রোজেন হাসান > ১৫টি কবিতা >> কবিতাগুচ্ছ

0
560
ধ্বনি
আমি ঘুমিয়ে আছি, আমাকে ভেদ করে যাওয়া বাতাস থেকে নীরবতায়
অসংখ্য ঘর্ষণ থেকে উৎসর্গীত ধ্বনির প্রান্তরে
বয়ে যাচ্ছে আমার মৃত্যু
দূরে আরও দূরে শরীর হীরের চেয়েও বেদনায়
বিধূর, ছয়টি কোণে উজ্জ্বল ফুলের
স্বপ্নে আমাকে অতিক্রম করে যাচ্ছে নেকড়েরা
উন্মাদ রাতে শিকারী নেকড়েদের ধ্বনির জন্মে
ডুবে যাচ্ছে আমার মৃত্যু–
বহু-বহু পুরোনো বন্ধুদের প্রাণে বিস্মৃত
পৃথিবীর দেহে আমার।
দেবদারু
আমার সামনে যে দেবদারুর ডালে বসা হরিয়াল
একই তীব্র হাওয়া আর ভায়োলেট পাহাড়ের প্রতিচ্ছায়ায় আমরা
তার সাথে কি বিসাদৃশ্য আমার?
আমি চিন্তা করি মৃত্যু
আমি অবিরাম চিন্তা করি
মৃত্যু কি? সাবলাইম!
যে সামলাইম ওই পরবর্তী বসন্তের দিকে
উড়ে যাচ্ছে।
মৃত্যু
আমি রাতের পর রাত ভেবে জেগেছি
কোনো গভীর মৃত্যুর উপসর্গের কথা
আমাকে দখল করে রেখেছিল, বছরের
পর
বছর
দিন আর রাত। একদিন
আমি জানলাম
মৃত্যু এক চিন্তা,
যে অবসরহীন আর ক্রমান্বয়ে নিজেকে কর্কটের মতো বহুস্তর করে,
আমি বছরের পর বছর
তাকে জেগে থাকা মেঘের আলোর মতো
ভেবে চলেছি, জীবন তার কাছে
এক দর্শন যে উত্থানের মহিমা বর্ণনা করে
স্বপ্নের গতকালের সব পাহাড়
মেঘ শিকারের সব অলীক ভূতগ্রস্থ
এক জীবন।
কফিশপের কবিতা
অনেকদিন পরে আমি লিখছি
অবাস্তব কফিশপে, ঝাপসা কফিকাপ
আমার আঙুল আর তার ব্যবহার
নিয়ে
আমি প্রবাল, ঘুমের আবছায়া
জুড়ে
নি-রতি আমি, কফিকাপ আমার আঙুলের
ছায়ার সাথে কাটিয়ে দিচ্ছে এই হেমন্ত
পিনপতন বিকেলের মুহূর্তসকল।
অনেকদিন পরে আমি লিখছি
আমার চোখ, দৃশ্য হলো-না সেইসব হেমন্ত
আমার চোখ দৃশ্য হলো-না এই মুদ্রিত আত্ম প্রহারে।
সমুদ্রের স্মৃতি
সেইত সমুদ্র এই চূড়ার সবথেকে উঁচুতে
যার মৃত্যু শূন্য-নক্সাতে পুড়ছে, শাদা অববাহিকার
ত্রিশূল আর হরিৎ, মিশছে স্বশূন্যে
ওই একা দীর্ঘতার নীচে জলদেবীর ঐশ্বর্য
বিলিয়মান, আর তুমি শাদা পাথরের স্মৃতিতে
প্রশ্ন করো শবদেহ
সেইত সমুদ্র
সব বর্ণ-জলের পতঙ্গ।
আর জল আর জল স্রোতঋণ
তোমার হৃদয় থেকে উঠে আসে বৃষ্টির পাহাড়।
নিরাকরণে
নিজের একাকীত্বে কেউ নিরহংকারী নয়
ডিপ্রেশনের চাঁদ থেকে তেরছা
আলো এসে পড়ে অর্ধেক নারীত্বে
সেই নারী
যে রেকর্ড বাজায়, বার-
বার ঘুরপথে, একই স্বরে এসে
লিপি খুলে, ‘আমি
কি বাজাব না?’
সেই প্রতিশব্দ
থেকে খুলে পড়ে
অহংতমসা
হলুদ বিভূতি
সব আলো বার-
বার, যার প্রতিধ্বনিতে এখনও
বেজে চলেছে, প্রতিশ্রুতি
প্রলুব্ধকরতা, নিজেরই।
পুরুষ বেড়াল
পুরুষ বেড়াল একসময় নিজের জন্য বাঁচতে শুরু করে, সে
উপত্যকার ওইপারে বনপরীদের কাছে চলে যায়
সেখানে মর্মর জ্বলে,
ঝরনা কিছুটা বন্য এবং শীতল। এই রূপকের বিন্যাস,
গত অরন্যেও তার প্রেমিকারা ছিল ঘরবাসী।
পুরুষ বেড়াল তার বিগত পশম আছড়ে আছড়ে ঝেড়ে ফেলে।
দ্যাখো মুখর সমুদ্র এবং বিশ্বস্ত শব্দদের ছেড়ে একদিন,
কোনো ভাবুক বেড়াল
দূর কোন দূরে অরণ্যে মিলিয়ে যাবে, এমন-কি তার
কুয়াশাময় ও মৃত্যু এবং কিছু বাস্তব।
ভাষার মুহূর্ত
মুহূর্তের গোলাপ শুধু গোলাপ, এর পেছনে
হাজার বিস্মৃতির লাল সমুদ্র, অসংখ্য স্তবগান, সংখ্যাহীন
মৃত্যু, ভোরের বন্দরে নিস্তব্ধতার ঢেউসকল- তার ঘ্রাণে মিশে
যাওয়া, মালভূমির অপার তীক্ষ্ন হাওয়া, সূর্যের পতনে।
গোলাপ শুধু গোলাপ
এক গুচ্ছ লাল মুহূর্তের জানালা
ভেদ করে আমি উঠে যাই শুধু মুহূর্ত ভাষায়, যার পূর্বে সব
আমার মাঝে ছিল, হারানো।
মুখ
মর্মরের মতো একজনের মুখ
যাকে খুলতে খুলতে কেউ নি:স্ব হয়ে যায়
আসমানের সাতটা পর্দা, কেন গান
ওই মুখে?
কেন তার কবিতা, সমতল থেকে ক্রমশ রূপান্তরিত
মিতবাক পাথরে?
একজন তাকে খুলে যায়, বর্ষণের নীচে তার গহনে
আগুন, উড়ালের স্বাধীনতা এইমাত্র
তাকে জানিয়ে যায়
অপরিচয়, অপরিচয় তার সবকিছু, তার
একমাত্র অধিকার, ওই সঙ্গীতের
তলে তার সব চিহ্নসকল, ছিঁড়ে ফেলা
ওই মুখের তলে, সে ভাববে একজন তার মুখ,
বসন্ত, সাতটা বৃষ্টির ফোটা, পানাফুল, ছোট
স্কুলের পাশে দুপুরে একটা পেঁচা,
এই রকম সবকিছু
সে খুলে রাখবে, তার হাতের ভিজে যাওয়া
আয়নাতে।
মুখটিতে, ভরে যাবে তার ছোট্ট অপরিচয়ের দেহ।
বৃদ্ধলোক
বৃদ্ধলোক ওয়াল্ট হুইটম্যান
আকাশে রয়ে গেছে রাজ্য যার,
যে এখন মনস্তাপের ঊর্ধ্বে তার
মেঘেদের বিদায় জানায়
তার শেষ স্টেশনে।
এক তরুণ বীণাবাদক তার হৃদয়ে
শোনায় এই অর্ধ শহরের কোনো মূল্য নেই
সে গান ভুলে গেছে, খুবই সাধারণভাবে,
তিনি স্বগতস্বরে শোনান আমি যাবো
বৃদ্ধলোক ওয়াল্ট হুইটম্যান
আমার শশ্রুর লম্বমান মৃত্যুর
শহরে, তরুণ বীণাবাদক
আমার হৃদয় ছেড়ে ওঠো
দাড়াও, যেন ওই মাতাল রাজ্য
আকাশে রয়ে গেছে
আমাদের নারীবিহীন পিতার মন্দির
দাড় করো তুষার গলে গলে ঘাসের গান
ছড়িয়ে তুলছে আমি দেখি এক ঘাসের পুরুষ
বৃদ্ধলোক ওয়াল্ট হুইটম্যান।
হরিণ এবং শূন্যতা
এমন একটা দিনের ওপর বিমূর্ত সেরাসিন
তোমার হরিণ পাতাবাহারের গান গায়
সেরাসিনের কথা মনে করে
আরও বিষাদ আরও সমুদ্রের দিকে
ঘুরিয়ে দেয় জাহাজ
যে পাতার সবগুলো রেখা সেরাসিন
কৃত্রিমতার এই পবিত্র অবগাহনে
যেখানে অবগাহন সেরাসিনের জন্য কাঁদে
সমস্ত শূন্যতার মূল থেকে তোমার হরিণ
পাতা বাহারের গান গায়
তার অস্থিশূন্যতার মতো এই।
অর্ধস্ফুট
যেন আমি ডুবো পাহাড়
তাসের মতো অবিকল তাসের মুখ কত
কত চড়ৃই, তাইগ্রীসের উদ্দামতার উপকথা
বলে যায়,
অবিকল আরেকটা তাসের কানে,
আরএকটা যুদ্ধের কানে, যে মেঘ যেন তাস দিয়ে গড়া, কিন্তু
বৃষ্টি পড়ে দারুকার মতো
তার সুরঙ্গ বেয়ে, যেন ইউলিসিসের নৌকোর
শব্দ শুনি আমি, আয়নার প্রতিদৃশ্য থেকে
মুক্তি পাওয়া
লুব্ধকের আত্মা, স্বনির্বাণের দিকে যাচ্ছে
আবার যে প্রতীকের পৃথিবী জুড়ে অবিরাম
উত্তর সরবতা জন্ম নিচ্ছে
নির্জনতার কুহক গড়ে দিতে
যেন আমি আর কখনও উত্থাপিত হবোনা
শ্যাওলার প্রত্যাদেশ ভুলে
এই প্রাচীন শহরে তিনকোটি প্রজন্ম বৃষ্টি ঝরছে।
একটি হার্ডমেটাল কোকেনের পর
আমি তাকে অপরিবর্তীত সকালে দেখেছি
কোকেনের শিহরণের মাঝে কাটানো
গতরাতের সেই একই লোক কিনা
এই সকালে ভাসমান এই বিছানায়
ভেসে যাচ্ছে
স্বরণের শেষ ধ্বনিটি ভুলে,আমি
তাকে দেখেছি কাল সকালে
কিনা কোকেনের শিহরণের
সেই পর্দায় যে ভেসে যাচ্ছিল
তার বিছানা সমেত
টুথপেস্ট আর ব্রাশ আর এক্স-
সিগনেচার ছিল যার ভ্যানিটিব্যাগে।
যে ট্রানসেক্সুয়াল ছিল, কিনা
তার অস্পৃষ্য ইচ্ছা
তার ঠোঁটে লাগানো গাঢ় প্রহারের
আমার মনে নেই
টাওয়ার থেকে জ্বলে ছিল
এই মনে না থাকা
সে ছিল কিনা।
অক্টোবরের রাত
বিচ্ছিন্ন হতে থাকা প্রবালের আঙ্গিকে
আমি শুনতে পাই, বিলাপের ভেতর তার গান
এবং ধ্রুবতারার দূরত্বে একটি শিশু
নেমে গেছে বৃষ্টির জলে, অনেক দূরে
গাছ, তার ওপর আনন্দরোহিত আর নীরবতা
অপার আমি শুনি রহস্যে আমি লুপ্ত
রয়ে গেছি
আমার ভেতর সেই ভূমি অশ্রুহীন
ধারণাহীন, আকাঙ্ক্ষার
ভোরের সমুদ্র যেন মদের মতো লাল।
একটি সুপ্ত ধারণার কোণে অত্যুচ্চ নীরবতা
আমি দেখতে পাই
অবিরত কালো ডানা তাকে ফেলে গেছে
অজস্র লম্বমান চুলের ভেতর।
ব্যবহার
আমরা সজীব বলে ব্যথা পাই
মৃত দেহ কাটতে, চাদরে ঢাকা
সেই দেহ, তার অর্ধেক শরীর কথা বলে
আমরা আর তুমি, সেই অগুণিত তুমির সাথে কথা
বলতে
ব্যবহারে, বুক গভীর করে কপাল আলাদা করে ছুরি
আলাদা চাদরের তলায় ঘৃণা, শিউরে ওঠা
এই জন্ম, আমরা সজীব-ব্যথা
এখানে আর আর জীবিত এবং মৃত্যুর দিকে যাওয়া প্রাণ
যাদের কন্ঠ অবধি ঢাকা, করোটি ফিরিয়ে রাখে ওই
কোণের বিপরীতে, যেখানে একজন এখন মারা যাচ্ছে।
শুধু আমরা মরা কাটি, সেই মৃত তার প্রতিটি তন্তু কথা বলছে
আমার প্রতি, অসম্ভব সেই ভাষা
আবছা আলোর এই পরিত্যক্ত ওয়ার্ড
আমরা জানিনা ডাক্তার কেন নেই!
অজস্র সিড়ি, শুধু এই ওয়ার্ডকে ফেলে যাবে বলে
নেমে যাচ্ছে, অনন্ত এই রাত।