শাপলা সপর্যিতা > সম্পর্কটি শুধুই জৈবিক >> ধারাবাহিক উপন্যাস [পর্ব ২৪]

0
223

পর্ব ২৪

মাধবী ঘরে আলো জ্বালেনি তখনো। বাইরে এত এত গোলমাল। চক্রবর্তীর ফিরে আসায় লোকজনের এত এত আনন্দধ্বনি শব্দ চিৎকার কিছুই মাধবীর যেন কানে ঢুকছে না। ঘর অন্ধকার। নির্বাক চারপাশ। কবরের নিস্তব্ধতা যেন অদ্ভুতভাবে গ্রাস করেছে এখানে সময়। চক্রবর্তীকে মাধবীর ঘরে নিয়ে এসে ছন্দা দেখে আলো নেভানো ঘর। কোনো কথা নেই তবু তার। এই মুহূর্তে সে মাধবীকে বিরক্ত করতে চাইছে না। খুব সন্তর্পণে ঘরের মৃদু আলোটা জ্বালিয়ে দিয়ে চলে যায়। চক্রবর্তী যখন ঘরে ঢোকে তখন মাধবী জানালায় মেলে দিয়েছে দুচোখ। বাইরে দারুণ জোৎস্না। ঘরের ভেতরেই যেন একটি আস্ত পৃথিবী আজ, পূর্ণিমার জোয়ারে উত্তাল। চক্রবর্তীর পদক্ষেপ অস্থির তথাপি ধীর। ভেতরে ভাঙছে সমুদ্রের উত্তাল ঢেউগুলো তবু বাইরে নেই তার কোনো গর্জন। কয়েক সেকেন্ডের জন্য পায়ের পাতায় যেন সেই বরফ শীতলতা। তবু তাতে জ্বালতে হয় আগুন। এগিয়ে এসে মাধবীর ঘাড়ে হাত রাখে। একটুকু কী কেঁপে উঠেছে মাধবী তার স্পর্শে! এক্ষুণি কী ফিরবে তার দিকে! আর স্বভাবসুলভ ক্রমাগত অস্থির বাক্যব্যয়ে পাগল করে তুলবে তাকে অভিযোগে অনুযোগে! তারপর তাকে না বলে চলে যাবার, দীর্ঘ সাতটি মাস তাকে না দেখে ভুলে থাকার অভিযোগে অভিমানে ঝাঁপিয়ে পড়বে বুকের ওপর! প্রগাঢ় চুম্বনে পাগল করে তুলবে রক্তের প্রবাহ! অস্থির প্রণয় পাগল দুটি মানবশরীর তখন এক পরমাত্মার ধ্যানে হবে নিবিষ্ট ক্ষণকাল। তারপর আসবে পরম প্রহর। যতনে ভালোবাসায় নৈবেদ্য নিবেদনে লাভ করবে নির্বাণ। এমনটিই তো হবার কথা।
কিন্তু না। আজ মাধবী অন্য আর কোনো মাধবী। অচঞ্চল, স্থির। বাইরে শীতলতর তার আকার। চোখে গভীরতর এক করুণ আলো। তার নিজের ভেতরে কম্পমান দুটি বিষণ্ন আত্মার খবর তখনো জানেনা চক্রবর্তী। ফিরে ঘুরে তাকায় সে চক্রবর্তীর দিকে। অদ্ভুত সে দৃষ্টি। কী যেন কী এক ঘোর, শুধু এক আবছায়া লেখা আছে সেখানে। এত চেনা চোখে এতটা অচেনা দৃষ্টি! সেই দৃষ্টিতে আজ কেন লেখা রয়েছে কোনো চিঠি! কী কথা তার মুখে উচ্চারণ করতে বারণ আজই! লিখে দিতে হয়েছে চোখের আলোতেই! সে চিঠির ভাষা জানে না চক্রবর্তী। কোনোদিন যেন পড়েনি সে চিঠির অক্ষর শব্দ বাক্য। পড়তে খানিক বিভ্রম হয় তাই। অস্পষ্ট লাগে সব। কিছু বলতে যেয়ে আড়ষ্ট হয়ে আসে জিভ। আরও আঁটোসাটো হয়ে আসে টেনে রাখা আবেগের রেশ। মনে হয় এর চেয়েও সহজ ছিল সীমান্তে কাটানো উদভ্রান্ত সময়। এর চেয়েও সহজ ছিল খাম্পা গেরিলাদের হাত থেকে পালিয়ে বেঁচে থাকা দিনরাতের প্রহরগুলো। আরও সহজ ছিল সেদিনের পালিয়ে যাওয়া। এতটা কঠিন হবে ফিরে আসার ক্ষণ এ যদি আগে জানতো! এর বেশি সময় নষ্ট করা ঠিক হবে কী- এইসব ভাবছে যখন তখনই মাধবীর কথা ফোটে মুখে;
– এ কী চেহারা হয়েছে তোমার?
যেন কত শত যুগ পার হয়েছে এখানে আসতে। এই কথা এই মিহি কণ্ঠস্বর এই ভুবনমোহন শব্দের ঝংকারে কানে কানে মধুবর্ষণ কবে যেন হয়েছিল তার শেষ! আজ কোথা থেকে এল এত দিন পর! সেই চিরচেনা কণ্ঠে, প্রবল মায়ার আলোড়ন। নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেনা চক্রবর্তী। হাঁটু মুড়ে বসে পড়ে। জড়িয়ে ধরে মাধবীর দু-পা। আর অমনি অদ্ভুত এক শিহরণে কেঁপে ওঠে। অস্থির আবেগে উঠে দাঁড়িয়ে মাধবীকে কোলে করে উঠিয়ে নিয়ে চলে বিছানায়। বিস্ময়ে হতবাক হয়ে বসে পড়ে মাধবীর শিওরের কাছে। ওর পেটের উপর হাত রেখে শিশুর মতো সরলতায় বলে ওঠে :
– এখানে, আমি? মানে আমার সন্তান!
মহূর্তে মাধবীর মুখের সব কালো মেঘগুলো যেন পাখা পায়। উড়ে চলে হাওয়ায় হাওয়ায়। একমুহূর্তে কিছুক্ষণ আগের সব আড়ষ্টতা ছেড়ে যায় দুজনকে। আনন্দে মোহিত দুটি প্রাণ যেন সব পুরানো ক্লেদের আবর্জনা ভুলে গিয়ে নতুন উদ্যমে সুর দিতে শুরু করে জীবনের গানে। কিন্তু শেষরক্ষা হয় না। চক্রবর্তী ফিরে আসার ঠিক এক মাসের মাথায় আট মাসের একটি মৃত সন্তান জন্ম দেয় মাধবী। কনসিভ করার পর থেকেই তার বাবার তাকে কিডন্যাপ করা, চক্রবর্তীর না বলে চীনে চলে যাওয়া, এসব কারণে একটানা অস্থির আর অনিশ্চিত জীবনের মাঝখানে পড়ে মাধবীর অত্যধিক স্নায়বিক চাপের কারণে গর্ভের সন্তানটি ঠিক মতো বেড়ে উঠতে পারেনি। পরিমাম মতো অক্সিজেন পায়নি। ফিটাল অবস্থায়ই অপরিণত একটি মাংসপিণ্ড হয়ে পড়ে রয়েছে গর্ভে। সেটা বুঝতে বুঝতেই গেছে সাত-আটটি মাস।
মৃত আর অপরিপক্ক সন্তান জন্মের পর মাধবী একেবারে বদলে যায়। এই বিপ্লব, বিপ্লবী জীবন, অস্থির ভাঙন, রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের লক্ষ্যে গেরিলা আক্রমণ আর বেশি দিন মেনে নিতে পারে না মাধবী। অন্যদিকে তখন ‘গ্রাম দিয়ে শহর ঘিরে ফেলা’র স্বপ্নে বিভোর শত শত শহুরে যুবক নারী পুরুষ দলে দলে এসে গ্রামগুলোতে জমায়েত হচ্ছে। এখানে সেখানে মরছে। মারছে। শহরের বুকে অ্যাকশন করছে যেসব যুবক তারা গ্রামে ফিরে আসতে শুরু করে। পার্টির মেয়েদের বিষয়ে তেমন কোনো নির্দেশ না থাকলেও তারা ঠিক করে যে তারাও শ্রমিক অঞ্চলে বা গ্রামে গিয়ে কৃষকের সাথে কাজ করবে। জোতদাররা একের পর এক নকশালদের হাতে খুন হচ্ছে। নারীরাও তখন খতম অভিযানেও অংশ নিতে শুরু করে দিয়েছে। ঠিক এমনি পর্যুদস্ত যখন রাষ্ট্র ক্ষমতা, তখনই রাষ্ট্র তার সমস্ত শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে বিপ্লব দমন করবার জন্য। খেটে খাওয়া গরিব মানুষের উপরও চলছে চরম পুলিশি নির্যাতন। লুট করে নিচ্ছে গরীবের শেষ সম্বল। জ্বালিয়ে দিচ্ছে ঘর। পায়ে পিষে গুলি করা ছাড়াও নানারকম শারীরিক অত্যাচারে আর ঘরের মা বোনদের সম্ভ্রম লুঠের মাধ্যমে কৃষক বিপ্লবীদের যাপিত জীবনকে করে তুলছে সর্বশান্ত। গ্রামে শহরে হাজার হাজার বিপ্লবী গ্রেফতার হচ্ছে। তবু এই শ্মশানের বুকে দাঁড়িয়েও সর্বহারা লড়াকু কৃষক বিপ্লবীরা এতটুকু ভীত নয়। তাদের শপথ, নিজেরা না খেটে অপরের খাটুনিকে চুরি করে যারা আজ টাকার পাহাড় গড়েছে, সমাজ থেকে এই আগাছাগুলোকে তুলে ফেলতেই হবে। এই একমাত্র বাঁচার পথ। তাই বীর লড়াকুরা যতই নিঃস্ব হচ্ছেন ততই কালবৈশাখির প্রচণ্ড তেজ নিয়ে জেগে উঠছেন আবার। যেসব বেড়াজাল তাদের এতকাল আটকে রেখেছিল সেগুলোকে ভেঙেচুড়ে এগিযে চলছেন তারা। যে মশাল তারা জ্বালিয়েছেন, যে-কোনো মূল্যে তা জ্বালিয়ে রাখবার শপথে দৃপ্ত আজ তারা। কোনো শ্রেণিশত্রুকে তারা রেহাই দেবেন না। বরং শয়তানের সমাধির উপরই গড়ে তুলবেন গরীবের রাজত্ব। অন্যদিকে নেতৃত্বের কেউ যেন ধরা না পড়েন, সেজন্য পার্টি কমরেডরা নিরাপদ জায়গায় শেল্টার নিচ্ছেন। তবু যখন তখন ধরা পড়ছেন কোনো কোনো নেতা। একরাতের মধ্যেই হয় খুন বা গুম করে ফেলে রাখা হচ্ছে ধরা পড়া বিপ্লবী নেতা কমরেডদের।
পার্টি তখন ডাক দিয়েছে আইনের মাধ্যমে নয় বরং জেল ভেঙে বেরিয়ে আসার। পুলিশও তখন মারমুখি। বিপ্লবীদের থানা লক-আপে কুখ্যাত পুলিশ অফিসার রুনু গুহ নিয়োগী নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। থানা লকআপে বিপ্লবীদের চুরুট দিয়ে কপালে মুখে ছ্যাকা দেয়া হতো। মলয়া ঘোষ নামের এক নারী নকশালিস্টকে যখন জেল কাস্টডিতে আনা হয় তখন তার সারা শরীর ক্ষত-বিক্ষত। তার হিপে কোনো মাংস ছিলনা। দগদগে ঘায়ের ভেতর থেকে হাড় বের হয়ে এসেছিল। একটি অ্যাকশনে ধরা পড়েন রাজশ্রী দাশগুপ্ত আর সঞ্জয় সেন। জেল ব্রেকের বাইরের স্কোয়াডে ছিল রাজশ্রী। পুলিশের এলোপাথারিতে ছোঁড়া গুলি রাজশ্রীর পায়ে লাগলে আহত হয়ে অ্যারেষ্ট হয় সে। সঞ্জয়েরও গায়ে গুলি লেগেছিল। ঠিক সময়ে হাসপাতালে নেয়া হলে সে বেঁচে যেত। কিন্তু হাসপাতালে না নিয়ে দীর্ঘক্ষণ তাকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ফেলে রাখা হয়। ক্রমাগত রক্তক্ষরণে মারা যায় সঞ্জয়। এরকম অবস্থায় চক্রবর্তী আর নিজের জীবন নিয়ে সংশয়ে পড়ে যায় মাধবী। একদিকে মৃত সন্তানের হাহাকার, যন্ত্রণা, অন্যদিকে স্বামীকে কাছে না পাওয়ায় তার বিচ্ছেদের রূপ, যখন তখন নিহত হবার আশঙ্কা, দিনে দিনে চরমতম রূপ ধারণ করতে থাকে। তার সবটা আঘাত এসে পড়ে চক্রবর্তীর ওপর। দিশেহারা চক্রবর্তী ভেবে পায় না কি করবে। কেমন করে সামাল দেবে এ ঝড়। একদিকে জোতদার, শোষক আর শ্রেণিশত্রুর রক্তে রক্তাক্ত প্রতিদিন গ্রাম আর অন্যদিকে বিপ্লবীদের লাল রক্তে রঞ্জিত সমগ্র ভারত। লাল আগুনের লেলিহান শিখায় ক্রমাগত পুড়ে ছাই হতে চলেছে শোষক আর শ্রেণিশত্রু। অন্যদিকে বিপ্লবীর দল। একদিকে সংসারে মাধবীর ক্রমান্বয়ে অসহিষ্ণু হয়ে ওঠা অন্যদিকে জেল অত্যাচারের ভয়ে এখানে সেখানে লুকিয়ে থাকা, অনিশ্চিত নিরাপত্তাহীন জীবন। সবে মিলে চক্রবর্তী অসহায় দিশেহারা। মাধবী আর দার্জিলিং থাকতে আগ্রহী নয়।
বছর চলে গেল। আবার নতুন বছর এলো। আবার বছর গেল। বিপ্লবের লাল পতাকা উড়তেই থাকলো। শ্রেণিশত্রু খতম হতেই থাকলো। বিপ্লবীর রক্তে গ্রামের পর গ্রাম লাল হতেই থাকলো। এভাবে আর কতদিন। মাধবীর ধৈর্য যখন চুড়ান্ত রূপ ধারণ করলো তখন একদিন সে বলে বসলো :
– আমাকে ঝাড়খণ্ডে রেখে আসো।
বিস্মিত চক্রবর্তী।
– কী বলছ?
– হ্যাঁ। আর এদিকের সবকিছু গুটিয়ে ফেলো।
– কী গুটিয়ে নেব? মাধবী, আমি বিপ্লবী। তুমি বিপ্লবীর স্ত্রী। তোমার মুখে এমন কথা!
– আর বিপ্লবে কাজ নেই। সাধারণ মানুষের সঙ্গে সম্পর্কহীন বিপ্লব যে কতটা সফল হবে, তা নিয়ে আমি সন্দিহান।
– কি বলছ কি এসব?
– হ্যাঁ। তোমাদের বিপ্লবের সাথে সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততা নেই। এভাবে জনবিচ্ছিন্ন একটি বিপ্লবের ফরম্যাট কতটা সফল হয়ে উঠবে, সেটা আমার জানা নেই। আর এই ভূভারতে ভিন্ন সংস্কৃতির চীন থেকে আমদানি করা ফর্মুলায় শ্রেণিশত্রু খতম করে তোমরা রাষ্ট্রযন্ত্র আদৌ দখল করতে পারবে বলে আমি মনে করি না।
মাধবীর কথাগুলো চক্রবর্তীর ভেতরে খুব বড় একটা ঝড় তুলে দেয়। সত্যিই তখন কোণঠাসা পার্টি। পার্টির ভেতরে ভেতরে ঘুণপোকাদের মারাত্মক দংশন আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। চারু মজুমদার জেলে জখম নিয়ে আর বয়সের ভারে ক্রমান্বয়ে ন্যূব্জ। দলের ভেতরে আবার মুখোশপড়া কিছু সংশোধনবাদীর সক্রিয় আনাগোনা বাড়ছে। ভুল সংবাদ উপস্থাপন, নেতার ফুসফুসের ক্যান্সার ক্রমাগত অবনতির দিকে যাওয়া- সব মিলিয়ে বিপ্লবের মাঝামাঝি এই সময়টার অবস্থা যে খুব ভালো নয়, শুধু চক্রবর্তী নয়, অনেকেই সেটা বুঝতে পারছে। কিন্তু…হঠাৎ ভাবনার জালটা ছিন্ন হয় মাধবীর কথায়।
– দিন ঠিক করো। আমাকে ঝাড়খণ্ডে রেখে আসো। তারপর পার্টির যা কিছু আছে গুটিয়ে ফেলো। আমি বাংলাদেশে যাব।
এবার মাথায় বাজ পড়ার মতো অবস্থা চক্রবর্তীর।
– কি বললে? বাংলাদেশে যাবে?
– হ্যাঁ, বাংলাদেশে যাব।
[চলবে]