লাবনী আশরাফি > রবের ব্রেঁস ও তাঁর চলচ্চিত্র >>  উৎসব সংখ্যা ২০২০

0
450

রবের ব্রেঁস ও তাঁর চলচ্চিত্র

[১] জীবনের নির্মোহ নির্মেদ বয়ান ও সিনেমায় স্পিরিচুয়ালিটি

I am looking for truth, or the impression of truth.
— Robert Bresson

পৃথিবীর সব শিল্পমাধ্যমই স্থান ও কালের একটা সময়কে প্রতিফলিত করে। আর সেই সমন্বিত রেখাকে এক অপরিমাপ্য অখণ্ডতায় পৌঁছে দেবার প্রয়াসে শিল্পে চলে সত্যানুসন্ধান। অন্যান্য শিল্পের তুলনায় চলচ্চিত্র বস্তুনিষ্ঠ। তবে সময়ের ব্যবহার, স্থান-কালের চলিষ্ণুতা চলচ্চিত্র যে-কোন শিল্পের চেয়ে মানুষকে বিস্মিত করেছে বেশি। চলচ্চিত্রশিল্পের জন্মলগ্নেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এ বিস্ময়। তবে চলচ্চিত্রের উদ্দেশ্য বিস্ময় আর নিছক বিনোদন নয়। বিনোদনের জন্য শিল্প কোন শিল্পীই সৃষ্টি করেন না। শিল্প থেকে যদি কেউ বিনোদিত হয় সেটা সেই নির্দিষ্ট ব্যক্তিটির অভিপ্সা মাত্র। জীবনের গভীর অনুধাবন, সূক্ষ্ম চিন্তা, নিজস্ব অভিজ্ঞতা আর অপরিমেয় জিজ্ঞাসু মনের অন্বিত রূপ হল শিল্প। চলচ্চিত্রও শিল্পের এমন একটি মাধ্যম, যেখানে জীবনের চোরাগোপ্তা পথের অজানা অনেক কিছুই ছবি, শব্দ, আলোর ভাষায় ফুটিয়ে তোলা হয়। তবে শিল্পের অন্যান্য মাধ্যমে থেকে চলচ্চিত্রের সাথে ভুল বোঝাবুঝিটা একটু বেশি। চলচ্চিত্রে যেভাবে জন্ম নিয়েছিল, সেই বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে উঠে একে সম্পূর্ণভাবে শিল্প হয়ে উঠতে দীর্ঘ সময় লেগে গেছে। চলচ্চিত্রের এই যাত্রাপথে চলচ্চিত্রকে যিনি ‘pure cinema’ অভিধায় পৌঁছে দিয়েছিলেন তিনি রবের ব্রেঁস (১৯০১-১৯৯৯)।
১৮৯৫ থেকে ১৯৩০ — এই লম্বা সময়ে চলচ্চিত্র নিজের পায়ে যে শুধু দাঁড়িয়েছে তাই নয়, চলচ্চিত্রের ব্যাপকতা ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। বড় দীর্ঘ সময়ে চলচ্চিত্র স্বল্প থেকে দীর্ঘ হয়েছে, নির্বাক থেকে সবাক হয়েছে, সাদা-কালো থেকে রঙিন হয়েছে। অর্থাৎ বিষয় ও টেকনিকের দিক থেকে চলচ্চিত্র নিজস্ব রূপ নিয়ে তার অস্তিত্ব জানান দিয়েছে। কিন্তু মুশকিলটা হল চলচ্চিত্র এমন এক শিল্পমাধ্যম যার সাথে সরাসরি অর্থ যুক্ত থাকায় এবং হলিউড প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তা কলাশিল্প (art) থেকে ভোগ্যশিল্প (industry) হয়ে উঠলো। ফলে, চলচ্চিত্রে সামনে চ্যালেঞ্জ যেন একটু বেশিই চলে এলো। একদিকে বিনোদনের খোরাক আর অন্যদিকে ‘ব্যবসা’ করার হাতিয়ার — এই দুয়ের পেষণে চলচ্চিত্রের সম্ভাবনা যেমন বাড়তে শুরু করলো, তেমনি এর টিকে থাকার প্রশ্নও রেড জোনে চলে গেল। তবে চলচ্চিত্রকে পিওরিটির কাছে যে-কজন শিল্পী পৌঁছে দিয়েছেন তাঁদের গুরু হলেন রবের ব্রেঁস। শুরুতেই ১৯০১ থেকে ১৯৩০-এর কথা উল্লেখ করেছিলাম। কারণ ব্রেসঁ তাঁর দীর্ঘ চল্লিশ বছরের ক্যারিয়ারে সিনেমা নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন ১৯৩৪ সালে Public Affairs নামক শর্টফিল্মটির মধ্য দিয়ে। এই দীর্ঘ সময়ে তাঁর সিনেমার সংখ্যা মাত্র ১৩টি। এর মধ্যে অবশ্য সাতটি সিনেমাই জায়গা করে নিয়েছে Sight and Sound-এর Top 250-এর তালিকায়। সিনেমার ইতিহাসে ব্রেসঁ সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য তাঁর transcendental style-এর জন্যে। তিনি সমস্ত বড় চলচ্চিত্র নির্মাতার মধ্যে সবচেয়ে নির্মোহ, স্বকীয় এবং আপোষহীন। তিনি সর্বদাই সিনেমা নিয়ে ভেবেছেন। তাঁর ভাবনাগুলো জড়ো হয়েছে তাঁর একমাত্র বই Notes on Cinematography-তে। ব্যবসাসফল, দর্শকের জনপ্রিয়তা বা সিনেমা কী হওয়া উচিত, এ সম্পর্কে মানুষের যে ধারণা, তার দিকে দৃষ্টিপাত না করে তিনি যা চেয়েছিলেন তা সুনির্দিষ্টভাবে তাঁর সিনেমায় রূপ দিয়েছেন।
ব্রেসঁর শিল্পীসত্তাকে তিনটি বিষয় নিঃসন্দেহে প্রভাবিত করেছিল। তাঁর ক্যাথলিক ধর্ম, যা জেনেসেনিজম নামে পরিচিত; চিত্রশিল্পী হিসেবে তাঁর যাত্রা আর যুদ্ধবন্দী হিসেবে তাঁর অভিজ্ঞতা। তিনি খুঁজেছেন, ভেবেছেন, কাজ করেছেন। চলচ্চিত্র নিয়ে তিনি কী ভাবতেন তাও নিজেই বলে গেছেন :

I don’t think so much of what I do when I work, but I try to fill something, to see without explaining, to catch is as near as I can — that’s all (Notes on Cinematography).

ব্রেসঁ ভাবনার এই নিয়ামকগুলো তাঁর সিনেমাকে দিয়েছে নির্মোহ, নির্মেদ অভিব্যক্তি। তাঁর সিনেমার স্পিরিচুয়ালিটি বা ট্রান্সেডেন্টাল রূপ নিয়ে কাজ করেছেন অনেকেই। আমিদি আফ্রে, আঁন্দ্রে বাজিন, সুসান সন্টাগ, পল শেহরারদার। তাঁরা প্রায় প্রত্যেকেই যে-তিনটি বিষয়কে প্রাধান্য দিয়েছেন তাঁদের লেখায়, সেই বিষয়গুলি হচ্ছে :

— Jansenist direction.
— Phenomenology,
— Spiritual style.

ব্রেসঁ সম্পর্কে আমি কেবল আমার ভাবনাই বলতে চাই খুব সরলভাবে। ব্রেঁসর সিনেমা, তাঁর Notes on Cinematography বইটি এবং বিভিন্ন সময়ে দেয়া তাঁর ইন্টারভিউগুলোকে আমি ঠিক যেভাবে বুঝতে চেষ্টা করেছি, সেই অনুভাবনা থেকেই আমার এই লেখা। ব্রেঁস নিয়ে কোন তাত্ত্বিক, বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা আমি করতে পারবো না। তবে তাঁর সিনেমাগুলো আমার মনে যে নির্মোহ ভাবাবেগের উদ্রেক করেছে, সেটাই প্রকাশ করতে চাই। এ-পর্যায়ে মূলত ব্রেঁসর সিনেমার স্টাইল, তাঁর ট্রিটমেন্ট, তাঁর সিনেমাটোগ্রাফি — এসব বিষয়ের পেছনে তাঁর চিন্তার অনুঘটকগুলি কীভাবে কাজ করেছে, সেই ব্যাপারগুলো খানিকটা বলতে চাই।
ব্রেঁসর সিনেমায় প্রথম যে ব্যাপারটি লক্ষণীয় তা হলো ক্যাথলিক কনটেক্সট বা ক্যাথলিক পটভূমি। তাঁর Angels of Sin (1943), Diary of a Country Priest (1951), The Trial of Joan of Arc (1962) — সিনেমাগুলোতে জেনসেনিজমের প্রভাব রয়েছে। এই তিনটি সিনেমাতেই চরিত্রগুলি যেভাবে নিয়তির কাছে বা গডের কাছে আত্মসমর্পণ করে, তাতে করে ক্যাথলিক কনটেক্সটকে বাইরে থেকে আরোপিত করতে হয়নি, তা আপনিই চরিত্রগুলির মধ্য দিয়ে নিজস্ব রূপ নিয়েছে।
প্রথম জীবনে চিত্রশিল্পী হিসেবে তাঁর যে অভিজ্ঞতা তা সিনেমা পরিচালক ব্রেঁসর কাজে প্রতিফলিত হয়েছে বেশ গভীরভাবেই। একজন চিত্রশিল্পীকে সিদ্ধান্ত নিতে হয় তিনি কী রাখবেন আর একজন সিনেমার নির্মাতাকে ভাবতে হয় তিনি ঠিক কতটুকু ফেলে দেবেন। ব্রেঁস তাই তাঁর সিনেমায় অপ্রয়োজনীয় সবটুকুই ছেঁটে ফেলে দিতে সক্ষম। আর এই অপ্রয়োজনীয় অংশ বাদ দেওয়ার ফলে একটি ফ্রেমে কী ঘটছে তার বাইরের অনুভূতিকেও দর্শকের মনে তিনি জাগাতে পারেন। এই জন্যই একটি হাত, একটি পা অথবা দরজার তালা (লক) বিশেষ বিশেষ ভূমিকায় উত্তীর্ণ হয়।
পুরো মানুষটিকে নয় শুধু তার একটি হাতই বলে দেয় সবটা। মিনিমালিস্ট অ্যাপ্রচকে তিনি এভাবেই ব্যবহার করেছেন সর্বোচ্চটুকু তুলে আনতে। শিল্পের দুটি ভিন্ন মাধ্যম চিত্রকলা আর সিনেমা নিয়ে ব্রেঁস যখন বলেন :

I haven’t painted for a long time. I believe that painting is over. There is nowhere to go. I don’t mean after Picasso, but after Cezanne. He went to the brink of what could not be done. Others may painted because they are of a different generation, but I felt very early on that I must not continue. When I stopped, it was horrible. At first, cinema was only a stop-gap, to occupy my mind. It was the right choice. I think, because cinema can go beyond painting. It is tomorrow’s writing or painting, with two kinds of ink, one for the eye, one for the ear.

ব্রেঁসর এসব কথাতেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে তাঁর সিনেমা সম্পর্কিত ভাবনা।
ইম্প্রেশনিজম আর কিউবিজমের মধ্যে এক নতুন সেতুবন্ধন তৈরি করেছেন পল সেজান। তেমনি ব্রেঁসও নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পেরেছিলেন ইতালীয় নিওরিয়ালিজম আর ফরাসি নিউ ওয়েভ থেকে। সেজান ও ব্রেঁস দুজনেই নিজেদেরকে নির্দিষ্ট দূরত্বে রেখে নিজস্ব অনন্য শৈলী ও শিল্পরূপকে আত্মস্থ করেছিলেন নিজ নিজ কালে। সেজান যেভাবে প্রকৃতিকে তুলে আনতে চেয়েছেন তাঁর ভাষায় তা অনেকটা এরকম :

I progress very slowly, for nature reveals herself to me in very complex ways, and the progress needed is endless. One must look at the the model and feel very exactly; and also express oneself distinctly and with force. (Paul Cezanne Letter, translated by Marguerite Kay, 1976).

সেজান এখানে যেভাবে বললেন, ব্রেঁসর সিনেমাতেও তাঁর প্রত্যেকটি ইমেজ সেভাবেই সতেজ সহজ মুহূর্ত নিয়ে উপস্থিত হয়েছে। দৃশ্যান্তরে ইনডোর বা আউটডোর হোক, বিনা ঝাঁকুনিতে এক-একটি সহজ মুহূর্তকে তুলে এনেছেন ইম্প্রেশনিস্ট শিল্পীদের মতোই। ব্রেঁসর এই অনন্যতা তাঁকে করে তুলেছে অসাধারণ এক চলচ্চিত্রনির্মাতা।

 

ব্রেঁসোর ভিডিও সাক্ষাৎকার

সিনেমার নন্দনতত্ত্ব নিয়ে দেখুন ব্রেঁসোর সাক্ষাৎকার (সময়সীমা ৬ মিনি ২৬ সেকেন্ড) 

https://www.youtube.com/watch?v=DVODh2lkVdc