শাপলা সপর্যিতা > সম্পর্কটি শুধুই জৈবিক >> ধারাবাহিক উপন্যাস [পর্ব ১৯]

0
403

চারু মজুমদার বিপ্লবের দলিল তৈরি করেছেন। দুজন বিপ্লবী সেই দলিল নিয়ে তিব্বত হয়ে মাও সে তুঙের কাছে পৌঁছে দিলেন। এদিকে ভারতে নকশালবাড়ি আন্দোলন তখন তুঙ্গে। এরই মাঝে একদিন মাধবী আর তার মায়ের সামনে এসে দাঁড়ালেন দুজন অস্ত্রধারী নকশালিস্ট। মানব-মানবীর চিরন্তন রীতিসিদ্ধ ও রীতিবিরোধী প্রেম আর প্রত্যাশার প্রকাশ, গ্রহণ, বর্জন, জিঘাংসা ইত্যাদিকে ঘিরে নকশাল আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে আবর্তিত হচ্ছে এই উপন্যাসের কাহিনি। আজ প্রকাশিত হলো উপন্যাসটির ১৯ সংখ্যক পর্ব। পূর্ববর্তী সপ্তদশ পর্বটি সংযুক্ত করে দেওয়া হয়েছে এই পর্বটির নিচে।

 

পর্ব ১৯

পাথরের চাঁইয়ের আড়াল নিয়ে কিছু কিছু করে পথ এগিয়ে দেখা গেলো যাদেরকে ভয় পেয়েছিলেন তারা আসলে মিলিটারি নয়। দিনের আলো স্পষ্ট হয়ে এলে বিষয়টা পরিস্কার হয়। আনন্দে হেসে ওঠেন কৃষ্ণভক্ত শর্মা।
– কমরেড দেখুন, দেখুন তাকিয়ে ভালো করে। হা হা হা। আমাদের ভয় পাবার কিছু নেই। হা হা হা।
নদীর মাঝে কিছু খুঁটি গেড়েছে মানুষ। খুঁটির খাকি রং আর পানির মাঝে গেঁথে রাখার কারণে দূর থেকে মনে হচ্ছিল কিছু মিলিটারি নওজোওয়ান বুঝি নুয়ে নুয়ে নদী পার হচ্ছে। যাক কমরেডকে হাসতে দেখে এতক্ষণে চক্রবর্তীর ভয় আর উৎকণ্ঠা বেশ অনেকটা কমে আসে। সেও প্রাণ খুলে হেসে ওঠে।
– সত্যিই তো তাই। মিলিটারী নয় ওগুলো। হা হা হা।
একটানা হেঁটে চলার শ্রান্তি, ক্ষুধা, অনিশ্চিত যাত্রাস্থল আর দুর্লক্ষ্য গন্তব্য, শত্রুর হাতে পুনর্বার ধরা পড়ে পর্যুদস্ত হবার ভীষণ উদ্বেগ কেটে যায় একমুহূর্তে। খানিক নির্মল বাতাসে ক্ষণিক নিশ্চিন্তি। চলার পথে আনে গতি। সঞ্চার করে নতুন প্রাণ। সবেগে হাঁটতে শুরু করেন আবার দুজন বিপ্লবী। শত্রুর হাতে পড়ার ভয় থেকে মুক্ত হবার সাথে সাথে আবার পেটের ক্ষুধা জানান দিতে শুরু করে। সাথে ছিল যা কিছু ছাতু সব শেষ। তবু চলার বিরাম নেই। প্রায় দুপুর হয়ে এসেছে। সূর্য মধ্যগগনে। তীব্র ঠান্ডা বাতাস। কৃষ্ণভক্ত শর্মার মনে হল একটু গরম জল খেতে পারলে খানিকটা আরাম বোধ হতো। নদী ধরে যেতে যেতে দেখা গেল দূরে হালের জমিতে কিছু কৃষক হাল বাইছে। তাদের কাছে যেতেই অদ্ভুত এক আলোর পরশে ছেয়ে গেল যেন দুজন বিপ্লবীর চোখ মুখ।
– কমরেড দেখেছেন!
চক্রবর্তী আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে ওঠে।
– হ্যাঁ, হ্যাঁ, দেখতে পাচ্ছি কমরেড। ওদের মাথায় মাও সে তুঙের ব্যাজ লাগানো রয়েছে।
– ওহো হো, মিরিক পার হয়ে গেছি তাহলে কমরেড। আমরা বর্ডার ক্রস করে গেছি। বর্ডার ক্রস করে গেছি…।
আনন্দে শর্মা জড়িয়ে ধরেন চক্রবর্তীকে।
– তাহলে কি আমরা চীনে পৌঁছে গেছি কমরেড? নাকি তিব্বত এটি?
– দেখি। ওদের কাউকে ডাকি। বোঝা যাবে কিছুটা সময় পরেই।
এখন আর প্রতি মুহূর্তে শত্রুর সন্দেহের কবলে পড়ার ভয় নেই। মিরিক দিয়ে বর্ডার পার হয়ে গেছেন জানার সঙ্গে সঙ্গে অদ্ভুত এক প্রশান্তি ছুঁয়ে গেছে দু’জনেরই মন। গত কয়েকটি মাসের নিদারুণ শঙ্কা, উপুর্যুপরি শারীরিক অত্যাচার আর শ্রমক্লান্ত শরীর মুহূর্তে যেন ফিরে পেয়েছে এক নতুন যৌবন। এক পা আগাতে আর যা কিছু করতে হাজার বার করে ভাবার প্রয়োজন মনে করছেন না কমরেড দুজন। হাতের ইশারায় শর্মা হালের কাজ করছে যারা তাদের কাউকে ডাকেন। একটি ছেলে কাছে আসে। সেই ছেলেটিকে ইশারায় নানা কথা বোঝানোর চেষ্টায় ব্যর্থ হন দুজন বিপ্লবী। ছেলেটি তাদেরকে দূরের গ্রামে নিয়ে যায়। সেখানে আর একটি ছেলের সাথে পরিচয় হয় যে লুনথুই গ্রামের গ্রামরক্ষী বাহিনীর হয়ে কাজ করছে। ছেলেটি দোভাষী। নিজেদের আবাসস্থলে নিয়ে আসে তাদেরকে। খুব যত্ন করে ওরা। তীব্র শীতের এই রাতটা বেশ গরমে এবং আরামে কেটে গেল। চামড়ি গরুর গরম দুধে রাতের খাবার শীতের প্রকোপে আড়ষ্ট শরীরে যেন নিয়ে এল নতুন প্রাণ। ভোর হলো এক নতুন সূর্যের সোনালি আলোতে। প্রতি মুহূর্তের উৎকণ্ঠার যেন অবসান হতে চলেছে। আর কেউ বুঝি তাদেরকে সন্দেহ করবেনা। শর্মা এরই মাঝে একবার খোঁজ করে রাখেন, হুম। দলিল ঠিকঠাকই আছে তার সাথে। সকালের সোনারোদে গ্রামের নিভৃত এক কুটিরের উঠোনে গা মেলে দিয়েছেন কৃষ্ণভক্ত শর্মা আর চক্রবর্তী। তখনই কিছু চামড়ি গরুর বেপারি ঢুকে পড়ে গ্রামে। কিছুক্ষণের মধ্যেই চাউর হয়ে পড়ে তাদের এখানে আশ্রয় নেবার খবর। রাতে বহু লোকজন এসে জড়ো হয় বাড়িটিতে। বের করে আনা হয় তাদেরকে সবার সামনে। কেউ একজন প্রশ্ন করে :
– তোমার কারা?
কৃষ্ণভক্ত শর্মা উত্তর করেন :
– আমরা সাধারণ মানুষ।
– না, তোমরা ইন্দিরা গান্ধীর দালাল। ভারত সরকার তোমাদের খোঁজ খবর নিতে পাঠিয়েছে
ওদের কোনো ভাবেই বিশ্বাস করানো যায়নি যে ওরা ভারতের গুপ্তচর হয়ে এখানে ঢোকেনি। তবে এবার স্পষ্ট হলো এটা তিব্বত। চীনা সামরিক বাহিনী দখল করে রেখেছে তিব্বত। আর চীনের সাধারণ মানুষও এখানে ভীষণ সতর্ক রয়েছে। সেনাবাহিনীর সতর্ক নজর রয়েছে যে কোনো বহিরাগতের ওপর। গ্রামপ্রতিরক্ষা বাহিনী এরই অংশ হয়ে কাজ করছে হয়তো। তাই বন্দি করে রাখা হলো আবার বিপ্লবী দুজনকে ঘরটির ভেতর। সারাদিন ওরা নিজেদের কাজ করে। রাত হলেই বড় বড় রাম দা বটি ছুরি এসব নিয়ে গ্রামের লোকেরা এসে জেরা করতে শুরু করে। এভাবে দুটি রাত পার হয়ে গেল। তখনও কৃষ্ণশর্মা আর চক্রবর্তী বুঝে উঠতে পারছিলেন না তাদের আসল উদ্দেশ্য এদের কাছে স্বীকার করা ঠিক হবে কি না। তার উপর আরো মুশকিল হলো ওরা কথা বোঝেনা। দু‘পক্ষের কথা দোভাষী অনুবাদ করে দেয়। তৃতীয় রাতে আবার বড় বড় কতগুলো ছুরি হাতে ওদের ঘরে কয়েকজন ঢোকে।
– বল, কারা তোমরা? ঠিক করে বল ইন্দিরা গান্ধী তোমাদের খোঁজ খবর করতে পাঠিয়েছে কি না?
– না। আমরা ভারতের দালাল নই। বিশ্বাস করো তোমরা। বরং আমরা ওখানে পর্যুদস্ত। আমরা তোমাদের নেতার কাছে এসেছি।
– আমাদের নেতা? তার কাছে তোমাদের কি কাজ?
– আছে। আমাদের নেতা কমরেড চারু মজুমদার তার কাছেই আমাদেরকে পাঠিয়েছেন। আমাদের এই সংকটকালে তোমাদের নেতার বুদ্ধি-পরামর্শ আমাদের খুব দরকার। তোমরা বিশ্বাস করো আমাদের। আমরা ভারতে নির্যাতিত। আমরা পথ খুঁজে বেড়াচ্ছি। এই মুহূর্তে তাকে আমাদের খুব প্রয়োজন।
– আমাদের নেতাকে তুমি চেনো?
– হ্যাঁ চিনি।
একজন ছেলেকে ভেতরে পাঠালো। সে মাও সে তুঙের একটা বিরাট বাঁধাইকরা ছবি নিয়ে এলে আনন্দে শর্মা চিৎকার করে ওঠেন।
– মাও সে তুঙ।
ঠিক তারপরই আরও একটি বড় ছবি নিয়ে আসে। তাকেও চিনতে পারেন তারা।
– হ্যাঁ। ইনি হলেন লিনপিয়াও।
তারপর আনে চুতের ছবি। সবাইকে চিনতে পারেন যখন দুই বিপ্লবী তখন ওরা আশ্বস্ত হয় যে ওরা চীনের শত্রু নয়। নিজেদের মধ্যে এমনভাবে বলাবলি করে যে ওদেরকে বিশ্বাস করা যায়। সেই সুযোগে কৃষ্ণভক্ত শর্মা তাদেরকে অনুরোধ করেন :
– আমার কথা তোমরা ঠিকঠাক বুঝবে না। আমাকে চীনারা যেখানে আছেন সেখানে পৌঁছে দাও। লালফৌজে পৌঁছানো আমাদের খুব দরকার। এরই মধ্যে পথে পথে আমাদের দু-তিন মাস কেটে গেছে। ওদিকে ভারতে নকশাল আন্দোলন শুরু হয়ে গেছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাদের চীনে মাও সে তুঙের কাছে পৌঁছানো খুব দরকার।
এর পরের পথ সহজ। ওরাই নানান উদ্যোগ নেয় বিপ্লবীদের চীনে মাও সে তুঙের কাছে পৌঁছে দেবার। কয়েক পরস্থ যাত্রাবিরতির মাধ্যমে স্নান করে ফৌজি জামাকাপড় পরে পৌঁছে যান দুজন অমিত মনোবলের শক্তিধারী বিপ্লবী লালফৌজে। বিদেশ থেকে আসা আন্ডারগ্রাউন্ড বিপ্লবীদের যিনি প্রশিক্ষণ দেন তার নাম লিউ ইনলি। লিউ ইনলির হাতে চারু মজুমদারের আটটি দলিল কমরেড কৃষ্ণভক্ত শর্মা দেন। তার সেই ছেঁড়াখোড়া হাতব্যাগটির তলা ছিঁড়ে যখন তিনি দলিলগুলো ইনলির হাতে দেন তখন তাকে স্যালুট করে ইনলি বলেছিলেন :
– আপনি একজন সত্যিকারের বিপ্লবী। যত সুন্দর আর সুরক্ষিতভাবে এত বিপদ বাধা অতিক্রম করে আপনি দলিলগুলো এখানে এনে পৌঁছালেন, তাতে আপনার কাছে আমাদেরও অনেক কিছু শেখার আছে। আপনি একদম চিন্তা করবেন না। আপনাদেরকে প্রয়োজনীয় সব প্রশিক্ষণ আমরা দেব। এবং প্রশিক্ষণ শেষে যথাযোগ্য সম্মানের সঙ্গে সুরক্ষা দিয়ে নিজের দেশে পৌঁছে দেব।
কৃষ্ণভক্ত শর্মা লিউকে অনুরোধ করেন :
– আপনাদের রেডিও থেকে যদি আমাদের দেশের এই সব খবর প্রচার করা হয় বিশেষ করে হিন্দিতে তাহলে আমাদের দেশের বেশিরভাগ লোক সেটা বুঝতে পারবে।
কৃষ্ণভক্ত শর্মার অনুরোধে পিকিং রেডিওতে হিন্দি প্রচার বিভাগ খোলা হয়। পরে বাংলা বিভাগও খোলা হয়। এর পরই পিকিং রেডিও থেকে নকশালবাড়ির সংগ্রামের সমর্থনে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির বক্তব্য এবং কমরেড চারু মজুমদারের আটটি দলিল ইংরেজি হিন্দি ও বাংলা এই তিন ভাষাতেই প্রচার হতে থাকে নিয়মিত। ছড়িয়ে পড়ে নকশাল আন্দোলনের খবর সমগ্র ভারতের সাধারণ মানুষের কাছে। সমগ্র পৃথিবী মুহূর্তেই জেনে যায় ভারতের কৃষক বিপ্লবের আগুন জ্বলে উঠেছে দাউ দাউ করে। সমগ্র পৃথিবী জেনে যায়, কয়েক মাস ধরে তরাই দার্জিলিঙের কৃষক শ্রেণি ভারতের বিপ্লবী কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে ছিন্ন করেছে নয়া সংশোধনবাদের নাগপাশ। এতকাল ধরে যে জীবাণুরা বিপ্লবের গতিরোধ করে রেখেছিল তা চূর্ণ করে বের হয়ে এসেছে। তারা বাগানের মালিকদের জমি, ফসল, অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়েছে। স্থানীয় অত্যাচারী জমিদারদের শায়েস্তা করেছে। প্রতিরোধ করতে পেরেছে প্রতিক্রিয়াশীল সামরিক বাহিনীর আক্রমণ। প্রতিঘাতও করতে পেরেছে। কৃষকদের বৈপ্লবিক শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করার আর কোনো সুযোগ নেই এই মুহূর্তে। প্রমাণিত হয়ে গেছে যে সাম্রাজ্যবাদী, সংশোধনবাদী, দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারি আমলা, স্থানীয় দুষ্কৃতিকারী ভদ্রসম্প্রদায় এবং সামরিক বাহিনী বিপ্লবী কৃষক শ্রেণির কাছে তুচ্ছতর ক্ষমতাধারী। সাধারণ জনগণের সৌভাগ্য এবং অধিকার সংহারী এক ক্ষুদ্রতর অপশক্তি কেবল। কৃষক শ্রেণি এই জীবাণুকে সমূলে উৎপাটন করতে বদ্ধপরিকর। পিকিং রেডিও আর চীনা কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র পিপলস্ ডেইলির সম্পাদকীয়তে এ খবর প্রকাশিত হবার সাথে সাথে চীনের সাধারণ জনগণ সাধুবাদ জানান ভারতের বিপ্লবীদের। কৃষকদের এই বিপ্লবকে স্বাগত জানান মার্কসবাদী লেলিনবাদীসহ বিপ্লবী জনগণ। তারা বুঝতে পারেন, কয়েক দশক ধরে কংগ্রেসের অত্যাচার আর শোষণের মাত্রাকে তীব্র থেকে তীব্রতর করে তোলা শক্তিকে প্রতিহত করার জন্য ভীষণ প্রয়োজন ছিল এই বিপ্লবের। কংগ্রেসের শাসনামলে সামন্ততান্ত্রিক ছোট ছোট রাজা, জমিদার গোষ্ঠী, আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদ শ্রেণির সাথে যুক্ত হয়েছে নয়া সংশোধনবাদ নামে সেবাদাস চক্র আর প্রভু হিসেবে আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ। সবাই মিলে ভেতরে ভেতের যে শোষণ আর নিপীড়ন চাপিয়ে দিচ্ছে সাধারণ জনগণের ওপর তার সবচেয়ে প্রথম এবং বড় চাপটি এসে পড়ছে কৃষক শ্রেণির উপর। গত কয়েক বছর ধরেই দেশে দুর্ভিক্ষ জেঁকে বসেছে। ক্ষেতে-খামারে ক্ষুধা আর অনাহারে দিনের পর দিন মানুষ মারা যাচ্ছে।
এদিকে লালফৌজে কৃষ্ণভক্ত শর্মা আর চক্রবর্তী পৌঁছে যাবার সাথে সাথে ভারতে চারু মজুমদারের কাছে দলিল হস্তান্তরের খবরও পৌঁছৈ যায়। পিকিং রেডিওতে প্রচারিত খবর শুনে আশ্বস্ত হন কমরেড চারু মজুমদার। নতুন উদ্যমে বিপ্লবের অগ্নিশিখা নানা স্থানে ছড়িয়ে পড়ছে। কংগ্রেসের শাসন তথা সুবিধাবাদী রাজনীতির চক্রবুহ্যকে ভেদ করতে সক্ষম হচ্ছে।
সুদূর প্রবাসে যখন পরাক্রমশালী দুই বিপ্লবী কৃষ্ণভক্ত শর্মা আর চক্রবর্তী বিপ্লবের মধ্যবর্তী স্তরে পৌঁছে বিজয়ের এক দারুণ সাফল্যে উদ্ভাসিত, গৌরবান্বিত, তখন মাধবীর সাথে তার বাবা বীরেশ মুখার্জীর তুমুল বাকবিতণ্ডা চলছে। একদিকে সদ্য বিবাহিত স্বামী চক্রবর্তীর তাকে না বলে উধাও হয়ে পড়া, অন্যদিকে কংগ্রেস সমর্থক বাবা বীরেশের নকশালদের প্রতি নিরবচ্ছিন্ন উষ্মা মাধবীকে ক্রমান্বয়ে করে তোলে ক্ষুব্ধ। মানসিকভাবে সে ক্রমা্ন্বয়ে হতে থাকে বিধ্বস্ত। বিপর্যস্ত। বীরেশের সেই শান্ত ভীতু মেয়েটি হঠাৎ হয়ে ওঠে ভীষণ মুখরা। বাবা তাকে বিশ্বাস করাতে চাইছেন, চক্রবর্তী নকশাল আন্দোলনে যোগ দিয়েছে। নকশালরা স্বাধীন ভারতের ভেতরে বসবাসকারী বিদেশি সমাজতান্ত্রিক ভাবধারায় বিশ্বাসী। তারা সমাজতন্ত্রের নামে জ্বালাও পোড়াও আর খুব হত্যা জখমের মাধ্যমে দেশে অশান্ত পরিস্থিতি তৈরি করে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করতেই সদা লিপ্সু। কি করবে মাধবী? সদ্য বিবাহিত স্বামী তাকে কিছুই জানায়নি। মাধবী জানেনা তার স্বামী কংগ্রেসী নাকি নকশালিস্ট। কখনো কোনো রাজনীতির সাথে তার যুক্ততা আছে এটাই যার জানা নেই সে কি করে বিশ্বাস করবে স্বামী তার নকশাল আন্দোলনে যোগ দিয়ে কোনো অপারেশনে গেছে কি না। নাকি নতুন বউয়ের দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানাতে চোরের মতো পালিয়ে বাংলাদেশে চলে গেছে। এই দোদুল্যমান মন শরীরের উপরও তার চরম প্রতিক্রিয়া দেখাতে শুরু করেছে। মেয়ের এই বিপর্যস্ত মানসিক অবস্থায় মায়ের সাথে ডাক্তারের চেম্বার থেকে ফিরবার পথে এক সন্ধ্যায় দুজন অচেনা মানুষ পথ আগলে দাঁড়ায় মাধবীর আর তার মায়ের।
– জেঠিমা, একটু এদিকে আসুন।
কিছুই বুঝতে পারেননা মাধবীর মা। আপাত শান্ত বুদ্ধিমতী নিলীমা মুখার্জী তেইশ চব্বিশ বছরের দুটো ছেলের হাতে অস্ত্র দেখেও ভীত না হয়ে প্রশ্ন করেন :
– তোমরা কারা? আমাদের পথ রোধ করছ কেন?
– জেঠিমা, আমরা নকশালিস্ট।
ভেতরের আতঙ্ক চোখে মুখে ফুটে উঠলেও শান্ত থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করেন পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সী নিলীমা মুখার্জী। ঘটনার আকস্মিকতায় মাধবী স্তব্ধ নির্বাক। মরিয়া হয়ে প্রশ্ন করে :
– কি চাও তোমরা?
ছেলে দুটো দুদিক থেকে দুটো জিরো জিরো সেভেন পিস্তল ঠেসে ধরে দুজনের ঘাড়ে। গাড়িতে উঠতে ইশারা করে মাধবী আর তার মাকে। বাক্য ব্যয় বৃথা, এ তো বলাই বাহুল্য। দুজনে উঠে বসেন গাড়িতে। সাথে ছেলে দুটোও চড়ে বসে। বাড়ির সামনেই মাধবীর মাকে নামিয়ে দেয়। মাধবী নামতে গিয়ে বাধাগ্রস্ত হয়। ক্ষিপ্র দৃষ্টিতে ছেলেটির দিকে তাকাতেই উত্তর দেয় একটি ছেলে :
– কমরেড চারু মজুমদার আমাদেরকে পাঠিয়েছেন, বৌদি।
বিস্মিত বিষাক্ত তীক্ষ্ণ এক দৃষ্টিতে একবার তাকায় মাধবী ছেলেটির দিকে :
– কি, কমরেড চারু মজুমদার!
– হ্যাঁ, তিনি আপনাকে নিয়ে যেতে পাঠিয়েছেন।

[ক্রমশ]

পূর্ববর্তী ১৮তম পর্বের লিংক

http://www.teerandaz.com/%E0%A6%B6%E0%A6%BE%E0%A6%AA%E0%A6%B2%E0%A6%BE-%E0%A6%B8%E0%A6%AA%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BF%E0%A6%A4%E0%A6%BE-%E0%A6%B8%E0%A6%AE%E0%A7%8D%E0%A6%AA%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%95%E0%A6%9F-13/