রাসেল রায়হান > ‘ইহুদির গজল’ : কেন গাইব না >> নিজের বই নিয়ে

0
283

রাসেল রায়হান > ‘ইহুদির গজল’ : কেন গাইব না >> নিজের বই নিয়ে

“কবিতাগুলো লিখেছি এক ধরনের নেশার মধ্যে। ঘোর-টোর নয়; নেশা। হঠাৎ নেশা ধরে গিয়েছিল। কে না জানে, সমস্ত নেশাই ফাঁদ। এটাও ফাঁদই ছিল। হঠাৎ আটকে পড়া খরগোশের মতো অসহায় ছিলাম। পরে ভাবলাম, ফাঁদে যখন পড়বই, শিকার যখন হবই, তখন যোগ্য শিকার হব। তখন লিখতে বসেছি। এই বই আমার জন্য আক্ষরিক অর্থেই মুক্তি ছিল। নেশার জগৎ থেকে।”
”…বরং
মুচিকে দেখলেই স্মরণ করো,
যার যতটুকু পা,
ছাপ ঠিক ততটুকু হবে।”
আমার পায়ের মাপ আমি জানি। বেশির ভাগ পাঠক জানেন না, তাই বিভ্রান্ত হন। এই লেখা সেই বিভ্রান্তি কাটানোর প্রচেষ্টা। আমরা সবাই বলি, ‘বইমেলায় আমার বই আসছে, সংগ্রহ করুন।’ অনেকে ‘দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়ার আগে’ শব্দরাজিও ব্যবহার করেন, চক্ষুলজ্জার খাতিরে সেটা হয়তো বলেনও না আবার অনেকে। কিন্তু কেন বলেন, সেটার কোনো ব্যাখ্যা নেই। ‘ইহুদির গজল’ কেন পড়ব? আমার মনে হয়েছে, সেটা বলা যায় এখানে। বলতে গিয়ে মনে হলো, সেটা বলার মতো তেমন কোনো কারণ এই বইয়ে নেই। যারা আমার কবিতার সঙ্গে পরিচিত (আমি সৌভাগা যে আমার বই কেউ কেউ কেনে, অন্তত ৩০০ বই শেষ হয়ে যায়, যদিও আমি এই বই নিয়ে তীব্র সন্দিহান যে এটা ১০০ জনও হয়তো পড়বে না, এই লেখা পড়ার পর হয়তো ২-৪ জনেও থাকবে না সংখ্যাটা), তারা মোটামুটি একটা ধারণা রেখেছেন যে আমার কবিতা সহজ, মোটাদাগে কিছু গল্পের আভাস থাকে এবং সেটা আবেগে পরিপূর্ণ হয় বলে পাঠক গলে যায়, কখনো কখনো কিছু মেসেজ থাকে, যেটা পড়ে মনে হয়, আরে, এভাবেও তো ভাবা যায়; এতটুকুই; এই বইয়ে সেসব কিছু নেই।
”কোনো ফরসা হরিণও
তার কালো ছায়াকে
কীভাবে অস্বীকার করবে?
…একখণ্ড ক্ষুদ্র পারদ
মিশে যাচ্ছে
বড় পারদখণ্ডের সাথে…
এভাবে মিশে যাও,
দাগহীন।
ফুলসমূহের আগেই
ফুটে ওঠো
ক্ষুধা নিবারক ফলরূপে।”
ক্ষুধানিবারক ফল হওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকেই লেখাগুলো শুরু করেছিলাম। দু-একটা লেখার পর মনে হলো, আমি আসলে নিজের ক্ষুধাই নিবারণ করছি। দু-আড়াই বছর আগে যখন ‘ইহুদির গজল’-এর কবিতাগুলো লিখতে শুরু করি, তখন বেশ গর্বসহকারে বলেছিলাম, সুফিকবিতা লিখছি। দু-চারজন অনুপ্রেরণাও দিয়েছিলেন। এবং এগুলো যে মূলত সুফিকবিতা নয়, কেউ সেটা বলেনওনি আমায়। আমি আহত হতে পারি ভেবেই হয়তো তাঁরা আমার ভুলটা ভাঙানোর চেষ্টা করেননি। আঘাত অবশ্য আমাকে পেতেই হলো, যখন কিছু সত্যিকারের সুফিকবিতা পড়ার সৌভাগ্য আমার হলো। সদ্যোজাত শিশুর কাছে আঁতুড়ঘরের ছাদকেই আকাশ মনে হয়, আমারও শুরুতে সেটাই হয়েছিল। এখন আমি নিজে বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি, এগুলো সুফিকবিতা নয়। আমার মতো লোভী মানুষের পক্ষে সুফিকবিতা লেখা যে এ জনমে সম্ভবও নয়, সেটুকু বোঝার মতো জ্ঞান পরম করুণাময় আমাকে দিয়েছেন।
”আর
এত অধিক ভালোবেসো না।
জেনে রাখো,
গোলাপের নামেও
কেউ কেউ অভিসম্পাত দেয়;
যাদের পিঠ
গোলাপের ভারে
ন্যূব্জ হয়ে আছে!
কেউ জানে না,
প্রত্যাখ্যাত প্রেমিকের হৃদয়
মূলত
সেই পিঁপড়া,
যে
ক্রমাগত পালিয়ে বেড়ায়
বালিকার হাতের আতশ কাচ থেকে;
সদ্য যেই বালিকাটি
শিখেছে
আতশ কাচের ব্যবহার।”
পুরো বই খুঁজলে আদৌ কিছু যদি পাওয়া যায়, সে হলো উপদেশ। উপদেশে উপদেশে সয়লাব, বৃদ্ধরা যেটা বিলান আরকি। সুতরাং এই বই আমার জন্য একটা ঝুঁকি, বৃদ্ধ অভিধা পাওয়ার ঝুঁকি।
এই বই আসলে এক বৃদ্ধের চাপিয়ে দেওয়া বোঝাও। যেসব উপদেশ বিলানো হয়েছে, সেগুলিও যে সবসময় ইতিবাচক, তা নয়, নেতিবাচকও মনে হবে অনেক সময়। এমনিতেই আমরা উপদেশ নিতে পারি না, তার মধ্যে নেতিবাচক। ফুলের দোকানে কাজ করা মানুষটি যখন ফুলের বোঝা পিঠে তোলে, তখন ফুলকেই তার কাছে অভিশাপ মনে হয়, সেখানে এসব উপদেশ অভিশাপ বৈ কিছু হতেই পারে না।
”মায়া সেই মর্দা হরিণের নাম
শিকারের উদ্দেশ্যে নেমে
তীব্র ক্ষুধার্ত একটি মাদী বাঘ
যার
শরীর
চেটে দেয়,
আমৃত্যু
…আর
মোহ সেই বাঘিনীর শাবক
যে
ভাবছে,
মা
তার জন্য হরিণটিকে
খাবার উপযোগী করছে—
অনন্তকাল ধরে”
তবু… যে দু-চারজন পাঠক শেষমেশ এই বই সংগ্রহ করবেন, তাদের আমার কাছে মনে হয় বাঘিনীর সেই শাবকের মতো, আমার কবিতা লেখা দেখে ভাবছে যে আমি তাদের জন্য খাবার প্রস্তুত করছি। আসলে আমি আমার নিজের খাবারটাই খেয়েছি। কবিতাগুলো লিখেছি এক ধরনের নেশার মধ্যে। ঘোর-টোর নয়; নেশা। হঠাৎ নেশা ধরে গিয়েছিল। কে না জানে, সমস্ত নেশাই ফাঁদ। এটাও ফাঁদই ছিল। হঠাৎ আটকে পড়া খরগোশের মতো অসহায় ছিলাম। পরে ভাবলাম, ফাঁদে যখন পড়বই, শিকার যখন হবই, তখন যোগ্য শিকার হব। তখন লিখতে বসেছি। এই বই আমার জন্য আক্ষরিক অর্থেই মুক্তি ছিল। নেশার জগৎ থেকে। সুতরাং এটাকে বই করা প্রকৃতপক্ষে পাঠককে ঠকানোই, মূলত এটা আমার নিজের বাঁচার প্রাণপণ আকুতি। নইলে ক্রমাগত পালিয়ে বেড়াতে হতো বালিকার হাতের আতশ কাচ থেকে; সদ্য যেই বালিকাটি শিখেছে আতশ কাচের ব্যবহার।
”অথচ,
তুমি ডাকলে
একটি অপরিচিত মোরগ
সাড়া দেবে না।
এর তরজমা এই নয় যে
সব অপরিচিত মোরগই
বধির
দেখো,
আহত ঐ ফুলটিকে—
মৌমাছির দিকে
না যেতে পারার বেদনাও সে
গোপন রেখেছে”
পাণ্ডুলিপি রেডি করতে গিয়ে সবার প্রথম যে ঝামেলায় পড়েছিলাম, সেটা হলো বইয়ের নাম। এই বই এমন যে কোনো নামই খুঁজে পাচ্ছিলাম না, যেটি শুনলেই এক লহমায় এর চরিত্র ধরে ফেলা যাবে। শেষমেশ এই নামের আশ্রয় নিতে হলো। নামটা প্রথম বইয়েরই রাখতে চেয়েছিলাম। নানা কারণে রাখা হয়নি। এই বইয়ে এসে সেটা রাখা গেল। আমার বিশ্বাস, আপনি যে মানুষটিকে সবচে ঘৃণা করবেন, কোনো এক ডুবন্ত মুহূর্তে সে-ই হয়তো আপনার হাতটা ধরবে এসে প্রথমে। ধরবেই যে, এমন নয়, তবে ধরতেও পারে। এই সহজ বিশ্বাসটুকুই এই বইয়ের নাম। পুরো বইয়ে ৯টা কবিতা (নাকি ৮টা, আল্লাহ জানেন, মূল পাণ্ডুলিপি আমার কাছে নেই আর), যার একটিও সহজ নয়, আমার আগের কোনো কবিতার সাথে সামান্য মিলও নেই, কোনো মেসেজ নেই, আগেই বলেছি, মাঝেমধ্যে যা আছে বিরক্তিকর উপদেশসদৃশ সব বস্তু, তা-ও এলোমেলো, বিচ্ছিন্ন, এবং সব মিলিয়ে শেষে যে চিত্র দাঁড়াবে, সেটা আপাতদৃষ্টিতে শূন্য। অনাপাত-দৃষ্টিতেও।
একদম যে কিছুই নেই এ বইয়ে, সেটা বললে নিজের প্রতি অন্যায় করা হবে, অথবা এই বইয়ের প্রতিই। আহত ফুলটির বেদনা ধরে রাখার একটা দুর্বল প্রচেষ্টা আমার আছে। সে প্রচেষ্টাটুকুর একটা ‘সুররিয়ালিস্টিক’ চিত্র পাবেন এই বইয়ে।
”দোযখে
কর্মরত ফেরেশতার কথা ভাবো।
বেহেশতের
একটা ঝুলন্ত আঙুরও
সে দেখতে পায় না।
নিয়তি এমনই—
অনিবার্য
অমোঘ।”
যখন ‘ইহুদির গজল’ শুরু করি, তখন সামান্য অংশবিশেষ আমার প্রথম বই সুখী ধনুর্বিদ-এ নিয়েছিলাম, এই বইয়ের পূর্ণাঙ্গতার খাতিরেই সেটুকু ফিরিয়ে আনতে হলো। এ-জাতীয় লেখা আমার কাছে মূলত একটি ফাঁদের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ছিল; পুরোপুরি মুক্তির একটাই উপায় ছিল, বই করে ফেলা। সুতরাং এ বই আমার নিজের মুক্তির লোভে। আর এই লোভটুকুর জন্যই আমার কোনোদিন সুফিকবিতা লেখা হয়ে উঠল না। হয়ে উঠবেও না।
আবারও বলছি, কবিতাগুলো বিচ্ছিন্ন। পুরোটা পড়ে হতাশ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এবং পাঠক হতাশ হবেনও, সে নিশ্চয়তা আমি দিচ্ছি। এই বইয়ের নিয়তি আমি জানি। অনিবার্য সে নিয়তির মধ্যেও বরং কখনো কখনো মায়া লাগবে দোজখে কর্মরত ফেরেশতাটির জন্য। ভরদুপুরে কেউ হয়তো গেয়ে উঠবে ইহুদির গজল। যদিও মায়া সেই মর্দা হরিণের নাম, শিকারের উদ্দেশ্যে নেমে তীব্র ক্ষুধার্ত একটি মাদী বাঘ যার শরীর চেটে দেয়, আমৃত্যু।

[ব্যবহৃত পঙক্তিগুলো ‘ইহুদির গজল’ থেকে নেওয়া। বইটি প্রকাশ করেছে জেব্রাক্রসিং প্রকাশনী (৩৩২ নম্বর স্টল)। প্রচ্ছদ করেছেন মাসুক হেলাল। বইটির গায়ের মূল্য ১৮০ টাকা।]