লুৎফর রহমান রিটন > ছড়াগুচ্ছ >> উৎসব সংখ্যা ১৪২৬

0
538

[সম্পাদকীয় নোট : লুৎফর রহমান রিটন। বাংলাদেশের সংবেদনশীল শীর্ষ ছড়াকার। অজস্রপ্রসু তিনি। রাষ্ট্রিক সামাজিক ব্যক্তিক- এমন কোনো প্রসঙ্গ নেই যা নিয়ে তিনি ছড়া-কবিতা লেখেন না। জনমানুষের দুঃখ কষ্ট বেদনা আশা আনন্দ- সবকিছুর প্রতি তাঁর দৃষ্টি এতটাই তীক্ষ্ণ যে, জনজীবনকে স্পর্শ করছে, কিন্তু ছড়া লিখে লুৎফর রহমান রিটন তাতে সাড়া দিচ্ছেন না, এমনটা হবার জো নেই। সেই কারণে, অসম্ভব মানবিক তিনি। দেশের প্রতি, দেশের মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসা কিংবদন্তিতুল্য বলা যায়। কয়েক বছর আছেন বিদেশে, কিন্তু দেশের প্রতি তাঁর মমত্ববোধ যে কতটা তীব্র, সেটা বোঝা যায় তাঁর ছড়া-কবিতাগুলি পড়লে। আর কীবোর্ড বা কলমের ধার তাঁর কত ধারালো- ব্যাঙ্গের চাবুক যেমন তাঁর হাতে ঝলসে ওঠে, তেমনি পরম মমতায় কোনো কোনো প্রসঙ্গকে তিনি এত বিনম্রভাবে অবলীলায় প্রকাশ করেন যে, পাঠক হিসেবে শ্রদ্ধায় তাঁর প্রতি মাথাটা আপনা-আপনি নুয়ে আসে। কুর্নিশ বাংলাদেশের এই ছড়াকারের প্রতি। তীরন্দাজ তাঁর এই ছড়াগুচ্ছ (কবিতার রেশও আছে) প্রকাশ করতে পেরে সত্যি আনন্দিত ও গর্বিত। পড়ুন রিটনের অবিস্মরণীয় এই নতুন ছড়া-কবিতাগুলি তীরন্দাজে। পড়ার পর আপনাদের পাঠ-প্রতিক্রিয়া জানাতেও ভুলবেন না।]

আপসকামী

আপস আপস চতুর্দিকে, আপস জগৎময়
নানান ঢঙ্গে সবার সঙ্গে আপস করতে হয়।
আদর্শহীন রাজনীতিবিদ এবং টকশোজীবী
আপসরফায় ভরিয়ে ফেলেন পত্রিকা আর টিভি।
আপস দেখি আন্দোলনে বিপ্লবে বিক্ষোভে
শিক্ষকেরাও আপস করেন পদ-পদবীর লোভে।
সাংবাদিকের আপস থাকে আপস করেন কবি
হর-হামেশা আপস করেন বন্ধু ও বান্ধবী।
বিচারপতি-আইনজীবীরও আপসরফা থাকে
আমিও ভাই আছি মিশে আপসকামীর ঝাঁকে।
অফিস মানে বসের সঙ্গে নিত্য আপস কষা
নইলে চাকরি ঘ্যাচাং আমার নইলে মরণ দশা।
রাস্তা ঘাটে চলতে ফিরতে আপস থাকে জারি
মুখ বুজে তাই হজম করি নিত্য সবার ঝারি।
এম্পি-নেতা-আমলা-পুলিশ কিংবা হোটেলবয়
সবার সঙ্গে রোজ প্রতিদিন আপস করতে হয়।
পাড়ার মুদি-দর্জি যুবক-লন্ড্রীওয়ালা বালক
বাস ড্রাইভার-কন্ডাক্টর-কিংবা রিকশা চালক
এবং গৃহে কাজের বুয়া, আপস সকলখানে
আমি ভীতু আপসকামী এইটা সবাই জানে।
চাঁদাবাজ আর সন্ত্রাসীদের সঙ্গে আপস ছাড়া
রোজ প্রতিদিন নাকাল হবো কিংবা গৃহহারা।
ওদের সঙ্গে নিত্য নতুন আপস করেই বাঁচি
এ সংসারে আপস করেই আজও টিকে আছি।
আপস আমার শিরায় শিরায় নিত্য প্রবাহিত
আপস করার জন্যে ব্যাকুল সদাই থাকি ভীত।
কর্মে আপস ঘর্‌মে আপস ধর্মে আপস করি
আপস করেই বেঁচে থাকি আপস করেই মরি।
এই জীবনের প্রাপ্তিগুলো আপস করেই পেলাম
কিন্তু- খেয়াল করিনি কোথায় ছিলাম কোথায় নেমে এলাম!
(আপস করতে করতে আমি ‘পাপোশ’ হয়ে গেলাম!)

শিল্পপতি

অন্ধকারের বাসিন্দা যে, যার রয়েছে কালো টাকার আগ্রাসী বিস্তার
সবচে ধবল সবচে সফেদ ঝাঁ চকচকে চোখ ধাঁধাঁনো পোশাক থাকে তাঁর।
ঠিক কপালের মধ্যিখানে আবছা মতন ইবাদাতের চিহ্ন থাকে ফুটে
আকাশ পথে বিজনেস ক্লাশ ফি বছরই একাধিকবার মক্কা-ঢাকা রুটে!
কোরবানী দেন সবচে সুঠাম সবচে দামি গরুটাকেই প্রদর্শনী খাতে
গরুর সঙ্গে তাঁর ছবিটাও সগৌরবে প্রচারিত হয় যে মিডিয়াতে!
তিনি সবার শ্রদ্ধাভাজন আশপাশে তাঁর মজুদ থাকে অঢেল কৃতদাস
জনারণ্যে দমে দমে তাঁর মহত্ব জিকির হয়ে বহাল বারো মাস…
তিনি মহান শিল্পপতি শিল্পাসনে তাঁর হয়েছে চিরস্থায়ী শাদি
উদ্যোগী হন নিত্য নতুন প্রজেক্ট খোলেন ইনোভেটিভ আমরা নাড়া বাঁধি।
ব্যাংক থেকে ঋণ নেবার কাজে দক্ষ খুবই ব্যাংক তাঁকে লোন দেবার তরে সাধে
একশো দু’শো কোটির নিচে ঋণ নিতে তাঁর অনীহা খুব প্রেস্টিজে খুব বাঁধে!
যে শিল্পটাই গড়েন তিনি দু’বছরের মাথায় সেটাই রুগ্ন হয়ে পড়ে
শিল্প কি আর সহজ বস্তু? মামার বাড়ির আবদার কি?? শিল্প গাছে ধরে???
রুগ্নশিল্প বাঁচাতে তাঁর ঋণ নেয়া ফের ফরজ বুঝে ব্যাংকগুলো দেয় ঋণ
ঋণখেলাপী শিল্পপতির এক জীবনের ব্যাংক ঋণ শোধ হয় না কোনোদিন।
কিন্তু তবু যায় না ছোঁয়া টিকিটা তাঁর কোনোমতেই, সুরক্ষিত তিনি
কারণ- নেতা, রাজনীতিবিদ, আমলাসহ শাসনযন্ত্র তাঁহার কাছে ঋণী!
সবাইকে দেন মাসোহারা, ভেট, উপহার, বিদেশ ভ্রমণ বাড়ি কিংবা গাড়ি
নগদ টাকার সঙ্গে থাকে ফাও হিশেবে উপঢৌকন চোখ ধাঁধানো নারী।
সরকারি দল বিরোধীদল এমনকি সব খুচরো দলের বিবৃতিবাজ লিডার
সবার মুখেই পুড়ে রাখেন সর-ওঠা দুধ ভর্তি বোতল অন্যকথায় ফিডার।
শিল্পপতির মুখোশ পরা চিরকালের ঋণখেলাপী মনীষীগণ- সেলাম,
আপনারা সব ছিলেন বলেই রুগ্ন শিল্প বাঁচিয়ে রাখার সঠিক মন্ত্র পেলাম।

সুখী দম্পতি

নানা নানী দুইজনে নানা কথা কয়
নানা দেশে ঘুরে ফিরে নিশ্চিত হয়-
নিজের দেশের চেয়ে সেরা কিছু নয়।

নানী আর নানা
ভালোবাসে খেতে খুবই ‘বাঙ্গালি খানা’
বাঙ্গালি খানা মানে ডাল ভাত আর-
ছোট বড় মাছেদের প্রিয় সমাহার।
নানান ভর্তা-ভাজি-সব্জির ধুম
পেট ভরে খেয়ে-দেয়ে শান্তির ঘুম।
নানা আর নানী–
হাতের নাগালে রাখে প্রিয় পান-দানী।
আচরণে দু’জনেই মহা খান্দানি।
সকলি ঝাপসা দেখে। ক্যানো? চোখে ছানি।
নানী আর নানা
দু’জনেই ভালোবাসে বেড়ালের ছানা।
তিনটে বেড়াল ছানা নানাদের ঘরে
সারাদিন মিঁউমিঁউ ম্যাঁওম্যাঁও করে।
তুলতুলে ছানাগুলো জানি প্রিয় অতি
ছানাদের নিয়ে ওঁরা সুখী দম্পতি।

টমাস আলভা এডিসনে

টমাস আলভা এডিসনে–
খাইতে গেলো রেডিসনে।
দ্যাখতে ব্যাডায় মোটকা-তাজা
খাইতে চাইলো বাদাম ভাজা।
ম্যানেজারে শুইন্যা হাসে
বাদাম খাইতে কেউ কি আসে!
ফাইভ ইস্টার বেকারিতে?
তারপরেও আইন্না দিতে
চেষ্টা করুম, স্যার গো-
আনতে পিনাট পাঠাইতেছি রেডিসনের কার্গো।
খুশি হয়া এডিসনে
ডিগবাজী খায় রেডিসনে।

পার্টি শেষে

কাল সারারাত পার্টি ছিলো
আহ্‌ কী দারুণ পার্টি গো!
রাম হুইস্কি বিয়ার শেষে
ভদকা খেলাম চারটি গো!
লম্বা ঘুমে দিন করে পার
হইলো শেষে ভার্টিগো!

কানাই কান্তিছে!

গিয়াছি কালকে গড়িয়াহাট
করিয়া বাজার করিয়া হাট
ফিরিয়া আসিতে রাত্রি পার,
কী করে হইবে যাত্রী পার?
ঘাটে একটাও নৌকা নাই
কাঁদিতেছে তাই বউ, কানাই…
আমি কহিলাম- ও কানাই
তোমাদের মতো বোকা নাই!
নৌকা নাই তো কান্তিছো কেনো?
নদী পার হও সাঁতরে!
নৌকা ছাড়াই নদী পার হতো
শ্রীমান জ্যাঁ পল সার্ত্রে…

শুকরিয়া

শুকরিয়া ভাই শুকরিয়া
আপনি পাছায় লাত্থি দিলে
ব্যথায় উঠি কুঁকরিয়া?
মিথ্যা কথা, মিথ্যা স্যার
এইটা সলিড মিথ্যাচার।
লাত্থি খেয়ে হাসতে থাকি
সুখ-সায়রে ভাসতে থাকি।
লাত্থি যদি না দেন তবে
কেন্দে উঠি ডুকরিয়া,
শুকরিয়া ভাই শুকরিয়া…

আমি তোমার

মৃত্যু নাচে মৃত্যু নাচে
তোমার চোখের অগ্নিআঁচে
সেই আগুনে আমায় তুমি পুড়িয়ে দিতে পারো, মেয়ে
পুড়িয়ে দিতে পারো।
ধুসর তোমার স্বপ্নগুলো
আমি তোমার স্মৃতির ধুলো
তুমি আমায় একটা ফুঁ-তেই উড়িয়ে দিতে পারো, মেয়ে
উড়িয়ে দিতে পারো।

ধর্ম ব্যবসা

প্রকাশ্য লাম্পট্য ছাড়া তার জীবনে ‘ধর্ম’ নাই।
রাজ-ক্ষমতা দখল ছাড়া দৃশ্যত তার কর্ম নাই।
‘ধর্ম’ ছাড়া লেজেহোমোর অন্য কোনো বর্ম নাই।
ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করে শর্ষিনা আর চরমোনাই…

আমাদের থাকা

তোমরা থাকো সমুদ্রে আর আমরা বিলে-খালে থাকি
রাজনীতিবিদ-ক্রিমিনালের চক্রান্তের জালে থাকি।
পাতায় থাকি ডালে থাকি
দিবসে আর সালে থাকি
‘সংকোচেরো বিহবলতা’…আড়ালে আবডালে থাকি।
অবরোধে জ্বালাও পোড়াও ভাঙচুড়ে হরতালে থাকি।
ইহকালেই ভোদাইগুলোর জন্যে পরকালে থাকি!
পল্টি খাওয়ার সিজন এলেও সবুজে আর লালে থাকি!
রাজনীতিবিদ প্রভু। রাজা। আমরা প্রজার হালে থাকি।

ঢাকাইয়া কুইজ

ক্যামতে বুঝাই পেরেশানির কারণ থাকে হাজারটা
এই যে দেহেন আজিমপুরের ‘ঘোরাশহিদ মাজার’টা।
এই মাজারে শহিদ ক্যাঠা? শহিদ হইছে ঘোরাটা?
ঘোরায় ক্যামতে শহিদ হইবো! (মিলায়া দ্যান জোড়াটা)
আহেন বহেন আপ্নে জ্ঞেনি মানুষ আপ্নে মন্দ না
মাইন্সে ক্যালা করতে আছে একটা ঘোড়ার বন্দনা!
কইতে পারলে ইনাম দিমু খিলামু গোছ্‌ পরাটা
কেমুন দিলাম ছড়াটা?
[‘গোর-এ শহিদ’ মাজারকে স্থানীয়রা ‘ঘোড়া শহিদ মাজার’ বলেন।]