যেভাবে লিখতে শুরু করি >> শাপলা সপর্যিতা >> জন্মদিন

0
282

যেভাবে লিখতে শুরু করি 

[আজ তীরন্দাজ-এর নিয়মিত লেখক শাপলা সপর্যিতার জন্মদিন। তিনি যে লেখাটি লিখছেন সেটি একটি উপন্যাস : সম্পর্কটি শুধুই জৈবিক। শাপলাকে তীরন্দাজ-এর পক্ষ থেকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাই।]

বেশির ভাগ লেখাই আমি লিখি হাঁটতে হাঁটতে। শাকসব্জি কাটতে কাটতে। চুলায় কোনো রান্না নাড়াচাড়া করতে করতে। আবার কাপড় ধুতে ধুতেও। লিখি সারাদিন সারারাত। কখনো ঘুমের ভেতর জেগে উঠি। লিখে ফেলি স্বপ্নে পাওয়া সোনার মোহর। আবার কখনো ঘুমের আলস্যে হারাই কড়ি ও কবজ। সেদিনও পথে হাঁটছিলাম। শংকর থেকে হেঁটে কাদেরাবাদ হাউজিং যেতে যতটা পথ ততটা পথের জন্য কোনো যানবাহন ব্যবহার করা আমার স্বভাবে নেই। যখন লিফটের দরজায় দাঁড়িয়েছি আমার ছাত্রকে পাশে দেখেই প্রশ্ন করি, -তুমি? কখন এলে?
-মিস, আমিতো সেই রাস্তা থেকেই আপনার পাশে পাশে হেঁটে আসছি।
আমি বিস্মিত হয়ে বলি,
-ওহ্।
-এতো প্রায়ই ঘটে মিস। আপনি রাস্তায় আনমনা হয়ে হাঁটেন।
এইটুকু বাচ্চার এই কথা শুনে আমি তাজ্জব হই। কি যেন ভাবতে ভাবতে ঘরে ঢুকি।
তারপর, নিজের মাকে ছাত্রের সেই কাহিনি বলার কী অদ্ভুত মজা সে আর বলতে। ছাত্রের মা বলেন,
-আপা কোনোদিন না আবার অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে যায়। আমিও দেখেছি আপনাকে এমন।
সেই হাঁটাপথে আমি আবিস্কার করেছিলাম এক অদ্ভুত বীজ। আমার ভেতরে জন্ম নিয়েছিল এক ঈশ্বরকণা। নাকি ঈশ্বরই আমায় দিয়েছিলেন কিছু অপার্থিব আমি জানি না। তবে কটা নাম পেয়েছিলাম। কোন পথে যাব তার সঠিক দিকনির্দেশনা পেয়েছিলাম এটা অন্তত জেনেছি এতদিনে। এ আমার দ্বিতীয়জন্মের পথ চলা। দ্বিতীয় জন্মের সঞ্চয়। এ যাত্রাপথেই পাই নামটি, এখন সকলেই জানেন। অন্তত আমার উপন্যাসের পাঠক অন্তত জানেন এর নাম ‘সম্পর্কটি শুধুই জৈবিক’।
ঠিক করি ‘সম্পর্কটি শুধুই জৈবিক’ নামে একটা কিছু লিখবই। পূর্বাপর নানা ঘটনার রেশ ধরে তো অবশ্যই এই নাম। কিন্তু কী লিখবো? হঠাৎ হা্ওয়ায় উড়ে আসা ধূলোর মতো কত নাম আসে। কত কত নাম মুছেও যায়! কত শিশুগাছ জলসিঞ্চনের অভাবে মরে যায়। কিছু আবার তেমনিই হারায়। পায়ে সোনার ঘুঙুর নেই বলে সে উদাসীন পথে ধায়। আমি আর খুঁজে পাইনা তার মুখ কিংবা সুখ। সেও হারানোর অপেক্ষাতে রয়েছে হয়তো। তবু হারায় না। ক্ষ্যাপা পরশ পাথর হাতের কাছে রেখে হারায়। আর আমার পরশ পাথর করতলে এসে বাসা বাঁধে। হয়তো কখনো ক্ষেপি নি বলেই এ পাওয়া আমার। এই চলেছে গত প্রায় এক হাজার আটশত পঁয়ত্রিশ দিন কিংবা তারও বেশি সময় ধরে। প্রথম জন্মের মায়ের বাধ্যগত কন্যা। কাদামাটি ছাঁচে ঢেলে যে পুতুল বানিয়েছিলেন, সে জেগে উঠেছিল লাইমাই পাহাড়ের কাছের এক ঝুলবারান্দার দেয়াল ধরে নড়বড়ে পায়ে দাঁড়াতে দাঁড়াতে। যখন সে হামাগুড়ি দিয়ে বারান্দায় চলে গেলেই দেখতে পেত সন্ধ্যার আকাশে পূরবীর আদিগন্ত লাল। যখন ঝুলবারান্দায় ঝুলে পড়া পেয়ারায় ডাল বেয়ে গড়িয়ে পড়তো অঝোরে বৃষ্টিধারা কিংবা শিউলির সুবাসে মুখরিত হতো ভোরবেলা। পাহাড়চূড়ায় নিঃসঙ্গ মানুষের আসঙ্গলিপ্সা কিংবা বাদুরের হন্তারক ইলেকট্রিসিটির তার, এসবই ওই শৈশবে দানা বেঁধেছিল কে জানতো। কে জানতো লুকিয়ে মধ্যদুপুরে বয়সের আগে আগে খেয়ে ফেলে দেয়া ‘দেবদাস’ কিংবা ‘সংশপ্তক’-এর বীজ মাটির গভীর অন্ধকার ছিঁড়েখুঁড়ে বের করে আনবে কচি চারাগাছ! কে জানতো এলেচি আমদির সেই নিঃসঙ্গতা কুঁড়ে কুঁড়ে খাবে তাকে চিরটাকাল। আমি কেবলই মায়ের স্বপ্ন সফল করার ভাবনায় বিভোর। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে স্বামী সংসারে এসে দেখি আমি স্বামীর স্বপ্ন সফল করার প্রয়াসী। আর এইবেলায় নারী যখন নিজের শক্ত শেকড়ের খোঁজে শঙ্কিত, রাত্রিদিন তখন আমি মেলে দিই ডানা। দূর দূর থেকে খুঁজে আনি খড়কুটো। কন্যাদের স্বপ্ন আঁকতে রং তুলি। ঠিকানার পরিবর্তে আকাশ খুঁজি। রাতের নিরালায় প্রতিষ্ঠা করি শক্ত ভিত। এ এক দারুণ জার্নি। নিজের স্বপ্ন কি ছিল? আসলেই কোনো স্বপ্ন কি আমি দেখেছিলাম নিজেকে নিয়ে? আজও এ প্রশ্নের উত্তর আমার জানা হয়ে ওঠে নি। তবে হ্যাঁ, জানতে শুরু করেছে সেই ২০১৮ সালের ১৫ নভেম্বর থেকে। যেদিন সম্পর্কটি শুধুই জৈবিকের প্রথম পর্বটি প্রকাশিত হয়। জানতে শুরু করেছি ঠিক তার পরদিনই ১৬ নভেম্বর থেকে যেদিন আমার মা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে যান অসীমে। সেদিনের পর থেকে জানতে শুরু করেছি কী লিখবো আমি। কী লেখা দরকার। কেন লেখা লেখা দরকার। কী লিখতে চাই আমি। আর তারই পথ ধরে চলে যাই ১৯৪৭ সাল ১৯৬৩ সাল, ১৯৬৬ ‘৬৯ ‘৭০ ‘৭১ ‘৭২ ‘৭৪ হয়ে ২০০৯ সাল অবধি। কংগ্রেসের আধিপত্য আর জৌলুস স্বেচ্ছায় পরিত্যাগ করে পায়ে সেন্ডেল আর হাফশার্ট পড়ে পথে নেমে পড়া সেই ১৯ বছরের কিশোরের পিছু পিছু ধাই। চারু মজুমদারের পথ ধরে ধরে হেঁটে যাই। হেঁটে চলি তুষার বরফ। হাঁটি কৃষ্ণভক্ত শর্মার পথ ধরে। নেপাল সীমান্তে হাঁটি, চীন তিব্বত সীমান্তে। পৌঁছে যাই পিকিংয়ে। ছয় দফার দাবিতে চলি মিটিংয়ে মিটিংয়ে রাজপথে পিচে। গণঅন্দোলনে নেমে পড়ি। ’৭০-এর নির্বাচনের গোপন ষড়যন্ত্রের মুখোশ ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলি। নামি ইয়াহিয়া-ভূট্টোর পেতে রাখা ফাঁদের মাঝখানে। চলে যাই রেসকোর্স ময়দানে। পাকসেনাদের জিপের পেছন পেছন লুকিয়ে বসে থাকি। শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়িতেও নেমে পড়ি ২৫ মার্চের কালরাতে। তার পিছু পিছু স্বাধীনতার যুদ্ধে নেমে পড়ি। আকাশ পোড়ানো ঘর পোড়ানো মাটির ছাই হাতে তুলে মেখে নিই নিজেরই গায়ে। মৃত্যু জখম হত্যা ধর্ষণ কাম ক্রোধ উল্লাস জয় পরাজয়ের সাক্ষী হতে থাকি এক এক করে। সাথে জন্ম দিতে থাকি মনস্বিতা টুলটুল ফারুক তমালকৃষ্ণ মাধবী রমা কিংবা নিরালা অথবা মুন্সী আব্দুর রবের মত এক-একজন রক্তমাংসের মানুষ। জন্ম দিই ঘটনা। মধ্যরাতে নিঃঝুম যখন আমার পৃথিবী। কোলাহলে মুখর রাতের শেষ সীমানায় ঘুমিয়ে পড়েছে পাখিরা। তখন আমি সারাটি রাত ধরে ছটফট করি প্রসব বেদনায়। কেউ নেই কোথাও। শূন্য ঘর। জনমানুষের চিহ্নহীন। ওষুধ পথ্য ডাক্তার বদ্যি সকলই নিজে নিজে সেরে নেই একা, মধ্যরাত থেকে ভোর অবধি জেগে জেগে। তারপর আবার ভোর হবে। মিলিটারি শাসনের তালে তাল মেলাতে প্রতি মিনিটে মিনিটে জরিমানার টাকা সেভ করতে আমার আরও একটু জোরে হাঁটার দিন শুরু হবে। তার সঞ্চয়ওতো কিছু চাই। দ্বিতীয় জন্মে এভাবেই মুখর এভাবেই আমার দিন। এভাবে কর্মবহুল আমার রাত্রিগুলোতে ভেঙে পড়ি আমি বারবার। আর আশ্চর্য বিভঙ্গে গড়ে তুলি মাটির প্রতিমা আমার। গত প্রায় দুবছর ‘সম্পর্কটি শুধুই জৈবিক’ লিখতে লিখতে এভাবেই বার বার মরেছি আর জন্মেছি শতবার। জন্মের নবতিথি হয়তো কিছু থাকে। কালের পাতায় পাতায় যার হিসেব। কিন্তু লেখকের মৃত্যু অপার। জন্মও পূণর্বার।
শুভেচ্ছা জানাই সকল পাঠক ও শুভার্থীকে আজকের এই পার্থিব জন্মতিথিতে আমার। হয়তো কোনো এক অধরা সময়ে দেখা হবে অপার্থিব অন্য এক জন্মতিথিতে, সে প্রবল প্রত্যাশায়।