মিল্টন বিশ্বাস > উপন্যাসে বঙ্গবন্ধু >> মুজিব শতবর্ষ

0
460

উপন্যাসে বঙ্গবন্ধু

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা উপন্যাসে একদিকে বাংলাদেশের ইতিহাস, আর অন্যদিকে মহান নেতা জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের যে প্রতিচ্ছবি পাই, সামগ্রিকভাবে সেটাই হচ্ছে বাংলাদেশ। জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশের ইতিহাস। একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব যে কত বিচিত্রভাবে উপন্যাসেরও নায়ক হয়ে উঠতে পারেন, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা উপন্যাসগুলি তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।

আজ ১৭ মার্চ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ। ‘মুজিববর্ষে’র সূচনা দিবস। জাতির পিতার জন্মশতবর্ষে জাতীয় শিশু দিবস উদযাপন খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। এরকম দিন বর্তমান প্রজন্মের জীবনে আর আসবে না। তাছাড়া ১৯৯৭ সাল থেকে জাতীয় শিশু দিবস পালন করা শুরু হলেও বঙ্গবন্ধুকে নিবিড়ভাবে জানার সুযোগ এ-প্রজন্মের হয়েছে গত ১১ বছরে। তারা জেনেছে, বঙ্গবন্ধু ছিলেন মাটির মানুষ ও সাধারণ মানুষের নেতা। এজন্য তাঁর সহজ-সরল আচরণ শত্রু-মিত্র সকলকে আকৃষ্ট করত। মানুষের কল্যাণে ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। তিনি বাংলা সাহিত্যের সৃজনশীল রচনার অন্যতম প্রেরণাদায়ী ব্যক্তিত্ব। বাংলা উপন্যাসে তাঁর জীবন ও কর্মকে উপস্থাপনের বহুমাত্রিক অভিব্যক্তি লক্ষণীয়।
২.
বাংলা সাহিত্যে বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্মভিত্তিক ৩০টি উপন্যাস রচিত হয়েছে। এগুলি হচ্ছে আউয়াল চৌধুরীর সেই কালো রাত, আনিসুল হকের যারা ভোর এনেছিল, উষার দুয়ারে, আলো-আঁধারের যাত্রী, এই পথে আলো জ্বেলে, এখানে থেমো না, আবদুল মান্নান সরকারের জনক, আহমদ ছফার একজন আলী কেনানের উত্থান পতন, এ্যালভীন দীলিপ বাগচীর বাঙলার স্থপতি (১ম খণ্ড), ড. এ এইচ খানের ফাদার অব দ্য নেশন, মহিবুল আলমের, তালপাতার পুথি ১ ও ২, মাসরুর আরেফিনের আগস্ট আবছায়া, মাসুদ আহমেদের বিজন নীল জলে, মুনতাসীর মামুনের জয় বাংলা, মোস্তফা কামালের অগ্নিকন্যা, অগ্নিপুরুষ, অগ্নিমানুষ, মোস্তফা মীরের এই হলো শেখ মুজিবের দেশ, মোহিত কামালের উড়াল বালক, শেখ সাদীর ১৫ আগস্টের ১০০ মিনিট, শামস সাইদের ধানমন্ডি ৩২ নম্বর (১ম ও ২ খণ্ড), স. ম. শামসুল আলমের গল্পের গাড়ি মিরধা ভাই, সমীর আহমেদের, দাওয়াল, সেলিনা হোসেনের আগস্টের একরাত ও সাতই মার্চের বিকেল, সৈয়দ শামসুল হকের দুধের গেলাশে নীল মাছি, হুমায়ূন আহমেদের দেয়াল, হুমায়ূন মালিকের মুজিবপুরাণ ইত্যাদি।
এই উপন্যাসগুলোর কাহিনি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এখানে ইতিহাস ও শিল্প পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। ইতিহাসের কঙ্কালের ওপর কল্পনার অস্থিমজ্জা মিশিয়ে লেখকেরা সৃষ্টি করেছেন সফল একেকটি সাহিত্যকর্ম। লেখকের কল্পনায় ইতিহাসের চরিত্রগুলো জীবন্ত হয়ে উঠেছে। ঘটনা ও চরিত্রের দ্বন্দ্ব-সংঘাত এবং ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে উপন্যাসের কাহিনিগুলির অধিকাংশই পেয়েছে প্রত্যাশিত গতি। এসব উপন্যাসের ভেতরে আছে রাজনীতি, সমাজ-সংস্কৃতি, ইতিহাস ও সমাজসংলগ্ন মানুষের অধিকারের কথা। ভিন্ন বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে। দাঙ্গা-হাঙ্গামা, শ্রেণিবৈষম্য, ঘাত-প্রতিঘাত-সংঘাত, বিপর্যয়, রাজনৈতিক নানা অস্থিরতা ও সমকালীন নানা প্রসঙ্গ আখ্যানে স্থান পেয়েছে। মূলত আখ্যানের প্রতিটি মানুষই কোনো না কোনো রাজনৈতিক জীবন। আর এক্ষেত্রে একজন ঔপন্যাসিককে সাধারণ মানুষের তুলনায় অনেক বেশি রাজনীতি সচেতন হতে হয়েছে। মূলত ইতিহাস ইতিহাসই; উপন্যাস উপন্যাসই। এ-দুয়ের উপাদানগত পার্থক্য অনেক। উভয়ের মূল উপাদান সময় ও চরিত্র। মূল ইতিহাসকে অক্ষুণ্ন রেখে এবং এর চরিত্রগুলোকে উপন্যাসে যথাযথ ভূমিকায় তুলে ধরা সহজ কাজ নয়। যদি এই দুইয়ের সামান্য হেরফের ঘটে যায়, তাহলে উপন্যাসের বিশ্বস্ততা নষ্ট হয়।
ইতিহাসকে আশ্রয় করে উপন্যাস রচনার বিষয়টি অবশ্র নতুন নয়। বাংলা উপন্যাসের সূচনাকাল থেকেই এ প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। বাংলার সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি তথা যুগের অভিঘাতগুলো উনিশ ও বিশ শতকের সব ঔপন্যাসিকের রচনাতেই ফুটে উঠেছে। বাংলাদেশের উপন্যাসেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি।
বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রচিত উপন্যাসগুলোতে দেখা যায় ঐতিহাসিক ঘটনারই প্রাধান্য; বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের বিক্ষুব্ধ সময়ে এসব উপন্যাসের চরিত্রগুলো পরস্পরের কাছে এসেছে। তাদের মানসিক সংঘর্ষ ও পরিবর্তনের চিত্র উদ্ঘাটিত হয়েছে। ইতিহাস এখানে পারিবারিক জীবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে বিজড়িত। অর্থাৎ, ইতিহাস বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পারিবারিক জীবনকে আলিঙ্গন করে এগিয়েছে। এজন্য কাহিনিতে মানুষের সাধারণ নানান মনোবৃত্তি- যেমন প্রেম, ঈর্ষা, বন্ধুত্বের ছবিও পাওয়া যায়। ইতিহাসের জটিল-কুটিল দৃষ্টির তলায় আবর্তিত হয়েছে মানবতা। কাহিনির বৃহত্তর পরিসরের মধ্যে কিংবা যুগান্তকারী ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব-সংঘাতে নিম্নবর্গের মানুষ উপেক্ষিত হলেও, সর্বক্ষেত্রে সেটা ঘটেনি।
অধিকাংশ আখ্যানের চরিত্রগুলি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির, কখনো-বা তাদের অবস্থান সমাজের উঁচুতে। তাঁরা রাজনৈতিক আবর্তে প্রকম্পিত ইতিহাসের ভেতর জন্মগ্রহণ করে বেড়ে উঠেছেন। ইতিহাস এদের পারিবারিক জীবনে প্রবেশ করে স্বাভাবিক স্বাধীনতাকে সংকুচিত করেছে এবং তার তুচ্ছতম বিষয়ের সঙ্গে একান্ত অপ্রত্যাশিত ও নির্মম পরিণতির সংযোগ স্থাপন করেছে। বঙ্গবন্ধুর বিশাল জীবন-ইতিহাস ক্ষুদ্র ব্যক্তিগত জীবনকে প্রায় গ্রাস করে নিয়েছে। তবে ঐতিহাসিক ঘটনাক্রমের মধ্যে তাদের নিজেদের কণ্ঠস্বর ও জীবনযাপনকে হারিয়ে ফেলেননি অন্যান্য রাজনৈতিক চরিত্রগুলি। ইতিহাসের প্রবল আকর্ষণে তাদের জীবন ঐতিহাসিক ঘটনার ধারায় এগিয়ে গেছে। ইতিহাসের হাত থেকে ব্যক্তিগত জীবনকে অনেকেই আবার রাজনৈতিক কারণে রক্ষা করতে পারেননি। অবশ্য কোনো কোনো ঔপন্যাসিক ইতিহাসের সর্বগ্রাসী একাধিপত্য থেকে মানবজীবনের স্বাধীনতা ও গৌরবকে যতটা পারা যায়, রক্ষা করতে চেয়েছেন। এজন্য ইতিহাসের নিষ্পেষণে চরিত্রগুলো তাদের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য হারিয়ে ফেলেনি। ইতিহাসের নাগপাশের মধ্যে মানব-হৃদয়ের সর্বাপেক্ষা স্বাধীন স্ফুরণ ঘটেছে। আবার কেউ কেউ ইতিহাসের বন্ধন কাটিয়ে ঔপন্যাসিক প্রতিভার পূর্ণ পরিচয় রাখতে পেরেছেন তাদের কাহিনিতে। রাজনীতির আবর্তের মধ্যে ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা মূর্ত হলেও ইতিহাসের প্রবাহধারায় তা নিঃশেষ হয়ে যায়নি। ইতিহাসের পাষাণ-প্রাচীর চারিদিকে থেকে ধেয়ে এলেও ব্যক্তি-স্বাধীনতা ব্যাহত হয়নি। কখনো কখনো চরিত্রের চেয়ে প্রাধান্য পেয়েছে ঘটনাসমূহ। ইতিহাসের প্রসিদ্ধ ঘটনার মধ্যে ব্যক্তিচরিত্রের শৃঙ্খলিত জীবন যোজনা করেছেন কেউ কেউ। ব্যক্তিগত জীবনে ইতিহাসের গতিবেগ সঞ্চারিত হয়েছে। ফলে, দুই ভিন্ন প্রকৃতির উপাদানের সমন্বয় ঘটেছে উপন্যাসগুলোতে- ইতিহাসের ঘটনা ও ব্যক্তিজীবন।
বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা উপন্যাসে দেখা যায়, লেখকরা তাঁর নিজের কালের বাস্তবতার পরিবর্তে অতীতে বিচরণ করেছেন। আনিসুল হক যেমন দেশভাগের আগে শেখ মুজিবের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ রাতে এসে থেমেছেন। সেলিনা হোসেন বঙ্গবন্ধু হত্যার নির্মম ঘটনা নিয়ে কাহিনি নির্মাণ করেছেন। পক্ষান্তরে অতীতের ইতিহাসের সময়পর্বে দাঁড়িয়ে আরেকটি সমান্তরাল কাহিনি বর্ণনা করেছেন হুমায়ূন আহমেদ। আর সৈয়দ শামসুল হক ১৫ই আগস্টের হত্যাকাণ্ডে বিস্মিত আর মর্মাহত হয়ে বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার রূপায়ণ ঘটিয়েছেন। অতীত ইতিহাস সব উপন্যাসেই আছে, তবে তার মাত্রা ভিন্ন ভিন্ন। উপন্যাসগুলোর ঘটনা-কাহিনি ঐতিহাসিক বলেই লেখকদের সমকালীন রীতিনীতি, আচার ব্যবহার, সংস্কার, পোশাক-পরিচ্ছদ ইত্যাদি সকল বিষয়ে সচেতন থাকতে হয়েছে। আবার ঐতিহাসিক বাস্তবতা উপস্থাপনে নির্লিপ্ত থেকেছেন। উপন্যাসগুলোর প্রধান চরিত্র বঙ্গবন্ধুসহ সকলেই সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব। বঙ্গবন্ধু জাতির পিতা হিসেবে কীর্তিমান। আর খুনি মোশতাকবাহিনী অপকীর্তির দরুন নিন্দিত-ঘৃণিত। দুই ধরনের চরিত্র রূপায়ণে লেখকদের ইতিহাসের প্রতি যথাসম্ভব বিশ্বস্ত থাকতে হয়েছে। আনিসুল হক বঙ্গবন্ধুর পাশে সোহরাওয়ার্দী, তাজউদ্দীন, মোশতাক, ভাসানীসহ আরও অনেক চরিত্র ইতিহাসের উপকরণের জন্য সরাসরি গ্রহণ করেছেন।
দেয়ালে হুমায়ূন আহমেদ জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত এসে থেমেছেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডে জড়িত খুনিদের সকলকেই নির্মোহভাবে দোষী হিসেবে তুলে ধরেছেন। পক্ষান্তরে মহিবুল আলমের দৃষ্টি আরো গভীরে। তালপাতার পুথি (১ ও ২) উপন্যাসে খুনিদের মনস্তত্ত্ব উন্মোচনে মহিবুল দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। শামস সাইদ বঙ্গবন্ধুর বাড়ি নিয়ে দীর্ঘ দুই খণ্ডে উপস্থাপন করেছেন বাংলাদেশের ইতিহাসের উত্তাল সময়কে।
স্বাধীনতা সংগ্রাম বাঙালির শ্রেষ্ঠ অর্জন। স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব অর্জনের জন্য এদেশের মানুষকে ঝঞ্ঝা-উত্তাল দিন পার করতে হয়েছে, যার কেন্দ্রে ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ভাষা-আন্দোলন ছিল বাঙালির জাতিসত্তা উন্মেষের গৌরবময় মুহূর্ত। স্বাধীনতা সংগ্রাম সেই সময় থেকে ক্রমান্বয়ে মহীরুহে পরিণত হয়। বাঙালিত্বের মূল শেকড় ভাষা-আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত ইতিহাসে লুকিয়ে রয়েছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের নারকীয় ঘটনা বিশ্ববাসীকে স্তব্ধ করে দেয়। একুশ ও মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র যে সাংস্কৃতিক চর্চার দ্রুত বিকাশ ঘটেছিল, তা থমকে দাঁড়ায় পঁচাত্তরের খুনিদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের উল্লাসে। একাত্তরের ষড়যন্ত্রকারী পরাজিত শক্তির চক্রান্ত স্বাধীন সার্বভৌম দেশকে নিয়ে যায় সন্ত্রাসের করতলে, স্বৈরশাসকের হাতের মুঠোর ভেতর। বন্ধ হয়ে যায় মুক্তবুদ্ধির অনুশীলন ও সকল শিল্পচর্চা। এমনকি বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ করা নিষিদ্ধ হয়ে যায়। হত্যাকাণ্ডের পর ভীতসন্ত্রস্ত খুনিরা বঙ্গবন্ধুর জনপ্রিয়তাকে মুছে ফেলার জন্য তড়িঘড়ি জন্মভিটা টুঙ্গিপাড়ায় তাঁকে কবরস্থ করে। বত্রিশ নম্বর থেকে জন্মভিটা টুঙ্গিপাড়ায় তাঁকে পাঠান হলো ঠিকই, কিন্তু জীবিত মুজিবের চেয়ে মৃত মুজিব আরো বেশি প্রেরণার উৎসে পরিণত হলেন। তাঁর হত্যার মধ্য দিয়ে রক্তাক্ত হয়েছে বাঙালির সংস্কৃতি, বাংলা ভাষা, বাংলার মানুষের অসাম্প্রদায়িক চেতনাসহ সকল সুকৃতি। এসবই প্রকাশিত হয়েছে বাংলাদেশের সাহিত্যে- চিত্রকল্প ও ভাষা-ছন্দ-সুরে। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা উপন্যাসে।
সেলিনা হোসেন একটি যুগের সমগ্র ইতিহাস পরিবেশন এবং পর্যালোচনা না করে বঙ্গবন্ধুর শক্তিমান, তীক্ষ্ণধী, কূটনৈতিক ও সাহসী ভূমিকা, পাকিস্তান রাষ্ট্রের সঙ্গে তাঁর বিরোধ এবং জাতির জীবনে মুজিবের নেতৃত্বকে তুলেছেন। উপন্যাসের প্রধান ঘটনা ও তার পটভূমি ঐতিহাসিক। আনিসুল হকের মুখ্য চরিত্রগুলো ঐতিহাসিক বাস্তবতা ও মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত। ঐতিহাসিক চরিত্র অনেক সময় ইতিহাসসম্মত আচরণ নাও করতে পারে। কারণ ঔপন্যাসিক গল্প লিখতে বসেছেন। উপন্যাসের সবই ঐতিহাসিক হবে না, এটাই স্বাভাবিক। সেখানে লেখকের কল্পনাও থাকবে। তবে সত্যকে নিরেট বাস্তবতার আলোকে উপস্থাপিত করেছেন কোনো কোনো লেখক। প্রধান ঐতিহাসিক চরিত্র বঙ্গবন্ধুর পাশে কিছু অপ্রধান চরিত্রও এসেছে। ঐতিহাসিক ঘটনার সত্যাসত্য বিবেচনা না করে কল্পনার স্বাধীনতাকে শিল্পের স্বার্থে ব্যবহার করেছেন ঔপন্যাসিকেরা। ইতিহাসের তাগিদে উপন্যাস যাতে তার স্বধর্ম থেকে বিচ্যুত না হয়, এজন্য কোনো কোনো চরিত্র আধা-ঐতিহাসিক, আধা-কাল্পনিক বলে হয়েছে। যেমন, আনিসুল হকের উপন্যাসে ইতিহাসের ঘনঘটার পাশে ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমির কথোপকথন ব্যক্তিগত জীবনের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। ঐতিহাসিক বিষয়ের সঙ্গে কাল্পনিক প্রেমকাহিনি বুনে দিয়েছেন সৈয়দ শামসুল হক। ইতিহাসের ঘূর্ণাবর্তে ব্যক্তি মাহতাব অনন্য হয়ে উঠেছেন। ইতিহাসের স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব বঙ্গবন্ধু, তাজউদ্দীন। তাঁদের উপস্থাপনে ঐতিহাসিকতা বজায় রেখেছেন মহিবুল, শামস, সমীর আহমেদ। তবে সব ঔপন্যাসিকের হাতেই বঙ্গবন্ধু কালের গতি অতিক্রম করে সর্বকালের হয়ে উঠেছেন। নির্মাণকুশলতায় ঐতিহাসিক বিষয় ও চরিত্রসমূহের কাঠামোটিকে লেখকরা উপন্যাসের প্রাণস্পন্দনে মূর্ত করে তুলেছেন। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও আত্মত্যাগকে পুনঃপ্রতিষ্ঠাও করা হয়েছে।
বঙ্গবন্ধুকে তাঁর দেশের মানুষের হাতে প্রাণ দিয়েছিলেন। অথচ বঙ্গবন্ধু বীর, শ্রেষ্ঠ বাঙালি, মহানায়ক, মহামানব। এই মহামানবকে বন্দনা করে উপন্যাস রচিত হবে এটাই স্বাভাবিক। মানব-মানবতা ও মুক্তির দিশারি বঙ্গবন্ধু লেখকদের উৎসাহী করেছেন স্বাভাবিকভাবেই। কারণ, মানবমুক্তির গান সাহিত্যিকদের প্রধান অবলম্বন। এজন্য মহামানবের মাঝে প্রেরণা অন্বেষণ করে জাতি ও জনতাকে মুক্তির পথে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা রয়েছে আখ্যানে, বঙ্গবন্ধুকে উপস্থাপনের মাধ্যমে। ঔপন্যাসিকরা শেখ মুজিব ‘বঙ্গবন্ধু’ হওয়ার ইতিহাসসহ বাঙালির মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে পরিস্ফুট করেছেন। লেখকদের কাছে একাত্তরে বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ এক হয়ে গিয়েছিল। ষাট ও সত্তর দশক ধরে বিশ্বব্যাপী মুক্তিপাগল মানুষের তেজোদীপ্ত প্রতীক ছিলেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৭৫-এর ১৫ই আগস্টের পর দেশের বৈরি পরিবেশে লেখকরা স্মরণ করেছেন তাঁকে। পঁচাত্তরের পর রাজনৈতিক পট পাল্টে গেলেও মুজিবের অনুপস্থিতিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে মেনে নিয়ে সৃজনশীল সাহিত্য সৃষ্টি করা হয়েছে। আমাদের গৌরবময় ইতিহাস লুণ্ঠিত করার প্রতিবাদে তাঁকে নিয়ে রচিত হয়েছে রাজনৈতিক উপন্যাসে। ১৯৭৫ পরবর্তী সময়ের সমাজ-সংস্কৃতিতে স্বৈরশাসকের অনিবার্য প্রভাব থাকলেও, প্রতিবাদী সাহিত্য ধারার শক্তিশালী বিকাশ বঙ্গবন্ধুকে কেন্দ্র করেই বিস্তৃত হয়। কাহিনি পল্লবিত হয়েছে ৭ই মার্চের ভাষণকে নিয়ে, তাঁর নির্মম হত্যাকাণ্ড, তাঁর বাসগৃহ বত্রিশ নম্বর বাড়ি, স্বাধীনতা ও বঙ্গবন্ধুকে একীভূত করে। অর্থাৎ, ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের পর বঙ্গবন্ধু যখন সামরিক শাসকদের কাছে একটি নিষিদ্ধ নাম, তাঁর কথা উচ্চারণই রাষ্ট্রদ্রোহিতা; সেই সময়ের পরই রচিত হতে থাকে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে উপন্যাস।

৩.

আগেই বলেছি, জাতির পিতার দীর্ঘ সংগ্রামের কাহিনি নিয়ে উপন্যাসগুলি লেখা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর দেশপ্রেম ছিল তর্কাতীত। ঐকান্তিকতায় পূর্ণ ছিল মানুষের প্রতি ভালোবাসা, পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ষড়যন্ত্র করে তাঁকে শায়েস্তা করতে চেয়েছে, কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে। জনগণ তাঁকে জেল থেকে বের করে এনেছে। ঐতিহাসিক ঘটনা পরম্পরায় দেখা যায়, ১৯৭০ সালে ইয়াহিয়া নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়। নির্বাচনে জয়ী আওয়ামী লীগকে ষড়যন্ত্র করে সরাতে না পেরে সশস্ত্র বাহিনীকে লেলিয়ে দেয় তারা। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে জয়ী হয়ে বাঙালি আবার তাঁকে পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত করে আনে। তিনি ১৯৭২ থেকে দেশের উন্নয়নে কাজ করেছেন। তাঁর শাসনকালেই সংবিধান প্রণীত হয়। আরো অনেক অবদান রয়েছে এই মহামানবের। পঁচাত্তরের দুঃসময় পরবর্তী সময়ে তাঁর প্রতি মানুষের ভালোবাসা প্রদর্শন থেমে থাকেনি। মানুষ উজ্জীবিত হয়েছে বঙ্গবন্ধুর নামে। তাঁকে নিয়ে রচিত উপন্যাসেও দেখা যাবে এই মহামানবেরই জয়গান। এর কোনো কোনোটির ভাষা, বর্ণনাভঙ্গি, ঘটনাবিন্যাসে দুর্বলতা থাকলেও, বঙ্গবন্ধুর প্রতি তীব্র ভালোবাসার টানে সেইসব ত্রুটি ঢাকা পড়ে গেছে। এসব উপন্যাসে বঙ্গবন্ধুকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের মানুষের হৃদয় যেন উদ্বেল-উন্মুখর হয়ে উঠেছে। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা উপন্যাসে একদিকে বাংলাদেশের ইতিহাস, আর অন্যদিকে মহান নেতা জাতির পিতা শেখ  মুজিবুর রহমানের যে প্রতিচ্ছবি পাই, সামগ্রিকভাবে সেটাই হচ্ছে বাংলাদেশ। জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশের ইতিহাস। একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব যে কত বিচিত্রভাবে উপন্যাসেরও নায়ক হয়ে উঠতে পারেন, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা উপন্যাসগুলি তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
মিল্টন বিশ্বাস
অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।