মিচ আলবম > আরও একটি দিনের জন্য >> কামরুল হাসান অনূদিত ধারাবাহিক উপন্যাস (পর্ব ১)

0
264

আরও একটি দিনের জন্য > ধারাবাহিক উপন্যাস (পর্ব ১)

ধারাবাহিক এই উপন্যাসটি পড়ার আগে জেনে নিন

‘আরও একটি দিনের জন্য’ (For One More Day) হলো সেই দিনটি যা আমরা সকলেই কামনা করি আমাদের প্রয়াত প্রিয়জনের সঙ্গে একটিবার দেখা করার জন্য। আহা, যদি তারা ফিরে আসতো, যদি আরেকটি দিন তাদের সঙ্গে কাটাতে পারতাম, তবে অনেক অজানা প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যেত, সবচেয়ে বড়ো কথা নিজেদের ভুলগুলোর জন্য ক্ষমা চেয়ে নেওয়া যেত, বলা যেত তাদেরকে কী গভীরভাবে আমরা ভালোবাসি, কী বিপুল বেদনা বহন করি তাদের হারিয়ে। এই বইতে এই প্রিয়জন হলেন চার্লস বেনেটোর মা পলিন বেনেটো।
জীবনের প্রতি চরম বীতশ্রদ্ধ হয়ে চার্লস গিয়েছিল আত্মহত্যা করতে। চাকরি হারানো এক মানুষ, যার স্ত্রী ছেড়ে চলে গেছে, যে ক্রমশই ওই সব ব্যাথা ভুলতে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছিল, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি নেয় এ-জীবন সে আর রাখবে না সেইদিন যেদিন তার একমাত্র মেয়ের বিয়েতে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। দুবার আত্মহত্যার চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে চার্লি বাড়ি ফিরে হতবাক হয়ে দেখে আট বছর আগের মৃত মা ফিরে এসেছেন। চার্লি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারে না, কিন্তু এও তো সত্য তার স্নেহময়ী মা জলজ্যান্ত সামনে দাঁড়িয়ে। ঔপন্যাসিক বলেছেন পাঠকরা এই উপন্যাসকে ভূতের গল্প বলেও ভাবতে পারেন। লেখকের মতে, প্রতিটি পরিবারেই একটি ভূতের গল্প আছে। মিচ আলবম একজন আমেরিকান ঔপন্যাসিক, যার বই সারা পৃথিবীতে ৩৯ মিলিয়ন কপি বিক্রি হয়েছে। মিচ আলবমের জন্ম আমেরিকার নিউ জার্সিতে, ১৯৫৮ সালে। ব্যক্তিগত জীবনে নিঃসন্তান আলবম ভূমিকম্পে পিতৃ-মাতৃহীন হাইতির কৃষ্ণাঙ্গ শিশুদের জন্যে গড়ে তুলেছেন একটা চ্যারিটি প্রতিষ্ঠান। সেই প্রতিষ্ঠান নিয়েই কাটে তার জীবনের অনেকটা সময়।

“আমাকে অনুমান করতে দিন। আপনি জানতে চাচ্ছেন কেন আমি নিজেকে খুন করতে চেয়েছিলাম।”
– আমার প্রতি চিক বেনেটোর প্রথম দুটি বাক্য।

এটি একটি পরিবারের গল্প, এবং যেহেতু এতে একটি ভৌতিক চরিত্র রয়েছে, আপনারা একে ভূতের গল্প বলতে পারেন। তবে কি জানেন, প্রত্যেক পরিবারই একটি ভূতের গল্প। মরে যাবার অনেক বছর পরেও মৃতেরা এসে আমাদের টেবিলে বসে।
এই বিশেষ গল্পটি চার্লস “চিক” বেনেটোর গল্প। ভূতটি কিন্তু সে নয়। সে একজন জলজ্ব্যান্ত মানুষ। এক শনিবার সকালে তাকে আমি একটি ছোট লীগ মাঠের পাশে পাই, সে পরেছিল একটি নেভী ব্লু রঙের সিনথেটিক জ্যাকেট, যা বাতাস আটকে রাখে, আর সে চিবুচ্ছিল পিপারমিন্ট গাম। হতে পারে তাকে আপনারা তার বেসবল খেলার দিনগুলো থেকে চেনেন। আমার পেশাগত জীবনের একটা অধ্যায় কেটেছে ক্রীড়ালেখক হিসেবে, তাই নামটি আমার কাছে বিভিন্ন পর্যায়ে শোনা মনে হচ্ছিল।
পেছনে তাকিয়ে বলতে পারি, ভাগ্যই আমাকে তাকে পেতে সাহায্য করেছিল।আমি পিপালভিল বীচ শহরে এসেছিলাম বহুবছর ধরে আমাদের পারিবারিক সম্পত্তি হিসেবে থাকা একটি ছোট বাড়ি বিক্রি করে দিতে। সেখান থেকে ফিরে আসার সময় এয়ারপোর্টের দিকে যেতে যেতে আমি কফি খেতে এক জায়গায় থামি। সড়কের ওপাশে একটি মাঠে বেগুনি রঙের টি-শার্ট পরা শিশুরা বল ছোড়াছুড়ি করে খেলছিল। হাতে পর্যাপ্ত সময় ছিল। আমি একটু ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম।
আমি মাঠটির পেছনে এসে দাঁড়ালাম,
আমার আঙুলগুলো লোহার মোটা তার পেঁচিয়ে তৈরি বেড়া আঁকড়ে ছিল, দেখলাম একজন বুড়ো লোক ঘাস কাঁটার মেশিনে ঘাস কাটছে। তার গায়ের চামড়া রোদেপোড়া ও কুঞ্চিত, ঠোঁটে ধরানো একটি সিগারেটের অর্ধেক। আমাকে দেখে তিনি ঘাস কাটা বন্ধ রেখে জিজ্ঞেস করলেন, মাঠের শিশুদের মাঝে কোনোটি আমার কি না। আমি বল্লাম, না। তিনি জিজ্ঞেস করলেন আমি সেখানে কী করছি। আমি তাকে বাড়ি বিক্রির কথা বল্লাম। তিনি আমাকে শুধালেন জীবিকার জন্য আমি কী করি, আর আমি তাকে সত্যি কথাটা বলে বোধকরি ভুলই করলাম।
“একজন লেখক, অ্যাঁ?” সিগারেটটি চিবুতে চিবুতে তিনি বল্লেন। মাঠের প্রান্তে একটি সস্তা বেঞ্চে আমাদের দিকে পিঠ দিয়ে একাকী বসে থাকা একজনের দিকে সে আঙুল তুলে দেখাল। “তোমার উচিৎ হবে ওই লোকটির সাথে কথা বলা। ওখানে একটি গল্প আছে।”
আমি প্রায়ই এমনটা শুনি।
“আচ্ছা, তাই? কেন কি বলবেন?”
“তিনি একবার প্রো বল খেলেছিলেন।”
“হুম।”
“আমার ধারণা তিনি ওয়ার্ল্ড সিরিজে খেলেছিলেন।”
“হুম।”
“আর সে নিজেকে খুন করতে চেয়েছিল।”
“কী বল্লেন?”
“তাই।” লোকটি নাক টানলেন। “আমি যা শুনেছি লোকটির কপাল খুবই ভালো যে সে বেঁচে আছে। তার নাম চিক বেনেটো। তার মা, পজি বেনেটো, এখানে বাস করতেন।” তিনি হাসলেন। “সে ছিল দুর্দান্ত!”
তিনি মুখ থেকে সিগারেটটি ফেলে সেটি পা দিয়ে পিষে ফেললেন।। “যাও, আমাকে যদি বিশ্বাস না হয়, তাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করো।”
সে ঘাস কাটার যন্ত্রের কাছে ফিরে গেল। আমি লোহার বেড়াটি ছেড়ে দিলাম। সেটাতে জং ধরে গিয়েছিল আর কিছু জংয়ের গুড়ো আঙুলে উঠে এলো।
প্রতিটি পরিবারেই একটি ভূতের গল্প আছে।
আমি কাঠের বেঞ্চটির দিকে এগুলাম।
এখানে আমি যা লিখেছি তা চার্লস “চিক” বেনেটো কথোনথনের সময় সেই সকালে
আমাকে বলেছিল- যা এর চেয়েও বেশি বিস্তৃত ছিল-ব্যক্তিগত নোট, তার ডায়েরির পাতা যা আমি পরে, নিজের গরজে জোগাড় করে নিই। আমি সেসবকে নিচের বর্ণনায় জড়ো করেছি, তার মুখনিঃসৃত কথাতেই, কারণ আমি ঠিক নিশ্চিত নই আপনারা এই ঘটনা বিশ্বাস করবেন কি না, যদি না তার মুখ থেকে তা না শোনেন।
আপনি এই কাহিনী বিশ্বাস নাই করতে পারেন।
কিন্তু নিজেকে এই প্রশ্নটি করুন: আপনি কি কখনো এমন কাউকে হারিয়েছেন যাকে আপনি ভালোবাসেন, আর ইচ্ছা হয়েছিল তার সাথে আরও একবার কথা বলতে, আরও একবার সেই সময়টি ফিরে পেতে যে সময়কে আপনি ভেবেছিলেন চিরকাল থাকবে, যখন শেষ কথাগুলো বলতে পারবেন। যদি তাই হয়, তাহলে আপনি জানেন আপনি আপনার সারা জীবনের সবগুলো দিন একত্রিত করলেও এই একটি দিন, যা আপনি ফেরৎ পেতে চাইছেন, তার সমান হবে না।
কী হতো বলুন তো, যদি তা ফেরৎ পেতেন?

মে ২০০৬

১. মধ্যরাত

চিকের কাহিনী

আমাকে অনুমান করতে দিন। আপনি জানতে চান আমি কেন নিজেকে খুন করতে গিয়েছিলাম?
আপনি জানতে চান আমি কীভাবে বেঁচে রইলাম। আমি কেন নিখোঁজ হয়ে গেলাম। ঐ সকল সময়ে আমি কোথায় ছিলাম। কিন্তু সবার আগে, আমি কেন নিজেকে খুন করতে গিয়েছিলাম, তাই না?
ঠিক আছে। লোকেরা ওরকম করে। তারা আমার সাথে নিজেদের তুলনা করে। যেন দুনিয়ার কোথাও এই লাইনটি টানা আছে, আর আপনি যদি সেটা অতিক্রম না করেন, আপনি কখনোই নিজেকে কোনো ভবন থেকে ঝাঁপিয়ে পড়তে বা একগাদা ঘুমের ঔষধ খেতে- কিন্তু যদি আপনি সেসবই করেন তাহলে জানবেন। লোকেরা হিসাব করে দেখে আমি সেই লাইনটি অতিক্রম করেছিলাম। তারা নিজেদের জিজ্ঞেস করে, আমরা কি মৃত্যুর এত কাছাকাছি যেতে পারবো, যতদূর সে গিয়েছিল?
আসল কথা হলো এরকম কোন সীমারেখা নেই। যা রয়েছে তা হলো আপনার নিজের জীবন, আপনি সেটাকে কিভাবে নষ্ট করতে চান, আর কে আপনাকে বাঁচাতে আসবে।
আর কেইবা আসবে না?
পেছনে তাকিয়ে আমি দশ বছর আগে মরে যাওয়া আমার মায়ের মৃত্যুর দিনটিকে স্মরণ করছিলাম। মা যখন মারা যান, আমি তখন তার পাশে ছিলাম না, আমার থাকা উচিৎ ছিল। সুতরাং আমি মিথ্যা বলেছিলাম। সেটা ছিল একটা বাজে ধারণা। শেষকৃত্যের অনুষ্ঠানে আপনি মিথ্যা বলতে পারবেন না। আমি মায়ের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে এটা বিশ্বাস করার চেষ্টা করছিলাম যে সেটা আমার কোনো ভুল ছিল না। সেসময়ে আমার চৌদ্দ বছরের মেয়ে আমার হাতখানি হাতে তুলে নেয় আর ফিসফিস করে বলে, “বাবা, আমার খারাপ লাগছে যে তুমি দাদীকে বিদায় বলতে পারোনি আর সেটাই ছিল যথেষ্ট। আমি ভেঙে পড়লাম। কাঁদতে কাঁদতে আমি হাঁটু মুড়ে বসে পড়লাম, ভেজা ঘাসের দাগ লেগে যাচ্ছিল আমার প্যান্টে।
শেষকৃত্যের পরে আমি এত বেশি মদ খেলাম যে কৌচ থেকে পড়ে গেলাম। কিছু একটা পরিবর্তন হলো আমার ভেতর। একটি দিন আপনাকে অবনত করতে পারে আর সেইদিনটি আমাকে ভীষণভাবে নত করলো। শিশু হিসেবে আমার সবকিছুর উপরে আমার মা ছিলেন- উপদেশ, সমালোচনা, সন্তানের প্রতি মায়ের যা যা ভূমিকা সব। এমনও কোনো কোনো সময় এসেছে আমি চাইতাম মা আমাকে একা ছেড়ে দিক।
তা তিনি করলেন। তিনি মরে গেলেন। আর কোনো সাক্ষাৎ নয়, আর কোনো ফোনকল নয়। আর কোনোরূপ উপলব্ধি ছাড়াই আমি সরে যেতে শুরু করলাম, যেন আমার শেকড় উৎপাটিত হয়েছে, যেন এক শাখানদী দিয়ে আমি ভেসে যাচ্ছি । মায়েরা তাদের সন্তানদের সম্পর্কে কিছু ইন্দ্রজাল ধরে রাখেন, এমনি একটি ইন্দ্রজাল ছিল আমি যা হতে চেয়েছি আমি তাকে পছন্দ করি, মাও সেটাই পছন্দ করে। সে যখন চলে গেল, সেই ধারণাটিও চলে গেল।
সত্যি হলো, আমি যা হয়েছি আমি তা মোটেই পছন্দ করতাম না। আমার মানসপটে আমি এখনো যে ছবিটি ধারণ করি তা হলো আমি একজন সম্ভাবনাময় তরুণ এথলেট। কিন্তু আমি আর তরুণ নই, আমি এখন আর কোনো এথলেটও নই। আমি একজন মধ্যবয়সী বিপণনকর্মী। আমার সম্ভাবনা অনেক আগেই তিরোহিত।
মা মরে যাওয়ার এক বছর পরে আমি আমার জীবনের আর্থিক বিচারে সবচেয়ে বড়ো বোকামিটি করলাম। আমি একজন মহিলা বিপণন কর্মীকে আমার সাথে বিনিয়োগের পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলতে সুযোগ দিলাম। সে ছিল এক আকর্ষণীয় চেহারার যুবতী সেই বুকের দুটি বোতাম খোলা ফ্যাশনের আত্মপ্রত্যয়ী, ঝড়ো হাওয়ার মতো যা একজন অধিকতর বয়সী পুরুষকে তিক্ত করে তোলে যদি সে তার সাথে কোনো কথা না বলে তাকে অতিক্রম করে যায়। আর কথা বললেই পুরুষটি ধরা। প্রস্তাবটি নিয়ে কথা বলতে আমরা তিনবার দেখা করি, দুবার তার অফিসে আর তৃতীয়বার এক রেস্তোরাঁয় – না, এর মাঝে অশোভন কিছু নেই কিন্তু তার সুগন্ধির সৌরভ থেকে আমার মাথাটি বের করে আনতে আনতে আমার সঞ্চিত টাকার প্রায় পুরোটাই আমি একটি মূল্যহীন কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করে বসে আছি। তাকে দ্রতই পশ্চিম উপকূলে ” ট্রান্সফার” করা হয়। পুরো ব্যাপারটি আমাকে আমার স্ত্রী ক্যাথরিনের কাছে ব্যাখ্যা করে বোঝাতে হয়।
এরপরে আমি আরো মাদকাসক্ত হয়ে পড়ি- আমাদের সময়ের বেসবল খেলোয়াড়রা সকলেই মদে আসক্ত ছিল- কিন্তু এটা একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়, এর মধ্যে আমার দুটি বিপণনের চাকরি চলে যায়। চাকরি হারাবার ফল হয় আমি আরো মাদকাসক্ত হয়ে পড়ি। আমি ঘুমাতাম অসময়ে। খেতাম উল্টাপাল্টা। মনে হল আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বুড়ো হয়ে যাচ্ছি। যখন চাকরি পেতাম আমি ক্রেতার সাথে দেখা করার আগে বাথরুমে গিয়ে সঙ্গে লুকিয়ে রাখা মাউথওয়াশ দিয়ে মুখ ধুয়ে ও চোখে ড্রপ দিয়ে আসতাম। টাকাপয়সার সঙ্কট দেখা দিল। ক্যাথেরিন আর আমার ঝগড়া লেগেই থাকতো। সময়ের সাথে সাথে আমাদের বৈবাহিক সম্পর্ক ভেঙে পড়ল। আমার দুর্দশা দেখে সে ক্লান্ত হয়ে পড়ল আর সেজন্য আমি তাকে কোনো দোষ দেই না। আপনার যখন অধঃপতন হয় কেবল নিজের কাছেই না, আপনি সকলের কাছেই পঁচে যান, যাদের আপনি ভালোবাসেন তাদের কাছেও। একরাতে ক্যাথরিন আমাকে বেসমেন্টে বেসবেল খেলোয়াড়ের গ্লাভস পরে ঠোঁট কেটে রক্ত পরা অবস্থায় আবিষ্কার করে।
এর কিছুদিন পরেই আমি আমার পরিবার ছেড়ে চলে যাই, তারাও আমাকে ছেড়ে চলে যায়।
বুঝিয়ে বলতে পারবো না আমি কতখানি লজ্জিত ছিলাম।
আমি একটি এপার্টমেন্টে থাকতে শুরু করি। আমি আরো বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম। আমার সঙ্গে যারা মদ খেত তাদের ছাড়া বাকি সবাইকে এড়িয়ে চলতে শুরু করলাম। আমার মা বেঁচে থাকলে আমাকে হয়তো উদ্ধার করতে পারতেন, কারণ অনেকসময়েই তিনি আমার হাত তার বাহুর ভেতর জড়িয়ে বলতেন, “কী হয়েছে চার্লি, ঘটনা কী?” কিন্তু মা তো আর নেই। এটা হলো সেই অবস্থা যখন মা-বাবা মরে গেছেন, আর আপনি অনুভব করেন জীবনের প্রতিটি সংগ্রামের মুখোমুখি হতে একটি ব্যাকআপ নিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে আপনি একা যাচ্ছেন।
অক্টোবরের প্রথমদিকে এক রাতে আমি নিজেকে খুন করার সিদ্ধান্ত নিলাম।
আপনি হয়তো অবাক হচ্ছেন। আমার মতো মানুষকে দেখে আপনি হয়তো ভেবেছেন এমন একজন মানুষ যে ওয়ার্ল্ড সিরিজে খেলেছে সে নিশ্চয়ই এতটা নিচে নেমে আসবে না যে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিবে, কেননা নিদেনপক্ষে সে “স্বপ্ন হলো সত্যি” জাতীয় কিছু জীবনে পেয়েছে। কিন্তু সেটা হবে আপনার ভুল ধারণা। স্বপ্ন যখন সত্যি হয় তখন যা ঘটে তা হলো একটি ধীর দ্রবীভূত উপলব্ধি যে সেটা তা ছিল না আপনি যা ভেবেছিলেন।
আর সেটা আপনাকে বাঁচাবে না।
যা আমাকে শেষ করে দিল, ছুঁড়ে দিল সীমারেখার ওইপাড়ে, অস্বাভাবিক শোনালেও সত্যি, তা ছিল আমার মেয়ের বিয়ে। সে ছিল তার মায়ের মতোই পুরু ঠোঁট আর বাদামী রঙের লম্বা, সোজা চুলের বাইশ বছর বয়সের এক যুবতী। অপরাহ্নের এক অনুষ্ঠানে সে একজন “চমৎকার যুবা”কে বিয়ে করল।
আর সেটাই হলো পুরোটা যা আমি জানি, আর সেটাই সে আমাকে একটি সংক্ষিপ্ত চিঠিতে জানিয়েছিল। চিঠিটি বিবাহ অনুষ্ঠানের কয়েক সপ্তাহ পরে আমার এপার্টমেন্টের ঠিকানায় এসেছিল।
আপাতদৃষ্টিতে আমার মাদকাসক্তি, ডিপ্রেশন ও খারাপ ব্যবহারের কারণে আমি এতটাই বিব্রতকর এক চরিত্রে পর্যবসিত হয়েছিলাম যে একটা পারিবারিক অনুষ্ঠানের জন্য আমার উপস্থিতি ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। আমন্ত্রণের পরিবর্তে আমি সেই চিঠিটি আর দুটি ছবি পেয়েছিলাম, যার একটিতে আমার মেয়ে ও তার সদ্য বিয়ে করা স্বামী একটি গাছের নিচে হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়ে আছে আর অপরটিতে সুখী দম্পতি শ্যাম্পেন পান করে পরষ্পরের স্বাস্থ্য কামনা করছে।
দ্বিতীয় ছবিটি আমার হৃদয় ভেঙে দিল।সেটা ছিল সেই স্ন্যাপশটের একটি যা এমন একটি মুহূর্তকে ধরে রেখেছে যে আপনি কখনোই ফিরে পাবেন না, কথা বলার মাঝখানে তারা তাদের পানপাত্র হাতে ধরে হাসছে। ছবিটি এত নিস্পাপ, এত তাজা, এত…অতীত কাল। ছবিটি আমার অনুপস্থিতিকে যেন খোঁচা দিচ্ছিল। আপনি সেখানে ছিলেন না। আমি এমনকি এই লোকটিকে চিনতাম না। আমার প্রাক্তন স্ত্রী চিনত। আমাদের পুরনো বন্ধুবান্ধবরা চিনত। আপনি সেখানে নেই। আরো একবার আমি একটি গুরুত্বপূর্ণ পারিবারিক ঘটনায় অনুপস্থিত। এই ক্ষেত্রে আমার ছোট্ট মেয়েটি আমার হাত ধরে আমাকে সান্তনা দিল না; সে অন্য কারো হয়ে গেল। আমাকে জিজ্ঞেস পর্যন্ত করল না। আমাকে শুধু নোটিশ পাঠাল।
আমি চিঠির খামটির দিকে তাকালাম, যাতে তার নামের নতুন শেষাংসটি লেখা ছিল (মারিয়া লাং, মারিয়া বেনেটো নয়) আর কোনো ফেরৎ ডাকঠিকানা ছিল না (কেন? তারা কি ভয় পাচ্ছিল যে আমি গিয়ে উপস্থিত হতে পারি?) কিছু একটা আমার ভেতরে এত গভীর তলানিতে গিয়ে ঠেকল যেআমি আর সেটা উদ্ধার করতে পারলাম না। তোমার একমাত্র সন্তানের জীবন থেকে তুমি বহিষ্কৃত; তুমি অনুভব করছ একটা লোহার দরোজা তালা দিয়ে আঁটকে দেওয়া হয়েছে, তুমি জোরে জোরে বাড়ি দিচ্ছ, কিন্তু কেউ শুনতে পাচ্ছে না। সবকিছু ছেড়ে দেবার ভূমি হলো ওই শুনতে না পাওয়া, আর সবকিছু পরিত্যাগ করা হলো নিজের হাতে নিজেকে সমর্পণ করার ভূমি।
আমি তাই চেষ্টা করলাম।
এটা এমন নয় যে এর মধ্যে এমন কী আছে? এটা বরঞ্চ অনেকটাই এর মাঝে আলাদা কী আছে?
———

আহাম্মকিতে ডুবে খোদার কাছে ফিরল সে যখন
তার গানগুলো অর্ধেক লেখা, কাজ অসমাপ্ত রয়ে গেছে
কে জানে তার বিধ্বস্ত পা কোন পথে ঘুরে মরেছে
কোন বেদনার পাহাড় বা শান্তির চূড়া সে করেছে জয় তখন?
মনে হয় খোদা হাসিমুখে তুলে নিলেন ওর হাতখানি
আর বললেন, “ওরে হতভাগা, ওরে আবেগে ভরা বোকা
জীবন এমন পুস্তক সহজে হয় না পাঠোদ্ধার, মানি :
কেন বিদ্যালয়ে থাকতে পারলি না তুই, খেলি ধোঁকা?”

(চার্লস হানসন টাউনের লেখা এই কবিতাটি চিক বেনেটোর জিনিসপত্রের ভেতর এক নোটবুকে লেখা ছিল)

[চলবে]