শাপলা সপর্যিতা > সম্পর্কটি শুধুই জৈবিক >> ধারাবাহিক উপন্যাস [পর্ব ১৮]

0
430
চারু মজুমদার বিপ্লবের দলিল তৈরি করেছেন। সেই দলিল নিয়ে তিব্বত হয়ে মাও সে তুঙের কাছে চলেছেন দুজন কমরেড। এদের একজন তার প্রেমিকাকে না জানিয়ে চলেছেন চীনে। কিন্তু সহজ হয়ে উঠছে না সেই অভিযাত্রা। মানব-মানবীর চিরন্তন রীতিসিদ্ধ ও রীতিবিরোধী প্রেম আর প্রত্যাশার প্রকাশ, গ্রহণ, বর্জন, জিঘাংসা ইত্যাদিকে ঘিরে নকশাল আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে আবর্তিত হচ্ছে এই উপন্যাসের কাহিনি। ভারত ভাগ (১৯৪৭) থেকে শুরু করে ভারতের নকশাল আন্দোলনের (১৯৬৬-১৯৭১) প্রেক্ষাপট ছুঁয়ে বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থান (১৯৬৯) ও স্বাধীনতা আন্দোলন (১৯৭১) পেরিয়ে সমকাল পর্যন্ত এর বিস্তৃতি। আজ প্রকাশিত হলো উপন্যাসটির ১৮ সংখ্যক পর্ব। পূর্ববর্তী সপ্তদশ পর্বটি সংযুক্ত করে দেওয়া হয়েছে এই পর্বটির নিচে।

পর্ব ১৮

ঠিক বুঝে উঠতে পারেন না কৃষ্ণভক্ত শর্মা কি ঘটছে এখানে। কি ঘটতেই বা চলেছে। দিনের আলো পুরোপুরি ভাসেনি। এখনো বরফে আচ্ছাদিত দূরের পাহাড়-চূড়া। তিনি মনে মনে ভেবেছিলেন খাম্পা গেরিলাগুলো জেগে উঠবার আগেই চক্রবর্তীকে নিয়ে হাঁটা দেবেন দূরের ওই পাহাড়ের উদ্দেশ্যে। কেন যে বার বার মনে হচ্ছে তারা প্রায় তিব্বত কিংবা চীনের কাছে চলে এসেছেন। নদীর ওপারে পাহাড়টি অতিক্রম করতে পারলেই সীমান্তে পৌঁছানো যাবে। কিন্তু, গত পুরো একটি মাসের পথশ্রান্তি, শরীরের উপর নেপালী সীমান্তরক্ষীদের অত্যাচার, সাথে গত পরশু রাত থেকে শুরু করে সারাটি দিনের একটানা হেঁটে চলার ক্লান্তি – তুষারের প্রকোপ মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করতে না পারলেও হয়তো খানিকটা বিধ্বস্ত করে ফেলেছে শর্মার বত্রিশ বছরের সুঠাম, সুগঠিত শরীরকেও। তাই আজ রাতের ঘুম একটু বেপরোয়া হয়ে গেছে। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ধাতস্থ হন। লাথিটা খুব লেগেছে, চোখ আর চেহারা দেখেই সেটা বোঝা যায়। কিন্তু কঁকানোর লোক তিনি নন। কোনোমতে গুছিয়ে উঠতে নিয়েছেন মাত্র। তখনি আর একটা লাথি শর্মার বুকের উপর তুলতেই অন্য গুণ্ডাটি থামায়। দিনের খানিক আলোর উদ্ভাসে ততক্ষণে স্পষ্ট হয়ে যায় ওদের চেহারা আর ভাষায়, হ্যাঁ, এরা তিব্বতি কিংবা চীনা। দুটোর একটি। কিন্তু যতদূর ধারণা করতে পারছে চক্রবর্তী, এরা খাম্পাই হবে। ওদের সাথে অনেক ভারি ভারি মালপত্র। হতে পারে ওসব লুটপাটের মাল। ওজনে প্রায় তিরিশ পঁয়ত্রিশ কেজি হবে। যে গুণ্ডাটি শর্মার বুকের উপর তোলা লাথিটি থামাতে বাধ্য করেছিল অন্য জনকে সে হঠাৎ তাদের মালপত্রের বোঁচকাটি দেখিয়ে ওদের দুজনকে ইশারা করে সেগুলো উঠিয়ে নিতে। স্তব্ধ হয়ে দেখতে থাকা চক্রবর্তী এতক্ষণে টের পায় যে ওদের এইসব মালামাল বহন করানোর জন্যই তাহলে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে। প্রায় তিরিশ-পঁয়ত্রিশ কেজি মালামাল দু’জনে ভাগাভাগি করে পিঠে তুলে নিয়ে ওদের নির্দেশিত পথে হাঁটতে থাকে। এভাবে তিনদিন পার হবার পর একটি বাড়িতে এসে ওঠে। মাল বইতে বইতে ভীষণ ক্লান্ত দুজনেই। ওরা যে ভাষায় কথা বলছে সে ভাষার মিল নেই হিন্দি কিংবা বাংলার সাথে। তবে ঠাহর করতে পারে খানিকটা ওদের নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা শুনে আর ইশারা অঙ্গভঙ্গি দেখে। বোঝা গেল একটা নদী পার হয়ে ওইসব মাল যেদিকে নিয়ে যাবার কথা, সেখানে নদীটির উপর যে পুলটি ছিল, বর্ষার খরস্রোতে সেটি ভেঙে পড়েছে। অতসব ভারি মালামাল নিয়ে তাই পুলবিহীন নদী পার হওয়া ওদের পক্ষে সম্ভব নয়। তাতে একটি বিষয় স্পষ্ট হলো যে নদীর ওপারে যাওয়াই লোকগুলোর লক্ষ্য। এখন মালগুলো বিক্রি করে দেয়া ছাড়া উপায় নেই। ওরা চলল গ্রামের দিকে। যে বাড়িতে উঠেছিল সেখানে একজন বৃদ্ধা রয়েছেন। প্রচণ্ড তুষারপাতের মধ্যে তিনি চুলার উপর গরম জল চড়িয়ে রাখছেন একটানাই। শর্মা তার ব্যাগ থেকে ছাতু বের করেন। ভীষণ পরিশ্রান্ত তারা। ক্ষুধার্ত দুজনেই। ছাতু গুলে খাবার জন্য গরম জল আর লবণ দেন বৃদ্ধা। খাওয়া শেষ হলে খুব জোর চেষ্টায় ইশারায় ইঙ্গিতে বৃদ্ধাকে বোঝাতে পারেন যা তিনি জানতে চান। শমার চুলায় চড়িয়ে রাখা গরম জলটা দেখিয়ে প্রশ্ন করেন :
– এখানে এই জল তুমি কোথায় পেলে মা?
তার কথা বোঝা দুঃসাধ্য। কেবল ইশারায় কী বলছেন কিছুটা বোঝা গেল। হাতের তর্জনী নির্দেশ করলো দূরে নদীর ওপারে একটা জায়গার নাম ধরে। আর তাতেই দিকনির্দেশনা পেয়ে গেলেন শর্মা, এবার কোন দিকে যেতে হবে।
– ও ই লুন থু ইয়া
– লুনথুইয়া?
আবেগে কৃষ্ণভক্ত শর্মার গলা বেশ চড়ে যায়:
– ও হ হো, ওই দিকে লুনথুইয়া থেকে জল আনো?
বৃদ্ধা তার কথা কিছুই বুঝতে না পেরে মুখের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করে কিছু একটা।
– হা হা হা লুনথুইয়া।
চক্রবর্তী বুঝে যায় বিশেষ কিছু একটা রয়েছে ওই লুনথুইয়ার মধ্যে। তখনই চক্রবর্তীকে কাছে ডাকেন শর্মা, কণ্ঠের স্বর নিচু তার।
– কমরেড, নেপালী সীমান্তরক্ষীরা এই নামটিই বলছিল তখন হিন্দিতে। মনে পড়ে?
– হ্যাঁ, হ্যাঁ কমরেড। ওরা আমাদেরকেই লুনথুইয়া থেকে আসা ডাকাত মনে করেছিল।
– একদম তাই।
– তার মানে ওদিকেই এগুতে হবে আমাদের কমরেড। আমরা খুব কাছে এসে গেছি। কিন্তু ঠিক জায়গাটা বের করতে হলে আমাদের এখনই পালাতে হবে।
– এই দিন-দুপুরে?
-হ্যাঁ। ওরা গ্রামে গেছে লুটের মাল বিক্রি করতে। সন্ধ্যের আগে ফিরবে না। এই সময়টাতেই আমরা পালাবো। রাতে যখন ফিরবে অন্ধকারে আমাদের খুঁজে পেতে ওদের বেশ বেগ পেতে হবে। ততক্ষণে আমরা পাহাড়টা পার হয়ে যেতে পারি! হয়তো একটা কুল-কিনারা হবে এবার।
বৃদ্ধা ছাড়া ওই ঘরটাতে তখন আর কেউ নেই। তিনি নিজের মনে কাজ করছেন। চক্রবর্তী আর কৃষ্ণভক্ত শর্মা তাকে কিছু না বলেই হাতের ব্যাগ নিয়ে বাইরে বের হয়ে আসেন।
– কমরেড ওদিকে দেখুন। একটা ঝরনা দেখা যাচ্ছে।
শর্মার হাতের ইশারায় চক্রবর্তী দেখতে পায় বেশ দূরে একটা ঝরনা। মে-জুন মাসের ভরা বর্ষায় তুমুল গতিতে ছুটে চলেছে।
– কমরেড আমাদের দৌড়োতে হবে ওই ঝরনা ধরে। ঝরনার শেষেই পাবো নদী।
– হুম। আমি নিশ্চিত কোনো নদী পাওয়া যাবে। রাতের মধ্যে এ জায়গা পার হতে না পারলে ওদের হাতেই মারা পড়তে হবে। আমাদের ধরতে পারলে এবার খতম করেই ফেলবে।
– চলুন কমরেড। এক্ষুনি চলুন।
সারাটা রাত একনাগাড়ে দৌড়ানোর পর শরীর ক্লান্ত অবসন্ন। ছাতু শেষ। ক্ষুধার্ত দুজন মানুষ। মন্থর হয়ে আসে হাঁটার গতি। চোখের সামনে অজানা অস্পষ্ট সকল। স্বপ্ন ও বাস্তবের মধ্যে এই মুহূর্তে খুব একটা তারতম্য নেই। অনিশ্চিত এখন আজ কিংবা আগামীর সকল সম্ভাবনা। তবু দুর্ণিবার, সফলতার ব্যাপক আর বিভীষণ এক প্রত্যাশা। ঝুলন্ত জীবনের রহস্য উদ্ঘাটনে সবেগে তাই চলেছেন দুই বিপ্লবী। বুকের নিভৃতে গোপনে উড়ছে লাল পতাকা। তীব্র শীতের দহনেও তাই ভেতরে ভেতরে অগ্নিশিখা। সেটাই কপালে নীরবে এঁকে দিচ্ছে উষ্ণ ওমরেখা। সেই ওম্ ছড়িয়ে পড়ছে কপাল থেকে মাথা, বুকের নীরব থেকে পায়ের ক্রমপ্রসারিত আঙুল অবধি। পেরিয়ে যাচ্ছে গ্রাম নগর শহর দেশ পাহাড় নদী ঝরনা আর তরাইয়ের সকল নিপীড়িত ক্ষুধার্থ মানুষ, সমগ্র ভারত। কৃষ্ণভক্ত শর্মা নিশ্চিত জানেন ওদিকে শুরু হয়ে গেছে নকশাল আন্দোলন। যদিও পথে পথে এখানে সেখানে দিনরাত যাপন আর গোপনীয়তার কারণে কোথাও থেকে কোনো খবর তিনি পাচ্ছেন না নকশাল আন্দোলনের বিষয়ে। কিন্তু তিনি নিশ্চিত। হাটঁতে হাঁটতে গতি মন্থর। কৃষ্ণভক্ত শর্মা আর চক্রবর্তী গল্প করতে করতে এগুতে থাকেন ধীর লয়ে। মনে পড়ে কমরেড চারু মজুমদার একদিন ব্যাখ্যা করেছিলেন কেন তরাই যোগ্য স্থান, কৃষক বিদ্রোহের জন্য। চারু মজুমদার কৃষ্ণভক্ত শর্মা এরা সকলেই তখন কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (সিপিআই)-তে। চৌষট্টি সালে জেল থেকে বের হবার পর ঠিক করলেন তারা আর সিপিআই করবেন না। সিপিআইয়ের মতাদর্শ সেখানে শেষ হবার পথে। জেলের ভেতরে বসেই সেটা টের পেয়েছিলেন। এবং সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন জেলের ভেতরে বসেই। জেল থেকে বের হবার পর সিপিএম গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু পয়ষট্টি সালে যখন পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধ শুরু হয় তখন বেশ বেছে বেছে জেলে ঢোকানো হলো। বাষট্টি সালে যারা জেলে গেছিলেন তাদের অনেক কমরেডকেই এবার আর জেলে ঢোকানো হলো না। তাতে সন্দেহ হলো যে সিপিএমের ভেতরেও সিপিআইয়ের মতো কিছু মারাত্মক দালাল রয়ে গেছেন। এখন তাহলে কি করা উচিত? সিপিএম থেকে আলাদা হয়ে কোন পার্টি গঠন করবেন তারা? তখন কমরেড চারু মজুমদার বললেন :
– দেখ, সব পার্টিই দেখা হলো। কেউ বিপ্লব আনবে না। সবার লক্ষ্য এক। নিজের স্বার্থসিদ্ধি। বিপ্লব যদি করতে হয় তবে দরকার একটি বিপ্লবী পার্টি। আর সংগ্রাম না করে এটা গঠন করা সম্ভব না। পার্টির প্রশ্ন পরে আসবে। আগে করতে হবে কাজ।
চারু মজুমদার তাঁর বক্তব্যে সেদিন মাও সে তুঙের বাণী তুলে ধরে বলেছিলেন :
– এক চিঙ্গরি সারা জঙ্গল জ্বালা সাকতি হ্যায়, অর্থাৎ একটি দিয়াশলাইয়ের কাঠির আগুন একটি পুরো জঙ্গল জ্বালিয়ে দিতে পারে, জানো তো? তো দিয়াশলাইয়ের জ্বলন্ত কাঠি ছুঁড়ে মারলে কোন জায়গাটায় আগে আগুন ধরবে? যেখানে শুকনো পাতাগুলো ছড়িয়ে রয়েছে। চোত-বোশাখের দিনে ওই শুকনো জমিনে আগুন দিলে খুব সহজে সেটা সমস্ত জঙ্গলে ছড়িয়ে পড়বে। আমাদের আজকের ভারত ঠিক সেই অবস্থায় পৌঁছেছে। মানুষের রোজগার নেই। বেকার বাড়ছে দেশে। অভাব বাড়ছে। কৃষকের হাত হতে জমি চলে যাচ্ছে। এ অবস্থায় আমাদের জ্বালাতে হবে। আর দিয়াশলাই কাঠি কোথায় ছুঁড়ে মারতে হবে বলতো? সেই জায়গাটিই হলো তরাই। এই জয়গাটিই তপ্ত পরিপক্ক হয়ে আছে। এখানে অনেকদিন ধরেই কৃষকেরা জোতদারদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে আসছে। এখানে চা শ্রমিকরাও সকল আন্দোলনে কৃষকের সাথে ছিল। এই জায়গাতেই শ্রমিক কৃষকের একটা দারুণ ঐক্য গড়ে উঠেছে।
শর্মার কথা বলতে বলতে মাঝখানে কিছুটা থামেন। দম নেন। শ্রান্তির ছাপ তার গলার স্বরে স্পষ্ট এবার।
– বুঝলেন কমরেড। সেই থেকেই কমরেড চারু কী কী করণীয়, লিখতে শুরু করলেন। কিন্তু কার কাছে জানবেন এই লেখাটা ঠিক হচ্ছে কি বেঠিক? জাজ করবে কে? গুরু তো একজন লাগবে? ভারতে তো আর কোনো গুরু নেই। আছে চীনে। অতএব আমাদের যেতে হবে চীনে। মাও সে তুঙের কাছে।
রাত শেষ হয়েছে কিছুক্ষণ আগেই। পথ চলার বিরাম নেই তবু। ফুটতে শুরু করেছে ভোরের আলো। সেই হালকা নীলাভ আলোয় দূরের কোনো নদীর জলরেখার তীব্র ঝিলিক এসে চোখে লাগছে দুজনের। মনে জ্বেলে দিচ্ছে নতুন প্রত্যাশার আর এক সূর্য। সবকিছু স্পষ্ট হতেই দেখা গেল একটা চামরি গরু চড়ানোর বাথানে দাঁড়িয়ে আছেন দুজনে। দূরের আবছায়ায় দেখা যায় মিলিটারির মতো দেখতে কিছু লোক নদী পার হচ্ছে। ধরা পড়লে আর রক্ষে নেই। খুব দ্রুতই দুজনে একটা পাথরের চাঁইয়ের আড়ালে লুকিয়ে পড়লেন।
[চলবে]

পূর্ববর্তী পর্ব-১৭

http://www.teerandaz.com/%E0%A6%B6%E0%A6%BE%E0%A6%AA%E0%A6%B2%E0%A6%BE-%E0%A6%B8%E0%A6%AA%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BF%E0%A6%A4%E0%A6%BE-%E0%A6%B8%E0%A6%AE%E0%A7%8D%E0%A6%AA%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%95%E0%A6%9F-12/?fbclid=IwAR1-uf11N4Vl4VtblM9UuexwiEwS1A0FjVHEnmK1KGtuxKzm5BFmGL7ZxqM