শঙ্খ ঘোষ >> কৈশোরক কবিতাগুচ্ছ

0
382
[সম্পাদকীয় নোট : আসন্ন অমর একুশের বইমেলায় আমন্ত্রিত হয়ে আসছেন ভারতের শীর্ষ সাহিত্য পুরস্কার ‘জ্ঞানপীঠ’ পাওয়া বাঙালি কবি শঙ্খ ঘোষ। প্রধানত কবি হিসেবেই তাঁর পরিচিতি। কিন্তু তিনি যে শিশু-কিশোরদের জন্য অসামান্য অনেক কবিতা ও ছড়া লিখেছেন, সেই তথ্য আমাদের বাংলাদেশের পাঠকদের অনেকেরই জানা নেই। এখানে তাঁর বিভিন্ন গ্রন্থে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা এরকমই কিছু কবিতা সংকলন করে উপস্থাপন করা হলো। কবিতাগুলি তার জন্মভূমি পূর্ববঙ্গ বা যেখানে তার ছেলেবেলার অনেকটা সময় কেটেছে সেই পাক্‌শিকে নিয়ে লেখা। কবিতাগুলি স্মৃতিচারণ আর বর্ণনার মহিমায় অসামান্য বলা যায়। আসন্ন বইমেলায় বাংলাদেশে কবি শঙ্খ ঘোষকে স্বাগত জানাই।]

সবার দেশই সবার ভালো

যতই হাসো, যে যাই বলো, লিখে তো রাখছি :
দুনিয়ার যে সেরা শহর- সেই হলো পাক্‌শি।
অবশ্য ঠিক শহরও নয়, একটু একটু গ্রাম
গ্রাম-শহরের সেই দোটানায় প্রণতি রাখলাম।
সেই প্রণতি রূপোর রেখা পদ্মানদীর জলে
সেই প্রণতি ফলতে থাকে বৈঁচির জঙ্গলে
সেই প্রণতি থাকছে দূরের দিগন্তে ওই লেগে
সন্ধ্যা হবার অল্প আগের ফল্‌সারঙা মেঘে।
রাত-তিনটেয় ব্রিজের ওপর ঝম্ঝমানো ট্রেনে
দূরের থেকে আনছে আমার সেই প্রণতি টেনে।
ঘোর বর্ষায় একলা কাঁপে টইটুম্বুর পুকুর
টিনের চালের টাপুরটুপুর বয়স বাজায় নূপুর
শিয়রজোড়া বোনের বাহার পায়ে নদীর তীর
মধ্যখানে যে জনপদ ললিত-গম্ভীর
সে আজ আমায় ডাক দিয়েছে আদ্যিকালের থেকে
চলো আমরা সেইখানে যাই এখনই প্রত্যেকে।
তোমার গ্রামকে তুচ্ছ করছি? তুলনা থাক, ছি!
সবার দেশই সবার ভালো- আমারটা পাক্‌শি।

ও আমার গ্রাম

ও আমার গ্রাম
তোমাকে প্রণাম-
ভুলে গেছ তুমি
আমাদের নাম?
একদিন শুধু
তোমারই ছিলাম
হঠাৎ কখন
বিধি হলো বাম
দেখি আমাদের
নেই নামধাম
মেলে না কোথাও
প্রাণের আরাম।
এখনও কি তুমি
আমারই সে গ্রাম?
ও গ্রাম, তোমাকে
হাজারো সেলাম।

হারিয়ে-যাওয়া দেশ

বললে এটা ভুল হবে কি
যখন কোনো স্বপ্ন দেখি
তখন কেবল তোমার মুখই ভাসে
যখন থাকি আপনমনে
কিংবা আধো জাগরণে
তখনও তো আমায় ছাড়ে না সে।
একটা-দুটো গল্পকথা
বলতে গেলে তোমার ছটা
লাগেই এসে সে-গল্পটার গায়ে
বলছি তোমায় এসো এসো এসো
আমার তুমি সব নিয়েছ
ডাইনে তুমিম তুমিই আছো বাঁয়ে।
তুমি আমার ভৈরবী গান
কিংবা ভোরে খোলা আজান
জলের কোলে সারিগানের রেশ-
তুমি আমার চিরকালীন
একলা থাকার দুঃখতে লীন
তুমি আমার হারিয়ে-যাওয়া দেশ!

সংঘাত

আমার ছিল পদ্মায় ভোর, বৈঁচিবোনের বিকেল
তুমি কি আর সেসব কিছু পা-ও?
সোনারূপোর বদলে আজ দিচ্ছি কেবল নিকেল
ঘরের থেকে বেরোও না এক পা-ও!
আমার ছিল ভোরের আলোয় কীর্তনীয়ার গান
আমার ছিল ডালিমগাছে মৌ-
একটু বেলা হলেই যখন মন করে আনচান
দুধ দিয়ে যায় গয়লাবাড়ির বৌ।
আমার ছিল ঘোর দুপুরে ঝপাং-করা সাঁতার
প্রহর পরে প্রহর কাটে জলে-
আমার ছিল উধাও পথ দিক দিগন্ত হাঁটার
হারিয়ে যাওয়া ছলে বা কৌশলে।
আমার ছিল বর্ষা-অঝোর বৃষ্টিপড়ার দিনে
মাঠের মধ্যে ভিজে যাওয়ার সুখ
আমার ছিল নৌকো থেকে জোড়া ইলিশ কিনে
মায়ের মুখে জাগানো কৌতুক।
আমার ছিল একলা বসে দুঃখ পাবার মতো
অঢেল সময়, ছড়ানো দিনরাত-
তোমার দিন যে রুটিন দিয়ে বাঁধছি অবিরত
তোমার আমার সেইখানে সংঘাত।

কোন্‌টা আমি

‘আমার আছে পদ্মানদী’ ‘আমার আছে গঙ্গা’
‘আমার আছে খুলনা-যশোর’ ‘আমার আছে বনগাঁ’
‘আমার আছে রূপসা‘ ‘আমার রূপনারায়ণ নেই?’
‘শিলাইদহ আমার’ ‘আর আমার আছে সেই
ভুবনডাঙার মাঠের পাশে শান্তিনিকেতন-
না থাকলে তা জীবনকথা জানতি কোথায় মন?
‘আমার আছে সাগরদাঁড়ি’ ‘বীরসিংহ আমার’
‘আমার বুকে খালবিল সব’ ‘আমারও খেতখামার’
‘আমার কাছে কক্সবাজার আর নয় সে বেশি দূরও’
‘আমার কি নেই মাথার ওপর দার্জিলিঙের চূড়ো?’
তর্কটা তাই এইখানে ভাই ক্ষান্ত করে দে-
কোন্‌টা যে ঠিক আমার আমি- বল্ তো আমি কে?

বাড়ি

সহজেই তুমি ভুলে থাকো তবু
আমি তো ভুলিনি তোমায়
তোমার ছবিই থেকে গেছে সব
পথের পরিক্রমায়।
আজ শুধু দিই পাড়ি
ধু ধু করা বালিয়াড়ি
তবু মনে পড়ে আমারও তো ছিল
ছুটিতে যাবার বাড়ি।
সেই বাড়ি, সেই তুমি
আমার জন্মভূমি-
দিগন্ত থেকে দেখো আনন্দে
ছুটে আসে মৌসুমি।
তখনও তোমার মনে
দেখো না সংগোপনে
একজন ছিল লুকিয়ে তোমার
সিঁড়ির ঘরের কোণে?
সেই সিঁড়ি, সেই বাড়ি
আজও হবে কান্ডারি
আজও যে আমার মনে পড়ে তার
সুপুরি বনের সারি।