শাপলা সপর্যিতা > সম্পর্কটি শুধুই জৈবিক >> ধারাবাহিক উপন্যাস [পর্ব ২০]

0
220

পর্ব ২০

চারু মজুমদার যেদিন সুপ্রিয় চক্রবর্তীর কাছে জানতে পেরেছিলেন মাধবী আর চক্রবর্তী পালিয়ে বিয়ে করেছে খুব বেশি দিন হয়নি, তখন তিনি ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন। ততদিনে চক্রবর্তী রওনা হয়ে গেছে চীনের উদ্দেশ্যে কৃষ্ণভক্ত শর্মার সাথে। তিনি জানতেন এ যাত্রা মারাত্মক। এ যাত্রায় জীবনহরণ ততোধিক। তবু তিনি মাধবী আর চক্রবর্তীকে নিয়ে একটা ছক কেটেছিলেন। মাধবীর বাবা বিরেশ মূখার্জি মেয়েকে দার্জিলিংয়ে সুপ্রিয়র বাড়ি থেকে কিডন্যাপ করার ঘটনায় তিনি ইচ্ছে করেই বাধা দেননি। খবর তার কাছে আগেই ছিল। মনে মনে ভেবেছিলেন দেখা যাক। বাইচান্স যদি চক্রবর্তী না ফেরে তাহলে মেয়েটির কি গতি হবে! এসব ভেবেই তিনি কমরেডদের বিরেশকে বাধা দিতে নিষেধ করেন। কিন্তু যে মুহূর্তে তিনি খবর পেলেন যে চক্রবর্তী আর কৃষ্ণভক্ত শর্মা তিব্বত, লাসা পার হয়ে চীনে পৌঁছে গেছেন, তখনই প্রথম তার মাথায় এল মাধবীর কথা। তিনি মাধবীকে আনিয়ে নেবার কথা ভাবলেন। চক্রবর্তী আর কৃষ্ণভক্ত শর্মা ততদিনে লালফৌজের রক্ষণাবেক্ষণে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন চীনে মা্ও সেতুঙ বিচারধারার উপর। শিখছেন বিপ্লবী রাজনীতি এবং গেরিলা যুদ্ধের নানা কৌশল। নিয়মিত রাজনীতির ক্লাসে অংশ নিচ্ছেন। চীন তখন সারা পৃথিবীর বিপ্লবীদের পীঠস্থান। চীনে তখন বাইরের যে কোনো দেশের বিপ্লবীরা গেলে তাদের রাজনীতির ক্লাস করানো হতো। প্রশিক্ষণ দেয়া হতো গেরিলা রণকৌশল। চারু মজুমদার ঠিক করেন আন্দোলনের মাঝে মাঝে দুটো দলে ভাগ করে মোট বারো জন বিপ্লবীকে চীনে পাঠাবেন প্রশিক্ষণের জন্য। এ বিষয়ে কথাও হয়ে গেছে চীনের সাথে। কানু সান্যালের নেতৃত্বে প্রথম দলটিতে রাখা হয় দীপক বিশ্বাস, খোদন মল্লিক ও খোকন মজুমদারকে। দ্বিতীয় দলে সৌরেন বোসের নেতৃত্বে থাকেন সুকুমার রায়, দুলাল চন্দ, অনিল মুখার্জি, পবিত্র সেনগুপ্ত, কদমলাল মল্লিক, মণিলাল সিং ও শান্তি পাল। একদিকে দলিল প্রকাশ শুরু হয় পিকিং রেডিও থেকে। অন্যদিকে বেজে ওঠে বিপ্লবের তীব্র বজ্রনির্ঘোষ। বিপ্লবের পর্যাপ্ত অনুসন্ধান, আয়োজন আর রসদ জোগাড়ে থাকা সত্বেও যে একটি সুতীব্র জ্বলনক্ষম স্ফুলিঙ্গের প্রয়োজন ছিল সেটাই যেন তার মহাকালানল নিয়ে জ্বলে উঠলো। সারা ভারতের ঊষর মুরুভূমির শুষ্ক মাটিতে, রুক্ষ্ণ শুষ্ক গাছের পাতায়, চৈত্রের ক্ষরতপ্ত বাতাসে আগুনের স্ফুলিঙ্গ ধেয়ে আসতে থাকলো বুর্জোয়া শোষক প্রবঞ্চক হটকারী ঠকবাজদের গ্রাস করতে।
তরাই দার্জলিং দাহ্যপ্রবণতম অঞ্চল। এখানেই সবচেয়ে বেশি শোষিত বঞ্চিত রক্তাক্তের আবাস। তাই এখান থেকেই প্রজ্জ্বলন ছড়িয়ে পড়ে প্রচণ্ড দাবদাহে। চটের হাট এলাকা ছিল নকশালদের জন্য সবচেয়ে দুর্বল জায়গা। আর তাই জোতদাররা তাদের যাবতীয় কর্মকাণ্ডের ঘাঁটি গড়ে তুলেছিল এখানেই। জোতদারদের গড়ে তোলা পার্টির নাম ছিল সোস্যালিস্ট পার্টি। চটের হাট ছিল সোস্যালিস্ট পার্টির প্রায় নিরাপদ এলাকা। তাই ফাঁসিদেওয়া, খড়িবাড়ি, নকশাল বাড়ির জোতদার আর জামিদাররা নিজেদের সম্পদ আর প্রাণ রক্ষার্থে চটেরহাটকেই অভয়াশ্রম মনে করতেন। সোস্যালিস্ট পার্টির স্থানীয় নেতা সম্পত রায় ছিল তেলেঙ্গাজোতের এক অত্যাচারী জোতদার। অন্যদিকে দুই বিপ্লবী মণিলাল সিং ও শোভান আলির বসতভিটে ছিল এখানেই। তাই নকশালদের বিপক্ষে সোস্যালিস্ট পার্টি বরবার চটেরহাটেই তাদের বিপ্লবী বিধ্বংসী কার্যক্রম ঘটানোর জন্য সচেষ্ট ছিল। আর তারই একটা মারাত্মক আগ্রাসনে সেদিন পড়ে গেলেন বিপ্লবী সোবহান আলি। চটেরহাটে সোবহান আলি আর মণিলাল সিং ছিল সোস্যালিস্ট পার্টির বরাবরের লক্ষ্য। এদের দুজনকে খতম করতে পারলেই এখানে কিছুটা নিশ্চিন্ত থাকতে পারে ওরা। একবার মণিলাল সিংয়ের বাড়িতে আগুন লাগানো হলো। হত্যা করার জন্য গ্রামে তার বাড়িতে তাকে অতর্কিতে আক্রমণ করে বসে। কিন্তু সফল হতে পারেনি। আর অন্যদিকে সোবহান আলি ছিলেন আমিত সাহসী অসীম শক্তিধর একজন বিপ্লবী। এবার জোতদারদের আবার সংগঠিত করা হলো সোবহান আলিকে লক্ষ্য রেখে। আলি নিধন এবার তারা নিশ্চিত করতে চায়। আলি-হত্যা পরিকল্পনা তখন তাই ভীষণ সুসংগঠিত, গোছানো। ভীষণ পরিকল্পিত। আশি নব্বইজন জোতদার দালাল আর পঞ্চাশ ষাটটি বন্দুক সংগ্রহ করা হলো। তারপর মিছিল করে চটেরহাট এবং আশেপাশের গ্রামে গ্রামে ঢুকে কৃষকদের তাদের সাথে যোগ দিতে জোর জবরদস্তি করতে থাকে।
– চলো। আমরা মিছিলে যাচ্ছি। তোমাদের যেতে হবে আমাদের সাথে।
– না। আমরা কেন যাব ওই মিছিলে?
– কেন যাবে?
– হ্যাঁ, ক্যানে যাবেক হাম?
– বাঁচার জন্য। এই বন্ধুক দেখছিস তো? একটা গুলি শুধু। তোর জীবনের খায়েশ একজনমের তরে উড়িয়ে দিতে পারি জানিস?
আদিবাসী এক কৃষকের মাথায় বন্দুকের নল ঠেকিয়ে সম্পত রায় উত্তর দিয়েছিল। আরও বলেছিল :
– ছাপটিগুড়ি হাটে মিটিং আছে, চল্, যেতে হবে তোদের সকলকেই।
– না। হাম যাবেক লাই। এক্কেবারে যাবেক লাই।
– হয় আমাদের সাথে চল, নইলে…
বলেই একজন কৃষককে চোখের সামনে গুলি করে দিল। একজন কৃষক এগিয়ে এসেছিল ওকে ধরতে। কাউকে ধরতে দেওয়া হলো না। চোখের সামনে সেই কৃষক তড়পাতে তড়পাতে যখন মারা গেল, অন্যরা ভয় পেয়ে গেল। মিছিলে যেতে বাধ্য হলো তারা। ভয় দেখিয়ে নানা গ্রাম থেকে দুশো আড়াইশ কৃষক সংগ্রহ করা গেল। পারা গেল না কেবল ফাঁসিদেওয়া থেকে কৃষক সংগ্রহ করা। এই অঞ্চল থেকে কেবল পাওয়া গেল একজন পেশাদার ডাকাতকে। এরা সবাই চলল ছাপটিগুড়ি হাটের দিকে। পরিকল্পনাটি হলো সোবহান আলির বাড়িতে গিয়ে তাকে আটকে হত্যা করা। কিন্তু পথে হঠাৎ করে সকলকে থামতে নির্দেশ দিল সম্পত রায়।
– হেই। ঠেরো। তুম লোক তেলেঙ্গাজোত গ্রামছে নজর রাখলো।
বলে একদলকে দাঁড় করিয়ে রাখলো মণিলাল সিংয়ের বাড়ি তেলেঙ্গাজোতের দিকে। যাতে ওদিক থেকে আর কেউ্ এদিকে এসে সোবহান আলিকে বাঁচাতে না পারে। একদল গেল সোবহান আলির বাড়ির দিকে। এ খবর ঠিকই ছড়িয়ে পড়ে তেলেঙ্গাতে। ওদিকে কয়েকশ কৃষক তীর ধনুক নিয়ে আক্রমণ প্রতিহত করবার প্রস্তুতি নেয়। সোবহান আলিকে খবর দেয়া হয় তেলেঙ্গাতে চলে যেতে। কিন্তু সোবহান আলি দেখলেন এখন এখান থেকে যেতে হলেও যুদ্ধ করেই যেতে হবে। মরতেও হতে পারে। তাই তিনি ঠিক করলেন তার বাড়িতে থেকেই তিনি যুদ্ধ করবেন। তাকে বারবার অনুরোধ করায় তিনি বললেন :
– ওদের আসতে দাও। আমি লড়াই করবো। যদি মরতেই হয় তবে দু-একটা মাথা সাথে নিয়ে তবেই আমি পৃথিবী ত্যাগ করবো। চিন্তা করোনা আমার জন্য।
তবু দুশ্চিন্তা কি আর পিছু ছাড়ে! কারণ এখানে সোবহান আলি একা আর জোতদারদের ভাড়াটেরা শতাধিক। তবু অসাধারণ বিপ্লবী জেদ আর ক্ষিপ্রতা তাকে একাই যুদ্ধের জন্য তৈরি রাখলো ওই মুহূর্তে। ইসহাক আর সোইলা নামের দুজন কৃষক তখন সোবহান আলির বাড়িতে তার সাথে ছিলেন। সম্পত রায়ের লোকেরা সেটা বুঝতে পারেনি। তিনজনে সম্মুখ যুদ্ধের জন্য যখন তৈরি তখনই প্রতিপক্ষ ঢুকে পরে ঘরে। লাঠি ঘুরিয়ে যতক্ষণ সম্ভব গুলি ও তীরের মোকাবিলা করেন। কিন্তু এও কি সম্ভব! শত শত আক্রমণকারীর সাথে তিনজন মাত্র লোক যুদ্ধ পরিচালনা করবেন এবং জিতে যাবেন! তাই এই যুদ্ধে বন্দুকের গুলিতে নিহত হলেন সোইলা আর ইসহাক। সোবহান আলি আশ্রয় নিলেন দরজার আড়ালে। নিজের সংগ্রহে থাকা বিশাল তোলোয়ারটির খাপ উন্মুক্ত করলেন। যদি একজন জোতদারও ঘরে ঢোকে, তবে একটা একটা করে তিনি সংহার করবেন। এটাই সংকল্প। প্রাণভয়ে ভীত নন তিনি। জোতদাররা বুঝতে পারেনি সোবহান আলির পরিকল্পনা। হঠাৎ একজন বন্দুক হাতে ঢুকে পড়ে আলির বাড়ির ভেতর। সাথে সাথে তিনি তাকে ধরাশায়ী করে বন্দুক কেড়ে নেন। তারপর এককোপে তার মাথা ফেলে দেন। তারপর আর একজন তারপর আর একজন। এভাবে তিনজনকে শেষ করে দুই হাতে দুটো বন্দুক উঁচিয়ে বের হয়ে আসেন বাইরে। দৌড়াতে লাগেন তেলেঙ্গাজোত গ্রামের দিকে। সেখানে শত শত কৃষক আর বিপ্লবী কমরেডরা তার অপেক্ষায় রয়েছেন। এখানে আর কেউ নেই। তিনি একা। প্রাণ রক্ষা করতে হলে যে কোনো মূল্যে তাকে এই মুহূর্তে পৌঁছাতে হবে তেলেঙ্গাজোত গ্রামে। পথিমধ্যে ধরা পড়া যাবে না কোনো অবস্থাতেই। ধরা পড়লেই শেষ। হঠাৎ শোনা গেল :
– ওই যে দেখো দেখো। বাড়ির পেছন দরজা দিয়ে পালাচ্ছে সোবহান আলি। চলো। ধরো, ধরো ওকে। জোরছে কদম চালাও জওয়ান হো…
চিৎকার করতে করতে কয়েকজন তার পিছু ধাওয়া করে। ওদের চিৎকার শুনে আরও কয়েক জন তার পিছু নেয়। কিন্তু বন্দুক হাতে উল্টো রুখে দাঁড়ান সোবহান।
– সরে যা। সরে যা বলছি। না হলে গুলি করে দেব।
জোতদাররা খানিকটা ভয় পেয়ে পিছু হটতে থাকে। এটা দেখে খানিকটা আশ্বস্ত হন কমরেড আলি। আবার যেই তিনি ছুটতে শুরু করেন, পেছনে পেছনে শত্রুপক্ষও ছুটতে থাকে। সোবহান আলি এবার প্রচণ্ড বেগে পেছন ফেরেন। জোতদারদের দিকে তাকিয়ে ক্ষিপ্ত ক্ষুধার্ত বাঘের মতো চারপাশ প্রকম্পিত করে ভীষণ গর্জে ওঠেন। তার এই অপ্রস্তুত আর অদ্ভুত আচরণে হঠাৎ হতচকিত হয়ে পড়ে আক্রমণকারীরা। খানিকটা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে পিছু হটতে থাকে। নিরাশা তাদের ঘিরে ধরে। এবারও বোধকরি আর সোবহান আলিকে হত্যার চেষ্টা ব্যর্থ হতে চলেছে। ওদিকে সোবহান আলি জোর কদমে দৌড়াচ্ছেন তো দৌড়াচ্ছেন। তেলেঙ্গা গ্রামটা আর আধা মাইল দূরে। জোতদাররা এমন অনভিপ্রেত গর্জন শুনে আর সোবহান আলির অসম সাহসিকতা দেখে তখন খানিকটা মানসিক দোটানায় পড়ে গেছে। ওর পেছনে আবার এগুবে কি এগুবে না। তারা এবারের মতো সোবহান আলিকে ছেড়ে দেবে বলে ঠিক করে। তারা উল্টো দিকে দৌড়াতে শুরু করে। ঠিক তখনই ঘটে এই খণ্ডযুদ্ধের নির্মমতম ঘটনা। খুব দ্রুত দৌড়াতে গিয়ে পানিতে পা পিছলে পড়ে যান সোবহান আলি। ঝপাৎ শব্দে আবার পেছনে ফিরেই জোতদারদের চেলারা দেখতে পায় সোবহান আলির পড়ে থাকা দেহটি:
– ওই দেখো দেখো পানিতে পিছল খেয়ে পড়েছে। এবার বাগে পাওয়া সহজ হবে। চলো…
দৌড়াতে দৌড়াতে যতক্ষণে ফিরে আসে জোতদাররা, ততক্ষণে কোনোমতে উঠে দাঁড়াতে পেরেছেন কমরেড সোবহান আলি। কিন্তু না। পূর্ণ শক্তি নিয়ে উঠে দাঁড়াবার আগেই একজন জোতদারের লাথি খেয়ে আবার ছিটকে পড়ে যান চিৎ হয়ে। তার বুকে উপর পা দিয়ে এক সেকেন্ডেরও কম সময় নিয়ে প্রথম বর্ষাটি গেঁথে ফেলে তার বুকে। বিশাল আকারের দ্বিতীয় বল্লমটি এফোঁড়-ওফোঁড় করে চটেরহাটের মাটিতে তাকে চিরকালের মতো গেঁথে দেয়। বিশাল বিপ্লবী, অমিত শক্তি আর সাহসের আধার এক জাতবিপ্লবীর পরম পরাজয়ের ক্ষণকে আর তিনি রুখতে পারেন না কোনোভাবেই। চিরকালের শোষক অত্যাচারী জমিদার আর জোতদাররা একের পর এক বল্লম নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে সোবহান আলির তড়পাতে থাকা দেহের উপর। একের পর এক যুদ্ধাহত মৃত্যু পথযাত্রী এই যোদ্ধার দেহের উপর চলে ঘণ্টাখানেকের ক্রুদ্ধ উল্লাস। ভারতের সশস্ত্র কৃষিবিপ্লবের প্রথম বীর শহিদের মুখ থেকে মৃত্যুর আগে আগে শেষ শব্দটি বের হয়ে আসে।
– বিপ্লব দীর্ঘজীবি হোক।
সঙ্গে সঙ্গে সর্বশেষ মারণাস্ত্রটি- একটি ত্রিশূল তার মুখ আর চোখের উপর বসিয়ে দেয় কেউ।

চিন্তার জালটা হঠাৎ ছিন্ন হয়ে যায় তমালকুষ্ণ রাজ চক্রবর্তীর। মনস্বীতাকে খুঁজছিলেন তিনি। দীর্ঘ রাস্তায় ড্রাইভ করতে করতে গাড়িটা ঠিক এই সময়টাতে এসেই জোর একটা খেয়ে থেমে পড়ে। মাথায় ভর করে প্রায় ঊনপঞ্চাশ বছর আগের সোবহান আলির রক্তাক্ত বল্লমবিদ্ধ তড়পাতে থাকা মৃত দেহটার ছবি। ঘুরে ওঠে তমালকৃষ্ণ রাজ চক্রবর্তীর মাথাটা। কী এক অশনি চিন্তা স্থির হতে দেয়না আজও ঊনসত্তর বছর বয়সের চক্রবর্তীকে। মেয়েটাকে কথা দিয়েছিলেন রোজ তাকে অফিসে নিয়ে যাবেন। আটনয় মাসের গর্ভস্থ সন্তান নিয়ে রাস্তায় একাকী নিঃসঙ্গ মেয়েটার দাঁড়িয়ে থাকার ছবিটি তিনি ভুলতে পারেন না কেন! প্রখর তেজদৃপ্ত সে-মুখ কোথায় যেন এক গভীর মায়া জাগিয়ে দিয়ে গেছে। মোহাম্মাদী হাউজিংয়ের তিন নম্বর গলিটার ভেতর দিয়ে ঢুকে পড়েন আজ। মেইন রোডে মারাত্মক জ্যাম বেঁধে গেছে। তিন নম্বর দিয়ে ভেতর দিকে চার হয়ে বেরিয়ে যাবেন তিনি। তিন নম্বরে ঢুকতেই দেখা যায় একটি বাড়ির সামনে অ্যাম্বুলেন্স দাঁড়িয়ে আছে। একজন নারী নামছেন। পেছনে একজন পুরুষ। এবার বিরক্তিকর অলস অপেক্ষা। হঠাৎ গাড়ির জানালায় চোখ গেল। বিস্ফারিত চোখে তিনি দেখেন, আরে, এ-তো মনস্বীতা। কী এক অদ্ভুত স্থির আর মায়াধরা নিঃস্ব ক্লান্ত চোখ। এই চোখে সেদিনের দেখা মেয়েটির প্রখর তেজ নেই। এই স্তব্ধ নির্বাক বিষণ্নতা বেশিক্ষণ চক্রবর্তী ধারণ করতে পারলেন না। গাড়ি থেকে নেমে এলেন।
ভুল দেখিনি তো! নিজেকে্ই প্রশ্ন করতে করতে কাছে আসেন। মনস্বীতার কোলে একটি শিশু। সাদা কাপড়ে মোড়ানো। কাছে এসেই তমালকৃষ্ণ রাজ চক্রবর্তী ডাক দেন :
– মনস্বীতা!
অজানা এক অদ্ভুত মায়াময় আহ্বান যেন শুনতে পায় মনস্বীতা। কবে, কোন কালে যেন, শৈশবেই হবে হয়তো-বা এমন ডাক শুনেছিল সে। এ-কী সেই দূরাগত ধ্বনি- যেমন করে তাকে ডাকাতেন বাবা। মা, মা! এ-কী নারীস্বর নাকি পুরুষের! কে ডাকে তাকে এমন আদরকাড়া কণ্ঠে! কতকাল এমন কথা, এমন কণ্ঠ, এমন আদর সে শোনেনি। মনে করতে চেষ্টা করে খানিকটা। ঠাহর করতে পারে না মনস্বীতা। চোখের কোল বেয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রু শুকিয়ে গেছে। চৈত্রের খররোদ্দুরে বিশুষ্ক খালের কোনো ক্ষীণ জলের রেখা বুঝি পথ কেটে চলে গেছে চিবুকের ওপর দিয়ে। মাথাটা খানিকটা ঘুরিয়ে তাকায় মনস্বীতা। সাথে সাথে চিনতে পারে।
– আপনি?
– হ্যাঁ। তোমাকে আর রাস্তায় দাঁড়াতে দেখিনি সকাল বেলায়?
এই প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়ে মনস্বীতা কোলের সন্তানটিকে এগিয়ে ধরে চক্রবর্তীর দিকে। তিনি যখন হাত বাড়িয়ে দেন। কিন্তু তখনও জানেন না কী নিষ্ঠুর এক সত্যকে তার হাতে সমপর্ণ করছে মনস্বীতা।
(চলবে)

পূর্ববর্তী ১৯তম পর্বটি এই লিংকে ক্লিক করলে পড়া যাবে

http://www.teerandaz.com/%E0%A6%B6%E0%A6%BE%E0%A6%AA%E0%A6%B2%E0%A6%BE-%E0%A6%B8%E0%A6%AA%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BF%E0%A6%A4%E0%A6%BE-%E0%A6%B8%E0%A6%AE%E0%A7%8D%E0%A6%AA%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%95%E0%A6%9F-14/?fbclid=IwAR3Q0aULelbESIf76rGfNacstyC0tPvL2zbkY-gnrPBonpu_JHVEVpu8YhQ