রনক জামান > নির্জনতার শক্তি : শেক্সপীয়র থেকে মুরাকামি >> করোনার দিনে

0
451

নির্জনতার শক্তি : শেক্সপীয়র থেকে মুরাকামি

প্লেগ যখন মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ে তখন শেক্সপীয়রও ছিলেন সেল্ফ-কোয়ারেন্টিনে। আর সেই দিনগুলোতে তিনি লিখে ফেলেছিলেন তাঁর বিখ্যাত ট্র্যাজেডি ‘কিং লিয়ার’। নিজের বুদ্ধি-বিবেচনা অনুসারে সময়টাকে আপনিও কাজে লাগাতে পারেন। অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও ভালো কাজ এই অবসরে করে ফেলা সম্ভব। অন্তত দীর্ঘদিন জমে থাকা নিজের অসমাপ্ত লেখাগুলো লিখে ফেলুন।

***

“উপন্যাস লেখার মেজাজে যখন থাকি, তখন প্রতিদিন ভোর ৪টায় উঠে পড়ি এবং ৫-৬ ঘণ্টা লেখার কাজ করি। বিকেলে ১০ কিলোমিটার দৌড়াই বা ১৫০০ মিটার সাঁতার কাটতে যাই (অথবা দুটাই করি), এরপর একটু পড়াশোনা করি, গান শুনি। রাত ৯টায় ঘুমিয়ে পড়ি। কোনো প্রকার এদিক-ওদিক না করেই এই রুটিন অনুসারে আমি চলি। এভাবে রুটিন মেনে অভ্যস্ত হওয়াটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। রুটিন করে কাজ করাটা আমার কাছে মূলত আত্ম-সম্মোহনের মতো। মনের গভীরতর স্তরে পৌঁছুবার জন্য আমি নিজেকে এভাবে আত্ম-সম্মোহিত করি।” – মুরাকামি

লেখক তিনি। ভাবুকও। সর্বকালের সেরা চিন্তক বললেও ভুল হবে না। সুদূর সেই গ্রিসে, নির্জন একটা কক্ষে টেবিলে একটু ঝুঁকে কী যেন লিখে চলেছেন। হয়তো ভুর্জ্যপত্রে কিংবা প্যাপিরাসে। পালকের কলম প্রকৃতি থেকে আহরিত কালিতে ডুবিয়ে একটু একটু করে লিখছেন তিনি। আরিস্তুতল তাঁর নাম। নামটা শোনার পরই সমীহ-শ্রদ্ধায় তাঁর প্রতি আমাদের মাথা নুয়ে আসে। এতবড় লেখক তিনি হয়ে উঠেছিলেন কিন্তু দিনের পর দিন এই নির্জনে বসে লিখতেন বলে। এখন আমাদের লেখকদের জন্যে এসেছে সেই অখণ্ড অবসর। নির্জনতা। করোনা ভাইরাসের আতঙ্কে কাঁপছে সারা বিশ্ব। লেখকেরাও চলে গেছেন নির্জনে, নির্বাসনে। এতো আসলেই একধরনের নির্বাসন। বেঁচে থাকার জন্যে গণস্পর্শ বাঁচিয়ে লেখকেরা একান্তভাবেই একা হয়ে গেছেন বা একা হতে হচ্ছে তাঁদের। কিন্তু এতে ভাবনার কিছু নেই। লেখকেরা তো নির্জনে থেকেই একা-একাই লেখালেখি করেন। করোনার দিনে এই নির্জন-আবাস হয়তো আরও বেড়েছে। লেখকেরা তো এভাবেই লিখে থাকেন। সুধীন্দ্রনাথ দত্ত বলেছিলেন, জনতার জঘন্য মিতালি তাঁর সহ্য হয় না। জীবনানন্দ তো লেখকের জন্য আবশ্যিক শর্তের কথাই বলেছেন, যে স্বভাবটি হচ্ছে নিজেরই মুদ্রাদোষে তিনি একা হয়ে গেছেন। লেখকেরা এভাবেই নির্জনে বসে লেখালেখি করেন। এটা তাদের জন্যে খুবই স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। এটা তাঁদের লেখালেখির জীবনযাপনেরই অংশ। আরিস্তুতল থেকে মুরাকামি সবাই তো এভাবেই লেখালেখি করেছেন।
এই মুহূর্তে কোভিদ-১৯ নামের একটা ভাইরাসের আতঙ্কে কাঁপছে সারা পৃথিবী। অন্য সবার মতো লেখকেরা আরও গভীর গভীরতর নির্জনতার কাছে নিজেদের সঁপে দিচ্ছেন। কিন্তু নির্জনতা লেখকদের শত্রু নয়, বন্ধু। এই নির্জনতাকে আলিঙ্গন করেই তো লেখক হয়ে উঠতে পারেন লেখক। লেখকদের জন্য এটা গৃহবন্দিত্ব নয়। সৃষ্টিশীল মুহূর্ত। লেখকেরা সেই আদি কাল থেকে লেখার আগের প্রস্তুতি মুহূর্তে, লেখার মুহূর্তে, বাইরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন থেকে লেখালেখি করেছেন। লেখকদের জন্য এই ধরনের ‘আইসোলেশন’-এ থাকাটা নতুন কিছু নয়। বরং লেখকেরা এই বিচ্ছিন্নতাকে, নির্জনতাকে উপভোগ করেন। এ কারণেই পৃথিবীর প্রায় সব লেখকই বলে থাকেন ‘সলিচ্যুড’ বা নিঃসঙ্গতা তাদের প্রিয়। কারণ এরকম নিঃসঙ্গ, একাকী, নির্জন সময় না পেলে তাঁরা লিখতে পারতেন না। করোনা ভাইরাস তাই তাঁদের কাছে দুর্বিসহ লাগবে না। এই ‘আত্ম-নৈঃসঙ্গ্য’কে তাঁরা উপভোগ করবেন।
২. কঠিন ও গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো আগেভাগে করে রাখুন
ইংরেজিতে একটা কথা আছে—সিজ দ্যা ডে আর্লি—যা করার, সকাল সকাল করুন। মনে করুন ভুবনবিখ্যাত কথাসাহিত্যিক আর্নেস্ট হেমিংওয়ের কথা। হেমিংওয়ে প্রতিদিন সকাল ছয়টায় উঠে লিখতে বসতেন। জেনে বিস্মিত হবেন না, তিনি সব সময় বসে লিখতেন না। অনেক সময় টাইপরাইটের সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে লিখতেন। প্যারি রিভিউকে দেয়া সাক্ষাৎকারে নিজেই বলেছিলেন, ‘একটা বইয়ের কাজ করার সময় বা গল্প লেখার সময় আমি ভোরের প্রস্ফুটিত সতেজ আলোর ভেতর লিখতে শুরু করি। আশেপাশে কেউ বিরক্ত করার নেই। আবহাওয়া শীতল, প্রফুল্ল মন—নিজের কাজে ব্যস্ত থাকার উপযুক্ত সময় তখনই।’
সুতরাং আপনারা—যারা এসময় গৃহবন্দী হয়ে আছেন, তারা নিজেদের বড় ও গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো সকাল সকাল সেরে নিতে পারেন। অসমাপ্ত কাজগুলোও এখনি সেরে ফেলতে পারেন। একটু পরেই সকালের খবরে হয়তো নতুন নতুন মৃত্যুর খবর ছুটে আসবে। নতুন আক্রান্তের খবর উড়ে আসবে। আত্মীয় বা পরিবারের ফোন আসবে। মনোযোগ তখন সরে যাবে, কৌতুহলে, আতঙ্কে—এবং তার আগেই—ঘুম থেকে ওঠার পরপর ফ্রেশ সময়টা নিজের কাজের জন্য বেছে নিন। কাজে মনোযোগ ধরে রাখতে পারবেন, অল্প সময়ে অনেক কাজ গুছিয়ে ফেলতে পারবেন।
৩. রুটিন তৈরি করে মেনে চলুন
সেলফ-কোয়ারেন্টাইনের ভেতর নিজের কাজগুলো সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে করতে একটা ব্যক্তিগত রুটিন জরুরি। রুটিন তৈরি তো সবাই করতে পারেন কিন্তু মেনে চলাটাই কঠিন। আপনি স্বরচিত রুটিন ঠিকমতো মেনে চলার চেষ্টা করুন—ফল পাবেন।

‘যৌবনে আমার প্রেমিকারাও আমার রুটিনকে টলাতে পারেনি। আমার প্রেমের জন্য নির্ধারিত সময় ছিল লাঞ্চের পর।’ – গ্রাহাম গ্রীন

লেখকদের কঠোর অধ্যবসায়ের উদাহরণ এক্ষেত্রে আপনাকে উৎসাহ জোগাতে পারে। অধিকাংশ লেখকই প্রতিদিন একটা নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম থেকে ওঠেন, প্রতিদিন নির্দিষ্ট সংখ্যক শব্দ লেখার টার্গেট তাঁদের থাকে। এই রুটিনটা তাঁরা মেনে চলেন দিনের পর দিন। শুধু তো লেখালেখি নয়, ব্যায়ামের জন্য তাদের নির্দিষ্ট সময় আছে। এমনকি মদ্যপান কিংবা কফিপানের জন্যও একটা সময় নির্ধারিত রেখে কাজ করেন তাঁরা। আমাদের একজন প্রধান ঔপন্যাসিক সেলিনা হোসেনের কথা বলি। তিনি প্রতিদিন একটা নির্দিষ্ট সময়ে লেখালেখি করেন। কোনো অনুষ্ঠানে যাওয়া বা ঘর-সংসারের টুকিটাকি কাজের সময়ও তাঁর বাঁধা। সৈয়দ শামসুল হকও এভাবেই সার্বক্ষণিক সময় ধরে লেখালেখি করতেন। কথাসাহিত্যিক-কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় খুব ভোরে উঠে সকাল ৯টা-১০টা অব্দি লিখতেন। সমরেশ বসুরও এরকমই অভ্যাস ছিল। প্লেটোর রচনাবলীর বাংলা অনুবাদক আমিনুল ইসলাম ভুইয়ার লেখার সময়টা আরও প্রলম্বিত। তিনি খুব ভোরে উঠে প্রায় সারাদিনই লেখালেখি করেন। জরুরি ব্যক্তিগত কাজগুলি এর মাঝেই সেরে ফেলেন তিনি।
রুটিন নিয়ে বিখ্যাত ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক গ্রাহাম গ্রীনের মজার একটা কথা আছে—‘যৌবনে আমার প্রেমিকারাও আমার রুটিনকে টলাতে পারেনি। আমার প্রেমের জন্য নির্ধারিত সময় ছিল লাঞ্চের পর।’ শুধু গ্রাহাম গ্রীন নয়, বাংলাদেশে এই সময়ে যাঁরা লিখছেন তাঁরা হয়তো তাদের প্রেমিকা বা বৌদের এভাবেই দিনক্ষণ ঠিক করে সময় দেন। আপনিও কখন কী করবেন, ঠিক করে, সেইভাবে চলুন।
বাড়তি কিছু পরিকল্পনা করে কাজ করার এখনই উপযুক্ত সময়। নিজের কথা বলি। আমি এখন একটা উপন্যাস লিখছি। এই লেখার পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে প্রতিরাতে ঘুমাতে যাবার আগে আমি উপন্যাস-সংক্রান্ত কাজের একটা কাল্পনিক টু-ডু লিস্ট করে তারপর ঘুমাতে যাই। ফলে, পরদিন ঘুম থেকে জাগার পর আমার কী করা দরকার, সেই সেন্সটা থাকে। সময় বা মনোযোগের অপচয় ঘটে না। আসলে সবকিছু পরিকল্পনার ভেতর থাকলে, আকাশকুসুম কল্পনায় কাটানো সময়টা দিনশেষে উপকারী বলে মনে হয়। বাড়তি প্রেরণা পাওয়া যায়।
রুটিন রুটিন আর রুটিন। স্ত্রীর কাছে লেখা মার্কিন লেখক কুর্ট ভনেগাটের একটা চিঠিতে দেখতে পাচ্ছি, সম্পূর্ণ চিঠিটা জুড়ে স্রেফ তাঁর দৈনন্দিন কাজের ফিরিস্তি, অর্থাৎ রুটিনের কথা। ভাবুন তো তাঁর রুটিনটা কেমন? দেখুন তাহলে :
“সকাল সাড়ে পাঁচটায় ঘুম থেকে উঠি। আটটা পর্যন্ত কাজ করি, বাসাতেই নাশতা করি। এরপর দশটা পর্যন্ত লেখালেখি। শহরের ভেতরেই খানিকটা স্থান জুড়ে হাঁটাহাঁটি করি। চিঠিপত্র পোস্ট করার থাকলে করি। এরপর যাই পৌরসভার সুইমিং পুলে। সময়টা একদম নিজের সঙ্গে কাটাই। আধাঘণ্টা সাঁতার কাটি। পৌনে বারোটায় বাসায় ফিরে আসি, চিঠি এলে পড়ি, দুপুরের খাবার খাই। বিকেলে স্কুলের জন্য প্রস্তুতি নিই, পড়াতে যাই নয়তো নিজে পড়তে বসি।”
এটাও জানা গেছে যে, তিনি রুটিনমাফিক বিকেল সাড়ে পাঁচটায় স্কচ গিলতেন। শুতে যেতেন রাত দশটায়। দিনের ফাঁক-ফোঁকরে পুশ-আপ আর সিট-আপের মতো ব্যায়ামও সেরে নিতেন।
আমাদের আরেক ঔপন্যাসিক-লেখক হাসনাত আবদুল হাইও দিনের নির্দিষ্ট সময়ে পড়াশোনা করেন, লেখেন। বিকেলের দিকে তাঁর বাড়িতে একটা ছেলে আসে কম্পিউটারে লেখা টাইপ করতে।
৪. অতএব, প্রতিদিন ব্যায়াম

যদি ব্যায়ামে অরুচি থাকে, তাহলে করোনা-আক্রান্ত চীনের উহান শহরের একজন ম্যারাথন রানারের গল্প বলছি, শুনুন। তিনি এখনও প্রতিদিন ৩১ মাইল করে দৌড়ান। কোথায় দৌড়ান জানেন? নিজের ডাইনিং টেবিলের চারপাশটা হচ্ছে তার দৌড়ানোর ট্র্যাক।

আপনি লেখক হয়েছেন বলে জবুথবু হয়ে থাকবেন না। প্রতিদিন নিয়ম করে ব্যায়াম করবেন। এ ব্যাপারে মনে করতে পারি প্রখ্যাত জনপ্রিয় জাপানি ঔপন্যাসিক হারুকি মুরাকামির কথা। তিনি ২০০৪ সালে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “উপন্যাস লেখার মেজাজে যখন থাকি, তখন প্রতিদিন ভোর ৪টায় উঠে পড়ি এবং ৫-৬ ঘণ্টা লেখার কাজ করি। বিকেলে ১০ কিলোমিটার দৌড়াই বা ১৫০০ মিটার সাঁতার কাটতে যাই (অথবা দুটাই করি), এরপর একটু পড়াশোনা করি, গান শুনি। রাত ৯টায় ঘুমিয়ে পড়ি। কোনো প্রকার এদিক-ওদিক না করেই এই রুটিন অনুসারে আমি চলি। এভাবে রুটিন মেনে অভ্যস্ত হওয়াটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। রুটিন করে কাজ করাটা আমার কাছে মূলত আত্ম-সম্মোহনের মতো। মনের গভীরতর স্তরে পৌঁছুবার জন্য আমি নিজেকে এভাবে আত্ম-সম্মোহিত করি।”
এমন হয়তো হতে পারে, আপনার ঘরে ব্যায়ামের পর্যাপ্ত স্পেস নাই। তাতে কী। এমন কিছু ব্যায়াম আছে যা খুব স্বল্প জায়গায়, এমনকি বিছানায় বসেও করা যায়। যোগব্যায়াম তো অনায়াসে বিছানায় বা খুব অল্প জায়গায় করা যায়। তীরন্দাজ-এর সম্পাদক কবি-প্রাবন্ধিক মাসুদুজ্জামান একবার বলছিলেন তিনি নিয়মিত সাঁতার কাটেন, দৌড়ান। কিন্তু যখন এটা সম্ভব হয় না তখন যোগব্যায়াম করেন। কবি সরকার আমিনেরও নিয়মিত সাঁতার কাটার অভ্যাস আছে। আরও অনেক লেখকই যে ব্যায়াম বা সাঁতার কাটেন, দৌড়ান, সেটা অস্বাভাবিক নয়। এতে শরীর ও মন ঝরঝরে থাকে। না হলে দেখবেন, মন ও শরীর ভারী ও অবস্বাদগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। এতে কাজের প্রচণ্ড ক্ষতি হবে, যা হয়তো আপনি টেরই পাবেন না। ব্যায়াম তো নানা রকম হয়। আপনি আপনার রুচিমাফিক ব্যায়াম বেছে নিতে পারেন। আমি প্রায় সারাদিন ঘরে কাটাই। সার্বক্ষণিকভাবে লেখালেখি করার জন্যই এরকম জীবন বেছে নিয়েছি। আমি প্রতিদিন পুশ-আপ আর নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম করি। যেমন নাক দিয়ে পেট ফুলিয়ে জোরে জোরে নিঃশ্বাস নেয়া ও ছাড়া। নাক দিয়ে বাতাস নিলে বাতাস গরম থাকে বলে গলা ও ফুসফুসের জন্য এই গরম বাতাস আরামদায়ক। মস্তিষ্কও এতে প্রচুর অক্সিজেন পায়, সহজেই সতেজ অনুভব করা যায়।
এরপরও যদি ব্যায়ামে অরুচি থাকে, তাহলে করোনা-আক্রান্ত চীনের উহান শহরের একজন ম্যারাথন রানারের কথা বলছি, শুনুন। তিনি এখনও প্রতিদিন ৩১ মাইল করে দৌড়ান। কোথায় দৌড়ান জানেন? নিজের ডাইনিং টেবিলের চারপাশটা হচ্ছে তার দৌড়ানোর ট্র্যাক।
৫. ইন্টারনেট আপনার শত্রু
সামাজিক যোগাযোগ এখন ইন্টারেট ছাড়া প্রায় অসম্ভব। বাসায় একা, আইসোলেটেড থাকছি—এতে আরো বেশি যোগাযোগ হচ্ছে বন্ধু-বান্ধবদের সাথে, পুরো বিশ্বের সাথে। সামাজিক মাধ্যমে সচেতনতার বিষয়টি ইতিবাচক হলেও নেতিবাচক দিকগুলো ব্যক্তি-মানসিকতায় প্রভাব ফেলছে। গুজব ছড়ালে, আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সচেতন ও সাবধান করার চাইতে আতঙ্ক ছড়ানো উৎসাহীদের সংখ্যা নিতান্ত কম নয়। ফেসবুক তো এখন গুজবের ডিপো হয়ে উঠেছে। গোপন তথ্য ফাঁস করার নামে অনেকেই জেনেশুনে বা না-জেনে গুজব ছড়ান। সংকটের সময় এই গুজব ডালপালা মেলে বেশি। এরকম পরিস্থিতিতে আমরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ি।

অস্ট্রেলীয় লেখক বেঞ্জামিন ল সবার জন্য একটা অ্যাপস সাজেস্ট করেছেন। অ্যাপটার নাম ‘ফরেস্ট’। এই অ্যাপসটির মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ইন্টারনেটকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বন্ধ রাখা যায়। এতে আপনি কখন কি করবেন সেটা নির্দিষ্ট করে রাখতে পারবেন।

এরকম কিছু ঘটলে আমরা তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। আমরা যা পারি তা হলো নিজেদেরকে নিয়ন্ত্রণ করতে। নিজেকেই নিজের বিচার-বিবেচনা-বুদ্ধি দিয়ে বুঝতে হবে কোন তথ্যটি আসলে সঠিক হতে পারে, কোনটা নয়। ব্যক্তিগতভাবে কেউ সোস্যাল মিডিয়ায় অকাট্য প্রমাণ ছাড়া কিছু দিলেই বিশ্বাস করবেন না। অর্থাৎ, ইন্টারনেট থেকেও আমাদের দূরে থাকার দরকার আছে। ইন্টারনেট থেকেও আমাদের সেলফ-কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে। এ নিয়ে অনেক লেখকের কথা বলা যায়। আমাদের দেশে বেশ কিছু লেখক আছেন যাদের ফেসবুক নাই। থাকলেও খুব সীমিত সময়ের জন্য তাঁরা ফেসবুক চালান। সেলিনা হোসেনের নামে একটা ফেসবুক আছে, কিন্তু তিনি নিজে সেই ফেসবুকটা খোলেনও নি, চালানও না। ইংল্যান্ড প্রবাসী শাহাদুজ্জামানের ফেসবুক আছে ঠিকই, কিন্তু কালেভদ্রে ফেসবুক দেখেন তিনি। মঈনুস সুলতান, আমাদের আরেক জনপ্রিয় লেখক। থাকেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। তাঁরও ফেসবুক আছে। কিন্তু কখনো ফেসবুক ব্যবহার করেন না। তিনি যোগাযোগের জন্য ইমেইল ব্যবহার করেন। এই সময়ের বেস্টসেলিং ও পুরস্কারজয়ী ঔপন্যাসিক জেইড স্মিথ। শুনলে হয়তো বিস্মিত হবেন, তাঁর নিজের কোনো স্মার্টফোন নেই। মার্কিন ঔপন্যাসিক ও প্রাবন্ধিক জোনাথন ফ্র্যাঞ্জেনের লেখার ঘরে কোনো ওয়াইফাই কানেকশন নাই। কম্পিউটারে লেখেন বটে কিন্তু ইন্টারনেটের সংযোগ থাকে বিচ্ছিন্ন।
অস্ট্রেলীয় লেখক বেঞ্জামিন ল সবার জন্য একটা অ্যাপস সাজেস্ট করেছেন। অ্যাপটার নাম ‘ফরেস্ট’। এই অ্যাপটির মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ইন্টারনেটকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বন্ধ রাখা যায়। এতে আপনি কখন কি করবেন, সেটা নির্দিষ্ট করে রাখতে পারবেন। আমার জানা আরেকটা অ্যাপ আছে এরকম, নাম ‘ফ্রিডম’। এই অ্যাপটি একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ইন্টারনেট বন্ধ করে রাখে (সাধারণত প্রতিদিন ৩-৫ ঘণ্টা)। আপনি কখন নেট থেকে বিচ্ছিন্ন থাকবেন, কখন কাজ করবেন, এর মাধ্যমে ঠিক করে নিতে পারেন। কাজ করার জন্য সকালবেলাটাই ভালো। এই সময়ে ইন্টারনেট থেকে বিচ্ছিন্ন থেকে আপনি ফ্রেশ মুডে দিনের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলি, লেখালেখি করতে পারেন। এই অ্যাপগুলোর ফাংশান সত্যি ইন্টারেস্টিং।
৬. বিচ্ছিন্নতাই জীবন
প্লেগ যখন অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছিল, শেক্সপীয়র তখন সেল্ফ-কোয়ারেন্টিনে ছিলেন। ধরে নিতে পারি, আমরা সবাই এখন সেরকম সেলফ-আইসোলেশনে আছি। কোয়ারেন্টিনে আছি। এতে আতঙ্কিত হবেন না। মন খারাপও করবেন না। নিজের দিক থেকে সবসময় পজিটিভ থাকুন। প্লেগ যখন মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছিল তখন শেক্সপীয়রও ছিলেন সেল্ফ-কোয়ারেন্টিনে। আর সেই দিনগুলোতে তিনি লিখে ফেলেছিলেন তাঁর বিখ্যাত ট্র্যাজেডি ‘কিং লিয়ার’। নিজের বুদ্ধি-বিবেচনা অনুসারে সময়টাকে আপনিও কাজে লাগান। অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও ভালো কাজ এই অবসরে করে ফেলা সম্ভব। অন্তত দীর্ঘদিন জমে থাকা নিজের অসমাপ্ত লেখাগুলো লিখে ফেলুন। পড়ে ফেলেন সেইসব বই যা এতদিন আপনার পড়া হয়ে ওঠেনি। অথবা নতুন বড় কোনো পরিকল্পনা করে লিখে ফেলুন কোনো উপন্যাস বা প্রবন্ধের বই অথবা করে ফেলুন অনুবাদ।
একটাই কথা, এই দুঃসময়ের অবসান হবে। আপনি তাই নির্ভার থাকুন আর সময়টাকে কাজে লাগান। সবার মঙ্গল কামনা করছি।
[এই লেখাটির নানান তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন তীরন্দাজ-এর সম্পাদক কবি-প্রাবন্ধিক মাসুদুজ্জামান। কৃতজ্ঞতা তাঁর প্রতি।]