাসে এসেছে মূলত রাজনীতির মধ্য দিয়ে। মানুষের অস্তিত্বের লড়াইকে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের আর রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্যেই প্রতিফলিত হতে দেখেছেন তিনি। লিখলেন কাঁটাতারে প্রজাপতি আর ভালোবাসা প্রীতিলতার মতো অসাধারণ দুটি জীবনী-উপন্যাস। তবে এই পর্বের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি তিনপর্বের গায়ত্রী সন্ধ্যা, যার কখা আমি আগেই উল্লেখ করেছি। একটি জাতির জন্মের পূর্বাপর ইতিবৃত্ত যে উপন্যাসের বিষয় হতে পারে, সেলিনা হোসেন গায়ত্রী সন্ধ্যা লিখে বাংলা উপন্যাসে স্থাপন করলেন সেই অনন্য দৃষ্টান্ত।
সেলিনা হোসেনের কৃতিত্ব এই যে বার বার তার উপন্যাস বাঁক নিয়েছে। তিনি বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে সরে এসেছেন খুব সহজেই। তার সৃষ্টিশীলতার সমগ্রতার সন্ধান করতে গিয়ে আমার মনে হয়েছে, এটা ঘটেছে মূলত তার নিজেরই আত্মগত টানে। ইতিহাস ও সমাজবোধ দিয়ে যখনি তিনি উপলব্ধি করেছেন বাইরের পৃথিবীতে কোনো না কোনো সংকট ঘনিয়ে উঠেছে, যার প্রভাবে ব্যক্তির অস্তিত্ব সংকটাপন্ন হয়ে পড়ছে, তখনি তিনি সেই বিষয় নিয়ে উপন্যাস লিখেছেন। এ হচ্ছে আসলে শিল্পীর সেই দায়, যার দ্বারা প্রাণিত হয়ে উপন্যাস রচনা করেছেন পৃথিবীর মহৎ সব ঔপন্যাসিক। এই একটি কারণে সেলিনা হোসেন আমাদের শুধু নমস্য নন, পূজনীয়ও বটে। হয়তো বেশি বলা হয়ে যাবে, কিন্তু মানবিক সংকট তাকে এতটাই বিচলিত, বিব্রত, বিষণ্ন করে যে তিনি সেই বিষয়ে উপন্যাস না লিখে পারেন না। ফলে আরও একবার তার উপন্যাসের বিষয়বস্তু ঘুরে যায় নারীর প্রসঙ্গে। এই পর্বে তিনি একে একে লেখেন দীপান্বিতা, লারা, মোহিনীর বিয়ে, আণবিক আঁধারের মতো উপন্যাস। এইসব উপন্যাস আবর্তিত হয় একেবারেই নারীর জীবনযাপনকে ঘিরে, যে-জীবনকে বিপন্ন করে তোলে সমাজ, রাষ্ট্র, বিশেষভাবে পুরুষতন্ত্র। পুরুষতন্ত্র যে একধরনের সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিধিবিধান বিশেষ, সেলিনা হোসেনই বাংলাদেশের উপন্যাসে সেকথা সবার আগে গুরুত্বের সঙ্গে উপজীব্য করেছেন।
সেলিনা হোসেনের উপন্যাসের বিষয়বৈচিত্র্য তাই বহুমুখী, নানা দিকে ছড়ানো। তবে তাঁর ভাবনার কেন্দ্রে আছে এই জনপদের মানুষ। উপকূলীয় মানুষের বিপন্ন জীবন নিয়ে শুরু হয়েছিল তাঁর সৃষ্টিশীল রচনা, মাঝে ছুঁয়ে দিয়েছিলেন উত্তর-উপনিবেশবাদী রাষ্ট্রীয় সংকটে বিপর্যস্ত মধ্যবিত্ত আর সাধারণ মানুষের জীবনকে, পরিশেষে নারী হয়ে উঠলো তাঁর উপন্যাসের বিষয়আশয়। তবে শেষ কথা বলে কিছু নেই সেলিনা হোসেনের কাছে। সৃষ্টিশীলতার মধ্য দিয়ে যিনি মানবিক হয়ে ওঠেন, তাঁর পক্ষেই এর পরে লেখা সম্ভব পূর্ণ ছবির মগ্নতা আর যমুনা নদীর মুশায়েরার মতো উপন্যাস। এ-দুটি উপন্যাস তো সেই জীবনী উপন্যাস, কিন্তু মানবিতার স্পর্শে কী সজীব পূর্ণ ছবির মগ্নতার রবীন্দ্রনাথ, যিনি আমাদের সংস্কৃতি আর আত্মপরিচয়ের পটভূমি নির্মাণ করে দিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ আমাদের কাছের মানুষ, সন্দেহ নেই, কিন্তু দূর-যমুনার গালিবকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবো আমরা?
যমুনা নদীর মুশায়েরার সূত্রে সেলিনা হোসেন দেশের গণ্ডী ছাড়িয়ে হয়ে উঠলেন আন্তর্জাতিক। মানবিকতার অর্থ যে শুধু দেশের সীমানায় আবন্ধ থাকা নয়, সব দেশের সব কালের বিপন্ন মানুষ ও সম্প্রদায়ের প্রতি টান অনুভব করা, এই উপন্যাসের মধ্য দিয়ে সেলিনা হোসেন সেভাবেই সর্বমানবিক হয়ে উঠেছেন। বাংলাদেশের উপন্যাসের ধারায় এই ধরনের উপন্যাসের অনন্য নজির আবার তিনিই সৃর্ষ্টি করলেন। একজন কবির জীবন যে মানবিকতারই নির্যাসমাত্র, যমুনা নদীর মুশায়েরাতে তারই প্রতিফলন ঘটেছে।
উত্তর-ঔপনিবেশিক জাতিরাষ্ট্র হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ যে রাজনৈতিক সংঘাত ও সংকটের মধ্য দিয়ে চলছে তারও সৃষ্টিশীল ডিসকোর্স রচনা করেছেন তিনি। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড পরবর্তী বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে ‘আগস্টের এক রাত’ নামে এরকমই একটা অসামান্য উপন্যাস লিখেছেন। সেলিনা হোসেনকে বলা যায়, বাংলাদেশে জীবনীভিত্তিক উপন্যাস রচনার পথিকৃৎ।
সেলিনা হোসেনের সৃষ্টিশীলতা এভাবেই রূপে-রূপান্তরে এখনও অব্যাহত ধারায় প্রবহমান। উপন্যাসের মতো গল্পেও মানুষের সূক্ষ্ণাতিসূক্ষ্ণ জীবনকে ছোট ছোট পরিসরে সামগ্রিক অনুভবে মহীয়ান করে তুলেছেন এই কথাসাহিত্যিক। মানবিকতার স্পর্শে তার ছোটদের জন্য রচিত লেখাও উজ্জ্বল। কুন্দেরা যেমন বলেছিলেন, অন্যদের মধ্য দিয়ে নিজের অস্তিত্বেরই সন্ধান করেছেন তিনি।
এও কী শিল্পীর সেই সামাজিক দায় নয়? তবে এই দায়বদ্ধতা শুধু নারীর কাছে নয়, তিনি তো আমাদের পাহাড়ি আদিবাসীদের জন্যও অনুভব করেন এই দায়। ফলে গল্প, প্রবন্ধ, কিশোর উপন্যাস ও ভ্রমণ মিলিয়ে সংকলন করেছেন আদিবাসীদের মেঘ ও শিশিরের মতো একটা গ্রন্থ। প্রান্তিক জনমানুষের প্রতি তার এই যে মমত্ববোধ, ভালোবাসা, এরপর তাই আমরা উপজীব্য হতে দেখি ভূমি ও কুসুমে। সীমান্তবর্তী একটি বিশেষ সমস্যা ছিটমহলবাসীদের নিয়ে যে উপন্যাস রচনা করা যায়, সেকথা তো তিনিই ভাবতে পারেন যার কাছে দেশ মানে শুধু ঢাকা নয়, কিংবা নয় শুধুই গ্রামীণ বা মধ্যবিত্তের বৃত্তাবদ্ধ জীবন। নিম্নবর্গীয় মানুষের যাপিত জীবনকে তিনি বার বার এইভাবে তার উপন্যাসের বিষয় করে তুলেছেন। এই জীবন বাংলাদেশের আর কোনো ঔপন্যাসিকের লেখায় সেইভাবে মূর্ত হতে দেখি না। সেলিনা হোসেনের কৃতিত্ব এই যে বার বার তাঁর উপন্যাস বাঁক নিয়েছে। তিনি বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে সরে এসেছেন খুব সহজেই। তাঁর সৃষ্টিশীলতার সমগ্রতার সন্ধান করতে গিয়ে এমনটাই মনে হয়েছে আমার; আর এটা ঘটেছে মূলত তাঁর নিজেরই আত্মগত টানে। ইতিহাস ও সমাজবোধ দিয়ে যখনই তিনি উপলব্ধি করেছেন বাইরের পৃথিবীতে কোনো না কোনো সংকট ঘনিয়ে উঠছে, যার প্রভাবে ব্যক্তির অস্তিত্ব সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছে, তখনই তিনি সেই বিষয় নিয়ে উপন্যাস লিখেছেন। এ হচ্ছে আসলে শিল্পীর দায়, যার দ্বারা প্রাণিত হয়ে উপন্যাস রচনা করেছেন পৃথিবীর মহৎ সব ঔপন্যাসিক। এই একটি কারণে সেলিনা হোসেন শুধু নমস্য নন, পূজনীয়ও বটে।
আজ কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের জন্মদিন। অভিবাদন তাঁকে।