ল্যাংস্টন হিউজেস > কবিতাগুচ্ছ >> ভাষান্তর জহিরুল হক মজুমদার

0
265

কবি পরিচিতি >>

জেমস মারসার ল্যাংস্টন হিউজেস ১৯০২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরিতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর যখন খুব কম বয়স, তখনই তাঁর বাবা মায়ের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। বাবা চলে যান মেক্সিকোতে। তের বছর বয়স পর্যন্ত তিনি মানুষ হয়েছেন নানীর কাছে। তারপর ইলিনয়ের লিঙ্কনে মায়ের সাথে থাকতে চলে যান। ইলিনয়ে থাকার সময়ই তিনি কবিতা লিখতে শুরু করেন। হাইস্কুল পেরিয়ে তিনি মেক্সিকোতে বাবার সাথে এক বছর কাটান। তার পরের একবছর শিক্ষাগ্রহণ করেন নিউইয়র্কের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে। এসময় জীবিকার প্রয়োজনে বিচিত্র ধরনের কাজ করেছেন- বাবুর্চির সহকারী, বাসের কন্ডাক্টর কিংবা ধোপার কাজ। জাহাজের নাবিক হিসেবে আফ্রিকা ও ইউরোপ ভ্রমণ করেন। শিক্ষা-বিরতির পর তিনি পেনসিলভেনিয়ার লিংকন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা শেষ করেন।
স্কুলে থাকতেই তাঁর সহপাঠী বন্ধুরা তাঁকে Class Poet হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ The Weary Blues বের হয় ১৯২৬ সালে। সাহিত্য-জগতে তিনি “হারলেম রেনেসাঁ”র কবি হিসেবে স্বীকৃত। কিন্তু অনেকেই মনে করেন এই স্বীকৃতি তাঁকে সাহিত্যের নির্দিষ্ট প্রকরণ অর্থাৎ কবিতার মধ্যেই সীমিত করে ফেলে। এছাড়া সীমিত করে ফেলে একটি দশকের মধ্যেও- যে দশকটি (১৯২০-এর দশক) হারলেম রেনেসাঁ দশক হিশেবে পরিচিত।
তিনি সাহিত্যের অন্য ধারায়ও কাজ করেছেন। উপন্যাস লিখেছেন। Not Without Laughter উপন্যাসের জন্য পেয়েছেন সাহিত্য পুরস্কার (১৯৩০)। এছাড়া লিখেছেন নাটক। কবিতাচর্চা করেছেন রেনেসাঁ দশকের আগে এবং পরেও। ল্যাংস্টন হিউজেস প্রোস্টেট ক্যান্সারের জটিলতায় ১৯৬৭ সালের ২২ মে নিউইয়র্কে মারা যান।

কবিতাগুচ্ছ >>

হারলেম
একটি বিলম্বিত স্বপ্ন
কোথায় কী হয় তার?
সে কি শুকায় রৌদ্রে কিসমিসের মতো?
কিংবা বাড়তেই থাকে ক্ষতের মতো
তারপর চলে যায় এমনিতেই?
সে কি নষ্ট মাংসের মতো ছড়ায় দুর্গন্ধ?
কিংবা রসালো মিষ্টির উপর
চিনির শক্ত আবরণ হয়ে থাকে?
হয়তো-বা সে বিরাট ভারের মতো ঝুলে পড়ে
অথবা বিস্ফোরণে জেগে ওঠে কি?
স্বপ্ন
স্বপ্নগুলিকে শক্ত করে আঁকড়ে ধর,
কারণ, স্বপ্নের মৃত্যু হলে
জীবন এক ডানাভাঙা পাখির মতো
যা আর উড়তে পারেনা।
স্বপ্নগুলোকে শক্ত করে আঁকড়ে ধর,
কারণ, স্বপ্নগুলো চলে গেলে
জীবন এক অনুর্বর ভূমি
যা শুধুই বরফে ঢাকা।
আমি যখন বড় হচ্ছিলাম
অনেক অনেক বছর আগে
আমি প্রায় ভুলতে বসেছিলাম আমার স্বপ্নগুলোকে।
কিন্তু আমার সামনে তখন স্বপ্নগুলো ছিল
প্রখর সূর্যের মতো উজ্জ্বল।
তারপর দেয়াল উঠতে লাগলো ধীরে ধীরে
আমি ও আমার স্বপ্নের মাঝখানে।
দেয়াল উঠতে থাকলো
যতক্ষণ না সে আকাশ ছুঁয়ে যায়।
দেয়ালের ছায়া আর কালো এই আমি
আমি সেই ছায়ার মধ্যে শুয়ে পড়ি।
আমার সামনে আর আমার স্বপ্নের আলো নেই
আমার উপরে শুধু গাঢ় দেয়াল, শুধু ছায়া।
আমার হাত, আমার কালো রঙের এই হাত
দেয়াল ভেঙে সেই স্বপ্নকে ছিনিয়ে এনেছে।
আমাকে এই অন্ধকার ভেঙেচুরে দিতে সাহায্য কর।
আমাকে এই রাত ভেঙেচুরে দিতে সাহায্য কর।
আমাকে এই ছায়াকে ভেঙে
সহস্ত্র বর্ণময় সূর্যে পরিণত করতে সাহায্য কর,
সহস্ত্র ঘূর্ণায়মান স্বপ্নের এক সূর্যে পরিণত করতে সাহায্য কর।
পুত্রকে মা
প্রিয় পুত্র, আমি তোমাকে বলে যাই-
জীবন আমার জন্য কোন ঝকঝকে সিঁড়ি ছিলনা,
আমার পথ জুড়ে ছিল সূঁচালো পেরেক।
ছিল অনেক টুকরো আবর্জনা,
ছিল ছিন্নভিন্ন চলটা ওঠা,
কোন কোন জায়গায় ছেঁড়া ছিল কার্পেট,
ফ্লোর একেবারে বেরিয়ে পড়া।
কিন্তু আমি সবসময় উঠেছি আর উঠেছি,
আর পৌঁছেছি সিঁড়ির ল্যান্ডিংয়ে,
কখনো পেরিয়েছি বাঁক,
কখনো পৌঁছেছি এমন অন্ধকারময় জায়গায়
যেখানে কোন আলোই ছিলোনা।
তাই, পুত্র, তুমি পেছন ফিরবে না
এখনই তুমি সিঁড়িতে বসে বিশ্রাম নিওনা।
যদিও তোমার কাছে এই যাত্রা কষ্টের মনে হচ্ছে।
এখনই পড়ে যেওনা-
কারণ আমি এখনো চলছি, বাবা।
আমি এখনো উপরের দিকে উঠে চলেছি
আর, জীবন আমার জন্য কোন ঝকঝকে সিঁড়ি নয়।
আমিও

আমিও আমেরিকার গান গাই
আমি সেই কালো ভাই।
তারা আমাকে রান্না ঘরে খেতে পাঠিয়ে দেয়
যখন পারিবারিক বন্ধুরা আসে,
কিন্তু আমি হাসি,
পেট ভরে খাই,
আর শক্ত সমর্থ হয়ে বেড়ে উঠি।
আসছে দিন
আমিও টেবিলে বসে খাবো
যখন পারিবারিক বন্ধুরা আসবে।
কেউই আমাকে বলার সাহস পাবেনা যে
“রান্না ঘরে গিয়ে খাও।”
বরঞ্চ, তারা দেখবে-
আমি দেখতে কত চমৎকার হয়েছি
এবং লজ্জা পাবে-
আমিও যে আমেরিকা!