শাপলা সপর্যিতা > ধারাবাহিক উপন্যাস >> সম্পর্কটি শুধুই জৈবিক [পর্ব ৮]

0
396
নকশালবাড়ি আন্দোলন আর বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে এই গল্পের শুরু। সীমান্তের এপার-ওপারের গল্প। কিন্তু এই গল্পের প্রধান চরিত্র ঢাকার বিবাহিত নারী মনস্বীতা। তার নারীজীবনের প্রত্যাশা পূরণের পথে পরিচয় হয় চক্রবর্তীর সঙ্গে। চক্রবর্তী নকশালবাড়ি আন্দালনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মনস্বীতা এভাবেই ত্রিমাত্রিক এক সম্পর্কের কেন্দ্রে ঢুকে পড়ে। এরপর ঘটে চলে নানান ঘটনা। সেই ধারাবাহিক ঘটনারই অষ্টম পর্ব প্রকাশিত হলো এখানে।

পর্ব ৮

ট্রেনের কামরায় উন্মার্গ কামের শেষে প্রেমের ঘোরে লতার মতো জড়িয়ে থাকা দুটো উন্মুখ শরীরে কখন যে ভোরের আলো এসে পড়েছে কেউ জানেনা। বেঘোরে ঘুমুচ্ছিল মাধবী আর চক্রবর্তী। ভোর হয়েছে অনেক্ষণ। রূপালি আলোর পরশে ঘুম ভেঙে জেগে ওঠে ঠিক এই ক্ষণে, পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী দুজন মানুষ। বেলা ১০টা বেজে গেছে ততক্ষণে যখন উত্তরবঙ্গ এক্সপ্রেস ট্রেন এসে থামে নকশালবাড়ি স্টেশনে। বিশশতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত নকশালবাড়ি এলাকাটি চা বাগানের জন্যই বিখ্যাত ছিল। দেশ স্বাধীন হবার দুবছর পর, ১৯৪৯ সাল থেকে কলকাতার সাথে পূর্ব পাকিস্তানের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলো। তখন নতুন করে রেললাইন বসানোর কাজ শুরু হলো। নকশালবাড়ির উপর দিয়ে শিলিগুরিতে মিটারগেজ রেললাইন এলো। নকশালবাড়ি স্টেশনও তৈরি হলো। উত্তরবঙ্গ এক্সপ্রেসে বসে দার্জিলিং বেড়াতে আসা যাত্রীদের চোখ হয়তো কখনো পড়তো কি পড়তো না ছো্ট্ট এই রেলস্টেশনটির দিকে। তারপর আবার ভুলে যেত। মাধবী আর চক্রবর্তীর আপাত গন্তব্য এই নকশালবাড়ি চা বাগানের ম্যানেজার সুপ্রিয় মুখার্জির কোয়ার্টার। সুপ্রিয় মাধবীর দাদার বন্ধু। আর সুপ্রিয়র বৌ চন্দনা মাধবীর ছোটবেলার বন্ধু। পশ্চিমে নেপাল, পূর্বে বাংলাদেশ, দার্জিলিং জেলার ভারত-নেপাল-বাংলাদেশের সীমান্ত-লাগোয়া একটা অঞ্চল, যার নাম নকশালবাড়ি।
নকশালবাড়ি আর নেপালের মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে মেচি নদী। অন্যদিকে বয়ে চলেছে মহানন্দার ধারা। দিনের সূর্য মাথায় করে রেখেছে যেন আজ সোনা সোনা আলোর ধারা। তারই খানিকটা বুঝি ঝরে পড়ছে মেচির ক্ষীণ স্রোতধারায়। বর্ষাকালে এখানে জোয়ার বয় কিনা জানা নেই ওদের। বর্ষার একটানা ধারাবর্ষণে হয়তো উত্তুঙ্গও হতে পারে তার কোনো স্রোতধারা। প্রকৃতি যদিও শীত শেষ করেছে অনেক আগেই। তবু এখানে বর্ষা আসতে আরও বেশ দেরি আছে, মেচির শীর্ণধারা বয়ে চলেছে। প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ মাধবী আজ। ফুরফুরে মন। হালকা ঝরঝরে শরীর চক্রবর্তীরও। সন্ধ্যায় একটা কাজ আছে। চক্রবর্তীকে যেতে হবে পার্টি অফিসে। মাধবীকে কিছু এখনো জানানো হয়নি। মাধবী মুগ্ধ বিস্ময়ে দেখছে প্রকৃতি, তার লীলায় বাঁধানো পাহাড়, শান্ত সবুজ। দূরে উঁচু উঁচু টিলা। জল হাঁটুতে ঠেকে আছে এখানে এখনো। শীতের শুরু থেকে ভরা বর্ষার আগ অব্দি স্থানীয় লোকজন হেঁটেই চলাচল করে এখানে। নুয়ে পড়ে মেচির জল ছুঁতে ছুঁতে মাধবী চক্রবর্তীকে ডাকে :
– দেখো দেখো, কি সুন্দর।
– হুম। সত্যিই। খুব সুন্দর।
যে সাঁওতাল ছেলেটিকে ওদের নিতে পাঠিয়েছে সুপ্রিয়দা তার নাম মংলু সাঁওতাল। সে-ও ফাঁকে ফাঁকে কথায় যোগ দেয় ওদের সাথে।
– লুখে একে বন্দর বোলে সাহাব।
– কোনটিকে বন্দর বলে?
– নোকসালবাড়ি, ফাঁসিদেওয়া, খড়িবাড়ি নিয়ে দুসো চুয়াত্তার বর্গমাইল এলাকা আছে এখানে বন্দর বোলে। বহুত গারীব লোক আছে। পেটে ভুখা আছে। দুমুঠা ভাত পাবে বোলে সারাদিন কাজ করাইলায় মালিক সাহাব।
মাধবীর মন খারাপ হয়ে যায় ছেলেটির কথা শুনে। সে প্রশ্ন করে :
– তোমরা এখানে কোথা থেকে এসেছ? মানে এটাতো তোমাদের বাপ-দাদার বসতবাটি নয়?
– নাগো বৌমনি। এলাকার পত্তনের সময় রাজবাংসীরাই আছিলা সুধু।
মাধবী উচ্চারণ করে নামটি আবার :
– রাজবংশী?
– হয়, রাজবংসী।
– তারপর?
– কাজের লুবে লুবে, দুমুঠো খাবে পড়বে বলে সাঁওতালেরাও আসতে সুরু করে দিল। নেপালিরাও এলো। বাসাবাড়ি বানায়ে নিল ইখানে দিনে দিনে।
– আচ্ছা।
চক্রবর্তীর মাথায় খেলছে পার্টি অফিসের চিন্তা। কখন যে কিভাবে মাধবীর কাছ থেকে ছাড়া পাবে। নির্ঘাত এই নতুন জায়গায় চিন-পরিচয় নেই বলে মাধবী তাকে ছাড়তে চাইবে না। ভেতরে ভেতরে উৎকণ্ঠা এবার বুকের কাছে উঠে আসছে :
– এই আর কতদূর রে মংলু?
চক্রবর্তীর কথা শোনে না ওরা। ততক্ষণে মাধবী জুটে গেছে মংলুর সাথে গল্পে। ওর বেশ ভালো লাগছে শুনতে। মাধবী আবার বলে মংলুকে :
– আচ্ছা, তারপর?
– বাগানের কুলির কাজ করাতে বহুত লুক আনা হলো এখানে বৌমনি। রাঁচি ওড়িশা, মধ্যপাদেস থেকেও আনা হোলো কত কত লুক।
– এদেরকে দিয়ে কি কাজ করানো হতো রে মংলু?
– চা বাগানের কুলির কাজ।
এর মাঝখানে ওদের কথায় যোগ দেয় চক্রবর্তী;
– তুমি কি জানো। এদের পাওনা কড়ায় গণ্ডায় শোধ করা হতো না কোনোকালেই। ছিলনা নিজস্ব কোনো অধিকার এদের।
– আচ্ছা? ওদের অধিকারের জন্য কি কিছুই করেনি তখন ইংরেজ সরকার?
– করেছে। ১৮৫৯ সালের রেন্ট অ্যাক্টের ধারা ১০-এ আধিয়াদের বারো বছরের চাষ করা জমির দখলিসত্ব দেয়ার নির্দেশ রয়েছে।
– তাহলে?
-তাহলে আর কি? জোতদাররা ছাড়তো নাকি জমি? সত্যিকার অর্থে কোনো জমিই আধিয়াররা পেতনা।
– পুরোটাই ঠকবাজি তাহলে?
– আর বলতে?
এর মধ্যে আবার যোগ হয় মংলু সাঁওতাল :
– আবার কি হয়েছে সাহাব জানোতো?
– বলো তো কি?
– যারা কৃসকেরা খাজটাটাজনা দিতো…
কথার মাঝখানে মাধবী কথা টেনে নিয়ে বলে :
– আবার কৃষকেরও খাজনা দিতে হতো নাকি রে?
– হয় বৌমনি। কৃসক খাজনাটাজনা দিল বটে, তবু প্রজা বলে তাকে স্বীকার দিলনা।
– কেন?
চক্রবর্তীর দিকে তাকিয়ে মাধবী প্রশ্ন করলে চক্রবর্তী উত্তর দেয় :
– এ নিয়ে অনেক চিঠি চালাচালি হয়েছে। ১৮৭২ সালে বেকেট সাহেব প্রজা হিসেবে এদেরকে স্বীকৃতি দেবার জন্য সুপারিশ করে চিঠি পাঠিয়েছিলেন কলকাতায়। এভাবে বিভিন্ন সময়ে নানাভাবে প্রজার অধিকার সংরক্ষণের চেষ্টা করা হলেও স্হানীয় জোতদারদের কারণে সে অধিকার প্রজারা পায়নি কোনো কালেই।
– তার মানে যাতা রকমের শোষণ চলছে শত বছর ধরে এখানে?
– হুম।
কথাগুলো শুনতে শুনতে মংলু সাঁওতালের ভেতরের আলোড়ন টের পেয়ে যায় চক্রবর্তী মাধবী দুজনেই। এত বছর এখানে থেকেও সঠিক করে বাংলা উচ্চারণ এদের আসেনা। এখনো ‘শ’-কে ‘স’। ‘বলে’-কে ‘বোলে’ ‘লোক-কে লুক’ এমন অপভ্রংশ শব্দের উচ্চারণে কথা বলতে থাকে অধিকাংশ সাঁওতাল। মংলুও ঠিক এই ঢঙে কথা বলে চলেছে। তার ভেতরেও চাপা আগুন জ্বলছে। তার আঁচ ওদের দুজনেরই গায়ে লাগছে। সেই ধারায় মংলু আবার যুক্ত হয় :
– আরও হয়েছে কী জানোতো বৌমনি, ওনেক ওনেক চা বাগান কিনে লিয়েছে চা বাগানের মালিকরা। ওনেক ওনেক বাগান। জমি কিনে লিয়েছে। আর সাঁওতালদেরকে কুলির কাজে লাগিয়ে দিয়েছে।
মংলুর কথারই রেশ ধরে চক্রবর্তী আবার বলে :
– হুম। প্রজার অধিকার দেয়া, তাদের দরকারি প্রয়োজন মেটানো তো দূরে থাক; সরকার, জোতদার ও বাগানের মালিক মিলিয়ে সৃষ্টি হলো তিন শ্রেণির জমির মালিক, অর্থাৎ শোষক-শ্রেণির।
মাধবী অত্যন্ত বুদ্ধিমতী নারী। চক্রবর্তীর গলার বিদ্রোহের সুরটা টের পায়। মাধবীর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি গিয়ে পড়ে চক্রবর্তীর চোখে। চোখ সরিয়ে নিয়ে সামনে আগায় চক্রবর্তী। কথা পাল্টে অন্যদিকে ঘুরে চলে যেতে চায় :
– মংলু। কি অবস্থা?
– ওইতো সাহাব। ওই… যে বাংলো দেখা যায়, ওটাই সাহাবের বাংলো। চলুন। চলুন। বৌমনি দাঁড়ায়ে আছেন দেখছি। আসুন আসুন। তাড়াতাড়ি আসুন। আর বেশি দূরে নয় বিধায় বাংলোতে উঠে এল সকলেই খুব তাড়াতাড়ি। সেই ছেলেবেলার বন্ধু চন্দনা আর মাধবী একজন আর একজনকে পেয়ে দারুণ খুশি। সুপ্রিয় বাবু তখন অফিসে। খবর পেয়ে দ্রুত এলেন। জলখাবারের ব্যবস্থা হলো। সুপ্রিয়বাবুকে পেয়ে কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো চক্রবর্তী। তার নাম আগেই পার্টি অফিস চক্রবর্তীকে জানিয়েছিল। মাধবী আর চন্দনা ঘরের ভেতরে গেলে চক্রবর্তী আর সুপ্রিয়র মধ্যে কথাবার্তা চলে। চক্রবর্তীই কথা শুরু করে, কেননা তাড়া আছে তার :
– দাদা আমার এক্ষুণি বেরিয়ে পড়তে হবে, জানেনতো?
– হুম। জানি। কমরেড চারু মজুমদারসহ অন্য ক্যাডাররা এসে গেছেন ইতিমধ্যে। তুমি খুব তাড়াতাড়ি বের হয়ে যাও।
কমরেড চারু মজুমদার ক্যাডার মিটিং ডেকেছেন। নকশালবাড়ি, ফাঁসিদেওয়া, খড়িবাড়ি এলাকার মূল কৃষক কমরেড, পুরোনো নেতা আর নতুন কমরেডরা সেখানে উপস্থিত থাকবেন। তাই চক্রবর্তী একটু ইতস্তত করে। সে-তো এই এলাকার নয়। তবু পার্টি যখন জানতে পেরেছে ব্যক্তিগত কারণে চক্রবর্তীকে এদিকে আসতেই হচ্ছে আর কমরেড চারু মজুমদার ওখানে একটি মিটিং ডেকেছেন, অতএব চক্রবর্তী সেটা অ্যাটন্ড করুক নতুন কমরেড হিসেবে। বুকের ভেতরে তখন প্রবল উত্তেজনা। চারু মজুমদারের সাথে দেখা হবার রোমাঞ্চ একদিকে আন্দোলিত করছে, অন্যদিকে মাধবী জেনে যাবে এই ভয়ে দুরু দুরু বুকে মাধবীকে কিছু না জানিয়েই বাইরে পা বাড়ায় চক্রবর্তী।
আর ঠিক তখনই :
-এই এই, তুমি কোথায় গেলে?
বলতে বলতে মাধবী ঘরে প্রবেশ করে।
– সুপ্রিয়দা? চক্রবর্তী কোথায়?
বাইরে পা ফেলেই চক্রবর্তী পেছনে মাধবীর ডাক শুনতে পায়। কিন্তু কিছু করবার নেই তার। কান বন্ধ করে রূদ্ধশ্বাসে এক দৌড়ে পার হয়ে যায় বাড়ির সদর দরজাটুকু। ঘরের পর্দা বাতাসে উড়ে চলে। তারই এক চিলতে ফাঁক গলে মাধবী বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার বিস্মিত চোখের দৃষ্টি চক্রবর্তীর দৌড়েচলা ছায়াকে অনুসরণ করে কিছু একটা বুঝতে চেষ্টা করে।
[চলবে]

পূর্ববর্তী পর্ব 

http://www.teerandaz.com/%E0%A6%B6%E0%A6%BE%E0%A6%AA%E0%A6%B2%E0%A6%BE-%E0%A6%B8%E0%A6%AA%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BF%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%A7%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%B9%E0%A6%BF/?fbclid=IwAR3w5cFrVn-oQkaNC2mX1gasonCVMvr9Prx24d6QlRjGnpI9hOIIZBSUybk