মেহেদী মাহমুদ চৌধুরী > একটাই মোমবাতি  ও  ওমর খৈয়াম >> জন্মদিন

0
488
[সম্পাদকীয় নোট : ওমর খৈয়াম- বাঙালির ঘরে ঘরে সুপরিচিত একটি নাম। কিন্তু তিনি কী শুধুই কবি ছিলেন? খৈয়ামের জীবনীকাররা বলছেন অন্যকথা। কী বলছেন তাহলে তাঁরা? পড়ুন এই লেখাটি। এখানে উল্লেখ্য, আজ ওমর খৈয়ামের ৯৭১তম জন্মদিন। খৈয়ামের প্রতি তীরন্দাজের শ্রদ্ধার নিদর্শন স্বরূপ এই লেখাটি প্রকাশিত হলো।]
কিছুদিন আগে প্রয়াত হয়েছেন কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। তার একটা কবিতা কৈশোরকালে এক বন্ধুর কারণে পাঠের সুযোগ হয়েছিলো। কবিতাটার শিরোনাম চক্রবর্তীর ‘একটাই মোমবাতি’। মোটামুটি পরিচিত হলেও যারা পড়েননি তাদের জন্য কবিতাটা নিচে তুলে দিচ্ছি :
একটাই মোমবাতি, তুমি তাকে কেন দু’দিকে জ্বেলেছ?
খুব অহঙ্কারী হলে তবেই এমন কাণ্ড করা যায়।
তুমি এত অহঙ্কারী কেন?
চোখে চোখ রাখতে গেলে অন্য দিকে চেয়ে থাকো,
হাতে হাত রাখলে গেলে ঠেলে দাও,
হাতের আমলকী মালা হঠাৎ টান মেরে তুমি ফেলে দাও,
অথচ তারপরে এত শান্ত স্বরে কথা বলো, যেন
কিছুই হয়নি, যেন
যা কিছু যেমন ছিল, ঠিক তেমনি আছে।
খুব অহঙ্কারী হলে তবেই এমন কাণ্ড করা যায়।
অথচ এমন কাণ্ড করবার এখনই কোনো দরকার ছিল না।
অন্য কিছু না থাক, তোমার
স্মৃতি ছিল; স্মৃতির ভিতরে
ভুবন-ভাসানো একটা নদী ছিলো; তুমি
নদীর ভিতরে ফের ডুবে গিয়ে কয়েকটা বছর
অনায়াসে কাটাতে পারতে। কিন্তু কাটালে না;
এখনই দপ করে তুমি জ্বলে উঠলে ব্লাউজের হলুদে।
খুব অহঙ্কারী হলে তবেই এমন কাণ্ড করা যায়।
তুমি এত অহঙ্কারী কেন?
একটি মোমবাতি, তবু অহঙ্কারে তাকে তুমি দু’দিকে জ্বেলেছ।
কবিতার অর্থ একেকজন এক-একরকম ভাবে করে থাকেন। তবে কিশোর বয়সে একজন বাঙালি কিশোর কাউকে দ্বিচারিতার জন্য কটাক্ষ করতে কবিতাটা ব্যবহার করবে এমন ভাবাটার মধ্যে অস্বাভাবিকত্ব নেই। যতদূর মনে পড়ে আমার বন্ধুর কবিতাপাঠের সেই ব্যাখ্যাই আমার কাছে ধরা পড়েছিলো। তবে এই কবিতাটার অন্য পাঠ-সম্ভাবনাও আছে এবং এরকমটাই আমি এখানে করবো। আর যার জীবনকে তুলে ধরবো এই কবিতার মাধ্যমে সেই নামটা আমাদের সবারই পরিচিত – ওমর খৈয়াম।
মোমবাতির দুই দিক। আমরা আগুন জ্বালাই এক দিক থেকে। কিন্তু চাইলে দুই প্রান্ত থেকেই জ্বালানো যাবে আগুন। নীরেন্দ্রনাথ এই সম্ভাবনাকে লক্ষ্য করেছিলেন। তবে দু’দিক থেকে আগুন জ্বালানো কঠিন। জ্বালাতে পারলে মোমবাতি আলো দেবে বেশি তবে নিঃশেষ হয়ে যাবেও তাড়াতাড়ি। নীরেন্দ্রনাথের ভাষায় খুব অহংকারী হলেই এরকম করা যায়।
মানুষের জীবনের সাথে মোমবাতির মিল আছে। জ্বলতে জ্বলতে সে একসময় নিঃশেষ হয়ে যায়। মোমবাতির কাজ আলো দেওয়া। এরকমটা ঘটে জীবনের ক্ষেত্রেও। সব মানুষই কমবেশি আলো ছড়ায়- অর্থাৎ অন্যকে প্রভাবিত করে। তবে সব জীবনের আলোর তীব্রতা একরকম হয় না। কোন কোন জীবনের আলো খুবই মলিন। আর কিছু কিছু জীবনের আলোর তীব্রতা এমন যে অন্যান্য জীবনের আলোগুলো সেই আলোকচ্ছটার আড়ালে ঢাকা পড়ে যায়।
আলোকের এই তীব্রতার সাথে সম্পর্ক আছে জীবনযাপনের সিদ্ধান্তের। মোমবাতির দু’দিকেই যেমন আগুন জ্বালানো যায় তেমনি মানুষের জীবনেও থাকতে পারে নানামুখী সম্ভাবনা। অনেকে জন্মায়ও বহুমুখী প্রতিভা নিয়ে। তবে বহুমুখী প্রতিভাধরদের বেশিরভাগই বহুমুখী সৃষ্টিশীলতার চর্চা থেকে বিরত থাকেন। জীবনের মোমবাতি জ্বালানোর জন্য তারা একদিককেই বেছে নেন। চর্চা করেন একমুখী সৃষ্টিশীলতার।
কিন্তু এর উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম ওমর খৈয়াম। জন্ম বর্তমান ইরানের নিশাপুরে ১০৪৮ সালে। জাতিতে পারসিক। ওমর খৈয়াম একাধারে একজন কবি, গণিতবিদ ও জোতির্বিজ্ঞানী এবং এই তিন ক্ষেত্রেই তার অবস্থান একেবারে প্রথম সারিতে। পৃথিবীর ইতিহাসে এ দিক থেকে ওমর খৈয়ামের সমকক্ষ আর মনে হয় কেউ নেই।
কাব্যকলা ও গণিতশাস্ত্র মানুষের সৃষ্টিশীলতার দুই শ্রেষ্ঠতম প্রকাশ। কিন্তু এ দুইয়ের চর্চা একইসাথে করা খুব কঠিন। কারণ মননের জগতে আপাতত তাদের দূরত্ব অনেক। এ ধরনের চর্চা কেন কঠিন তা বোঝাতে একটা উদাহরণ দেবো। কণ্ঠসংগীত ও নৃত্যকলা উভয়েই প্রকাশ করে মানুষের সৃজনশীলতাকে – সুর  ও ছন্দের প্রতি ভালোবাসাকে। তাদের সম্পর্ক ও যোগাযোগ অনেক কাছাকাছির। কিন্তু কণ্ঠসংগীতে দরকার কণ্ঠের অনুশীলন। অপরদিকে নৃত্যকলায় দরকার হয় শরীরের নানা অঙ্গের অনুশীলন। কেউ কেউ দুটোই করতে পারেন তবে দেখা যায় কোন একটিতেই বেশি ভালো করছেন। তেমনি খুব কম লোকই একইসাথে কণ্ঠসংগীত ও বাদ্যযন্ত্রে সমান পারদর্শী হতে পারেন।
অনুশীলনগত দিক থেকে কাব্যকলার কাছাকাছি হল গল্প উপন্যাস। তাই অনেক কবিকেই দেখা যায় গল্প উপন্যাস লিখতে। তেমনি অনুশীলনগত দিক থেকে গণিতের কাছাকাছি আছে বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখাগুলো। ওমর খৈয়াম যে তাই একইসাথে গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী ছিলেন, তাতে তেমন বিস্ময়ের কিছু নেই। এরকম অনেকেই আছেন। কিন্তু বিস্ময়ের বিষয় হলো ওমর খৈয়াম একাধারে একজন কবি- গণিতচর্চায় তিনি তাঁর মস্তিষ্ককে যেভাবে প্রস্তুত করতেন, কবিতাচর্চায় তা তাকে, অনুমান করি, করতে হতো একেবারে ভিন্নভাবে।
আসলে আমরা জানি না যে তিনি কিভাবে তা সম্ভব করেছিলেন। ওমর খৈয়ামের মতো একই সাথে কবি ও গণিতবিদ আরো কয়েকজন আছেন। সমকালীনদের মধ্যে বাংলাদেশে যিনি বেশি পরিচিত তিনি হলেন কবি নিকনোর পাররা। তবে তার পরিচয় বাংলাভাষীদের কাছে কবি হিসেবেই। তাকে নিয়ে পত্র-পত্রিকাতে মাঝে মাঝে আলোচনা দেখা যায়। সেগুলোতে পাররা যে একজন গণিতের অধ্যাপক ছিলেন তার উল্লেখ থাকে না। এরকম আরো কিছু নাম বলা যাবে কিন্তু খ্যাতি ও অবদানের দিক থেকে ওমরের মতো আর কেউ নেই।
কবি খৈয়াম
আসুন এবার দেখি কাব্যকলায় ওমর খৈয়ামের অবদান কেমন ছিলো। ওমর খৈয়াম কবি হিসাবে পরিচিত তার রুবাইয়াতের জন্য। রুবাইয়াৎ চার লাইনের ফারসি ভাষায় লেখা ছোট আকারের কবিতা। এর সাথে কিছুটা মিল আছে জাপানি হাইকুর। হাইকু অবশ্য আরো ছোট, শব্দালঙ্কারমুক্ত- যাকে বলে একেবারের মেদহীন। তুলনায় রুবাইয়াতের বড় আকর্ষণ ওই শব্দালঙ্কার। ওমর খৈয়াম কতগুলো রুবাইয়াৎ লিখেছিলেন ঠিক জানা যায়নি এবং এ নিয়ে গবেষকদের মধ্যে দ্বিমত আছে।
ওমর খৈয়ামের রুবাইয়াৎ বর্তমানে বিশ্বের কবিতা পাঠকদের কাছে পরিচিত এডওয়ার্ড ফিটজিরাল্ড নামক এক ইংরেজের সুবাদে।  ফিটজিরাল্ড ১৮৫৯ সালে ওমর খৈয়ামের ৭৫টার মতো রুবাইয়াৎ অনুবাদ করে প্রকাশ করেন। পরে এই সংখ্যা একশতে দাঁড়ায়। এই অনুবাদগুলো প্রথমদিকে লন্ডনের সাহিত্য অনুরাগীদের দৃষ্টি আকর্ষণে ব্যর্থ হলেও একসময় লাভ করে ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা। ফিটজিরাল্ডের রুবাইয়াতের মাধ্যমে পাশ্চাত্যে ও পাশ্চাত্যকে অনুসরণ করে ওমর খৈয়ামের রুবাইয়াৎ পরিচিত হয়ে ওঠে ভারতীয় উপমহাদেশসহ সারা পৃথিবীতে। উল্লেখ্য যে, মোগল আমলে ফারসি ছিলো রাজভাষা। কাজেই মোগলরা যে ওমর খৈয়ামের কাজ সম্পর্কে জানতেন তা নিশ্চিত, তবু সেই পরিচয়ের বিস্তার কতটুকু ছিলো তা জানতে গবেষণার দরকার আছে। এখানে উল্লেখ করতে হবে যে কবি কাজী নজরুল ইসলাম রুবাইয়াতের বাংলা অনুবাদ করেছিলেন। নজরুল ফারসি জানতেন, তাই হয়তো মূল ফারসি থেকে সরাসরিই অনুবাদ করেছিলেন। তবে তিনি যে ইংরেজি অনুবাদের খ্যাতির দ্বারা প্রভাবিত হননি, এমন কথা বলা যাবে না।
ফিটজিরাল্ডের খৈয়াম
ফিটজিরাল্ডের অনুবাদ কিন্তু যাকে বলে আক্ষরিক অনুবাদ নয়। ফিটজিরাল্ডের রুবাইয়াৎ যেমন ওমর খৈয়ামের, তেমনি ফিটজিরাল্ডেরও সৃষ্টি।  এর সাথে তুলনা করা যাবে বুদ্ধদেব বসুর বোদলেয়ারের অনুবাদকে, যা অনেকখানি বুদ্ধদেব বসুরও সৃষ্টিকর্ম, যাকে বলতে পারি অনুসৃষ্টি (ট্রান্সক্রিয়েশন)। ফিটজিরাল্ড ছাড়াও আরো অনেকেই ওমর খৈয়ামের রুবাইয়াতের ইংরেজি অনুবাদ করেছেন, তবে খ্যাতির দিক থেকে কেউই ফিটজিরাল্ডকে অতিক্রম করতে পারেননি।
ফিটজিরাল্ডের ওমর খৈয়ামের অনুবাদ কাব্যশৈলীর দিক থেকে কারুকার্যময়। মূলও অনুমান করি তাই। কবিতাগুলো ঝলমল করছে শব্দালঙ্কারে, যেন সোনার উপরে বসানো আছে বহুবর্ণিল নানান হিরকখণ্ড, সেসব থেকে বিচ্ছুরিত হচ্ছে নানান বর্ণবিভা। এতে যেন আছে তীব্রতা ও আলোকের ছটা। কিন্তু বিষয়বস্তুর দিক থেকে ওমর কিছুটা অদৃষ্টবাদী ও আত্নবিনাশী। ওমর বলছেন জীবনকে উপভোগ করতে এই জন্য নয় যে জীবন উপভোগের বিষয়। তিনি বলছেন ভোগ করো আর না করো জীবন এমনিতেই শেষ হবে যাবে- সময় কাউকেই ছাড় দেয় না। তবে আমার উপরের এই ব্যাখ্যা কিছুটা সরল। ওমরের কবিতার অন্য পাঠ-সম্ভাবনাও আছে। কেউ কেউ ওমরের কবিতাতে সুফিবাদের নানান অনুষঙ্গ খুঁজে পেয়েছেন। এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা আমার সাধ্যের বাইরে আর তা ফারসি কবিতার বিশেষজ্ঞদের জন্যই তুলে রাখবো।
খৈয়াম : জ্যোতির্বিজ্ঞানী-গণিতজ্ঞ
ফিটজিরাল্ড তাঁর অনুবাদকর্মে ওমরকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী কবি হিসেবে। জীবদ্দশায় ওমর খৈয়ামের বিজ্ঞানী হিসাবেই অধিক পরিচিতি ছিলেন বলে অনুমান করি। ১০৭৪ সালে তৎকালীন সুলতান মালিক শাহ তাকে মানমন্দির নির্মাণ ও ক্যালেন্ডার সংস্কারের কাজ দিয়েছিলেন। ওমর আটজন সহকর্মী নিয়ে ৫ বছর কাজের পরে তার ক্যালেন্ডার প্রকাশ করেন। এই ক্যালেন্ডারটাকে বলা হয় জালালি ক্যালেন্ডার। এই কাজটা যে কত কঠিন ও পরিশ্রমসাপেক্ষ, তা যারা বুঝতে পারছেন না তাদের বলবো শুধু একরাতের জন্য খলি চোখে আকাশের তারাদের গতিবিধি লক্ষ্য করে কী হচ্ছে একটা বিবরণ তৈরি করার চেষ্টা করে দেখতে পারেন। বেশিরভাগ মানুষই একঘণ্টার পরে হাল ছেড়ে দেবেন। ওমরকে এই কাজটা করতে হয়েছিলো পাঁচ বছর ধরে। কাজটা আরও কঠিন করে দিয়েছে মধ্য-এশিয়ার তীব্র শীতের রাতগুলো।
তবে ওমরের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে আসলে গণিতে। আল খারিজমির মাধ্যমে সূত্রপাত ঘটেছিলো বীজগণিতের। ওমর খৈয়াম তাকে এগিয়ে নিয়েছিলেন অনেক দূর। ওমরের কাজগুলো গুরুত্বপূর্ণ বীজগাণিতিক বিভিন্ন সমস্যার সমাধান অনুসন্ধানে।
ওমরের কিছু অবদানের বর্ণনা সহজেই করা যাবে আমাদের পাঠ্যপুস্তকের গণিতের সাহায্যে। মাধ্যমিক পর্যায়ে সবাই (a+b)2 = a2+ 2ab+ b2 সূত্র মুখস্থ করেছেন। সূত্রের প্রমাণ খুব সহজ। আসুন লিখি (a+b)2 =(a+b) (a+b)। এবার পর্যায়ক্রমে গুণ করে পাওয়া যাবে সূত্রটাকে। এবার ভাবুন যে বর্গ না হলে যদি ঘনক হতো, তাহলে সূত্রটা কী দাঁড়াতো। আগের মতোই লিখতে পারি (a+b)3 = (a+b) (a+b) (a+b)। পর্যায়ক্রমে গুণ করে এবারের সূত্রটাকে পাওয়া যাবে। একটু বেশি সময় লাগবে এই যা। একইভাবে গুন করে পাওয়া যাবে চতুর্বর্গ, পঞ্চবর্গগুলোকে। কিন্তু আগের চেয়ে আরো অনেক বেশি সময় লাগবে সূত্র বের করার জন্য গুণনের কাজে। তাই যদি একটা সাধারণ সূত্র থাকে গুণফল কি হবে  তা জানার জন্য, তাহলে আমাদের এই কাজটা অনেক সহজ হয়ে যেতে পারতো। এই পদ্ধতি বা সাধারণ সূত্রকে বলা হয় দ্বিপদী উপপাদ্য বা বাইনোমিয়াল থিওরোম। ওমর খৈয়ামই প্রথমে বের করেছিলেন সেই পদ্ধতি। যদিও কিভাবে তা বের করেছিলেন সেই লেখাগুলো কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। পরে দ্বিপদী উপপাদ্যের সমাধান দিয়েছিলেন অন্য কয়েকজন। এদের মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন হলেন ব্লেইজ পাসকাল (Blaise Pascal), যার জন্ম ১৬২৩ ও মৃত্যু ১৬৬২ সালে ফ্রান্সে।
ওমর খৈয়ামের এই কাজের সাথে সম্পর্কিত আরেকটি খুবই বড় মাপের গাণিতিক কাজ হলো ত্রিঘাত সমীকরণের সমাধান। ত্রিঘাত সমীকরণের ছোট ভাই দ্বিঘাত সমীকরণের সাথে সবার না হলেও অনেকের পরিচয় ঘটেছিলো মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের গণিত পাঠের সময়। ax2+bx+c=0 আকারের সমীকরণগুলোকে বলা হয় দ্বিঘাত সমীকরণ। প্রশ্ন হলো এখানে x এর মান কতো। মোটামুটি প্রাচীন কাল থেকেই জানা ছিলো যে এর মান হলো  । তুলনায় ax3+bx2+cx+d=0 আকারের সমীকরণকে বলা হয় ত্রিঘাত সমীকরণ। এই সমীকরণের সাধারণ সমাধান আগে কেউ বের করতে পারেননি। ওমর খৈয়াম এই অসাধ্য সাধনের চেষ্টা করলেন। এই অসাধ্য সাধন তিনি করলেন জ্যামিতিক প্রক্রিয়াতে। ত্রিঘাত সমীকরণের সমাধান ওমর খৈয়ামের পদ্ধতিতে একটি বৃত্ত ও প্যারাবোলার সম্পর্কে দিয়ে পাওয়া যায়। পরবর্তী কালে আরো কয়েকজন ত্রিঘাত সমীকরণের সমাধানের পদ্ধতি দেখিয়েছেন, তবে ওমরই সবার পূর্বসূরি। এই সমাধানের মাধ্যমে ওমর বীজগণিত ও জ্যামিতির মধ্যকার সম্পর্ককেও প্রকাশ করে গেলেন। মনে রাখতে হবে যে আল খারিজমির হাত ধরে সে সময়ে বীজগণিতের যাত্রা মাত্র শুরু হয়েছে। এখনকার মতো বীজগাণিতিক চিহ্ন ব্যবহার করে অংক করার পদ্ধতি তখনও চালু হয়নি। তাই ওমরকে পুরো ব্যাপারটাই বর্ণনা করতে হয়েছিলও গদ্যে লিখে।
গণিতে ওমর খৈয়ামের অবদানের আরেকটি হলো ইউক্লিডের পঞ্চম স্বতঃসিদ্ধ প্রমাণের চেষ্টা। পঞ্চম স্বতঃসিদ্ধটাকে সমান্তরাল স্বতঃসিদ্ধ হিসেবেও পরিচিত। ওমর খৈয়াম এটা প্রমাণের চেষ্টা করলেন এবং দেখলেন কিছু কিছু ক্ষেত্রে স্বতঃসিদ্ধটাকে সত্যি দেখানো যায় না। এই প্রচেষ্টার মাধ্যমে ওমর অবদান রেখে গেলেন- এখন যাকে বলা হয় নন-ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতিতে।
ওমর খৈয়াম, আল খারিজমি ও অন্যান্য মুসলিম মনীষীর কাজ পরবর্তীতে ইউরোপে সমাদৃত হওয়া শুরু করে। তাঁদের লেখাগুলো লাতিন এবং ক্রমান্বয়ে অন্যান্য ইউরোপীয় ভাষার অনূদিত হয়। এই কাজগুলো তৈরি করে দেয় ইউরোপীয় গণিত ও বিজ্ঞানচর্চার ভিত্তি। তুলনায় দেখা যায় যে বাংলাদেশে অনেকই জ্ঞান-বিজ্ঞানে মুসলিম স্বর্ণযুগের এসব মনীষীর কথা ভেবে গর্ব অনুভব করেন। কিন্তু এদের কোনো মূল কাজ যে বাংলাতে অনুবাদ হয়েছে, এখনো সেটা চোখে পড়েনি। হলেও কখনোই তেমন প্রচারে আসেনি। এরকম একই ব্যাপার দেখা যায় বাঙালি গর্ব অতীশ দীপঙ্করকে নিয়ে। অতীশ দীপঙ্করের নাম ও তিব্বত-যাত্রার কথা কে না জানে! কিন্তু আসলেই তিনি কি করেছিলেন, কেন বিখ্যাত, তা জানেন এমন লোক খুব কমই আছে। তাঁর কাজের কোনো অনুবাদ হয়ে থাকলেও সর্বসাধারণের কাছে একেবারেই পরিচিত নয়।
শেষকথা
ওমর খৈয়াম কবিতা ও গণিত দু’দিকে আগুন জ্বালালেও মোটামুটি দীর্ঘ জীবনই পেয়েছেন। ১১৩১ সালে মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স হয়েছিলো ৮৩ বছর। তাঁর সমাধি আছে জন্ম ও মৃত্যু স্থান প্রিয় নিশাপুরে, যার কথা রুবাইয়াতে আছে বেশ কয়েকবার।
নীরেন্দ্রনাথ তাঁর কবিতাতে বলছেন যে খুব অহংকারী হলেই কিন্তু একটা মোমবাতির দু’দিকে আগুন জ্বালানোর মতো কাজ করা যায়। ওমর কী তবে খুব অহংকারী ছিলেন? ওমরের রুবাইয়াৎ কিন্তু তা বলে না। রুবাইয়াৎ অলংকৃত কবিতা হলেও ওমর সেখানে জীবনকে দেখান অর্থহীন হিসেবে- মানুষ এই জগৎ সংসারে ক্ষমতাহীন। রুবাইয়াতে তাই আছে পাশা খেলার কথা, যে পাশার গুটিগুলো খেলা শেষ হলে আবার ফিরে যায় বাক্সবন্দি অবস্থায়। তিনি মানুষকে দেখেন সময়ের দাস হিসেবে, বলেন, যে-সময় যা লিখে ফেলেছেন তার একবিন্দুও মোছা যায় না, যত চেষ্টা-অশ্রুপত হোক না কেন।
ওমর খৈয়াম আমাদের কাছে এক মহান পুরুষ। সৃষ্টিশীলতায় ভিন্ন ভিন্ন শাখার তিনি রেখে গেছেন চিরস্থায়ী অবদান। একহাজার বছর পরেও আমরা তাকে স্মরণ করি। কিন্তু নিজেকে নিয়ে তিনি কি ভাবতেন? তাকে কি আসলেই অহংকারী বলা যায়? পাঠক, তাঁর কবিতা পড়ে দেখুন, কী বলছেন তিনি। তবে একথা তো নিঃসন্দেহে বলা যায়, কালজয়ী কবিতা রচনা করে গেছেন তিনি। মরমী সুফী কবি হিসেবেই তাঁর খ্যাতি। কালে কালে তিনি বিশ্বজুড়ে পঠিত হবেন, এমনই একজন লেখক তিনি। কিন্তু তাঁর গণিতসত্তাকেও ভুলে যাওয়া যাবে না।
আজ খৈয়ামের ৯৭১তম জন্মদিন। কালজয়ী এই মহান কবি ও গণিতজ্ঞের প্রতি অশেষ শ্রদ্ধা।