শাপলা সপর্যিতা > সম্পর্কটি শুধুই জৈবিক >> ধারাবাহিক উপন্যাস [পর্ব ২৭]

0
265

পর্ব ২৭

“এক মহান বিপ্লবীর করুণ মৃত্যুর রক্তে যখন স্নাত হতে চলেছে রাতের শেষ প্রহরে জন্ম নিতে থাকা নতুন একটি দিন, তখনই গড়ের ময়দানের এই জায়গাটিতে প্রতিদিনের মতো হাঁটতে হাঁটতে চলে এসেছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়ক উত্তম কুমার।”

শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালে লাহোরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিল ছয় দফা ঘোষণা করেন। তারপর থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মধ্যে তুমুল প্রত্যাশা তৈরি হয়। এর বাস্তবায়নে গণজাগরণ লক্ষ করা যায়। রাজনীতিবিদদের মধ্যে এবং শাসক মহলে এটি মারাত্মক আলোড়ন সৃষ্টি করে। কারণ পূর্ব পাকিস্তানের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানের সাজানো আগ্রাসন, শোষণ, অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশকে পর্যুদস্ত করা আর নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রকাশিত ছয় দফা বুঝিয়ে দেয়, শোষকের নীলনকশা পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ বুঝে ফেলেছে। লাহোরে শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফা পেশ করে দেশে ফিরে এসে আওয়ামী লীগ নেতাদের বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি আর প্রবীণ নেতাদের উপর ভরসা রাখতে পারছেন না। কারণ ভেতরে ভেতরে বেশিরভাগ নেতাই পাকিস্তানপন্থী, এটাই তার উপলব্ধি। তিনি বাসভবনে ডাকেন ছাত্রলীগ নেতাদের। প্রবীণ নেতাদের উপর ভরসা হারানোর কথা প্রকাশ করে জেলায় জেলায় দায়িত্ব গ্রহণের জন্য তরুণ নেতাদের নেতৃত্ব গ্রহণের নির্দেশ দেন। তারপর থেকে শুরু হয় ছয় দফার ব্যপক প্রচার। ভাসানী ন্যাপ, চীনপন্থি কমিউনিস্ট গ্রুপ আর ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন) ছয় দফাকে আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) মদদপুষ্ট বলে বয়কট করে। তারা মনে করে আইয়ুব সরকারকে বিপাকে ফেলে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ হওয়াই ছিল এর লক্ষ্য। কিন্তু ছয় দফা ঘোষণার পরপরই এর সমর্থনে সারা পূর্ব পাকিস্তানে হরতাল ডাকা হয়। পূর্ব পাকিস্তানের শ্রমিকরাও হরতালের সমর্থনে রাজপথে নেমে পড়ে। আইয়ুব সরকারের ভিত নড়ে ওঠে। হরতালের সময় ছাত্রজনতার ওপর সরকার গুণ্ডা লেলিয়ে দেয়। মিছিলে গুলি চলে। নিহত হয় ছয় জন ছাত্র ও সাধারণ মানুষ। আহত হয় বহুলোক। সভা সমাবেশের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। কিন্তু এই হরতালের সফলতার ভেতর দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে ছয় দফার উপর জনগণের আস্থা অর্জন করা সম্ভব হয়েছিল, বোঝা যায়। হরতালের খবর সারাদেশে ফলাও করে প্রকাশ করে দৈনিক ইত্তেফাক। এর ফলে পাকিস্তান প্রতিরক্ষা আইনে গ্রেফতার করা হয় ইত্তেফাক-সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিঞাকে। ছয় দফার প্রতি জনগণের আস্থা প্রকাশ আর শিক্ষিত সুধী মহলে তার গ্রহণযোগ্যতাসহ গোয়েন্দা রিপোর্টের ভিত্তিতে আইয়ুব সরকার বুঝে যায় তার ক্ষমতা পূর্ব পাকিস্তানে টালমাটাল। শুরু হয় নতুন চাল। পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকার প্রকাশ করে যে সশস্ত্র গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণার চেষ্টাকে পাকিস্তান সরকার ব্যর্থ করে দিয়েছে। এই পরিকল্পনার মূল হোতা শেখ মুজিবুর রহমান। মুজিবকে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় গ্রেফতার করা হয়। অভিযোগ আনা হয়, ভারতের আগরতলায় ভারতীয় সেনাবাহিনীর লে. কর্ণেল মিশ্র ও মেজর মেননের সাথে শেখ মুজিবুর রহমান দেখা করেছিলেন। এই মিথ্যে সাজানো ঘটনাকেই পাকিস্তান সরকার আগরতলা ষড়যন্ত্র নাম দিয়ে প্রচার-প্রচারণা চালাতে থাকে। বলা হয়, পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণার জন্য প্রচুর অস্ত্র সংগ্রহের উদ্দেশ্যে শেখ মুজিব আগরতলায় বসে পাকিস্তানের অখণ্ডতার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছেন। পাকিস্তানি গোয়েন্দাদের হাতে এই ষড়যন্ত্র সংক্রান্ত প্রচুর প্রমাণ-তথ্য-দলিল আছে। পাকিস্তানি শাসকরা ঘটনাটিকে ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ আখ্যা দিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানসহ আরও ২৮ জনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরওয়ানা জারি করে। ১৭ জানুয়ারি ছয় দফাকেন্দ্রিক রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা থেকে শেখ মুজিবুর রহমানকে নির্দোষ খালাস দেয়া হয়। কিন্তু পরদিন ১৮ জেল থেকে বেরুবার সময় আবার গেটেই সামরিক বিধির আওতায় তাঁকে গ্রেফতার করা হয়।
কুর্মিটোলা সেনানিবাসে শুরু হয় শেখ মুজিবের বিচার কাজ। কঠোর গোপনীয়তার প্রহসনমূলক বিচারকাজ চলতে থাকে। কিন্তু দেশি-বিদেশী সাংবাদিক ও প্রতিনিধিদের সামনে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরোপ করেও সরকার শেষরক্ষা করতে পারেনি। পাকিস্তানি সরকার ভেবেছিল এসব করে জনগণের কাছে শেখ মুজিবকে হেয় করে জনরোষ দমানো যাবে। জনগণ শেখ মুজিবের উপর রূষ্ট হয়ে উঠবে। কিন্তু ঘটনার স্রোত উল্টো দিকে ঘুরে গেল। প্রতিদিন সংবাদপত্রের পাতায় শেখ মুজিবের জেরা পড়তে পড়তে সাধারণ মানুষ সরকারের উপর ক্ষুব্ধ, অধৈর্য আর চরম বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠলো। জনমনে ধিকিধিকি করে জ্বলতে থাকা আগুনের স্ফুলিঙ্গ উদভ্রান্ত জ্বলন্ত লেলিহান শিখার মতো প্রজ্জলিত হতে শুরু করলো। জগন্নাথ কলেজের ছাত্রদের ডাকা হরতাল সফলভাবে পালিত হলো। মিছিলের পর মিছিলে রাজবন্দি শেখ মুজিবুর রহমানসহ সকল রাজবন্দির মুক্তির দাবিতে স্নোগানে স্নোগানে রাজপথ প্রকম্পিত হলো। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীনতার পথে আরও একধাপ এগিয়ে দিল। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় একটানা ধরপাকড় নির্যাতনের কারণে ছাত্রলীগের অবস্থা সংকটে পড়লো। ছয় দফা নিয়ে সব দলের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হলো না। ফলে পূর্ব পাকিস্তানের সায়ত্বশাসনের জন্য যে সম্মিলিত্ একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্মের দরকার ছিল, তা গঠন করা সত্যিই কঠিণ হয়ে দাঁড়ালো। তবু ঐতিহাসিক প্রয়োজনে দলগুলো ঐক্যবধ্য হবার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলো। সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতারা ছয় দফাকে অন্তর্ভুক্ত করে এগারো দফা প্রণয়ন করলো। ডাকসু কার্যালয়ে সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে জনসাধারণের মাঝে প্রকাশ করা হয় ১১ দফা। এতো বলা হলো, বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শায়ত্বশাসন দিতে হবে, কলেজগুলোতে প্রাদেশিকীকরণ বাদ দিয়ে শিক্ষা সংকোচন নীতি পরিহার করতে হবে, প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটে প্রত্যক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে, রাজনৈতিক স্বাধীনতা, ব্যক্তি স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা দিতে হবে, দৈনিক ইত্তেফাকের উপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে, আইন পরিষদের ক্ষমতা হবে সার্বভৌম। পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পৃথক মুদ্রানীতি প্রণয়ন করতে হবে, শাসনতন্ত্রে এমন ব্যবস্থা থাকতে হবে যাতে পূর্ব পাকিস্তানের মুদ্রা পশ্চিম পাকিস্তানে পাচার হতে না পারে, সকল প্রকার ট্যাক্স খাজনা করধার্য ও কর আদায়ের সকল ক্ষমতা আঞ্চলিক সরকারের হাতে থাকবে, প্রতিটি রাষ্ট্রের বাইরের দেশের সাথে ব্যবসা বাণিজ্যের আলাদা হিসাব থাকবে, এবং এসব ব্যবসার মাধ্যমে অর্জিত মুদ্রা অঙ্গরাষ্ট্রগুলোর হাতে থাকবে, পূর্ব পাকিস্তানে অস্ত্র কারখানা নির্মাণ ও নৌবাহিনীর সদর দপ্তর স্থাপন করতে হবে, পূর্ব পাকিস্তানকে রক্ষীবাহিনী (মিলিশিয়া) গঠনের ক্ষমতা দিতে হবে, কৃষকের উপর খাজনা ও ট্যাক্স কমাতে হবে, কৃষকের সব ঋণ মৌকুফ করে দিতে হবে, শ্রমিকের স্বার্থবিরোধী কালো আইন তুলে নিতে হবে, শ্রমিকের প্রাপ্য পারিশ্রমিক ও বোনাস দিতে হবে, শ্রমিককে ধর্মঘটের অধিকার ও ট্রেড ইউনিয়ন করার স্বাধীনতা দিতে হবে, পূর্ব পাকিস্তানের বন্যা-নিয়ন্ত্রণ ও জল বিতরণের সার্বিক ব্যবস্থা করতে হবে, জরুরি আইন নিরাপত্তা আইন ও অন্যান্য আইন প্রত্যাহার করতে হবে, সিয়েটো সেন্টো ও পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি বাতিল করে জোট বর্হিভূত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি চালু করতে হবে, দেশের বিভিন্ন কারাগারে আটক ছাত্র শ্রমিক কৃষক রাজনৈতিক কর্মী নেতাদের দ্রুত মুক্তি দিতে হবে, গ্রেফতারি পরোয়ানা ও হুলিয়া তুলে নিতে হবে এবং আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা তুলে নিতে হবে। এই ছিল ১১ দফার দাবি যা সমগ্র জাতিকে এক নতুন পথ দেখায়।
এই গণআন্দোলনের জোয়ারে টালমাটাল হয়ে পড়ে আইয়ুব খানে সিংহাসন। নিভে আসতে থাকে ক্ষমতার দম্ভ। প্রমাদ গুনতে শুরু করে সে। খানিকটা নমনীয় হয়ে আসে নিজের অস্তিত্বের সংকটক কাটিয়ে উঠতে। শেখ মুজিবুর রহমানসহ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সমস্ত আসামিকে মুক্তি দিয়ে কোনোমতে নিজের ক্ষমতাকে তখনকার মতো আঁকড়ে ধরে থাকার প্রচেষ্টায় মরিয়া হয়ে ওঠেন তিনি। জেল থেকে বের হয়েই শেখ মুজিব ঘোষণা করেন তিনি ১১ দফার সাথে একাত্মতা। শেখ মুজিবকে সংবর্ধনা দিতে জনতার ঢল নামে রেসকোর্স ময়দানে এবং এই জনসভায় বাংলার নায়ক শেখ মুজিবুর রহমানকে “বঙ্গবন্ধু” উপাধি দিয়ে জনগণ বরণ করে নেয় পূর্ব পাকিস্তানের দিশারী হিসেবে।
১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে ভারত ভাগের সাথে বাংলা ভাগের বিষয়টি তখনকার রাজনৈতিক অবস্থার তাৎক্ষণিক ধারাবাহিক পরিণতি। ঐক্যবদ্ধ বাঙালির জন্য সেটা ছিল মর্মন্তুদ ঘটনা। কিছু হিন্দু ও কিছু মুসলিম বাঙালি নেতার আত্মস্বার্থের মধ্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত বাংলা ভাগের ষড়যন্ত্র সফল হয়। ১৯৩৩ সালে একদল মুসলিম ছাত্র লন্ডনে চৌধুরী রহমত আলীর নেতৃত্বে পাকিস্তান শব্দটি তৈরি করে। পি অর্থে পাঞ্জাব, কে অর্থে কাশ্মির, এস অর্থে সিন্ধু, স্তান অর্থে বেলুচিস্থান, এভাবে পাশাপাশি অবস্থিত চারটি ভূখণ্ডের কিছু অক্ষর কিছু অংশবিশেষ নিয়ে যে পাকিস্তান শব্দটি তৈরি করা হয় তাতে বাংলা অন্তর্ভুক্ত ছিল না। ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল নিয়ে একটি সার্বভৌম দেশ গঠনের চিন্তা করা হয়। কিন্তু মুসলিম লীগের একদল নেতা হাজার মাইল দূরে অবস্থিত পূর্ব বাংলাকে পশ্চিম পাকিস্তানের অন্তর্ভূক্ত করার অভিপ্রায় গ্রহণ করে কেবল এখানে মুসলমানদের বসবাস বলে। সেদিন শুধুমাত্র ধর্মীয় কারণটিকে উপলক্ষ করে ভাষা সংস্কৃতি জীবনাচরণের মিল থাকা সত্ত্বেও এবং ভূখণ্ডগত সংলগ্নতা থাকার পরও পশ্চিম বাংলা থেকে পূর্ব বাংলাকে আলাদা করা হয়। কারণ এটাই যে পশ্চিম বাংলা হিন্দু অধ্যুষিত আর পূর্ব বাংলা মুসলিম অধ্যুষিত। এ কাজটি ছিল চরম অদূরদর্শী ভাবনা। পশ্চিমবঙ্গ, পূর্ববঙ্গ আর আসাম নিয়েই প্রতিষ্ঠিত হতে পারতো একটা স্বতন্ত্র দেশ। কিন্তু বিভাজনের ভাবনা থেকে পাকিস্তানের অংশ হয়ে গেল বাংলাদেশ। অজগরের মতো হা-নিয়ে পূর্ব বাংলাকে গিলতে শুরু করলো পশ্চিম পাকিস্তান। কিন্তু পূর্ব বাংলাকে হজম করতে পারলো না। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম হলো বাংলাদেশ রাষ্ট্রের।
কিন্তু অনেক আগেই, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন ভারতের মুসলিম নেতারা মুসলিম লীগের পাকিস্তান রাষ্ট্রগঠনের পরিকল্পনার বিরুদ্ধে রূখে দাঁড়িয়েছিলেন। তারা মনে করেছিলেন মুসলমানের সংখ্যা বিচারে যে রাষ্ট্র গঠিত হতে চলেছে, তা ভারতের মুসলমানদের জন্য চরম ক্ষতিকর হবে। এতে সমস্যা যত না মিটবে তার চেয়ে বাড়বে আরও বেশি। পাকিস্তান শব্দটির মধ্যে দিয়ে কিছু এলাকাকে শুদ্ধ (পাক) আর কিছু এলাকাকে যে অশুদ্ধ বলার ইঙ্গিত আছে, তা ইসলাম-বিরুদ্ধ। কিছু মুসলিম নেতা এও বলেছিলেন যে, এই শুচিতা সঙ্গে শুদ্ধতার সঙ্গে ব্রাক্ষ্মণ্যবাদের কোনো পার্থক্য নেই। মানুষ আর দেশকে শুচিশুদ্ধ আর কলুষিত- এই দুভাগে ভাগ করাটাই ভুল। এটা অন্যদের জন্য চরম অবমাননাকর, অনৈতিক। এ প্রসঙ্গে মাওলানা আবুল কালাম আজাদ বলেছিলেন :
গোটা ভারতই আমার ভূখণ্ড। আমি এর রাজনৈতিক আর অর্থনৈতিক জীবন গড়ে তোলা অংশীদার। একজন মুসলমান হিসেবে আমার এ অধিকার আমি কিছুতেই বিসর্জন দিতে রাজি নই। বাপ-দাদার কাছ থেকে যে সম্পদ আমি পেয়েছি, তা
ছেড়ে দিয়েই শুধু তার একটা টুকরো অংশ নিয়ে আমি খুশি থাকবো এটা নিশ্চিতভাবে কাপুরুষতা।
কিন্তু মুসলিম লীগের নেতারা এসব কথা কানে তোলেননি। এমনকি মুসলিম-প্রধান পূর্ব বাংলাকে আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষণার প্রস্তাবও তারা নকোচ করে দেন। তাই হাজার মাইলের ব্যবধানে পূর্ব বাংলাকে অন্তর্ভূক্ত করে যে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হলো ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট তার প্রথম গভর্নর হয়েছিলেন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। করাচি তার নিজ বাসভূমি না হওয়া সত্বেও করাচিকেই করা হয় পাকিস্তানের রাজধানী। এখানেও চরম অনৈতিক এক চাল চেলে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনঅধ্যুষিত ঢাকাকে যেখানে রাজধানী করার কথা, সেখানে করাচিকে পাকিস্তানের রাজধানী করা হল। এখান থেকেই শুরু হলো অসংগতির যাত্রা। জিন্নার মৃত্যুর পর আইয়ুব খান পাকিস্তানের দায়িত্ব নিলে পাঞ্জাবে চলে গেল রাজধানী। এভাবে তিন তিনবার রাজধানী পরিবর্তনের মাধ্যমে কেন্দ্রের কোটি কোটি টাকা নষ্ট করা হলো। শুরু হলো পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতি ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠার কাল। শোষণ আর বঞ্চনা আর নিষ্পেষণ। ফলে ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, এরপর ৭ই মার্চের ভাষণের মধ্য দিয়ে পূর্ব পাকিস্তান, অর্থাৎ বাংলাদেশের স্বাধীনতার আন্দোলন।
ওদিকে পশ্চিম বাংলায় আত্মগোপন করে থাকা নেতা নেতৃদের তল্লাসে সারা পশ্চিমবঙ্গ উত্তাল। সরোজ দত্তের খোঁজে দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের বাড়িতে পুলিশ। পুলিশ ঠিকমতো চিনতে পারেনি প্রথমে সরোজ দত্তকে। দিনের পর দিন বসন্তরায় রোডের বাড়িটির পাশেই একটি বাড়িতে পুলিশ ছদ্মবেশে ভাড়া নিয়ে খবর সংগ্রহ করছিল। একদিন পুলিশ বাড়িতে ঢুকে সরোজ দত্তকে প্রশ্ন করলো :
-আপনার নাম?
-বীরেন রায়।
সরোজ দত্ত একবার দেবীপ্রসাদ আর একবার তার স্ত্রী মঞ্জুষার দিকে তাকান এমন ভাবে যে তারা যেন এই নামেই তাকে পুলিশের কাছে পরিচয় দেয়। পুলিশ দেবীপ্রসাদকে এক ঘরে আর সরোজ দত্তকে অন্য ঘরে নিয়ে যায়, যাতে কেউ কারো প্রশ্নের উত্তর শুনতে না পান। দেবীকে সরোজ দত্তের ছবি দেখিয়ে প্রশ্ন করা হয় :
-একে চেনেন?
-হ্যাঁ চিনি।
-কে বলুনতো?
-উনি সরোজ দত্ত। আমি ও সরোজ, দুজনেই অধ্যাপক। তাছাড়া আমার পিসতুতো জামাইবাবু যিনি হাওড়াতে থাকেন ইনি তার বন্ধু। মাঝে মাঝে আসতেন অবশ্য তিনি আমাদের এখানে।
সরোজ দত্তকে বাঁচাতে দেবীপ্রসাদ তখন মরিয়া। যা যা ভাবনায় আসছে বানিয়ে বলে চলেছেন। কারণ আত্মগোপনে থেকে চুল দাঁড়ির গজিয়ে গেছে বলে সরোজ দত্তের আসল চেহারা পুলিশ ঠাহর করতে পারছে না। দেবীর কথা ধরেই প্রশ্ন করে পুলিশ :
-প্রায় প্রায়ই আসতেন? কবে শেষ এসেছিলেন?
-ওইতো কিছু দিন আগে।
দেবী তারপর গিয়ে দাঁড়ালেন যে ঘরে সরোজ দত্তকে রেখেছে সেখানে। মঞ্জুষা আর দেবী দুজনেই দেখছেন একজন পুলিশ অফিসার সরোজ দত্তের সামনে বসে তার কানগুলো খুব ভালো করে দেখে ছবির সাথে মেলাচ্ছেন। সরোজ দত্ত ঘড়িটা বা হাতের কব্জির নিচের দিকে করে পরতেন। তাও মেলাচ্ছে। তার পিঠে কুঁজ নয়, কুঁজের মতো হালকা একটু উঁচু মতো ছিল। তাও মেলাচ্ছে পুলিশ। তারপর মঞ্জুষাকে প্রশ্ন করতে লাগলো :
-আপনি সত্যি বলুন।
-আমি সত্যি কথা বলছি।
-কিন্তু আপনার স্বামী তো সত্যি কথা বলছেন না। উনিও বলছেন না।
-আপনি সত্যি কথা বলছেন?
-হ্যাঁ।
-আপনি বলছেন ইনি আপনার মামা। তাহলে ওনার পৈতে নেই কেন?
বিব্রত মঞ্জুষা তখন বোকার মতো বললেন :
-ব্রাক্ষ্ণণ না হলে মামা হওয়া যায় না? আমার এক বোনতো খ্রিস্টান বিয়ে করেছে তাতে কী সে আর বোন রইলো না?
– হা হা হা হা হা হা।
পুলিশ অফিসারের অট্টহাসিতে দেবী আর মঞ্জুষার বাচ্চাটি কেমন যেন কেঁপে ওঠে। ওদেরও বুকে একটা চরম ভয়ের কাঁপন ধরে। তবে কী সরোজ দত্তকে ওরা আইডেন্টিফাই করে ফেলেছে? এমন একটা ভয় ওদের দুজনকে অক্টোপাসের পতো জড়িয়ে ধরে। তার শরীর হিম-শীতল, ঠান্ডায় আড়ষ্ট করে তুলছে নভেম্বর-ডিসেম্বরের হাওয়া। পুলিশ অফিসারের তীক্ষ্ণ কটাক্ষ মঞ্জুষার কানে প্রবেশ করে না। সে ঠাঁয় তাকিয়ে আছে সরোজ দত্তের দিকে।
-হা হা হা মিসেস দেবীপ্রসাদ। আপনি মিথ্যেটা ঠিক করে বলা এখনো শিখে ওঠেননি।
তারপর দেবীকে প্রশ্ন করে :
-আপনি বলুন। ইনি বীরেন রায় না সরোজ দত্ত?
জেরা একসময় শেষ হয়। দেবীপ্রসাদ আর সরোজ দত্তকে ভ্যানে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। রাত তিনটায় গাড়ি ছেড়ে যায়। প্রথমে টালিগঞ্জ থানার সামনে। তারপর লর্ড সিনহা রোডে। ঢুকেই প্যাসেজ দিয়ে ডানদিকের ঘরটাতে সরোজ দত্তকে আর অন্য ধারে দেবীকে নিয়ে আবার প্রশ্ন :
-সত্যি করে বলুন, ইনি সরোজ দত্ত?
বার বার করে প্রশ্ন করে আর অন্য ঘরের দিকে আসা যাওয়া করে। ঘন্টা দুই বাদে দেবীকে ছেড়ে দেয়।
-আপনি চলে যান।
-আমার মামা শশুর?
-তাকে ছেড়ে দিয়েছি।
ভোর চারটা সাড়ে চারটার দিকে মোহনবাগার টেন্টের পেছন দিক। মত্ত অবস্থায় পুলিশ অফিসাররা সরোজ দত্তকে ছেড়ে দিয়ে চলেন যেতে বলেন।
-চলুন। আপনাকে ছেড়ে দিলাম। আপনি এবার যেতে পারেন।
সরোজ দত্ত কিছু দূর হাঁটবার পরই তার পায়ে গুলি করা হলো। সরোজ দত্ত পড়ে গেলেন মাটিতে। একজন পুলিশ অফিসার টলতে টলতে গেলেন সরোজ দত্তের পড়ে যাওয়া শরীরের দিকে। এক কোপে ধারালো বিশাল ছুরি দিয়ে মাথা আলাদা করে ফেললেন। ফিনকি দিয়ে রক্তস্রোত বইলো। এক মহান বিপ্লবীর করুণ মৃত্যুর রক্তে যখন স্নাত হতে চলেছে রাতের শেষ প্রহরে জন্ম নিতে থাকা নতুন একটি দিন, তখনই গড়ের ময়দানের এই জায়গাটিতে প্রতিদিনের মতো হাঁটতে হাঁটতে চলে এসেছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়ক উত্তম কুমার।
[চলবে]

নিচের লিংকে পড়ুন পূর্ববর্তী পর্ব ২৬

http://www.teerandaz.com/%E0%A6%B6%E0%A6%BE%E0%A6%AA%E0%A6%B2%E0%A6%BE-%E0%A6%B8%E0%A6%AA%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BF%E0%A6%A4%E0%A6%BE-%E0%A6%B8%E0%A6%AE%E0%A7%8D%E0%A6%AA%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%95%E0%A6%9F-21/