শাপলা সপর্যিতা > সম্পর্কটি শুধুই জৈবিক >> ধারাবাহিক উপন্যাস [পর্ব ২১]

0
344

পর্ব ২১

চোখের জলের ঢেউয়ে নিভে গেছে কী আজ মনস্বীতারও সেই অদ্ভুত জাজ্বল্যমান প্রদীপের মতো মুখখানি! সেদিনের ঝড় জল বৃষ্টিজিৎ মেয়েটির এমন যুদ্ধবাজ শরীর, প্রখর প্রজ্জ্বলিত দৃষ্টির প্রক্ষেপ পুরোটাই এইক্ষণে নির্বাপিত। সৃষ্টির কী এক গভীর আর গূঢ় চক্র দারুণ প্রজ্ঞা আর যুক্তিতর্ক ভেদ করে চলে যায় কোথায় কোন এক দূর অতীত থেকে বর্তমানে। হয়তো বর্তমান থেকে দূরে, আবার কোনো এক ভবিষ্যতে!
এত ঠান্ডা শরীর শিশুটির! আট মাসের একখণ্ড বরফ যখন তমালকৃষ্ণ রাজচক্রবর্তী মনস্বীতার হাত থেকে নিজের হাতে নিয়েছেন তখনও জানতেন না শিশুটি তার সমস্ত শীতলতা দিয়ে আঁকড়ে ধরবে এমনি করে। ক্রমান্বয়ে গ্রাস করতে থাকবে তার ভেতরের সমস্ত উষ্ণতাকে। এতটা সময় ধরে ড্রাইভ করতে করতে অযাচিত সেইসব উত্তপ্ত প্রহরগুলোর কথা-কাহিনি আজ তীব্র আলোর মালার মতো মনে হতে হতে যেখানে এসে ঠেকলো সে এক পরমক্ষণ। সোবহান আলি ছিলেন অকুতোভয় বীর। তার এবং আরো অসংখ্য বিপ্লবীর করুণ দুঃসাহসী আর নির্ভীক মৃত্যুর কাছে চিরকাল লজ্জিত এক আধা বিপ্লবী চক্রবর্তী। নিজেকে ঠিক এই নামেই ডাকে, গোপনে। অসংখ্য বিপ্লবীর তেজস্বী মৃত্যুর দুরন্ত প্রহর, চারপাশে ঘূর্ণায়মান শকুনের নিক্ষিপ্ত এক একটি বর্ষাফলকের আঘাতে শূন্যে উত্থিত এবং প্রক্ষিপ্ত এক একজন বিপ্লবীর রক্তকণিকাগুলো যখন জ্বালছে আরও আরও বিদ্রোহের প্রচণ্ড দাম্ভিক শক্তি আর তেজ তখন তিনি্ দ্বিধান্বিত। সেই বীর নকশালদের উক্ষিপ্ত রক্তকণাগুলো এখনো গলিত লাভার মতো বেয়ে আসে। উল্টোস্রোতে ধেয়ে আসে তারই মাথার ভেতর। ত্প্ত আগুনের লাল শিখার মতো তীব্র জ্বলন এখনো কোনো কোনো একাকী নিঃসঙ্গ রাতে পুড়িয়ে ভষ্ম করে চক্রবর্তীর অতীত। তবু স্থির হয় একসময় প্রজ্জ্বলন। বর্ষা বল্লম আর ত্রিশূলবিদ্ধ সোবহান আলির তড়পাতে থাকা দেহটিও ততক্ষণে মাথার ভেতর ঠান্ডা। অনুভবে শীতল হতে শুরু করেছে।
চোখের জলের ঢেউয়ে নিভে গেছে কি আজ মনস্বীতারও সেই অদ্ভুত জাজ্বল্যমান প্রদীপের মতো মুখখানি! সেদিনের ঝড় জল বৃষ্টিজিৎ মেয়েটির এমন যুদ্ধবাজ শরীর, প্রখর প্রজ্জ্বলিত দৃষ্টির প্রক্ষেপ পুরোটাই এইক্ষণে নির্বাপিত। সৃষ্টির কী এক গভীর আর গূঢ় চক্র দারুণ প্রজ্ঞা আর যুক্তিতর্ক ভেদ করে চলে যায় কোথায় কোন এক দূর অতীত থেকে বর্তমানে। হয়তো বর্তমান থেকে দূরে, আবার কোনো এক ভবিষ্যতে! এক হৃদয় থেকে অন্য আর কোনো হৃদয়ে! একই দেহ আবার কি তবে ফিরে ফিরে আসে পুনর্বার! এবং বারবার বেছে নেয় একই প্রচ্ছায়া! একই আরাধ্য আশ্রয়। একই আলোর দিকদিশা! চির পুরাতন সাধনায় লাভ করে ঊর্ধ্বতর মার্গ, আরাধ্য পরম নির্বাণ। না হলে কেন এভাবে আজ! এই মানবপাথর কোলে দাঁড়িয়ে রয়েছেন তিনি সেদিনের মতো! সেদিন তবু তো মাধবীর কান্না ছিল, চিৎকার ছিল, আর তার হাতে ধরা ছিল মৃত সন্তানের ঠান্ডাশীতল অজস্র ভার। পর্যাপ্ত ভালোবাসায় সবিশেষ প্রেমে যে জীবন শুরু করেছিলেন দুজনে তার ফলাফলে কেবল দুবার তাদের শরীরে শরীর মিশে পূজায় প্রার্থনায় ধ্যানে একাকার হতে পেরেছিল।
বাংলাদেশের গভীর নির্জন এক বনের গভীরে অদ্ভুত পোড়োবাড়িতে আর দার্জিলিংয়ে যাবার পথে রেলগাড়ির কামড়ায়। তবু সে মিলনে শান্ত সমাহিত পরম নিবেদন ছিল। প্রেম ছিল। নেশাতুর কাম ছিল। ভালোবাসার আশ্রয় ছিল। তাতেই জন্মেছিল যে অণুপ্রাণ। তার বুকে বড় বেশি ভার ছিল। মাধবীকে না বলে কৃষক বিপ্লবে নিজেকে সমর্পণ করেছিলেন, সেও তো গেল এক, কিন্তু তাকে না বলে এভাবে চীনে চলে যাওয়াটা এতটাই দুর্বহ হয়ে উঠেছিল আর সুদীর্ঘ ছিল সময়ের হিসেব যে, এক বিষাক্ত বিধ্বস্ত নিরাশ্রয়ে পড়েছিল মাধবী। চাঁদের শেষ আলোটুকু তাই গ্রহণে পড়ে গিয়েছিল আর বিষটুকু গিয়ে লেগেছিল ওই ক্ষুদ্রপ্রাণে। নিভে গিয়েছিল ধীরে ধীরে তার জীবন-প্রদীপ। সেই ক্ষুদ্র প্রাণ বুঝি আজ ফিরে এসেছে আবার! ঠিক একই পরিণতি নিয়ে তারই কোলে। না হলে এর তো থাকার কথা অন্য কারো কোলে পরম অন্তিম বেদনাবাহিত ক্ষণে।
কিন্তু মনস্বীতার চোখের জল শুকিয়ে গেছে, চিৎকার নেই, প্রলাপ নেই, এতটা নির্বাক নিস্তেজ নিঃসম্বল মেয়েটি আজ! সকলেই চলে গেছে বাড়ির ভেতর। মনস্বীতাও। তিনি একা কোলে ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছেন এভাবে কতক্ষণ কেউ জানে না। বাড়ির ভেতর থেকে কেউ এসে তার কোল থেকে মৃত সন্তানটির দেহ নিয়ে চলে যায়। আর নিকোনো উঠোনের শূন্যতায় পড়ে থাকে নীরব হাহাকারের তুমুল তাণ্ডব। মৃত শিশুটির মুখে মাধবীর মুখ মনস্বীতার মুখ একাকার হয়ে মিশে গিয়ে বিকেলের ছায়া ফেলে। তারপরে আরও মায়া ফেলে চলে যায় একটি দিন আর একটি রাত্রির গহন অন্ধকারে।
এইক্ষণে আবার পুরাতন ব্যথা নতুন করে প্রাণবান হয়ে ওঠে বুকের গভীরে। এক অধরা শিশুর কান্না বার বার মুছে দেয় রাত্রির গাঢ় নিরাভরণ সুন্দরতা। অসাধারণ রূপালি জোৎস্নার জল ধুয়ে মুছে একাকার এক শীতল শিশুর শরীরের ভারে। এখানে মনস্বীতা কে! মাধবীই বা কে! যুগ-যুগের সঞ্চিত ব্যথায় জমাট বরফের মতো কঠিন দুটি নারীমুখ দাঁড়িয়ে রয়েছে তার সামনে। একজনের দায় তার নিজের। আর একজন! কে নেবে তার দায়। কে দেবে সান্ত্বনা তাকে! সন্তান-হারানো দুজন নারীর অপার্থিব বেদনার ভার একা এই ক্লান্ত সন্ধ্যায় চক্রবর্তীকে ক্রমবিধূর করে তোলে। বুঝি আর বহন করতে পারছেন না। যুদ্ধাহত নিরস্ত্র সৈনিকের মতো পরাজিত অধোবদনে একা দাঁড়িয়ে আছেন রূপালি চাঁদের আলোর নিচে। আশ্বর্য! চাঁদের কি অসাধারণ সুন্দর ধারাপাত আজ রাতের প্রথম প্রহরে। তবু জোৎস্নার আলো ম্লান হয়ে আসে এই তীব্র বিষণ্ন বিমর্ষ নির্বাক ক্ষণে। এখানে আর এক সেকেন্ড সময়ও তিনি অত্রিক্রম করতে পারছেন না। বের হয়ে আসেন খুব দ্রুত পায়ে চন্দ্রাহত অবস্থা থেকে। আবার গাড়ির ড্রাইভিং সিটে উঠে বসেন। খুব দ্রুত গাড়ির গতি। ভীষণ যুদ্ধ ভেতরে বাইরে। ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে ব্যক্তিগত সকল ক্রোধ আর যন্ত্রণার বাঁধ। বার বার মনে পড়ছে সন্তান সম্ভবা সেই মেয়েটির মুখ। তুমুল বৃষ্টিতে কত যে বিপন্ন অবস্থায় পার হচ্ছিল জলমগ্ন গলির পথ। একা। নিঃস্ব। এ কী ভীষণ রুদ্র রূপ প্রকৃতির! যার কিছু নেই। তারে আরও নিঃস্ব করে কী লাভ। কি আবেশ এই বিষণ্ন যাতনার মুখগুলোকে বার বার দর্শনে তার! কী আনন্দ! কী আবেগ তার এই বেদনাঘন গানের সুরে! এসব ভাবতে ভাবতে বড় বিপন্ন লাগে আজ। বেশ ক’বার বাড়ি থেকে ফোন আসে। কল রিসিভ করেন না। মাধবী অথবা টুলটুলই হয়তো কল করে থাকবে। নির্বিকার তিনি। কল রিসিভ করবার প্রয়োজন মনে করেন না আর এই মুহূর্তে।
মৃত সন্তানের যাবতীয় সকল কাজ সম্পন্ন হয়। মনস্বীতার বিপন্ন মন, বিষাক্ত রক্তাক্ত ক্ষত, দেখা যাবে কী আর কোনোদিন! এই প্রচণ্ড বিক্ষুদ্ধ যাপিত জীবন, শামুক আবরণ, দ্বিতীয়বার ভাঙবে কী আর! হ্যাঁ। শেষবারের মতো ভেঙে পড়ে বেদনায় বেদনায় পরাক্রান্ত গভীর সে নারীর অস্তিত্বের খোলশটিও একবার। জীবাত্মার সাথে বিচ্ছেদের এই তীব্র বিশুদ্ধ যাতনার কালে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে ঝড় ওঠে। বৃষ্টি নামে। মত্ত প্রলাপে ভেসে যায় হৃদয়-যাতনার বিপুল বেহাগ। নিবিড় অন্ধকারে যে প্রদীপ জ্বালানোর জন্য এত যুদ্ধ এত অভিমান এতটা বিক্ষুব্ধ যাপিত জীবন, সে প্রদীপ এতটুকু শূন্যতাকে এক বিশাল গভীর অন্ধকারে পরিণত করেছে ক্ষণকালের জন্য। তারপর চিরকালের মায়ায় বেঁধে চলে গেছে পরমাত্মার সাথে মিলনের তীব্র আকর্ষণে। মনস্বীতাই বা কী করে অস্বীকার করবে সে অমোঘ নশ্বরতা!
পুরোটা জা্র্নিতে দুই নকশাল কমরেডের সাথে কোনো কথা হয় না মাধবীর। মৌন নির্বাক মাধবী হয়তো ভাবছিল আরও কিছু কি বাকি আছে দেখবার। বিস্ময়ের কোন সীমানায় গিয়ে শেষ হবে সব। এই ক’টা মাসে এত এত সব ঘটে গেল। এও কী স্বপ্নে ছিল তার! তার চেয়ে বরং বাংলাদেশের সময়গুলো সুন্দর ছিল। সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ মন। ভালোবেসেছিল পাশের বাড়ির চক্রবর্তীকে। কী এক অদ্ভুত সম্মোহন ছিল দুজনের জন্য দুজনের। সমাজ দেশ প্রতিবেশ সবকিছুকে তুচ্ছ করে তাই তো দুজনের এক হওয়া সম্ভব ছিল। কিন্তু বাস্তবিক যা যা চোখে দেখা যায় তার সবই কী অমোঘ! সবই কী সত্য! তার ভেতরেও হয়তো রয়ে যায় কোনো অজানা গুঢ় সত্য। যা আপাতভাবে দৃশ্যগ্রাহ্য নয়। বিশেষ সময়ে পরিগ্রহ করে সে তার আসল রূপ। যে চক্রবর্তী দেশ মাটি মা বাবা সব ছেড়ে মাধবীর পিছু পিছু চলে এসেছিল ভারতে, সেই কত সহজে তাকে না বলে উধাও হয়ে গেল। শোনা যায় চক্রবর্তী নকশাল আন্দোলনে যোগ দিয়েছে। কিন্তু তার কাছে কেন লুকোনো! কেন না বলে এমন করে হারিয়ে যাওয়া। সত্যি কথা হলো কংগ্রেস সমর্থক বাবার কাছেই সে প্রথম শুনতে পেল এসব কথা। সুপ্রিয়দা তো সব জানতো। সেই বা কেন এসব বলেনি মাধবীকে। ছন্দা! সে কি জানতো! জানতো না? মেলাতে পারে না কিছুতেই কিছু আর। চোখে সামনে সুন্দর একটা ঘরের স্বপ্ন মৃত জোনাকির মতো ঝুলে আছে। তার সব আলো হারিয়ে এক বিকট অন্ধকার যেন কেবলই জাপটে ধরছে মাধবীকে। আর বিষন্ন অবশ প্রত্যাশাহীন এক গাঢ় অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে ক্রমাগত। দুই কমরেড মাধবীকে নিয়ে ফিরে আসে আবার দার্জিলিং। মাধবীর বন্ধু ছন্দা দৌড়ে এসে বুকে জড়িয়ে ধরে ঘরে নিয়ে চলে মাধবীকে। একবার মাত্র মাধবী ছন্দাকে প্র্রশ্ন করে।
– তুই তো সকল জানতিস? জানতিস না?
ছন্দা আসলেই সব জানতো না। পরে সুপ্রিয়র কাছে জেনেছে। তবু এই সময়টা কথা বলা ঠিক হবে না ভেবে উত্তর করে না।
– আগে ভেতরে আয়। পরে কথা বলছি। একটু সুস্থির হয়ে বস।
ছন্দার বর সুপ্রিয়র মুখে কথা নেই্। তার বাড়ি থেকে যেভাবে কিডন্যাপ করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল মাধবীকে, এটা তার জন্য খুব লজ্জার। খুব লজ্জিত সে। তাকাতে পারছে না মাধবীর দিকে। মাধবীর পৌঁছানোর খবর পৌঁছে যায় সকল বিপ্লবীর কাছে। ঠিক তখনই বাড়ির ভেতর প্রবেশ করেন আর একজন কমরেড। বয়স, সময়ে সময়ে জেলের ভেতর অত্যাচার নির্যাতন আর অসুস্থতা সব মিলিয়ে বিমর্ষ তিনি। তবু কী এক অদ্ভুত প্রজ্ঞায় উজ্জ্বল এক শান্ত সমাহিত সৌম্যদর্শন মানুষকে চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মাধবী নির্বাক। অবাক। কমরেড চারু মজুমদার এবার দাঁড়ান মাধবীর মুখোমুখি। মাধবী কমরেড চারু মজুমদারের চোখে সোজা চোখ রাখে। দৃষ্টি প্রখর, তীব্র, অন্তর্ভেদী।
[চলবে]