রাটি আমাঘলোবেলি’র কবিতাগুচ্ছ >> ভাবানুবাদ মঈনুস সুলতান

0
405
জর্জিয়ার তরুণ প্রজন্মের কবি রাটি আমাঘলোবেলি’র জন্ম ১৯৭৭ সালে রাজধানী শহর তিবলিসিতে। ইউনিভারসিটি অব তিবলিসির ফিলোলজি বিভাগের ছাত্রাবস্থায় ১৯৯৪ সালে তাঁর কবিতা প্রথম প্রকাশিত হয়। সমঝদাররা তাঁকে কাব্যভুবনের দরবেশ হিসাবে আখ্যায়িত করেন। তাঁর আপাত গভীর ব্যক্তিত্বমণ্ডিত উচ্চারণকে যাদুমন্ত্রের সাথেও তুলনা করা হয়ে থাকে। আমাঘলোবেলির শব্দনিচয় ঘূর্ণিত হয় মূলত একটি বা দুটি ধ্বনিকে কেন্দ্র করে। তাঁর কাব্যভাষা ধ্বনির সীমানা অতিক্রম করে সৃষ্টি করে অর্থবোধক ব্যঞ্জনা, এবং তা কখনো কবিতাকে নিছক ধ্বনিতে পর্যবসিত করে না। মঞ্চে কবিতার পারফরমেন্সের জন্য বিখ্যাত এ-কবি ক্রমশ পথ করে নিচ্ছেন সাম্প্রতিক ধারাপ্রবাহের বিপরীতে। বোদ্ধারা তাঁর কবিতায় খুঁজে পাচ্ছেন প্রাচ্যদেশীয় গীতলতা, অন্তর্গত বিশ্বাস ও ভালোবাসার অন্বেষণ। নিচে অনূদিত কবিতাগুলো পোয়েট্রি ইন্টারনেশনেল রটারডাম ওয়েবসাইট থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। জর্জীয় ভাষা থেকে এগুলো ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন ডোনাল্ড রেফিল্ড, এবং অন্যান্য তথ্য অনুবাদ করেছেন জন আয়রনস্।

তোমাকে ভালোবাসার অনুভব

বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রতি আমার যে অনুভব
তোমার জন্য আমার ভালোবাসা তেমনি হয় মঞ্জরিত,
সংবেদনশীলতা নিয়ে দূরে ছড়িয়ে আছে শৈশব
আমার প্রেষণা যেন-বা তোমার অভ্যন্তরে নিয়ত হচ্ছে গুঞ্জরিত।
তোমার দিনযাপনে বয়ে যায় শান্তির সুবাতাস
পায়ের নিচে সুঠাম ভিত চাই না হারাতে,
সূর্য যে রকম মাতৃমমতায়ী পৃথিবীর সেবায় ক্রীতদাস,
তেমনি প্রেরণা নিয়ে জপি তোমার গাঁথা প্রতিদিন প্রত্যুষে।
আমার প্রবেশপথে প্রতিটি দরোজা করে দিয়েছো বন্ধ
সন্দেহে তুমি উপদ্রুত! এখন কী-বা উপায় আমার,
আর আসে না দখিনা বাতাসে ঝরা জুঁইয়ের গন্ধ,
স্বামীরা যে-রকম কোঁচকানো বিছানার দিকে তাকায় বারবার।
কিন্তু এক বিকালে ক্রুশ আঁকা নীল আলোয়ান পরে
যেন-বা অলৌকিক এক নীলাঞ্জন পাখি,
ঈশ্বর এসে ঢুকবেন তোমার নিরিবিলি ঘরে,
পাশে সেদিন থাকবে না কেউ- তুমি একাকী,
অনিচ্ছায় তবু নিমজ্জিত হবে আমার ভালোবাসায়,
মনে তোমার বাজবে দিব্য এস্রাজ ভিন্ন স্বরে।
বাড়িয়ে দেবে প্রসারিত দু’বাহু অবাক হয়ে তুমুল
প্রিয়-নামে করবে যখন আমাকে সম্বোধন,
চীৎকার করে উঠবো আমি ব্যাকুল,
ঝরবে অজস্র বকুল তোমার চুলে,
পাল-তোলা নাও বুঝি বা নোঙর করবে উপকূলে।

ভোরের দিকে দু’চোখ মেলে

ভোরে আমি দু’চোখ মেলে খুলে দেবো
দরোজা- ঝুলবারান্দার,
কামরায় ভেসে আসবে পথচারীদের কথাবার্তা
দেয়ালে ছায়া পড়বে- চলমান দৃশ্যপট,
গ্রামফোনে শোনা যাবে গান কানন বালার,
আলোর আরতিতে তুষ্ট হবে পাড়ার বৃদ্ধ বট।
আমি জানি এটাই তার অস্তিত্ব
ট্যাপে পানি নেই এক বিন্দু- তারপরও ভোর কিন্তু আসবে সতত,
যা তুমি পান করবে- পান করা যাবে জলের মতো।
ভোর তাকে নিয়ে আসবে জানালায়
ভোর বাস্তবতায় স্বপ্ন-বিশেষ,
ফোয়ারা, সড়ক, সরণী ও চকে সূর্যের অভিনিবেশ,
প্রতিদিন সাবধানী হাতে সকাল
স্পর্শে বর্ণিল করবে তাবৎ অনুভব,
মুহূর্তে কাঁপবে ভোরের নয়ন পল্লব,
চকের রোয়াকে ঝলসাবে আলোর প্রবাল।

চুপ করো, শিশু ঘুমাচ্ছে এখানে

ভারী পর্দায় ছায়াচ্ছন্ন কামরা- চারিদিকে নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসে ছড়াচ্ছে শান্তি কিন্তু শোনা যাচ্ছে ভাবনার স্বরধ্বনি। বস্তুর অন্তরালে আছে কী- তা খুঁজে বের করার প্রয়াজন নেই কোনো। নিশ্চুপ, আর কোনো শব্দ নয়- ঘুমাচ্ছে একটি শিশু!
নিশ্চুপ! শিশুটি দুপুরবেলা ঘুমিয়ে নিচ্ছে একটু। দুপুরের তপ্ত সূর্য হ্রদের আরশিতে ঝলকাচ্ছে, পর্দার শীতল ছায়া আলতোভাবে ছুঁয়ে আছে তার মুখ, আর সে এখন ঘুমাচ্ছে আর এই ভাবদৃশ্যের অব্যক্ত প্রার্থনা বয়ে নিয়ে যাচ্ছে ড্রামের রিদমিক ছন্দ, স্বপ্নের দখিনা বাতাস তাকে ভাসিয়ে নিচ্ছে বাগিচার গভীরে, আর প্রার্থনা কাপড়ের মতো জড়িয়েছে স্তনযুগল প্রথম সংবেদনের অভিজ্ঞতায়।
আলোচিত হচ্ছে যে শিশুটির নিশ্বাসের প্রসঙ্গ, মনে হয় স্বর্গ নেমে এসেছে এখানে, আর বলা যেতে পারে- স্বর্গ আমাদের অভ্যন্তরে বসবাসের অনুরোধ জানাচ্ছে- আর শিশুদের ভেতর এ অনুরোধ থেকে যায়, দীর্ঘ মেয়াদী হয় ব্যাপকভাবে, বসবাস করে, খুঁজে পায় খোলামেলা জায়গা। শূন্য খোড়ল এক নীড় বাঁধার জন্য যথেষ্ট ফাঁকা, প্রাণীদের দিনযাপনের উপযোগী একটি বনানী বা মানুষের কাঙ্ক্ষিত বসতবাড়ি। যার ভেতরে উত্তেজিত হয়ে থাকে প্রতিটি স্বতন্ত্র স্নায়ু, যখন একটি শিশু ঘুমের মন্দিরে মগ্ন হয় স্বপ্নের আরতিতে।

বনভূমি

বনানী এখানে গভীর। কিন্তু তার অভ্যন্তরে ছড়িয়েছে আলো
এথেন্স নগরীর এক মন্দিরের মতো জমকালো,
বনভূমিতে যখন আসে ভোর- ছড়ায় আলোর মিছিল
ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র নিরাপদ আগুনশিশিরে ঝিলমিল।
সূর্যদয়ের আলোকরশ্মিতে ছড়ায় নৈঃশব্দ্য- নিবিড় অতিশয়,
এ সময় এখানে কখনো ঘুরে বেড়াতে আসা বিরল
ঝরে যায় পত্রালী, হরিৎ হয় সবুজ কিছু তো নয় অক্ষয়।
বনানী ঝিমোচ্ছে এখন- নেমে এসেছে কুয়াশার মসলিন,
তার বৃক্ষময় বিছানার শিয়রে শেষ হয়ে আসে দিন।
পায়ে চলার শূন্য পথগুলো বৃত্তাকার- চিরায়ত,
নিঃশ্বাস নেই গভীরে- আরো ভালো করে তাকাই চারদিকে
যাবো না কোথাও আজ আপাতত।
মনে হয় বৃক্ষরাজির ভেতরে আছে নানা ধর্মের তরুবর,
এ-গাছটি লাওৎসের অনুসারী-
কনফুসিয়াসের শিষ্য বনস্পতিতে প্যাঁচা বেঁধেছে ঘর।
এ-গাছের ক্রুশকাঠে ঝুলছে যিশুখ্রিস্টের শব,
দেবদারুর চিরল পাতায় নামগান করে বাতাসের বৈষ্ণব।
ফলভারে গাছের শাখা নতজানু হয়েছে কুর্নিশে,
এ-বনভূমিতে জন্মায় অসমাপিকা ক্রিয়া
শব্দের শিকড় আঁকে স্বপ্নের ধারণা
দয়িতার কানে প্রেমিক পুরুষের ফিসফিস।
কোনো গাছের নির্যাস হয় প্রভুর পানীয়
পাতায় জড়ায় সোনার রেশম,
স্বরধ্বনি এখানে নির্জনতার প্রতীক
শ্যামলিমা শিশিরে সবুজ হয় হরদম।
জঙ্গলের প্রতিধ্বনি সময়ের প্রতিঘাতে অভঙ্গুর,
এখানে প্রতিধ্বনি কখনো হয় না হ্রস্ব
শব্দের পলিমাটিতে আঁকা হয় হরিণের খুর।
এ হচ্ছে এমন এক নির্জন পরবাস
এখানে আসে না তেমন কেউ-
বয়স বাড়ে বাজপোড়া বৃক্ষের,
গোধূলিতে গাছের শাখায় ঝিমোয় বেলেহাঁস।