মেঘ অদিতি >> সুব্রত সরকারের কবিতা ও কবিতা নিয়ে কিছু কথা >> কবিতা/প্রবন্ধ

0
271

সুব্রত সরকারের কবিতা নিয়ে এই আয়োজন। এতে এখানে প্রথমে থাকছে সুব্রত সরকারের ৮টি নির্বাচিত কবিতা এবং পরে  তাঁর কবিতার ওপর আলোচনা। আলোচনা করেছেন কবি মেঘ অদিতি।

সুব্রত সরকার >> কবিতাগুচ্ছ
স্নেহের যশোর রোড
যদি ভুল করে থাকি, বাংলাভাষা, সহ্য করো।
নিঃসঙ্গ পুরুষের আঁকাবাঁকা কন্ঠস্বর লেখা থাকবে না, লোহা
প্রাণের ভিতরে ঢুকে উদ্ভিদ হয়ে গেছে
যার চোখের অল্প নিচে বালি।
যে-কোনো মানুষ হতে পারে জটিল, ঘূর্ণাবর্ত ও সংকটে
রুচির শিকড় কত নিচে নামতে পারে
অনেকের সঙ্গে আলাপ হবার আগে কল্পনা করিনি।
কোথায় ছিদ্র, অবাক হয়ে দেখতে হয়
মিথ্যার ফোয়ারা কী অপূর্বভাবে নামছে জীবনে।
ভিতরে ময়লা জল, খন্দ, অপরাধের জং-ধরা স্প্রিং—
ওখান থেকে আহার সংগ্রহ করি বলে
ঘৃণা করবার কিছু নেই। এইমাত্র যে ফুল—ভুবনের ঊর্ধ্বে উঠে
চন্দ্রসভার আলো খাচ্ছে, অন্তত তার একটি পাপড়ি
আঁধারের, না-পাওয়া মানুষের আঁচে তৈরি।
যে কোনো ভাষায় টুকে রাখো।
সৌন্দর্য রক্ষার জন্য পলাশেরা ঝরে পড়বে
স্নেহের যশোর রোডে,
শুধু এই কৃতজ্ঞতায়
একটি গ্রহের নাম রেখে যাই দেবদারু কলোনি।
কীটদ্রষ্ট গ্রন্থ যদি যৌনতার প্রতীক হয়
প্রতিহিংসাপরায়ণ পশু টেলিভিশনের কাছে কারও রক্ষা নেই।
আমার পাপের কথা আলোচনা করে যারা মদ খায়
তাদের আরেক কাঠা এই শর্তে দিকে পারি:
যদি একটিও বইয়ের কষ্ট নিজের চোখে দেখে থাকেন
শুকনো মুখে নির্বাসনের ব্যথা সহ্য করে নেবো
কখনও বলব না, পড়ো, ইলেকট্রিকের আলোয়,
বাংলা, ক’-পৃষ্ঠার কিছু প্রাণী রেখে গেলাম।
অসীম, তোমার শূন্য কোথায়
সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠে আসি, এই রাত্রি অন্ধ উটের মতো
মনে হয় কতদূরে গেছে? কালপুরুষের
ধনুকের নিচে ছোট্ট মৃগশিশু, আশ্রয় খোঁজে। আয়
তোকে নির্ভয় মন্ত্র দিই। দূরে সিরিয়াস নক্ষত্রের কোণে অগ্নিকুণ্ড জ্বেলে
কেউ স্বস্ত্যয়ন করছে, অস্ফুট মন্ত্রোচ্চারণের শব্দে
মহাকাশে গমগম আওয়াজ হল।
আরাবল্লির সবুজ টিলায় মেয়েরা ঘাঘরা পরে কুয়ো থেকে জল তুলছে।
এখানে মেঘশীর্ষে লুন্ঠিত রোদ্দুর হেমবর্ণ, পাখিদের কাকলি
অকস্মাৎ শূন্যতায় গিয়ে মেশে, ঐ ঘোড়ার মুখের ফেনায় পৌরুষের দ্রুত
পতন— এ যেন তার অপমানখানি মৃন্ময়, পথপার্শ্বে
পড়ে থাকা হাঁ-মুখ পাথর— তোমারও জীবন আছে? বলো,
তুমি ব্যথা পাও? তোমার চঞ্চলতা ঐ কুমির, তার
শিকার-ধরা নয়নের জলে ভেসে যায় কী রত্ন? মধ্যরাতের কয়েকটি
আর্তস্বর প্যাঁচার মতো ঝটপট উড়ে যেতে একটু ছায়া
যেভাবে পড়ল, আহ্ তুমি কি উষ্ণ? হায়াসিন্থের পাপড়ি যেমন
কোমল— কী অপূর্ব লাগে তোমার কথায়!
ঝাউয়ের মর্মররেখার মধ্যে একটুখানি হাড়, যেন শীত, কুকুর
ডাকছে জীবনের ভিতর থেকে, দেখা গেল চাঁদের আলোয়
বাঁকা দণ্ডের মতো কী-একটা মনের নির্জনতার কিছুটা
মায়াবী করে তোলে, আমার চেতনা হল বালির উপরে রাখা
স্থির আকাশের স্তূপ, সেখানে খরশান দীপ্তির সঙ্গে
ময়লা খড়্গ পড়ে থাকে সমুদ্রপ্রাচীরে, সে
কিছু বলতে চায়, হঠাত অর্ধতারকার অশ্রু গড়িয়ে পড়ল ছাদে-
কেন হিম, কেন চিন্তাগুলি অপস্রিয়মাণ ঐ
তৃশ ও স্তব্ধতার মধ্যে— আমি ঠিক সম্পূর্ণ জানি না অদৃশ্যের
ভিতর আসলে কী সম্ভাবনা দেখেছিলাম, চিন্ময়!
ঈর্ষা কখনোই একা থাকতে পারে না
জহর হল একরকমের বিষ, প্রাচীন মানুষেরা বলেন
এই বিষ আসলে সৃষ্টির প্রথমে ছিল
বাদামি রঙের ঘোটকী, যার হ্রেষাধ্বনি শুনতে পাওয়া যাবে
পরে, যখন মনের ভিতর থেকে কালো কুচকুচে
এক শিখা বেরিয়ে এসে দেখা দেয়, কারণ একা থাকাই হল
অপমানের ও ঈর্ষা কখনোই নিঃসঙ্গ থাকতে পারে না, তারও সঙ্গীর দরকার হয়।
তারপর মীর মোশাররফ হোসেন লিখলেন— হায়
জায়েদা, তোর দুঃখে কেন পাষাণেও ফাটল ধরিল না, পুষ্করিণী
শুকাইয়া যাউক, বৃক্ষের ফুল ঝরিয়া পড়িবে, পথের
কুক্কুর ও ছন্নছাড়া বায়সের দল চিৎকার করিতে লাগিল, কারণ
পিশাচীও যাহা করিতে ভয় পায়-এক্ষণে তেমত
কার্যে চলিলি অথচ স্পষ্ট দেখিতে পাইতেছি যে তোর
অন্তঃকরণে দুগ্ধফেননিভ বিছানায় হাসান
পরম নিশ্চিন্তে নিদ্রা যাইতেছেন, তাঁর অধরের মৃদু হাসির সঙ্গে
কেবল ঈদের সন্ধ্যার অল্প চাঁদটুকুর-ই তুলনা হয়!
আর জায়েদা কী করিলেন? অসুস্থ স্বামীর শয্যার পাশে রাখা
সোরাহার জলে তীব্র কালকুট মিশিয়ে দিতে গিয়ে
কতবার তাঁর নয়ন অশ্রুতে পূর্ণ হইল, বিধাতা হয়তো কখনোই তাঁকে
ক্ষমা করিবেন না, লেখকেরও সে সাধ্য নাই, শুধু
পাঠক, ঈর্ষানলে প্রজ্জ্বলিত এই সামান্য রমণীর লজ্জা একমাত্র আপনি
নিবারণ করতে পারেন, কারণ
করাল দুঃখের রূপে এই নারী এখন বিশাল ও নগ্ন কালীমূর্তি।
তাহলে কি জায়েদা ও তার লেখক এবং সে লেখার সকল
পাঠকেরা ও অবশেষে এই উল্লেখকারী আর
বর্তমানে যাঁরা এটি পড়ছেন সকলেই সে পাপকার্যের কিছু কিছু
অংশগ্রহণ করিল? কারণ নিভৃতে
সকল মনুষ্যই সেই আদি ও নিষিদ্ধ আগুনের ভারবহনকারী, কারণ
জন্ম, জন্মান্তরম জন্মান্তরালে সেই অগ্নি আজও
অমৃত, বহমান দিকচিহ্নহীনে ছায়া খোঁজে অরূপের!
এক অন্ধ পাখি ধরিয়ের গল্প
[ কবির কোনো শত্রু থাকতে পারে না। কবির শত্রু শুধুমাত্র সমকাল বা অন্য সময়ের বিস্মৃত, শোষিত কবিদের বুঝতে না পারা। এটা সমস্ত দেশের ও সর্বকালের কবিদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। — পাবলো নেরুদা]
পুরনো তামাকের গন্ধ ও কৃত্রিম ভাষায় লেখা সেই রচনা
এখন ভেসে চলে মহাদেশ বিজয়ের আকাঙ্ক্ষায়
তার চোখের স্ফুলিঙ্গ, আবাদে, ভেরি, জল-ডাকাতের নৌকার পাশে
ঝিকঝিক করে ওঠে কামনায়, রিপু-তাড়িত
শ্রমিকের পার্টি অথবা নিরক্ষর, ভুখা-কৃষকের বিষয়গুলি
আজ নিরেস তাদের কাছে অপ্রীতিকর মনে হয়
যারা চাইত দুনিয়ার মেহনতী মানুষের মুক্তির সংগ্রাম যদি একত্রিত
হতে পারত শুধু স্তব্ধতার ভিতর,হিম ও সন্ধ্যার
আলোছায়ার ভিতর, যেন এক বেদনার সুর যা অন্তরকে চিরকালের
জন্য ব্যথিত, রিক্ত করে রাখবে!
প্রায় বিশ্বাস করে ফেলেছিলাম এ কথা যদি না প্রাক্তন পাখি-শিকারি
অন্ধ প্রতিবেশী জানাত — দুনিয়ার সবচেয়ে মধুর হল
সেই উত্তেজনার মুহূর্তগুলি যখন পাখিরা জালের খুব কাছে এসে,
আরো কাছে এসে আরো জোরে ডাকছে— কিচ কিচ ডাকে
তাদের আবেগ ও পাখি-ধরিয়ের বুকের ধুকপুকানি এর কি কোনো তুলনা হয়?
ভাবলাম, সত্যিকারের একজন কবি বটে এই অন্ধ পাখি ধরিয়ে!
বাংলা গদ্যের সুবাস ও আগুন
যখনই কোথাও আলো জ্বলে ওঠে, ঋষিরা বলেছেন:
অনুষ্টুপ ছন্দ ছুটে এসে তার উপরে
দু’খানি ঢাউস ডানা মেলে ধরে, তারপর সে
ধীরে ধীরে স্মৃতি ঝরাতে থাকে, জন্ম, পূর্বজন্ম, এমনকী যখন
ছন্দও তৈরি হয়নি কোথাও, এভাবে অতীতে, সুদূর অতীতে
পৌঁছে একসময় দেখা গেল সেখানে হয়ত আগুনও নেই, ছন্দও নেই।
শুধু গদ্যের এক সংক্ষিপ্ত পৃথিবী রচিত হয়ে আছে, সেই স্মৃতিরও
পূর্বে, ঘুমন্ত এক নদীর কিনারায়, মুক পাহাড়ে
করুণাহত পাখিরা উড়ছে, কল্পনা করি এইরকম এক টিনের ট্রাঙ্কে
জীবনানন্দ তার সমগ্র গদ্যসম্ভার তালাচাবি দিয়ে
রেখে গেছেন উত্তরকালের জন্যে।
কোনো অপেক্ষা ছিল না, শুধু অশোকানন্দ চাবি
খুঁজে পেয়ে যেদিন সেই ট্রাঙ্কের সামনে হাঁটু মুড়ে বসলেন —
ছন্দের প্রজাপতিটি ফের কোত্থেকে উড়ে এল, তারপর
হলদে হয়ে যাওয়া সেই পাণ্ডুলিপির পৃষ্ঠা তিনি আঙুলে স্পর্শ
করছেন যখন, অক্ষরেরা যেন ফের চলতে শুরু
করে, কেউ হাই তোলে, চা সুরুৎ করে টেনে নিচ্ছে জিভ, তেরছা তাকায়, আর ছন্দের ডানা থেকে খসে খসে পড়ে–
পুরনো জরির স্মৃতি, ট্রাঙ্কে রাখা প্রাচীন
বাংলা গদ্যের সুবাস ও আগুন
জ্বলে ওঠে, পুনর্বার।
মড়িঘর
মড়িঘর, যেন শ্রাবণপূর্ণিমার রাতে ধীরে ধীরে
চোখ মেলছে, মনে
খুব ব্যথা পেলাম, এত পর মনে করেন আমায়, কিন্তু
আমি আসলে আপনার ঘরের ছেলে-ভাইপোর মতো, আর তেমন বুঝলে
সংকোচ না করে সোজা এখানে চলে আসুন, কাকু
এ বাড়ির সোয়াদ আপনাকে কি বলব—
কিন্তু পরম সত্যকে আবার সকলে
ঠিকভাবে মানিয়ে নিতে পারে না, তা বাদে দেখেছি কেউ কেউ
প্লাস্টিকের ব্যাগে করে নিজের কতকটা ব্রহ্মবিদ্যা
সঙ্গে নিয়ে ঘোরে ও মনে চিন্তা হয়
যে— এই মাটির খুরিতে কয়েকখানা রসগোল্লা
হয়ত খলবল করছে, কিন্তু এসবের তো কিছু অতীত নেই, শেষও
হবে না কোনওদিন, তবু লোকে যে বলে
দেখলাম— মড়িঘরের দালান ঘেঁষে চাঁদ উঁকি দিত যখন
একটা জানলা খুলে যেত, যেন
শিবলিঙ্গের তৃতীয় চক্ষু, গায়ত্রী মন্ত্র পড়ছে, শুধু
উচ্চারণ শুনেই গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠবে, এসো কিন্তু, দরকার হলেই
চলে আসবে এখানে, লজ্জার কিচ্ছু নেই, তা
শেষ থাকুক চাই না থাকুক।
পুনর্যাত্রা
যুদ্ধ শেষ। জীবন বলতে
এখনও নড়াচড়া করছে : ফারেনহাইট ফোর ফিফটি ওয়ান ডিগ্রি
নিভে যাবে।
ধাতু, কল্পনা ও টেকনোলজি পুড়ে ছাই হয়ে উড়ে যাচ্ছে—
অয়নমণ্ডল ছাড়িয়ে
ছায়াপথে কোটি কোটি বছর ধরে পাক খাবে
এই সভ্যতা ও একটি ছোট্ট মেয়ের প্রার্থনার ভস্মাবশেষ।
তারপর যা হবার হয় হোক।
কিন্তু দুর্বল হাত বাড়িয়ে পৃথিবী রণনেতার
ফ্যাকাশে ছাইটুকুও ছাড়তে চাইছে না,
একটি বস্তুও যেন মাতৃত্বের সম্পর্ক ছিন্ন করতে না পারে।
এদিকে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির ভরকেন্দ্র টলে গেছে,
বহির্মুখিন বায়ুপুঞ্জের পিছনে তার আর্তনাদ শোনা যায়:
ফিরে আয়—
কিন্তু কে কার কথা শোনে!
ধরা যাক, আমি এক শব্দকণা, ব্রহ্মাণ্ডে উৎক্ষিপ্ত হয়েছি।
এই বর্ণময় মহাকাশ থেকে চারুলতা আমাকে বঞ্চিত করে রেখেছিল
কী স্বার্থে? অসীম থেকে ভ্রূ কুঁচকে তাকিয়ে দেখি:
অনিতার ঝলসানো, বেদনাহত মুখ
আমার চলার গতিকে শ্লথ করে দেয়।
প্রতিটি নক্ষত্র আজ উৎকন্ঠিত,
কিন্তু সান্ত্বনা গ্রহণ করার জন্যে সেখানে
কেউ নেই, শেফালির সঙ্গে কেউ এখন কথা বলে না।
বাল্যকাল থেকে হয়ত ঐজন্য আমি এত উন্মনা:
গাছপালা ও নদীর মধ্যে কীসের এক প্রকাশ দেখতে পেতাম,
পৃথিবীর লাবণ্যময়ী মুখশ্রী ও একজোড়া উজ্জ্বল চক্ষু,
হাত ধরে কোথায় নিয়ে যেত…
তখন যদি জানতাম সর্বনাশ আসছে মধুর পথ ধরে।
যতক্ষণ মৃত্যু না হবে দেহকে আনন্দ দিয়ে যাবে
শ্রমিকের মতো:
চলে আসবার আগে এই ছিল মিতালির অভিশাপ।
তার অন্তরের বেদনা সাঁৎ সাঁৎ করে
কানের পাশ দিয়ে ছিটকে চলে যাচ্ছে দূর মহাকাশে।
এমনই এক মহাসময়ের ক্ষণে
বৃ্হস্পতির অভিকর্ষের কাছে একখণ্ড রজ্জুর মতো
আলোর এক ফোটনকণার সঙ্গে দেখা।
দু’জনেই বিকশিত হই সাধ্যমত, তবু কী-এক বিষাদ এসে
মাঝে মাঝে শরীরের রক্ত শুষে নিয়ে যায়…
ভাবি, লীলা দেখার যদি কেউ না থাকে
তবে বৃথা এই আনন্দ-বিনাশ।
ফোটন কণা আমাকে সমর্থন করে, দু’জনে
পুনর্বার যাত্রা করি পৃথিবীর দিকে।
জন্মসূত্র
জীবনের যেখান থেকে বিষের জঙ্গলের শুরু—
না,
এমন পাখি-ওড়া বাতাস বইছে
মনে হচ্ছে —
অন্তরে ঘরদোর বানিয়ে কিছুদিন বাঁচলে মন্দ হয় না।
কিন্তু নির্বাসিত বৃক্ষের অভিশাপে শুধু চুল উঠে আসে
আর ক্রমে মাথা খাঁ-খাঁ করে।
এখানে বসতি ছেড়ে মানুষেরা চলে গেছে—
যেন ব্রহ্মজ্ঞানের মতো সম্পন্ন গ্রাম ছিল,
অনেক খুঁজে এক আবছা মরা কুয়ো দেখতে পেলাম—
কার দু’ফোটা অশ্রু আজও শুকোয়নি।
জীবিত প্রাণী বলতে একটি দুর্বল ছায়া, শুধু কাঁপে, শুধু কাঁপে,
পিপাসা নলের মতো তার মাথা ফুটো করে পায়ের তলা দিয়ে
পৃথিবীর গভীরে কোথাও চলে গেছে।
লোকেদের বিশ্বাস ওখানেই যত জীবনের জন্ম।
ঐ গহবরের মুখে কান পেতে রেখে শুনতে পাচ্ছি এক কন্ঠস্বর;
না উল্লাস, না কান্না, না কিছু
ঐ স্বরের সাদা সুতো ধরে
একদিন নেমে এসেছিলাম এই পৃথিবীতে।
[কবিতাগুলো কবি সুব্রত সরকারের কবিতা সংগ্রহ থেকে নেয়া]

মেঘ অদিতি > কবিতার ঈশ্বর 

অন্ধের একমাত্র অবলম্বন যেমন যষ্ঠি, তরুণ কবিরও চাই তেমন দুটি অবলম্বন। স্বপ্ন ও কল্পনা। বাকি যা কিছু কবিতায় না থাকলে আমরা কবিতা হল না বলে ভাবি, তা কবিতার জন্য খুব জরুরি নয়।
কথাগুলো কবি সুব্রত সরকারের।
তার কাছে আমার প্রশ্ন ছিল, কবিতা আসলে কি? এককথায় তার উত্তর, কবিতা এ রকমের বিদ্যুৎঝলক। অজস্র ভণ্ডামি, মিথ্যা আর অনাচার আমাদের প্রতিনিয়ত ঘিরে থাকে চারপাশ থেকে। সে জায়গা থেকে পরিত্রাণ পেতে আমরা কবিতার কাছে আসি।
সুব্রত সরকার। সত্তর দশকের এক শক্তিশালী স্বতন্ত্র কন্ঠ। অথচ আমরা তাঁর নাম তেমন করে জানি না, কবিতাও পড়িনি। কিন্তু জেনে ওঠা আর খুঁজে নেবার দায় কার? পাঠকের নয়? পাঠক হিসেবে এ দায় আপনার, আমার, আমাদের। কবির কাজ অতীন্দ্রিয় এক অনুভূতিকে ছুঁয়ে থেকে একের পর এক কবিতা লিখে চলা। আর সত্যি বলতে লিখে আমরা অনেকেই চলি, কিন্তু সেই পথটিকে চিনি ক’জন? যিনি চিনতে পারেন তিনিই ফোটান ফুল, কলমের আঁচড়ে। আর তারা অক্ষর, হয়ে শব্দ হয়ে, পঙক্তি হয়ে চলতে থাকে সেই অনাদিকাল থেকে আজও।
কবি সুব্রত সরকারের প্রথম গ্রন্থটির নাম, দেবদারু কলোনি। প্রকাশিত হয় কবির তেইশ বছর বয়সে। ১৯৭৯ সালে। পরবর্তী গ্রন্থগুলো, তোমাদের খুব ভালোবেসেছি (১৯৮৬), গত জন্মের ঋতু (১৯৮৬), সহ্য কর বাংলাভাষা (১৯৯১), তোমাকে মিথ্যে বলেছি (১৯৯২), ঘন মেঘ বলে ঋ (১৯৯৭), বহুত আঁধিয়ার হো বাবু, হামে কুছ রোশনি চাহিয়ে (১৯৯৯), একাকি মানুষের সৌন্দর্য (২০০২), ফারেনহাইট ফোর ফিফটি ওয়ান ডিগ্রি (২০০৪), অন্তঃস্থ বিসর্গ, না স্নেহকরস্পর্শ (২০১৩), কবিতা সংগ্রহ (২০১২)। চাঁদ নমস্কার করল (২০১৭)।
গদ্যগ্রন্ধ: পরিচ্ছন্নতা ও বিষাদের দেবী, রক্তমাংসের পাণ্ডুলিপি ও শকুনের ডানার কলম।
কবিতাসংগ্রহ থেকে কবিতা পড়তে গিয়ে বারবার আমার কাছে এরকমটাই মনে হয়েছে যে, লেখাকে তিনি স্বতন্ত্র চরিত্র হিসেবে দেখেন। তারা তার পাশাপাশি চলে। হাসে-কাঁদে। কথা বলে। তিনি তাদের দেখতে পান কখনও পাহাড়, জঙ্গল বা সমুদ্রে অর্থাৎ তারা তখন জীবন্ত ও চলমান।
দ্বিতীয়ত, তার কবিতায় মিথ, কল্পনা, বিজ্ঞান, ও ইতিহাস, সমাজচেতনা, সমকাল, সর্বোপরি নিজস্ব স্বরের অপূর্ব মিলন ঘটে। আশ্চর্যজনকভাবে তিনি বিজ্ঞান নিয়ে খেলা করেন। পার্টিকেল ফিজিক্সকে অবলীলায় মিলিয়ে দেন কবিতায়। আসে ইতিহাস, চলচ্চিত্র। কবিতায় একরকমের ইলিউশন তৈরি হয়। আর তা পাঠককে টেনে ধরে চুম্বকের মতো। এককথায় ভিন্ন ভাবনায় জারিত অন্যমাত্রার কবিতা যা আপনাকে আক্রান্ত করবেই।
আসুন দীর্ঘ কবিতার একটি বই বহুত আঁধিয়ার হো বাবু, হামে কুছ রোশনি চাহিয়ে থেকে একঝলকে দেখে নেওয়া যাক ইতিহাস, কাল আর বিজ্ঞান তার কলমে কী করে এসে পড়েছে। বইটি তিনি উৎসর্গ করেছেন তিব্ব্তের সম্রাট লহ-লামা-য়েশোকে। উৎসর্গপত্রে লেখা হয়েছে দু’টি ছোটছোট গদ্য এবং বলতে একেবারেই দ্বিধা নেই, সেই দুটো হৃদয়স্পর্শী গদ্যাংশ পড়ে আমি অনেকক্ষণ চুপ করে বসেছিলাম। প্রথম গদ্যের শুরুতেই আসে ইতিহাসের তুষারাবৃত এক অধ্যায় যেখানে অতীশ দীপঙ্কর তিব্বতে যাবেন শিক্ষার আলো ছড়াতে তারই বর্ণনা। পরের গদ্যে কবির মনে তার অনুরণন, নিজের ভাবনা আর শীলভদ্র, শান্তরক্ষিত, দীপঙ্করের কথা আসে। এরপরই কবিতা শুরু। সেখানে নানা মানুষের হাঁটাচলার আওয়াজ পাওয়া যায়। কথা ভেসে আসে।
এ বইয়ের কবিতা শুরু হচ্ছে এভাবে-
সময় স্থির ও বর্তুল
এর আরম্ভ নেই, শেষ নেই শুধু মাঠের উপরে
অনেকক্ষণ একটা ফাঁকা টুপি পড়ে রয়েছে।
মহাকাল আসলে এইরকম
কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে চায়ের দোকান রক্তাক্ত
কেরোসিন কাঠের বেঞ্চিতে কেউ নেই।
এখন সময়সারণির যে অংশে আপনি রয়েছেন,
বালি থেকে ঐ দূরের কৃত্তিকানক্ষত্র-
আপনার জগত এইটুকু,
এরপর সমাপ্তিরেখায় চুনের দাগ, একাদশীর সারস উড়ে চলে।
কোথায় রেখেছো ডানা? কোথায় তোমার অস্থি?
এইখানে- পত্রগুচ্ছে, এইখানে
শিলাতলে, এই মর্মর, শীকরে, ঐ সমুদ্র-মসজিদ, ফেনা নক্ষত্রের
উপরে রইল- নিয়ে যেয়ো!
(পৃষ্ঠা ২০৭)
এই কবিতাগ্রন্থে কী নিপুণতায় যে তিনি মিলিয়ে দিয়েছেন বিজ্ঞানকে। লিখছেন, ধ্রুপদী বিজ্ঞানে রঙ ও শব্দ আসলে বিভিন্ন মাপের শক্তির তরঙ্গ। শব্দ ও বর্ণও একইভাবে মূদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। বিশেষ বিশেষ ফ্রিকোয়েন্সির শক্তিতরঙ্গ মানবদেহে বিভিন্ন রঙ ও শব্দের অনুভূতি জাগায়। বর্ণ, শব্দ ও রঙ আসলে এক। কবিতায় এভাবে বিজ্ঞানকে আনা যায়, ভেবেছেন কখনও? বিস্ময় লাগে না? আবার অক্ষরও নাকি অক্ষয়! কেমন করে? চীনের একটা প্রবাদ আছে একটা শব্দ একবার উচ্চারিত হলে তা গ্রহমণ্ডলে চিরকাল ধরে চলতে থাকে। আবার বিজ্ঞান বলে আমরা যা কিছু বলি বা করি তা বিশ্বের শৃঙ্খলার মাঝে একরকমের বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে। তাহলে আপনি যখন প্রার্খনা করেন? অথবা ক্রোধ?
তিনি লিখেছেন,
কিন্তু প্রার্থনায় কি সত্যিই কিছু হয়? যখন ঘরের কোণে বসে
কেউ বিশ্বের মঙ্গলচিন্তা করেন এই মহাজাগতিক অস্তিত্ব কি সে আহ্বান
শুনতে পায়? আগে আমারও একথা বিশ্বাস হত না, কিন্তু
যখন জানলাম বিজ্ঞানীরা অনেক অঙ্ক কষে টের পেয়েছেন
এ মহাবিশ্বের যে যেখানে যাই করুক সমগ্র মহাশূন্যতায় অবিকল
তার ছায়া পড়ে। এমনাকি আমার চিন্তারও অভিঘাত
আছে, এই ক্ষুদ্র লেখাটি পড়ার ফলে আপনিও এই বিশ্বজগতের
কিছু পরিবর্তন ঘটালেন এখন এর পরিমাপ কত?
আপনি যখন কিছু বলেন বা করেন বা শোনেন এমনকি আপনার
স্বপ্ন রচনা করতে যতটুকু শক্তি খরচ হবে মহাবিশ্বে
তার দশ মিলিয়ন, মিলিয়ন মিলিয়ন গুন বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়
এই বিশৃঙ্খলা আপনার কাজ অথবা চিন্তার অনুরূপ আকৃতি
গঠন করে সেখানে। আরও স্পষ্ট করে বললে
ভবিষ্যতের মহাবিশ্ব আপনার দ্বারাও নিয়ন্ত্রিত, তার গতিপথ
নির্ণয়ে আপনার ভূমিকা কিছু কম নয় একথাও প্রমাণিত হয়েছে।
(পৃষ্ঠা ২২৪)

** এনট্রোপি অফ থার্মোডায়নামিক্সের কথা বলা হচ্ছে? কেন না Entropy is defined as the quantitative measure of disorder or randomness in a system.

এবার এই কবিতায় বিজ্ঞানের সাথে সাথে ত্রিনয়নের কনসেপ্টটাও একবার পড়া যাক।
ডিয়ার মিস্টার হকিং, সিলভার স্ট্রিট, ইংল্যান্ড
প্লিজ লেট মি নো হোয়ার দি পাওয়ার হ্যাজ গান, অর ইজ ইট আ ফ্যাক্ট
এ গ্যালাক্সির কাছে আরো দুটি গ্যালাক্সি রয়েছে,
তিনটিকে একত্রে দেখলে মনে হবে ত্রিনয়ন? চিন্তার জগতেও রয়েছে ঐ ত্রিস্তর বিশ্ব।
ইচ্ছে হলে আপনি এক্ষুনি পরীক্ষা করে দেখতে পারেন, চোখ বন্ধ করে
মনকে ধীরেধীরে দুই ভুরুর ঠিক মাঝে নিয়ে এসে
কপালের ভিতরে কী আছে দেখার চেষ্টা করুন- ঘূর্ণায়মান
একটি চোখের অস্তিত্ব অনুভব করবেনই। এই আমাদের গ্যালাক্সি,
এরই একপ্রান্তে সৌরজগত, অন্য দুটিকে এত সহজে দেখতে
পাবেন না। এন্ড নাউ মাই কোশ্চেন–
হোয়েদার দি সেড পাওয়ার কামস ইন সাচ প্লেস অফ টাইম
হোয়ার ইট ইজ নট আজ ওয়াজ? আপনার
উত্তরের আশায় একটি পিঁয়াজ জলের গ্লাসে ভাসিয়ে দিই
কারণ নিউট্রণ ফিল্ড হল অব্যক্ত, প্রতি
বারো থেকে ষোলো মিনিটের মধ্যে সেখানে একটি ইলেকট্রন
একটি প্রোটন পত্ মানে বিভক্ত হয়ে যায়-
এই কুসংস্কারের জন্যে আগেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।
(পৃঃ ২১৮)

বিজ্ঞান স্বীকার করেনা মনের অস্তিত্ব। তাহলে মন এল কোথা থেকে? ধ্রুপদী বিজ্ঞান স্বীকার না করলেও তার অস্তিত্ব আছেই।

প্রকৃতপক্ষে এ জগৎ বর্ণহীন আলোককণার,শব্দহীন
তরঙ্গকণার, তাপহীন শক্তিকণার ও গন্ধহীন ছয়টি কোয়ার্কের মাঝে
অসংখ্য শূন্যের, এখানে মনের কোনো অস্তিত্ব নেই, সে
শূন্য, পিঠে আরো কিছু শূন্য।
তবু তারই রচনা এই বিশ্বের মাথায়
চাঁদ উঠতেই শেয়ালটা মুখে নিয়ে ছুট, দে ছুট-
উত্তেজনায় ভুলে গেছি বাস্তব আসলে হচ্ছে কল্পবাস্তব, আমারই চিন্তায়
তিনি রয়েছেন, লোহার পাটাতনে অদৃশ্য, হে অগ্নিময়
যতদিন চিতার ধোঁয়ায় জন্মের সর্বস্ব জ্বলে শেষ না হবে আমায়
রাখো তুমি ক্ষুধার্ত, রুটির থালার পাশে
বহুৎ আঁধিয়ার হো বাবু, রোগা সূর্যশিশু, ক্রান্তিরেখায় বিলীন
কার্গোজাহাজ, আমিই ক্যাপ্টেন, অন্তত মেরিন ইঞ্জিনিয়ার, তুমি বান্ধবী, আর তুই খুব কুচ্ছিত, তুই বরঞ্চ খালাসী হ। (পৃঃ ২০৮)

বহুত আঁধিয়ার হো বাবুর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এমনই সব বিস্ময়, ভাবনার বিপরীতে ভাবনা আসে আর কবিতাগুলো পাঠককে চুম্বকের মতো আটকে রাখে। কবিতা একবার পড়তে শুরু করলে সেখান থেকে মুখ সরিয়ে রাখা তখন মুশকিল, পাঠককে তখন নিয়ন্ত্রণ করেন স্বয়ং কবি। শব্দে শব্দে তৈরি করছেন মিথের এক ইন্দ্রজাল। কবিতায় তিনি বলছেন, ভাষা সৃষ্টি হয়েছে অদৃশ্যের ভেতর। কোথাও ভাষা ছিল না, শব্দ ছিল না, এমনকি সময় তখন স্থির। বিগ ব্যাং থেকে চারটি ফান্ডামেন্টাল ফোর্সকে তিনি কবিতায় অবলীলায় এনে ফেলেন কালের আদ্যাশক্তি কালীর সাথে। এভাবেই আরও কত কিছু তিনি নিয়ে এসেছেন, তা আসলেই বিস্মিত করে দেয়। কবি শঙ্খ ঘোষ এই বইটি পড়ে কবি সুব্রত সরকারকে বলেছিলেন, এ ভাষাতেও কবিতা লেখা যায়, আমি জানতাম না। সুব্রত আপনাকে স্যালুট। প্রসঙ্গত জানাই এই কবিতাগুলো প্রথম প্রকাশ পায় ভূমেন্দ্র গুহ সম্পাদিত দরগা রোড পত্রিকায়।
আরও একটি অসম্ভব ভাল লাগা দীর্ঘ কবিতার বই ফারেনহাইট ফোর ফিফটি ওয়ান ডিগ্রি। কখনও সেই বইটি নিয়েও দু চার কথা জানানো যাবে।
যে কথাটা বলে শেষ করতে চাই্, যে রূঢ় বাস্তবতা, পচাগলা, ঘুনেধরা সমাজে বাস করে আমরা ধ্বস্ত, ক্লান্ত, সেই বাস্তবতায় বাস করেও তিনি লিখে চলেন এইসব সবুজ সতেজ কবিতা। তাঁর একটি বই থেকে অন্য বইতে গেলেই দেখা যায় প্রতিবার বদলে গেছে ভাষা অথচ তাঁর কন্ঠস্বর সর্বত্র গমগম করছে। প্রবল আত্মবিশ্বাসী এই কবির জীবন আপাদমস্তক এক কবিরই জীবন, এ বোধই হয়ত তাঁকে অক্লান্ত রাখে এবং কবিতা তার কাছে সর্বোতভাবে হয়ে ওঠে এক উদযাপন।
যে কবি এমন সব তীক্ষ্ণ, তীব্র কবিতা লিখে চলেছেন আজও তাকে আসলে কোনো সময়ের বাঁধনে বেঁধে ফেলা যায় না আর এভাবেই যাবতীয় তুচ্ছতাকে তুড়ি মেরে কবি সুব্রত সরকার হয়ে ওঠেন কবিতায় ঈশ্বর। এখানে তুলে আনা দু চারটি কবিতা দিয়ে আসলে তাঁর কবিতাকে জানা অসম্ভব। পাঠকের প্রতি অনুরোধ, আসুন তাঁর কবিতার কাছে একবার গিয়ে বসি।

[‘শালুক’ আয়োজিত প্রতিস্বর-এর সপ্তম অনুষ্ঠানে পঠিত]