শাপলা সপর্যিতা > সম্পর্কটি শুধুই জৈবিক >> ধারাবাহিক উপন্যাস [পর্ব ২২]

0
535

পর্ব ২২

তীব্র বিষ চোখে। মাধবীর ক্ষীপ্র দুচোখের সে বিষদৃষ্টি ভেদ করে ভাবনাগুলো যেন ক্ষুদ্রতম সময়ের মধ্যে অতিক্রম করে দীর্ঘতম দূরত্ব। চারু মজুমদারের তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়ে তারেই তীব্র বিষাদ। সদ্য বিবাহিত স্ত্রীকে কিছুই না জানিয়ে চক্রবর্তীর চীনে চলে যাওয়ার যাবতীয় দোষ বা কারণ একমাত্র চারু মজুমদার, হঠাৎ এক মুহূর্তের জন্য এই ভাবনাটাই জোর শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে আর মারাত্মক আক্রমণ করার জন্য প্রস্তুত হয় মাধবীর সুগভীর অন্তরালে।
বাবা বিরেশ মুখার্জির বাড়িতে কয়েক মাসের একটানা বিধ্বস্ত সময়যাপনের ক্লান্তি আর গন্তব্যহীন অস্থিরতার ভার গোপনে, ধীরে, তুলছিল এক তীব্র অভিমানের দেয়াল। সে সময় গত হয়েছে আগেই। না দেখার সে অভিমান দিনে দিনে রূপান্তরিত হয়েছে দুঃখ ক্ষোভ এবং অবশেষে এক মারাত্মক ঝড়ে। যে ঝড় একা সামলানো দুতিন মাসের অন্তসত্তা, একা মাধবীর পক্ষে দূরহ হয়ে উঠেছে। চারু মজুমদারকে দেখার সাথে সাথে তার বিপন্ন্ অনুভূতিগুলো মুহূর্তে যেন মন মাথা আর শরীরের কোণে কোণে ডেকে আনছে প্রচণ্ড ঝড়ের আবাহন। যেন দিনে দিনে চক্রবর্তীর প্রতি বিক্ষুব্ধ ভালোবাসা রূপ নিচ্ছে এক তীব্র জিঘাংসায়ও! বার বার নিজেকে প্রশ্ন করে পায়নি কোনো উত্তর। কিন্তু এমনি দুরন্ত ব্যক্তিত্ব, দুর্বার বেগে যিনি আগুন দিয়ে চলেছেন সমগ্র ভারত জুড়ে, জ্বালিয়ে রাখছেন দহন আর ছড়িয়ে দিচ্ছেন শত বছরের শোষকের দিকে বহ্নিশিখা। যিনি রাজপ্রাসাদ ছেড়ে নেমে এসেছেন মাটির ঘরে খালি পায়ে। যিনি নিগৃহীত অবহেলিত আর আত্মবিশ্বাসহীন কৃষকের বুকে এনে দিয়েছেন বিশ্বাসের জোয়ার, জোতদারের পায়ের নিচে পিষ্ট হয়েই মৃত্যু – এই কৃষকের, শ্রমিকের ভাগ্যের লিখন এমন বিশ্বাসে যে কৃষকের হাতে তুলে দিয়েছেন বন্দুকের মতো বিশ্বাসী হাতিয়ার, তিনি বুঝতে পারবেন না মাধবীর বুকের ব্যথা, সইতে পারবেন না তার জিঘাংসার প্রজ্বলিত ভাবনা অবান্তর কিনা। তাই মাধবীর গভীর আগুন নেভানোর মূলমন্ত্র তিনি আত্মস্থ করেই এসে দাঁড়িয়েছেন তার সামনে। মাধবীর প্র্থম দৃষ্টি প্রক্ষেপে তিনি খানিক বিচলিত হলেও মোক্ষম অস্ত্র প্রয়োগে কোনো ভুল করেন নি। মাধবী কিছু বলে্ উঠবার আগেই কমরেড চারু মজুমদারই শুরু করেন কথা বলা।
– মা। আপনি বিপ্লবীর সুযোগ্য স্ত্রী।
মাধবী কিছুই বুঝে উঠতে পারে না হঠাৎ এমন প্রসঙ্গের অবতারণায়। সে অবাক এবং নির্বাক। কারণ জানার পর থেকেই মাধবী চক্রবর্তীর বিপ্লবী হয়ে ওঠার বিষয়টি কোনোমতেই ভালো চোখে তো নিতেই পারেনি। তার উপর নানা টানাপোড়েনে পড়ে পুরো নকশাল আন্দোলনটির বিষয়েই সে বীতশ্রদ্ধ হতে শুরু করেছে হয়তো ভেতরে ভেতরে। এ বিষয়টি নিয়ে তখনো তার মনোজগতে চলছে তীব্র বিতর্কিত অবস্থা। তাই মাধবীর অবাক দৃষ্টিতে আছড়ে পড়ছে বিস্ময় আর কৌতূহল। তার চোখের দিকে আঙুল নির্দেশ করে আবার বলেন তিনি :
– শত্রুর প্রতি তীব্র ঘৃণাই বিপ্লবীর পরম সম্বল। আপনার দৃষ্টিতে পরিশুদ্ধ ঘৃণা আমি পড়তে পারছি পুরোটাই।
বিস্ময়ের শেষ অভিজ্ঞতা কি অর্জন করতে পেরেছে এই ক্ষণে মাধবী, নিজেকেই প্রশ্ন করে। আরও কিছু কি রয়ে গেছে বাকি! চারু মজুমদার আবার বলতে শুরু করেন।
– কিন্তু আপনি কি জানেন আপনার স্বামী খুব শীঘ্র ফিরে আসছেন? তিনি বিজয়ী বিপ্লবী বীর। প্রতিটি পুরুষের বিজয়ের পেছনে মা কিংবা স্ত্রী বোন কিংবা প্রেমিকার অসাধারণ উপস্থিতি তাকে পৌঁছে দিতে পারে সাফল্যের শিখরে। আমি জানি, নেপালি সীমান্তরক্ষীদের হাতে, একটানা তুষারপাতের ঠান্ডা মরণফাঁদে কিংবা তিব্বতী গেরিলাদের হাতে যে কোনো সময় মৃত্যুবরণ করতে পারতেন আমাদের কমরেড কৃষ্ণভক্ত শর্মা কিংবা তমালকৃষ্ণ রাজ চক্রবর্তী। এই কথাটি শোনার সঙ্গে সঙ্গে মাধবীর কোথায় যেন কি এক অজানা আশঙ্কা খেলে যায়। অস্ফুটে বলে ওঠে;
-না না। কি বলছেন!
এইটুকু বলে থামেন তিনি। ফুসফুসে জীবাণুর মারাত্মক আক্রমণ এবং সংক্রমণ। যন্ত্রণার সাথে যুদ্ধে পরাজিত হলে প্যাথিড্রিন নিতেও ডাক্তার বলে দিয়েছেন তাকে। এতটাই ভয়াবহ ক্ষত। এই সময়টাতেই সে যণ্ত্রণাটা আবার মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। শারা শরীর যেন হঠাৎ বিশ্বাসঘাতকতা করতে শুরু করে দেয়। মুখের ওপর নীলাভ এক আকাশ নেমে এসেছে যেন তার। মাধবীর সংবেদনশীল অন্তরাত্মায় তা ধরা পড়তে সময় নেয় না। নিজেকে হঠাৎ ভীষণ লজ্জিত লাগে অনুভবে। বলে ওঠে;
– আপনি বসুন। আমি দুঃখিত।
– আমিও খুব দুঃখিত। আমি আপনাকে সঠিক সময়ে জানাতে পারি নি। কমরেডকেও নির্দেশ দিতে পারিনি আপনাকে জানাতে। তার দায় পুরোটাই আমার।
– না না। এ আপনি কি বলছেন। একদম ঠিক নয়।
সেদিকে ভ্রূক্ষেপ করেন না কমরেড চারু।
– আপনি এবার আশ্বস্ত হতে পারেন। আপনার স্বামী ভালো আছেন। তিনি চীনে গেরিলা যুদ্ধ আর রাজনীতির উপর শিক্ষা নিচ্ছেন। খুব ভালো আছেন আমাদের দুই কমরেড। যাবার পথে যে ভয়ানক আশঙ্কা ছিল, প্রাণ সংহারের সম্ভাবনা ছিল এবারে সে-সব বিপদাপদের আশঙ্কা নেই। চীন তাদের সব রকমের নিরাপত্তা দিয়েই আমাদের এই দুজন কমরেডকে ফেরত পাঠাবে।
মাধবীর বুকের ওপর থেকে যেন এক বিশাল পাথরের চাঁই সরিয়ে দিলেন কমরেড। সব রাগ গলে জল হয়ে গেল। আর তা ধেয়ে গেল চারু মজুমদারের দিকে পরম মমতায়। এইক্ষণে সে চারু মজুমদারের অসুস্থতায় পরম মমতা অনুভব করে। দারুণ শ্রদ্ধায় বিগলিত হয়ে ওঠে তার মন।
– আপনি তো আর কাউকে পাঠাতে পারতেন এ খবর দেবার জন্য। নিজে কেন আসতে গেলেন এই শরীরে?
– আমার কাজ তো আমাকেই করতে হবে। এ আমার কাজ মা। দূর থেকে এসেছেন দীর্ঘ পথ শেষে। এবার একটু বিশ্রাম করুন। বিরেশ মুখার্জিকে সকল পরিস্থিতির খবর জানানো হয়েছে। আপনি এবার নিশ্চিন্ত হতে পারেন।
মাধবীর মনে হলো এ এক মহাপুরুষের কণ্ঠে উচ্চারিত শব্দের মেঘমালা। প্রলম্বিত ঝড়ে ক্রমাগত আহত মাধবীর ঊষর প্রাণে ছড়িয়ে দিচ্ছে শীতল বাতাস। দীর্ঘ অমাবস্যা যেন তার তীব্র ভয়াল কালো অন্ধকার দূর করে দিয়ে শীতল পূর্ণিমায় হঠাৎ বদলে নিয়েছে তার রূপের ব্যঞ্জনা। তাতেই খুলে গেছে কোনো এক অরূপের দ্বার। একবার তাকান তিনি মাধবীর মুখে, চোখে। দৃষ্টিতে সমব্যথা। তবু যেন কী এক অপরূপ মায়া, দীঘির কালো জলের মতো শান্ত করে দিয়েছে মাধবীর বিশ্রস্ত বেদনার নিঃসীম অন্ধকারকে। একবার একটি কম্পিত হাত তিনি মাধবীর মাথার উপর রাখেন কি রাখেন না। তারপর আর এক সেকেন্ড সময়ও এখানে অতিবাহিত করবেন না বলে ঠিক করেন। সাথে সাথে বের হয়ে আসেন ছন্দা সুপ্রিয়র বাড়ি থেকে। অসুস্থ, অথচ সোজা লম্বা দীর্ঘ ঋজু শরীর চলেছে বাতাসেরও আগে আগে। তার চেয়েও দীর্ঘ তার প্রতিটি পদক্ষেপ। ক্ষীপ্র তার গতি। পেছনে তার ছায়া পড়ে থাকে। ছায়া ক্রমে দূরতিক্রম্য হয়ে ওঠে। দীর্ঘ থেকে দীর্ঘায়ত হতে থাকে তার প্রগাঢ় বেদনা। এই প্রখর রোদে উজ্জ্বল সূর্যকেও যেন পরাজিত করে চলে যেতে থাকেন একজন দীর্ঘ বিপ্লবী। লক্ষ গেরিলার দিশা, শ্রান্ত ক্লান্ত কৃষকের মনের আলো, পৃথিবীর সকল মেহনতী নিগৃহীত মানুষের ব্যথার পাহাড় কাঁধে নিয়ে চলে যেতে থাকেন কমরেড চারু মজুমদার, মাধবীর সামনে থেকে দূরে। তার প্রস্থান এক নির্বন্ধিত মহামায়া, ছায়া ফেলে যায়। মায়া রেখে যায়। প্রসিদ্ধ এক বটচ্ছায়ার মতো সকল চিন্তার বিস্তারকে প্রসারিত করে নিয়ে যায় চেতনার কোন এক ঊর্ধ্বলোকে। অপসৃয়মান তখন মনোজাগতিক দ্বিধাদ্বন্দ্বের সংকীর্ণ রূপরেখা। অধিকার করে নেয় মাধবীর চেতনার নির্লিপ্ত কলুষতা।
[চলবে]
পূর্ববর্তী পর্ব-২১

http://www.teerandaz.com/%E0%A6%B6%E0%A6%BE%E0%A6%AA%E0%A6%B2%E0%A6%BE-%E0%A6%B8%E0%A6%AA%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BF%E0%A6%A4%E0%A6%BE-%E0%A6%B8%E0%A6%AE%E0%A7%8D%E0%A6%AA%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%95%E0%A6%9F-16/?fbclid=IwAR0e9fkwVyaErDZFFKD5WJLto1IK_bXTqv-dyS1_K_Nhw6YLdmCT4cKf4Yk