রিমঝিম আহমেদ >> আমার কবিতা লেখা আর কবিতাগুচ্ছ

0
549

আমার কবিতা লেখা >>

মনে নেই কবে থেকে কবিতা লিখতে শুরু করেছি। প্রিয়জনদের মৃত্যুশোক, আপনজনদের অবহেলা এসবের ভাগ নেয়নি কেউ। চিরকাল বন্ধুহীন ছিলাম, ভালো বন্ধু যাকে বলে! নৈঃসঙ্গ্য থেকে ডায়েরি লিখেছি। এভাবেই হয়তো কবিতার দিকে হাঁটা। যদিও আমি আজও নিশ্চিত নই, কবিতা লিখি কি না। একে কবিতা না বলে জীবন বললেও ভুল হবে না। জীবনে খুব কম মানুষ বুঝতে পেরেছে বা চেয়েছে। আমাকে মানুষ সম্ভবত খুব একটা সয়ে নিতে পারে না। আমারই সমস্যা। এই অস্বস্তি থেকে নিজেও মানুষের সাথে মিশতে পারি না। ফলে আরও একা হই। কী জানি, হয়তো মানুষের ভালোবাসা কিংবা অপমানের জবাব দেবার এটাও এক মাধ্যম। আর তো কোন পথ নেই।

কবিতাগুচ্ছ >>

ঝড়ের নির্বাণ
শত-বয়স্ক বটের নীচে অসহ্য এই প্রাণায়ু
আমার। ছলনা কতটা আর আড়ালে রাখা যায়!
ডাকবাক্সে চিঠি নেই, তবু কত কথা পড়ে ফেলি হায়!
কালের ক্রূরতা এত ভাষার শরীরে! এত বায়ু
বয়! পাতার নক্সাটা ভেদ করে কে-বা আর বের করে
ঝড়ের নির্বাণ? ভেঙে যায় কাচ, ঝুর ঝুর শব্দে
শুধু চমক, গোপন সংকেত অগণ্য শত অব্দে
লেগে থাকা ঘুম চোখ থেকে খুলে নেয় মন্বন্তরে!
এতটা চাপের মুখে অন্য কোন নাম তাবিজের
খোলে নিয়ে বুকে ধরে রাখি! আজ বা সামান্য
কোনো দিন সকল সুন্দর ব্যর্থ হলেও পলান্ন
খেতে খেতে ভুলে যাব হতব্রহ্ম পৃথিবীর ফের
পুড়ে যাওয়া হাড়, চেটে খাচ্ছে মাতাল ডাইনোসর
জতুগৃহ জ্বলে যায়, বহুদূর আলেয়া নগর…
ছুটির দিনের কবিতা

রাঙ্গুনিয়া যেতে হলে পার হয়ে যেতে হয় নদী
হালদা-ব্রিজ, তোমাকেও। একদা ওখানে আমার মা
থাকতেন, বাবাও আর সবুজ ঘাসের মতো জল-
রোদে আমরাও বেড়ে উঠেছিলাম। ফুলতোলাজামা
মাটির খিড়কিটি থেকে নিরক্ষর সাক্ষ্য রেখে যায়
আচারের বোয়ামভরা শৈশব, বার্ধক্যপীড়িত
চোখে দিলুর মা হুঁকো টানে, তার মনে সেগুনের
ছায়া। সময়ের পদ্য লেখে চামড়ায় কি পৌষী শীতও?

শিলকের চা-বাগান, অড়হর সবুজ বনানী
নাম ধরে ডাক দেয় টিলাভরা হলুদের ফুল
নৌকায় নাইয়রী বউ বুকে তার কুহুতাল নদী
বিবাহজমিন ধরে উড়ে গেছে সকল কবুল
মুহূর্ত পেরিয়ে যায় সবুজ পারুয়া, ইছাখালি
পাঁজরের জাগে বসে লেজ নাড়ে লাল টেন্টারালি
নিয়তি মানি না তবু নিয়তি কিছু তো আছে, যাকে
বয়ে যেতে দেখি হাতের তালুতে। গড়হাটবারে
বাড়ন্ত আনাজ, চাল। নৌকা ভিড়ে হাটবারে ইছামতী
খালে। পাশে মরা-কাক ঝুলে আছে দূরগামী তারে।
একফালি মেঘ এলো, একমুঠ কাঁকর জীবন
এইভাবে ধরে আছি এই বুঝি হাতছাড়া হবে
গ্রামের সবুজ চিল যার চোখে উড়ে যেতে দেখি
তার নাম নিতে নেই, তার কথা বলাও বারণ
ভেতরে শরীর নেই, মন নেই ছায়ার বল্কলে
তোমাকে আঁকড়ে ধরে একা থাকা যৌথপরিবারে
বেঁচে থাকা একমাত্র শখ, দিগন্তে-ভূমিতে মাখামাখি
আমিও ফেঁসেছি যেন বিবাহের অধিক সংসারে
অশ্রুহীন কান্নাধারা অলিখিত কবিতার ছাই
কাগজে স্বাক্ষর করে জীবন বিকিয়ে দেয়া যায়
কামড়ের দাগ
অপঘাতে মরে যাব একদিন
এ ভেবেই শান্তি পাই- আমাকে বুড়ো হতে হবে না
অন্ধকার ঘরে রাত হাততালি দেয়
কয়েকটা বেলুন আজও জমা রাখে শিশু
এই পৃথিবীর নোংরা ভাগাড়ে এটুকুই ছাড়
এটুকুই ছারখার!
সুন্দরী তরতর উড়ে যাচ্ছে মেঘে
পিচ্ছিল সিঁড়ি বেয়ে ভুল প্রশংসায়
আমি টের পাই, সে কি টের পায়?
এই অর্ধনির্মিত ফ্লাইওভার, ধুন্ধুমার মাছিদের
সাথে জেগে থাকে। শহুরে বেশ্যারা গুনে রাখে
মুখের মুখোশ, ফলের বিচি, খোসা
মাছির চেয়েও সৎ নিভে-যাওয়া আগুনের কলরব
কবিতার হাতে পরিয়ে দিয়েছে উলেন দস্তানা
রাতের হাইওয়ে, ভূমিহীন পিঁপড়ের মৃত্যু
অপঘাত ডাকনাম ধরে ডাকে
…আমার কবিতাজুড়ে মানুষের কামড়ের দাগ।
আবারও পরানসখা

আমার যা ত্রুটি আছে, তোমাকে দেব না, ভালোটুকু
নাও। যে নিশ্বাস ভারী হয়ে বুকে চেপে আছে, পারো–
যদি কিছুটাও ভাগ নাও, আরও কিছু বেঁচে থাকা
আমাকে পোহাবে, ভাদ্রের রোদের জরাহীন তেজে

ছায়াময় মেঘ ছুঁয়ে ছুঁয়ে পাখির ডানার মতো
উড়ে যাব বিশুদ্ধ হাওয়ায়। সে তো স্বপ্ন, শিশুতোষ!
অদ্ভুত পাগল থেকে দূরে থাকে প্রলাপের ভয়ে
পুরুষ নদীর বুকে টলে ওঠে জল, নৌকো ভরে
যায় বিচিত্র বিচ্ছেদে। তোমার ঝলমলে প্রেমিকা
থেকে কয়েকশো গজ দূরে অব্যর্থ চিঠির মতো
মুছে যাই চতুর্ভুজ ভাঁজে। দেখা হয়, দেখা হয়ে
যায়… তবু খরখরে থাকি, বিষণ্ন ঈর্ষার ঘা’য়ে
তোমার অভাব নিয়ে হাঁটি, ঈষৎ শিশিরে ভেজে
চোখ, …মৌন কুর্চিফুল আমার পরানসখা হোক!
রিমঝিম আহমেদ >>
জন্ম ৮ জুলাই, ১৯৮৫, রাঙ্গুনিয়া, চট্টগ্রাম।
প্রকাশিত কবিতার বই : লিলিথের ডানা (২০০১৬, চৈতন্য), কয়েক লাইন হেঁটে (২০১৮, জেব্রাক্রসিং), ময়ূরফুলের সন্ধ্যা (২০১৯, বাতিঘর), সুবেহ তারা (২০১৯, তবুও প্রয়াস, কলকতা)