রবিউল হুসাইন > প্রিয় ছেলেবেলা আমার >> স্মৃতিচারণ

0
167

প্রিয় ছেলেবেলা আমার

[সম্পাদকীয় নোট : কবি ও স্থপতি রবিউল হুসাইন গত ২৬ নভেম্বর মৃত্যুবরণ করেছেন। তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে পাঠকদের উদ্দেশে প্রকাশিত হলো তাঁরই ছেলেবেলার স্মৃতিচারণ। তীরন্দাজ তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করছে।]

তুমি গাছে দাঁড়িয়ে গান গাইছিলে, ওরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনছিল। তারপর আমার কাছে এসে জানতে চায় ওই গায়ক ছেলেটি মানে তুমি কে, কী করো, ইত্যাদি। আমি কারণ জিজ্ঞেস করতে ওরা বললো, ওরা তোমাকে যাত্রা-দলে নিতে চায়। বহুদিন ধরে ওরা কৃষ্ণের ভূমিকায় তোমার মতো ছোট্ট বয়সের কালো একটি ছেলেকে খুঁজছে যার আবার গানের গলাও আছে। তোমাকে খুব পছন্দ। একটি মাসোহারাও দিতে চায়।

মানুষের জীবনে ছেলেবেলাই সবচেয়ে বৈশিষ্ট্যময়। জন্মের পর প্রাথমিক অবস্থায় জীবন যখন পরিবেশ-পরিস্থিতির সঙ্গে বাবা-মায়ের তত্ত্বাবধানে বিকশিত এবং আস্তে আস্তে হাঁটা-চলা শেখার সঙ্গে সঙ্গে বোধ-অনুভবের জন্ম হতে থাকে, তখন থেকেই ছেলেবেলার শুরু। পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের স্পর্শ-সুখ, যার প্রতিটিতেই নতুন নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চারিত, এই প্রারম্ভিবকালেই প্রাপ্তিলাভ ঘটে। এ কারণে ছেলেবেলা দুঃখ-শোকের আকর যেমন, তেমনি হাসি-আনন্দেরও অফুরান উৎস। সারাজীবন তাই ছেলেবেলার স্মৃতি একজন জীবিত মানুষকে বয়ে বেড়াতে হয়। বলা হয়ে থাকে, যার জীবনে ছেলেবেলা যত চমকপ্রদ এবং আনন্দ বা দুঃখময় অথচ বৈচিত্র্যময়, তিনি পরবর্তী জীবনে ততই ঋদ্ধবান ও বাস্তব-সংগ্রামের বিরুদ্ধে সাহসী ভূমিকা রাখতে সক্ষম হন।
আমার ছেলেবেলা খুবই আনন্দের আবার খুব দুঃখেরও। গ্রামে জন্ম, নানার বাড়িতে। তখনকার বৃহত্তর যশোরে, এখনকার ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা থানার রতিভাঙ্গা গ্রামে। ওপারে বসন্তপুর, এপারে আমাদের গ্রাম। গ্রামের পাশেই কালী নদী। বর্ষাকালে জন্ম-অজগর, ঘোলা মাটির রঙের প্রবাহিত পানি, শীতে নীল বালি চিকচিক বিশাল চর, হাঁটু জল, গ্রীষ্মে দাপাদাপি জলে, সারাদিন নদীতে কাটিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে, পরে বাড়িতে এসে বাবার বকুনি, মায়ের সস্নেহ আশ্রয়—কত কত মন-জাগানিয়া ঘটনা। এখন সেই গ্রামে যাওয়া একেবারেই হয় না। ইসলামী বিশ্ববিদ্যায়ের পুবদিকে মাইল পাঁচেক গেলেই আমাদের গ্রাম। প্রকৃতপক্ষে বড় হয়ে গেলে, তখন আদি গ্রামে যদি বাবা-মা বা নিজেদের জমিজমা না থাকে তাহলে কখনও সেখানে যাওয়া হয়ে ওঠে না। আমার বেলায় তাই হয়েছে। উপরন্তু আমদের গ্রাম থেকে কুষ্টিয়া শহর নিকটবর্তী বলে আমার বাবা কুষ্টিয়া শহরে থিতু হন। স্কুল-কলেজ জীবন কুষ্টিয়া শহরে কাটানোর পর ঢাকা শহরে আসি। তখন থেকেই এই রাজধানী। শহরের কোলে জীবনপাত করছি। তাই বলা যায়, বর্তমানে আমি উদ্বাস্তুর মতোন।
যশোরের, না কুষ্টিয়ার, না ঢাকার অধিবাসী আমি। এ এক অদ্ভুত অবস্থা আমার। মনে হলে এসব, আমার নিজেকে একটি খাঁটি ত্রিভুজ বলে মনে হয়। কিন্তু আমার একান্ত ইচ্ছা ছিল একটি গোলাকার বৃত্ত হওয়ার।
বাবার পুলিশের চাকরি। কয়েক বছর পরপর বদলি হওয়া প্রথায় পরিণত। তখন আমি খুব ছোটো। মনে পড়ে, কোথায় যেন আমাদের বাসার কাছে একটা বিশাল বটগাছ ছিল। সেই গাছে ছিল অসংখ্য মুখপোড়া হনুমান। ওদের শরীরের পেছনে লম্বা বিশাল লেজ ঝুলছে। মানুষের মতো হাঁটাচলা ও স্বভাব। সারা গাছ জুড়ে তাদের সংসার। একজন আরেকজনের মাথার উকুন বেছে দেয়। ছোট ছোট বাচ্চা হনুমান ডানাহীন পাখির মতো এ-ডাল থেকে অন্য ডালে লাফ দিয়ে খেলা করছে। কেউ আবার মাটিতে নেমে খেলছে, দৌড়াচ্ছে। আমি তো আগে এমন দেখিনি। আমার হাতে বোধহয় কোনো খাবার-টাবার ছিল। বাড়ির গেটের সামনে দাঁড়িয়ে খাবার খেতে খেতে হনুমানদের কাণ্ড-কারাখানা দেখছি। হঠাৎ করে আমার চেয়ে বড় আকারের এক বিশাল হনুমান আমার সামনে এসে এক ঝটকায় হাত থেকে খাবার কেড়ে নিয়ে আমার গালের উপর তার কালো হাতের এক থাপ্পড় মেরে দ্রুত চলে গেল। আর আমি তো ভয়ে ভ্যা করে কেঁদে উঠলাম। সবাই তড়িঘড়ি করে দৌড়ে এসে হনুমান আর আমার কাণ্ড-কারখানা দেখে হাসবে না কাদবে, এই নিয়ে মহাচিন্তায় পড়ে গেল। কিন্তু ব্যাপারটি দেখে সবাই হেসে অস্থির। তখন আমার কী গোস্বা! আমি আরও চিৎকার করে কেঁদে উঠি।
এখানে আর একটি ঘটনা ঘটেছিল। সেটা হচ্ছে আমার এক চাচার সাইকেল নিয়ে। একদিন সেই সাইকেলের পিছন-সিটে বসিয়ে তিনি আমাকে নিয়ে বেড়াতে বের হলেন। বেড়ানো মানে একটি মাঠের চারদিকে ঘোরা। সাইকেলে উঠিয়ে তিনি সাবধান করে দিলেন কীভাবে বসতে হবে, পা বাইরে থাকবে, ইত্যাদি। আমি তো মহানন্দে বসলাম, আর তিনি সাইকেলে চড়ে চালাতে শুরু করলেন। জীবনের প্রথম সাইকেল চড়া। স্বভাবতই আমি খুব উৎফুল্ল। অন্যান্য খেলার সঙ্গীরা তো আমার দিকে জুলজুল করে চেয়ে আছে। আমার একটু একটু গর্ববোধও হচ্ছে, যেন হাওয়ায় ভেসে যাচ্ছি। এরপর হঠাৎ তীব্র ব্যথায় চিল্কার করে কেঁদে উঠলাম। সবাই অবাক। কী হলো, কী হলো। চাচা তো সঙ্গে সঙ্গে নেমে পড়লেন এবং দেখলেন আমার ছোট্ট বাম পা-টা সাইকেলের চাকার স্পোকের মধ্যে গিয়ে বেশ খানিক কেটে গিয়ে চামড়া ছিলে গেছে এবং দর দর করে রক্ত ঝরছে। তিনি আমাকে কোলে নিয়ে দৌড়ে আমাদের বাসায় গিয়ে মায়ের কাছে পৌঁছে দিলেন। সাইকেলটা কাঁত হয়ে সবুজ ঘাসে ঢাকা মাঠে পড়ে থাকলো। সবাই আমাকে নিয়ে অস্থির। সঙ্গে কান্না তো চলছেই। এরকম কত যে ঘটনার ঘটনায় ছেলেবেলা কেটেছে। আমি দুরন্ত আবার শান্তও ছিলাম। গাছে চড়ে ফল পাড়ার অভ্যাস ছিল। নারকেল গাছে চড়ার প্রতিযোগিতা হতো। কে আগে উঠতে পারে। সাঁতারেও পটু ছিলাম। গ্রীষ্মের ছুটিতে প্রায়ই গ্রামে বেড়াতে যেতাম। একই গ্রামে দাদা-নানাদের বাড়ি। গ্রামের সামনে নদী এবং পেছনে গ্রীষ্মকালে ফসলের মাঠ হয়ে যেতো বিস্তীর্ণ জলাভূমি নিয়ে অথৈ জলের বিল। বিলের পানি নদীতে পড়তো জলপ্রপাতের মতো। নদীর পানি আগে শুকিয়ে যেত। কিন্তু বিলের পানি থাকতো। উপরন্তু জমির পানির উচ্চতা নদীর পানির চেয়ে বেশি হওয়াতে বিলের পানি নদীর মধ্যে পড়ে এক জলপ্রপাতের অবস্থা হতো। বিলের পানি যখন একদম শুকিয়ে যেত তখন মধ্যমাঠে বিশাল এলাকা জুড়ে কাদাপানি থাকতো। সেখানে সবাই সর্বাঙ্গে কাদা মেখে জাল, মাছ ধরার সড়কি, পোলো নিয়ে সারাদিন জিয়ল-কই-বাইন-বোয়াল-কাতলা সব ধরা যেন এক কাদাপানির মহোৎসব ঘটতো সেখানে। আমিও তাই করতাম, কাদা মেখে ভূত হতাম। আমার নানা ছিলেন আমাদের গ্রামের প্রাইমারি স্কুলের হেডমাস্টার। খুব আয়েশি ছিলেন। অনেক জমিজমার মালিক এবং স্বভাবে চুপচাপ, কম কথা বলতেন। কাচারি-ঘরে রানি ক্লিওপেট্রার মতো কাঁত হয়ে মাথায় হাত ঠেকিয়ে প্রায় শুয়ে-বসে থাকতেন। তখন ইংরেজ আমল শেষে পাকিস্তানের প্রথম সময়। ডাকে আসা ‘আজাদ’ নামক অধুনালুপ্ত খবরের কাগজ পড়েই নানা বেশি সময় কাটাতেন, বিশেষ করে স্কুল করে এসে। একদিন খুব মজার ঘটনা হয়। আমি কাচারি ঘরের সামনে একটি লিচু গাছে চড়ে লিচু খাচ্ছি আর গান গাইছিলাম জোরে-জোরে। পাশ দিয়ে দেখি একদল লোক নানা রকম বাদ্য-বাজনার যন্ত্র নিয়ে পথ পার হচ্ছে। খেয়াঘাটের রাস্তাটা নদী থেকে নানা বাড়ির কাচারি ঘরের সামনে দিয়ে বেঁকে গেছে। সবাইকে ওই পথে যেতে হয়। আমি খেয়াল করিনি। লোকগুলো চলে যাচ্ছে আমার দিকে তাকাতে তাকাতে। আমি কিছু পরে প্যান্টের পকেটে অনেক লিচু নিয়ে গাছ থেকে নেমে পড়লাম। আমাকে দেখে নানা বললেন, বেঁচে গেছো ভাই খুব। এখনই তোমাকে ওরা নিয়ে যেতো ওদের সঙ্গে। আমি বললাম, কেন, ওদের সঙ্গে যাব কেন? তিনি হাসতে হাসতে বললেন, ওরা যাত্রা করে। কৃষ্ণ-লীলা, বেহুলা-লখিন্দর, জরিনা সুন্দরী। তুমি গাছে দাঁড়িয়ে গান গাইছিলে, ওরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনছিল। তারপর আমার কাছে এসে জানতে চায় ওই গায়ক ছেলেটি মানে তুমি কে, কী করো, ইত্যাদি। আমি কারণ জিজ্ঞেস করতে ওরা বললো, ওরা তোমাকে যাত্রা-দলে নিতে চায়। বহুদিন ধরে ওরা কৃষ্ণের ভূমিকায় তোমার মতো ছোট্ট বয়সের কালো একটি ছেলেকে খুঁজছে যার আবার গানের গলাও আছে। তোমাকে খুব পছন্দ। একটি মাসোহারাও দিতে চায়। নানা মজা পেয়ে বললেন, তুমি যদি যেতে চাও তো বলো এখনই ডাকি। আমি ধুত করে উঠলাম। বললাম, নানা বলেন না এরপর কী হলো? নানা তখন বললেন যে, ওরা জিজ্ঞেস করলো তোমার বাবা কী করে। আমি তোমার পুলিশ বাবার কথা বলাতে ওরা ‘ওরে বাবা’ বলে তাড়াতাড়ি চলে গেলো। এই কথা
বলে নানা হেসে গড়িয়ে পড়েন। এরপর আমার মামা-মামি আর বন্ধুরা অনেকদিন ধরে কেষ্ট ঠাকুর বলে আমাকে ক্ষ্যাপাতো।
নানা-দাদাদের ছিল বেশ বড়-সড় ফলের বাগান। আম, জাম, কাঠাল, লিচু, সুপারি, নারকেল, বরই কত কি। কাঁঠাল গাছে প্রায়ই বর্ষাকালে বজ্রপাত হতো। কত যে বজ্ৰদগ্ধ কাঠাল আর তার গাছ দেখেছি তার ঠিক নেই। পাশে বয়ে যাওয়া কালী নদীতে বর্ষাকালে প্রচণ্ড স্রোত থাকতো। গ্রামের মানুষ মাছ ধরার জন্য বাঁশের বাঁধ দিতো। কত রকম যে মাছ সেই বাধে ধরা পড়তো। তখন সবসময় যেন এক উৎসব লেগে থাকতো। আবার গরমকালে থাকতো নদীতে হাঁটু পানি। সারাদিন পানিতেই প্রায় থাকতাম। চাচা-মামারা আমাকে বলতেন, মানুষ না, ও একটা মাছের জাত। নদীর শুকনো বুক জুড়ে বিকালবেলায় ছোট-বড় সবাই খেলতে কিংবা বেড়াতে বের হতো। বর্ষাকালে আবার এই নদীরই এক পাড় ভেঙে পড়তো সশব্দে। মাঝরাতে জেগে উঠলে ভয়ে আর ঘুম হতো না, বিশেষ করে নদীর ভেতর বিশাল মাটির দলা ভেঙে পড়ার শব্দে। অনেকে এর মধ্যেই ভরা বর্ষাকালে সাঁতরিয়ে নদীর এপাড়-ওপাড় করতো। আমিও একবার ওরকম ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম অতি উৎসাহে। পরে ঘূর্ণিজলে যখন ঘুরপাক খেয়ে পানিতে তলিয়ে যাচ্ছিলাম, তখন পাড় থেকে আমার এক মামা ঝাঁপিয়ে পড়ে আমাকে উদ্ধার করেন। ছেলেবেলার সোনালি দিনের অসংখ্য মজার স্মৃতি মনে পড়ে। এ এক অফুরন্ত স্মৃতির দীর্ঘ ভ্রমণ, যেটাকে ইংরেজিতে নস্টালজিয়া বলে। এই শব্দের প্রকৃত অর্থ করতে গেলে বাংলা ভাষায় বলা যায় এটাকে স্মৃতিভারাতুর নষ্ট ডোবাজলের অস্তিত্ব হিসেবে। নস্টালজিয়া অর্থাৎ নষ্ট জলের ক্রিয়া-বিক্রিয়া। নষ্ট অর্থাৎ যে সময়টি নষ্ট বা অতীত হয়ে গেছে সেই সময়ের কথা। ইংরেজি নস্টালজিয়া শব্দটি দুটি লাতিন শব্দ থেকে এসেছে। একটি নসটস অর্থাৎ প্রত্যাবর্তন আর একটি আলজস অর্থাৎ যন্ত্রণা। মনে পড়ার যন্ত্রণা। আসলে তাই অতীত দিনের কথা মনে পড়লে মনটি ব্যথায় কুঁকড়ে যায়। লেখাপড়া বাদে যে কর্মকাণ্ড একটি মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য জরুরি, বিনোদন বা খেলাধুলো এই কর্মকাণ্ডে পড়ে। ছেলেবেলার এই কর্মকাণ্ড খুবই আকর্ষণীয় ও স্মৃতিভারাতুর। যেদিন চলে গেছে সেদিন কখনও ফিরে আসবে না। যেহেতু মানুষের জীবনকাল একরৈখিক, উলটো করে ঘোরানো যায় না। যেটুকু করা যায় তা শুধু স্মৃতি ও স্মরণের উপত্যকায় যাওয়া-আসা সময়ের মাধ্যমে। সাপ নিয়ে বেশ কয়েকটি কাহিনী আছে আমার ছোটবেলায়। আগেই বলেছি গাছে ওঠা খুব শখ ছিল। তখন আমরা কুষ্টিয়ার মেহেরপুরে থাকতাম। সেখানকার ফুটবল খেলার মাঠের দক্ষিণ দিকে একটি কেয়া বন ছিল। সেখানে যখন ফুল ফুটতো তখন চারিধারটা বুনো গন্ধে ম-ম করে উঠতো। আমার ইচ্ছে হলো সেখানে গিয়ে ফুল নিয়ে আসার। যেমনি ভাবা তেমনি কাজ। তর তর করে পেঁপে গাছের কাণ্ডের মতো ডাল নাকি শেকড় বেয়ে ধারালো চওড়া আর লম্বা সবুজ কাঁটাভরা বড়-বড় পাতার ফাঁক-ফোকর দিয়ে উঁচুতে উঠে শাদা ফুল দেখলাম বিশাল কলার মোচা যেন, বেশ ফুলের সুবাস চারিদিকে। কেয়া গাছের তাল খুব নরম। সাবধানে আস্তে আস্তে উঠে যেই ফুলের গায়ে হাত দিতে যাব, দেখি একটা কালো সাপ কুণ্ডলী পাকিয়ে ফুলের নিচের দিকে জড়িয়ে শুয়ে আছে। আমি তো দেখে দুই তিন লাফে নিচে নেমে ভোঁ-দৌড়। পরে শুনেছি কেয়া ফুলের মন-মাতানো সুবাসের আকর্ষণে সাপ চলে আসে। আমি আগে তা জানতাম না। আর একবার ঘটনা হয়েছিল পুকুরে সাঁতার কাটার সময়। বর্ষাকাল। সেটা বোধহয় আলমডাঙ্গায়। সবার সঙ্গে পুকুরে নাইতে নেমেছি। নতুন সাঁতার শিখেছি। প্রচুর উৎসাহ। সাঁতার দিয়ে একবার এপাড়ে আর একবার ওপাড়ে যাওয়া-আসা করছি। অনেক মানুষ স্নান করতে নেমেছে। বন্ধুরাও আছে। আমি একটু বিশ্রাম নিয়ে আবার পাড় থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে সাঁতার শুরু করেছি। অন্যরা যেভাবে করে। সাঁতার কেটে কেটে সামনের দিকে যাচ্ছি। মাঝ পুকুরে হঠাৎ দেখি পানির মধ্যে একটা সাপ আমার দিকে হেলেদুলে আসছে। আমি সঙ্গে সঙ্গে বিপরীত দিকে ঘুরে প্রাণপণে সাঁতরে কূলে পৌঁছানোর চেষ্টা করতে থাকলাম। মনে হচ্ছিল যেন এখনই আমার ঘাড়ের উপর সাপ চলে আসছে। সে যে কী ভয়, বলে বোঝানো যাবে না! পাড়ে কিছুতেই পৌঁছুতে পারছি না, হাজার চেষ্টা করে আপ্রাণ সাঁতরিয়েও। পরে একসময় পৌঁছে উপরে উঠে পুকুর পাড়ে ঘাসের উপর চিৎ হয়ে শুয়ে হাঁপাতে থাকলাম। সাপটা দেখি অনেক দূরে তখনও। সাপের সঙ্গে সাঁতার প্রতিযোগিতায় প্রথম হই, কিন্তু তা প্রাণের ভয়ে এই যা!
গাছে ওঠার স্মৃতিও চমকপ্রদ বলা যায় আমার। গাছে উঠে উদাস দুপুরে টারজান বা বাদরের মতো এডালে-ওডালে ঝুলে কত যে লাফিয়েছি তার ঠিক নেই। পেয়ারা, আম, জাম, ডাব, লিচু-এসব গাছে ছিল আমার স্বচ্ছন্দ ভ্রমণ। একবার হয়েছে কী, আমার দুই বন্ধুকে নিয়ে ডাব চুরি করতে বেরুলাম। তখন ভরদুপুর। চারিদিক জনমানবশূন্য। চুরি করার মোক্ষম সময়। গরম কাল। আমাদের বাড়িতে সবাই খেয়েদেয়ে গড়াগড়ি দিচ্ছে। ছুটির দিন। এই ফাঁকে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। হাতে একটা পাটের থলি বা বস্তা। আমি গাছে উঠবো আর ওরা দু’জন দু’দিকে দুই হাতে থলি ধরে উপরের দিকে তাকিয়ে থাকবে। গাছের উপর থেকে দেখে নিচে আমি ডাব ফেলব ধরে থাকা মেলে দেয়া থলি বরাবর। ওরা এমনভাবে ধরবে যাতে ডাব মাটিতে না পড়ে। পড়লে ফেটে ডাবের সব পানি বেরিয়ে যাবে আর খুব শব্দ হবে। শব্দ হলেই তো মুশকিল! গাছে উঠে সেইমতো ডাব ফেললাম নিচে। কিন্তু ওরা ধরতে না পেরে ডাব ফস্কে মাটিতে পড়ে গেল এবং সঙ্গে বিকট আওয়াজ! বন্ধুরা তো ঝেড়ে দৌঁড়! আমি তো গাছের মাথায়! ডাব পড়ার সঙ্গে সঙ্গে একজনের আওয়াজ, কে রে? মানে বাড়ির মালিকের কণ্ঠস্বর। তিনি টের পেয়ে গেছেন। একটু পরই তিনি তো হাজির। নিচে দেখেন ডাব পড়ে আছে এবং পাটের থলিটাও। বন্ধুরা বস্তাটা নিতে পারেনি। তিনি সব বুঝে উপরের দিকে তাকালেন। কে তুমি? আমি উত্তর না দিয়ে চুপ। আবার বললেন। আমি না বলে পারলাম না। কারণ, তার জন্য যত না, আমার আব্বার জন্য ভয় বেশি। যদি তিনি জানতে পারেন তাহলে আমায় আস্ত রাখবেন না। আমি পরিচয় দিলাম। তিনি শুনে ছি-ছি করে উঠলেন। ভদ্রলোকের ছেলে তোমার এত অধঃপতন! এসো নিচে নেমে এসো। আমি তো সড়াৎ করে নিচে নেমে এলাম। তিনি বিধ্বস্ত আমাকে দেখে হুম্ করে উঠলেন এবং বললেন, কখনও ভবিষ্যতে এরকম করবে না, বুঝেছো। আমি শান্ত ছেলের মতো ঘাড় নাড়লাম। তিনি খানিকক্ষণ চুপ করে থাকলেন। পরে বললেন, আবার গাছে ওঠো এবং সব ডাব পাড়ো। আমি বাধ্য হয়ে গাছে উঠলাম। উপর থেকে দেখি দু’জন লোক থলি ধরে নিচে দাঁড়িয়ে। সব ডাব এভাবে পাড়া হলো ওপর থেকে থলির উপর ফেলে। এবার তিনি নামতে বললেন আমাকে। আমি নিচে নামতেই বললেন, শোনো, এই নাও। আর কখনও এসব করো না। তিনি আমাকে দুটো ডাব দিলেন। আমি হাসবো না কাঁদবো, বুঝে উঠতে পারলাম না। এই ঘটনা ঘটেছিল মেহেরপুরে। আমাদের বাসা সংলগ্ন একটি বেশ বড় আম বাগানে, কোনো এক ভরদুপুরে।
এরপর কুষ্টিয়া শহরের থানা পাড়ায় আমরা যখন থাকি তখন একটি কাণ্ড ঘটেছিল এই ডাব চুরি করা নিয়ে। অনেক রাতে বাসায় পাঁচিল টপকিয়ে আমরা কয়েকজন মিলে ডাব চুরি করতে বেরিয়েছি। আমিই গাছে উঠেছি। নিচে সবাই। হঠাৎ উঁহু করে সড়-সড় করে নিচে নেমে আসি। সবাই অবাক, কি হলো? ঘুটঘুটে অন্ধকার। মফস্বল শহর, পঞ্চাশের দশক। তখন বিদ্যুৎ আসেনি রাস্তায়। ব্যাপারটা কী, আসলে গাছটা বিষ পিপঁড়ায় ভর্তি। আমি তো আর দেখিনি অন্ধকারে। আমার ঠোঁট কামড়ে দিয়েছে। তীব্র যন্ত্রণার সঙ্গে সঙ্গে দেখি আমার নিচের ঠোঁট ফুলে বেলুনের মতো হয়ে গেল। তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরে গেলাম। আবার সেই পাঁচিল টপকে ভিতরে। তখন আমার দাদী বেঁচে ছিলেন। তিনি টের পেয়ে জেগে উঠলেন। হেরিকেনের আলো উস্কে আমার চেহারা দেখে চমকে গেলেন। তাড়াতাড়ি পানের বাটা থেকে নিয়ে আমার ঠোটে লাগিয়ে দিলেন। বললেন হাসতে হাসতে, এত রাতে ঠিক হয়েছে, দুটু শাস্তি বিষ্টু দিয়েছে।
অমি খেলাধুলায় খুব উৎসাহী ছিলাম। ফুটবল, ক্রিকেট, হকি, সাঁতার, দৌড়ঝাপ, সাইকেল চালানো ইত্যাদি প্রায় সব কিছুতে অংশ নিতাম। ফুটবলে ব্যাকে, ক্রিকেটে উইকেটকিপার, হকিতে সেন্টার ফরোয়ার্ডে খেলতাম। এই খেলাধূলা নিয়ে দু-তিনটে ঘটনার কথা মনে পড়ে। ক্রিকেট খেলায় বেশ ভালো ফিল্ডার ছিলাম । কয়েকটা স্মরণীয় ক্যাচ ধরেছিলাম। বেশ কয়েকবার বাউন্ডারি হাঁকিয়েছিলাম। কিন্তু একবার একটা বল উঁচুতে গেলে, আমি তখন ফিল্ডিংয়ে ক্যাচ ধরার সময় ফসকে গেল, তাতে চারিদিকের দর্শকদের দুয়ো-দুয়ো ধ্বনিতে বেশ লজ্জিত হয়েছিলাম। আসলে ক্যাচটা খুব সহজ ছিল। কিন্তু যেই ক্যাচটা ধরতে যাব ঠিক তখনই পশ্চিম দিকের সূর্যের আলো চোখে পড়ে চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়াতে এই কাণ্ড ঘটে। কী আর করা! সাইকেল রেসেও একটা বিপত্তি ঘটেছিল। একমাইলের প্রতিযোগিতা। একেবারে শেষ চক্রে। বন্ধুরা ট্রাকের পাশে দাঁড়িয়ে খুব উৎসাহ দিচ্ছে। আমার গলা শুকিয়ে কাঠ। তাই আমি আমার এক বন্ধুকে একটা রুমাল ভিজিয়ে আমাকে দিতে ইশারা কলাম । সে রুমালটা দিল পরের রাউন্ডে। কিন্তু রুমাল ছিল সম্পূর্ণ শুকনো। সেইটা মুখে দিয়ে যে কী অবস্থা, দম আটকে গলা শুকিয়ে মরে যাওয়ার আগ-মুহূর্ত বলে মনে হয়েছিল। যদিও সেই রেসে আমি প্রথম হয়েছিলাম এতো কষ্টের পরেও। তবে বন্ধুকে খুব গালমন্দ করেছিলাম। পরে সে ক্ষমা চায় নিঃশর্তে। বন্ধুটি এখন নেই। বেশ কয়েক বছর আগে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে। মনে আছে তখন ‘৫৬-৫৭ সাল। কুষ্টিয়া শহরে বিদ্যুৎ আসেনি। সেই সময় প্রথম পুরস্কার হিসেবে হেরিকেন পেয়েছিলাম। খুব খুশি হয়েছিলাম। যদিও বন্ধুরা হাতে হেরিকেন পেছনে বাঁশ বলে হাসাহাসি শুরু করেছিল।
এরপর খুব কষ্টের একটা ঘটনা ঘটে। সেটা ১৯৫৮ সালের কথা। হকি খেলা তখন আমাদের স্কুলে প্রথম বারের মতো চালু হলো। নতুন খেলতে শিখেছি আমরা। একটা স্বীকৃত নিয়ম যে, হকির ব্যাট কোনোভাবেই কোমরের উপরে যাওয়া বলে হিট করতে ওঠানো যাবে না। আগে বলে ব্যাট সবসময় বিলো দি বেল্ট কোমরের নিচে থাকবে। যদি তা না করা হয়, তাহলে সেটা ফাউল বলে গণ্য করা হবে। কিন্তু কী আর করা, মাঠে বেশ খেলছি। সামনে ম্যাট্রিক পরীক্ষা। তবুও খেলা নেশার মতো ছিল আমার কাছে। একটা বল দূর থেকে বেশ উঁচুতে উঠে গেছে। আমি মাটিতে পড়ার অপেক্ষায় আছি, যাতে সেই বল ধরে গোলপোস্টের দিকে নেয়া যায় । ঠিক তখনই কী যে হলো চোখে অন্ধকার! আর কিছুই মনে নেই। পরে জ্ঞান ফিরলে দেখি সবাই আমাকে ধরে পুকুর পাড়ে নিয়ে মাথায় পানি ঢালছে। মুখে প্রচণ্ড
ব্যাথা। ঠোঁট ফুলে গেছে, রক্ত পড়ছে। আমি হাতে একটু পানি নিয়ে চোখে-মুখে দিয়ে কুলকুচি করে ফেলতেই দেখি সবুজ ঘাসের ভেতর শাদা মতো কী যেন! ভালো করে তাকাতেই বুঝে ফেলি আমার সামনের একটা দাঁত গোড়া থেকে সম্পূর্ণ উপড়ে পড়েছে। তখন আমার বয়স ১৪-১৫ বছর। পরে বাসায় গেলে রাশভারি বাবার মুখোমুখি হই। তিনি খুব রাগি মানুষ। সব শুনে তিনি আমার ওপর একটু সহানুভূতি দেখাবেন, তা না , উল্টো হঠাৎ করে সেই আহত মুখের উপর বিরাশি ওজনের একটা থাপ্পড় দিলেন। ভয়ে আমার সঙ্গী-বন্ধুরা ঝেড়ে ভোঁ-দৌড়! হারামজাদা, তোমার সামনে ম্যাট্রিক পরীক্ষা, আর তুমি হকি খেলা করো, লজ্জা করে না! মা দৌঁড়ে এসে বাবার হাত থেকে আমাকে রক্ষা করলেন। অবশ্য এতকিছু করার পরও ১৯৫৯ সালে ম্যাট্রিকে প্রথম বিভাগে পাশ করেছিলাম। তবে এ ঘটনার পর খেলাধুলা একেবারেই ছেড়ে দিলাম, আর ওই পথের মুখোমুখি হইনি কোনোদিন, আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও। এখন বেশ খারাপই লাগে।
এরপরও কত ছোটবেলার ঘটনা। প্রায় প্রতিবছর বার্ষিক পরীক্ষার পর কুষ্টিয়ার কুমারখালীর পদ্মার পাড়ে রবিঠাকুরের কুঠিবাড়ি, সম্পূর্ণ লাল রঙ বাইরে। ভেতরের সব ঘরের দেয়ালে দেশ-বিদেশ থেকে আসা দর্শনার্থীদের লেখা কালো কয়লা দিয়ে কতশত ঠিকানা আর কত যে নাম- সে বিশাল এক মুরাল বা দেয়ালচিত্রের শিল্পকর্ম, যাকে বলে গ্রাফিত্তি। সেখানে পিকনিক করতাম শীতকালে। পিকনিকের জন্য ছাগল বা মোরগ-মুরগি যা লাগতো সব পাড়ার এবাড়ি-ওবাড়ি থেকে বন্ধু-বান্ধবরা চুরি করে যোগাড় করতো। পুকুর পাড়ের পাশে বকুলতলা সান-বাঁধানো ঘাট যেখানে মাঝেমধ্যে রবি ঠাকুর এসে বিশ্রাম নিতেন, কবিতা লিখতেন, গান বাঁধতেন। আর আমরা কী না যেখানে ছাগল জবাই করে রান্নাবান্না শেষে সারারাত হৈ-হল্লায় আমোদ-ফুর্তি করতাম। সেখানে- এক দারোয়ান থাকতেন তখনো। খুব ছোট থাকতে ঠাকুরজীকে দেখেছিলো সে। বলতো, কী লম্বা-চওড়া দুধে-আলতায় কান্তিবরণ পুরুষ ছিলেন রবিবাবু, অমন দেখা যায় না। সেখানে বেশ কয়েক মাস আগে গিয়ে দেখি এক অন্ধ গায়ক, ধানের তুষ কুলো দিয়ে বাতাসে মেলে দেবার সময় তা দু’চোখের ভেতরে ঢুকে ধীরে ধীরে তার এই অবস্থা, গান গাচ্ছে। দুচোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে- আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে, দেখতে আমি পাইনি। আমার চোখও ভিজে যায়। কুষ্টিয়া থেকে প্রায় ৬ মাইল দূরে, শিলাইদহের কুঠিবাড়ি এখন তো সেখানে যাওয়া কত সহজ। তখন খুব কষ্ট করে রিকশায় যেতে হতো। বেশ কয়েকদিন আগে সেখানে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। দেখে আমি তো অবাক এবং হতাশ। সম্পূর্ণ ভবনটিকে শাদা নাকি ঘিয়ে রঙ করা হয়েছে লাল রঙের বদলে। এর কোনো অর্থ হয়? কোনো ভবনকে মূল থেকে এভাবে পরিবর্তন করা গর্হিত অন্যায় ও এক সাংস্কৃতিক অপরাধ।
এরকম অসংখ্য ঘটনায় ভরপুর আমার ছোটবেলা। মনে পড়ে আমার ছোট ভাইটার মায়ের পেট থেকেই মৃত্যু। সবাই ভীষণ কষ্ট আর দুঃখে খুব কেঁদেছিলাম। এখনও তার কথা মনে এলে কান্না আসে। বেঁচে থাকলে সে আজ কত বড় হতো। বাবার মৃত্যু ১৯৬৪ সালে অমন। তাকে মৃত্যুর সময় দেখিনি। মাটির কবরে শুয়ে পড়েছিলেন কুষ্টিয়া শহরের গোরস্তানে, ঢাকা থেকে আমার আসার আগেই। মা-ও ২০১২ সালে, তার আগে বউ ১৯৯৮ সালে মারা গেছেন।
প্রিয় ছেলেবেলা আমার এরকম এইভাবে কত শত মন-ভাঙা সুখ-দুঃখের স্মৃতি নিয়ে জীবনের এক অমলিন ধূসর-উজ্জ্বল তাপিশ্রী হয়ে আছে।

[সাম্প্রতিক প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত ‘অপ্রয়োজনীয় প্রবন্ধ’ থেকে সংকলিত। সাম্প্রতিক প্রকাশনীর প্রতি তীরন্দাজ-এর কৃতজ্ঞতা।]