মাহফুজা শীলু >> গানের রবীন্দ্রনাথ প্রাণের রবীন্দ্রনাথ >> রবীন্দ্রপ্রয়াণ দিবসে শ্রদ্ধার্ঘ্য

0
511

গানের রবীন্দ্রনাথ
প্রাণের রবীন্দ্রনাথ

আমার রবীন্দ্রনাথের সবটা জুড়েই গান। ‘মুখপানে চেয়ে দেখি, ভয় হয় মনে, ফিরেছ কী ফেরো নাই, বুঝিব কেমনে।’ এই গানটি আমি শুনেছিলাম সম্ভবত থ্রি কিংবা ক্লাস ফোরে যখন পড়ি। তারও আগে শুনেছিলাম, ‘ওগো নদী, আপন বেগে পাগল পারা।’ সুর নয়, বরাবর গানের বাণী আমাকে টানে। আমার কণ্ঠ সুর-বঞ্চিত। প্রথম গানটির কী বুঝেছিলাম, কে জানে! কণ্ঠে গান ছিল না সত্যি তবে আমার প্রাণে গান ছিল। আছে। অল্প বয়স থেকেই গানের ব্যাপারে ছিলাম সর্বভুক। বিশেষ পছন্দের ছিল রবীন্দ্রসংগীত, আধুনিক বাংলা গান এবং বেশ কিছু নজরুলগীতি। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, অতুলপ্রসাদ সেনগুপ্ত এবং রজনীকান্ত সেনের গান শোনার সুযোগ হয়েছে আরও পরে।
১৯৭৮ সালে আমাদের বাড়িতে প্রথম এল ৪৫-আরপিএম অথবা ঘূর্ণন যন্ত্রটি। চমৎকার দুটি কাঠের সাউন্ড বক্সসহ এই যন্ত্রটি হয়ে উঠেছিল আমার নিত্যদিনের সঙ্গী। বড় ভাই ফেরদৌস সাজেদীন প্রথমবারের মতো আমেরিকা থেকে দেশে এসেছে। আমি গান ভালবাসি, তাই এই উপহার, যা আমার জীবনের সেরা উপহার হয়ে আছে আজও। বন্ধুরা গান শোনার বাসনায় যখন-তখন আমাদের বাসায় চলে আসতো। ক্যাসেটের জনপ্রিয়তা তখন তুঙ্গে। কিন্তু ৪৫-আরপিএম আর ওইরকম দুটো জাঁদরেল সাউন্ড বক্সে গান শোনার আনন্দই ছিল আলাদা। ওই দুর্লভ গানের যন্ত্রটির কারণে আমাদের ড্রইং রুমের সৌন্দর্য এবং মর্যাদা বেড়ে গিয়েছিলো কয়েকগুণ। পড়াশোনা লাটে উঠিয়ে (প্রথাগত পড়াশোনার প্রতি আমার আগ্রহ ছিলো বরাবরই কম) আমি ক্রমশ গান শোনায় ডুবে যেতে থাকলাম।
কবিতার একটি দুর্লভ রেকর্ড ছিল আমাদের, যেখানে বুদ্ধদেব বসু স্বয়ং ‘রাত তিনটের সনেট’ পাঠ করেছেন। ‘শুধু তা-ই পবিত্র, যা ব্যক্তিগত। গভীর সন্ধ্যায় নরম, আচ্ছন্ন আলো; হলদে-ম্লান বইয়ের পাতার লুকোনো নক্ষত্র ঘিরে আকাশের মতো অন্ধকার; অথবা অত্বর চিঠি, মধ্যরাতের লাজুক তন্দ্রায় দূরের বন্ধুকে লেখা।’
কবিতায় মোহগ্রস্ত হই। অভিধান খুলে খোঁজার চেষ্টা করি ‘অত্বর’ শব্দের মানে। জীবনানন্দ দাশ, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত তখন প্রয়াত। ওঁদের দুজনের কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন শম্ভু মিত্র ও বসন্ত চৌধুরী। আবৃত্তির প্রতি ঝোঁক আমার শৈশব থেকে। তবে সেসব ‘কাঠবিড়ালি, কাঠবিড়ালি পেয়ারা তুমি খাও’ — জাতীয়। আরো একটু বড় হয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ।’ তারপর ১৬-১৭ বছর বয়সে শম্ভু মিত্রের কণ্ঠে জীবনানন্দ দাশের ‘আট বছর আগের একদিন’ শুনে আবৃত্তি কী, কেমন করে করতে হয়, সেই প্রথম যেন ধরতে পারি! আমাদের বাড়িতে ‘আকাশবাণী’ কলকাতার নাটক শোনার খুব রেওয়াজ ছিল। আর ছিল কলকাতার আধুনিক বাংলা গান শোনার রেওয়াজ। সেসবের কৃতিত্ব অবশ্যই আমার মাকে দিতে হয়।
রোববার দুপুর আর শুক্রবার রাত আটটায় আম্মার সাথে বসে বসে নাটক শুনতাম। সেই থেকে প্রিয় কণ্ঠ তৃপ্তি মিত্র, শম্ভু মিত্র, অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়। ছিলেন পার্থ ঘোষ, গৌরি ঘোষ। কিছু পরে জগন্নাথ বসু, ঊর্মিমালা বসু। পার্থ ঘোষের ভক্ত ছিলাম তাঁর পরিচালিত ‘গল্পদাদুর আসর’-এর জন্য। নাটক তো বোঝা গেল, অনেকে মিলে পারফর্ম করে, একটি গল্প থাকে, ক্লাইম্যাক্স থাকে, পরিণতি থাকে। তাহলে আমি কী করে গানে এলাম! মানে, গানের এমন মনোযোগী শ্রোতা হলাম! ওই যে আগেই বলেছি গানের সুর নয় বাণী আমাকে আকৃষ্ট করে। আর রবীন্দ্রনাথের গানের মতো বাণীপ্রধান গান ভূ-ভারতের আর কোথায় আছে! অল্প বয়স থেকেই গানসংক্রান্ত কোনো আলোচনাও আমি খুব মনোযোগ দিয়ে শুনতাম। পড়তাম। ‘দেশ’ পত্রিকার শেষের দিকে সুভাষ চৌধুরী গান নিয়ে লিখতেন। অর্থাৎ, তিনি ছিলেন সঙ্গীত-সমালোচক। একবার দেবব্রত বিশ্বাসের গান নিয়ে লিখলেন, কিছুটা এরকম — দেবব্রত বিশ্বাসকে আমার রবীন্দ্রনাথের গানের অনুবাদক মনে হয়। দেবব্রত বিশ্বাসের উচ্চারণ, স্বরক্ষেপণ এবং গানের বাণীর যথাযথ ভাব তুলে ধরার জন্য দেবব্রতকে সুভাষ চৌধুরীর রবীন্দ্রনাথের গানের অনুবাদক মনে হয়েছিল। গান তো আসলে এভাবেই মানুষের মনে স্থান করে নেয়। কে, কীভাবে বুঝে গানটা প্রাণে ধারণ করছে — সেটাও একটি বিষয়। তাই এক গানই একেক শিল্পীর কণ্ঠে একেক রকম হয়ে ওঠে। আর সেভাবেই রবীন্দ্রনাথের কোনো কোনো গান কোনো কোনো শিল্পীর কণ্ঠে বিশেষ হয়ে ওঠে।

আজ তোমারে দেখতে এলেম অনেক দিনের পরে।
ভয় করো না, সুখে থাকো, বেশিক্ষণ থাকব নাকো –
এসেছি দণ্ড দুয়ের তরে।

এ গান তো কতজনের কণ্ঠেই শুনেছি। কিন্তু অশোকতরু বন্দ্যোপাধ্যায় যেভাবে, ‘আজ তোমারে’ বলে শুরু করেন, আমি যেন স্পষ্ট বুঝতে পারি — আজ মানে আজ-ই। এই মুহুর্তের কথাই বলছেন এবং আমাকেই যেন দেখতে এসেছেন। বলছেন —

দেখব শুধু মুখখানি, শোনাও যদি শুনব বাণী,
না হয় যাব আড়াল থেকে হাসি দেখে দেশান্তরে।

ছোট গান, পুরোটাই তুলে দিলাম। কিংবা অশোকতরুর কণ্ঠে প্রথম শোনা সেই গানটি — ‘বঁধু তোমায় করব রাজা তরুতলে।’ আবার অভিধান নিয়ে বসি। ‘ব’-এর উপর চন্দ্রবিন্দু দিলে ‘বঁধু’র অর্থ বন্ধু হয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথের গান শুনতে শুনতে এভাবেই কী আমি সাহিত্যপাঠের প্রতি আরো বেশি মনোযোগী হয়ে উঠছিলাম, সেই কৈশোরেই?
গানে, এই বলতে পারাটা খুব জরুরি। মনে আছে, শ্রদ্ধেয় ওয়াহিদুল হকের গানের ক্লাস ‘আনন্দধ্বনি’তে যেতাম কখনও কখনও। গান গাইতে তো অবশ্যই নয়। বন্ধুরা যারা গান করত, তাদের সঙ্গী হয়ে। আমি ওয়াহিদুল হককে শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলাম ‘কণ্ঠশীলন’ থেকে আবৃত্তির কোর্স করতে গিয়ে। সে ভিন্ন প্রসঙ্গ। ওয়াহিদ ভাই গান শেখানোর আগে গানটি শিল্পীকে পাঠ করতে বলতেন। তারপর বলতেন নিহিত অর্থের দিকে মনোযোগ দিতে।
গানের পাশাপাশি কবিতার প্রতিও আগ্রহ সমানভাবে বাড়তে থাকল। তবে কবিতায় রবীন্দ্রনাথ আমাকে তেমন আটকাতে পারেননি। গানে যেমন আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছিলেন। আমি তখন রবীন্দ্রনাথের নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ থেকে যাত্রাভঙ্গ করে সোনার তরী টপকে হাত ধরেছি তিরিশের কবিদের। সেটা সম্ভবত সেই আমার সেভেন কী এইট শেষ করার পরপরই, বড়ভাই যেদিন বাড়িতে বুদ্ধদেব বসুকে নিয়ে এলেন। নিয়ে এলেন আধুনিক কবিতার নানা সম্ভার আর গানের ঢেউ। আমি তখন অনেকটাই তৈরি সেই ঢেউয়ে ভেসে যাওয়ার জন্য। তখনো এই গান আমার শোনা হয়নি, ‘অচেনাকে ভয় কী আমার ওরে? অচেনাকে চিনে চিনে উঠবে জীবন ভরে।’
রবীন্দ্রনাথের গানের চেয়ে আধুনিক গান আর কী হতে পারে? রবীন্দ্রনাথের গান আমার যে শিল্পবোধ, রুচিবোধ তৈরি করেছিল, সেটা সঙ্গী করেই আমি একে একে পড়তে শুরু করি তিরিশের কবি ও লেখকদের। বিশেষভাবে পড়তে শুরু করি বুদ্ধদেব বসুকে। আর কল্পনায় নিজেই কখন ‘তিথিডোর’-এর স্বাতী মিত্র হয়ে উঠি। গান শোনা এবং কবিতাপাঠের মধ্যে কোনরকম ব্যবধান আমার অন্তরায় হয় না আনন্দ পাওয়ার ক্ষেত্রে। এখনো শঙ্খ ঘোষ, শহীদ কাদরী, আল মাহমুদ, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, আবুল হাসান, নির্মলেন্দু গুণ, জয় গোস্বামীর পরে হালের শ্রীজাত, মন্দাক্রান্তা সেন এবং বাংলাদেশের অনেকের কবিতাই একই মুগ্ধতায় পাঠ করি।
একটি কবিতাও না লিখে কী করে এতটা কবিতার মানুষ হলাম? সে-ও, সেই গানই ভালোবেসে (ভুল বললাম, গত বেশ কিছুদিন কবিতা লিখছি), বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথের গান।
রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে আমাদের বন্ধুদের মধ্যে ছিল নানান খেলা। আমার এক কাছের বন্ধু একবার পোস্টকার্ডে, গত শতকের আশির দশক, পোস্টকার্ড তখন এমন অদৃশ্য হয়ে যায়নি। আমরা তখনও গোপন করতে শিখিনি প্রায় কিছুই। না সংরাগ, না বন্ধুত্ব, না দুঃখ,  না আনন্দ। রবীন্দ্রনাথের অনেকগুলি গানের প্রথম দুই লাইন ছোট ছোট অক্ষরে লিখে পাঠিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের গান আমি ভালোবাসি, কতটা, আমার সেই বন্ধু জানত। তাই জন্মদিনে এই অভিনব উপহার! সারা বিকেল ‘গীতবিতান’ খুলে গানগুলি পাঠ করেছিলাম। নিজে প্রেমে পড়েও মনে হয়েছিল, ‘জয় করে তবু ভয় কেন তোর যায় না, হায় ভীরু প্রেম হায়রে।’ মনে হয়েছিল, ‘আজি তোমায় আবার চাই শুনাবারে, যে কথা শুনায়েছি বারেবারে।’
‘তোমার আমার বিরহের অন্তরালে কত আর সেতু বাঁধি, সুরে সুরে তালে তালে।’ এই গানটি প্রথম শুনি আমার এক বন্ধুর কণ্ঠে। অনেক পরে জেনেছিলাম সত্যজিৎ রায়ের দশটি প্রিয় গানের মধ্যে এই গানটি রয়েছে। ভালো লেগেছিল জেনে।
আশির দশকের পুরোটাই ছিল আমার গানের দিন। ছোড়দা ডাক্তারি শেষবর্ষে পড়ার সময় ঘুমের মধ্যে মারা যায়। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হোস্টেলে। সেই সময় অনেক দিনের জন্য পরিবারের সকলেই যেন আমরা মরে গিয়েছিলাম ওর সাথে সাথে। কোনো কিছুতে আনন্দ নেই। কেবল গানটা ছিল সাথে। রবীন্দ্রনাথ আর আমি হাত ধরে থেকেছি কত না রাত, কত না দিন, কত না বসন্ত, কত না বর্ষা। আমরা বন্ধুরা কোনো বিশেষ উৎসবে একে অপরকে গান উপহার দিতাম। বন্ধুটির বিশেষ দিনে ওর উদ্দেশ্যেই কেবল গান গাওয়া হতো!
আমার মতো রবীন্দ্রনাথের গান অনেকেই ভালোবাসেন, হয়তো বেশিই। তবে রবীন্দ্রসংগীত আমার কাছে শুশ্রূষার মতো। গভীর বেদনায় যখন ভেঙে পড়েছি — রবীন্দ্রনাথে আশ্রয় মিলেছে। ‘বুক বেঁধে তুই দাঁড়া দেখি, বারে বারে হেলিস নে ভাই।’ নিজেকে সান্ত্বনা দিই এই বলে —

জীবন আমার চলছে যেমন তেমনিভাবে
সহজ কঠিন দ্বন্দ্বে ছন্দে চলে যাবে
চলার পথে দিনে রাতে দেখা হবে সবার সাথে
তাদের আমি চাব তারা আমায় চাবে।

নিবিড় বেদনাতেও মন পুলকিত হতে পারে, সেও-তো রবীন্দ্রনাথের গানেই জানা। ‘কাঁদালে তুমি মোরে ভালোবাসারই ঘায়ে নিবিড় বেদনাতে পুলক লাগে গায়ে।’ কখনো পথ চলতে অভিমানে, উৎকণ্ঠায় ভেঙে পড়েছি। অভয়বাণী নিয়ে রবীন্দ্রনাথ পাশে আছেন টের পাই, আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়া
বুকের মাঝে বিশ্বলোকের পাবি সাড়া।

‘আমার ভুবন তো আজ হলো কাঙাল।’ এতোকাল জেনেছি, মানুষই কাঙাল হয়। ‘ কিন্তু আমার ভুবনই আজ কাঙাল হয়ে উঠলো! এই অসম্ভব সুন্দর কাঙালপনা গানে কে কবে বলেছে।
কত কত গান মনে আসছে,

ও চাঁদ চোখের জলের লাগল জোয়ার
দুঃখের পারাবারে
হল কানায় কানায় কানাকানি
এই পাড়ে ওই পাড়ে।

চোখের জলেরও জোয়ার হয়? এরকম অর্থপূর্ণ শব্দযোগ রবীন্দ্রনাথের গানের মধ্যে ঢুকে পড়ে কত-না মাধুর্য দান করেছে গানকে।
প্রেমপর্বের গানে এত তীব্র বিরহ — যেন অবশ করে দেয়।

আজি যে রজনী যায়
ফিরাইব তায় কেমনে…
ওগো ভোলা ভালো তবে, কাঁদিয়া কী হবে মিছে আর।
যদি যেতে হল হায় প্রাণ কেন চায় মিছে আর।

রবীন্দ্রনাথের গানে আমরা কী পাই? পাই বুঝি শর্তহীন এক প্রেমের বার্তা,

নাই বা ডাকো রইব তোমার দ্বারে
মুখ ফিরালে ফিরব না এইবারে
যেথায় তুমি লুকিয়ে প্রদীপ জ্বালো
বসে রইবো সেথায় অন্ধকারে
নাই বা ডাকো রইব তোমার দ্বারে।

কত গান যে তুলে দিতে ইচ্ছে করছে। কী বাণীতে, কী সুরে — অনন্য সেসব গান। তবে হয়তো বহুশ্রুত নয়, এরকমই একটি গান —

তোর ভিতরে জাগিয়া কে যে
তারে বাঁধনে রাখিলি বাঁধি।

এই গানটির শেষের ক’টি লাইন এইরকম —

হোথা ফুরায়ে গিয়েছে রাতি
হেথা জ্বলে নিশীথের বাতি
তোর ভবনে ভুবনে কেন
হেন হয়ে গেল আধাআধি?

‘আধাআধি’র কী আশ্চর্য সুন্দর ব্যবহার। শব্দকে কত গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারলে, সুর কতটা অনায়াসলব্ধ হলে এরকম গান তৈরি হয়। রবীন্দ্রনাথের গান আমার কাছে শুধু শুশ্রূষার নয়, কেবলি ভালোবাসার।
পূজাপর্বের একটি গান —

তুমি ডাক দিয়েছো কোন সকালে কেউ তো জানে না
আমার মন যে কাঁদে আপন মনে কেউ তা মানে না।

সহজ সুরে, সহজ কথায় – ‘অচলায়তন’ নাটকের পঞ্চকের কণ্ঠের এই গান বারবার মনে করিয়ে দেয়, ‘তোমার মতো এমন টানে কেউ তো টানে না।’ এরকম আরও কত যে প্রিয় গান আছে :

‘আবার এরা ঘিরেছে মোর মন
আবার চোখে নামে আবরণ।’

‘কার মিলন চাও বিরহী।’

‘একদা তুমি প্রিয়ে, আমারি এ তরুমূলে
বসেছো ফুলসাজে সেকথা যে গেছ ভুলে।’

‘শ্রাবণের পবনে আকুল বিষণ্ণ সন্ধ্যায়।’

‘কখন বসন্ত গেল এবার হল না গান’

‘সখী আঁধারে একেলা ঘরে, মন মানে না’

শান্তিদেব ঘোষের গলায়, ‘আর রেখো না আঁধারে আমায় দেখতে দাও, তোমার মাঝে আমার আপনারে দেখতে দাও।’ শুনে মনে হতো গান এমন করেও গাওয়া যায়?
আরও অনেক গানের কথা মনে আসছে লিখতে বসে। আমার সব সময়ের প্রিয় গান ‘শাপমোচন’ গীতিনাট্যের এই গানটি,

বাহিরে ভুল হানবে যখন অন্তরে ভুল ভাঙবে কি?
বিষাদবিষে জ্বলে শেষে রসের প্রসাদ মাঙবে কি?
রৌদ্রদাহ হলে সারা নামবে কি ওর বর্ষাধারা
লাজের রাঙা মিটলে হৃদয় প্রেমের রঙে রাঙবে কি?
যতই যাবে দূরের পানে
বাঁধন ততই কঠিন হয়ে টানবে নাকি ব্যথার টানে
অভিমানের কালো মেঘে বাদল হাওয়া লাগবে বেগে
নয়ন জলের আবেগ তখন কোনই বাধা মানবে কি?

গানটি একরাতে শ্রীকান্ত আচার্যের কণ্ঠে ১৭ বার শুনে মন খারাপ করে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। গুণে লিখে রাখছিলাম কত বার শুনতে পারি। সতেরোবারের পরে আর পারিনি। মনখারাপের ভয়ে এই গানটি শুনি না অনেকদিন।
‘তুমি ডাক দিয়েছো কোন সকালে কেউ তা জানে না’ — আগেও উল্লেখ করেছি, আবারও করলাম।
এই নিবিড়-গভীর নিঃশব্দ প্রেমের ডাকের স্বরূপ তো রবীন্দ্রনাথের গান থেকেই জানতে পারি।

আর সেই গানটি?

গোধূলি গগনে মেঘে ঢেকেছিল তারা
আমার যা কথা ছিল হয়ে গেল সারা।

এই গানটির শেষ দুটো লাইন এই করোনা-কালে বারবার মনে পড়ছে,

আর কী কখনো কবে এমন সন্ধ্যা হবে —
জনমের মতো হায় হয়ে গেল হারা।

আহা, আরো কত কত প্রিয় গানের কথা উল্লেখ করা হলো না।

শেষ করবার আগে রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে একটা স্মৃতির কথা বলি। বাবার চাকরির কারণে  আমি বাবা-মায়ের সঙ্গে নানান জায়গায় ঘুরে বেড়াই। ভাই-বোনরা সব যার যার মতো বাইরে পড়াশোনা করছে। সেরকম একটা সময়ে ছোড়দাকে চিঠি লিখতাম নিয়মিত। তখন ও ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে পড়ে। একবার ওর চিঠির খামের উপরে একদিকে ঠিকানা লিখে, অন্যপিঠে রবীন্দ্রনাথের একটি গানের কিছু অংশ লিখে দিয়েছিলাম। ‘স্বপন-পারের ডাক শুনেছি, জেগে তাই তো ভাবি’ — গানটির মাঝের অংশটুকু লিখে দিয়েছিলাম নিছক মজা করার জন্যই। কোন গান, সেটি ও ধরতে পারে কিনা।

চাওয়া পাওয়ার বুকের ভিতর
না-পাওয়া ফুল ফোটে
দিশাহারা গন্ধে তারই আকাশ ভরে ওঠে
খুঁজে যারে বেড়াই গানে, প্রাণের গভীর অতল-পানে

যে জন গেছে নাবি
সেই নিয়েছে চুরি করে
স্বপ্নলোকের চাবি।

ভাইয়ের সাথে নিছকই দুষ্টুমি করার জন্য হাতের লেখা পাল্টে দিয়েছিলাম। ভাই নাকি সারাদিন চিঠিটি বুকপকেটে নিয়ে ঘুরেছে, খুলে পড়েনি। পাছে অচেনা একজনের কাছ থেকে আসা চিঠি পাওয়ার আনন্দটুকু উবে যায়! পরে ওর বন্ধু এবং ঘনিষ্ঠজনদের কাছে একথা শুনেছি।
হায়, কে জানতো আমাদের জীবনের আনন্দের চাবিটি চুরি করে ভাই পরপারে পাড়ি জমাবে, যখন তার বয়স পঁচিশও হয়নি!

এভাবেই রবীন্দ্রনাথ গান নিয়ে আছেন আমার জীবনে। এতটা সত্যি হয়ে।