শচীন দাশ > নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে পাঠক এখনও উন্মুখ >> প্রবন্ধ

0
293

শচীন দাশ > নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে পাঠক এখনও উন্মুখ >> প্রবন্ধ

 

[সম্পাদকীয় নোট : কথাসাহিত্যিক অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম ঢাকায় ১৯৩৪ সালে। দেশভাগের যন্ত্রণা নিয়ে একসময় তাঁকে চলে যেতে হয় কলকাতায়। গত ১৯ জানুয়ারি ব্রেনস্ট্রোকে সেখানেই তিনি মৃতুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর। তাঁর উল্লেখযোগ্য সৃষ্টির কয়েকটি হল ‘নীলকন্ঠ পাখির খোঁজে’, ‘অলৌকিক জলযান’, ‘মানুষের ঘরবাড়ি’, ‘ঈশ্বরের বাগান’, ‘ঋতুসংহার’, ‘নগ্ন ঈশ্বর’, ‘নীল তিমি’। পেয়েছিলেন সাহিত্য অকাদেমি, বঙ্কিম পুরস্কারসহ একাধিক পুরস্কার ও সম্মাননা। জীবিকার টানে একাধিক কাজ করেছেন বিভিন্ন সময়। ট্রাক পরিষ্কারের কাজ থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্কুলে শিক্ষকতার কাজও করেছেন তিনি। একজীবনে কাজ করেছেন জাহাজের খালাসি হিসেবেও। পরবর্তীতে সাংবাদিক হিসেবেও কাজ করেছেন বেশ কিছুদিন। বারবার তাঁর লেখায় উঠে এসেছে দেশভাগের যন্ত্রণা। অসাম্প্রদায়িক প্রয়াত এই লেখকের স্মরণে এখানে প্রকাশিত হলো তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজের উপর লেখা একটি প্রবন্ধ। বলাবাহুল্য এই উপন্যাসেই পাঠক খুঁজে পাবেন দেশভাগের কথা, বাংলাদেশের জন্মের কথা। প্রবন্ধটিতেও আছে তার বিবরণ।]
পিত্রালয়ে দিন চারেক কাটিয়ে দেবী দশভূজা আবার স্বগৃহে ফিরে যাওয়ার প্রাক্কালে ধরে রাখা যে নীলকণ্ঠ পাখিকে সম্প্রীতির উদ্দেশ্যে উড়িয়ে দেওয়ান রেওয়াজ ছিল একদা, নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে উপন্যাসে বড়কর্তা পাগল মনীন্দ্রনাথ যেন তাকেই খুঁজে বেড়াচ্ছেন আকাশে হাত বাড়িয়ে। ‘… বড়কর্তা দুহাত উপরে তুলে হাতে তালি বাজাতে থাকলেন, যেন আকাশের কোন প্রান্তে তাঁর পোষা হাজার হাজার নীলকণ্ঠ পাখি হারিয়ে গেছে। হাতের তালিতে তাদের ফেরানোর চেষ্টা।’  মনীন্দ্রনাথের আকুতি ঝরে পড়ে তাই আকাশের দিকে তাকিয়ে। চোখে তাঁর স্বপ্ন, হারিয়ে যাওয়া সেই সব নীলকণ্ঠ পাখিরা ফিরে আসবে আবার রাতের নির্জনতায় ডানা ভাসিয়ে। পাগল মনীন্দ্রনাথ তাই খুঁজে বেড়ান তাদের। এবং তাঁর এই অনুসন্ধানই যেন কথাসাহিত্যিক অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে উপন্যাসের মূল সুর। যে সুর বহন করে নিয়ে গেছে ঈশম, ঈশম শেখ। উপন্যাসের শুরুতেই আমরা তাই দেখি ঈশমকে। পৃথিবীতে নতুন এক মানবশিশু জন্ম নিয়েছে। তারই সংবাদ নিয়ে চলেছে সে।
ঈশমের হাতে একটা লাঠি। একটা লণ্ঠন। প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় উন্মুক্ত আকাশের নিচে মাঠের পর মাঠ অতিক্রম করে যাচ্ছে সে। কাছারি বাড়িতে গিয়ে মেজোকর্তা ভূপেন্দ্রনাথ ও চন্দ্রনাথ ওরফে ধনকর্তা কে জানাবে ওই জন্ম সংবাদ। তারই দায়িত্ব নিয়েছে সে। ঈশম তাই চলেছে মহালে। পথে পড়ছে গ্রাম, পড়ছে নদী। খাল-বিল আর পাড়ার পর পাড়া। এবং পথ ভাঙতে ভাঙতে যাচ্ছে ঈশম জানাচ্ছে সে আনন্দ-সংবাদ। কখনও মাঠ কখনও বা খালপাড়। আবার কখনও বা গুদারাঘাট। গুদারাঘাটে দাঁড়িয়ে ওপারে যাওয়ার চেষ্টায় ঈশম তাই হাঁকে পারানির উদ্দেশ্যে : ‘আমি ঈশম। আমারে পার কইর‌্যা নাও দ্যাও। আমি যাইতেছি খবর নিয়া। ধনকর্তার পোলা হইছে।’
নতুন এক মানবশিশুর জন্মকে ঘিরেই নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে উপন্যাসের শুরু। শুরুর ওই জন্ম তো কেবল মানবজন্ম নয়, যেন জন্ম নিচ্ছে একটি কবিতা। আর ওই জন্ম-মুহূর্তের সাক্ষী ঈশম :
‘সোনালি বালির নদীর চরে রোদ হেলে পড়েছে। ঈশম শেখ ছইয়ের নীচে বসে তামাক টানছে। হেমন্তের বিকেল। নদীর পাড় ধরে কিছু গ্রামের মানুষ হাট করে ফিরছে। দূরে দূরে সব গ্রাম মাঠ দেখা যাচ্ছে। তরমুজের লতা এখনও আকাশমুখো। তামাক টানতে টানতে ঈশম সব দেখছিল। কিছু ফড়িং উড়ছে বাতাসে। সোনালি ধানের গন্ধ মাঠময়। অঘ্রাণের এই শেষ দিনগুলিতে জল নামছে খাল-বিল থেকে। জল নেমে নদীতে এসে পড়ছে। এই জল নামার শব্দ ওর কানে আসছে। সূর্য নেমে গেছে মাঠের ওপারে। বটের ছায়া বালির চর ঢেকে দিয়েছে। পাশে কিছু জলাজমি। ঠাণ্ডা পড়েছে। মাছের এখন আর শীতের জন্য তেমন জলে নড়ছে না। শুধু কিছু সোনাপোকার শব্দ। ওরা ধানখেতে উঠছিল। আর কিছু পাখির ছায়া জলে। দক্ষিণের মাঠ থেকে ওরা ক্রমে সব নেমে আসছে। এ সময় একদল মানুষ গ্রামের সড়ক থেকে নেমে এদিকে আসছিল- ওরা যেন কী বলাবলি করছে। যেন এক মানুষ জন্ম নিচ্ছে এই সংসারে, এখন এক খবর, ঠাকুরবাড়ির ধনকর্তার আঘুনের শেষবেলাতে ছেলে হয়েছে।’
এই উপন্যাসের শুরুতে আছে যেমন জন্ম, শেষ হচ্ছে তেমনি আবার এক মৃত্যুতে। এবং যে জন্মের বার্তা বহন করে নিয়ে এসেছে ঈশম, উপন্যাসের শেষে সেই ঈশমই মারা যাচ্ছে তরমুজের খেতে, কিন্তু অবহেলা নয়, সে নিয়ে আসছে নতুন আর এক বারতা। নতুন এক ভাষার নতুন এক দেশের। তাই তার কবরের উপর লিখে রাখা হয়, আগামী দিনের এক ইস্তাহার। যে স্থান থেকে জন্ম নেবে আর একটি ভূখণ্ড। বাংলাদেশ।
নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে উপন্যাসটি আসলে একদিকে যেমন এ উপমহাদেশের গ্রামসমাজের পরিবর্তনের ইতিহাস, ধর্মভিত্তিক দুই সম্প্রদায়ের মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের অবনতির আলেখ্য, অপরদিকে তেমনি আবার নতুন এক ভাষায় নতুন এক ভূখণ্ড খোঁজার আখ্যান।  একদা যে গ্রামসমাজের গরনে ছিল সম্পর্কের অটুট বন্ধন, হিন্দু-মুসলমান একই বৃন্তের দুটি ফুল হয়ে কাটিয়ে এসেছে এযাবৎকাল, একদিন সেখানে এল ভাঙন। হিন্দু-মুসলমানের সম্পর্ক তলানিতে এসে ঠেকলো। জন্ম নিল মুসলিম লীগ। দাবি উঠল মুসলমানদের জন্য পৃথক একটি দেশ চাই। ফলে, গ্রামে মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে সামসুদ্দিনরা। গ্রামে গ্রামে তারা গাছের সঙ্গে ইস্তাহার ঝোলায়। গ্রামীণ মুসলমান সমাজকে জাগাবার চেষ্টা করে। সমবয়সী বিধবা মাধবীর চোখে পড়ায় সে অবাক হয়েই সামসুদ্দিনের কাছে ইস্তাহারের বিষয়ে জানতে চায় এবং জানতে পেরেই জিজ্ঞেস করে, দেশটাকি শুধু তার জাতভাইদেরই? উত্তরে সামু জানায় :
– কেন আমার জাতভাইদের হইব। দেশটা তর আমার সকলের্।
– তবে কেবল ইসলাম ইসলাম করস ক্যান?
– করি আমার জাতভাইরা বড় বেশি গরু-ঘোড়া হইয়া আছে। একবার চোখ তুইল্যা দ্যাখ, চাকরি তগো, জমি তগো, জমিদারি তগো। শিক্ষাদীক্ষা সব হিন্দুদের। (প্রথম খণ্ড)
দুই খণ্ডে সমাপ্ত এ উপন্যাসের প্রথম খণ্ডে রয়েছে মানুষে মানুষে ভাগাভাগি ও হিন্দু-মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের সম্পর্কের অবনতি। দ্বিতীয় খণ্ডে তারই পরিপ্রেক্ষিতে দাঙ্গা ও দেশভাগ। হিন্দুদের দেশত্যাগ। ফলে, যে গ্রামসমাজে মনীন্দ্রনাথ, ভূপেন্দ্রনাথ, চন্দ্রনাথ প্রমুখেরা ছিল আবহমান কাল ধরে দেশভাগের পরে তারাই একসময় হয়ে পড়ে সংখ্যালঘু। এবং অনিশ্চয়তায় ভোগে। ফলে, একদিন তারা চলে যায় এ দেশ ছেড়ে। কিন্তু তাদের এই দেশত্যাগ কিংবা উৎখাত করাকে মেনে নিতে পারেনি অসাম্প্রদায়িক ঈশম। নদীর চরে বসেও সে তাই ভাবে, ‘মিয়ারা খুব যে খোয়াব দেখতাছো। অগো খ্যাদাইবা  কোন দ্যাশে। নিজের দ্যাশ ছাইড়া কবে কেডা কোনখানে যায়।’
কিন্তু ঈশমের ভাবনাকে নস্যাৎ করে দিয়ে শুরু হয় হিন্দুদের দেশত্যাগে উৎসাহিত করা। তাদের না সরালে তাদের জমিজমার দখল নেবে কী করে ও তাদের অফিস কাছারিতেই বা ঢুকবে কী করে তারা! ফলে মুখ হয়ে যায় ঈশম। এমনকি যে শিশুর জন্মের খবর নিয়ে সে মহালে যায়, সবাইকে সে আনন্দ সংবাদ জানায়, যে শিশুকে সে কোলেপিঠেই মানুষ করে, একদিন সে শিশুরই (সোনা) পায়ের তলার মাটি সরে গেলে সে যেন বোবাই তখন একরকম। কিন্তু মেনে নিতে পারে না। মনে মনে খানিক হলেও বুঝি হতাশ ততদিনে সামসুদ্দিনরা। এ দেশ কি তাদের হলো! এ ভাষা কি তাদের রইল! কোথাও কি একটু সুর কেটে যাচ্ছে। নতুন সুরে খোঁজেই অসম্প্রদায়িক এই মানুষটির মৃত্যুর খবরেই সে তাই ছোটে তরমুজের খেতে। মৃত ঈশমের দেহে নতুন এক ইশতাহার লিখে দেয়। সবাই অবাক হয়ে দেখে সেই ইস্তাহারের নাম বুঝি বাংলাদেশ।
এই আখ্যানের ভাষা কোথাও কোথাও যেন কবিতারই ভাষা নিয়ে উঠে এসেছে। কোথাও কোথাও বা রুক্ষ ও মানুষেরই তৈরি জেহাদের মতোই কঠিন। আবার কোথাও বা যেন এক অজানা নদী সাঁতরে যাওয়ার মতোই এক অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা। নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে উপন্যাসটির খোঁজ পড়ে তাই বারেবারেই। কেবল তাই নয়, হিন্দু ও মুসলমান- এই দুই সম্প্রদায়ের সম্পর্কের অবনতি এবং দাঙ্গা দেশভাগ এ উপমহাদেশের বাঙালিকে আলাদা করে দিয়েছে বহু আগেই। কিন্তু তার ট্রমা আজও কাটেনি। ফলে বাঙালি যতদিন আছে ততদিন তাদের জাতীয় জীবনের এমন ট্রমা নিয়ে তারাও কিন্তু ওই পাগল মনীন্দ্রনাথের মতোই এ আখ্যানে খুঁজে বেড়াবে নীলকণ্ঠ পাখিটিকে। পেলে ভালো, না হলে তাদের এ অনুসন্ধান চলবে। চলতেই থাকবে।