শাপলা সপর্যিতা > সম্পর্কটি শুধুই জৈবিক >> ধারাবাহিক উপন্যাস [পর্ব ২৮]

0
274

পর্ব ২৮

রাতগুলো বিষণ্ন মনস্বীতার। দিনগুলোরই বা খোঁজ কোথায় রয়েছে কে জানে! এতটা অস্তিত্বহীন দিন রাতের অনুভব আজকাল! সূর্য উঠেছিল কবে যেন কোন ভোরে! মধ্যগগণে কখন এসেছে কখন গিয়েছে চলে অস্তে কে জানে! মেঘলোকে এক অদ্ভুত বেদনার প্রচ্ছদ এখনো জমে রয়েছে। ছায়াচ্ছন্নতায় গভীর অন্ধকার। বিমর্ষ লাগে পৃথিবীর মুখ। সে তো কখনো সন্তান চায়নি! নারীর ভেতরে যে কোমল মানুষ, গভীর প্রণয়িনী মন আর তারই অনুষঙ্গে জেগে ওঠা মাতৃত্বের বোধ – সে তো কবেই ভেসে গেছিল জলে। তবু এই ক্ষণিকের খেলা ছিল মনস্বীতার ভাগ্যযোগ! সে তো মরে গেছে কবেই। একজন নারী একজন মানুষ কখন যে সকলের অন্তরালে হয়েছে নিজেরই হন্তারক, কেউ জানেনি সে কথা। কাকে দোষ দেবে? কাবে বলবে হৃদয়ের ব্যথা? স্বামী নামে প্রভুমনসদৃশ এক মানুষের সাথে দিনরাত নিঃশব্দে যাপন। হতাহত যাতনার বিষে শরীর। নিয়ত ব্যক্তি আর ব্যক্তিত্বের সংঘর্ষে প্রাণপাত সম্ভব। কিন্তু প্রাণের স্পন্দন সেখানে অসম্ভব। প্রণয় ছাড়া কী আদতে কোনো সৃষ্টি সম্ভব! বুকের গভীরে একটি সন্তানের জন্ম না হলে, গভীর প্রণয়লব্ধ মন শরীর প্রার্থনায় আর আশীর্বাদে সিক্ত না হলে কী জেগে ওঠে কোনো উদ্ভিন্ন আলোক রেখা। জ্বালাতে কী পারে সে কোনো উজ্জ্বলতম শিখা! দিনরাত নিজের সাথে প্রতারণা, সমাজ সংসার প্রাত্যহিক জীবনের কালি কলঙ্ক সব নিজের ঘাড়ে বয়ে নিয়ে হৃদয়বৃত্তের আর সব সুকুমারকে কবেই তো জলাঞ্জলি দিয়েছে নিজেরই হাতে। যুদ্ধের মাঠে কেবলই রক্তপাত। ধার চকচকে সশস্ত্র নিয়ত প্রাণহরণ শরীরহরণ, দুঃসহবাস। দুর্বিসহ সময় মেপে মেপে যখন শুষে নিচ্ছিল জীবনের বাকি সব জল-রস-সুধা! সৃষ্টির জন্য চাই গভীর সবুজ, ঘন অরণ্য, প্রগাঢ় নদী, জল আর ঝরঝর বরষায় নিকোনো উঠোন। ছিল কী তেমন কিছু তার! তবু হঠাৎ কোনো এক অদ্ভুত যোগ মায়ায় মুখর করেছিল জীবন। যখন তখন ফুটেছিল ফুল। ঘ্রাণে উন্মুখর হয়েছিল কখন যে তার যুদ্ধবাজ জীবনের অলিগলি। যখন প্রথম জানতে পেরেছিল কেউ এসেছে। কেউ আসবে। একজন মানুষ তার নিজেরও হতে পারে, একজন মানুষ তার জীবন ভরিয়ে তুলতে পারে, কেউ তার সঙ্গে আসতে ব্যকুল সেদিন বিস্মিত মনস্বীতা পড়তে পারছিল না নিজেরই মনের ব্যকরণ। কী অনায়াসে না জানা ঘটনার নির্দিষ্ট অবশ্যম্ভাবী ফলাফলের কথা জানবার সাথে সাথে বলে দিয়েছিল, হ্যা এই সন্তানটি তার ইপ্সিত। বুকের গভীরে এত কান্না জমেছিল কবে তার! কোনো এক আকালের চৈত্রে হয়েছিল খরা। মাটি ফেটে চৌচির-বুঝতে পারেনি নিজেই কোনোদিন। প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যা পরিশ্রমে জানতে পারেনি তার কিছুই। তাই অপ্রেমে তুচ্ছতায় অবহেলায় অসংস্কৃতেও যে জীবনের আকার তাকে স্বীকার করতে এক সেকেন্ডও চিন্তা করতে হয়নি মনস্বীতার। ডাক্তারের প্রশ্নের উত্তরে সেদিন শত জনমের মাতৃত্বের বোধ বুঝি তাই এসে ভর করেছিল তার শরীরে মনে মাথায়। সন্তানটি তার ইপ্সিত এ কথা বলে দিতেই ফারুক কী বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল তার দিকে সে ছবিও চোখ বন্ধ করলেই ভেসে ওঠে আজও। আর ভেসে ওঠে জল ঝড়, বন্ধুর পথে যাত্রা, বিপদসংকুল ঝড়োবরষা দিনের সকালগুলো। অফিস যাবার তাড়া, সন্তানের জন্য নিজের জন্য আশ্রয়ের খোঁজে দিগ্ববিদিক জ্ঞানশূন্য। তবু শেষ রক্ষা হয়নি। এ ছাড়া আর কীই বা করার ছিল এই একা শূন্য মনস্বীতার! জানালায় চোখ মেলে দিয়ে খানিক স্বস্তি খোঁজে এই মহূর্তে মনস্বীতা। অক্টোবর নভেম্বরের আসি আসি শীতের আমেজে বেলা দ্বিপ্রহর তখন। অন্য সময় হলে হালকা কাঁথাটা গায়ে জড়িয়ে এমনি অলস বেলায় মনস্বীতার শুয়ে পড়তো। আলসে দিনের আবেশে সপ্তাহের পরিশ্রান্ত শরীর খানিক জুড়িয়ে নিয়ে তবেই রাতের ঘরকন্যায় মন দিতো। আজ অন্যরকম সব। দুটো বাড়ির মাঝখানে ছোট একটুখানি হাওয়া খেলবার অবকাশ। এরই মাঝে একচিলতে সোনামোড়ানো রোদ এসে পড়ে মনস্বীতার বিছানায়। আর সেই নরম কোমল রোদে হঠাৎ কী এক যাদুমন্ত্রেই বুঝি জীবন্ত হয়ে ওঠে তার আট মাসের মৃত সন্তানের কোমল শীতল শরীর! অদ্ভুত এক মায়ামন্ত্রবলে শবের দেহে নড়ে ওঠে প্রাণ। আড়ষ্ট পাথর চোখে টলমল করে ওঠে কালো নদীর জলের মতো ঠাণ্ডা তীক্ষ্ণ আলো! নরম রোদের আলোতে ঝরে ঝরে পড়ে তার হাসি, গালের টোল। হায়, সন্তানের মৃত শরীর এত ঠাণ্ডা এই নীরব কোমল রোদের আলোতেও তার ওম টের পাওয়া দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে। ঘরটা কেমন গুমোট লাগে মনস্বীতার। বাইরের ওইটুকু শান্তির দিকে একটানা তাকিয়ে থেকে থেকে কখন বেলা গেছে ধরে জানা নেই তার। সকলেই গেছে যার যার ঘরে ফিরে। ফারুক সকাল সকাল বেশ পরিপাঠি ছিমছাম হয়ে কোথায় বেড়িয়ে গেল মনস্বীতা রাখেনি সে খবর। শূন্য ঘর। শূন্য বিছানা। শূন্য মন। এত ব্যথা কোথা থেকে এসে ভার করে তোলে শরীর মন। অবশ বিবশ লাগে সব। এত যে যাতনার কাল পার করেছে কখনো তো এমন ভার লাগেনি নিজেকে। কত যে ব্যথায় ব্যথায় জীবন পার করেছে এতকাল, কই কখনো তো এতটা রক্তাক্ত মনে হয়নি নিজেকে। কোথায় যেন বয়ে চলে নীরবে ব্যথার এক সুগভীর নদী। তার জল কালো। উত্তুঙ্গ তার স্রোতের প্রবাহ। ভয়ঙ্কর তার বিষধর স্রোতের প্রকোপ। এ জীবনে আর এই বিষের নিকষ কালো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে কী! কোথায় কে আছে এই কালোয় জ্বালবে আলো। কাঁটাগুলো ধন্য করে ফুল ফোটাবে। নাকি বেদনায় বেদনায় বয়ে যাবে নির্লিপ্ত মহাকাল! সন্তানের মৃত্যু এত নীল! এতটা গভীরে তার ক্ষত!
-আহ হা…হা হা হা
চিৎকার করে কেঁদে ভেঙে পড়ে শুন্য ঘরে নিঃস্ব মনস্বীতার সকল যাতনার অবশেষ।
কলিং বেলের শব্দে চমকে ওঠে মনস্বীতা’
-এই সময় কে আসতে পারে আর? ফারুক ফেরত এসেছে মনে হয়। কোনোকিছু ফেলে গেছে হয়তো।
চোখ মুছে বাইরের দিকে পা বাড়ায়। আর বাইরে এসে দরজা খুলতেই থমকে দাঁড়ায়। সেই সৌম্যকান্তি রূপ, শান্ত অধীর তার চির মায়াময় আকার নিয়ে দাঁড়িয়েছেন এসে চোখের সামনে আবার। হঠাৎ একটা আলোর ঝলকের মতো খেলে যায় মনস্বীতার মনের গভীরে। জানে না কোন সে আলো। কী তার রূপ! দ্রুত হাতে দরজার পাল্লাটা সরিয়ে ভেতরে আসতে আওভান করে। চক্রবর্তী এসেছেন মনস্বীতার ঘরে। বসতে বসতে প্রশ্ন করেন
-কেমন আছেন? দুচারটি দিন আর খবর নিতে পারি নি আপনার। বাড়ি ভর্তি লোকজন ছিল। তাছাড়া সেদিন ফোন নম্বরটিও নেয়া হয়নি যে ফোন করবো।
মনস্বীতা তীব্র দৃষ্টির প্রক্ষেপ আজও চক্রবর্তীর অনুভব এড়াতে পারে না। কিন্তু সে দৃষ্টিতে একটা মায়া মায়া বেদনাহত যাতনার অশেষ ছাড়া আর কিছু নেই আজ। সেই তেজ সেই ক্ষীপ্র গতি জলকে পরাহত করবার অবিসংবাদিত আত্মবিশ্বাসের প্রখর ছাপ আজ নেই মনস্বীতার চোখে। চোখের কোলে এখনো লেগে রয়েছে কান্নার জলের পাতলা পরত। হয়তো কিছুক্ষণ আগেই কেঁদেছে। তবু সন্তান হারানো শোক কী অদ্ভুত শান্ত করে তুলেছে সেদিনের অস্থির মেয়েটিকে। চক্রবর্তী যখন এসবই ভাবছেন তখনই মনস্বীতা কথা বলে। কোনো প্রস্তাবনা ছাড়াই;
-আপনি আমাকে নাম ধরে ডাকতে পারেন। তুমি করেও বলতে পারেন।
চক্রবর্তী যেন স্বস্তি পান। এটাই তিনি চাইছিলেন। প্রশ্ন করেন;
-তোমার স্বামী ঘরে আছেন?
-না নেই। বাইরে কোথাও গেছে
-ঘরে তুমি একা?
-হ্যা। একা।
-তাহলে চলো আমার বাড়িটা তোমাকে চিনিয়ে নিয়ে আসি। এতটা প্রতিবেশি আমরা এটা তো আগে জানা ছিল না।
-কত নম্বর বাড়ি আপনার?
-৮৮।
-আচ্ছা।
-ওই তো রাস্তার ওই পারে, যেখানে তুমি প্রতিদিন ট্যাক্সির জন্য দাঁড়াতে তার উল্টো দিকের রাস্তার দ্বিতীয় বাড়িটাই।
-আচ্ছা।
-বাড়িতে কে আছেন?
-মাধবী আর টুলটুল?
-টুলটুল?
-আমার ছেলের নাম।
-আপনার ছেলের নাম টুলটুল?
-হুম।
মনে পড়ে মনস্বীতার। সেদিন অফিসে তাকে নামিয়ে দেবার সময় তার ছেলেকে নিয়ে কথা হয়েছিল। কী যেন পুরো নাম বলছিলেন, হ্যা মনে পড়েছে অরুণকৃষ্ণ রাজ চক্রবর্তী। ও হ্যা। তখন মনস্বীতার খুব শরীর খারাপ লাগছিল। তাই ডাক নামটি আর মনে নেই।
-বেশ তো নামটি
-তাহলে চলো, ওদের সাথে পরিচিত হবে!
অবসন্ন শরীর মনে কোথায় বের হতে ইচ্ছে করে না আজকাল। অফিস থেকেও কলিগরা ফোন করছে কতবার করে। আজ যাবে কাল যাবে করে করে শুরু করতে পারে নি আবার নতুন করে। কিন্তু চক্রবর্তীর আওভানে কী এক অদ্ভুত মায়া জড়ানো। মনস্বীতার বের হতে ইচ্ছে করে আজ;
-চলুন।
খানিক ইতস্তত করে চক্রবর্তী বলেন :
-গুছিয়ে আসবে কি?
-কী গুছিয়ে আসবো?
মনস্বীতার কথায় চক্রবর্তী বুঝতে পারেন ঘরের আটপৌঢ়ে পোষাকের বিষয়ে কোনো খবর নেই ওর। থাক। বিরক্ত করারই বা কী আছে দরকার। নিজেকে এই কথা বলে চলতে শুরু করেন।
-না ঠিক আছে। এসো।
ঠিক সেদিনের মতো গাড়ির দরজা খুলে ধরেন। মনস্বীতা গাড়িতে উঠে বসলে চক্রবর্তী আবার ড্রাইভিং সিটে বসেন।
-আপনি এতটুকু দূরত্বে গাড়ি বের করেছেন যে?
-আমি অন্য কোথাও গেছিলাম। ফিরবার পথে তোমাকে দেখতে এলাম।
-ও আচ্ছা।
হঠাৎ কী ভেবে আবার বলে :
-আচ্ছা আজ না হয় আপনার বাড়িতে না গেলাম।
-আচ্ছা।
-অন্য কোথাও যেতে চাও।
-একটু খোলা হাওয়ায় নিয়ে চলুন না আমাকে। নীল আকাশের নিচে কোথাও। কোনো নদীর ধারে!
-ঠিক আছে। বাড়িতে অন্য আর একদিন যাওয়া যাবে। তাছাড়া তুমি নিজেও কখনো চলে আসতে পারবে।
গাড়ির গতি বাড়ে। বিকেলের পড়ন্ত রোদের আলোতে কী যে অদ্ভুত মায়া। মেয়েটার চোখের কোলে পড়েছে তারই ছায়া। ওতেই চক্রবর্তী দেখতে পান চোখের কোল গড়িয়ে গড়িয়ে বয়ে চলা জলের নদী কোথায় কোন সমুদ্রে গিয়ে মিশেছিল হয়তো কিছুক্ষণ আগেই। এখনো চোখ বেয়ে গালের মাঝ বরবর রয়েছে তার অশেষ। গাড়িটা যখন মেইন রোড ছেড়ে চলেছে তখনি পাশ কাটিয়ে চলে যায় ফারুক। বাড়ি ফিরছিল সে।
-আরে, মনস্বীতা না? হ্যা। তাইতো। কোথায় কার সাথে কার গাড়িতে চলেছে?
ততক্ষণে গাড়ি এগিয়ে গেছে অনেক। কোনোমতে গাড়ির পেছনে নম্বরটা পড়ে নিতে পারে খুব দ্রুতই ঢাকা মেট্রো গ-১৭-৪০-৭৩।
[চলবে]

পূর্ববর্তী পর্ব-২৭

http://www.teerandaz.com/%e0%a6%b6%e0%a6%be%e0%a6%aa%e0%a6%b2%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%ae%e0%a7%8d%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%95%e0%a6%9f-22/