শাপলা সপর্যিতা > সম্পর্কটি শুধুই জৈবিক >> ধারাবাহিক উপন্যাস [পর্ব ১৬]

0
357
মানব-মানবীর চিরন্তন রীতিসিদ্ধ ও রীতিবিরোধী প্রেম আর প্রত্যাশার প্রকাশ, গ্রহণ, বর্জন, জিঘাংসা ইত্যাদিকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে এই উপন্যাসের কাহিনি। ভারত ভাগ (১৯৪৭) থেকে শুরু করে ভারতের নকশাল আন্দোলনের (১৯৬৬-১৯৭১) প্রেক্ষাপট ছুঁয়ে বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থান (১৯৬৯) ও স্বাধীনতা আন্দোলন (১৯৭১) পেরিয়ে সমকাল পর্যন্ত এই উপন্যাসের বিস্তৃতি। আজ প্রকাশিত হলো উপন্যাসটির ষষ্ঠদশ পর্ব। পূর্ববর্তী পঞ্চদশ পর্বটি দেয়া আছে এই পর্বটির নিচে।

 

পর্ব ১৬

এ যে ঘোর স্বপ্ন। এ মায়া। আর এই মহামায়ার ঘোরে আজকের সারাটা রাত কেটে গেল। দিনের হালকা আলোর আবেশে চোখ খুলে কাউকে দেখতে না পেলেও কেমন এক মাধবী মাধবী গন্ধ যেন ছড়িয়ে রয়েছে সারাটি ঘরে। মায়াবী সে আঘ্রাণ। মধুরতম মাদকতা। এখানো মাতাল শরীর। মাতাল, এখনো প্রতিটি রক্তের কণা। ঘুম ভেঙেও প্রতিক্ষণে শরীরের কানায় কানায় উন্মার্গের প্রাবল্য টের পায় চক্রবর্তী। অনুভব করতে পারে মাধবীর প্রাণ, শরীর, প্রেম, উদ্ধত কামনার সাত রঙ। সেই কামনার আশ্লেষে নিগূঢ় রাত্রিযাপন আজকের পুরোটাই। এ যাপন এতটাই সত্য, এতটাই জীবন্ত যে, তার বস্তুগত রঙ এই সকালের সূর্ঘের করঘাতেও ভেঙে পড়েনি কণামাত্র। ওই তো মাধবী দাঁড়িয়ে রয়েছে দূরে। হেসে উঠছে। টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়ছে আজকের সকাল। মাধবীর হাসির শব্দের মধুরতম ঝংকারে ভেঙে পড়তে লেগেছে পৃথিবীর সকল কাঁচ। ওইতো মাধবীর কান্নায় ক্লান্ত লাল পতাকার উড্ডীন। তার রোষে আর অভিমানে ছুটে আসা রাতের প্রত্যাঘ্যাতগুলো যেন এখনো সূচগ্র তীরের মতো বিঁধছে গভীরে। আর ক্রমাগত বিষাক্ত করে তুলছে চক্রবর্তীর একান্ত বিপ্লব। প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ছে নিজেরই কাছে। সত্যিকার বিপ্লবী কি হয়ে উঠতে পারছেনা চক্রবর্তী! তার কপালে বাঁধা লাল পতাকাটি কি তবে উড়তে উড়তে থেমে যাবে! নিস্পন্দ হয়ে পড়বে তার তেজ! বাতাসের আন্দোলনে শিহরিত হবে না কি আর তার সচল গতি! আটাশ বছরের যৌবনোদীপ্ত উচ্ছ্বলতার সাথে কি তবে আজ ভীষণ বিভেদ সৃষ্টি হতে চলেছে। কেন এত পিছুটান। কেন এতটা আবিষ্ট হয়ে পড়ছে সে। এ তো বিপ্লবীর কাছে কাম্য নয়। কি বলছিল সে রাতে স্বপ্নের ঘোরে মাধবীকে। হ্যাঁ, ব্যক্তিগত সাধকে কখনো কখনো দ্বিতীয় প্রায়োরিটিতে রাখতে হয়। কিন্তু এই মনোদৈহিক টানা পোড়েন গিয়ে ঠেকেছে এক মারাত্মক দ্বিধা আর দ্বন্দ্বের মাঝখানে। কোথায় আছে মাধবী। কেমন আছে আদৌ! কেউ কি রেখেছে তার কোনো খবর। আর যা কিছু স্বপ্নে দেখেছে তার এতটুকু যদি সত্যি হয়ে দাঁড়ায় কখনো- নকশালিস্ট চক্রবর্তী আর মাধবীর যুগপথে! তবে! কি আসছে ধেয়ে সামনে! বিষণ্ন বিক্ষিপ্ত লাগে নিজেকে নিজেরই্ কাছে আজ। সে জানে স্বপ্ন এক স্খলন। কবে যেন পড়েছিল ফ্রয়েডের স্বপ্ন ব্যাখ্যা, কবে আজ মনে নেই। তবে এটা মনে পড়ে, স্বপ্ন মনের গভীর কিংবা র্অধচেতনার কোনো এক স্তরে জমে থাকা অতৃপ্তির নাম, যা কেবলই ধেয়ে আসে ইপ্সিত তৃপ্তির দিকে। নিজস্ব চাওয়া পাওয়ার অবদমন থেকে জন্ম যার, না পাওয়াকে বাস্তবের খুব কাছে কিন্তু বাস্তব নয় এমন এক অবছায়া অবস্থায় পাওয়ার মাঝে। অদেখাকে একেবারেই ধারে-কাছে অনুভব করার কাছাকাছি। তবু উৎকণ্ঠা তবু মনের অসম্ভব এক বিস্ত্রস্ত বিক্ষেপণ ক্রমাগত অস্থির করে তুলছে কেন আজ! চক্রর ভাবনার জাল ছিন্ন হয় প্রহরীর ডাকে।
– উঠ যাও তুম লোক।
প্রহরীর হাতে সকালের নাস্তা। শুকনো রুটি ডাল আর পনিরের তরকারি। প্রতিদিনের মতো। প্রহরীর ডাকে একলা মগ্নচৈতন্য থেকে ফিরে আসে চক্রবর্তী। পাশের ঝুলন্ত বিছানা থেকে ঘুমে কাদা হয়ে পড়ে থাকা কৃষ্ণভক্ত শর্মা চোখ খুলে তাকান। প্রহরী এবার বেশ গলা চড়িয়ে ডাকে।
– উঠ যাও। তুম লোক আজাদ হো যায়।
– কি?
লাফ মেরে বিছানা ছেড়ে ওঠে চক্রবর্তী। তাকায় শর্মার দিকে। অদ্ভুত এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন তিনি সামনে। তার দৃষ্টি অনুসরণ করে সে দেখতে পায় দড়িতে ঝোলানো তার খুলে রাখা আলখাল্লায় চোখ শর্মার। সেই যে এসেই খুলে রেখে দিয়েছিলেন আলখাল্লাটি দড়িতে, তেমনই আছে সেখানে। এক মাস গত হয়েছে। ধুলোয় মলিন হয়েছে। কেউ ধরেনি সেটা। সে যতটুকু জানে, ওতেই রাখা আছে আটটি দলিল। কিন্তু এতটা অবহেলায় যে ফেলে রেখেছেন কেন কে জানে। এতটুকু উৎকন্ঠাও দেখেনি গত একমাসে। চক্রবর্তী ডাকে।
– কমরেড।
শর্মার নিরাবেগ কণ্ঠ, একটি হাত খানিকটা উঠিয়ে বলেন।
– শান্ত থাকুন কমরেড। ধীরে।
প্রহরী চলে গেলে আবার বলেন।
– খুব অস্থির হবার সময় এখনো নয় কমরেড। এখান থেকে বের হবার সময়টা আরও কঠিন। ওদের বিশ্বাস করানো গেছে যে, আমরা গুপ্তচর নই। এত মার খেয়েও আমরা কিন্তু স্বীকার করিনি আমাদের কাছে কি আছে আর আমরা কি করতে এখানে এসেছি। কিন্তু যে কোনো সময় অবিশ্বাসটুকু ফিরে আসবারও যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ এখনো আমাদের সাথে রয়েছে দলিলগুলো, যেগুলো নিয়ে ধরা পড়লেই আমূল বদলে যাবে দৃশ্যপট। তাই যথেষ্ট স্থিরতার দরকার রয়েছে আমাদের এখন। মাত্র একটি পথ আমরা অতিক্রম করতে চলেছি। কিন্তু তারপরও রয়েছে মারাত্মক অনিশ্চয়তা। বরফে ঢাকা পথ। শরীরে তীব্র ক্ষত, মারাত্মক জখম আর ব্যথার ভারে আমরা দুজনেই হত। তারপর রয়েছে তীব্র ঠাণ্ডাতে পথিমধ্যে জমে অসুস্থ হবার সম্ভাবনা। ঝড় জল আর বরফের মধ্য দিয়ে চলতে হবে আমাদের। আরও শংকুল পথে্ এগোতে হবে এখান থেকে আমরা চলে যাব মিরিক। সেখানে থেকে হাঁটাপথে তিব্বত সীমান্ত দিয়ে ঢুকতে হবে চীনে। যেখানে চীনের দখলকৃত অধিপথে রয়েছে স্থানে স্থানে আমেরিকার মদদপুষ্ট তিব্বতী গেরিলা বাহিনী। পথিমধ্যে হিংস্র পশুর দল। খরস্রোতা নদী। পাহাড়ের উঁচু শিখর থেকে হঠাৎ গড়িয়ে পড়া হিমবাহ। কখন কোথায় ভাসিয়ে নিয়ে চলে যায় তার কোনো কিছু আগে থেকে বলা চলে না। তাই খুব শান্ত। খুব স্থির। আবেগের কোনো ঠাঁই এখানে নেই। অথচ দেখুন তাকিয়ে ওদিকে, আমাদের পথচেয়ে বসে রয়েছেন কমরেড চারু মজুমদার। পথচেয়ে লক্ষকোটি ভারতবাসী, সংগ্রামী জনতা। লক্ষ্য আমাদের নিজেদের মুক্তি নয়। আমাদের লক্ষ্য বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে স্বাধীনতা। সমগ্র ভারতবর্ষের প্রতিটি মানুষের নিজস্ব বিপ্লব। ভারতের প্রতিটি মানুষের নিজস্ব স্বাধীনতা। বুর্জোয়া রাজনীতির সুর্দীঘ কালের শোষণ থেকে মুক্তিকামী সাধারণ কৃষক শ্রমিক জনতার মুক্তি এনে দেয়া। কঠিন সে পথ কমরেড। খুব কঠিন।
এতক্ষণ ধরে কৃষ্ণভক্ত শর্মার কথা শোনার পর চক্রবর্তী গলা খানিকটা নামিয়ে প্রশ্ন করে।
– কিন্তু দলিল?
– ওখানেই আছে।
বলে আঙুল তুলে দেখান দড়িতে ঝুলানো আলখাল্লাকে।
– ওখানেই ওগুলো বেশ আছে। আমি ওগুলোকে খুব একটা যত্ন করিনি, কারণ তাতে ওদের সন্দেহ হতে পারতো।
– কিন্তু ওভাবে দলিলগুলো ঝুলিয়ে রাখলেন?
-এছাড়া কিছুই করবার ছিলনা কমরেড। ওগুলোকে খুব বেশি ধরা-ছোঁয়া করলে ওরা সন্দেহ করতে পারতো। তাই অবহেলায় ফেলে রেখেছি। একবার যদি ওরা দলিলগুলো ঘাটতে শুরু করতো তবে ঠিক খুঁজে বের করে ফেলতো। ওপরওয়ালাদের হাতে যদি কোনোমতে চলে যেত আপনি কি মনে করেন ওরা বুঝতে পারতো না? অবশ্যই পারতো। তাই আমি প্রহরীদের সন্দেহের মাত্রাকে বাড়তে দেইনি।
চক্রবর্তীকে তবু অস্থির দেখায়।
– কমরেড। আপনি নিশ্চিত? দলিলগুলো ওখানে আছে তো?
– গতরাত অবধি আমি নিশ্চিত ছিলাম। এখন আছে কি নেই সেটা নিশ্চিত নই।
– তবে?
চক্রবর্তীকে অস্থির দেখায়। আলখাল্লাটা আনতে উঠতে যেতে চায়। শর্মা তাকে থামাতে ডাকেন।
– কমরেড, অস্থির হবে না। ওরা অনুমতি দিক। ওটা বাদ দিয়ে আমরা প্রস্তুত হই চলুন।
তখনই প্রহরী আবার প্রবেশ করে।
– তুম লোক রেডি হো যাও। তুম লোক ইস দিন সে আজাদ হো গ্যয়ে। ইউ ক্যান গো। ইধার আও। ইয়ে লো।
এই বলে একজন প্রহরী ওদের পুরানো হ্যান্ডব্যাগ, ব্যাগে রাখা শুকনো ছোলার ডাল আর ছাতুর গুড়াভরা একটা কৌটা ইত্যাদি এসব ফেরত দেয়। একলাফে প্রহরীর সামনেই উঠে বসেন শর্মা। দড়িতে ঝুলিয়ে রাখা আলখাল্লাটা গায়ে পড়ে নেন।
আলখাল্লার ভেতর দলিলগুলো যথাসুন্দর আছে। কোনো সমস্যা নেই। ঠিকঠাক সব। দুজনে বের হয়ে আসেন পথে।
দূরে পাহাড়ের উঁচু উঁচু টিলায় আজ আর ওদের দিকে বন্দুক তাক করে দাঁড়িয়ে নেই প্রহরীরা। স্বস্তির নিঃশ্বাস নেয় চক্রবর্তী বুক ভরে। কিন্ত শর্মাকে অতটা শান্ত দেখায় না। পথ চলছেন নিবিষ্ট মনে। ক্লান্ত অবষণ্ন হয়ে পড়বার কথা যে শরীরের, তার কোনো ছাপ নেই। হেঁটে চলেছেন। যেতে যেতে পথে সাত দিন পার হয়ে গেল। পৌঁছালেন মিরিকে। বললেন,
– বুঝলেন কমরেড, আমাদের এবার চলতে হবে কঠিন পথে। যেতে হবে আরও বহু পথ।
– হুম।
– আমরা এবার রওনা দেব কোথায় জানেন?
– চীনের দিকে।
– হুম। কিন্তু আমাদের বের হতে হবে তিব্বত সীমান্ত দিয়ে। হাঁটাপথে
– আচ্ছা।
– আপনার কাছে কি ম্যাপ আছে কমরেড?
– আমার দিক-দিশা জ্ঞান খুব ভালো কমরেড। ম্যাপ লাগবেনা। উত্তর-পূব কোণায় আছে চীন। উত্তর-পুব কোণার দিকে এগুবো। কিন্তু আমার চিন্তা অন্যখানে।
– কি সেটা?
– তিব্বত। পৃথিবীর সুউচ্চ শিখরে অবস্থিত দেশটি। এত ঠাণ্ডা ওখানে। তার উপর রয়েছে আমেরিকার খাম্পা গেরিলারা। ওদের হাতে পড়লে আর রেহাই নেই।
– এখন আমরা ঠিক কোন জায়গাটাতে আছি কমরেড?
– যতটুকু ধারণা করতে পারছি এটা তিব্বত আর সিকিম বর্ডারের কাছাকাছি কোথাও হবে । কমরেড, আমি আসবার সময় বৌদি যে ছাতু করে দিয়েছিলেন, তার কিছুটা অবশেষ রয়ে গেছে। চলুন খেয়ে নেই। খুব ক্ষিদে পেয়েছে। বসে পড়লেন তিনি একটা গাছের ছায়ায়। চক্রবর্তী দেখলো তার পা দুটো খুব বেশি ফুলে আছে। কিন্তু তার মুখে কোনো রা নেই। উঁহু আহা জাতীয় একটি শব্দও এ যাবত তাকে বলতে শোনেনি। এত যে মার খেয়েছেন নেপালি রক্ষীদের গুহায় আটক থাকার সময়, তবু রক্তাক্ত জখমে পুড়ে যাওয়া পিঠে নির্লিপ্ত শুয়ে থেকেছেন। এসব ভাবতে ভাবতে কৃষ্ণভক্ত শর্মা তার ঝোলা থেকে একটি ব্যাগ বের করলেন। তারপর একটা বড় কাগজও।
– এটা কি কমরেড? এটা পাহাড়ে একধরনের বিড়ি বানানোর কাগজ। ভীষণ শক্ত। স্থানীয়রা একে বলে কটুয়া।
– এটা একটু ধরুনতো কমরেড। কটুয়া কাগজটা দিয়ে আমি একটা চেম্বার বানাবো।
বলতে বলতে একটা বেশ বড়সড় ঠোঙামতো কী যেন বের করে চক্রবতীর দিকে বাড়িয়ে দিলেন।
চক্রবর্তী দেখলো ঠোঙার নিচেরটা বেশ শক্ত। আর সেটার ভেতরে বেশ কয়েকটা চেম্বার। শর্মা দলিলগুলো বেশ ঠোঙার নিচের সাইজ মতো ভাঁজ করলেন। তার ভেতর ঠেসে ঢোকালেন সবগুলো দলিল। তার সাথে টিনের একটা কৌটোমতো ছিল। সেটাতে কি একটা ঢেলে ম্যাচ বের করে আগুন ধরাতে বললেন চক্রবর্তীকে। তিনটা ইটের উপর রেখে নিচে শুকনো পাতায় আগুন জ্বেলে যেটা গলালেন সেটা দেখতে আলকাতরার মতো। তারপর অনায়াসে সেই আলকাতরা ঢেলে দিলেন ঠোঙার একদম নিচের চেম্বারে। আলকাতরা জমে গেল।
– আসুন কমরেড। ছাতু খেয়ে নেই।
ছাতু খাওয়া শেষ করে কিছু ছাতু তিনি ছড়িয়ে দিলেন ঠোঙাটির নিচে। তার উপর আরও যা যা ছিল তাই রেখে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে যেই উঠতে গেলেন, ওমনি একটা কণ্ঠস্বর কানে এলো।
– তুম কৌন হো?
প্রশ্নে ঘুরে তাকাতেই দেখতে পান দুজন সাধারণ মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। দেখতে সাধারণ মনে হচ্ছে। দুজনের হাতেই লম্বা লম্বা দুটো রাম দা।
[চলবে]

পূর্ববর্তী পর্ব-১৫

এখানে গুহার ভেতরটাতে বেশ গরম হবার কথা। অথচ তা নয়। একপাশে খোলা মুখ দিয়ে খানিক বাতাস আসে থেকে থেকে। তাই ভেতরে স্বস্তিদায়ক হাওয়া। রাত্রি মাঝ প্রহর। ক্লান্ত প্রহরী, ঝিমুচ্ছে। মধ্যরাতের আঁধার তাড়িয়ে তাড়িয়ে কয়েকটি প্রদীপও ঝিমিয়ে পড়েছে তখন। বাকিগুলো আরাধ্য জীবনের শেষ মুহূর্তটুকু দান করে চলেছিল চক্রবর্তীর কুঠুরিটাতে। খানিক্ষণ আগে তারাও নিষ্প্রভ হয়েছে। তাই গুহার ভেতর এখন গাঢ় অন্ধকার। ঝুলন্ত বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়েছিল চক্রবর্তী। তন্দ্রার ভেতর হঠাৎ চমকে উঠে বসে।
– কে? কে তুমি?
অনতিদূর থেকে ভেসে আসে খুব পরিচিত নারীকণ্ঠ।
– চিনতে পারছ না আমাকে?
চেনা কণ্ঠের ধ্বনি হঠাৎ যেন বয়ে আনে কী এক রিনরিনে কাঁপন। ঠিক বুকের মাঝখানে বিঁধে থাকে তার সুর। আর চারপাশে অজস্র ঢেউয়ের বলয় তুলে কেন্দ্র থেকে বিস্তারিত হতে থাকে অদ্ভুত ভালোলাগার ঘোর তুলে দিয়ে অসীমে। যেন মাঝপুকুরে ছুঁড়ে দিয়েছে কেউ ঢিল। একের পর এক ঢেউ ছড়িয়ে পড়ছে ক্রমাগত। কেউ জানে না তার জন্মরহস্য। তবু স্থির চক্রবর্তী। নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জোর চেষ্টা করে যাচ্ছে ভেতরে ভেতরে। তথাপি অপরাধীর মতো অস্ফুট তার কণ্ঠ।
– পারছি তো। কিন্তু তুমি এখানে?
– হুম। আমিই তো।
– কি করে এখানে এলে? এই মধ্যরাতে?
– এলাম। তুমিতো না জানিয়ে চলে এলে। আমি কোথায় আছি, আমার কি হবে, কিভাবে চলবে এসব কি ভেবেছিলে ফেলে আসবার সময়? তবে আজ কি করে এলাম এ প্রশ্ন কেন?
– মাধবী…
উঠে পড়ে চক্রবর্তী। কাছে যায়। এই মুহূর্তে তাকে শান্ত করার দরকার, বুঝতে পারে। ধরতে যায় মাধবীর হাত। খানিক পিছিয়ে যায় মাধবীর অবগুণ্ঠিত অদ্ভুত ছায়া। সে কী অভিমানে!
– মাধবী কি হেসে উঠলো নাম ধরে ডাকায়?
চক্রবর্তীর মনে ধন্দ জাগে। সেই প্রথম প্রেমের সময়গুলোতে যেমন দূর থেকে নাম ধরে ডাকলেই পাগলের মতো ছুটে আসতো মাধবী জানালার ধারে। সেকথা মনে পড়ে যায়। কাছে এসে ডাকলে মৃদু হাসিতে ভুবনে প্লাবিত জোৎস্না ছড়াতো। কিংবা তার চোখের কিরণে ফুটে উঠতো চক্রবর্তীর হাতেধরা ফুলগুলো ভোরের কুয়াশা দূর করে দিয়ে। আর জ্বলে জ্বলে উঠতো সূর্যের রঙ। আজ, অন্ধকারে বোঝা যায় না তার সবটা ঠিকঠাক। তার উপর আধো অবগুণ্ঠনে ঢাকা মুখ। হাতের আঙুল দেখতে পায় চক্রবর্তী। ওইতো মাধবীর ঠোঁট, তাও খুব স্পষ্ট। কিন্তু টানাচোখের গভীরে কালো নদী, চোখের কোমল উপত্যকার ঘন পাপড়িতে প্রায়শই লেগে যায় চশমার কাঁচ। ধনুকের মতো বাঁকানো ভ্রু, কিছুই দেখা যায় না স্পষ্ট। মাথার উপর থেকে ঠোঁট পর্যন্ত ঢাকা অবগুণ্ঠনের আড়ালে কে দাঁড়ানো! এ তো মাধবীই, ওই তো, উদ্ধত খোলা তরবারির মতো ঋজু টান টান, খুব চেনা ভঙ্গিতে দাঁড়ানো মাধবীর শরীর, স্পষ্ট দেখা যায়। সেটাই আজ গাঢ় এক অন্ধকার রাতের মাঝখানে তীব্রভাবে আকৃষ্ট করে চক্রবর্তীকে। ছুটে আসে খুব কাছে। ছুঁয়ে দিতে ইচ্ছে করে ওকে। জড়িয়ে ধরতে চায় আজ একেবারে বুকের কাছে। গভীর আবেগে চুমু খেতে খেতে বড় বেশি মাতাল হতে চায় মন। এই নিরালা অন্ধকারে বিপ্লবের প্রজ্জ্বলিত আগুন আর তার লেলিহান শিখা একমুহূর্তের জন্য যেন নিভে জল হয়ে যেতে চায়। সমগ্র ভারত জুড়ে জ্বলতে থাকা আগুনের উত্তপ্ত প্রবাহ নেপাল-ভারত সীমান্তের এক পাহাড়ের গুহায় এই উদভ্রান্ত রাতের নিঃস্তদ্ধতায় শান্ত, স্থির। টুপটাপ ঝড়ে পড়তে থাকে নিঃশব্দে মোহময় আবেগে। ভাঙতে থাকে একজন বিপ্লবীর শপথ। বস্তুগত তাড়নার প্রবল হলাহল অন্ধ করে দেয় চোখ। বন্ধ করে দেয় রোষ। স্তব্ধ করে দেয় যেন বিপ্লবীর সকল জোস। প্রতিশোধের আগুন নির্লিপ্ত হতে থাকে গোপনে, আড়ালে। রক্তের প্রতিটি কণা মুহূর্তে মুহূর্তে কী যে অস্থির। তার তুমুল তাণ্ডব একজন বিপ্লবীর সাথে গড়ে তোলে দূর্দান্ত অসহযোগে, ভীষণ বিভ্রাট। আর সেই অসহযোগ চক্রবর্তীর সারাটা শরীর জুড়ে আলোড়ন তুলে দিগ্বিদিক ছড়িয়ে দেয় কামনার সুতীব্র বিষ। উন্মাতাল স্পর্ধায় বাধ ভেঙে ফেলে বস্তুগত আবেগের দারুণ সংযম। আর মুহূর্তে মুহূর্তে ছুটে আসে তীব্র ফণা তুলে বিষধর সাপের মতো। কিন্তু মাধবী কেমন একটা নিরাপদ দূরত্ব রাখে। চক্রবর্তী বুঝে উঠতে পারে না কিছুতেই। প্রশ্ন করে।
– তুমি অবগুণ্ঠিত কেন? কেন অন্ধকারে এভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছ? কাছে এসো?
– কাছে!! হা হা হা…।
মাধবীর হাসির শব্দে রাতের গা থেকে আঁধার ভেঙে প্রহরগুলো খসে খসে যেন পরে যেতে থাকে টুকরো কাঁচের মতো। দূরে শিবালিকের চূড়ায় হাসির ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে ফিরে আসে। আরও বেশি সতর্ক হয়ে ওঠে পাহাড়ের চূড়ায় প্রহরীরা। ওরা নড়েচড়ে বসে। কেঁপে ওঠে চক্রবর্তীর বুকের ঠিক মাঝখানটা। অনেক অনেকবার শোনা মাধবীর উঁচু কণ্ঠের ওই হাসি ভুলবার তো নয়। কিন্তু অমন আকাশ কাঁপিয়ে কেন হাসছে আজ, বুঝতে পারেনা। ঘোর লাগে তার।
– মাধবী, এ কী তুমি? নাকি স্বপ্নঘোর!
– না না। আমিই তো। তবু তুমি চিনতে পারছ না আমায়?
– পারছি মাধবী, চিনতে পারছি। কিন্তু তোমাকে কেমন অদ্ভুতই বা ঠেকছে কেন আমার বুঝতে পারছি না!
– হা হা। তাতো ঠেকবেই। তোমার হাত তো রক্তে রাঙানো।
মাধবীর কথায় তীব্র শ্লেষ। সে কথা বলতেই থাকে।
– তোমার কপালে লাল রঙে উড়ছে কার পতাকা? কার রক্ত, চক্র? জানো? আমার নাম মুছে গেছে সে রক্তের বন্যায়। তুমি নেই। কোথাও। মাধবীও নেই কোথাও। তুমি নিরীহ মানুষের জীবন নিয়ে খেলছ মরণ খেলা। তুমি আমার জীবন নিয়েও খেলছ চক্র…
– না না। কি বলছ তুমি? এইতো তুমি আমার বুকের ভেতর।
– বুকের ভেতর? হা হা হা।
চক্রবর্তী অবাক তাকিয়ে রয়েছে মাধবীর দিকে। কী অদ্ভুত আর নির্দয়ভাবে হেসে চলেছে সে। মাধবীর এই অশান্ত রূপ তার চেনা নয়। একেবারেই চেনা নয় তার রোষ। ভীষণ অপরিচিত এই তীব্র তীর্যক কটাক্ষ। তবে কি কোনো ভুল করেছে সে? সেই বালক বয়সের ভালোলাগা ঘোর, প্রেম, গোপনে চুপিসারে বিয়ে, গভীর জঙ্গলের ভেতর পোড়োবাড়িতে প্রথম সঙ্গম সুন্দরম। আর দ্বিতীয় মিলন ট্রেনের কামড়ায়। এই নাতিদীর্ঘ প্রেমের গোপনে কখনো আসেনি তেমন ঝড়। দেখা দেয়নি বিরোধ। কখনো দেখেনি মাধবীর ক্ষোভ কিংবা রূক্ষ ক্লেদাক্ত মুখ। তাই আজ তাকে চিনতে বড় কষ্ট হয় চক্রবর্তীর। কিন্তু সে জানে সে অপরাধ করেছে। মাধবীকে জানানোর দরকার ছিল সব। কিন্তু সাহস করে উঠতে পারেনি। আর সহসা এই বিচ্ছেদ। মেনে নেয়া কঠিন, এও বুঝতে পারে। তবু বিপ্লবীদের বিরুদ্ধে মাধবীর বিষোদ্গারের জবাবটা তার দেয়া দরকার মনে করে।
– এই যে দিনের পর দিন নির্যাতিতের কান্না জোর-জুলুম-জখম তার কোনো প্রতিকার নেই! প্রতিশোধ নেবে না কেউ কোনোদিন? তুমিই বলো মাধবী?
– যে নিজের স্ত্রীকে অরক্ষিত রেখে আসে সে করবে নির্যাতিতের সুরক্ষা? হা হা হা।
– আমি তো একা নই মাধবী। শত শত লক্ষ কোটি ভারতবাসী আজ এই যুদ্ধে সামিল হয়েছে। তাছাড়া তোমাকে তো তোমার ইচ্ছেতেই সুপ্রিয়দার বাড়িতে রেখে এলাম। বৃহত্তর স্বার্থে কখনো ক্ষুদ্রতর স্বার্থকে দ্বিতীয়তে রাখতে হয়। এ তো তোমার অজানা নয়।
– বৃহত্তর স্বার্থ? কাকে বল তুমি? নকশাল আন্দোলন বৃহত্তর আন্দোলন? তবে জবাব দাও। কি তার সত্যাসত্য? যদি জমির আন্দোলনই হবে তবে বড় জোতদাররা কী করে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়? কি করে বৃদ্ধি পায় তাদের জমির পরিমাণ?
– তোমাকে পুরো বিষয়টি বুঝতে হবে তাহলে মাধবী?
– কি বুঝবো তুমিই বলো। যতবারই রাজস্বমন্ত্রী একে জমির আন্দোলন বলছেন, ততবারই সাধারণ মানুষ তাকে থামিয়ে দিয়েছে।
– কারণ আছে মাধবী। এটা এখন আর জমির আন্দোলন নয়। এটা রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের আন্দোলন। কিন্তু তুমি এতকিছু জানলে কি করে?
চক্রবর্তী মাধবীর কথায় তার কংগ্রেসী বাবার ধ্যান-ধারণার ছাপ দেখতে পায়। কিন্তু বুঝে উঠতে পারেনা কিভাবে কী হলো। তীক্ষ্ণ প্রখর বুদ্ধিদীপ্ত মাধবীদের বাড়িতে রাজনীতি নেই। কিন্তু ওর বাবা ভয়ানক কংগ্রেস সমর্থক। এটা চক্রবর্তী জানে। ওদের বাড়িতে এসব আলোচনা চলে ঠিকই। কিন্তু মাধবী যে এসব এতটা রপ্ত করে ফেলেছে কিংবা আত্মস্থ করে ফেলেছে, সেটাই চক্রবর্তীর কাছে বিস্ময়কর ঠেকছে। কিন্তু আজ তার এই অস্থির অবস্থার কারণ তো সে নিজেই। মাধবীর প্রতি এতটুকু ক্ষুব্ধ হতে পারেনা সে। মাধবীর দিকে এগিয়ে যায়। এতটা সময় ধরে দূরে দাঁড়িয়ে বাকযুদ্ধ করতে করতে কি মাধবী খানিকটা অসংহত? চক্রবর্তী দুহাত ছুঁয়ে মাধবীকে কাছে টানতে চায়।
– কাছে এসো। শান্ত হও। তুমি এতদিনে জেনে গেছ তুমি বিপ্লবীর বউ। নয়?
– জেনেছি তো।
– এখন কি করবে তুমি? তুমিই বলো।
– চক্রবর্তী হঠাৎ মাধবীর খোলা তরবারির মতো অশান্ত শরীরী ভঙ্গির পরিবর্তন দেখতে পায়। তার হাতের মুঠোয় ধরা মাধবীর হাত শিথিল হয়ে আসে। দীর্ঘ তিরিশটি দিনের অদেখা অস্পর্শ আর তীব্র অবদমনের চূড়ান্ত অবস্থা মুহূর্তের স্পর্শে লাভার মতো গলে গলে পড়ে যায়। লাভার উত্তাপে পুড়ে খাক হতে ইচ্ছে করে চক্রবর্তীর। তার দুহাতের মাঝখানে মাধবীর শিথিল শরীর। সেখানে, শিহরিত উদ্ধত যৌবনের সুর আর গীতধারা। ঘন হয়ে আসে রাতের শেষ প্রহরে দুজন মানুষ। শরীরে মিশে যেতে চায় দুটো শরীর। চক্রবর্তীর নাক-মুখ ডুবে যায় মাধবীর মরাল গ্রীবায়। গভীর আবেশে চুমু খায়। চিবুকের মাঝ বরাবর ঠোঁটের স্পর্শ যখন কাঁপন তুলছে বহুদিনের প্রতীক্ষিত শরীরের কোণায় কোণায় তখন শিবালিকের চুড়ায় সূর্য উঁকি দিতে শুরু করেছে। মাধবীর মুখের অবগুণ্ঠনটা আলতো করে তুলে ধরে চক্রবর্তী। ঠিক তখনি গুহার আঁধার দূর করে একফালি আলো এসে পড়ে চক্রবর্তীর চোখের পাতায়। চোখ মেলে নির্বাক কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে।
-এ কি!

 

পূর্ববর্তী পর্ব ১৪

http://www.teerandaz.com/%E0%A6%B6%E0%A6%BE%E0%A6%AA%E0%A6%B2%E0%A6%BE-%E0%A6%B8%E0%A6%AA%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BF%E0%A6%A4%E0%A6%BE-%E0%A6%B8%E0%A6%AE%E0%A7%8D%E0%A6%AA%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%95%E0%A6%9F-10/?fbclid=IwAR2EFBu-PJ2Y_hh9gdSXUlA3pPxnawxSIIWXjoobJHlwJ3fA7eO3AiA9bcU