রুখসানা কাজল > ও শান্তি ও স্বদেশ >> ছোটগল্প

0
97
Joydeep chottopadhaya

রুখসানা কাজল > ও শান্তি ও স্বদেশ >> ছোটগল্প

এসপি নূরতাজ মন্ডল সাতসকালে থানায় এসেছে। ওসি হামিদুল্লা ছুটে আসে, জী স্যার, সালাম স্যার। ইয়েস স্যার, কোন কেসটা স্যার? বুঝেছি স্যার। শুয়োরের বাচ্চাটা প্রায় ম্যাসাকার করে ফেলছেলো স্যার। দাঙ্গা হয় নাই এই রক্ষে। নাস্তা করেন স্যার। অনেকদিন পর আমাদের মনে করলেন স্যার।
নূরতাজ নাস্তা করবে বলে জানিয়ে দেয়।
নাস্তার আগে এক মগ কড়া রঙ-চা দিতে বলে বাঁ হাতের কব্জি তুলে ধরেন । সকাল সাতটা উনিশ মিনিট। তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন, জগতের এই শুভক্ষণে বুদ্ধিকে শুদ্ধি করতে রঙ চায়ের কোনো জুড়ি নাই । খানিকটা গা ছেড়ে দিয়ে আরাম করে বসে তিনি ক্যাজুয়ালি রুমটি দেখতে থাকেন। এটি তার ছেড়ে যাওয়া থানা। রুমটি তার ছিল। এখনো তেমনি পরিচ্ছন্ন আর সাজানোই আছে সবকিছু।
এই থানাটা পুবমুখি। রুমের ভেতরে বসে উদিত সূর্যের গতিবিধির সাথে আলোর বিন্যাস সহজেই বোঝা যায়। নূরতাজ মন্ডল নিজ হাতে এই থানার অফিস সাজিয়ে নিয়েছিলেন। দেয়ালে জাতির পিতার ছবির পাশে প্রধানমন্ত্রীর ছবি। খুব ছোট বেলায় জাতির পিতাকে চাক্ষুষ দেখার অভিজ্ঞতা আছে নূরতাজ মন্ডলের। তারপরেই তো হত্যা করা হয় তাকে। আর সংবিধানের মূলস্তম্ভ থেকে মুছে দেওয়া হয় ধর্মনিরপেক্ষতা। দ্বিতীয়বার ছবিদুটো দেখে তিনি মনে মনে কিছু হিসাব করে নেন।
ওসির এই রুমে একসময় তিনি বসতেন। প্রমোশন পেয়ে এখন বড়সায়েব হলেও ওসির সাথে বন্ধুতার সম্পর্ক আগের মতই রয়েছে। দীর্ঘ চাকরি জীবনে এরকম অনেক জুনিয়রকে তিনি সময়, পরিস্থিতি, ব্যক্তি, সমাজ, সম্প্রদায় অনুযায়ী কাজ করতে শিখিয়েছেন। যে-কোন জটিল কেসে এরা এখনো তার শরণ নেয়। প্রয়োজনে তিনিও এদের ডেকে পাঠান।
হামিদুল্লা এদের মধ্যে ব্রিলিয়ান্ট অফিসার। আকস্মিক যে-কোনো ঘটনায় সৃষ্ট মব নিপুণভাবে সামলাতে শিখে গেছে। গেল কালকের ঘটনা সত্যি মিথ্যে যাই হোক, অনেক দূর যেতে পারত। উত্তেজনায় উন্মত্ত ক্ষিপ্ত গ্রামবাসীদের হাতে ছেলেটা খুন হয়ে গেলে অবাক হওয়ার কিছু ছিলো না। নগর কমিটির ক্ষমতাসীন এক নেতা তো মুঠোফোনে বলেই দিয়েছিলো, সামনে ইলেকশন। এ সময়ে এই ঘটনা । শালাকে ছারপোকার মতো মেরে ফেলা দরকার !
সরকার বিরোধীরাও ওঁত পেতে আছে। থানা পুলিশ আর ফরিয়াদি গ্রামবাসীদের কঠিন দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করছে তারা। ক্ষমতাসীন সরকারকে ফাঁদে ফেলার সামান্যতম সুযোগ, সূঁচ মাপের হেলাফেলার ফাঁদে পড়ে ছাড় দিতে নারাজ এরা।
নূরতাজ মন্ডল অবশ্য অন্য খবর পেয়ে ছুটে এসেছেন। একেবারে ইনোসেন্ট একটা সূত্র তাকে খবরটা দিয়েছে। তারাও ওই গ্রামের একই সম্প্রদায়ের বাসিন্দা। নামধাম গোপন রাখার শর্তে অনুরোধ জানিয়েছে, ছেলেটাকে বাঁচান স্যার। ঘটনাটা হঠাৎ ঘটে গেছে। একেবারে আকস্মিক স্যার। মুহূর্তের মধ্যে কী যে হয়ে গেলো স্যার। বোকাসোকা সরল টাইপের ছেলে। ওই ঠেলাগাড়ি চালায়ে খায় স্যার। আমাদের চেনাজানা স্যার। যা ঘটেছে একেবারে অঘটন। মা দুগগার কিরে স্যার।
তিনি খোঁজ নিয়ে আরো জেনেছেন, গত বছরদুয়েক ধরে গৃহস্থ বাড়ি ঘুরে ঘুরে মা বউ ঝিদের কাছ থেকে কলা পেঁপে ডাব নারকেল কিনে নেয় ছেলেটা। এতে গৃহস্থেরও উপকার হয়। আবার ছেলেটারও কিছু আয় রোজগার হয়। কাজটা একাই করে। আজ পর্যন্ত কারো সাথে কোনো অসৈরণ ঘটেনি। নারীকূলের মা বউ ঝি আর বুড়োরা ছেলেটাকে বেশ পছন্দই করে। শহর থেকে অনেক দরকারি জিনিস তারা এই ছেলেটাকে দিয়ে আনিয়ে নেয়। অনেক সময় এটা-সেটা খেতে দেয়। কোনো কোনো দিন দুপুর বেলা মুখ শুকনো দেখলে কেউ কেউ স্নেহের বশে দুটো ডালভাত না খাইয়ে কিছুতেই ছাড়ে না।
সাদা টোস্ট আর চা নিয়ে এসেছে সদ্য গোঁফ-ওঠা এক অচেনা ছেলে। তিনি এসেছেন শুনলে জব্বার দোকানি নিজেই চলে আসে স্পেশাল রং-চা নিয়ে। ক্রমশ বিস্তৃত টাকে হাত বুলিয়ে তিনি ভাবেন, জব্বারের হয়ত শরীর খারাপ। দোকানে বসেনি আজ। প্রায় বছর দুই এদিকে আসা হয় না। মোবাইল চার্জে বসিয়ে টেবিল ক্যালেন্ডারের পাতা বদলে ভাবেন, একবার জব্বারের সাথে দেখা করতে হবে। জব্বার তার এক্সক্লুসিভ স্পাই ছিল। ঘটনার পেছনের ঘটনা জব্বার ছাড়া আর কেউ এমন নিখুঁতভাবে তাকে এনে দিতে পারেনি।
ট্রে রেখে নূরতাজ মন্ডলের পা ছুঁয়ে সালাম করে কিশোর ছেলেটি। অবাক হন না তিনি। এরকম সালাম দিনে-রাতে বহুবার তিনি পান। তাকে নিতে হয়।
কে বলেন তো স্যার? কিশোর ছেলেটা চলে যেতে হামিদুল্লা হাসতে হাসতে প্রশ্ন করে। অবাক হয়ে জিজ্ঞাস্য চোখে জানতে চান, কে?
জব্বারের ছেলে স্যার।
জব্বারের। আরে সে কেমনে হয়। জব্বার তো…
হামিদুল্লা কানের দু-পাশে লেপ্টে থাকা টুপি ছুঁয়ে হাসে। বিগলিত কিন্তু বসের প্রতি সম্ভ্রমের ফ্রেমে বাঁধাই সে হাসি। নূরতাজ হামিদকে দেখে মনে মনে তারিফ করেন। নাহ তার শিক্ষা ব্যর্থ হয়নি। হামিদ মনে প্রাণে তাকে ফলো করে শুনেছিলেন বটে। এখন সামনা-সামনি দেখছেন।
শরীফ জব্বারের সেই চলে যাওয়া বউয়ের ছেলে স্যার। ওর বউ মরে গেছে তিন বছর আগে। জব্বারই নিয়ে এসেছে ছেলেটাকে। ইশকুলে দিয়েছে। ছেলেটা জানে জব্বার ওর বাপ। আসলে ওর বাপ বলে কেউ নাই স্যার। প্রস্টিটিউটের ছেলেমেয়েদের কি নির্দিস্ট কোনো বাপ থাকে স্যার।
এবার নূরতাজ মণ্ডলও হাসেন। সাধারণ আড্ডার সাধারণ মানুষের মতো সে হাসি। এই সাতান্ন বছর বয়সে তিনি জেনে গেছেন, মানুষের মনের মতো চিত্রবিচিত্র প্রাণী এই পৃথিবীতে আর কেউ নেই। পুরুষত্বহীনতাকে চ্যালেঞ্জ করে পালিয়ে গেছিল বলে জব্বার তার বউকে চুরির অভিযোগে জেল পর্যন্ত খাটিয়েছিল!
জব্বারকে দেখা করতে বলে আসল প্রসঙ্গে ফিরে আসেন তিনি , ওই ছেলেটাকে একবার আনো হামিদ। টপ সিক্রেট।
মার খেয়ে ঢোল হয়ে গেছে ছেলেটার চোখ মুখ। ফেটে যাওয়া জায়গাগুলোতে রক্ত জমে কালো হয়ে আছে। হাতের আঙুলগুলো ভাঙা। কেউ কেউ এত জোরে চুল টেনে নিয়েছে যে মাথার চাঁদির কিছু অংশের চুল উঠে গেছে। সেই ফাঁকা জায়গায় কালো কালো রক্তের দানা জমাট বেঁধে আছে। কেবল কি করে যেনো হাঁটুর নিচ থেকে পা-দুটো অক্ষত রয়ে গেছে। থানার হাজত থেকে হেঁটেই এলো ছেলেটা।
নূরতাজ মন্ডল ঘাগু পুলিশ। ছেলেটা যে সাগু পাবলিক তা একনজর দেখেই বোঝা যাচ্ছে। অপরাধ করতে হলে এলেম লাগে। ছেলেটাকে এলেমদার লাগছে না। তাছাড়া এ ধরণের অপরাধ যারা করে তারা থাকে দলেবলে। প্রতিমা ভাঙতে আসে গভীর রাতে। তাদের কেউ ধরা খাওয়া মাত্র প্রকাশ্যে বা অপ্রকাশ্যে থানায় যোগাযোগ করে তারা। মুচলেকা দিয়ে অপরাধীকে ছাড়িয়ে নিয়ে যায় ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে। এখন পর্যন্ত কেউ যোগাযোগ করেনি। গ্রামবাসীরাও জানিয়েছে তারা আর কাউকে দেখেনি। তার মানে ছেলেটা একা ছিল।
কিন্তু অপরাধ হয়েছে। এবং আর কেউ নয় কেবল এই ছেলেটিকেই হাতেনাতে অপরাধ সংঘটনের জায়গা থেকে পাকড়াও করে রঙ ধোলাই করেছে গ্রামবাসীরা।
নূরতাজের কেমন জানি অস্বস্তি হয়। অনেক বছর তিনি এরকম তৃণমূল পর্যায়ের অপরাধীদের নিয়ে কাজ করেন না। এখন তার অপরাধীরা বিত্তবান, অভিজাত কমবেশি শিক্ষিত আমলা, ব্যবসায়ী , শিক্ষক, সাংবাদিক, ধনী ঘরের উচ্চাকাঙ্ক্ষী বখাটে ছেলেমেয়েরা। এদের চোখের উপর কয়েকবার হাই পাওয়ারের টর্চের আলো ফেললে এরা গড়গড় করে অপরাধ স্বীকার করে নেয়। তিনি হামিদুল্লাকে ডেকে ছেলেটিকে জেলের হাসপাতালে পাঠিয়ে কিছুটা ফ্রেশ করে আনতে বলেন।
গ্রামবাসীদের মারপিটে ক্যারিশমা নেই তেমন। মেরেছে অনেক কিন্তু কায়দার মার নেই। ছেলেটা সুস্থ হয়ে যাবে দ্রুত। হামিদুল্লা খানিক ভাবিত হয়ে পড়ে। এরকম একটি সাধারণ কেসে স্যারের এতখানি সময় ব্যয় করার কি কারণ থাকতে পারে কে জানে! সরকার পক্ষের স্থানীয় নেতারা তো বলেই দিয়েছে হাড্ডি ভেঙে কয়েক বছর জেলের ঘানি টানাতে। বুদ্‌বুদের মতো হাসি উঠে মিলিয়ে যায় হামিদুল্লার মনে। এখন আর জেলে ঘানি কোথায়! বন্দিরা সবাই জামাকাপড় সেলাই করে। আচার বানায়। কুটির-শিল্পের কাজ করে। অপরাধীদের কেউ কেউ আবার পড়শোনার সাথে গান বাজনা, নাটক-টাটকও করে।
স্যার লাঞ্চ করতে পারে ভেবে হামিদুল্লা জব্বারের দোকানে তেলমশলা কম দিয়ে মাছ-মাংস রান্নার অর্ডার পাঠিয়ে দেয়।
এর মধ্যে জব্বার এসে যায়। জব্বারের দড়ি পাকানো শরীরে স্নেহগাছ বেশ শক্ত করেই বাসা বেঁধেছে। ফুলফল লতাগুল্মে ভরভারান্ত সে মায়াবৃক্ষ। জব্বার এখন কথা বলে সুখি মানুষের মতো, শরীফরে নিয়ে আলাম স্যার। আমার কম্মে তো আর সন্তান হলো না স্যার। ফাউ পালাম। আল্লাহর দান স্যার। ফেলি কি করে বলেন! তয় স্যার বাবা হওয়ার মেলা সুখ স্যার। কেমন যেনো স্বপন আসে স্যার । ঘুমে জাগরণে চোখে মুখে মনে। স্বপন খালি বাড়ে। বাড়তি বাড়তি বিশাল হয়ি যায় স্যার। ঘর বাড়ি মাঠ ঘাট নদী পারায়ে কোথায় কোথায় যে ভাসি চলি যায়! আমি কি ভালো বাপ হতি পারবো স্যার!
লাঞ্চের আগেই ছেলেটা ফিরে আসে। মাথা মুখে কয়েকটি ব্যান্ডেজসহ আঙুলগুলো প্লাস্টারে বাঁধা। মোটামুটি ভালো দেখাচ্ছে ছেলেটাকে।
কথা বলতে পারবি? থানায় থাকা একটি টুলে বসিয়েছে ছেলেটাকে। স্যারের গোপনীয়তার স্বার্থে হামিদ রুম ছেড়ে বেরিয়ে যেতে চাইলে ওকে থাকতে বলে নূরতাজ।
শুক্রবারের হাঁটে আনা চালকুমড়োর মতো সাদাসিধে চোখে চেয়ে আছে ছেলেটা। দাগ আঁকলে এখুনি দাগ বসে যাবে এমন সরল মুখ।
কেন গেছিলি অই গ্রামে?
বলাই সাহার বাড়ি থেকি কলা আনতি গেছিলাম স্যার।
তাইলে মন্দিরে ঢুকলি কেন?
মাথা নীচু করে ফেলে ছেলেটা। নূরতাজ লম্বা শরীরটা টেবিলের দিকে ঝুঁকিয়ে নরম গলায় জানতে চায়, তোর তো কলার গাড়ি নিয়ে চলে আসার কথা ছিল। মন্দিরে গেলি কিভাবে ?
পেরেচ্ছাপ পাইছিল স্যার। মন্দিরের পাশের কলা ক্ষেতে বসতি গিয়ি দেখি- ছেলেটার সাদা চোখের অংশ ফুলে ওঠে। চঞ্চল হয়ে ওঠে দু-চোখের মণি, মনে কয় স্যার ভুতপেত্নি! না না স্যার জীনপরি- সন্ধ্যাকাল ছেলো ত স্যার – দেখতি পারি নাই ভালো করে তয় তেনারা মারামারি করতিছিল স্যার- একজন ছুটি আসলো আমারে দেখি- আমি স্যার পালাতি গিয়ি মন্দিরে– দুগগা তো সবার মা স্যার- যদি বাঁচায় –
ভালো কথা। তা মূর্তি ভাঙলি কেন?
ভুতরাও যে মন্দিরেও আসি পড়লো স্যার। আমি স্যার একিবারি দুগগা মার পায়ের কাছি পালাতি গেছিলাম স্যার। মাগো বাঁচাও বলি জড়ায়ে ধরতি গেছি- তখনই গণেশের নাক ভাঙি গেলো- আর কারিগররা চেঁচায়ে গ্রাম মাথায় করি ফেলালো স্যার।
থকথক করে কেঁদে ফেলে ছেলেটি, আমি মোছলমান বলি মা আমারে বাঁচায় নাই স্যার- যাতি আসতি কতবার ভালো ভালো কলা দিছি দুগগা মায়ের পার তলায়- বলাইদার সাথি কতবার ডাকিছি মা, ওমা জগজ্জননী আমারে একটু বুদ্ধি দাও মা-
প্রাণ খুলে শ্বাস নেন নূরতাজ মন্ডল। ছেলেটার ভালোমানুষি মনে এবার পাপ ঢুকে পড়বে। জেলবাস হয়ত তিনি রক্ষা করতে পারবেন। কিন্তু ছেলেটা এবার সাম্প্রদায়িক হয়ে যাবে। ওর মনে বিশ্বাসের সরলতা মুছে গিয়ে অন্যদের মতো আল্লাহ, ঈশ্বর, ভগবানকে ভাগ করে নেবার শিক্ষা জন্ম নিবে। একহাতের চেটো দিয়ে অন্য হাত মুছে নিয়ে তিনি মনে মনে হাসেন, এই তো এই জগতের বাস্তবশিক্ষা। ছেলেটার বুদ্ধির কমতি ছিল। এবার তা পূর্ণ হলো।
নাম কী তোর ? আল আমিন স্যার। মোহাম্মাদ আল আমিন মিয়া স্যার।
মোহাম্মাদ আল আমিনকে হাজতে পাঠিয়ে তিনি হামিদুল্লার সাথে পরবর্তী কর্মসূচী নিয়ে বসেন। সিদ্ধান্ত নেন সরাসরি যে গ্রামে ঘটেছে এ ঘটনা সেখানেই সালিশ বসাবেন।
বাংলাদেশের দক্ষিণপূর্ব অঞ্চলের এই সমস্ত গ্রাম একসময় ছিল একেবারেই হিন্দু অধ্যুষিত। সাত চল্লিশের দেশভাগের ফলে অনেকেই ইন্ডিয়া চলে গেছে। মাতৃভূমির মায়ায় যারা ছিল তারা দেশত্যাগ না করে নিজেদের একাত্মতা বজায় রাখতে পেরেছিল বহুদিন ধরে। একঘর মুসলিমেরও বসতি ছিল না তখন এ সমস্ত গ্রামে।
স্বাধীন বাংলাদেশ গঠিত হওয়ার পর প্রায় আশির দশকে চাকুরি জীবনের প্রথমে তার পোস্টিং হয়েছিল এই অঞ্চলে। সে সময় দেখেছেন, নতুন দারোগা মুসলিম জেনে গ্রামের অনেক মহিলা অবাক বিস্মিত হয়ে দূর থেকে তাকে দেখে যেত। এই সমস্ত মহিলা এর আগে এত কাছ থেকে কখনো মুসলিম দেখেনি। তাছাড়া মুসলিমদের সম্পর্কে এরা ধারণা পেয়েছে যে , ইসলাম হচ্ছে জালেমদের শাসন। মুসলিমরা হচ্ছে মহা জালেম। এরা হিন্দুদের মেরে-কেটে হত্যা করে। হিন্দু নারীদের ধর্ষণ করে অথবা জোর করে বিয়ে করে মুসলিম বানিয়ে ফেলে।
স্পর্শকাতর এই গ্রামগুলোতে সরকারের প্রতিটি অফিসারই অত্যন্ত সচেতন হয়ে কাজ করত। এখন ডিজিটাল সময়। তাছাড়া বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর অনেকেই দেশ ছেড়ে চলে গেছে। সংখ্যালঘুর নিরাপত্তাহীনতা, আত্মীয় ও ধর্মীয় সংস্কৃতির নৈকট্য এবং আধুনিকতার আহ্বানেও অনেকে দেশ ত্যাগ করেছে। অনেকে আবার নির্যতনের শিকার হয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে।
যারা এখনও আছে তারা অত্যন্ত স্বাভিমানী। একটি অশিক্ষিত মুস্লিম ছেলে, কুসংস্কারে আচ্ছন্ন হয়ে ভুতপ্রেত, জিনপরির ভয়ে দুর্গা মায়ের আশ্রয় নিতে পারে এটা কিছুতেই বিশ্বাসযোগ্য হবে না গ্রামবাসীদের কাছে। অবিশ্বাস করার যুক্তিগ্রাহ্য কারণও রয়েছে। অনেক উগ্র মুসলিম আছে যারা গোপনে প্রতিমা ভাঙচুর করে। প্রকাশ্যে হুমকি দেয়। দেশছাড়া করার ভয় দেখায়। ফলে গ্রামের অবস্থা খুবই নাজুক। হামিদুল্লা কিছুটা চিন্তিত হয়।
কিন্তু নূরতাজ মন্ডল অঙ্ক কষে নেমেছে। জব্বারকে ডেকে খোঁজ আনতে বলে। সেদিন সন্ধ্যায় মন্দিরের পাশের কলা ক্ষেতে কারা বা কে কে ছিল তাদের হদিস জানতে। সেই সময় প্রতিমা নির্মাণ কারিগরদের চীৎকার শুনে প্রথমেই কে কে মন্দিরে এসেছিল এবং কারা কারা এসেছিল তাদের ঠিকঠাক হিসেব আনতে।
সালিশ হবে সরকারি কর্মকর্তা, সাংবাদিকসহ সাধারণ গ্রামবাসীদের নিয়ে। কোন রকম আড়াল গ্রহণ করা হবে না।
সাদা ভাতে লেবুর রস ছড়িয়ে দিতে দিতে নূরতাজ মন্ডল তিন পুরুষ আগের ঘটনাটা মনে করতে চেষ্টা করেন। এমনই এক ভুল বোঝাবুঝির খেসারত দিতে তার বাবার বাবা জন্মজন্মান্তরের মাতৃভূমি হুগলি ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলো। স্বেচ্ছায় দেশ ছাড়া সে এক সান্ত্বনার ব্যাপার। কিন্তু জোর করে দেশ ছাড়ানো সে যে মনের ঘরে আজন্মের বিষফোঁড়া হয়ে যন্ত্রণা দিতে থাকে!