শাপলা সপর্যিতা > সম্পর্কটি শুধুই জৈবিক >> ধারাবাহিক উপন্যাস [পর্ব ২৩]

0
234

পর্ব ২৩

কমরেড কানু সান্যালের নেতৃত্বে প্রথম দলটি যখন চীনে পৌঁছায় তারই কিছু আগে আগে কৃষ্ণভক্ত শর্মা আর তমালকৃষ্ণ রাজ চক্রবর্তী দেশে ফিরে আসেন যথাযোগ্য মর্যাদায়। সুস্থ শরীরে প্রায় ছয় মাস পর তারা ফিরে আসেন। এসেই দেখা করতে যান চারু মজুমদারের সাথে। চারু মজুমদার খুব খুশি। তার বিপ্লব সংক্রান্ত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য চীনে মাও সে তুঙের কাছে দলিল নিয়ে যাবার জন্য যে ঝুঁকি নিয়েছেন দুজন বিপ্লবী, তাদের প্রতি তিনি আজ কৃতজ্ঞ। কৃষ্ণভক্ত শর্মা চারু মজুমদারকে বিস্তারিত জানান।
– কমরেড, চেয়ারম্যান মাও সে তুঙ আর চীনা পার্টির নেতারা আপনার দলিলের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন।
– বাহ, বেশ।
যদিও আগেই পিকিং রেডিও থেকে তার দলিল প্রকাশ শুরু হয়েছে। তবু আজ কৃষ্ণভক্তের নিজের মুখে শুনে তিনি খুশি। ভীষণ আত্মবিশ্বাসী দেখায় চারু মজুমদারকে। সকলকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন :
– এবার তবে আরও বলিষ্ঠভাবে সংগ্রাম গড়ে তোলো। দৃঢ় আত্মপ্রত্যয়ের সাথে সংগ্রাম এগিয়ে নিয়ে চলো।
– একদম
– বিপ্লবীরা প্রস্তুত থাকো। আমি চীনের সাথে কথা বলছি। তারা যেন আমাদের আরো কিছু বিপ্লবীকে চীনের গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেবার সুযোগ দেয়।
চেয়ারম্যান মাও সে তুঙ ও ভাইস চেয়ারম্যান লিন পিয়াওয়ের নেতৃত্বে তখন চীনে সগৌরবে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের জোয়ার চলছে। সাথে দেশ-গঠনের ব্যাপক কাজে ব্যস্ত চীন। ঠিক সেই সময়ই কমরেড চারু মজুমদারের ইচ্ছেতে দুটি দলে ভাগ হয়ে কানু সান্যাল আর সৌরেন বোস মাও সে তুঙ চিন্তাধারা অধ্যয়ন ও প্রশিক্ষণের জন্য চীনে যা্বার জন্য প্রস্তুত। কানুর দল ফিরে এলে সৌরেনের দল চীনে পৌঁছান। চীনের গৃহযুদ্ধ ও জাপান-বিরোধী গৃহযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বয়োজ্যোষ্ঠ নেতারাই এই পাঠ শিক্ষা দিতেন। যাদের অনেকের গায়েই এখনো বুলেটবিদ্ধ ক্ষত স্পষ্ট। তত্ত্বগত ও প্রয়োগগত দুধরনের ক্লাসই করানো হয়েছিল। পিকিংয়ে তত্ত্বগত ক্লাস শেষ করার পর সামরিক প্রশিক্ষণের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছিল প্রদেশে। গেরিলা যুদ্ধ, প্রতিরোধ যুদ্ধ, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধঘাঁটি এলাকা, নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব, হুনান কৃষক আন্দোলনের রিপোর্ট, চিংকার পাহাড়ে সংগ্রাম- এইসব তত্ত্বগত বিষয় পড়ানোর সাথে সাথে শারীরিক শিক্ষার ওপরও জোর দেয়া হয়। দেয়া হয় গেরিলা যুদ্ধের ট্রেনিং। ফায়ারিংয়ের উপর প্রশিক্ষণ। তত্ত্বগত বিষয়গুলো পড়ানোর সাথে সাথে একটা মূল্যায়নের ব্যবস্থাও ছিল। সপ্তাহ জুড়ে অধিত বিষয়ের উপর শিক্ষার্থীদের সারসংক্ষেপ বলতে হতো। আর সেগুলো শুনে মূল্যায়ন করতেন শিক্ষকরা। একই সাথে গেরিলা যুদ্ধের ক্লাস শেষ হলে এলো মূল্যায়নের পর্যায়। শিক্ষকদের বলা হতো অধ্যয়ন পরিচালক। সবকিছু অধ্যয়নের পর অধ্যয়ন পরিচালক এই কথাগুলো বলতেন।
– গেরিলা যুদ্ধই মূল লক্ষ্য মূল কাজ আমাদের।
এই কথা বলবার সাথে সাথে শান্তিপালসহ আরও কয়েকজন কমরেড লাফিয়ে উঠলেন। কিন্তু সৌরেন বোস এবং অন্যান্য কয়েকজনের মধ্যে এ নিয়ে বিশেষ আগ্রহ দেখা গেল না। এমনকি যেদিন গেরিলা যুদ্ধ ও গণফৌজ গঠনের ক্লাস নেয়া শুরু হয়, সেদিন থেকেই সৌরেন বোসের মধ্যে প্রচণ্ড নিরুৎসাহ দেখা যায়। এর আগে কানু সান্যালের মধ্যেও দেখা গেছিল গেরিলা-যুদ্ধ বিষয়ে উৎসাহের ভাটা। অন্যদিকে চীনে যা যা পড়ানো হয়েছিল তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল গেরিলা যুদ্ধেরই উপর। কিন্তু কানু সান্যাল ও সৌরেন বোস দুজনেই ছিলেন ভেতরে ভেতরে গেরিলা যুদ্ধ ও সশস্ত্র সংগ্রামের ঘোর বিরোধী। সেটা পরে প্রকট হয়ে ওঠে। অন্য কমরেডদের কাছে এমনকি চীনা অধ্যয়ন পরিচালকদের নজরও সেটা এড়ায়নি। দুই দলের একধরনের বিভাজন বেশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে নকশাল কমরেডদের কাছে। এমনকি চীনা অধ্যয়ন পরিচালকদের কাছেও। কারো কারো ব্যক্তিগত চারিত্রিক বিকারও প্রকাশ পেয়ে যায়। নানাভাবে কয়েকজন কমরেড চীনা নারী কমরেডকেও ত্যক্ত-বিরক্ত করেছেন এরই মধ্যে। সুকুমার রায় বরাবর নেতিবাচক প্রশ্ন করে এবং শাও চির পক্ষ নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন করতেন প্রশিক্ষকদের। কখনো তার প্রশংসা করে নানা কথাবার্তা বলে চীনা প্রশিক্ষক ও পরিচালকদের উত্তেজিত করার চেষ্টা করতেন। খাতায় বরাবার তিনি আলোচনার নেতিবাচক বিষয়গুলো নোট করে রাখতেন। এমনকি চেয়ারম্যান মাও সে তুঙকে নিয়ে কুৎসিত ও কুরুচিকর একটি মন্তব্যও করে বসেন একদিন। চীনাদের কাছে তা ভীষণ বিব্রতকর হয়ে দাঁড়ায়। তাছাড়া সৌরেন বোসের কিছু কাজ চীনে প্রশিক্ষণ নিতে আসা কমরেডদের মাঝে স্পষ্টতই একটি বিভাজন তৈরি করে। একথা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে সৌরেন বোস সেই সময়ে কমরেড চারু মজুমদারের আনুগত্য পুরোপুরি মেনে নিতে ইচ্ছুক নন। পার্টির প্রতি চারু মজুমদারের দায় ও দায়িত্বও অস্বীকার করার মনোভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে সৌরেনের আচরণে। এ নিয়ে অন্যান্য কমরেডদের সাথে তার মতানৈক্যও দেখা দেয় চীনে থাকতেই। দ্বিতীয় গ্রুপের কমরেডরা চীনে এসে তিন মাসের প্রশিক্ষণ নেবেন এমন পরিকল্পনা থাকলেও কানু সান্যালের কারণে দীর্ঘতর হয়ে সেটা পাঁচ মাসে গিয়ে ঠেকেছিল। কথা ছিল কানুর দল ফিরে গিয়ে পথের কী অবস্থা এবং দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে চীনে চিঠি পাঠাবেন। সে অনুযায়ী দ্বিতীয় দলটি পশ্চিমবঙ্গে ফেরত যাবে। কেননা, পশ্চিমবঙ্গে তখন রাষ্ট্রপতির শাসন চলছিল। তাই কোনো খবর না পেয়ে কোনো ধরনের অনিশ্চিত অবস্থার মধ্যে কমরেডদের ফেরত পাঠাতে চাইছিল না চীন। কিন্তু কানুর চিঠির অপেক্ষায় আরও দুমাস অতিবাহিত হয়। তিনি চিঠি পাঠান নি। বিপদের ভয়ে চীন কমরেডদের ভারতে ফেরতও পাঠাতে পারছে না। শেষে কমরেডদের অনুরোধে বাধ্য হয়েই অনিশ্চিত অবস্থার মধ্যেই হতাশ হয়েই চীন ভারতীয় বিপ্লবীদের ফেরত পাঠায়। অন্য দিকে কানু সান্যাল ছিলেন নেতৃত্বাকাঙ্ক্ষী। ভুল চিন্তাধারা আর ভুল দৃষ্টিভঙ্গীর মানুষ। কমরেড চারু মজুমদারের প্রতি তার হিংসা, অশ্রদ্ধা ঘোরতর বিরোধ চীনে যাবার পর প্রকাশ হয়ে পড়ে। চীনাদের সাথে কথায় নকশাল বাড়ির ইতিহাস এবং বিপ্লবের প্রসঙ্গে সে কখনো চারু মজুমদারেরর নাম উচ্চারণ করতো না। মাঝে মাঝে তাই অন্যান্য বিপ্লবীদের সাথে বাক বিতণ্ডা হতো এই নিয়ে। কোন বিপ্লবী হয়তো জানতে চাইলেন :
– চীনা কমরেডদের কাছে চারু মজুমদারের কথা বলছেন না কেন?
তখন সৌরেন বোস এবং কানু সান্যালের উত্তর প্রায় একই রকম হতো।
– চারু মজুমদারের কথা বলার কী আছে। চীনা কমরেডরা তো সবই জানেন। আমরা তো তার চিঠি নিয়েই এসেছি। সুতরাং তার কথা বলার কি দরকার আছে আর?
– চিঠি দিয়ে কমরেড চারু মজুমদার তার দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু আমাদের দায়িত্ব হলো নকশারবাড়ির বিপ্লব যে তার ব্যক্তিগত নেতৃত্বে ঘটেছে সেটা চীনাদের জানানো। চীনা কমরেডরা তো এখানে, চীনের মুক্তি ছাড়াও যে-কোনো সংগ্রামের সাফল্যের জন্য বার বার করে মাও সে তুঙের নাম নিচ্ছেন। তাহলে আমাদের সিএমএ-র নাম বলতে সমস্যা কোথায়?
অন্যান্য বিপ্লবীদের এমন প্রশ্নের উত্তরে সৌরেন বোস আর কানু সান্যালের বলার কিছু থাকতো না। তারপর থেকে সৌরেন মাঝে মাঝে খুবই নিরুৎসাহিত হয়ে চারু মজুমদারের ভূমিকা সম্পর্কে কিছু কথা বলতেন। কিন্তু এর পর মুহূর্তেই অন্যান্য বিপ্লবীদের বলতেন :
– নাও, হয়েছে? এই বেলা তোমরা খুশি তো?
আগের দলে কানু আর পরবর্তী দলের নেতা সৌরেনের আচরণ চীনা বিপ্লবীদের মনে খুব অশান্তি তৈরি করে। তারা বলেই বসে :
– আপনাদের মধ্যে শ্রমিক ও কৃষক কমরেডরা বেশি পরিমানে আসতে পারতেন। ওটাই দরকার ছিল।
একসময় কাছাকাছি পাশাপাশি বাস করা সৌরেন বোসকে চারু মজুমদার বিশ্বাস করেছিলেন। তার উপর বিপ্লবী দলের ভার দিয়েছিলেন। পার্টির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিয়েছিলেন। কিন্তু সংগ্রামের ভাটার সময় এরাই মুখোশ খুলে বেরিয়ে আসেন। ঘোরতর চারু মজুমদার বিরোধী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে পরবর্তী কালে নকশাল আন্দোলন এবং নকশাল-বিরোধী নীল নকশা রচনার মাধ্যমে নিশ্চিত করেছিলেন চারু মজুমদারের স্বপ্নের করুণ অপমৃত্যু।
তমালকৃষ্ণ রাজ চক্রবর্তী যখন সুপ্রিয়দা আর ছন্দার বাড়ির দিকে এগুচ্ছে তখন সন্ধ্যা লাগো লাগো। আকাশে কেউ যেন আবীরে আবীরে ছড়িয়ে দিয়েছে এক মহোৎসব। তবু কেন মনে হয়! পায়ে করে নিয়ে এসেছে তীব্বতের পাহাড় চূড়ার চূর্ণ বরফকুচি। তার ঠান্ডা শীতল স্পর্শ ক্রমেই জড়িয়ে ধরছে প্রতি পদক্ষেপ তার। যেন এখনও খাম্পা গেরিলারা ধেয়ে আসছে পেছেন পেছন। রুদ্ধশ্বাসে তবু যেন সে এগিয়ে চলেছে এক দিকচক্রবালের দিকে। সাথে সুপ্রিয়দা রয়েছেন অবশ্য। দুজনের মুখে কোনো কথা নেই। যদিও চারু মজুমদার সেদিন মাধবীর মুখোমুখি হয়েছেন, সেই খবরটা সুপ্রিয়দা জানিয়েছেন চক্রবর্তীকে। মাধবীর মানসিক স্থিতির কথাও বলেছেন। কিন্তু চক্রবর্তী নিঃসঙ্কচিত্ত হতে পারছে না। তার বুকে ভয়, মনে লজ্জা, সমগ্র অন্তর জুড়ে গভীর অনুশোচনা। সদর দরজায় পা দিয়েই চক্রবর্তীর উৎসুক চোখ খুঁজে ফেরে সেই প্রিয় মুখ। ছন্দা ‘চক্রদা’ বলে ডাকতে ডাকতে ছুটে আসে। উৎকর্ণ মাধবী ভেতরের ঘরে। এক মহূর্তের জন্য কেঁপে ওঠে তার গভীর কালো দুটি চোখ। যে-চোখে গত হয়ে যাওয়া ছটি মাসের বিক্ষুব্ধ তৃষ্ণার জল। শরীরে চৈত্রের খরা। চারু মজুমদারের কম্পিত হাত সেদিন যখন মাধবীর মাথায় কালো চুল ছুঁয়ে স্পর্শ করেছিল অন্তর, তখন কী এক অদ্ভুত শান্ততা তাকে আশ্রয় করেছিল। ভেবেছিল চক্রবর্তীকে সে একজীবনের তরে ক্ষমা করে দিতে পারে এবার। কিন্তু তবু আজ এই ক্ষণে নির্বাক অভিমান হঠাৎ দল বেঁধে ছুটে আসছে। কেন? যেন নিজেরই ভেতরে শুনতে পাচ্ছে সে তরঙ্গায়িত লক্ষ সমুদ্রের বিক্ষুব্ধ হুঙ্কার! তার গভীর যাতনার রেশ ছড়িয়ে পড়ছে রক্তস্রোতে, শরীরের কানায় কানায় আবর্তন পুনরাবর্তনে যেন স্পষ্ট করে তুলেছে শঙ্খধ্বনি! কী এক অদ্ভুত আলোড়ন কম্পমান শিখার মতো প্রবিষ্ট হতে চলেছে আজ মাধবীর মনোজাগতিক সত্ত্বায়, যেখানে বেড়ে উঠছে নিজেরই অজান্তে চক্রবর্তীর আত্মার কোনো এক পরম সম্পদ।
[চলবে]

পূর্ববর্তী পর্ব ২২

http://www.teerandaz.com/%E0%A6%B6%E0%A6%BE%E0%A6%AA%E0%A6%B2%E0%A6%BE-%E0%A6%B8%E0%A6%AA%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BF%E0%A6%A4%E0%A6%BE-%E0%A6%B8%E0%A6%AE%E0%A7%8D%E0%A6%AA%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%95%E0%A6%9F-17/