রশীদ করীম-এর লেখা ‘সমরেশ বসুর সঙ্গে’ > পাঠ : মাসুদুজ্জামান >> মৃত্যুবার্ষিকী

0
420
রশীদ করীম > সমরেশ বসুর সঙ্গে >> পাঠ : মাসুদুজ্জামান

এই লেখাটির পাঠ শোনার জন্য নিচের লিংকে ক্লিক করুন >>

https://www.youtube.com/watch?v=4atgDrTR0Qg&fbclid=IwAR0xahMPmJcu3tvbQet-P7uiAHnuMyEBVOIVVG9jjdO-PbjMHd9EsyzHRY4

আর পড়ুন এখানে, নিচে >>

খিস্তিখেউড় আর পোস্তার ভাষাকে, গ্রামের মানুষের মুখের জবানকে, ঘষে-মেজে ঝকঝকে তীক্ষ্ণ ধারালো করে আধুনিক জটিল চিন্তা প্রকাশের বাহন করে তাজ্জব বানিয়ে দিলেন। ভাষার এই বিস্ময়কর ভাস্কর আসলে বাংলা গদ্যের এক নতুন ঘরানার জনক।

সমরেশ বসুর লেখার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ঘটিয়ে দেন শহীদ কাদরী। সেই সময় ‘ক্যালটেক্স’ অফিসে আমার কামরাটিতে বসে শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, শহীদ কাদরী, এবং অগ্রজদের মধ্যে মাঝে-মাঝে আবুল হোসেন ও আহসান আহমদ আশক এবং আমি প্রায়ই সারাদিনমান আড্ডায় বসতাম। একবার কি দু’বার সৈয়দ মুজতবা আলীও উপস্থিত হয়েছেন। আমাদের আড্ডার প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল সাহিত্য। রাজনীতি বলে কোন জিনিস আছে — সেটা যেন আমাদের গোচরেই ছিল না। মাঝে-মাঝে অবশ্যই প্রসঙ্গটা অনিবার্যভাবে এসেই পড়তো। বাংলাদেশ হবার পর যেবার সমরেশ প্রথম ঢাকায় আসে, এবং আমাদের পরিচয় হয়, এর ঠিক দু’দিনেই সেই পরিচয় বন্ধুত্বের অন্তরঙ্গতা লাভ করে, তখন আমার অফিসের সেই কামরাটিই সমরেশ বসুর সারাদিনের বাসস্থানে পরিণত হল। বাংলাদেশেও তাঁর অজস্র গুণগ্রাহী ও ‘ফ্যান’। সারাদিনে অগনিত বার আমার অফিসেই সমরেশের কাছে টেলিফোন আসছে। পূর্বাণী হোটেলে ও উঠেছে। সকালের ব্রেকফাস্ট সেরেই সে আমার কাছে চলে আসে। যারা তাঁর সাক্ষাৎ বা সঙ্গপ্রার্থী তাদেরকে টেলিফোন নম্বর দেয়াই আছে। সেটা আমার এই টেলিফোন নম্বর : অফিসের ও বাসার। সমরেশ এক ঘণ্টা দু’ঘণ্টা চার ঘণ্টার জন্য বেরিয়ে পড়ে। আবার আমার অফিসেই ফিরে আসে।
একদিন এক ফাঁকে আমার অপরিচিত দু’জন সঙ্গীকে নিয়ে সমরেশ বসু বেড়িয়ে পড়ে। উদ্দেশ্য যে বাড়িটিতে তাঁর জন্ম, সেটি দেখবে। আমি অফিসের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। দুপুরের পর সমরেশের কণ্ঠ বেজে উঠল টেলিফোনে। খুশিতে উপচে পড়ছে। সত্যিই তাঁর গলার আওয়াজ শুনে মনে হচ্ছিল, সে হঠাৎ একজন বালক হয়ে গেছে। আমি টেলিফোন তুলে ‘হ্যালো’ বলতেই সমরেশ বলল, ‘এই বর!’ আমি তো অবাক। ‘বর’ বলছে কেন? তার মনের ভেতর থেকে যে আনন্দ উপচে পড়ছে টেলিফোনের এপাশে বসেও আমি তার স্পর্শ লাভ করছিলাম। তবু বুঝলাম না, ‘বর’ বলল কেন? আজও জানি না। খুব সম্ভব আনন্দের জোয়ারের সময় লোকে আবোল-তাবোল অনেক কিছু বলে।
টেলিফোনেই বলল, ‘যে বাড়িটিতে আমার জন্ম, দেখে এলাম। চোখ দিয়ে জল গড়াতে লাগলো। মনে হলো আমি এক উলঙ্গ শিশু হয়ে গেছি।’

‘রশীদ করীম, প্রীতিভাজনেষু, এ উপন্যাস আমার রচিত নয়, অতএব এ উপন্যাসের কোন দায়িত্বও আমার নেই, আছে তাঁর যে সমরেশ বসু এই উপন্যাস লিখতে পারেন। বিনীত সমরেশ বসু, ২৪-৩-৭২।’

খাবার জন্য আমরা বাড়িতে এলাম। আমার শেলফে একটি বই ছিল। ‘পাইরেসি এডিশন’। বইটির নাম ‘গোপি-সংবাদ’। লেখক সমরেশ বসু। অপাঠ্য লেখা। সমরেশকে বললাম : ‘এমন একটি উপন্যাস কী করে লিখতে পারলে?’ সমরেশ বইটি উল্টেপাল্টে দেখল। গম্ভীর হয়ে গেছে সে। বইটির একটি পাতা বেছে নিয়ে লিখল : ‘রশীদ করীম, প্রীতিভাজনেষু, এ উপন্যাস আমার রচিত নয়, অতএব এ উপন্যাসের কোন দায়িত্বও আমার নেই, আছে তাঁর যে সমরেশ বসু এই উপন্যাস লিখতে পারেন। বিনীত সমরেশ বসু, ২৪-৩-৭২।’
সমরেশের এই খেদোক্তিটি হঠাৎ গতকালই খুঁজে পেলাম। অনেক কিছুই ফেলে দিয়েছি। এই লেখাটি সমরেশের স্মৃতি হিসেবে তুলে রাখবো।

হঠাৎ একদিন দেখি, সমরেশও উপস্থিত। বললাম, ‘তুমি যে দেরি করে এলে?’ সমরেশ বলল, ‘আমাকে ডাকেনি। তবু তোমাদের “একুশে” দেখতে এসেছি।’ তাঁর গলায় অভিমান বেজেছিল।

সমরেশ সেই সময় বেশ কয়েকবার ঢাকায় এসেছে। একবার বাংলা একাডেমি একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে সারাদিনব্যাপী অনুষ্ঠান করে। সেটায় আমন্ত্রিত হন অন্নদাশঙ্কর রায়, মনোজ বসু, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায় এবং কিছু কিছু অখ্যাত কবি-সাহিত্যিক। মযহারুল ইসলাম তখন মহাপরিচালক। সমরেশ আমন্ত্রিত হন নি। হঠাৎ একদিন দেখি, সমরেশও উপস্থিত। বললাম, ‘তুমি যে দেরি করে এলে?’ সমরেশ বলল, ‘আমাকে ডাকেনি। তবু তোমাদের “একুশে” দেখতে এসেছি।’ তাঁর গলায় অভিমান বেজেছিল।
আর একবার, একদিন সকালবেলা দেখি, সমরেশ কোট-টাই পড়ে আমার দরজায় দাঁড়িয়ে। সঙ্গে চিত্রাভিনেতা মোস্তফা ও উজ্জ্বল। মুস্তাফা ও উজ্জ্বল অল্পক্ষণই বসলেন।
সমরেশকে আমার হেফাজতে রেখে চলে গেলেন। সেবারই বোধহয় সমরেশ দু’দিন আমার সঙ্গে ছিল। একদিন দ্বিপ্রাহরিক ভজনের সময় সিকানদার আবু জাফরও উপস্থিত ছিলেন। তিনি সমরেশকে ‘সমকাল’-এ লিখতে বললেন। সমরেশ খুব আগ্রহের সঙ্গে রাজি হল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ‘সমকাল’-এ লেখা আর হয়ে ওঠেনি। একবার সৈয়দ নুরুদ্দীন তাঁর বাসায় আমাদের খেতে ডাকলেন। আসলে সমরেশকেই ডাকলেন। সঙ্গে আরো অনেকে এবং আমিও ছিলাম। দেখেই মনে হল নুরুদ্দিনের সঙ্গে সমরেশের দারুণ বনিবনা হয়ে গেছে। কিন্তু রাত একটু গভীর হতেই দেখি, এ কি, দুজনে যে প্রায় হাতাহাতি শুরু করে দিয়েছে। সে কি তুমুল ঝগড়া। ঝক্কিটা পোহাতে হলো আমাকে। কারণ, সৈয়দ নুরুদ্দীন আমার ব্যক্তিগত বন্ধু। আবুল মনসুর আহমদ সম্পাদিত ‘ইত্তেহাদ’-এ সৈয়দ নুরুদ্দীন আর আমি একসঙ্গে কাজ করেছি। (আরো অনেকের মধ্যে রুহুল কুদ্দুসও ছিলেন ইত্তেহাদের একজন সৌখিন সাংবাদিক)।
পরদিন সকালে সমরেশকে জিজ্ঞেস করি : ‘কি হয়েছিল? অমন ক্ষেপে গেলে কেন?’ সমরেশ বলে, ‘কি জানি! কিছুই তো বুঝতে পারছি না। চলো নুরুদ্দীনের কাছে যাই।’
নুরুদ্দীনকেও সেই একই প্রশ্ন করি। সে বলে আর হাসে, ‘আমারও তো মনে নেই কিসে কি হলো!’
নুরুদ্দীন আমাদেরকে প্রেসক্লাবে নিয়ে এলো। সেখানে ব্রেকফাস্ট সারলাম। টুকরো টুকরো তাৎপর্যহীন আরো অনেক ঘটনা আছে, এবং আসলে এইসব ঘটনা দিয়েই আমাদের জীবন সুখের বা দুঃখের হয়। মহাকাব্যের ঘটনা তো আর আমাদের জীবনের জন্য নয়।

সে যে খুবই রমণীমোহন লোক ছিল, তার কিছু পরিচয় ঢাকাতেই দেখেছি। অনেক সময় সমরেশের আচরণ, চেহারা আর হাসি কাজী নজরুল ইসলামকে মনে করিয়ে দিয়েছে। আমার কৈশোরে কাজী নজরুল ইসলামকে তাঁর সুস্থ অবস্থায় দেখবার, তাঁর সামনে বসে তাঁর আবৃত্তি আর গান শুনবার বিরল সৌভাগ্য আমার একাধিকবার হয়েছে।

সমাবেশকে একবার সৈয়দ আলী কবীরের ইস্কাটন গার্ডেনের বাড়িতে নিয়ে এলাম। সেখানে সমরেশ সকলের সামনে তাঁর আশ্চর্য অভিনয় ক্ষমতার পরিচয় দিল। সমরেশ যখন কমিউনিস্ট ছিল, তখন সে একবার গ্রেফতার হয়, এবং কারাগারে নিক্ষিপ্ত হয়। সেই সময় কর্মকর্তারা তাকে কি কি প্রশ্ন করেছিলেন, কিরকম ভঙ্গিতে করেছিলেন, কিরকম কড়ি ও কোমল আচরণ করেছিলেন, সে কি জবাব দিয়েছিল এবং কিভাবে জবাব দিয়েছিল, — প্রায় মঞ্চাভিনয় করে করে সমরেশ তা দেখিয়ে ও শুনিয়ে দিল। সমরেশ মুখফোড় না হয়েও যে কী আশ্চর্য রকম বাকপটু, তা তাঁকে যাঁরা জেনেছেন, সকলেই জানেন। মাথাভরা কালো চুল, বড় বড় চোখ, নাক, চিবুক, গণ্ড, সবকিছুতেই গড়ন নিখুঁত, হঠাৎ কখনো ওষ্ঠে বিদ্যুতের মতো হাসি ঝলসে ওঠে, তা যেমন ধারালো, তেমনি অনেক কিছু দেখেছে শুনেছে আর সহ্য করেছে, সেরকম একটি লোকের সহিষ্ণুতা সেই হাসিতে। সে যে খুবই রমণীমোহন লোক ছিল, তার কিছু পরিচয় ঢাকাতেই দেখেছি। অনেক সময় সমরেশের আচরণ, চেহারা আর হাসি কাজী নজরুল ইসলামকে মনে করিয়ে দিয়েছে। আমার কৈশোরে কাজী নজরুল ইসলামকে তাঁর সুস্থ অবস্থায় দেখবার, তাঁর সামনে বসে তাঁর আবৃত্তি আর গান শুনবার বিরল সৌভাগ্য আমার একাধিকবার হয়েছে।
আমি চৌদ্দ বছর হতে চললো কলকাতা যাইনি। বাংলাদেশের বাইরেই কোথাও যায়নি। সমরেশও সাম্প্রতিক কালে বহু বছর ঢাকা আসেনি। শেষ এসেছিল ৮৬ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষ দিকে। ফিরে যায় ৮৭ সালের জানুয়ারি মাসের একেবারে গোড়ার দিকে। সঙ্গে ছিলেন তাঁর স্ত্রী, যাঁকে আমি সবসময় ‘টুনি’ বলেছি। সমরেশ মাঝে-মাঝে ‘ছুটকি’ বলতো। সমরেশের এই শেষ ঢাকা সফর প্রসঙ্গে আসবার আগে, সামান্য সাহিত্য প্রসঙ্গ সেরে নেই।
দুই
সমরেশ বসু একজন অসামান্য কীর্তিমান সাহিত্যিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন, সে সম্পর্কে কোন বিতর্ক নেই। সেই সঙ্গে তিনি আমাদের কালের অদ্বিতীয় গদ্যশিল্পী। শুধু তাই নয়, তিনি মরচে-পড়া, ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে যাওয়া, বাংলাভাষীর বাহুতে এমন এক নতুন রক্ত সঞ্চয় করলেন, যে ভাষা প্রাণ লাভ করে লাফ দিয়ে উঠলো। খিস্তিখেউড় আর পোস্তার ভাষাকে, গ্রামের মানুষের মুখের জবানকে, ঘষে-মেজে ঝকঝকে তীক্ষ্ণ ধারালো করে আধুনিক জটিল চিন্তা প্রকাশের বাহন করে তাজ্জব বানিয়ে দিলেন। ভাষার এই বিস্ময়কর ভাস্কর আসলে বাংলা গদ্যের এক নতুন ঘরানার জনক। কিন্তু তাঁর সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করবার মতো পরিসর এখানে নেই। আমি শুধু তাঁর সাহিত্যিক মানসিকতার কিছুটা পরিচয় এখানে দেব। সেজন্য আমাকে লেখা তাঁর একটি চিঠির কিয়দংশ উদ্ধৃত করব। পাঠক ক্ষমা করবেন। চিঠিটি তিনি লেখেন ২২-৪-৭২ তারিখে।
হিন্দু অন্য হিন্দুকে তার ঘরে ঢুকতে দেয় না, পানি খাদ্য দেয় না, ছোঁয় না, যে কারণে হরিজন নিয়ে আজও আন্দোলন চালাতে হয়, ছুৎমার্গী ব্যাপারে সরকারকে আইন প্রণয়ন করতে হয়। সেক্ষেত্রে হাফেজ রশীদ (উত্তম পুরুষের নায়ক খুব ভালো ফুটবল খেলতো বলে তাকে এক জায়গায় হাফেজ রশীদ বলা হয়েছে) ক্ষুব্ধ হবে, এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। কিন্তু এ যুগের পটভূমিকায় দাঁড়িয়ে, এবিষয় নিয়ে উপন্যাস লেখা কতখানি যুক্তিযুক্ত সেটা ভাববার কথা।
‘তোমার উত্তম পুরুষ আমি পড়েছি। নানা কারণেই বইটি আমার ভালো লেগেছে। তথাপি বইটি একপেশে দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে লেখা এবং সাম্প্রদায়িকও বটে, যদিও তার মধ্যে অনেক যুক্তিযুক্ত কারণ রয়েছে। নায়কের মন যেসব অভিজ্ঞতায় হিন্দুদের প্রতি বিরূপ হয়ে উঠেছিল, বিশেষ করে যে দুই শতকের কথা বলা হয়েছে, তা অনেকখানিই সত্য। সেই সময়ে, হিন্দু হিসাবে, আমার নিজের অভিজ্ঞতাও তাই। মুসলমান বন্ধুর বাড়িতে যেভাবে আমাকে খেতে দেয়া হয়েছে, আমার কোন মুসলমান বন্ধুকেই আমাদের বাড়িতে দেওয়া হতো না, যা আজকের ক্ষেত্রে অচিন্তনীয়। উত্তম পুরুষের নায়কের বিরূপতা বিক্ষোভের পথ ধরেই একদা ইসলাম ধর্মের অনুপ্রবেশ ভারতবর্ষে ঘটেছিল। কোটি কোটি মানুষ মন্দিরের বাইরে দাঁড়িয়ে থেকেছে, বিগ্রহ দর্শনের অধিকারও তাদের ছিল না। এমনকি মানুষের ছায়া মানুষ মাড়ালেও পাপ এবং তজ্জনিত কারণে শাস্তি। সেই জন্য শঙ্করাচার্য একেশ্বরবাদী আন্দোলন করেছিলেন, শ্রীচৈতন্যও জাতিভেদ ঘোচাবার চেষ্টা করেছিলেন, যে কারণে, ওঁকে সম্ভবত শহিদই হতে হয়েছিল। পুরীর মন্দিরে চণ্ডালের প্রবেশাধিকার দাবি করে, সেই মন্দিরের বাইরে আর কেউ তাঁকে জীবিত থাকতে দেখেনি। ধর্মান্ধ পাণ্ডাদের হাতে তাঁর কী পরিণতি হয়েছিল, ইতিহাস সে বিষয়ে দ্বিধাগ্রস্থ, নির্বাক। আমি কি বলতে চাইছি, তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছো? হিন্দু অন্য হিন্দুকে তার ঘরে ঢুকতে দেয় না, পানি খাদ্য দেয় না, ছোঁয় না, যে কারণে হরিজন নিয়ে আজও আন্দোলন চালাতে হয়, ছুৎমার্গী ব্যাপারে সরকারকে আইন প্রণয়ন করতে হয়। সেক্ষেত্রে হাফেজ রশীদ (উত্তম পুরুষের নায়ক খুব ভালো ফুটবল খেলতো বলে তাকে এক জায়গায় হাফেজ রশীদ বলা হয়েছে) ক্ষুব্ধ হবে, এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। কিন্তু এ যুগের পটভূমিকায় দাঁড়িয়ে, এবিষয় নিয়ে উপন্যাস লেখা কতখানি যুক্তিযুক্ত সেটা ভাববার কথা।… এক্ষেত্রে আমার বলার ইচ্ছা বেশি হল এই কারণে, আমার প্রথম মুদ্রিত গল্পের নাম ‘আদাব’ ১৯৪৬-এর পটভূমিকায় লেখা, বিষয় দাঙ্গা। আমি চিরদিনই মিলন প্রয়াসী।
অন্যান্য দিক থেকে উত্তম পুরুষ অনেক জায়গায় আমার খুব ভালো লেগেছে। হাফেজের সঙ্গে ওর মায়ের আচরণ এবং কথাবার্তা, অনেকবারই আমার বুক টনটনিয়ে দিয়েছে, ওর বঞ্চনার চিত্রগুলোও করুণ, খুব ভালো ফুটেছে। আরো ভালো লেগেছে সেই সময়ের কলকাতার চিত্র, ভাষাটা বিষয়বস্তু এবং চরিত্রের সঙ্গে সুন্দর খাপ খেয়েছে।’
এই শেষের লাইন ক’টি না দিলেও পারতাম। তবু সমরেশ বসুর মতো একজন লেখকের প্রশংসা উদ্ধৃত করবার লোভ সামলাতে পারলাম না।
তিন
৮৬ সালের ডিসেম্বরের শেষে সমরেশ ঢাকায় এসেছিল, এবারে সেই কথা। তার আসবার খবরটি পেলাম শামসুর রাহমানের মুখে। সে যেখানে উঠেছে, আমার বাসস্থান থেকে খুবই কাছে। শুনলাম তাঁর শরীরটা খুব ভালো যাচ্ছে না। মাঝে একটা মারাত্মক আক্রমণ গেছে হার্টের উপর। একদিন সকালে দেখা করতে গেলাম। সমরেশ তখনো তৈরি হয়নি। শুনলাম, আজকাল দেরি করে ওঠে। আমি এসেছি শুনে টুনি বেরিয়ে এলো। টুনিকে ‘আপনি’ সম্বোধনে কিছু বলতে গিয়েই বাধা পেলাম। টুনি বলল, ‘আপনার মুখে তুমি ছাড়া কিছু শুনিনি।’ জিজ্ঞেস করলাম, ‘সমরেশের শরীর কেমন?’ জবাব পেলাম, ‘খুব একটা ভালো নয়। আমার প্রশ্ন, ‘মদের সেবা চলছে কেমন?’ টুনি বলল, ‘পুরো দস্তুর।’ এমন সময় সমরেশ বেরিয়ে এলো। আমাকে জড়িয়ে ধরল। টুনি চা ইত্যাদির ব্যবস্থা করতে আবার ভিতরে ফিরে গেল।
‘সমরেশ, তুমি কদিন থেকে ঢাকায় আর আমাকে তা শুনতে হলো শামসুর রাহমানের কাছে?’
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কথাশিল্পী সমরেশ বসু ঝপ করে আমার পায়ের সামনে বসে পড়ল। বন্ধুর কাছে সে এমনই নিরহঙ্কার। আমরা দুজনেই যেন তখনও রাস্তায় মার্বেল খেলি। যদিও সেই ৭২-এ সমরেশের সঙ্গে আমার প্রথম ব্যক্তিগত পরিচয়।
সমরেশ বলল, ‘এসে অবধি এত লোককে তোমার কথা ঠিকানা জিজ্ঞেস করেছি। এইতো গতকাল বেলালকে…’
আমার অভিমান আগেই গলে গেছে। সমরেশকে বললাম, ‘তোমার আজকের দিনটি আমি কব্জা করলাম।’
‘ঠিক আছে। শুধু দুপুরের খাওয়াটা এখানেই খেতে হবে। কলকাতায় তোমাদের ডেপুটি হাইকমিশনার আমার হোস্টের আত্মীয়। তিনি দুপুরে খেতে আসবেন; সমরেশকে নিয়ে আমি ‘দৈনিক বাংলা’ অফিসে চললাম। শামসুর রাহমানের ঘরে বসে দীর্ঘ আড্ডা। সেখানে সালেহ চৌধুরী, হেদায়েত হোসাইন মোরশেদ, এবং আরো কেউ কেউ উপস্থিত ছিলেন। অনেক কথার মধ্যে সমরেশ একটি ঘটনার কথা বললেন, যে কথা মনে করলে আমার চোখ ভিজে আসতে চায়।
চট্টগ্রাম থেকে এক যুবক সমরেশ বসুর সঙ্গে দেখা করতে যায়। সে সমরেশের অনুরাগী। সেটা সমরেশের লিখবার সময়। কারো সঙ্গে দেখা করে না। তবু ছেলেটি বাংলাদেশ থেকে এসেছে শুনে সমরেশ বসতে বলল। এ-কথা সে-কথার পর সমরেশ জিজ্ঞেস করল, রশীদ করীম কেমন আছেন? ছেলেটি জবাব দিলো তিনি মারা গেছেন। ছেলেটি নাকি খ্যাপাটে। চিকিৎসার জন্য কলকাতা গেছে। আলাপ আর জমল না। সমরেশ উঠে পড়ল। টুনিকে ফোন করে খবরটা দিল। টুনি বলল, খবরটি শুনলে বটে, কিন্তু সত্য বলে আমার মন সায় দিচ্ছে না। সমরেশ এবারে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে ফোন করল। সুনীল বলল, আমারও মনে হচ্ছে খবরটা সত্য নয়। ঢাকা থেকে এত লোক আসে যায়, আমরা শুনতাম না? সমরেশ বসু স্থির থাকতে পারেনি। ফোন করলো বাংলাদেশ ডেপুটি হাইকমিশনারের অফিসে। যতদূর মনে পড়ছে, স্বয়ং ডেপুটি হাই কমিশনারকে। তিনি বললেন, আমাদের খবরের কাগজ তো রোজই আসে। খবরটি সত্যি হলে কাগজে থাকতো। তো আপনি আমাকে দুদিন সময় দিন। দুদিন পর সমরেশকে জানানো হলো, রশীদ করীম ভালই আছেন।
দুপুরের জন্য ছুটি দিয়ে সন্ধ্যাবেলা সমরেশকে আমার ফ্ল্যাটে নিয়ে এলাম। শামসুর রাহমান আর জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীও ছিলেন। সিদ্দিকী ঘণ্টাখানেক পর চলে গেলেন। সমরেশ তাঁর জীবনের অনেক কথা বললেন। তাঁর যে ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল, শামসুর রাহমান আর আমাকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তার বর্ণনা দিলেন। বললেন, এভাবে শুধু তোমাদেরই বলা যায়। ঘটনাটির সঙ্গে অন্তরঙ্গ এক অভিজ্ঞতা জড়িত ছিল। আমিও সেকথা লিখতে পারবো না। কিন্তু ব্যাথাটা কিভাবে কোথায় শুরু হয়, কিভাবে অগ্রসর হয়ে কোথায় যায়, গিয়ে কেন্দ্রীভূত হয়ে সাপের মতো জড়াতে থাকে, সেই অভিজ্ঞতার বর্ণনা যদি টেপ করে রাখতাম, তাই হতে পারতো দুর্লভ সাহিত্য।

হঠাৎ শামসুর রাহমানকে বলল, আমরা পরস্পরকে ‘আপনি’ বলি। সেটা কোন কাজের কথা নয়। এখনই ‘তুমি’ বলতে হবে। বলতে হবে তো বলল, কিন্তু বলতে পারছে না। আমি খোঁচাতে লাগলাম। সমরেশ হাসলো। তার সেই অবিস্মরণীয় হাসি, ‘একটু সময় দাও। তৈরি হয়ে নিই’ বলে অল্পক্ষণ অপেক্ষা করল। তারপর এল সেই ‘তুমি’।

সুনীল, শীর্ষেন্দু, শ্যামল সম্পর্কে অল্পবিস্তর আলাপ হলো। কে কি করছেন লিখছেন। আমাকে সমরেশ বলল, রামকিঙ্করের জীবন নিয়ে একটি উপন্যাস লিখছি। এই বয়সেও বহুবার বাঁকুড়া গেছি, গেছি উত্তর ভারতে। বহু লোকের সঙ্গে আলাপ করেছি তথ্যানুসন্ধানের জন্য। অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। উপন্যাসটি একবার পড়ে দেখো। সমরেশের বহু লেখা আমি নিজের আগ্রহেই পড়েছি। এই প্রথমবার আমাকে তাঁর লেখা পড়তে অনুরোধ করলো। উপন্যাসটি কি অসমাপ্তই থেকে যাবে?
হঠাৎ শামসুর রাহমানকে বলল, আমরা পরস্পরকে ‘আপনি’ বলি। সেটা কোন কাজের কথা নয়। এখনই ‘তুমি’ বলতে হবে। বলতে হবে তো বলল, কিন্তু বলতে পারছে না। আমি খোঁচাতে লাগলাম। সমরেশ হাসলো। তার সেই অবিস্মরণীয় হাসি, ‘একটু সময় দাও। তৈরি হয়ে নিই’ বলে অল্পক্ষণ অপেক্ষা করল। তারপর এল সেই ‘তুমি’। এমনভাবে সমরেশ ‘তুমি’ বলল যে মনে হল সমরেশ চিরকালই শামসুর রাহমানকে তুমি বলে আসছে।
শামসুর রাহমানকে তাঁর সেই প্রথম আর শেষ ‘তুমি’ বলা। আর দেখা হয়নি। ১৩ই মার্চ ১৯৮৮।
খুব সকালে সৈয়দ আলী কবীর ফোন করলো, ‘
‘খবরটা শুনেছো?’। কাল রাতে বিবিসিতে…’
খানিক পর শামসুর রাহমান ফোন করলেন, ‘খবরটা…’
অতঃপর জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, ‘এইমাত্র কাগজ দেখলাম…’
শুনেছি। শুনেছি। গতকাল রাত্রে আমার কন্যা নাবিলা আমাকে ঘুম থেকে তুলে খবরটা দিয়েছে। আমাদের টেলিভিশনেই শুনেছি।
ফিরে ফিরে একটি চিন্তা আমার মাথায় আসছে। বিষণ্ণ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কি চুপ করে বসে ভাবছেন : ‘আর কি হবে উপন্যাস লিখে! আসল লিখনঅলাই তো গেলেন!’
আর ভাবছি, টুনি এখন কি করছে?
[সংক্ষেপিত]
পাঠ-ভিডিও সম্পাদনায় রনক জামান
***
এই লেখাটি ১৬ মার্চ, ১৯৮৮ সালের ‘সচিত্র সন্ধানী’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এখানে পুনঃপ্রকাশিত হলো।