শাপলা সপর্যিতা > সম্পর্কটি শুধুই জৈবিক >> ধারাবাহিক উপন্যাস [পর্ব ২৬]

0
383

পর্ব ২৬

পূর্ব বাংলায় তখন চলছে আইয়ুব খানের তীব্র দমন-নীতি। কিন্তু তাকে মোকাবিলা করার মতো দল পাকিস্তানে ছিলনা। কারণ রাজনৈতিক মতাদর্শ আর দফার প্রশ্নে দ্বিধাবিভক্তি প্রকট আকর ধারণ করেছিল। তব ভাষাকে কেন্দ্র করে বায়ান্ন সাল থেকে যে ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তা কখনো থেমে থেমে কখনো দুর্বার গতিতে চলছিল। বায়ান্নর পর সামরিক শাসনবিরোধী প্রথম জাগরণ ঘটায় ছাত্ররা ১৯৬২ সালে। এরপর প্রতিটি মাস প্রতিটি বছর এমন অবস্থার সৃষ্টি হতে থাকে যে, কোনো না কোনো বিষয় নিয়ে ছাত্রদের রাজপথে নামতেই হচ্ছিল। ১৯৬৬ সালে ছয়দফার প্রশ্নে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ দ্বিধা বিভক্ত হয়ে পড়ে। তারও আগে ১৯৬৩ সালে ভাসানী-আইয়ু্ব গোপন বৈঠকের পর থেকে মাওলানা আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে তীব্র অনীহা প্রকাশ করতে থাকেন। ৬ দফার পাশাপাশি ন্যাপ ১৪ দফা কর্মসূচি উত্থাপন করলেও আন্দোলন নিয়ে বেশিদূর এগুতে পারেনি। শুধু ন্যাপ ভাসানী নয়, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন), শ্রমিক ফেডারেশন, এমনকি চীনপন্থি কমিউনিস্ট পার্টি এবং এর বিভিন্ন উপদল ‘ডোন্ট ডিসটার্ব আইয়ুব’ নীতিতে যখন অটল, মনি সিংহ, খোকা রায়ের নেতৃত্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ, এ দলের সকল নেতাই যখন জেলে, চীনপন্থি কমিউনিস্ট পার্টির নেতা- হক-তোয়াহা, মতিন-আলাউদ্দিন, দেবেন-বাশার এরা আত্মগোপনে। এদিকে ১৯৫৮ সালে সামরিক আইন জারির পর থেকে শেখ মুজিবুর রহমান, তফাজ্জল হোসেন মানিক মিঞা, তাজউদ্দিন আহমদ, শেখ ফজলুল হক মনি, মণি সিংহ, সত্যেন সেন, অজয় রায়, রতন সেন, আশু ভরদ্বাজ, মোহাম্মদ ফরহাদ, মৃণাল বারুরী, অমল সেন, আবদুল হক, নগেন সরকার, কাজী জাফর, রনেশ মৈত্রের মতো নেতারা হয় কারারুদ্ধ, না হয় গ্রেফতারি পরওয়ানা মাথায় নিয়ে ঘুরছেন। কিন্তু নভেম্বর ২৯ থেকে পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তপ্ত হতে থাকে। সাত ডিসেম্বর নীলক্ষেতে মারমুখি জনতাকে দমন করতে পুলিশ গুলি চালায়। দুজন কর্মচারী তাতে নিহত হয়। খবরটি শহরে প্রচারিত হবার সাথে সাথে বিভিন্ন জায়গায় দফায় দফায় সংঘর্ষ চলতে থাকে। তিনজন নিহত, অর্ধ শতাধিক আহত, পাঁচ শতাধিক গ্রেফতার হলে পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করে। সংসদ অধিবেশনে শুরু হয় তীব্র বিতর্ক। ফলাফল…ঊনিশ শত ঊনসত্তর সাল। পূর্ব পাকিস্তানের রাজপথ সংক্ষুব্ধ। বিক্ষুব্ধ জনগণ। উত্তাল সমগ্র পূর্ব পাকিস্তান। ২৪ জানুয়ারি থেকে ছাত্র শ্রমিক কর্মজীবী সাধারণ জনগণ রুদ্ররোষে নেমে পড়ে রাজপথে। হরতাল সফল করার আহ্বানে সামিল হয় পূর্ব পাকিস্তানের সব শ্রেণির সাধারণ মানুষ। আর সচিবালয়ের সামনে পাখির মতো গুলি করে মারা হয় ছাত্র রুস্তম আলী এবং নবকুমার ইন্সটিটিউটের স্কুল-বালক কিশোর মতিউরকে। পূর্ব পাকিস্তানের জনতা তখন প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ, উন্মত্ত, লড়াকু। লাখ লাখ মানুষ তখন পল্টনে দুই শহীদের লাশ নিয়ে উন্মত্ত, ক্রুদ্ধ এক জমায়েতে জড়ো হয়। ভয়ঙ্কর উচ্ছৃঙ্খল এক উত্তপ্ত পরিস্থিতির মোকাবেলার জন্য গভর্নর হাউজে সামরিক বাহিনী প্রস্তুতি নেয়। কামান মেশিনগান তাক করে রাখা হয় জনতার দিকে। মূল আন্দোলনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে যে-কোনো সময় বেধে যেতে পারে প্রলয়ঙ্করী যুদ্ধ। ভীত সন্ত্রস্ত্র রাজনীতিবিদরাও। কী করে নিয়ন্ত্রণ করবেন জনতার রুদ্ররোষ আর বিক্ষুব্ধ স্রোতস্বীনীতুল্য তীব্র প্রতিবাকে। প্রতিশোধের আগুনে সবকিছু জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে ফেলবে যেন বিক্ষুব্ধ বাঙালিরা।
সমগ্র পূর্ব পাকিস্তান যখন চিন্তিত, কী করে এই রক্তাক্ত বিয়োগান্তক ঘটনায় পাগলপ্রায় জনগণকে সামাল দেয়া যায়, তখনই মসজিদ থেকে শহীদের জানাজার ঘোষণা দিয়ে এবং রূহের মাগফেরাতের জন্য দোয়ার আহ্বান জানিয়ে শান্ত করা হয় জনগণকে। ২৫ ফেব্রয়ারি ডাকা হয় পরবর্তী হরতাল। কিন্তু শান্ত না হোক আপাত স্থির হয়ে আসা জনগণকে আবার অশান্ত করে তোলে পাকিস্তান সরকার। বেতার ও টেলিভিশনে পূর্ব ঘোষণা না দেয়া অবধি গভর্নর মোনায়েম খান সন্ধ্যা পর্যন্ত লাগাতার কারফিউ জারি করেন। শহরের নিয়ন্ত্রণভার সেনাবাহিনী আর ইপিআরের উপর ন্যস্ত করা হয়। নির্বিচারে আবার শুরু হয় গুলি। আনোয়ারা বেগম নামে একজন নারী পুলিশের গুলিতে নিহত হলে পরিস্থিতি আবার উত্তপ্ত হতে শুরু করে। আইয়ুব খান কিছুটা নমনীয় হয়ে আসেন। তিনি আলাপ আলোচনার প্রস্তাব দেন। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান, ওয়ালী খান, জুলফিকার আলী ভুট্টোসহ সকল রাজবন্দীকে জেলে রেখে এ ধরনের আলোচনাকে প্রত্যাখ্যান করে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। পরিস্থিতি সামাল দিতে আইয়ুব খান পূর্ব পাকিস্তানে আসেন ৬ ফেব্রুয়ারি। ‘আইয়ুব ফিরে যাও’ পোস্টরে ছেয়ে যায় ঢাকা শহরের দেয়াল আর রাজপথ। আইয়ুব-বিরোধী স্লোগানে স্নোগানে তখন মুখর পূর্ব পাকিস্তান। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কালো পতাকা উড়ছে। সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা নেমে আসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন তৈরি কলাভবনে। সমাবেশে সকল রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি দাবি করা হয়। পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খানের পদত্যাগ দাবি করে ছাত্ররা। আইয়ুব নগরের নাম শেরেবাংলা নগর, আইয়ুব গেটের নাম নিহত আসাদের নামে আসাদ গেট রাখার প্রস্তাব করা হয়। কিন্তু ১২ ফেব্রুয়ারি ফিরে যাবার সময় আইয়ুব খান আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করা হবে না বলে জানিয়ে যান। একই মাসে ঢাকা সেনানিবাসে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হককে সেনানিবাসে হত্যা করা হয়। পালাতে গিয়ে ক্রসফায়ারে পড়ে পুলিশের গুলিতে নিহত হন জহুরুল হক, এই ঘটনা ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্র-জনতা আবার ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। বেপরোয়া হয়ে ওঠে সমস্ত পূর্ব বাংলা। আর তার চেয়েও বেপরোয়া তখন পশ্চিম পাকিস্তান, পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে পর্যুদস্ত করার জন্য মরিয়া। জনগণ ঢাকা নগরীর নানান স্থানে- সরকারি বাসভবনে, মন্ত্রীদের প্রাদেশিক ভবনে এবং আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিচারকের বাসভবনে আগুন লাগিয়ে দেয়। রাজশাহীতে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। ছাত্ররা তা ভঙ্গ করতে যখন প্রস্তুত, তাদের শান্ত করার জন্য এগিয়ে আসেন প্রিয় শিক্ষক ড. জোহা।
-প্রিয় ছাত্ররা আমার, কথা শোনো।
একজন ছাত্রনেতা উত্তর দেয় :
-আপনি সরে যান স্যার। আমাদের মিছিল নিয়ে বের হতে দিন।
-১৪৪ ধারা জারি রয়েছে। তোমরা এভাবে বের হয়োনা রাজপথে।
-আমরা ১৪৪ ধারা ভাঙবো স্যার।
-না, ফিরে যাও।
-সরে দাঁড়ান স্যার। আপনি না সরে দাঁড়ালে মিছিল বের হতে পারছে না।
-প্রাণপ্রিয় ছেলেরা, প্রাণ রক্ষা করে বিপদের মোকাবিলা করতে হবে। তোমরা ছাড়া এ জাতি কার ওপর ভরসা করবে। এভাবে প্রাণ দিওনা। মিছিল নিয়ে বের হলেই গুলি করবে। তোমরা কী দেখতে পাচ্ছ না সেনাবাহিনী প্রস্তুত? এই সরকারের কোনো ন্যায়নীতি মায়া-দয়া নেই আমাদের উপর। যতই প্রাণ নেবে ততই ভাববে আমাদের শক্তিক্ষয় করতে পেরেছে। কেন বুঝতে পারছ না? শান্ত হও। অকারণে প্রাণসংহারের সুযোগ করে দিওনা ওদের, আমি বলছি – ফিরে যাও।
এই ধরনের কথাবার্তা বলে ছেলেদের শান্ত করে যখন তিনি ফিরে আসছেন, তখন তাঁর গতিরোধ করে দাঁড়ায় একজন পাকিস্তানি সেনা।
-ঠ্যারো। তুম কৌন হো?
-ম্যায় ড: জোহা।
একজনকে ঈশারা করে পাকসেনা। কেউ কিছু বুঝে উঠবার আগেই বেয়োনেট ঢুকিয়ে দেয় ড. জোহার পেটে। এফোঁড়-ওফোঁড় করে পিঠ দিয়ে বের হয়ে আসে বেয়োনেট। বার তিনেক। তাতেও  সন্তুষ্ট নয়। ড. জোহার পড়ে থাকা দেহটাকে বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে ফিরে যায় সেনাবাহিনী। মুহূর্তে খবরটা রাষ্ট্র হয়ে যায়। ঢাকাতে সে খবর পৌঁছায় বাতাসেরও আগে। উত্তাল জনরোষের মুখে জারি করা হয় সান্ধ্য আইন। পুলিশের গুলি উপেক্ষা করে সাধারণ মানুষ ঢাল হিসেবে ঢেউটিন নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়ে। রাতের অন্ধকারে কত কত লোক নিহত হয়েছে এমনি করে, তার কোনো হিসেব নেই। এরকম উত্তাল সময়েই মাধবীর মধ্যে আবার দেখা দেয় অস্থিরতা। মাধবীর গর্ভে এখন দ্বিতীয় সন্তান। মাধবী এখন অন্য রকম। একে তো চক্রবর্তীর জীবন শঙ্কা রয়েছে, তার উপর আগের বারের মতো তাকে একা ফেলে হারিয়ে যাবারও পুরানো ভয়টা কাজ করছে। এবার সে কোনো রিস্কই নেবে না। অনাগত সন্তানকে তার রক্ষা করতেই হবে। তা না হলে এবার নিজের কাছে তার নিজের আর কোনো ক্ষমা নেই। তাই মরিয়া এবার মাধবী। কলকাতাসহ সারা পশ্চিমবঙ্গে তখন ছাত্রবিক্ষোভ দানা বাঁধছে। কেন্দ্রীয় নেতারা আত্মগোপনে, জেলে, কোনো কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব না থাকায় ছাত্ররা দুঃসাহসিক ও রোমাঞ্চকর কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। মূর্তিভাঙা লাইব্রেরি পোড়ানো, এমনকি ব্যাংক ডাকাতিতেও জড়িয়ে পড়ছে কেউ কেউ। শুরু হয়ে গেছে তখন ছাত্রদের ত্যাগ বীরত্ব আর আদর্শের অপচয়। সুশীতল রায় চৌধুরী বাধ্য হয়ে কলম হাতে তুলে নিলেন। লিখলেন মূর্তিভাঙা ও স্কুল কলেজ পোড়ানোর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দলিল। মার্কসবাদী তাত্ত্বিক অসিত সেন সংবাদ পত্রে বিবৃতি দিলেন।
-শিক্ষায়তনে হামলা করে গান্ধীবাদ মুছে ফেলা যাবে না।
সকল খবর মাধবীকে ক্রমান্বয়ে অসাড় করে তুলছিল। চক্রবর্তীর সাথে বাকবিতণ্ডার ক্রম ঊর্ধ্বগতিকে লাগাম টানা আর সম্ভব হয়ে উঠছিল না যখন, সেরকম একদিন :
-কি পেয়েছ তুমি?
মাধবীর ক্ষিপ্রদৃষ্টির প্রক্ষেপ চুম্বকের মতো টেনে নেয় চক্রবর্তীর দৃষ্টি।
-কি হয়েছে বল?
-কী করছো তোমরা? এখন অব্দি কী করতে পেরেছে এই বিপ্লব? এই খতম, জ্বালাও পোড়াও? গেরিলা আক্রমণ?
-তুমি ক্ষিপ্ত হলে কেন হঠাৎ?
বলে মাধবীকে শান্ত করার জন্য চক্রবর্তী তার মাথায় হাত রাখতে গেলে হাতটা এক ঝটকায় সরিয়ে দেয় মাধবী।
-কিছু জোতদারকে খুন-খতম, এখানে-সেখানে অস্ত্র বারুদের ব্যাপক ব্যবহার, ধ্বংস রক্তারক্তি, অসংখ্য যুবক খুন, তারপরও কি পেরেছো রাষ্ট্রযন্ত্রকে দখলে নিতে? শ্রেণিশত্রু নিশ্চিহ্ন করতে পেরেছ তোমরা? বল আমাকে?
-মাধবী, এ বিপ্লব আমূল নাড়া দিয়েছে দেশের রাষ্ট্রযন্ত্র আর পুরোনো বুর্জোয়া চিন্তাভাবনায়। ভারতের রাজনীতিতে এই বিপ্লব যে শিক্ষা দিচ্ছে, তা ইতিহাসে নথিভুক্ত হয়ে থাকবেই।
-বাহ। বেশ।
মাধবীর কথায় তীব্র শ্লেষ মেশানো। আর সেই বিষের বিন্দু চক্রবর্তীর রক্তস্রোতে মারাত্মক বিষক্রিয়ার সঞ্চার করতে থাকে ক্রমান্বয়ে। ঠিক তখনই মোক্ষম আঘাতটা হানে মাধবী। চক্রবর্তীকে হাত ধরে টেনে নিয়ে দাঁড় করা ছন্দার ঘরের লাইফ লং আয়নার সামনে। চক্রবর্তীর প্রতিবিম্বের দিকে ঠিক বুকের মাঝখানটাতে তর্জনী ঠেকিয়ে প্রশ্ন করে :
-তাকাও নিজের দিকে। তারপর বল, এ কে?
-মাধবী!
বিস্মিত চক্রবর্তী।
-কোথা থেকে এসেছ তুমি। তোমার দেশের নাম কী? বল আমাকে।
এতক্ষণে চক্রবর্তী বুঝতে পারে মাধবীর লক্ষ্য। মাথা নিচু করে বলে :
-পূর্ব বাংলা।
-তাহলে এবার বল আমাকে, তোমার সেই পূর্ব বাংলা এখন কীরকম ভাবে বেঁচে আছে? এখানে ভারতের রাজনীতিকে শিক্ষা দিচ্ছ। নথিভুক্ত করছ বিপ্লব। এখানে-সেখানে প্রাণ দিচ্ছ, শ্রেণিশত্রু খতম করছ। বেশ, বেশ। আর ওদিকে পড়ে পড়ে কুকুরের মতো মরছে কারা? তার কী হবে? নেতারা কোথায় তোমার! হয় জ্বেলে মরছে, নয়তো গুম। নয়তো আত্মগোপনে। খুন, এই তো তোমাদের বিপ্লবের ফলাফল।
-বিপ্লব এখনো শেষ হয়নি মাধবী।
-তা ঠিক বলেছ। এখনো তো কমরেড চারু মজুমদার ধরা পড়েননি। আত্মগোপনে আছেন। কিন্তু তাতেই উদভ্রান্ত তার পার্টিলাইন। আর যদি ধরা পড়েন, তখন কী হবে তোমাদের বিপ্লবের? সেটা একবার ভেবে দেখেছ? নাকি এখনো ভারতের রাষ্ট্রযন্ত্র দখলের জন্য নতুন কোনো অত্যাশ্চার্য ফর্মূলা রয়েছে তোমাদের বিপ্লবের, তুরুপের তাসের মতো?
-মাধবী!
-অবাক হবার আর কিছু বাকি নেই আমার। এ খবরও তো পাচ্ছি, পূর্ব বাংলায় ১১ দফা ঘোষণার পর বিক্ষেোভ করা মানুষকে গুলি করে মারা হয়েছে। ১৪৪ ধারা জারি আছে। আইয়ুব খান সেনাবাহিনী নামিয়ে দফায় দফায় পূর্ব বাংলার ছাত্র জনতাকে নিশ্চিহ্ন করতে নেমে পড়েছে। এসবের কিছুই তুমি জান না। তাহলে আমিও আর বিস্মিত হয়ে পারছি না।
-মাধবী, কি করতে বল তুমি আমাকে?
-তুমি ঠিক এই পরিস্থিতিতে অর্থাৎ বিপ্লবের এই অংশে এসে কী করবে আমাকে বলতে হবে?
চক্রবর্তী নিঃশব্দ। উত্তর খুঁজে বেড়াতে থাকে।
-আমি বলবো?
শূন্য দৃষ্টি মেলে তাকায় চক্রবর্তী মাধবীর দিকে। ভারাক্রান্ত বিব্রত বিভ্রান্ত বিপ্লবী মন নিজেকে কোনো শব্দ-বাক্যেই আর প্রবোধ দিতে পারে না। মাধবীই নিরবতা ভাঙে আবার।
-পড়ে পড়ে মরবে। আত্মগোপন করবে হঠাৎ আমাকে না জানিয়েই হয়তো। হয়তো জেলে গুম হয়ে যাবে। আমি আবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে দেব না, এটা কিন্তু মনে রেখ।
-মানে কী?
-আরও ভেঙে বলতে হবে?
-বলো।
-তোমার কারণে আমার সন্তানের মৃত্যুর পুনরাবৃত্তি আমি আর হতে দিতে পারবো না।
সেই বালক বেলার কথা চক্রবর্তীর তখন। জন্মমাত্র কচি-কচি হাঁসের ছানারা কী আনন্দে ঘুরে বেড়াতো। হঠাৎ আকাশে উড়তে থাকা কোনো ঈগলের শ্যেনদৃষ্টি মুহূর্তে ছিনিয়ে নিত অবাধ স্বাধীনতা। বুকের পাঁজরে ঢুকে পড়তো যেমন ঈগলের ঠোঁট। ছোঁ মেরে ঠোঁটে করে শূ্ন্যে উড়ে যেত দ্বিধাহীন শিকারী। বালক, উড়ে চলা ঈগলের ঠোঁটে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ দেখতে পেত হাঁসের ছানাটা শিকারীর ঠোঁট থেকে পড়ে গেছে নিচে। বনে-বাদারে খুঁজে খুঁজে কখনো যদিও বা ওই নিথর দেহের কাছে যেতে পারতো, কিন্তু দেখা যেত তার বুকের পাঁজরটি শূন্য। হৃদয় নামক বস্তুটা  ঈগলের ঠোঁটৈ রয়ে গেছে, আকাশে আকশে শূন্যে শূন্যে ভাসমান তখন হৃদয় তার। আজ ঠিক এমনি এক অনুভূতি হচ্ছে চক্রবর্তীর।
-কী বলবো আর। তুমি বাংলাদেশে ফিরে চলো। নিজের দেশের গণআন্দোলনে যদি অংশ নিয়ে মরেও যাও, সেটাও হবে বীরত্বের কাজ। অহংকার করার মতো একটা ব্যাপার। আমার সন্তানকে আমি বলতে পারবো তার বাবা দেশের স্বাধীনতা-যুদ্ধে শহীদ হয়েছে।
তখন শূন্য সকল ভার। তীব্র ঘনঘোর উন্মনা আকাশ। কালো মেঘ অস্থির, তিষ্ঠোতে পারেনা ক্ষণকাল, উড়ে চলে হাওয়ায় হাওয়ায় আকাশের কোণে কোণে দিশাহীন অনির্দিষ্ট গন্তব্যে জলহীন…
[চলবে]
এই উপন্যাসের পূর্ববর্তী পর্ব (২৫) পড়ুন এই লিংকে ক্লিক করে

http://www.teerandaz.com/%E0%A6%B6%E0%A6%BE%E0%A6%AA%E0%A6%B2%E0%A6%BE-%E0%A6%B8%E0%A6%AA%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BF%E0%A6%A4%E0%A6%BE-%E0%A6%B8%E0%A6%AE%E0%A7%8D%E0%A6%AA%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%95%E0%A6%9F-20/