মাহফুজা শীলু >> তোমায় নতুন করে পাবো বলে >> সংগীত

0
460

তোমায় নতুন করে পাবো বলে

মেয়েটির ভালো নাম অণিমা। ডাক নাম মোহর। আর রবীন্দ্রনাথ নাম দিয়েছিলেন ‘কণিকা’। কাছের মানুষ তাঁকে আজীবন মোহর নামেই ডেকেছে। আমরা যারা দূরের, কাছে যেতে পারিনি যোগ্যতা এবং সুযোগের অভাবে, তারা তাঁকে তাঁর পোশাকি নামেই ডাকি। কণিকা। কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়। সংসদ বাংলা অভিধানে ‘কণিকা’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ দেখতে পাচ্ছি ক্ষুদ্রাংশ অথবা ফুলের রেণু। ক্ষুদ্র অর্থে তো অবশ্যই নয়-আমরা তাঁকে পেয়েছি দ্বিতীয় অর্থে। ফুলের মতো সুন্দর ছিলেন তিনি দেখতে। ততোধিক সুন্দর ছিল তাঁর কণ্ঠ।
রবীন্দ্রনাথের স্নেহধন্যা কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় আমৃত্যু সুরের সাধনা করে গেছেন। ভালোবেসে গলায় সুর তুলেছেন। তারপর ছড়িয়ে দিয়েছেন সেই সুর হাওয়ায় হাওয়ায়। যা আমরা কুড়িয়ে পেয়ে ধন্য মেনেছি নিজেদের। যারা রবীন্দ্রনাথের গান ভালোবাসি তারা কণিকার ভক্ত হয়ে যাই বড় সহজে। সে গাইতে পারি কী না পারি! প্রেমের গানে, একান্ত গভীর উচ্চারণে কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমতুল্য কাউকে সহসা চোখে পড়ে না। কণিকার পরে আরও কত শিল্পী এসেছেন, তবু কণিকা-কণিকাই।
সুচিত্রা মিত্র তাঁর তেজদীপ্ত গলায় যখন ‘কঠিন লোহা কঠিন ঘুমে ছিল অচেতন’ অথবা ‘নম যন্ত্র নম যন্ত্র’ গেয়ে উদ্দীপ্ত করে তোলেন আমাদের, তখন তার পাশাপাশি কণিকার কণ্ঠে, ‘আমি রূপে তোমায় ভোলাবনা, ভালোবাসায় ভোলাব। আমি হাত দিয়ে দ্বার খুলব না গো, গান দিয়ে দ্বার খোলাব।’ অথবা ‘ যা হারিয়ে যায়, তা আগলে বসে রইব কত আর,’ বারতা পেয়েছি মনে মনে, ‘আমার সকল নিয়ে বসে আছি সর্বনাশের আশায়’, বা ‘ ঘরেতে ভ্রমর এলো গুন গুনিয়ে- এ রকম অজস্র গান গেয়ে আমাদের শান্ত করে তোলেন। আমরা বুঝে যাই, মানুষের সকল সৌন্দর্য তার সমর্পণে – উচ্চকিত উচ্চারণে নয়।
কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন আশ্রমকন্যা। শুরুতে শান্তিনিকেতন আশ্রমের রূপে ছিল অনেকদিন। আশ্রম থেকে বিশ্বভারতী হয়ে ওঠা – সেটা অন্য গল্প। তখনও ছাতিমতলায় পাঠশালা, চারপাশে শুধু গান আর গান। সেই নিবিড় ঘন ছায়াসুনিবিড় শান্তির নীড় শান্তিনিকেতনের একটা গভীর ছাপ পড়েছিল তাঁর মনে।
কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম রেকর্ড বের হয়েছিল তাঁর ১৩ বছর বয়সে। সেই রেকর্ডের এক পিঠে ছিল, ‘মনে কী দ্বিধা রেখে গেলে চলে, অন্য পিঠে – ‘না না না, ডাকব না, ডাকব না, অমন করে বাইরে থেকে ডাকব না।’
১৯৪৩ সাল থেকে আকাশবাণীতে নিয়মিত গান গাইতে শুরু করেন এই শিল্পী।
কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথম একক সঙ্গীত পরিবেশন করেছিলেন ছায়া সিনেমা হলে। বর্ষামঙ্গলে। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সামনে! যাঁকে কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় অন্যান্য আশ্রমিকদের মতোই গুরুদেব বলে সম্বোধন করেছেন জীবনভর।
কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় কলকাতার ‘আনন্দলোক’ পত্রিকার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘ ভালো গাইতে হলে, ভালো মন লাগে। মন দিয়ে গাইতে হয় তো!’ এই যে গানের সাথে সুন্দর একটি মনের সংযোগ করতে হয়, তার খবর আমরা ক’জন রাখি ! গানের ভেতর দিয়ে নিজেকে তৈরি করা, তৈরি করতে পারা- সেটাও একটা আর্ট।
কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় রাবীন্দ্রিকযুগের এক উজ্জ্বল প্রতিভা। রবীন্দ্রনাথকে শুধু কণ্ঠে ধারণ করেননি, করেছিলেন অন্তরে। সেই অন্তরের সুধারসে শ্রোতারা জারিত হয়ে আসছে আজ কতকাল! সেও এক ইতিহাস!
‘ মোহর’ শান্তিনিকেতনের ছাত্রীই কেবল ছিলেন না, ছিলেন শিক্ষকও। শান্তিনিকেতনই ছিলো তাঁর আশ্রয়। এখান থেকে আর কোথাও যাননি কখনও। এই-ই ছিলো তাঁর সকল সুখ, সকল দুঃখের আবাস। তাঁর কৈশোর-যৌবনে শান্তিনিকেতনে গানের চর্চা হতো সকাল-বিকাল, সন্ধ্যা-রাত্রি। গানে গানে সকল বন্ধন টুটে যাবার খেলা চলত যেন তখন। বর্ষায় গান, বসন্তে গান, শরতে গান, শীতে গান। চতু্র্দিকে উৎসবে উৎসবে মাতোয়ারা। আর সকল ঋতু নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের ভাণ্ডারও তো অসামান্য।
গান শিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছাড়াও ইন্দিরা দেবী, শান্তিদেব ঘোষ, শৈলজারঞ্জন মজুমদারের কাছে। ‘তাসের দেশ’ এবং ‘ডাকঘর’ নৃত্যনাট্য দুটিতে অভিনয়ও করেছিলেন। আমরা অনেকেই হয়তো জানি না, রবীন্দ্রসঙ্গীত তাঁর প্রথম পছন্দ হলেও গেয়েছেন ভজন, নজরুলগীতি, অতুলপ্রসাদ এবং কিছু আধুনিক গানও। যেমন – ‘ওরে ওই বন্ধ হলো দ্বার/ ‘গান নিয়ে মোর খেলা।’
আনন্দলোক-এর সঙ্গে সেই সাক্ষাৎকারে কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় আরও বলেছিলেন, প্রতিষ্ঠা পাওয়ার জন্য তিনি কখনও গান গাননি। রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে টাকা রোজগারের কথাও কখনও ভাবেননি। প্রতিষ্ঠা যাঁর লক্ষ্য ছিল না, ছিল কেবল সাধনা – তাকে অপ্রতিষ্ঠিত রাখবে কে? কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘ এবং নিরলস সাধনাই সঙ্গীতপিপাসু, বিশেষ করে রবীন্দ্রসঙ্গীতপিপাসু বাঙালির ঘরে ঘরে তাঁকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় দেখতেই কেবল সুন্দরী ছিলেন না, রসবোধও ছিলো তাঁর বেশ। এক অনুষ্ঠানে নাকি কেউ একজন তাঁকে অটোগ্রাফ চেয়ে খাতা বাড়িয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘ আমি রূপে তোমায় ভোলাবো না, ভালোবাসায় ভোলাবো – তাঁর কণ্ঠের সেই বিখ্যাত গান লিখে অটোগ্রাফ দিতে! এর জবাবে কণিকা নাকি বলেছিলেন, না বাবা আমি এটা লিখব না, লোকে ভাববে আমি সত্যি বুঝি দেখতে খারাপ!
কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বাংলাদেশের রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পীদের ছিল প্রাণের এক নিবিড়-গভীর সম্পর্ক। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে আমরা অনেক স্বাধীনতাই পেয়েছি। তার মধ্যে অন্যতম হলো দুই বাংলায় অবাধ যাতায়াত। যেহেতু দুই বাংলার ভাষা এক, সংস্কৃতি এক – সেহেতু ভাব বিনিময়, বই বিনিময়,শিল্পী বিনিময়- কোনোটাতেই আর তেমন কোনো বাধা রইল না। কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলাদেশে এসেছেন কয়েকবার। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল তাঁকে দেখার, তাঁর গান শোনার – তাঁর সঙ্গে মিলিত হওয়ার। বাংলাদেশের রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পীদের মধ্যে পাপিয়া সারোয়ার, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা এবং সাদী মোহাম্মদ তকীউল্লাহদের মতো আরও অনেকেই তাঁকে শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন। এখানে উল্লেখ করলে বোধহয় অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা ছিলেন কণিকার কন্যাসম। শুধু ছাত্রীই ছিলেন না বন্যা, গুরু-শিষ্যের বাইরেও তাঁদের মধ্যে ছিলো খুব গভীর সম্পর্ক। বন্যার মতো শিল্পীদের মধ্য দিয়েই হয়তো কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় আরও বহুদিন তাঁর গানের ভাব-ঐশ্বর্য, তাঁর গায়কীর সৌন্দর্য নিয়ে বেঁচে থাকবেন। একসময় রেজওয়ানা চৌধুরীর ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে থেকেও কেউ কেউ বেরিয়ে আসবেন তাঁদের মতো সাধনা এবং গায়কী নিয়ে। এভাবেই শিল্পীরা যুগের পর যুগ বেঁচে থাকেন। বেঁচে থাকেন রবীন্দ্রনাথ।
অসামান্য প্রতিভাধর এই শিল্পী তাঁর কর্মে, জীবনযাপনে, সঙ্গীত সাধনায় সর্বত্রই ছিলেন রবীন্দ্রনাথের দ্বারা প্রভাবিত। কণিকার গানের মধ্য দিয়ে আমরা যেন রবীন্দ্রনাথকেই নানারূপে, নানাভাবে পাই। কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্যে মনন এবং গায়কীর এই যে মনিকাঞ্চন যোগ ঘটেছিলো-তা সত্যি দুর্লভ।
এত কথা যাঁকে নিয়ে, ১২ অক্টোবর ছিল তাঁর জন্মদিন। তিনি চলে গেছেন এই পৃথিবী ছেড়ে অনেকদিন হলো। গেয়ে গেছেন এমন গান – যা বার বার শুনতে ইচ্ছে করে। কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ায়ের গানে রবীন্দ্রনাথ আর কণিকা, দুজনকেই পাই একে অপরের পরিপূরক হিসেবে – ‘আমার মন মজেছে সেই গভীরের গোপন ভালোবাসায়।’
কিছুটা বিলম্ব হলেও শুভ জন্মদিন কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়।