রাজিয়া সুলতানা >> কবিতাগুচ্ছ

0
1363
[সম্পাদকীয় নোট : আজ কবি-অনুবাদক রাজিয়া সুলতানার জন্মদিন। এ উপলক্ষে মার্কিন প্রবাসী সুলতানার একগুচ্ছ কবিতা প্রকাশিত হলো। তীরন্দাজের পক্ষ থেকে রাজিয়া সুলতানাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাই।]
নামহীন
মধ্যরাত। স্নায়ু পিপাসা।
জল সিঞ্চনে নদীর ঠিকানা খোঁজা দায় –
যেন পৃথিবীর মানচিত্র থেকে অন্তর্হিত কোনো দেশ।
ছিল একদিন – আজ নেই –
থাকে না কিছুই।
শুধু যাপনের ম্লান দিনগুলি স্মৃতিধুলো মেখে
শেষবিকেলের রোদে শুয়ে রয়।
আঙুলে নয়, শব্দেই স্পর্শ।
তাই ঠোঁট, জিভ, মুখগহবর, কণ্ঠ জুড়ে যতো ফোনেটিক্স
কৈশোর, শৈশব, প্যান্ডোরা
এথেন্স, সক্রেটিস, অ্যাগোরা
আগুন প্যারাডক্স।
রাতের কোরকে ভুল মৌমাছি এলে
স্বপ্নের ভেতরে ঘুম পায় খুব- কোথায় যেন পড়েছিলাম।
পাইনের সূঁচ সবুজ গন্ধে ভরে থাকে যখন
আঘাত থাকে না তাতে – সেদিন হাঁটতে গিয়ে দেখলাম।
স্বর্গনাভ জল
নরক টলোমল
পুণ্য অভীপ্সা –
পথভ্রষ্ট জানে ভালো
নষ্ট ডিমে তা দেয়া হলে সারা, পাখিসত্য দিন ডুবে যায়।
কনফেশনাল
সেলুলয়েডের ফিতে তোমাকে পুরনো হতে দেয় না –
শুধু দৃশ্যের অতীত ছায়ায় মৃত কথাদের শোরগোল
যেন নগরীর ঘুমের নীরবে
নিরুদ্দেশ হবার খোঁজে এক কলোসিয়াম –
ওপরে আকাশ
নীচে বালি, কংকর, জল –
দৃষ্টি যতদূর, শুধু ধু ধু তারপর।
স্পর্শের গভীরে ফ্রেনিয়া, হেমলক আঙুল
দৃষ্টি ফেরাতেই ভার্জিনিয়া উলফ
সিলভিয়া প্লাথ, অ্যান সেক্সটন –
থ্রী এক্সেপশনালি ওয়েল ডুয়ার্স – আহা কনফেশনাল!
প্রেম
হু হু জানুয়ারি
বুকের দেউড়িতে পা –
স্মৃতির লণ্ঠন –
চিমনি জুড়ে অন্ধকার।
শূন্যঘর
ধুলোঝাড়া ছবির ফ্রেম
চন্দ্রগ্রস্ত স্তব্ধতা
উইন্ডচাইমে থেমে থেমে
বাতাসের ঘা।
তিল সম্মোহন
তৃষ্ণাছুরি
অলৌকিক সেই রাতে
অরণ্যের মর্ম ছিঁড়ে অকস্মাৎ
হরিণ গ্রীবা বাঁকিয়ে
তুমি খুন করেছিলে নীরবতা।
প্যারাডাইম
অপেক্ষার ভেতর সাঁতার খেলতে গিয়ে প্রথমে চোখ, তারপর দৃষ্টি উধাও হলো।
জানি, আজ এই মুহূর্তে –
কোথাও একটা নতুন শিশু জন্ম নিচ্ছে –
কোথাও একটা বাঘ একটা হরিণকে জব্দ করে ফেলেছে –
আর একটা সাপ কবরে টেনে ধরেছে কোনো লাশের জিহ্বা।
ওরা আমাকে তত্ত্ব বোঝাতে আসে, প্যারাডাইম শেখায় –
আমি বসে বসে মি-টু’র জোয়ার দেখি –
দেখি সুন্দর ঝরে পড়ছে কেমন নিশ্চিন্তে –
ছিপিখোলা বিয়ারের কার্নিশে তৃতীয় ব্যক্তির ঝুলে থাকা ঠোঁট, অসংলগ্ন কথাবার্তা আর বেলেল্লাপনা আজ-
আমাকে সূর্যের দিকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে হঠাৎ, নির্বাক।
আমাদের চৌকাঠে
রাতের সিন্ধু পার হয়ে এক গুহা – এইখানে মৃত্যুলেখা শুয়ে আছে
তার চারপাশে ঘুমিয়ে পড়েছে সহস্র প্রহরী –
কারা যেন আকাশ থেকে প্যাম্ফলেট ফেলছে – সেগুলো উড়ে উড়ে এসে ঢেকে দিচ্ছে
সূর্যরেখা, গ্লোবাল চিবুক সাবধানে –
অথচ কর্পোরেট বায়ুর নিশানায় আনন্দ ঝরে পড়ার কথা ছিলো পশ্চিমে।
এখন চীনের ডিম আমদানিতে সেও অভ্যস্ত, পুষ্টিতে যেমনই হোক
অর্গ্যানিক অর্থনীতির অংক তো মিলছে…
হাওয়াকলে অজস্র স্বপ্নের চিরায়ত ধ্বনি বৈকল্যের পাঠ দিয়ে নিভে যাচ্ছে প্রান্তরে
এইসব শব্দ বাতাসে এখনো ঠিক নড়ে, মেঘে মেঘে ভেসে বেড়ায় –
আমরা রাতে ঘুমোতে যাই, সকালে জাগি –
শ্রম-ঘুম বিশ্রামে ইটের ওপর মাথা রাখতেই
স্বত্বাধিকার, মুনাফার হাটে সেইসব ধ্বনি ঠোঁটে আবার জেগে উঠছে রাত্রি –
গাইছে –
যতক্ষণ না
মজুরের লাশ নিশ্চিত আকাশ থেকে ছিটকে পড়ছে আমাদের চৌকাঠে…
বিভ্রম
দুপুর গড়িয়েছে সেই কখন…
এখন
একটা ঘুঘু-ডাক অনুভুতি এসে জড়িয়ে নিচ্ছে বিকেল-
দূরে একটা কাঠঠোকরা লালঝুঁটি সেঁধিয়ে দিচ্ছে গাছের কোটরে –
কাঠঠোকরা, নাকি কার্ডিনাল?
একটা লগ কেবিন বনের ভেতর – ভেতরে কেউ আছে কি না উঁকি দিয়ে দেখতে ইচ্ছে করছে-
উঠোনে ক্রিস্টমাস ট্রি, লাইলাক, ডগউড
ছোট্ট পুকুর-
শাপলা লতার কাছে সিরামিকের একটা ব্যাঙ বসে আছে –
একটা কুয়ো, ওপরে রশি দিয়ে বাঁধা বালতি ঝুলছে…
লগ-মাচার ওপর মেপেলের ছায়া- অক্টোবর আকাশ-
খাড়িপথ বেয়ে নেমে যাবার আগে এইখানে
জুড়িয়ে নেয়া যেতো – ইচ্ছে করছে না –
কবে এক শ্রাবণ আকাশ কেঁদে কেঁদে ঝরেছিলো সারাদিন –
সেই চোখ আজও বুকের পাঁজরে বিঁধে আছে –
আমি তাকে ছাড়াতে পারিনা, ভুলতে পারিনা কিছুতেই…
আবার তোমার জন্য
সেই তো – চিবুকের কাছে এসে মাছরাঙা ভোর
অচেনা আকাশ, বৃষ্টি ঝরো ঝরো …
নীতি, পদ্মের হলুদ কোরকে ভ্রমরের সব দিন সমান কি যায়?
প্রতিদিন শিশিরে ভিজে ওঠে কাঁচ? জানালায়?
ব্যাকুল বাতাস-
রাতের দেহ ভ’রে চন্দনগন্ধ
পুষ্প থরো থরো…
সময় বয়ে গেছে জলের মতন
মাছেদের পিঠ থেকে পিছলে আসা নদী হারিয়েছে পথ…
আগুন-পাথর ছুঁয়ে না রাখা শপথ -স্মৃতিধুলো–ভুলে গেছো?
সংশয়
কেউ কেউ অখণ্ড আকাশকেও সন্দেহ করে
বলে টুকরো টুকরো আকাশগুলো
দেশের সীমানাগুলোতে বিচ্ছিন্ন;
আমি দেখি বিচ্ছিন্ন টুকরাগুলো নিয়ে এক পূর্ণ আকাশ
মূলত প্রত্যেকটা টুকরোই একেকটি পূর্ণ আকাশ।
কেউ কেউ পূর্ণাঙ্গ সময়ের কথা বলে
একটি সন্ধ্যা অথবা রাত নয়
আমি বলি সময়ের পূর্ণতা নেই কারো হাতে
আছে একেকটি পূর্ণ দিন, সন্ধ্যা অথবা রাত।
টিল ডেথ ডু আস্‌ পার্ট
কোনো কাজ নেই।
তবু মাঝে মাঝে এখনো মিডিয়া সেন্টারে যাই।
দূর থেকে দেখি, চিবুকের নীচে তোমার চোয়াল ভেঙ্গে গেছে।
ভাঙ্গাচোরা হাসি- কাস্টমার সার্ভিস বলে কথা।
ভেতরে আরো ভেঙ্গেচুরে আছো জানি।
মাত্র ক’মাস। বলেছিলে ভালো থাকবে। আমাদের বাবুটার সাথে তুমি
আর আসোনা। ভিজিটেশান রাইট নিয়ে কোর্ট কাচারি করলে।
আমি তো দিচ্ছি সাধ্যমতন। কখনো কৃপণ ছিলাম? দেখেছ?
ঈদে শাড়ির সাথে গহণার ম্যাচ –
এমনকি বিদেশ ভ্রমণে যে দেশ পছন্দ তোমার- সবসময় ‘ওকে’ বলেছি।
আমাদের প্রত্যেক বিশেষ দিন ছিল একেকটা অকেশান।
তোমাকে খুশি করার জন্য আমার প্রস্তুতি চলতো গোপনে।
সহজ সম্পর্কে সহজ ছিল সবকিছু। চেয়েছিলাম- শুধু ছুঁয়ে থাকো।
সুখে দুঃখে, ধনে, জনে কাছে থাকো জড়িয়ে।
আমার তো কেউ ছিল না কখনো শুধু তুমি ছাড়া। এখনও নেই।
রাতে তোমার কথাগুলো কাঁটার মতো বুকে বেঁধে।
ঘুমকে আপন করতে গেলে সে তোমার মতই আরো পর হয়ে যায়।
বিয়ের কথা মনে পড়ে-
সেই যে প্রীস্ট, তার মন্ত্র- আমার পালা শেষ হলে তুমি বললে–
“আই টেক ইউ অ্যাজ মাই হাজব্যান্ড, ফর বেটার, ফর ওয়ারস,
ফর রিচার, ফর পুওরার, ইন সিকনেস অ্যান্ড ইন হেলথ টিল ডেথ ডু আস্‌ পার্ট।”
আমি তো সত্যি ভেবেছিলাম সবকিছু। তুমি কি শপথ ভুলে শুধু মন্ত্র পড়েছিলে?
সঙ্গতি
নক্ষত্র আঁধার!
অনন্ত ঘুমের মহড়ায় জেগে উঠে দেখি হোটেল ক্যালিফোর্নিয়া- সাচ এ লাভলি প্লেস
অদূর-সিনেপ্লেসে চলছে বিউটি এন্ড দ্য বিস্ট
ডান্স ফ্লোরে কোহেন-
ডান্স মি টু দ্য এন্ড অব লাভ
ডান্স মি টু থ্রু দ্য প্যানিক টিল আই অ্যাম…আহা!
মম দুঃখ বেদন
মম সফল স্বপন
ইন দ্য নেম অব স্যাংচুয়্যারি
ঈশ্বর দেখুক এসে
উইদাউট এ সোল
আই হ্যাভ বিকাম সো নাম্ব- আহা!
তোমরা যা বলো তাই বলো
লেট’স নট প্রিটেন্ড টু কেয়ার
মেঘ বলেছে যাব যাব
চেক আউট করে বসে আছি–
সাগর বলে কূল মিলেছে…আহা!
নিজেরাই যখন আটকে আছি
নিজেদের স্বয়ংক্রিয় সেলে
দ্য বেল মিশন-
সাচ এ লাভলি প্লেস
সাচ এ লাভলি প্লেস
সাচ এ লাভলি প্লেস…আহা!