রাবেয়া রব্বানী > দ্য কনফেশন রুম >> ছোটগল্প >>> উৎসব সংখ্যা ২০২০

0
296

দা কনফেশন রুম

শহর তার বুকে নতুন একটা কিছুর অস্তিত্ব টের পায়। জিমখানা মাঠের ঠিক বাঁ পাশে জায়গাটা। নিমতলি, পঞ্চবটী বরফকল, কদম রসুল সব জায়গা থেকে মানুষ যায় সেখানে। বিশেষ করে মেয়েরা। তাদের গতিবিধি হিসাব করে যদি-বা কিছু বুঝা যায়। শহরের চেষ্টা চলছে।
এলাকার মানুষজন বাড়িটার সামনে দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় বিশ্বাস-অবিশ্বাস নিয়ে তাকায়। ধুপের ধোঁয়া গাছগাছালি ছাপিয়ে দিনভর ভেসে বেড়ায়, মাতাল করা সুবাস পাওয়া যায়। ভেতরের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে কারো কারো চাক্ষুষ ধারণা থাকলেও তা প্রচার হয় খুবই কম। কেউ কখনো বাড়ির ভেতরে গেলেও সেকথা কাউকে বলতে পারে না।
একাত্তরের যুদ্ধের সময় এক হিন্দু নাগরিকের এই পরিত্যক্ত বাড়িটি এক-এক সময়, এক-এক পরিচয় নিয়েছে। কখনো স্বাস্থ্যকেন্দ্র, কখনো যুবকদের কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্র, কখনো স্কুল। বর্তমানের গাছগুলোও লাগানো হয়েছে প্রায় দশ বারো বছর আগে। তখন এখানে একটা কিন্ডারগার্টেন স্কুল পরিচালিত হত। তার প্রমাণস্বরূপ এখনও একটা লোহার দোলনা বাতাসে এপাশ ওপাশ করে। জং ধরা শেকলে অদ্ভুত শব্দ হয়।
গাছগুলো এখন বেশ পরিণত। সেগুলোও বাড়ির ভেতরে কী হচ্ছে বুঝতে চেষ্টা করে। সারাদিনে বেশকিছু লোকজন আসে। জানালায় কখনো আলেম, কখনো ফাদার, কখনো সাধু চেহারার মুখগুলো দেখে গাছগুলো। শান্ত চেহারার পর্দানশীন মেয়েটাকে দেখে। রাত বাড়লে অন্ধকার গায়ে মেখে তাদের চলে যেতেও দেখে। কী ঘটছে তা বুঝতে না পারলেও যথেচ্ছ বাড়তে দিয়ে বাড়িটা যে তাদের সাথে সমঝোতা চায়, তা স্পষ্ট। তাই তারা এখন আগের চেয়ে দ্রুত বেড়ে উঠতে চায়, আড়াল করতে যে হবেই।
এই বাড়ির কাছাকাছি এলে পোয়াতি মেঘেরাও স্নেহময়ী হয়ে ওঠে। একটু বেশি পানি বর্ষণ করে। তখন টিনের চালে পানির পতন এত জোর শব্দ তৈরি করে যে মনে হয় আশেপাশের সব ক্ষুদ্ধ আত্মা যুদ্ধ শুরু করছে। কুকুরগুলো তখন একস্বরে ঘেউ-ঘেউ করতে-করতে বাড়ির চারপাশ ঘুরপাক খায়। শহর কেবল আকুপাকু করে, আরে কি হচ্ছে? হচ্ছেটা কি?

একরার খানা খুঁজে পেতে পেতে তার ভরদুপুর। হঠাৎ একটা ফিনফিনে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। গায়ে লাগে তো লাগে না এমন। এর মধ্যেই আমড়াওয়ালা তার বাহারি ডালি মেলে ধরে আছে, একটা ভিক্ষুক পেতে আছে তার ময়লা হাত, ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থাকা তেল মালিশের লোকটা বলছে… এই মালিশ, এই মালিশ। কয়েক ফোঁটা পানিতেই তার সিল্কের বোরকা ভিজে সেঁটে যাচ্ছে গায়ের সাথে। বাতাস, বারবার ওড়নাটাকে বুকের মাঝখানে জড়ো করে যেন তার পর্দাকে উপহাস করছে। না! সে ব্যস্ত হয়ে ভেতরে পা বাড়ায়।
আতর, আগরবাতির গন্ধে ম-ম করছে বাড়িটা। প্রথম ঘরটাতে পাটি পাতা। একটা হিজাব পড়া তরুণী বসে আছে। সে এগিয়ে যেতেই মেয়েটা জিজ্ঞেস করল,
মুসলমান?
জি।
বিবাহিতা?
জি।
আচ্ছা। ৮০০ টাকা দিয়ে অপেক্ষা করুন। মেশকাতে আজম আপনার সাথে কথা বলবেন। আপনি হচ্ছেন ক্লায়েন্ট নম্বর ২৩০।

ক্লায়েন্ট নাম্বার ২৩০ এখন মুসলমানদের জন্য নির্ধারিত কামরায় বসে আছে। একটা ফুলের ছাপ কাঁটা পার্টিশনের অন্য পাশে আছেন হুজুর সেফকাতে আজম। কারো চেহারা কারো কাছে স্পষ্ট না। দুপুরের ক্লান্তি ঠেলে যেন মেশকাতে আজম জোর করে বললেন, মা আপনার কথা বলেন। মূল কথা। পরিচয়ের কোন দরকার নেই।
ক্লায়েন্ট নাম্বার ২৩০ কিছুটা সময় নিয়ে বলল, আমার শাশুড়ি আমাদের সাথে প্রায় পনেরো বছর ধইরা থাকেন। সব কাজ আমি করি আর উনি তাতে নানান ভুল ধরেন, ছেলের কাছে আমারে অকর্মা প্রমাণ করেন। ছেলে মেয়েদের সামনেও ইজ্জত বাচায় রাখতে পারি না।
হুম।
আর সহ্য করতে পারতাছিলাম না। এত কাজ হুজুর, তার উপর এমুন অত্যাচার। দুই বছর ধইরা তাই আমি উনার খাবারের সাথে ঘুমের ঔষধ মিশাইয়া দেই। ডোজও দিন-দিন বাড়াইতে হইতাছে। এখন ভয় পাই উনার না কোন ক্ষতি হইয়া যায় আর এই পাপে শেষমেশ না আমি দোজখে সামিল হই।
মেশকাতে আজম মাথা নাড়েন, আল্লাহ শুধু কর্ম নয়, নিয়ত বিচার করেন, মা। ৬০ বছরের পর মানুষের এমনিতেও ঘুমের ঔষধের দরকার হয়। আশা করি কোন অমঙ্গল হবে না।
ক্লায়েন্ট নাম্বার ২৩০ বিস্ফোরিত চোখে বলল, হুজুর আপনি কি তাইলে বলতাছেন আমি এই কাজ চালায় যাব?
কি করবেন তা আপনার বিষয়।
হুজুর এতে কি পাপ হবে না?
পাপ মাথা ঘামানোর বিষয় না। আর ঘুম পাড়িয়ে রেখে উনাকে পাপ করতে দিচ্ছেন না, এটা তো এক দিক দিয়ে পুণ্যও।
ক্লায়েন্ট নাম্বার ২৩০ ভীষণ অবাক হল। এ আবার কেমন কথা! পাপ মাথা ঘামানোর বিষয় না! একজন আলেম কীভাবে এমন কথা বলতে পারে! সে পার্টিশনের ফাঁকগুলোর সামনে চোখ নিয়ে হুজুরের চেহারা দেখতে চাইল। মিনমিন করল, কিন্তু হুজুর আমলনামা তো নিয়ে যেতে হবে?
মেশকাতে আজম যেন একটু বিরক্ত হয়েই বললেন, আমলনামা মানে পাপ আর পুণ্যের ফর্দ। এককথায় পুণ্য বেশি হওয়া চাই। আর পুণ্য যদি কমও থাকে তবে পাপ কাটানোর দায়িত্ব আল্লাহতায়ালার, হযরত মুহাম্মদ সা. বলেছেন, বান্দার গুনাহ যখন বেশি হয়ে যায় এবং এসব গুনাহের কাফফারার মতো যথেষ্ট নেক-আমল তার না থাকে, তখন আল্লাহতায়ালা তাকে বিপদে ফেলে চিন্তাগ্রস্ত করেন। যাতে এ চিন্তাগ্রস্থতা তার গুনাহের কাফফারা হয়ে যায়। আল্লাহ ভরসা।
একমুহূর্ত অপেক্ষা না করে মেশকাতে আজম কামরা ছেড়ে বের হয়ে গেলেন।
ঘরটাতে আলাদা কোন আলো নেই। আকাশ থেকে মেঘ চুইয়ে যেটুকু আলো আসে আর তা থেকে যেটুকু জানালা দিয়ে প্রবেশ করে, এইতো। এমন আলো-আঁধারী দৃশ্যের যে বিশেষ দুর্বোধ্যতা, ক্লায়েন্ট নাম্বার ২৩০-এর পাপ-পুণ্যের হিসাব মিলাতে চাওয়াটা আরও জোরদার করল। সে চোখ বুঁজে ভাবতে চাইল, আসলেই পুণ্য বেশি হচ্ছে তো? হঠাৎ একটা বেড়াল তার পা ঘেঁষে মিউ মিউ করে উঠল। বাইরে কয়েকটা কুকুর একসাথে উউউ শব্দ করে উঠলো। একটা অজানা ভয়ে শিউরে উঠে ক্লায়েন্ট নাম্বার ২৩০ বাগানে ছুটে গিয়ে দম নিল।
বৃষ্টি থেমে গেছে। তবু প্রতিটা ভেজা পাতায় বাতাসের আলোড়ন এক হয়ে কেমন মায়াবী শব্দ তৈরি করেছে। এমন মনোরম পরিবেশে তার একটু আগের পাওয়া ভয়টা কেটে যাচ্ছে। ঠিক তো, কথাগুলো মিথ্যা তো নয়! সে কি একজন আলেমের চেয়ে বেশি বুঝে!
বিকেল নামবে নামবে। একরার খানার বাইরের পৃথিবী এখন বেশ সরব। সবাই আগের চেয়ে আরও জোড়ে চিৎকার করেছে, আই মালিশ, মালিশ… এই নেন আমড়া, আমড়া… আম্মা দুইডা ভিক্ষা দেন… ভাত খামু।

এই যে আপনার দুইশ টাকা ভাংতি। আপনি ক্লায়েন্ট নাম্বার ৩১৫। ফাদার জুলিয়ানো আপনার কথা শুনবেন। তিন নাম্বার ঘরটাতে চলে যান।
ক্লায়েন্ট নাম্বার ৩১৫ কামরায় ঢুকতেই ফাদার জুলিয়ানো তার লম্বা আচকান একটু তুলে ধরে বসা থেকে দাঁড়ালেন। তবে তার মুখ দেখা গেল না। তিনি জানালার দিকে মুখ ঘুরিয়ে আছেন।
ক্লায়েন্ট নম্বর ৩১৫ চেয়ারটাতে চুপচাপ বসে পড়তেই ফাদার জুলিয়ানো পার্টিশনের অন্য পাশে বসে ঠাণ্ডা স্বরে বললেন, ঈশ্বর আপনার মঙ্গল করুন। এবার আপনি শুধু আপনার সমস্যার কথা বলুন, মা।
ক্লায়েন্ট নাম্বার ৩১৫ যেন তৈরিই ছিল। বহুদিনের আটকে রাখা পানি যেন স্রোতের মতো গলগল করে বেরোতে লাগল, আমার বিয়ে হইছে তিন বছর আগে। নারায়ণগঞ্জ শহরে প্রচুর খ্রিস্টান থাকায় পাত্র পাইতে তেমন কষ্ট হয় নাই। কিন্তু বিয়ের পর বুঝতে পারলাম লোকটা ফ্যামিলির মান রক্ষায় বিয়েটা করছে। আগে থেকেই এক মুসলমান মেয়ের সাথে তার রিলেশন ছিল। আমার সাথে সে লোকদেখানো সংসার করে। বাচ্চা নিতে দেয় না। মাঝে মাঝে এক বিছানায় যা হয়, তা যেন ভুল করেই।
আচ্ছা।
তারপর আমি এই কষ্ট না পারি কাউকে বলতে, না পারি মানতে, না পারি ভুলতে। সারাক্ষণ এই অপমানের জ্বালা আমাকে একেবারে ছাই করে দিচ্ছে।
আপনি বিয়েটা ভেঙে দিতেন।
না ফাদার, তা পসিবল ছিল না। আমার ইনকাম নাই। বাবার বাড়িও তেমন সলভেন্ট না। ডিপ্রেশন থেকে বাঁচতে কিছুদিন পর নিজেও একটা ইল্লিগাল রিলেশনে জড়ায় পড়লাম। আমার শশুরের ফার্মের দেখাশোনা করে লোকটা। ফাদার, আমি এখন আর চার্চে গিয়ে দাঁড়াতে পারি না। ঈশ্বর আমাকে কীরকম বিপদে ফেললেন! একটা সুস্থ বিবাহিত জীবন হলে আমিও কি একটা শুদ্ধ জীবন যাপন করতে পারতাম না?
হ্যাঁ। সব কিছু ঈশ্বরের ইচ্ছায় হয়। তার প্রজ্ঞা বুঝার যোগ্যতা আমাদের নেই। আমরা কেবল তার ইচ্ছার উপর বিশ্বাস রাখতে পারি। নিশ্চয়ই এখানে আপনার জন্য কোন মঙ্গল আছে।
ক্লায়েন্ট নাম্বার ৩১৫ পার্টিশনের দিকে রেখে বলল, কেমন মঙ্গল ফাদার যেখানে আমি পাপ করছি?

পাপ সহ্য করছেন এবং উলটো পাপ করছেন, তো কাটাকাটি। শুধু খেয়াল রাখবেন পাপ আর পুণ্য কাটাকাটি হয়ে যেন শূন্য না হয়, তবে আর রইলো কি?
পাপ স্বীকার করার নিয়ম অনুযায়ী ক্লায়েন্ট নাম্বার ৩১৫ কাঁদতে শুরু করল।
শুধু শুধু কাঁদবেন না। ঈশ্বর আপনার মঙ্গল করুন।
ফাদার জুলিয়ানো তাকে হতবুদ্ধি করে দিয়ে চলে গেলেন। বিস্ময়ে ক্লায়েন্ট নাম্বার ৩১৫ এর কান্না থেমে গেল। এ আবার কেমন পাপ স্বীকার পদ্ধতি আর কেমন পরামর্শ!
শূন্য ঘরে কিছুক্ষণ বসে থেকে সে এবার ফেরার পথ ধরল। বিকেল মরে গেছে। বাগানে অদ্ভুত শব্দে দোলনাটা দুলছে। ঝোঁপের ভেতর কয়েকটা বেজি মেয়েদের পায়ের নূপুরের মতো শব্দ করছে। শোনা যাচ্ছে কোন অচেনা পাখির ডাকও। ক্লায়েন্ট নাম্বার ৩১৫ দোলনার কাছে গিয়ে শব্দটা থামানোর চেষ্টায় তা চেপে ধরল। এইরকম পুরনো লোহার ক্যাঁচক্যাঁচে শব্দে তার গা শিরশির করে। অদ্ভুত একটা খারাপ লাগা কাজ করে।
গেটের কাছে আসতেই সে আবার দোলনাটা দোলার শব্দ পেল। ফিরে তাকিয়ে দেখল হ্যাঁ, তা আবার মৃদু তালে দুলতে শুরু করেছে। ক্লায়েন্ট নাম্বার ৩১৫ কপালের ঘাম মুছে সহজ হল, দোলনা তো দুলবেই।

অনেকটা রাস্তা হেঁটে, বড় পুকুর পার করে, কাঁচা বাজারে এসেছিল সে। যে ক’টাকা জমেছে তাতে অনায়াসে আজ একরার খানায় একটু ঢু মেরে যাওয়া যাবে। সে বেশ খুশী। তাছাড়া পূজা শেষ হল কিছুদিন হয়। জমানো টাকাগুলোর উপর আবার একটা কিছু চেপে যাবে। দীপনের স্কুলও আজ ছুটি। হ্যাঁ, আজই যেতে হবে।
একরার খানায় ঢুকেই তার মন ভালো হয়ে গেল। দুর্গা মা চলে যেতেই গরম মিইয়ে গেছে। একরার খানার ভেতরে তা যেন একটু বেশি বোঝা যাচ্ছে। ঝাঁকড়া গাছগুলো দূর থেকে ধোঁয়াশা লাগছে। কুয়াশা কি? অথচ কার্তিক সবে এসেছে। জর্জেটের শাড়ি উঁচু করে ঘন ভারী ঘাসে পা রাখল, কিছুক্ষণ খালি পায়ে হাঁটল। তারপর ভেতরে গেল।
পাটির উপর বসে থাকা মেয়েটা যন্ত্রের মতো তার দিকে তাকিয়েই যাচাই করে ফেলল,
হিন্দু ও বিবাহিতা?
হ্যাঁ।
আপনি ক্লায়েন্ট নাম্বার ৪০৫। আটশ টাকা দিয়ে ২ নাম্বার ঘরটায় চলে যান। স্বামী অমনিশ আপনার কথা শুনবেন।
স্বামী অমনিশ আসতে বেশকিছু সময় নিলেন। এর মধ্যে ক্লায়েন্ট নাম্বার ৪০৫ ঘরটা হেঁটে হেঁটে দেখল। জানালায় দাঁড়িয়ে সতেজ গাছগুলোর সুবাস নিল। তারপর কৃষ্ণের একটা ছবির কাছে এসে চোখ বুঁজে প্রার্থনা শুরু করল। স্বামী অমনিশ গলা পরিষ্কার করে তার আগমন বোঝাতেই ক্লায়েন্ট নাম্বার ৪০৫ একটা চেয়ারে বসল। কিন্তু চেহারা না দেখতে পারায় পার্টিশনের কারণে সে স্বস্তি পেল না। মুখ না দেখে কীভাবে কথা বলা যায়! স্বামী অমনিশকে দেখার চেষ্টা করেই ক্লায়েন্ট নাম্বার ৪০৫ হেসে বলল, নমস্কার স্বামীজি।
নমস্কার। মা, এবার আপনার সমস্যার কথা বলুন।
ক্লায়েন্ট নাম্বার ৪০৫ যেন হঠাৎ পানিতে পড়ে গেছে এভাবে কথা হাতড়াতে লাগল। একটু ধাতস্থ হয়ে বলল, স্বামীজি, আমি অনেক পুজো-আচ্চা করি। আমার কথায় বা আমার কাজে কেউ যাতে কষ্ট না পায় সেদিকে খেয়াল করি। সব কাজ নিজে করে স্বামীর টাকা বাঁচাইতে চেষ্টা করি।
এগুলা তো সমস্যা না রে, মা। অপ্রয়োজনীয় কথা মূল সমস্যা গুলায় ফালায়।
আচ্ছা স্বামীজি। এমনিতে আমি চেষ্টা করি সংসার খরচের জন্য যা দেয় তা থেইক্কা বাঁচাইয়া নিজের টুকটাক হাতখরচ চালাইতে।
আপনার স্বামী কি অভাবী?
না স্বামীজি। কামাই ভালো। তবে উনি একটু হিসাবী।
সাংসারিক খরচায় একটু বেশি হিসাবী আর আপনার খরচের বেলায় তার চেয়েও বেশি, এই তো কইতে চান?
স্বামীজির স্মিতহাসি ক্লায়েন্ট নাম্বার ৪০৫ মুখ না দেখেই টের পেল। সে যেন কষ্টে পড়ে স্বীকার করল,
হ্যাঁ। বাইরে যেতে হয় ছেলেদের নিয়ে। আগের মতো আর হাঁটা যায় না, তার উপর রিকশা ভাড়া বাড়তেই আছে। মাঝে মাঝে টুকটাক খাওয়া, সংসারের জন্য হাড়ি-পাতিল, প্লাস্টিকের জিনিস কেনা, নিজের জন্য দু’তিন মাসে একটা সুতির শাড়ি, সিঁদুর,চুড়ি, সাবান, ব্যান্ড এসব তো লাগেই। কত দিদিদের সাথে উঠাবসা। কত দাদাদের ছেলের সাথে আমার ছেলের বন্ধুত্ব! একটা সমাজ আছে না কন? কিন্তু উনি এসব বুঝেন না। অনেক চেষ্টা কইরাও উনারে বুঝাইতে পারি নাই। উনি মনে করেন উনার দেয়া টাকায় আমার হইয়া ভাইসা যায়, আমি উল্টা জমাইয়া কুল পাই না।
আচ্ছা।
আস্তে আস্তে আমি উনার পকেট থেইকা টাকা সরানো শুরু করি। যখন বাজার কইরা আসেন বা যখন টাকা গোনা থাকে না, কিংবা দোকানে বিক্রির টাকা ঘরে আইনাই গোসলে যান, তখন আমি সরায়ে রাখি।
হুম।
এই টাকা দিয়ে যখন শখের একটা দুইটা কিছু কিনি, কোচিং শেষে পোলারে বার্গার স্যান্ডউইচ কিনা দেই, তখন খারাপ লাগে। স্বামীর লগে মিছা কথা কইয়া যত পূজা আচ্চাই করি ভগবান কি তা নিবেন?
আপনি হচ্ছেন অর্ধাঙ্গিনী। সব কিছুতে আপনার সমান দাবী, মা। উনি বুঝতেছেন না। একসময় বুঝবেন কিন্তু তখন আপনি বাইচা নাও থাকতে পারেন, তখন আপনার ছেলে নিয়া বাইরে নাও যাইতে হইতে পারে। এইখানে উনারই পাপ হইতাছে আর আপনি যে পাপ করেতেছেন তা হইতাছে উনার নিষ্কৃতি। ভগবৎ গীতায় আছে, “সকল পুণ্য আলাদা রেখে ঈশ্বরের ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ কর। তিনিই তোমাকে তোমার সকল পাপ থেকে মুক্তি দেবেন। অনুশোচনা কোরো না।” তাই আমার মতে যা করতেছেন তা ঈশ্বরের ইচ্ছাতেই করতেছেন। আপনার পরিস্থিতিই এইরকম।
সত্যি স্বামীজি?
আমার তাই মনে হয়। মানুষের মঙ্গল করবেন, সংসারের মঙ্গল করবেন। এখন আসি। আমার আবার আজকে উপোষ ছিল। শরীর বিশেষ ভালো না।
ক্লায়েন্ট নাম্বার ৪০৫ দুই হাত কপালে ঠেকাল। না, স্বামীজির কথায় তার কোন সন্দেহ নেই। শ্রদ্ধায় সে স্বামীজি বরাবর আরও একটা প্রণাম ঠুকে শাড়িটা একটু ঠিকঠাক করল। তারপর তার ব্যাগের টাকা গুনল। একটা ভালো ব্র্যান্ডের শ্যাম্পু কেনার মতো টাকা তার এখনও আছে। যে হারে চুল পড়া শুরু হয়েছে, তাছাড়া মেনকার বিয়ে আগামী সপ্তাহে। বড়বাজারে আর একটা ঢুঁ দিয়ে যেতে হবে।
ক্লায়েন্ট নাম্বার ৪০৫ বাইরে বসা মেয়েটার সাথে একটু আলাপ জমাতে চাইল, কিন্তু মেয়েটা তাতে কোন রা করল না। মাথা নিচু করে আঙুলের কর গুণে হিসাব করল। সে একটু হতাশ হয়ে বের হলেও বাগানের বাতাস আবার তার মনে ফুর্তি এনে দিল। সন্ধ্যা এইমাত্র নামলেও আকাশে রাত ঢুকে গেছে আর সেই আগত রাতের গায়ে পানসি নৌকার মতো নতুন চাঁদ। আচলটা টেনে সে তার হাত দিয়ে খোপা খুলে চুলগুলো নাকের কাছে আনল। ঘাম আর সাবানের মিলিত একটা সাধারণ মেয়েলি গন্ধ। কিছুদিনের মধ্যেই সেখানে দুর্দান্ত একটা গন্ধ যোগ হবে, ভাবতেই ভালো লাগছে তার।
তবে এমন ঢেউ খেলানো খোলা চুল পেয়ে একরার খানার বাতাস একটু না নাড়িয়ে থাকতে পারলো না। গাছেরা সায় দিতে মাথা দোলাল আর তাতে বাতাস আরও শক্তিশালী হয়ে আবার চুলগুলোকে বেশ এলোমেলো করে দিল। ক্লায়েন্ট নাম্বার ৪০৫-এর মনে হল, ভগবানের কৃপা যেন তাকে নাইয়-ধুইয়ে দিল, তার ইচ্ছাকে সমর্থন করল। সে পুরা বাগানটার দিকে আবার চোখ বুলিয়ে বলে উঠল, দুগগা দুগগা ।

ঘুমে রন্টুর শরীরটা তুলো-তুলো হয়ে আছে। পুলিশ ইন্সপেক্টর জাহাঙ্গীর তাও তার কোমরের দিকে একটা গুঁতো দিল। উফ্ করে শব্দ করে রন্টু পেট চেপে ধরে উঠে বসল। আঠার মতো লেগে থাকা চোখ একটু একটু করে মেলে সে জাহাঙ্গীরকে দেখে ভাবল, মূল গেটে তো তালা লাগানো, এই লোক নিশ্চয়ই দেয়াল টপকে এসেছে। জাহাঙ্গীর তার মোটা পেটের উপর প্যান্টটা সবলে উঠিয়ে চেয়ারে বসে টেবিলে পা ছড়িয়ে দিল।
বলেন কাকু।
এই মাসের মাল ছাড়।
রন্টু তোশকের তোলা থেকে দলা পাকানো কিছু নোট বের করে দিল জাহাঙ্গীরকে।
এই! মাসে মাসে কামাই কমতাছে তোগো! মাইয়াটা কই এইখানে যে বসে?
ও তো যায়গা সন্ধ্যায়।
কেন?
মেয়েমানুষ এখানে থাকব ক্যামনে, হোস্টেলে থাকে।
অসময়ে ঘুম থেকে উঠে রন্টুর প্রস্রাব চেপেছে। সে জাহাঙ্গীরকে ছোট আঙুল দেখিয়ে বাগানে এসে মান্দার গাছের তলায় পাজামা নামাল। জানালা দিয়ে আসা ঘরের আলোতে তার শিশ্নের ছায়া গাছের কাণ্ডে শয়ান হল। রন্টু ছায়াটা বড় করতে আরও একটু বেঁকে দাঁড়াল। প্রস্রাব শেষ হলেও রন্টু কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। ভাবতে লাগল, জাহাঙ্গীরের চাহিদা যেভাবে বাড়ছে, এখানে টিকে থাকা হবে তো! সবার পড়ার খরচা, বাসা ভাড়া, এখানকার দিনের খাওয়া, কারেন্ট বিল। রন্টুর মনে পড়ল, সবাইকেই থার্ড সেমিস্টারের টাকা দিতে হবে সামনের মাসে। এর উপর জাহাঙ্গীর এভাবে জ্বালালে ভিজিট-মূল্য আগের চেয়ে বাড়ানো ছাড়া গতি নেই।
ঘরে ফিরেই রন্টু একমগ পানি ঢক ঢক করে গিলে ফেলল, তারপর বিছানায় বসে বলল, অনেক খরচ কাকু। পড়ার খরচ চলে সবার, বুঝেনই তো। বাবা-মাকেও পাঠাই আমরা।
তাতে আমার কি রে? আমি এমুন একটা জিনিস চালাইতে সাহায্য করতাছি আমার রিস্ক আছে না? আমরা সংসার চালাই না, বাপ বউ নাই? চাকরি গেলে তরা খাওয়াবি?
সরি কাকু।
থো তোর সরি। ব্যাটা এই যুগে হুজুরি হ্যাডম খুইলা বইছ আর মাল ছাড়বা না, তা তো হইব না। তয় আজকা আমি একটা কনফেস করমু।
জি?
জি। কনফেসটা হইলো, তগো মতো চোর বাটপার নিয়া কাম কইরা যে অন্ধকার জমসে তার জন্য আলো দরকার। আলো হইলো মাল আর মাইয়ালোক। যোগার করে দে আমি কনসিডার করমু। তগো লগের মাইয়াটারে আগামী সপ্তাহে থুইয়া দিবি এইহানে। কথা শ্যাষ।
রন্টু বসে বসে পা দোলাচ্ছে। তার দুশ্চিন্তা হচ্ছে।
এলিনা মেয়েটা ঢিট কিসিমের না হলেও কামাই টিকিয়ে রাখতে এই কাজ করলেও করতে পারে, বলা যায় না। আসলে কি পাপই না চলছে এই একরার খানায়! দৈনিক অভ্যাস মতে রণ্টু নিজের অজান্তেই হিসাব করতে চাইল; যেভাবেই হোক কিছু ক্লায়েন্টকে তারা স্বস্তি দিচ্ছে আর সেই পুণ্যে এই পাপ কেটে যাবে। তাছাড়া তারা সবাই যার যার সংসারে সাহায্য করছে। পড়াশোনা শেষ করেও যে কামাই করতে পারবে, তার সাথেও অনেকের খোরাকি জড়িত। জাহাঙ্গীর আবার খেঁকিয়ে উঠল,
বুচ্ছস তো, কি কইছি?
রন্টু নিজের মধ্যে ফিরে এল। কি ভাবছে তা খেয়াল হতেই সে সশব্দে হেসে উঠল।

সূর্য আকাশের ধার ছাড়িয়ে উঠে আসতে আর ঘণ্টা দেড় বাকি। নাগেশ্বর গাছে কাকের ডিম ফুটেছে এইমাত্র। তবে সেখানে চিল্লাফাল্লা নেই। কৃষ্ণচূড়ার মোটা পেট বেয়ে দুটো গুলঞ্চ লতা যার যার মাথা উঁচানোর জন্য ধাক্কাধাক্কি করছে। ঝিঝিরাও একটু দমে গেছে কিন্তু একরার খানার ভেতর থেকে এখনও হুটোপুটি আর গোঙানির শব্দ আসছে। ক্লান্ত কুকুরগুলো বোঝার চেষ্টা ছেড়ে দিয়ে সবে লাফ-ঝাপ থামিয়েছে আর সবজান্তা বেড়ালটা? বেড়ালটা হেলে-দুলে অনেক আগেই এভাবে বাসা থেকে বেড়িয়ে এসেছে যেন তার সব জানা সারা।
সূর্যের বেয়ে ওঠা আরও একটু এগুতেই সব শব্দ থেমে গেছে। জাহাঙ্গীর সুখী অপদেবতার মতো বেড়িয়ে গেছে একরার খানা থেকে। তার গুনগুন করে গাওয়া গান শুনে গাছেরা মুখ চাওয়া-চাওয়াই করেছে।
জাহাঙ্গীরের চলে যাওয়া নিশ্চিত হতেই নিজের কামরার দরজা খুলে আজও মান্দার গাছের তলায় প্রস্রাব করতে বের হয়েছে রন্টূ। ভোরের আগের দিকের ঠাণ্ডা বাতাসে আজ তার বেশ শীত লাগছে। আলো-আধার-মাখা বাগানটার দিকে তাকিয়ে সে ভাবছে, শীত আসছে তার উপর যে ঝোঁপঝাড় তৈরি হয়েছে তাতে কার্বলিক এসিড না ছিটালেই নয়। জানালা দিয়ে আসা আলোয় তার শিশ্নের ছায়ার দিকে চোখ পড়তেই সে চোখ সরিয়ে নিচ্ছে। আজ দুষ্টুমি করার দেখার রুচি নেই তার। পাশের ঘরে এলিনার কি হাল কে জানে!
রন্টু ভেতরে গিয়ে ঘরের লাইট অফ করে দিতেই সমস্ত ভিটেটার বৈরাগ্য গায়ে মেখে একরার খানা আবার চোখ মুদেছে।
এদিকে জাহাঙ্গীর রাস্তায় বেড়িয়ে দেখছে, রাতে কখন যেন এ পশলা চোরাবৃষ্টি হয়ে সারা। রাস্তার পিচ আবলুস কাঠের মতো চকচকে কালো আর সেখানে সমুদয় আলোর প্রতিফলন পায়েচলা পথে যে আভিজাত্য এনে দিয়েছে, তা তার মনকেও ছুঁয়ে যাচ্ছে। এই ফুরফুরে মনটা নিয়ে এই আবহাওয়ায় পুলিশ স্টেশনে ফিরতে মন চাইছে না তার। কিছুক্ষণ ভেবে ভোর হওয়ার আগেই বড়বাজারের দিকে পুলিশ ফোর্স ডাকল জাহাঙ্গীর।
রাত শেষ হয়ে সূর্য তার চেহারা দেখাতে দেখাতেই বড়বাজার এলাকায় শোরগোল পড়ে গেছে। একটু আগে বেশকিছু মাদক ব্যবসায়ী ধরা পড়েছে। সবগুলোকে একসাথে বেঁধে জিপে তুলেছে জাহাঙ্গীর। তারপর জনতার চোখে তার বীরত্বের প্রমাণ দেখে দেখে পরোটা-ভাজি চিবিয়েছে, আগুন-গরম চা গিলেছে।
জাহাঙ্গীরের মতো শহরও আজ বেশ সুখী। এমনিতেও তার শরীরটা কদিন ধরেই হালকা লাগছিল, তবে এইমাত্র বড়বাজার থেকে আরও কিছু ভার নেমে গেল যেন। পাশাপাশি বেশ কিছুদিন ধরে এখানে অক্সিজেন বাড়তি আর তাতে নারীদের পরিচ্ছন্ন শুদ্ধ নিঃশ্বাস যোগ হয়ে বেশ আনকোরা ভাব। শহর আজ বুঝতে পারছে এর সাথে একরার খানার যোগসাজস আছে। লাখো মানুষের আবাসস্থল বলে স্থান-কাল-পাত্রের হিসাব না রাখতে পারলেও শহর এটাও নিশ্চিত যে, মেয়েগুলো একরার খানা থেকে ঘুরে গিয়েই স্বস্তির শ্বাস নিতে পারছে। শহর কৃতজ্ঞ বোধ করছে, পকেটে রাখা মূল্যবান জিনিসের মতোই একরার খানাকে ছুঁয়ে দেখতে চাইছে, আছে তো!

রাবেয়া রব্বানী

ছোটগল্পকার ও অনুবাদক। দীর্ঘদিন ধরে গল্প লিখছেন, অনুবাদ করছেন। প্রকাশিত ছোটগল্পের বই >> নিহত সূর্যের দেশ। অনূদিত গ্রন্থ : প্রেম পুজা ভোগ, আমি এখানে বক্তৃতা দিতে আসিনি